গণতন্ত্রের বৈশ্বিক সূচক ও বাংলাদেশ
jugantor
স্বদেশ ভাবনা
গণতন্ত্রের বৈশ্বিক সূচক ও বাংলাদেশ

  আবদুল লতিফ মন্ডল  

৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

যুক্তরাজ্যের লন্ডনভিত্তিক সাময়িকী দি ইকোনমিস্টের ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ) গত ফেব্রুয়ারিতে ‘Democracy Index 2021’ তথা গণতন্ত্র সূচক ২০২১ প্রকাশ করেছে।

বিশ্বে বিভিন্ন রূপে যে গণতন্ত্র বিরাজ করছে, তার চিত্র ফুটে উঠেছে গণতন্ত্র সূচকের এ সংস্করণে। এতে দেখা যায় কোভিড-১৯-এর কারণে পরপর দুবছর বিশ্বে গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার ওপর কতটা নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

কোভিড মহামারির দোহাই দিয়ে লকডাউন আরোপ এবং ভ্রমণে ‘গ্রিন পাশ’ চালুর মাধ্যমে উন্নত গণতান্ত্রিক ও স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় একই রূপে নজিরবিহীনভাবে নাগরিক অধিকার হরণ করা হয়েছে। এর ফলে জরুরি ক্ষমতার ব্যবহার স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং নাগরিকদের সামাজিক ও ব্যক্তিজীবনের ওপর রাষ্ট্রক্ষমতার প্রভাব অনেকটা বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৬৭টি দেশ নিয়ে এ সূচক তৈরি করা হয়েছে।

নির্বাচনব্যবস্থা ও বহুদলীয় অবস্থান, সরকারের সক্রিয়তা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক সংস্কৃতি, নাগরিক অধিকার-এ পাঁচ মানদণ্ডে একটি দেশের পরিস্থিতি বিবেচনা করে ১০ পয়েন্টভিত্তিক এ সূচক তৈরি করেছে ইআইইউ।

সূচকে প্রাপ্ত স্কোরের ভিত্তিতে ইআইইউ দেশগুলোকে চারটি শ্রেণিতে ভাগ করেছে এবং সেগুলো হলো-পূর্ণ গণতন্ত্র (full democracy), ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্র (flawed democracy), মিশ্র শাসন (hybrid regime) এবং স্বৈরতন্ত্র (authoritarian regime)। যেসব দেশের স্কোর ৮ বা এর বেশি তারা পূর্ণ গণতন্ত্র, যেসব দেশের স্কোর ৬-এর বেশি এবং ৮-এর কম, সেগুলো ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্র, যেসব দেশের স্কোর ৪-এর বেশি এবং ৬ বা এর কম, সেগুলো মিশ্র শাসন এবং যেসব দেশের স্কোর ৪ বা এর নিচে, সেগুলোর অবস্থান স্বৈরতন্ত্র ক্যাটাগরিতে। রিপোর্ট থেকে জানা যায়, ১৬৭ দেশের মধ্যে পূর্ণ গণতন্ত্র, ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্র, মিশ্র শাসন ও স্বৈরতন্ত্র ক্যাটাগরিতে রয়েছে যথাক্রমে ২১, ৫৩, ৩৪ ও ৫৯টি করে দেশ।

১০ পয়েন্টভিত্তিক স্কোরে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে থাকা পাঁচটি দেশ হলো-নরওয়ে, নিউজিল্যান্ড, ফিনল্যান্ড, সুইডেন ও আয়ারল্যান্ড এবং তাদের স্কোর হলো যথাক্রমে ৯.৭৫, ৯.৩৭, ৯.২৭,৯.২৬ ও ৯.১৮। সূচকের সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে থাকা পাঁচটি দেশ হলো- আফগানিস্তান, মিয়ানমার, উত্তর কোরিয়া, ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো ও সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক এবং তাদের প্রাপ্ত স্কোর হলো-যথাক্রমে ০.৩২, ১.০২, ১.০৮, ১.৪২ ও ১.৪৩।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে ভারত। দেশটি ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্র ক্যাটাগরিভুক্ত। ৬.৯১ স্কোর নিয়ে তালিকায় দেশটির অবস্থান ৪৬তম।

৬.১৪ স্কোর নিয়ে শ্রীলংকাও ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্র ক্যাটাগরিভুক্ত। তালিকায় দেশটির অবস্থান ৬৭তম। ৫.৯৯ স্কোর নিয়ে গতবারের তুলনায় তালিকায় একধাপ উন্নতি করলেও এবারও বাংলাদেশ আগের মতো হাইব্রিড রেজিম (মিশ্র শাসন) ক্যাটাগরিতেই রয়েছে। ২০০৬ সালে বিএনপির শাসনামলে ইআইইউ প্রকাশিত প্রথম ডেমোক্রেসি ইনডেক্সে ৬.১১ স্কোর নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্র ক্যাটাগরিতে। এরপর থেকে প্রায় ১৬ বছর ধরে বৈশ্বিক গণতন্ত্র সূচকে বাংলাদেশ নিচের ক্যাটাগরিতে তথা হাইব্রিড রেজিম বা মিশ্র শাসন ক্যাটাগরিতে অবস্থান করছে। দীর্ঘ এ সময়ে প্রথম দুবছর (২০০৭-২০০৮) সেনাসমর্থিত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার দেশ শাসন করেছে। এরপর থেকে প্রায় ১৪ বছর ধরে বিরতিহীনভাবে রাষ্ট্রক্ষমতায় রয়েছে আওয়ামী লীগ। দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশের হাইব্রিড রেজিমে অবস্থানের কারণ এবং কীভাবে অবস্থার উন্নতি করা যেতে পারে, তা পর্যালোচনা করাই এ নিবন্ধের উদ্দেশ্য।

যে পাঁচটি মানদণ্ড বিবেচনায় নিয়ে ইআইইউ বৈশ্বিক গণতন্ত্র সূচক ২০২১ তৈরি করেছে, সেগুলোর প্রথমটি হলো নির্বাচনি ব্যবস্থা ও বহুদলীয় অবস্থান। জন্মের পর থেকে বাংলাদেশ এ মানদণ্ডে দুর্বল অবস্থানে রয়েছে। জাতীয় পর্যায়ে এ যাবৎ ১১টি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৬-এর ১২ জুন, ২০০১-এর ১ অক্টোবর এবং ২০০৮-এর ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচন ছাড়া আওয়ামী লীগের শাসনামলে ১৯৭৩-এর ৭ মার্চ, বিএনপি সরকারের আমলে ১৯৭৯-এর ১৮ ফেব্রুয়ারি, জাতীয় পার্টির শাসনামলে ১৯৮৬-এর ৭ মে ও ১৯৮৮-এর ৩ মে এবং বিএনপি শাসনামলে ১৯৯৬-এর ১৫ ফেব্রুয়ারি, আওয়ামী লীগ শাসনামলে ২০১৪-এর ৫ জানুয়ারি ও ২০১৮-এর ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনগুলো সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়নি।

তাছাড়া বিএনপির শাসনামলে ১৯৯৬-এর ১৫ ফেব্রুয়ারি এবং আওয়ামী লীগ শাসনামলে ২০১৪-এর ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক ছিল না। তবে অনিয়মের দিক থেকে অতীতের সব সাধারণ নির্বাচনের রেকর্ড ভেঙে ফেলে ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ সাধারণ নির্বাচন। এ নির্বাচনে নজিরবিহীন অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। এসব অভিযোগের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগটি হলো-নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্ধারিত দিনের আগের রাতে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের ব্যালট বাক্সে ভোট প্রদান।

দশম ও একাদশ সাধারণ নির্বাচন শুধু যে অংশগ্রহণহীন ও সুষ্ঠু হয়নি তা নয়, এ দুটি সাধারণ নির্বাচনের মধ্যবর্তী স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচনও সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক হয়নি। ২০২১ সালে বিএনপি ও বিএনপি নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দলগুলো ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন বর্জন করে। বর্তমানে জেলা পরিষদের নির্বাচনও অনেকটা একদলীয়ভাবে অর্থাৎ মূলত সরকারদলীয় প্রার্থীদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।

সরকারের সক্রিয়তা সম্পর্কে বলা যায়, প্রায় ১৪ বছর ধরে একটানা ক্ষমতায় থাকা বর্তমান সরকার উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন এবং মানবসম্পদ উন্নয়ন ও সামাজিক ক্ষেত্রে লক্ষণীয় সাফল্য অর্জন করলেও এ সময়ে কাক্সিক্ষত গণতন্ত্র অনেকটা পিছিয়ে পড়েছে। শাসক দলের যুক্তি অনেকটা এ রকম-‘আগে উন্নয়ন, পরে গণতন্ত্র’। নির্ভেজাল গণতন্ত্র অনুসরণ করে যে উন্নয়ন করা যায়, উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোর দিকে তাকালে তার অকাট্য প্রমাণ মেলে।

রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বলতে সাধারণত এমন অবস্থাকে বোঝায়, যেখানে প্রশাসনের সব পর্যায়ে কার্যসম্পাদনের জন্য জনগণ তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করবে এবং সমস্যা ও চাহিদা সমাধানে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবে। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা জনগণের স্বার্থসংশ্লিষ্ট সব বিষয়ে তাদের মতামত নেওয়াকে গুরুত্ব দেবেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশে তৃণমূল পর্যায় থেকে শুরু করে অন্যান্য পর্যায়ে জনস্বার্থবিষয়ক সিদ্ধান্তগুলো ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা চালু রয়েছে। ফলে এসব বিষয়ে জনগণের ভূমিকা নেই বললেই চলে।

স্বাধীনতার পর থেকে দেশে অসুস্থ রাজনীতি বিরাজ করছে। মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশের রাজনীতিতে শুরুতেই সহিষ্ণুতা, সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ইত্যাদি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অভাব দেখা দেয়। স্বাধীনতার পাঁচ দশকে এসব ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন হয়নি। রাজনীতির মাঠের শত্রুতা রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের, বিশেষ করে দেশের তিনটি বড় দল আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির নেতাদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনকেও প্রভাবিত করেছে। নব্বইয়ের দশকে বড় দুটি দল বিএনপি ও আওয়ামী লীগ সহাবস্থানে বিশ্বাসী না হয়ে একে অপরকে রাজনৈতিকভাবে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার কৌশল অবলম্বনে তৎপর হয়ে ওঠে, যা বর্তমানেও অব্যাহত রয়েছে। বড় রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরে গণতন্ত্র ও নেতৃত্ব চর্চার অভাব এবং তাদের পরিবারতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হওয়া দেশের রাজনৈতিক সাংস্কৃতির আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য।

দেশে নাগরিক সুরক্ষার ইতিহাস মোটেই সুখকর নয়। আমাদের সংবিধানে বলা হয়েছে, আইনের আশ্রয়লাভ এবং আইনানুযায়ী ও কেবল আইনানুযায়ী ব্যবহারলাভ যে কোনো স্থানে অবস্থানরত প্রত্যেক নাগরিকের এবং সাময়িকভাবে বাংলাদেশে অবস্থানরত অপরাপর ব্যক্তির অবিচ্ছেদ্য অধিকার এবং বিশেষত আইনানুযায়ী ব্যতীত এমন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না, যাতে কোনো ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম বা সম্পত্তির হানি ঘটে, গ্রেফতারকৃত কোনো ব্যক্তিকে যথাসম্ভব শিগগির গ্রেফতারের কারণ জ্ঞাপন না করে প্রহরায় আটক রাখা যাবে না এবং ওই ব্যক্তিকে তার মনোনীত আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শের ও তার দ্বারা আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না।

গ্রেফতারকৃত ও প্রহরায় আটক প্রত্যেক ব্যক্তিকে নিকটতম ম্যাজিস্ট্রেটের সম্মুখে গ্রেফতারের চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে হাজির করা হবে এবং ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশ ব্যতীত তাকে তদতিরিক্তকাল প্রহরায় আটক রাখা যাবে না। কতিপয় শর্তসাপেক্ষে সংবিধানে প্রত্যেক নাগরিকের সমাবেশের স্বাধীনতা ও সংগঠনের স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। সংবিধান প্রত্যেক নাগরিকের বাক ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকার এবং সংবাদ ক্ষেত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দিয়েছে। জাতীয় বা স্থানীয় পর্যায়ে স্বাধীনভাবে প্রতিনিধি নির্বাচন জনগণের একটি মৌলিক অধিকার। স্বাধীনতার পর থেকে, বিশেষ করে এক যুগ ধরে এসব অধিকার লঙ্ঘিত হয়ে আসছে। বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুমের মতো মানবাধিকারবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে।

এ অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় কী? গণতন্ত্রের উন্নয়ন ও প্রাতিষ্ঠানিকীকরণে সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের বিকল্প নেই, সে নির্বাচন জাতীয় বা স্থানীয় যে পর্যায়েই অনুষ্ঠিত হোক। আগামী দ্বাদশ সাধারণ নির্বাচন যেন অংশগ্রহণমূলক ও সুষ্ঠু হয়, সে উপায় খুঁজে বের করতে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোকে আলোচনার টেবিলে আসতে হবে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকেই এ বিষয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। একই সঙ্গে দেশের সংবিধান ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন স্বীকৃত নাগরিক অধিকারগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। দেশ বৈশ্বিক গণতন্ত্র সূচকে উন্নতি করে সম্মানজনক অবস্থানে উঠে আসুক-এটাই জনগণের প্রত্যাশা।

আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক সচিব, কলাম লেখক

latifm43@gmail.com

স্বদেশ ভাবনা

গণতন্ত্রের বৈশ্বিক সূচক ও বাংলাদেশ

 আবদুল লতিফ মন্ডল 
৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

যুক্তরাজ্যের লন্ডনভিত্তিক সাময়িকী দি ইকোনমিস্টের ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ) গত ফেব্রুয়ারিতে ‘Democracy Index 2021’ তথা গণতন্ত্র সূচক ২০২১ প্রকাশ করেছে।

বিশ্বে বিভিন্ন রূপে যে গণতন্ত্র বিরাজ করছে, তার চিত্র ফুটে উঠেছে গণতন্ত্র সূচকের এ সংস্করণে। এতে দেখা যায় কোভিড-১৯-এর কারণে পরপর দুবছর বিশ্বে গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার ওপর কতটা নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

কোভিড মহামারির দোহাই দিয়ে লকডাউন আরোপ এবং ভ্রমণে ‘গ্রিন পাশ’ চালুর মাধ্যমে উন্নত গণতান্ত্রিক ও স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় একই রূপে নজিরবিহীনভাবে নাগরিক অধিকার হরণ করা হয়েছে। এর ফলে জরুরি ক্ষমতার ব্যবহার স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং নাগরিকদের সামাজিক ও ব্যক্তিজীবনের ওপর রাষ্ট্রক্ষমতার প্রভাব অনেকটা বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৬৭টি দেশ নিয়ে এ সূচক তৈরি করা হয়েছে।

নির্বাচনব্যবস্থা ও বহুদলীয় অবস্থান, সরকারের সক্রিয়তা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক সংস্কৃতি, নাগরিক অধিকার-এ পাঁচ মানদণ্ডে একটি দেশের পরিস্থিতি বিবেচনা করে ১০ পয়েন্টভিত্তিক এ সূচক তৈরি করেছে ইআইইউ।

সূচকে প্রাপ্ত স্কোরের ভিত্তিতে ইআইইউ দেশগুলোকে চারটি শ্রেণিতে ভাগ করেছে এবং সেগুলো হলো-পূর্ণ গণতন্ত্র (full democracy), ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্র (flawed democracy), মিশ্র শাসন (hybrid regime) এবং স্বৈরতন্ত্র (authoritarian regime)। যেসব দেশের স্কোর ৮ বা এর বেশি তারা পূর্ণ গণতন্ত্র, যেসব দেশের স্কোর ৬-এর বেশি এবং ৮-এর কম, সেগুলো ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্র, যেসব দেশের স্কোর ৪-এর বেশি এবং ৬ বা এর কম, সেগুলো মিশ্র শাসন এবং যেসব দেশের স্কোর ৪ বা এর নিচে, সেগুলোর অবস্থান স্বৈরতন্ত্র ক্যাটাগরিতে। রিপোর্ট থেকে জানা যায়, ১৬৭ দেশের মধ্যে পূর্ণ গণতন্ত্র, ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্র, মিশ্র শাসন ও স্বৈরতন্ত্র ক্যাটাগরিতে রয়েছে যথাক্রমে ২১, ৫৩, ৩৪ ও ৫৯টি করে দেশ।

১০ পয়েন্টভিত্তিক স্কোরে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে থাকা পাঁচটি দেশ হলো-নরওয়ে, নিউজিল্যান্ড, ফিনল্যান্ড, সুইডেন ও আয়ারল্যান্ড এবং তাদের স্কোর হলো যথাক্রমে ৯.৭৫, ৯.৩৭, ৯.২৭,৯.২৬ ও ৯.১৮। সূচকের সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে থাকা পাঁচটি দেশ হলো- আফগানিস্তান, মিয়ানমার, উত্তর কোরিয়া, ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো ও সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক এবং তাদের প্রাপ্ত স্কোর হলো-যথাক্রমে ০.৩২, ১.০২, ১.০৮, ১.৪২ ও ১.৪৩।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে ভারত। দেশটি ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্র ক্যাটাগরিভুক্ত। ৬.৯১ স্কোর নিয়ে তালিকায় দেশটির অবস্থান ৪৬তম।

৬.১৪ স্কোর নিয়ে শ্রীলংকাও ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্র ক্যাটাগরিভুক্ত। তালিকায় দেশটির অবস্থান ৬৭তম। ৫.৯৯ স্কোর নিয়ে গতবারের তুলনায় তালিকায় একধাপ উন্নতি করলেও এবারও বাংলাদেশ আগের মতো হাইব্রিড রেজিম (মিশ্র শাসন) ক্যাটাগরিতেই রয়েছে। ২০০৬ সালে বিএনপির শাসনামলে ইআইইউ প্রকাশিত প্রথম ডেমোক্রেসি ইনডেক্সে ৬.১১ স্কোর নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্র ক্যাটাগরিতে। এরপর থেকে প্রায় ১৬ বছর ধরে বৈশ্বিক গণতন্ত্র সূচকে বাংলাদেশ নিচের ক্যাটাগরিতে তথা হাইব্রিড রেজিম বা মিশ্র শাসন ক্যাটাগরিতে অবস্থান করছে। দীর্ঘ এ সময়ে প্রথম দুবছর (২০০৭-২০০৮) সেনাসমর্থিত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার দেশ শাসন করেছে। এরপর থেকে প্রায় ১৪ বছর ধরে বিরতিহীনভাবে রাষ্ট্রক্ষমতায় রয়েছে আওয়ামী লীগ। দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশের হাইব্রিড রেজিমে অবস্থানের কারণ এবং কীভাবে অবস্থার উন্নতি করা যেতে পারে, তা পর্যালোচনা করাই এ নিবন্ধের উদ্দেশ্য।

যে পাঁচটি মানদণ্ড বিবেচনায় নিয়ে ইআইইউ বৈশ্বিক গণতন্ত্র সূচক ২০২১ তৈরি করেছে, সেগুলোর প্রথমটি হলো নির্বাচনি ব্যবস্থা ও বহুদলীয় অবস্থান। জন্মের পর থেকে বাংলাদেশ এ মানদণ্ডে দুর্বল অবস্থানে রয়েছে। জাতীয় পর্যায়ে এ যাবৎ ১১টি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৬-এর ১২ জুন, ২০০১-এর ১ অক্টোবর এবং ২০০৮-এর ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচন ছাড়া আওয়ামী লীগের শাসনামলে ১৯৭৩-এর ৭ মার্চ, বিএনপি সরকারের আমলে ১৯৭৯-এর ১৮ ফেব্রুয়ারি, জাতীয় পার্টির শাসনামলে ১৯৮৬-এর ৭ মে ও ১৯৮৮-এর ৩ মে এবং বিএনপি শাসনামলে ১৯৯৬-এর ১৫ ফেব্রুয়ারি, আওয়ামী লীগ শাসনামলে ২০১৪-এর ৫ জানুয়ারি ও ২০১৮-এর ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনগুলো সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়নি।

তাছাড়া বিএনপির শাসনামলে ১৯৯৬-এর ১৫ ফেব্রুয়ারি এবং আওয়ামী লীগ শাসনামলে ২০১৪-এর ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক ছিল না। তবে অনিয়মের দিক থেকে অতীতের সব সাধারণ নির্বাচনের রেকর্ড ভেঙে ফেলে ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ সাধারণ নির্বাচন। এ নির্বাচনে নজিরবিহীন অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। এসব অভিযোগের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগটি হলো-নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্ধারিত দিনের আগের রাতে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের ব্যালট বাক্সে ভোট প্রদান।

দশম ও একাদশ সাধারণ নির্বাচন শুধু যে অংশগ্রহণহীন ও সুষ্ঠু হয়নি তা নয়, এ দুটি সাধারণ নির্বাচনের মধ্যবর্তী স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচনও সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক হয়নি। ২০২১ সালে বিএনপি ও বিএনপি নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দলগুলো ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন বর্জন করে। বর্তমানে জেলা পরিষদের নির্বাচনও অনেকটা একদলীয়ভাবে অর্থাৎ মূলত সরকারদলীয় প্রার্থীদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।

সরকারের সক্রিয়তা সম্পর্কে বলা যায়, প্রায় ১৪ বছর ধরে একটানা ক্ষমতায় থাকা বর্তমান সরকার উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন এবং মানবসম্পদ উন্নয়ন ও সামাজিক ক্ষেত্রে লক্ষণীয় সাফল্য অর্জন করলেও এ সময়ে কাক্সিক্ষত গণতন্ত্র অনেকটা পিছিয়ে পড়েছে। শাসক দলের যুক্তি অনেকটা এ রকম-‘আগে উন্নয়ন, পরে গণতন্ত্র’। নির্ভেজাল গণতন্ত্র অনুসরণ করে যে উন্নয়ন করা যায়, উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোর দিকে তাকালে তার অকাট্য প্রমাণ মেলে।

রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বলতে সাধারণত এমন অবস্থাকে বোঝায়, যেখানে প্রশাসনের সব পর্যায়ে কার্যসম্পাদনের জন্য জনগণ তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করবে এবং সমস্যা ও চাহিদা সমাধানে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবে। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা জনগণের স্বার্থসংশ্লিষ্ট সব বিষয়ে তাদের মতামত নেওয়াকে গুরুত্ব দেবেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশে তৃণমূল পর্যায় থেকে শুরু করে অন্যান্য পর্যায়ে জনস্বার্থবিষয়ক সিদ্ধান্তগুলো ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা চালু রয়েছে। ফলে এসব বিষয়ে জনগণের ভূমিকা নেই বললেই চলে।

স্বাধীনতার পর থেকে দেশে অসুস্থ রাজনীতি বিরাজ করছে। মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশের রাজনীতিতে শুরুতেই সহিষ্ণুতা, সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ইত্যাদি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অভাব দেখা দেয়। স্বাধীনতার পাঁচ দশকে এসব ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন হয়নি। রাজনীতির মাঠের শত্রুতা রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের, বিশেষ করে দেশের তিনটি বড় দল আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির নেতাদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনকেও প্রভাবিত করেছে। নব্বইয়ের দশকে বড় দুটি দল বিএনপি ও আওয়ামী লীগ সহাবস্থানে বিশ্বাসী না হয়ে একে অপরকে রাজনৈতিকভাবে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার কৌশল অবলম্বনে তৎপর হয়ে ওঠে, যা বর্তমানেও অব্যাহত রয়েছে। বড় রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরে গণতন্ত্র ও নেতৃত্ব চর্চার অভাব এবং তাদের পরিবারতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হওয়া দেশের রাজনৈতিক সাংস্কৃতির আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য।

দেশে নাগরিক সুরক্ষার ইতিহাস মোটেই সুখকর নয়। আমাদের সংবিধানে বলা হয়েছে, আইনের আশ্রয়লাভ এবং আইনানুযায়ী ও কেবল আইনানুযায়ী ব্যবহারলাভ যে কোনো স্থানে অবস্থানরত প্রত্যেক নাগরিকের এবং সাময়িকভাবে বাংলাদেশে অবস্থানরত অপরাপর ব্যক্তির অবিচ্ছেদ্য অধিকার এবং বিশেষত আইনানুযায়ী ব্যতীত এমন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না, যাতে কোনো ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম বা সম্পত্তির হানি ঘটে, গ্রেফতারকৃত কোনো ব্যক্তিকে যথাসম্ভব শিগগির গ্রেফতারের কারণ জ্ঞাপন না করে প্রহরায় আটক রাখা যাবে না এবং ওই ব্যক্তিকে তার মনোনীত আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শের ও তার দ্বারা আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না।

গ্রেফতারকৃত ও প্রহরায় আটক প্রত্যেক ব্যক্তিকে নিকটতম ম্যাজিস্ট্রেটের সম্মুখে গ্রেফতারের চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে হাজির করা হবে এবং ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশ ব্যতীত তাকে তদতিরিক্তকাল প্রহরায় আটক রাখা যাবে না। কতিপয় শর্তসাপেক্ষে সংবিধানে প্রত্যেক নাগরিকের সমাবেশের স্বাধীনতা ও সংগঠনের স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। সংবিধান প্রত্যেক নাগরিকের বাক ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকার এবং সংবাদ ক্ষেত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দিয়েছে। জাতীয় বা স্থানীয় পর্যায়ে স্বাধীনভাবে প্রতিনিধি নির্বাচন জনগণের একটি মৌলিক অধিকার। স্বাধীনতার পর থেকে, বিশেষ করে এক যুগ ধরে এসব অধিকার লঙ্ঘিত হয়ে আসছে। বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুমের মতো মানবাধিকারবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে।

এ অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় কী? গণতন্ত্রের উন্নয়ন ও প্রাতিষ্ঠানিকীকরণে সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের বিকল্প নেই, সে নির্বাচন জাতীয় বা স্থানীয় যে পর্যায়েই অনুষ্ঠিত হোক। আগামী দ্বাদশ সাধারণ নির্বাচন যেন অংশগ্রহণমূলক ও সুষ্ঠু হয়, সে উপায় খুঁজে বের করতে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোকে আলোচনার টেবিলে আসতে হবে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকেই এ বিষয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। একই সঙ্গে দেশের সংবিধান ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন স্বীকৃত নাগরিক অধিকারগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। দেশ বৈশ্বিক গণতন্ত্র সূচকে উন্নতি করে সম্মানজনক অবস্থানে উঠে আসুক-এটাই জনগণের প্রত্যাশা।

আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক সচিব, কলাম লেখক

latifm43@gmail.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন