নৌকাডুবি : বল্গাহীন প্রাথমিক পুঁজিবাদের বলি
jugantor
শতফুল ফুটতে দাও
নৌকাডুবি : বল্গাহীন প্রাথমিক পুঁজিবাদের বলি

  ড. মাহবুব উল্লাহ্  

২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য ১৯৪০-এ চারদিকে অস্বাভাবিক মৃত্যুর মিছিল দেখে লিখেছিলেন, ‘অবাক পৃথিবী! অবাক যে বারবার দেখি এই দেশে মৃত্যুরই কারবার।’ পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করলে একদিন না একদিন মারা যেতেই হবে। মৃত্যু থেকে কোনো মানুষ বা পশুপাখির রেহাই নেই। এটাই প্রকৃতির সাধারণ নিয়ম। তবুও প্রিয়জনের বা আপনজনের মৃত্যু হলে সবাই শোকার্ত হয়।

চোখের পানিতে প্রিয়জনকে বিদায় দিতে হয়। স্বাভাবিক মৃত্যুও মানুষ মেনে নিতে চায় না। কিন্তু মৃত্যু যদি অস্বাভাবিক হয়, তাহলে দুঃখের অন্ত থাকে না। বাংলাদেশে প্রতিনিয়ত মানুষ মরছে। এসব মৃত্যুতে রয়েছে অস্বাভাবিক মৃত্যুও। সাংবাদিক নির্মল সেন একটি কলাম লিখে প্রাতঃস্মরণীয় হয়ে আছেন। সেই কলামের একটি তাৎপর্যপূর্ণ উক্তি ছিল, ‘স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই।’

নির্মল সেনের এ উক্তিটি ঐতিহাসিক উক্তিতে পরিণত হয়েছে। স্বাভাবিক মৃত্যুর অনেক কারণ থাকে। অস্বাভাবিক মৃত্যুরও অনেক কারণ থাকে। অস্বাভাবিক মৃত্যুতে বিয়োগব্যথা থাকে, তার ওপর থাকে হৃদয় কন্দরে গভীর আঘাতের বেদনা। তাই স্বাভাবিক মৃত্যু মেনে নিলেও মানুষ অস্বাভাবিক মৃত্যু সহজে মেনে নিতে চায় না।

যতই দিন যাচ্ছে বাংলাদেশে অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা বেড়েই চলেছে। সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু, নৌকা ও লঞ্চডুবিতে মৃত্যু, রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক সংঘর্ষে মৃত্যু, বিস্ফোরণে মৃত্যু, ভূমিধসে মৃত্যু, বন্যায় মৃত্যু, ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে মৃত্যু, বজ্রপাতে মৃত্যু, অগ্নিদুর্ঘটনায় মৃত্যু এবং দুর্বৃত্তের হাতে মৃত্যু এদেশে বেড়েই চলেছে। মাঝে মাঝে মনে হয় এসব মৃত্যু থেকে আমাদের রেহাই নেই।

যারা সমাজ ও অর্থনীতি নিয়ে গবেষণা করেন, তারা অস্বাভাবিক মৃত্যুগুলোকে একটি বিশ্লেষণ ছকে ব্যাখ্যা করার প্রয়াস পান। একটু চিন্তা করলে দেখা যাবে এসব মৃত্যুর পেছনে কাজ করেছে অতি মুনাফার লোভ। সাধারণ নিয়ম মেনে ব্যবসা-বাণিজ্য করলে মুনাফা অবশ্যই হবে। কিন্তু নিয়মনীতি না মেনে ব্যবসা-বাণিজ্য করলে অতি মুনাফা করা সম্ভব, কিন্তু এভাবে মুনাফা আহরণ টেকসই হয় না।

গত ২৬ সেপ্টেম্বর সোমবার বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে যে খবরটি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করা হয় তা হলো, করতোয়ায় নৌকা ডুবে ২৪ জনের মৃত্যু। মৃত্যুর এ তথ্যটি ছিল প্রাথমিক হিসাব। যতই দিন যাচ্ছে মৃতদেহ উদ্ধার হচ্ছে এবং মৃতের সংখ্যায় যোগ হচ্ছে নতুন নতুন নাম। দুর্ঘটনার পরদিন পরিবেশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, ২০-৩০ জন ধারণক্ষমতার ইঞ্জিনচালিত নৌকায় কয়েকগুণ বেশি যাত্রী উঠেছিলেন। মৃতদের অধিকাংশই নারী ও শিশু। বুধবারের সংবাদপত্র থেকে জানা যায়, মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৮। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন কয়েকজন।

শারদীয় দুর্গোৎসবের মহালয়া উপলক্ষ্যে করতোয়া নদী পার হয়ে পাশের বদেশ্বরী মন্দিরে যাচ্ছিলেন হতভাগ্য যাত্রীরা। ইঞ্জিনচালিত এক নৌকাতেই উঠেছিলেন ৭০-৮০ জন। ঘাট থেকে ছাড়ার পরপরই দুলছিল নৌকাটি। মাঝি একবার তীরে ভেড়ানোর চেষ্টা করে বিফল হন। খানিক পরে মাঝ নদীতে নৌকাটি ডুবে যায়। প্রথমেই প্রাণ হারান ২৪ নারী, পুরুষ ও শিশু। নৌকাটির ধারণক্ষমতা নৌকায় ওঠা যাত্রীদের তুলনায় অনেক কম ছিল। এক্ষেত্রে আমরা দুষব কাকে?

প্রথমত বলতে হয়, যাত্রীরা হয়তো চাইছিল তাড়াতাড়ি নদী পার হতে। তাদের এই ব্যগ্রতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি নৌকার মাঝি। মাঝি হয়তো ভেবেছিলেন, দুর্ঘটনার ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি হলেও সামাল দিয়ে নদী পার হওয়া সম্ভব।

এ কারণে মাঝি বড় ধরনের একটা ঝুঁকি নিয়েছিলেন। দেশের প্রত্যন্ত এলাকায় নদীর এক পাড় থেকে অন্য পাড়ে যাওয়ার জন্য খেয়া নৌকার ব্যবস্থা থাকে। খেয়া পারাপারের ব্যবসাটি কে পাবেন তা নির্ধারণ করতে কর্তৃপক্ষ ঘাট নিলামে দেন। সর্বোচ্চ বিডারকে ঘাটের ইজারা দেওয়া হয়। তত্ত্বগতভাবে ব্যবস্থাটি ঠিকই আছে। কিন্তু গোল বাধে বিডের সময়ে। অধিকতর শক্তিমান বিডাররা দুর্বল বিডারদের ভয় দেখিয়ে বিডে অংশগ্রহণ করতে বাধা দেয়।

এর ফলে ইজারার মূল্য কমে যায় এবং রাষ্ট্র আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমাদের মতো দেশে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যত দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পায়, তার তুলনায় এসব কর্মকাণ্ডকে আইনের বিধান অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। ইজারা ব্যবস্থাটি সঠিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে কি না, তা দেখভালের জন্য তদারকি ব্যবস্থা জরুরি। তদারকি ব্যবস্থা সঠিকভাবে কাজ করলে নদীতে যে দুর্ঘটনা ঘটে, তা অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।

একদিকে কোনোরকম তদারকি ব্যবস্থা না থাকা যেমন বিপজ্জনক, তেমনই দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে যে তদারকি ব্যবস্থা দাঁড়িয়ে যায়, তার পক্ষে কার্যকরভাবে আইন না মেনে চলাকে থামানো সম্ভব নয়।

দেশে স্থানীয় সরকারব্যবস্থা মজবুত হলে তদারকি ব্যবস্থাটি স্থানীয় সরকারের হাতে ন্যস্ত করে সুফল পাওয়া সম্ভব। যদ্দূর জানা যায়, অনেক ক্ষেত্রেই ইউনিয়ন পরিষদ খেয়া পারাপারের দেখভালের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়। ইউনিয়ন পরিষদ যদি সঠিকভাবে কাজটি করে তাহলে ব্যবস্থাটি অনেক কম খরচে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। অর্থনীতির বহু ক্ষেত্র আছে যেখানে সঠিক তদারকি ব্যবস্থা দিয়ে নেতিবাচক প্রভাবগুলোকে খর্ব করা সম্ভব।

স্বাধীনতার ৫০ বছরে অর্থনীতির অনেক খাত বিশালভাবে বেড়ে উঠেছে। সাম্প্রতিককালে ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অভিযান চালিয়ে দেখা গেছে এসব সেন্টারের ডাক্তারদের সার্টিফিকেট ভুয়া, এরা নিুমানের রি-এজেন্ট ব্যবহার করে বলে প্যাথলোজিক্যাল টেস্টের সঠিক ফল পাওয়া যায় না। ফলে রোগীর সঠিক চিকিৎসাও হয় না।

অথচ রোগী ইতোমধ্যেই তার চিকিৎসার জন্য কয়েক হাজার টাকা ব্যয় করে ফেলেছেন। তার সমুদয় অর্থ পানিতে পড়ে গেছে। স্বাধীনতা-উত্তরকালে দেশে খাদ্যব্যবস্থা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব খাদ্যব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে মিষ্টান্নের ব্যবস্থা, কারখানায় তৈরি শুকনা খাবার, বিস্কুট, জ্যাম-জেলি প্রভৃতির ব্যবসা। হোটেল ব্যবসারও ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। কিন্তু খাদ্যের মান নিয়ে প্রশ্ন আছে। কখনো কখনো দেখা যায় মুরগি ব্যবসায়ীরা হোটেলগুলোয় মরা মুরগি সরবরাহ করে। এসব খাদ্য যারা খায়, তারা ভয়ানক মৃত্যুঝুঁকিতে থাকে।

করতোয়ায় নৌকাডুবিতে যারা মারা গেছেন অথবা এখনো নিখোঁজ রয়েছেন, তাদের আত্মীয়স্বজন শোক ও দুঃখে পাথর হয়ে গেছে। একটি দৈনিক পত্রিকা ঘটনার মর্মান্তিক ছবি আঁকতে গিয়ে লিখেছে, পঞ্চগড়ের বোদায় মর্মান্তিক নৌকাডুবিতে প্রিয় মা, বোন, বোনের মেয়ে ও জা-কে হারিয়েছেন আলো রানী। এখানেই শেষ নয় তার শোকগাথা।

দুর্ঘটনার পর কলিজার টুকরা দুই শিশু-সন্তানের খোঁজ পাচ্ছেন না। রোববার দুপুরে ঘটনার পর থেকেই তাই কেঁদে কেঁদে গলা শুকিয়ে গেছে তার। এখন আর কথা বলতে পারছেন না। কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করলে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন। মাঝেমধ্যেই ভাঙা গলায় হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন।

প্রাণে বেঁচে গেলেও আলো রানী এখন জিন্দালাশের প্রতিচ্ছবি। সন্তানদের ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। তবুও আশা নিয়ে বেঁচে আছেন। তার মন বলছে, ওরা ফিরবে তার বুকে। আলো রানীও ছিলেন নৌকায়। তবে সাঁতার জানায় তিনি ও তার আরেক বোন অর্পিতা রানী বেঁচে গেছেন। এখন তাদের মনে হচ্ছে এভাবে বেঁচে থাকা অর্থহীন।

বাংলাদেশে মর্মান্তিক দুর্ঘটনাগুলোর পেছনে আর্থসামাজিক ব্যবস্থার কি কোনো যোগসূত্র আছে? অনেকে বলবেন, এটা পুঁজিবাদের জন্য হচ্ছে। তবে ব্যাপারটি এত সহজসরল নয়। পুঁজিবাদীব্যবস্থাও সুঠাম-সবল হতে পারে। আদর্শ পুঁজিবাদে মানুষের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলে মুনাফা লোটার কোনো সুযোগ নেই।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো পুঁজিবাদী দেশে ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন নামে একটি রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ রয়েছে। এর কাজ হলো জনগণের জন্য নিরাপদ খাদ্য এবং নিরাপদ ওষুধ নিশ্চিত করা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এ ব্যবস্থাটি খুবই কার্যকর বলে প্রশংসিত হয়। পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় বহুবিধ ঘটনা আছে যেগুলো ক্ষতিকর।

এগুলোকে রোধ করতে না পারলে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা সমাজজীবনের জন্য সহায়ক থাকে না। এ কারণে উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলোয় রাষ্ট্রীয়ভাবে আইনের ছত্রছায়ায় নিয়ন্ত্রণমূলক সংস্থা গড়ে তোলা হয়। এ সংস্থাগুলো না থাকলে পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় ভয়ানক নৈরাজ্য দেখা দেবে এবং তার ফলে পুঁজিবাদী ব্যবস্থাটি নিজ থেকেই ধসে পড়বে। নিয়ন্ত্রণমূলক প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে তুলে উন্নত পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলো পুঁজিবাদের নেতিবাচক দিকগুলোকে যথার্থভাবেই নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে।

এখন প্রশ্ন উঠছে, নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলো যাদের নিয়ন্ত্রণ করবে, তারা নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোকে নিজেদের কবজায় নিয়ে আসতে পারে এবং এর জন্য কী করতে হবে? একে বলে Regulatory Capture. যদি রেগুলেটরি ক্যাপচারের ঘটনা ঘটেই যায়, তাহলে এর প্রতিষেধক হিসাবে কী পদক্ষেপ নেওয়া যায়? বলা হচ্ছে রেগুলেটরি ক্যাপচার থাকলে আইন-আদালতের আশ্রয় নিতে হবে। প্রক্রিয়াটি দীর্ঘ কিন্তু অপরিহার্য।

এমনও হতে পারে আইন-আদালতকে হাতের মুঠোয় নিয়ে আসতে পারছে ঘোরতর অন্যায় করা প্রতিষ্ঠানগুলো। এরপর পুঁজিবাদের হাতে এমন কোনো হাতিয়ার থাকে না, যা দিয়ে স্বাস্থ্যহানিকর এবং জীবনবিনাশী ব্যাপারগুলো প্রতিহত করা যায়।

এ অবস্থায় পড়লে পুঁজিবাদ নাচার হয়ে যায়। সেজন্যই বলা হয় পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের জন্য প্রয়োজন গণতান্ত্রিকভাবে সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যম ক্ষমতার হাত বদল এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুঠাম, সবল এবং কার্যকর রাখা। বাংলাদেশে এখন যেসব সমস্যা আমরা দেখি, এর জন্য দায়ী করতে হবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সঠিকভাবে কাজ না করলে নাগরিকদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে।

দেশের যেসব সমস্যার কথা এ কলামে তুলে ধরা হয়েছে, সেগুলোর উৎপত্তি ঘটছে যথার্থ রেগুলেটরি প্রতিষ্ঠান না থাকা অথবা বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল ও অকেজো হয়ে পড়ার কারণে। বাংলাদেশে আমরা যেসব অন্যায়-অপকীর্তি দেখছি সেগুলোর উৎপত্তি পরিপূর্ণ পুঁজিবাদের জন্য নয়, বরং যেখান থেকে পুঁজিবাদের সূচনা ঘটে তার জন্য।

কার্ল মার্কস পুঁজিবাদের প্রাথমিক অবস্থার নাম দিয়েছেন Primitive accumulation. বাংলাদেশে এখন সেই অবস্থাই চলছে। কোনোরকম উদ্যোগ ও ঝুঁকি গ্রহণ ব্যতিরেকে লোকজন হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক হচ্ছেন। বাংলাদেশের প্রথমদিকে দিনমজুর ছিলেন এমন একটি পরিবার এখন সহস্র কোটি টাকার মালিক হলেন কীভাবে? আমি তাদের দেখেছি। যখন জিজ্ঞাসা করলাম আপনারা এমন কী ব্যবসা করেন যা দিয়ে এত মুনাফা করা যায়। জবাবে জানা গেল তারা কেমিক্যালের ব্যবসা করেন।

পুরান ঢাকায় কেমিক্যাল রাখার জন্য বেশকিছু গুদাম আছে। এসব গুদামে বিস্ফোরণ হয়ে অনেক লোকের মৃত্যু হয়েছে। এসব মৃত্যুর কথা আমরা সংবাদপত্র থেকে জানি। কেমিক্যালের এই ব্যবসায়ীরা কেমিক্যালে ভেজাল দিয়ে প্রচুর লাভ করতে সক্ষম হয়।

এ ব্যবসায়ীরা কেমিক্যালের ড্রামগুলো নিরাপদে রাখার কোনো ব্যবস্থা করে না। যদি তাই করতে হতো, তাহলে তাদের খরচা বাড়ত এবং মুনাফা কম হতো। সর্বোপরি দেশের আইনব্যবস্থা দুর্বল হওয়ার কারণে নিয়ম ভঙ্গকারী কেমিক্যাল ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।

এরকম ব্যবসা থেকে কিছু লোকজনের (বলা যায় অমানুষদের) যথাযোগ্য শাস্তি হলে দায়িত্বহীন ব্যবসাটি নিয়মনীতির মধ্যে চলে আসত। কিন্তু শাসকগোষ্ঠী তা চায় না। চায় না বলেই দিনে দিনে মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে। মানুষ দুর্যোগে পড়ছে।

নদী পারাপারে সুনির্দিষ্ট নীতি এবং আইনের প্রয়োগ না থাকতেই এত বড় ট্যাজিক ঘটনাটি ঘটতে পারল। ইজারাদাররাও তাদের মুনাফা বাড়াতে গিয়ে নিরাপদভাবে খেয়া পারাপারের আনুষঙ্গিক ব্যবস্থাগুলো নিচ্ছে না। এত মানুষ বলি হলো প্রাথমিক পুঁজিবাদের নিয়মহীনতা ও নৈরাজ্যের যূপকাষ্ঠে।

ড. মাহবুব উল্লাহ : শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ

শতফুল ফুটতে দাও

নৌকাডুবি : বল্গাহীন প্রাথমিক পুঁজিবাদের বলি

 ড. মাহবুব উল্লাহ্ 
২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য ১৯৪০-এ চারদিকে অস্বাভাবিক মৃত্যুর মিছিল দেখে লিখেছিলেন, ‘অবাক পৃথিবী! অবাক যে বারবার দেখি এই দেশে মৃত্যুরই কারবার।’ পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করলে একদিন না একদিন মারা যেতেই হবে। মৃত্যু থেকে কোনো মানুষ বা পশুপাখির রেহাই নেই। এটাই প্রকৃতির সাধারণ নিয়ম। তবুও প্রিয়জনের বা আপনজনের মৃত্যু হলে সবাই শোকার্ত হয়।

চোখের পানিতে প্রিয়জনকে বিদায় দিতে হয়। স্বাভাবিক মৃত্যুও মানুষ মেনে নিতে চায় না। কিন্তু মৃত্যু যদি অস্বাভাবিক হয়, তাহলে দুঃখের অন্ত থাকে না। বাংলাদেশে প্রতিনিয়ত মানুষ মরছে। এসব মৃত্যুতে রয়েছে অস্বাভাবিক মৃত্যুও। সাংবাদিক নির্মল সেন একটি কলাম লিখে প্রাতঃস্মরণীয় হয়ে আছেন। সেই কলামের একটি তাৎপর্যপূর্ণ উক্তি ছিল, ‘স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই।’

নির্মল সেনের এ উক্তিটি ঐতিহাসিক উক্তিতে পরিণত হয়েছে। স্বাভাবিক মৃত্যুর অনেক কারণ থাকে। অস্বাভাবিক মৃত্যুরও অনেক কারণ থাকে। অস্বাভাবিক মৃত্যুতে বিয়োগব্যথা থাকে, তার ওপর থাকে হৃদয় কন্দরে গভীর আঘাতের বেদনা। তাই স্বাভাবিক মৃত্যু মেনে নিলেও মানুষ অস্বাভাবিক মৃত্যু সহজে মেনে নিতে চায় না।

যতই দিন যাচ্ছে বাংলাদেশে অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা বেড়েই চলেছে। সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু, নৌকা ও লঞ্চডুবিতে মৃত্যু, রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক সংঘর্ষে মৃত্যু, বিস্ফোরণে মৃত্যু, ভূমিধসে মৃত্যু, বন্যায় মৃত্যু, ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে মৃত্যু, বজ্রপাতে মৃত্যু, অগ্নিদুর্ঘটনায় মৃত্যু এবং দুর্বৃত্তের হাতে মৃত্যু এদেশে বেড়েই চলেছে। মাঝে মাঝে মনে হয় এসব মৃত্যু থেকে আমাদের রেহাই নেই।

যারা সমাজ ও অর্থনীতি নিয়ে গবেষণা করেন, তারা অস্বাভাবিক মৃত্যুগুলোকে একটি বিশ্লেষণ ছকে ব্যাখ্যা করার প্রয়াস পান। একটু চিন্তা করলে দেখা যাবে এসব মৃত্যুর পেছনে কাজ করেছে অতি মুনাফার লোভ। সাধারণ নিয়ম মেনে ব্যবসা-বাণিজ্য করলে মুনাফা অবশ্যই হবে। কিন্তু নিয়মনীতি না মেনে ব্যবসা-বাণিজ্য করলে অতি মুনাফা করা সম্ভব, কিন্তু এভাবে মুনাফা আহরণ টেকসই হয় না।

গত ২৬ সেপ্টেম্বর সোমবার বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে যে খবরটি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করা হয় তা হলো, করতোয়ায় নৌকা ডুবে ২৪ জনের মৃত্যু। মৃত্যুর এ তথ্যটি ছিল প্রাথমিক হিসাব। যতই দিন যাচ্ছে মৃতদেহ উদ্ধার হচ্ছে এবং মৃতের সংখ্যায় যোগ হচ্ছে নতুন নতুন নাম। দুর্ঘটনার পরদিন পরিবেশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, ২০-৩০ জন ধারণক্ষমতার ইঞ্জিনচালিত নৌকায় কয়েকগুণ বেশি যাত্রী উঠেছিলেন। মৃতদের অধিকাংশই নারী ও শিশু। বুধবারের সংবাদপত্র থেকে জানা যায়, মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৮। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন কয়েকজন।

শারদীয় দুর্গোৎসবের মহালয়া উপলক্ষ্যে করতোয়া নদী পার হয়ে পাশের বদেশ্বরী মন্দিরে যাচ্ছিলেন হতভাগ্য যাত্রীরা। ইঞ্জিনচালিত এক নৌকাতেই উঠেছিলেন ৭০-৮০ জন। ঘাট থেকে ছাড়ার পরপরই দুলছিল নৌকাটি। মাঝি একবার তীরে ভেড়ানোর চেষ্টা করে বিফল হন। খানিক পরে মাঝ নদীতে নৌকাটি ডুবে যায়। প্রথমেই প্রাণ হারান ২৪ নারী, পুরুষ ও শিশু। নৌকাটির ধারণক্ষমতা নৌকায় ওঠা যাত্রীদের তুলনায় অনেক কম ছিল। এক্ষেত্রে আমরা দুষব কাকে?

প্রথমত বলতে হয়, যাত্রীরা হয়তো চাইছিল তাড়াতাড়ি নদী পার হতে। তাদের এই ব্যগ্রতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি নৌকার মাঝি। মাঝি হয়তো ভেবেছিলেন, দুর্ঘটনার ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি হলেও সামাল দিয়ে নদী পার হওয়া সম্ভব।

এ কারণে মাঝি বড় ধরনের একটা ঝুঁকি নিয়েছিলেন। দেশের প্রত্যন্ত এলাকায় নদীর এক পাড় থেকে অন্য পাড়ে যাওয়ার জন্য খেয়া নৌকার ব্যবস্থা থাকে। খেয়া পারাপারের ব্যবসাটি কে পাবেন তা নির্ধারণ করতে কর্তৃপক্ষ ঘাট নিলামে দেন। সর্বোচ্চ বিডারকে ঘাটের ইজারা দেওয়া হয়। তত্ত্বগতভাবে ব্যবস্থাটি ঠিকই আছে। কিন্তু গোল বাধে বিডের সময়ে। অধিকতর শক্তিমান বিডাররা দুর্বল বিডারদের ভয় দেখিয়ে বিডে অংশগ্রহণ করতে বাধা দেয়।

এর ফলে ইজারার মূল্য কমে যায় এবং রাষ্ট্র আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমাদের মতো দেশে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যত দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পায়, তার তুলনায় এসব কর্মকাণ্ডকে আইনের বিধান অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। ইজারা ব্যবস্থাটি সঠিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে কি না, তা দেখভালের জন্য তদারকি ব্যবস্থা জরুরি। তদারকি ব্যবস্থা সঠিকভাবে কাজ করলে নদীতে যে দুর্ঘটনা ঘটে, তা অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।

একদিকে কোনোরকম তদারকি ব্যবস্থা না থাকা যেমন বিপজ্জনক, তেমনই দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে যে তদারকি ব্যবস্থা দাঁড়িয়ে যায়, তার পক্ষে কার্যকরভাবে আইন না মেনে চলাকে থামানো সম্ভব নয়।

দেশে স্থানীয় সরকারব্যবস্থা মজবুত হলে তদারকি ব্যবস্থাটি স্থানীয় সরকারের হাতে ন্যস্ত করে সুফল পাওয়া সম্ভব। যদ্দূর জানা যায়, অনেক ক্ষেত্রেই ইউনিয়ন পরিষদ খেয়া পারাপারের দেখভালের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়। ইউনিয়ন পরিষদ যদি সঠিকভাবে কাজটি করে তাহলে ব্যবস্থাটি অনেক কম খরচে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। অর্থনীতির বহু ক্ষেত্র আছে যেখানে সঠিক তদারকি ব্যবস্থা দিয়ে নেতিবাচক প্রভাবগুলোকে খর্ব করা সম্ভব।

স্বাধীনতার ৫০ বছরে অর্থনীতির অনেক খাত বিশালভাবে বেড়ে উঠেছে। সাম্প্রতিককালে ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অভিযান চালিয়ে দেখা গেছে এসব সেন্টারের ডাক্তারদের সার্টিফিকেট ভুয়া, এরা নিুমানের রি-এজেন্ট ব্যবহার করে বলে প্যাথলোজিক্যাল টেস্টের সঠিক ফল পাওয়া যায় না। ফলে রোগীর সঠিক চিকিৎসাও হয় না।

অথচ রোগী ইতোমধ্যেই তার চিকিৎসার জন্য কয়েক হাজার টাকা ব্যয় করে ফেলেছেন। তার সমুদয় অর্থ পানিতে পড়ে গেছে। স্বাধীনতা-উত্তরকালে দেশে খাদ্যব্যবস্থা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব খাদ্যব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে মিষ্টান্নের ব্যবস্থা, কারখানায় তৈরি শুকনা খাবার, বিস্কুট, জ্যাম-জেলি প্রভৃতির ব্যবসা। হোটেল ব্যবসারও ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। কিন্তু খাদ্যের মান নিয়ে প্রশ্ন আছে। কখনো কখনো দেখা যায় মুরগি ব্যবসায়ীরা হোটেলগুলোয় মরা মুরগি সরবরাহ করে। এসব খাদ্য যারা খায়, তারা ভয়ানক মৃত্যুঝুঁকিতে থাকে।

করতোয়ায় নৌকাডুবিতে যারা মারা গেছেন অথবা এখনো নিখোঁজ রয়েছেন, তাদের আত্মীয়স্বজন শোক ও দুঃখে পাথর হয়ে গেছে। একটি দৈনিক পত্রিকা ঘটনার মর্মান্তিক ছবি আঁকতে গিয়ে লিখেছে, পঞ্চগড়ের বোদায় মর্মান্তিক নৌকাডুবিতে প্রিয় মা, বোন, বোনের মেয়ে ও জা-কে হারিয়েছেন আলো রানী। এখানেই শেষ নয় তার শোকগাথা।

দুর্ঘটনার পর কলিজার টুকরা দুই শিশু-সন্তানের খোঁজ পাচ্ছেন না। রোববার দুপুরে ঘটনার পর থেকেই তাই কেঁদে কেঁদে গলা শুকিয়ে গেছে তার। এখন আর কথা বলতে পারছেন না। কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করলে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন। মাঝেমধ্যেই ভাঙা গলায় হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন।

প্রাণে বেঁচে গেলেও আলো রানী এখন জিন্দালাশের প্রতিচ্ছবি। সন্তানদের ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। তবুও আশা নিয়ে বেঁচে আছেন। তার মন বলছে, ওরা ফিরবে তার বুকে। আলো রানীও ছিলেন নৌকায়। তবে সাঁতার জানায় তিনি ও তার আরেক বোন অর্পিতা রানী বেঁচে গেছেন। এখন তাদের মনে হচ্ছে এভাবে বেঁচে থাকা অর্থহীন।

বাংলাদেশে মর্মান্তিক দুর্ঘটনাগুলোর পেছনে আর্থসামাজিক ব্যবস্থার কি কোনো যোগসূত্র আছে? অনেকে বলবেন, এটা পুঁজিবাদের জন্য হচ্ছে। তবে ব্যাপারটি এত সহজসরল নয়। পুঁজিবাদীব্যবস্থাও সুঠাম-সবল হতে পারে। আদর্শ পুঁজিবাদে মানুষের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলে মুনাফা লোটার কোনো সুযোগ নেই।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো পুঁজিবাদী দেশে ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন নামে একটি রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ রয়েছে। এর কাজ হলো জনগণের জন্য নিরাপদ খাদ্য এবং নিরাপদ ওষুধ নিশ্চিত করা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এ ব্যবস্থাটি খুবই কার্যকর বলে প্রশংসিত হয়। পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় বহুবিধ ঘটনা আছে যেগুলো ক্ষতিকর।

এগুলোকে রোধ করতে না পারলে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা সমাজজীবনের জন্য সহায়ক থাকে না। এ কারণে উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলোয় রাষ্ট্রীয়ভাবে আইনের ছত্রছায়ায় নিয়ন্ত্রণমূলক সংস্থা গড়ে তোলা হয়। এ সংস্থাগুলো না থাকলে পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় ভয়ানক নৈরাজ্য দেখা দেবে এবং তার ফলে পুঁজিবাদী ব্যবস্থাটি নিজ থেকেই ধসে পড়বে। নিয়ন্ত্রণমূলক প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে তুলে উন্নত পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলো পুঁজিবাদের নেতিবাচক দিকগুলোকে যথার্থভাবেই নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে।

এখন প্রশ্ন উঠছে, নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলো যাদের নিয়ন্ত্রণ করবে, তারা নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোকে নিজেদের কবজায় নিয়ে আসতে পারে এবং এর জন্য কী করতে হবে? একে বলে Regulatory Capture. যদি রেগুলেটরি ক্যাপচারের ঘটনা ঘটেই যায়, তাহলে এর প্রতিষেধক হিসাবে কী পদক্ষেপ নেওয়া যায়? বলা হচ্ছে রেগুলেটরি ক্যাপচার থাকলে আইন-আদালতের আশ্রয় নিতে হবে। প্রক্রিয়াটি দীর্ঘ কিন্তু অপরিহার্য।

এমনও হতে পারে আইন-আদালতকে হাতের মুঠোয় নিয়ে আসতে পারছে ঘোরতর অন্যায় করা প্রতিষ্ঠানগুলো। এরপর পুঁজিবাদের হাতে এমন কোনো হাতিয়ার থাকে না, যা দিয়ে স্বাস্থ্যহানিকর এবং জীবনবিনাশী ব্যাপারগুলো প্রতিহত করা যায়।

এ অবস্থায় পড়লে পুঁজিবাদ নাচার হয়ে যায়। সেজন্যই বলা হয় পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের জন্য প্রয়োজন গণতান্ত্রিকভাবে সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যম ক্ষমতার হাত বদল এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুঠাম, সবল এবং কার্যকর রাখা। বাংলাদেশে এখন যেসব সমস্যা আমরা দেখি, এর জন্য দায়ী করতে হবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সঠিকভাবে কাজ না করলে নাগরিকদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে।

দেশের যেসব সমস্যার কথা এ কলামে তুলে ধরা হয়েছে, সেগুলোর উৎপত্তি ঘটছে যথার্থ রেগুলেটরি প্রতিষ্ঠান না থাকা অথবা বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল ও অকেজো হয়ে পড়ার কারণে। বাংলাদেশে আমরা যেসব অন্যায়-অপকীর্তি দেখছি সেগুলোর উৎপত্তি পরিপূর্ণ পুঁজিবাদের জন্য নয়, বরং যেখান থেকে পুঁজিবাদের সূচনা ঘটে তার জন্য।

কার্ল মার্কস পুঁজিবাদের প্রাথমিক অবস্থার নাম দিয়েছেন Primitive accumulation. বাংলাদেশে এখন সেই অবস্থাই চলছে। কোনোরকম উদ্যোগ ও ঝুঁকি গ্রহণ ব্যতিরেকে লোকজন হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক হচ্ছেন। বাংলাদেশের প্রথমদিকে দিনমজুর ছিলেন এমন একটি পরিবার এখন সহস্র কোটি টাকার মালিক হলেন কীভাবে? আমি তাদের দেখেছি। যখন জিজ্ঞাসা করলাম আপনারা এমন কী ব্যবসা করেন যা দিয়ে এত মুনাফা করা যায়। জবাবে জানা গেল তারা কেমিক্যালের ব্যবসা করেন।

পুরান ঢাকায় কেমিক্যাল রাখার জন্য বেশকিছু গুদাম আছে। এসব গুদামে বিস্ফোরণ হয়ে অনেক লোকের মৃত্যু হয়েছে। এসব মৃত্যুর কথা আমরা সংবাদপত্র থেকে জানি। কেমিক্যালের এই ব্যবসায়ীরা কেমিক্যালে ভেজাল দিয়ে প্রচুর লাভ করতে সক্ষম হয়।

এ ব্যবসায়ীরা কেমিক্যালের ড্রামগুলো নিরাপদে রাখার কোনো ব্যবস্থা করে না। যদি তাই করতে হতো, তাহলে তাদের খরচা বাড়ত এবং মুনাফা কম হতো। সর্বোপরি দেশের আইনব্যবস্থা দুর্বল হওয়ার কারণে নিয়ম ভঙ্গকারী কেমিক্যাল ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।

এরকম ব্যবসা থেকে কিছু লোকজনের (বলা যায় অমানুষদের) যথাযোগ্য শাস্তি হলে দায়িত্বহীন ব্যবসাটি নিয়মনীতির মধ্যে চলে আসত। কিন্তু শাসকগোষ্ঠী তা চায় না। চায় না বলেই দিনে দিনে মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে। মানুষ দুর্যোগে পড়ছে।

নদী পারাপারে সুনির্দিষ্ট নীতি এবং আইনের প্রয়োগ না থাকতেই এত বড় ট্যাজিক ঘটনাটি ঘটতে পারল। ইজারাদাররাও তাদের মুনাফা বাড়াতে গিয়ে নিরাপদভাবে খেয়া পারাপারের আনুষঙ্গিক ব্যবস্থাগুলো নিচ্ছে না। এত মানুষ বলি হলো প্রাথমিক পুঁজিবাদের নিয়মহীনতা ও নৈরাজ্যের যূপকাষ্ঠে।

ড. মাহবুব উল্লাহ : শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন