যুদ্ধ নয়, শান্তির বার্তাই দেশের ঐতিহ্য
jugantor
যুদ্ধ নয়, শান্তির বার্তাই দেশের ঐতিহ্য

  ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী  

২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

জনশ্রুতিমতে, সাম্প্রতিক মিয়ানমার জান্তা সরকারের কুৎসিত সামরিক গোলযোগের ইঙ্গিত-সীমান্তের অভ্যন্তরে গোলা এসে পড়ার ঘটনা দেশীয় বিভীষণ ও বৈশ্বিক শত্রুর নিকৃষ্ট সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনায় প্রণীত। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকবার মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নিক্ষিপ্ত মর্টার শেল বাংলাদেশের বান্দরবান সীমান্তে এসে পড়েছে। আন্তর্জাতিক নিয়মনীতি লঙ্ঘন করে বাংলাদেশ সীমান্তের শূন্যরেখা সংলগ্ন এলাকায় স্থলমাইন স্থাপনসহ একের পর এক আগ্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে বেপরোয়া মিয়ানমার সেনাবাহিনী।

মাইন বিস্ফোরণে রোহিঙ্গাসহ বাংলাদেশি নাগরিকদেরও হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। যুদ্ধ পরিস্থিতি ছাড়া সীমান্ত এলাকায় সেনাবাহিনীর অবস্থান আন্তর্জাতিক রীতিবিরুদ্ধ হলেও মিয়ানমার তার তোয়াক্কা করছে না। বিদ্রোহী আরাকান ও কোচিন আর্মিসহ শান-কারেন-মং-কায়া জনগোষ্ঠীর সঙ্গে চলমান কথিত সংঘাতের অজুহাতে মিয়ানমার সরকার বারবার বাংলাদেশ সীমান্তে মর্টার শেল নিক্ষেপ করে নির্লজ্জ উসকানি দিয়ে যাচ্ছে।

বিজ্ঞ গবেষক-বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশকে যুদ্ধের ফাঁদে ফেলার অপচেষ্টা এবং চাপ সৃষ্টি করে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন রুদ্ধ-বাকি রোহিঙ্গাদেরও বাংলাদেশ বা অন্য কোথাও পাঠিয়ে দেওয়ার পাঁয়তারায় মিয়ানমার হেলিকপ্টার ও যুদ্ধবিমান দিয়ে বাংলাদেশের আকাশসীমা লঙ্ঘনের পর উসকানিমূলকভাবে মর্টার শেল নিক্ষেপ করছে।

গণমাধ্যম সূত্রমতে, ২৮ আগস্ট ঘুমধুম এলাকায় মিয়ানমার থেকে নিক্ষেপ করা ২টি অবিস্ফোরিত মর্টার শেল, ৩ সেপ্টেম্বর ২টি গোলা এবং ৯ সেপ্টেম্বর একে ৪৭ রাইফেলের গুলি এসে পড়ে। ১৬ সেপ্টেম্বর মাইন বিস্ফোরণে বাংলাদেশি এক যুবকের পা উড়ে যায়। ২২ সেপ্টেম্বর ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মুহুর্মুহু গোলা নিক্ষেপের শব্দে নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম-তুমব্রু এবং উখিয়া উপজেলার পালংখালী সীমান্ত প্রকম্পিত হয়েছে।

উপরন্তু ২০ সেপ্টেম্বর থেকে সীমান্তের অদূরে সংঘটিত ভয়াবহ গোলাগুলির ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দারা যারপরনাই আতঙ্কিত-আশঙ্কিত এবং স্থলসীমান্তঘেঁষা এসব বাসিন্দারা প্রচণ্ড ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, প্রায় দেড় মাস ধরে নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম ও তুমব্রুসহ আশপাশের সীমান্তে গোলাগুলি ঘটলেও এখন আঞ্জুমানপাড়া সীমান্তেও গোলাগুলি শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে বিমান থেকে গোলাবর্ষণ এবং গোলাগুলির ব্যাপকতা দারুণ প্রভাব ফেলেছে, যার ভয়ানক ভীতি এখনো কাটছে না।

দেশের নাগরিকদের নিরাপত্তার বিষয়টিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে সরকার ঝুঁকির মুখে থাকা প্রায় ৩০০ পরিবারকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার আনুষঙ্গিক কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে। নিরাপত্তা নিশ্চিতে স্থানীয় লোকজন ছাড়া বাইরের কাউকে অহেতুক সীমান্ত এলাকায় ঢুকতে কড়াকড়ি আরোপ করার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে।

গত ২০ সেপ্টেম্বর আসিয়ানভুক্ত দেশগুলো ছাড়া ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে ব্রিফিংকালে মিয়ানমারের উসকানিতে পা না দিয়ে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিকে শান্তিপূর্ণভাবে সামাল দেওয়ায় কূটনীতিকরা বাংলাদেশের চরম ধৈর্যের প্রশংসা করেছেন বলে জানান ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্র সচিব।

মিয়ানমার থেকে যেন আর কোনো মর্টারের গোলা বা গুলি এদেশে না আসে, সে ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে কূটনীতিকদের আহ্বান জানানো হয়েছে। গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘তারা আমাদের আশ্বস্ত করেছেন যে, তাদের নিজ নিজ দেশ জাতিসংঘের এ ইস্যুতে বাংলাদেশকে সমর্থন দেবে। আমরা তাদের আরও বলেছি, মিয়ানমারকে গোটা অঞ্চলকে অস্থিতিশীল এবং রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে বাধা সৃষ্টি করতে দেওয়া যাবে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘মিয়ানমার বরাবরই একই দাবি করে আসছে, বাংলাদেশে যে গোলাগুলো আঘাত হানছে, সেগুলো মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহী গ্রুপ আরাকান আর্মি ও এআরএসএ নিক্ষেপ করছে।’

বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য দেশগুলো ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, মিসর, দক্ষিণ কোরিয়া, তুরস্ক, ব্রাজিল, সৌদি আরব, জাপানসহ প্রায় সব দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নিলেও এতে অংশ নেয়নি বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত। বিজ্ঞজনরা চীনের অনুপস্থিতিকে কূটনৈতিক শিষ্টাচার লঙ্ঘনের পাশাপাশি মিয়ানমারের প্রতি তাদের সুস্পষ্ট সমর্থন বলে মনে করছেন।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু কর্তৃক প্রণীত বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’ নীতির ভিত্তিতে দেশ পরিচালনাকালে উদ্ভূত এ পরিস্থিতে বাংলাদেশে নিযুক্ত মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে তলব করে কয়েকদফা কড়া প্রতিবাদ জানালেও এদিকে ভ্রুক্ষেপ করছে না মিয়ানমার জান্তা সরকার। প্রতিবাদে সুরাহা না হলে প্রয়োজনে জাতিসংঘে উত্থাপনের মাধ্যমে এর শান্তিপূর্ণ সমাধানের প্রত্যয় ঘোষিত হয়েছে।

২১ সেপ্টেম্বর তিন বাহিনীর প্রধান ও পুলিশ প্রধানের সঙ্গে বিশেষ বৈঠক শেষে সম্মানিত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে বলে মন্তব্য করেন। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা কাউকে ভয় করি না। আমরা যুদ্ধ করে স্বাধীন করেছি, আমরা কাউকে কাউন্ট করি না।

মিয়ানমার নিজেদের অভ্যন্তরে নানা রকম কার্যক্রম চালাচ্ছে, যেটি বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। তবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত।’ একই তারিখে রাজধানীর সেনা মালঞ্চে অনুষ্ঠিত ‘দ্য রোল অব বাংলাদেশ ইন গ্লোবাল পিস’ শীর্ষক সেমিনারে প্রশ্নোত্তর পর্বে সেনাপ্রধানও সীমান্তে মিয়ানমারের সঙ্গে উত্তেজনায় সম্ভাব্য সব পরিস্থিতির জন্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সব ধরনের প্রস্তুতির বিষয়টি অবহিত করেন।

গত ২৬ সেপ্টেম্বর গণমাধ্যমে প্রকাশিত মিয়ানমারবিষয়ক আন্তর্জাতিক পরামর্শক কমিশনের সদস্য ইন্দোনেশিয়ার খ্যাতিমান আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী মারজুকি দারুসমানের সাক্ষাৎকারে জানা যায়, মিয়ানমারের পরিস্থিতি খুবই জটিল। সত্যিকার অর্থে মিয়ানমারে গৃহযুদ্ধ চলছে। মিয়ানমারের জান্তা দেশটির অর্ধেকেরও বেশি এলাকার নিয়ন্ত্রণ বা কর্তৃত্ব হারিয়েছে। প্রতিনিয়ত দখল-পালটা দখল, কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার লড়াই চলছে।

মিয়ানমারে সংঘাতের গোলা বাংলাদেশে এসে পড়া এবং বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ওপর মিয়ানমারের এ সংঘাতের প্রভাব সম্পর্কে প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী জনগণের বিরুদ্ধে হেরে যাচ্ছে।

এ কারণে জান্তা তার সম্ভাব্য সব উপায়ে শক্তি প্রদর্শনের চেষ্টা করছে। এর বিরূপ প্রভাব বাংলাদেশে পড়ছে ও পড়বে। প্রতিবেশীদেরও মিয়ানমার সংকটের প্রভাব মোকাবিলা করতে হবে। সংঘাত, সহিংসতা থামলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা তুলনামূলক সহজ। এখন যে পরিস্থিতি, তাতে হয়তো রোহিঙ্গারা ফিরে যেতে চাইবে না। তাই রোহিঙ্গাদের ফেরার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে মিয়ানমারে সংঘাত, সহিংসতা বন্ধ হতে হবে। আবার দুই পক্ষের পালটাপালটি হামলা বন্ধ হয়ে যাওয়ার অর্থ সংকটের সমাধান হয়ে গেল, এমনটি নয়।’

গত ২০ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত গণমাধ্যম সূত্রে, ২০১৯ সালে জাতিসংঘের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশন টিম কর্তৃক মিয়ানমারের কাছে অস্ত্র বিক্রিতে পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপে অস্ত্র পাওয়ার সুযোগ বন্ধ করার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিশেষ করে জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছিল। ওই টিমের প্রতিবেদন মতে, মিয়ানমারের সামরিক জান্তার নিপীড়নে দেশটির সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের দুঃসহ মানবিক বিপর্যয়ের সময়েও সাতটি দেশের কয়েকটি কোম্পানি মিয়ানমারে অস্ত্র সরবরাহ করেছে।

গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ার ইনডেক্স ২০২২-এর তথ্যানুসারে মিয়ানমারের রয়েছে সমরাস্ত্রের বিপুল ভান্ডার। এর মধ্যে ভারী অস্ত্রের সবই বিদেশ থেকে ক্রয় করা। ২০১৬ সাল থেকে চীন, উত্তর কোরিয়া, ভারত, ইসরাইল, ফিলিপাইনস, রাশিয়া এবং ইউক্রেনের ১৪টি কোম্পানি মিয়ানমারে যুদ্ধবিমান, সাঁজোয়া যান, যুদ্ধজাহাজ, মিসাইল এবং মিসাইল লঞ্চার সরবরাহ করেছে। সমর বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিবেশী দুই দেশ চীন ও ভারতের সঙ্গে মিয়ানমারের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠতার কারণে দেশটি সমরাস্ত্রের উল্লেখযোগ্য অংশ ক্রয় করে এই দুই দেশ থেকে। সম্পর্কের ধারাবাহিকতায় ভারত ২০১৮ সালে মিয়ানমারকে রুশ নির্মিত একটি সাবমেরিনও উপহার দেয়।

মিয়ানমারে চলমান সংঘাতের মধ্যেই কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের ৩৪টি ক্যাম্পে অবস্থানরত প্রায় সাড়ে ১১ লাখ রোহিঙ্গাদের মাঝে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতায় ক্যাম্পগুলোয় খুন, ধর্ষণ, অপহরণ, গ্রুপে গ্রুপে গোলাগুলি, অস্ত্র নিয়ে সংঘাত, আধিপত্য বিস্তার, মাদক, মানব পাচারসহ বিভিন্ন অপরাধ হরহামেশাই সংঘটিত হচ্ছে। শরণার্থী ক্যাম্পে একের পর এক হামলা ও হত্যাকাণ্ড ঘটাচ্ছে বিদ্রোহী রোহিঙ্গা গ্রুপগুলো।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত সূত্রমতে, গত চার মাসে ক্যাম্পে টার্গেট কিলিংয়ের শিকার হয়েছে ১৫ জন নেতা ও স্বেচ্ছাসেবক। কক্সবাজার জেলা পুলিশের তথ্যানুসারে, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে ২০২২ সালের ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ১১৫টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।

ক্যাম্পের নিরাপত্তায় নিয়োজিত আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) উপ-অধিনায়ক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার গণমাধ্যমে জানান, ২০২১ সালের ২৩ অক্টোবরে চালু হওয়া স্বেচ্ছায় পাহারা ব্যবস্থার কারণে ক্যাম্পে অগ্নিসংযোগ-অপহরণ-চাঁদাবাজি-ভয়ভীতি প্রদর্শনের মতো অপরাধ কয়েকগুণ কমেছে। পাশাপাশি বেড়েছে মাদক-অস্ত্র উদ্ধার এবং গ্রেফতারের সংখ্যাও। এতে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা প্রতিবন্ধকতায় পড়ার জেরে এখন স্বেচ্ছাসেবকসহ অন্যদের প্রতিপক্ষ হিসাবে টার্গেট করেছে।

গত ২৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭৭তম অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা রোহিঙ্গাদের টেকসই প্রত্যাবাসনে জাতিসংঘ ও বিশ্বনেতারাকে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে নিরাপদ ও মর্যাদার সঙ্গে প্রত্যাবাসনের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরিতে দ্বিপাক্ষিক, ত্রিপাক্ষিক এবং জাতিসংঘসহ অন্যান্য অংশীজনকে নিয়ে আলোচনা সত্ত্বেও একজন রোহিঙ্গাকেও তাদের মাতৃভূমিতে ফেরত পাঠানো যায়নি। মিয়ানমারে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সশস্ত্র সংঘাত বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনকে আরও দুরূহ করে তুলেছে। আশা করি, এ বিষয়ে জাতিসংঘ কার্যকর ভূমিকা রাখবে।’

ওই ভাষণে তিনি জাতিসংঘ ও বিশ্বনেতাদের সতর্ক করে বলেন, ‘বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের দীর্ঘায়িত উপস্থিতি বাংলাদেশের অর্থনীতি, পরিবেশ, নিরাপত্তা এবং সামাজিক-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে। তাদের প্রত্যাবাসনের অনিশ্চয়তা সর্বস্তরে হতাশার সৃষ্টি করেছে। মানব পাচার ও মাদক চোরাচালানসহ আন্তঃসীমান্ত অপরাধ বৃদ্ধি পাচ্ছে; এমনকি এ পরিস্থিতি উগ্রবাদকেও ইন্ধন দিতে পারে। এ সংকট প্রলম্বিত হতে থাকলে তা এই উপমহাদেশসহ বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে।’

মহান মুক্তিযুদ্ধের সূচনায় অবর্ণনীয় দুঃসময়ে ভারতে বাঙালিদের আশ্রয় নেওয়া ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধকে আমলে নিয়ে এদেশে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়া প্রযোজ্য ছিল। দেশে বহুমুখী সংকট থাকা সত্ত্বেও সরকার ও জনগণ রোহিঙ্গাদের গণহত্যা-পাশবিক নির্যাতন-নিপীড়ন থেকে পরিত্রাণের বিষয়টি মুখ্যত প্রাধান্য পেয়েছিল। ত

ৎকালীন মিয়ানমার সরকার ও কথিত মানবতাবাদী নেত্রী অং সান সুচির প্রত্যক্ষ সমর্থনে পরিচালিত বর্বরতম অভিযানে রোহিঙ্গাদের বিতাড়ন একটি জাতিগোষ্ঠীকে নিধন করা শুধু উদ্দেশ্য ছিল না, উর্বর আরাকান রাজ্যের পরিপূর্ণ দখলই ছিল তাদের প্রণিধানযোগ্য কূটনীতি।

দীর্ঘসময় ধরে এদের প্রত্যাবাসনে নানা অপকৌশল অবলম্বনে এটি সুস্পষ্ট যে, জাতিসংঘসহ বিশ্ববিবেক-উন্নত বিশ্ব কঠিন-দ্রুততর চাপ প্রয়োগে ব্যর্থ হলে এ সংকট নানা খাতে পুরো বিশ্বকে পর্যুদস্ত করার সমূহ আশঙ্কা রয়েছে।

ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী : শিক্ষাবিদ; সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

যুদ্ধ নয়, শান্তির বার্তাই দেশের ঐতিহ্য

 ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী 
২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

জনশ্রুতিমতে, সাম্প্রতিক মিয়ানমার জান্তা সরকারের কুৎসিত সামরিক গোলযোগের ইঙ্গিত-সীমান্তের অভ্যন্তরে গোলা এসে পড়ার ঘটনা দেশীয় বিভীষণ ও বৈশ্বিক শত্রুর নিকৃষ্ট সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনায় প্রণীত। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকবার মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নিক্ষিপ্ত মর্টার শেল বাংলাদেশের বান্দরবান সীমান্তে এসে পড়েছে। আন্তর্জাতিক নিয়মনীতি লঙ্ঘন করে বাংলাদেশ সীমান্তের শূন্যরেখা সংলগ্ন এলাকায় স্থলমাইন স্থাপনসহ একের পর এক আগ্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে বেপরোয়া মিয়ানমার সেনাবাহিনী।

মাইন বিস্ফোরণে রোহিঙ্গাসহ বাংলাদেশি নাগরিকদেরও হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। যুদ্ধ পরিস্থিতি ছাড়া সীমান্ত এলাকায় সেনাবাহিনীর অবস্থান আন্তর্জাতিক রীতিবিরুদ্ধ হলেও মিয়ানমার তার তোয়াক্কা করছে না। বিদ্রোহী আরাকান ও কোচিন আর্মিসহ শান-কারেন-মং-কায়া জনগোষ্ঠীর সঙ্গে চলমান কথিত সংঘাতের অজুহাতে মিয়ানমার সরকার বারবার বাংলাদেশ সীমান্তে মর্টার শেল নিক্ষেপ করে নির্লজ্জ উসকানি দিয়ে যাচ্ছে।

বিজ্ঞ গবেষক-বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশকে যুদ্ধের ফাঁদে ফেলার অপচেষ্টা এবং চাপ সৃষ্টি করে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন রুদ্ধ-বাকি রোহিঙ্গাদেরও বাংলাদেশ বা অন্য কোথাও পাঠিয়ে দেওয়ার পাঁয়তারায় মিয়ানমার হেলিকপ্টার ও যুদ্ধবিমান দিয়ে বাংলাদেশের আকাশসীমা লঙ্ঘনের পর উসকানিমূলকভাবে মর্টার শেল নিক্ষেপ করছে।

গণমাধ্যম সূত্রমতে, ২৮ আগস্ট ঘুমধুম এলাকায় মিয়ানমার থেকে নিক্ষেপ করা ২টি অবিস্ফোরিত মর্টার শেল, ৩ সেপ্টেম্বর ২টি গোলা এবং ৯ সেপ্টেম্বর একে ৪৭ রাইফেলের গুলি এসে পড়ে। ১৬ সেপ্টেম্বর মাইন বিস্ফোরণে বাংলাদেশি এক যুবকের পা উড়ে যায়। ২২ সেপ্টেম্বর ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মুহুর্মুহু গোলা নিক্ষেপের শব্দে নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম-তুমব্রু এবং উখিয়া উপজেলার পালংখালী সীমান্ত প্রকম্পিত হয়েছে।

উপরন্তু ২০ সেপ্টেম্বর থেকে সীমান্তের অদূরে সংঘটিত ভয়াবহ গোলাগুলির ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দারা যারপরনাই আতঙ্কিত-আশঙ্কিত এবং স্থলসীমান্তঘেঁষা এসব বাসিন্দারা প্রচণ্ড ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, প্রায় দেড় মাস ধরে নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম ও তুমব্রুসহ আশপাশের সীমান্তে গোলাগুলি ঘটলেও এখন আঞ্জুমানপাড়া সীমান্তেও গোলাগুলি শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে বিমান থেকে গোলাবর্ষণ এবং গোলাগুলির ব্যাপকতা দারুণ প্রভাব ফেলেছে, যার ভয়ানক ভীতি এখনো কাটছে না।

দেশের নাগরিকদের নিরাপত্তার বিষয়টিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে সরকার ঝুঁকির মুখে থাকা প্রায় ৩০০ পরিবারকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার আনুষঙ্গিক কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে। নিরাপত্তা নিশ্চিতে স্থানীয় লোকজন ছাড়া বাইরের কাউকে অহেতুক সীমান্ত এলাকায় ঢুকতে কড়াকড়ি আরোপ করার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে।

গত ২০ সেপ্টেম্বর আসিয়ানভুক্ত দেশগুলো ছাড়া ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে ব্রিফিংকালে মিয়ানমারের উসকানিতে পা না দিয়ে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিকে শান্তিপূর্ণভাবে সামাল দেওয়ায় কূটনীতিকরা বাংলাদেশের চরম ধৈর্যের প্রশংসা করেছেন বলে জানান ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্র সচিব।

মিয়ানমার থেকে যেন আর কোনো মর্টারের গোলা বা গুলি এদেশে না আসে, সে ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে কূটনীতিকদের আহ্বান জানানো হয়েছে। গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘তারা আমাদের আশ্বস্ত করেছেন যে, তাদের নিজ নিজ দেশ জাতিসংঘের এ ইস্যুতে বাংলাদেশকে সমর্থন দেবে। আমরা তাদের আরও বলেছি, মিয়ানমারকে গোটা অঞ্চলকে অস্থিতিশীল এবং রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে বাধা সৃষ্টি করতে দেওয়া যাবে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘মিয়ানমার বরাবরই একই দাবি করে আসছে, বাংলাদেশে যে গোলাগুলো আঘাত হানছে, সেগুলো মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহী গ্রুপ আরাকান আর্মি ও এআরএসএ নিক্ষেপ করছে।’

বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য দেশগুলো ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, মিসর, দক্ষিণ কোরিয়া, তুরস্ক, ব্রাজিল, সৌদি আরব, জাপানসহ প্রায় সব দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নিলেও এতে অংশ নেয়নি বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত। বিজ্ঞজনরা চীনের অনুপস্থিতিকে কূটনৈতিক শিষ্টাচার লঙ্ঘনের পাশাপাশি মিয়ানমারের প্রতি তাদের সুস্পষ্ট সমর্থন বলে মনে করছেন।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু কর্তৃক প্রণীত বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’ নীতির ভিত্তিতে দেশ পরিচালনাকালে উদ্ভূত এ পরিস্থিতে বাংলাদেশে নিযুক্ত মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে তলব করে কয়েকদফা কড়া প্রতিবাদ জানালেও এদিকে ভ্রুক্ষেপ করছে না মিয়ানমার জান্তা সরকার। প্রতিবাদে সুরাহা না হলে প্রয়োজনে জাতিসংঘে উত্থাপনের মাধ্যমে এর শান্তিপূর্ণ সমাধানের প্রত্যয় ঘোষিত হয়েছে।

২১ সেপ্টেম্বর তিন বাহিনীর প্রধান ও পুলিশ প্রধানের সঙ্গে বিশেষ বৈঠক শেষে সম্মানিত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে বলে মন্তব্য করেন। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা কাউকে ভয় করি না। আমরা যুদ্ধ করে স্বাধীন করেছি, আমরা কাউকে কাউন্ট করি না।

মিয়ানমার নিজেদের অভ্যন্তরে নানা রকম কার্যক্রম চালাচ্ছে, যেটি বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। তবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত।’ একই তারিখে রাজধানীর সেনা মালঞ্চে অনুষ্ঠিত ‘দ্য রোল অব বাংলাদেশ ইন গ্লোবাল পিস’ শীর্ষক সেমিনারে প্রশ্নোত্তর পর্বে সেনাপ্রধানও সীমান্তে মিয়ানমারের সঙ্গে উত্তেজনায় সম্ভাব্য সব পরিস্থিতির জন্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সব ধরনের প্রস্তুতির বিষয়টি অবহিত করেন।

গত ২৬ সেপ্টেম্বর গণমাধ্যমে প্রকাশিত মিয়ানমারবিষয়ক আন্তর্জাতিক পরামর্শক কমিশনের সদস্য ইন্দোনেশিয়ার খ্যাতিমান আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী মারজুকি দারুসমানের সাক্ষাৎকারে জানা যায়, মিয়ানমারের পরিস্থিতি খুবই জটিল। সত্যিকার অর্থে মিয়ানমারে গৃহযুদ্ধ চলছে। মিয়ানমারের জান্তা দেশটির অর্ধেকেরও বেশি এলাকার নিয়ন্ত্রণ বা কর্তৃত্ব হারিয়েছে। প্রতিনিয়ত দখল-পালটা দখল, কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার লড়াই চলছে।

মিয়ানমারে সংঘাতের গোলা বাংলাদেশে এসে পড়া এবং বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ওপর মিয়ানমারের এ সংঘাতের প্রভাব সম্পর্কে প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী জনগণের বিরুদ্ধে হেরে যাচ্ছে।

এ কারণে জান্তা তার সম্ভাব্য সব উপায়ে শক্তি প্রদর্শনের চেষ্টা করছে। এর বিরূপ প্রভাব বাংলাদেশে পড়ছে ও পড়বে। প্রতিবেশীদেরও মিয়ানমার সংকটের প্রভাব মোকাবিলা করতে হবে। সংঘাত, সহিংসতা থামলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা তুলনামূলক সহজ। এখন যে পরিস্থিতি, তাতে হয়তো রোহিঙ্গারা ফিরে যেতে চাইবে না। তাই রোহিঙ্গাদের ফেরার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে মিয়ানমারে সংঘাত, সহিংসতা বন্ধ হতে হবে। আবার দুই পক্ষের পালটাপালটি হামলা বন্ধ হয়ে যাওয়ার অর্থ সংকটের সমাধান হয়ে গেল, এমনটি নয়।’

গত ২০ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত গণমাধ্যম সূত্রে, ২০১৯ সালে জাতিসংঘের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশন টিম কর্তৃক মিয়ানমারের কাছে অস্ত্র বিক্রিতে পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপে অস্ত্র পাওয়ার সুযোগ বন্ধ করার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিশেষ করে জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছিল। ওই টিমের প্রতিবেদন মতে, মিয়ানমারের সামরিক জান্তার নিপীড়নে দেশটির সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের দুঃসহ মানবিক বিপর্যয়ের সময়েও সাতটি দেশের কয়েকটি কোম্পানি মিয়ানমারে অস্ত্র সরবরাহ করেছে।

গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ার ইনডেক্স ২০২২-এর তথ্যানুসারে মিয়ানমারের রয়েছে সমরাস্ত্রের বিপুল ভান্ডার। এর মধ্যে ভারী অস্ত্রের সবই বিদেশ থেকে ক্রয় করা। ২০১৬ সাল থেকে চীন, উত্তর কোরিয়া, ভারত, ইসরাইল, ফিলিপাইনস, রাশিয়া এবং ইউক্রেনের ১৪টি কোম্পানি মিয়ানমারে যুদ্ধবিমান, সাঁজোয়া যান, যুদ্ধজাহাজ, মিসাইল এবং মিসাইল লঞ্চার সরবরাহ করেছে। সমর বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিবেশী দুই দেশ চীন ও ভারতের সঙ্গে মিয়ানমারের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠতার কারণে দেশটি সমরাস্ত্রের উল্লেখযোগ্য অংশ ক্রয় করে এই দুই দেশ থেকে। সম্পর্কের ধারাবাহিকতায় ভারত ২০১৮ সালে মিয়ানমারকে রুশ নির্মিত একটি সাবমেরিনও উপহার দেয়।

মিয়ানমারে চলমান সংঘাতের মধ্যেই কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের ৩৪টি ক্যাম্পে অবস্থানরত প্রায় সাড়ে ১১ লাখ রোহিঙ্গাদের মাঝে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতায় ক্যাম্পগুলোয় খুন, ধর্ষণ, অপহরণ, গ্রুপে গ্রুপে গোলাগুলি, অস্ত্র নিয়ে সংঘাত, আধিপত্য বিস্তার, মাদক, মানব পাচারসহ বিভিন্ন অপরাধ হরহামেশাই সংঘটিত হচ্ছে। শরণার্থী ক্যাম্পে একের পর এক হামলা ও হত্যাকাণ্ড ঘটাচ্ছে বিদ্রোহী রোহিঙ্গা গ্রুপগুলো।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত সূত্রমতে, গত চার মাসে ক্যাম্পে টার্গেট কিলিংয়ের শিকার হয়েছে ১৫ জন নেতা ও স্বেচ্ছাসেবক। কক্সবাজার জেলা পুলিশের তথ্যানুসারে, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে ২০২২ সালের ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ১১৫টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।

ক্যাম্পের নিরাপত্তায় নিয়োজিত আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) উপ-অধিনায়ক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার গণমাধ্যমে জানান, ২০২১ সালের ২৩ অক্টোবরে চালু হওয়া স্বেচ্ছায় পাহারা ব্যবস্থার কারণে ক্যাম্পে অগ্নিসংযোগ-অপহরণ-চাঁদাবাজি-ভয়ভীতি প্রদর্শনের মতো অপরাধ কয়েকগুণ কমেছে। পাশাপাশি বেড়েছে মাদক-অস্ত্র উদ্ধার এবং গ্রেফতারের সংখ্যাও। এতে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা প্রতিবন্ধকতায় পড়ার জেরে এখন স্বেচ্ছাসেবকসহ অন্যদের প্রতিপক্ষ হিসাবে টার্গেট করেছে।

গত ২৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭৭তম অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা রোহিঙ্গাদের টেকসই প্রত্যাবাসনে জাতিসংঘ ও বিশ্বনেতারাকে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে নিরাপদ ও মর্যাদার সঙ্গে প্রত্যাবাসনের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরিতে দ্বিপাক্ষিক, ত্রিপাক্ষিক এবং জাতিসংঘসহ অন্যান্য অংশীজনকে নিয়ে আলোচনা সত্ত্বেও একজন রোহিঙ্গাকেও তাদের মাতৃভূমিতে ফেরত পাঠানো যায়নি। মিয়ানমারে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সশস্ত্র সংঘাত বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনকে আরও দুরূহ করে তুলেছে। আশা করি, এ বিষয়ে জাতিসংঘ কার্যকর ভূমিকা রাখবে।’

ওই ভাষণে তিনি জাতিসংঘ ও বিশ্বনেতাদের সতর্ক করে বলেন, ‘বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের দীর্ঘায়িত উপস্থিতি বাংলাদেশের অর্থনীতি, পরিবেশ, নিরাপত্তা এবং সামাজিক-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে। তাদের প্রত্যাবাসনের অনিশ্চয়তা সর্বস্তরে হতাশার সৃষ্টি করেছে। মানব পাচার ও মাদক চোরাচালানসহ আন্তঃসীমান্ত অপরাধ বৃদ্ধি পাচ্ছে; এমনকি এ পরিস্থিতি উগ্রবাদকেও ইন্ধন দিতে পারে। এ সংকট প্রলম্বিত হতে থাকলে তা এই উপমহাদেশসহ বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে।’

মহান মুক্তিযুদ্ধের সূচনায় অবর্ণনীয় দুঃসময়ে ভারতে বাঙালিদের আশ্রয় নেওয়া ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধকে আমলে নিয়ে এদেশে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়া প্রযোজ্য ছিল। দেশে বহুমুখী সংকট থাকা সত্ত্বেও সরকার ও জনগণ রোহিঙ্গাদের গণহত্যা-পাশবিক নির্যাতন-নিপীড়ন থেকে পরিত্রাণের বিষয়টি মুখ্যত প্রাধান্য পেয়েছিল। ত

ৎকালীন মিয়ানমার সরকার ও কথিত মানবতাবাদী নেত্রী অং সান সুচির প্রত্যক্ষ সমর্থনে পরিচালিত বর্বরতম অভিযানে রোহিঙ্গাদের বিতাড়ন একটি জাতিগোষ্ঠীকে নিধন করা শুধু উদ্দেশ্য ছিল না, উর্বর আরাকান রাজ্যের পরিপূর্ণ দখলই ছিল তাদের প্রণিধানযোগ্য কূটনীতি।

দীর্ঘসময় ধরে এদের প্রত্যাবাসনে নানা অপকৌশল অবলম্বনে এটি সুস্পষ্ট যে, জাতিসংঘসহ বিশ্ববিবেক-উন্নত বিশ্ব কঠিন-দ্রুততর চাপ প্রয়োগে ব্যর্থ হলে এ সংকট নানা খাতে পুরো বিশ্বকে পর্যুদস্ত করার সমূহ আশঙ্কা রয়েছে।

ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী : শিক্ষাবিদ; সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন