মূল্যস্ফীতির চাপে কমছে জীবনযাত্রার মান
jugantor
নীতি দুর্নীতি অর্থনীতি
মূল্যস্ফীতির চাপে কমছে জীবনযাত্রার মান

  ড. আর এম দেবনাথ  

০১ অক্টোবর ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

খারাপ খবর দিয়ে কলাম শুরু করা ঠিক নয়। তবু অবস্থা বিপাকে তা আজ করতে হচ্ছে। কারণ দেখা যাচ্ছে-সাধারণ মানুষ, নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের জন্য তিনটি খারাপ খবর যুগপৎভাবে উপস্থিত। এর মধ্যে একটি তো হচ্ছে মূল্যস্ফীতি, উচ্চতর ও ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি। দ্বিতীয় খারাপ খবরটি হচ্ছে, ‘নিত্যপণ্যের দামে অস্থিরতা’ সৃষ্টির অভিযোগে ৩৬টি কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা। আর তৃতীয়টি হচ্ছে, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির সুপারিশ অর্থ মন্ত্রণালয়ের।

বলাই বাহুল্য, তিনটি খবরই সাধারণ মানুষের জন্য দুশ্চিন্তার, সরকারের জন্য অস্বস্তির। খবরগুলো বড় হলেও ‘মিডিয়া’ দেখলাম রয়েসয়ে রিপোর্ট করছে, বিশেষ করে মূল্যবৃদ্ধির কারসাজি সংক্রান্ত খবরটি। তা হতেই পারে। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, এসব খবরে মানুষ আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে। বিশেষ করে সর্বশেষ খবরটিতে। এ খবরের শিরোনাম : ‘ভর্তুকির টাকা ছাড়ের সঙ্গে শর্ত-বিদ্যুতের দাম বাড়াতে বলল অর্থ মন্ত্রণালয়’।

আমরা জানি, বিদ্যুতে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হয়। বিদ্যুতের উৎপাদনমূল্য বেশি, বিক্রয়মূল্য কম সাধারণের স্বার্থে। তাহলে বাকি টাকা আসবে কোত্থেকে? অর্থাৎ লোকসানের টাকা পোষাবে কে? সরকার পোষাবে-ভর্তুকি দিয়ে। একটি খবরে দেখা যাচ্ছে, বলা হচ্ছে-‘বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) লোকসান বাড়ছে। এতে সরকারকে ভর্তুকি বাবদ বরাদ্দ বাড়াতে হচ্ছে।

অবশ্য এতে ভর্তুকি দিতে নারাজ অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ। তারা বিদ্যুৎ বিভাগকে চিঠি দিয়ে বিদ্যুতের দাম বাড়াতে বলেছে।’ পাশাপাশি একই চিঠিতে বিদ্যুৎকেন্দ্র অলস বসিয়ে রেখে যে ভাড়া বা ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়, তা কমাতে বলা হয়েছে।

এসবের অর্থ একটিই-বিদ্যুৎ বিভাগকে বাধ্য হয়ে বিদ্যুতের মূল্য বাড়াতে হবে। না বাড়ালে তারা লোকসানের বোঝা বহন করতে অপারগ হবে। কারণ অর্থ মন্ত্রণালয় আর ভর্তুকি বাড়াতে রাজি নয়। অর্থ মন্ত্রণালয় হচ্ছে ‘মন্ত্রণালয়গুলোর মন্ত্রণালয়’-সবার ‘গুরু’। তারা টাকা না দিতে পারলে সরকারের আর কোনো ভরসা নেই। অতএব, ফল হবে একটিই-শেষ পর্যন্ত বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি পাবে। প্রশ্ন শুধু সময়ের। এখন দিন গোনার পালা-কবে থেকে কত পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে।

আতঙ্ক এখানেই। আমাদের অভিজ্ঞতা হলো, সরকারের কোনো ‘বৃদ্ধি কার্যক্রম’ই অল্পে হয় না। ৫-১০ শতাংশ নয়, সরকার সাধারণত একবারে ২০-৩০-৪০ শতাংশ পর্যন্ত মূল্য বৃদ্ধি করে। এটা সহ্যের অতীত। কিন্তু অসহায় মানুষ কী আর করবে? প্রস্তুতি এখন নিতে হবে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির চাপ বহনের জন্য। বলাই বাহুল্য, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির চাপ শুধু মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত বিদ্যুৎ ভোক্তার ওপরই পড়বে না, এ মূল্যবৃদ্ধি সার্বিকভাবে অর্থনীতিতে ব্যাপক অস্বস্তিকর অবস্থা সৃষ্টি করবে। মূল্যস্ফীতির হার আরও বাড়বে।

ইতোমধ্যেই ভর্তুকি কমাতে গত আগস্ট মাসে পেট্রল, ডিজেল, কেরোসিন ও অকটেনের দাম বাড়ানো হয়। বাড়ানো মানে স্বাভাবিক বাড়ানো নয়, একেবারে খড়গহস্ত বাড়ানো। বৃদ্ধির হাল ছিল ৩৪ টাকা থেকে ৪৬ টাকা প্রতি লিটারে। এর আগে কখনো এত বৃদ্ধি দেখা যায়নি। এতে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। শেষ পর্যন্ত সরকার ক্ষোভে কিছুটা জল ঢালে। লিটারে দাম কমায় মাত্র পাঁচ টাকা। ঠিক আছে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে দেশের বাজারে দাম বাড়ানো হয়েছে। এখন কী হবে? এখন তেলের দাম বেশ কমেছে। এখন কি ‘মূল্য সমন্বয়’ করা হবে?

এর আগে দেখা গেছে, সরকার কিনেছে কম দামে, বিক্রি করেছে বেশি দামে। প্রচুর লাভ করেছে পিডিবি। সেই টাকা জরুরি তহবিলে জমা করা যেত ভবিষ্যৎ বৃদ্ধির বোঝা কমানোর জন্য। না, তা করা হয়নি। এতগুলো টাকা কোথায় গেল? এর হিসাব সন্তোষজনক ছিল কি? পেট্রল, ডিজেল, কেরোসিন ও অকটেনের মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা সামলাতে না সামলাতেই আসছে বিদ্যুতের ঝড়। এই ঝড় মানুষ সামলাবে কীভাবে?

জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে দ্রব্যমূল্য কীভাবে বেড়েছে তার খবর শুনে আতঙ্কিত হতে হয়। এ খবর পাওয়া যায় মূল্যস্ফীতির হারের খবরে। মূল্যস্ফীতি কী হারে বেড়েছে, তা সাধারণ মানুষ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। কিন্তু সরকারি কোনো তথ্য আমরা পাচ্ছি না। সেপ্টেম্বর মাস শেষ। এখন পর্যন্ত মূল্যস্ফীতির হার কত ছিল আগস্ট মাসে, তা আমরা জানতে পারিনি। আগে প্রতি মাসের প্রথম সপ্তাহে মূল্যস্ফীতির হার সম্পর্কে জানান দেওয়া হতো। দিতেন স্বয়ং মন্ত্রী। এখন কী যে হলো মন্ত্রী মহোদয়দের, তারা এ সম্পর্কে কোনো ‘রা’ করেন না।

মুশকিল হচ্ছে এখানেই। এখানেই সন্দেহ হয়। অতীতের অভিজ্ঞতাও তা-ই। যখন মূল্যস্ফীতির হার কম থাকে, তখন সরকার ঘটা করে সংবাদ সম্মেলন করে তা প্রকাশ করে। যেমন বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের খবর। আগে কয়েকদিন পরপর রিজার্ভ বৃদ্ধির খবর দেওয়া হতো। এখন আর তা হয় না। এতেই মানুষের সন্দেহ বাড়ে, ‘স্পেকুলেশন’ হয়, যা কারও জন্য ভালো নয়। সঠিক খবর মানুষ আশা করে। এতে অনেক কিছুর ফয়সালা হয়। বোঝা যাচ্ছে, মূল্যস্ফীতির হার বেশ বেড়েছে। বিবিএস এর হিসাব করে ফেলেছে; কিন্তু অজ্ঞাত কারণে তা প্রকাশ করছে না। বলা হচ্ছে, সার্বিক মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশ ছুঁইছুঁই। খাদ্য মূল্যস্ফীতি দুই সংখ্যার ঘরে, যা খুবই উদ্বেগজনক।

আন্তর্জাতিক বাজারে জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে, জাহাজ ভাড়া বেড়েছে, এলসি (ঋণপত্র) খরচ বেড়েছে। অতএব, জানা কথা, জিনিসপত্রের দাম কিছুটা বাড়বে। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্যস্তর দেশীয় বাজারে রক্ষিত হয় না। ওখানে দাম বাড়লে সঙ্গে সঙ্গে দেশের বাজারে দাম বাড়ে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে তার কোনো সুফল আমরা পাই না। বাজেটের সময়ও তাই। বা

জেটে কর হ্রাস পায়, কিন্তু পণ্যের দাম বাজারে কমে না। অথচ কর একটু বাড়লেই সঙ্গে সঙ্গেই মূল্যবৃদ্ধি ঘটে। বাজারের এই ‘অত্যাচার’ এক অসহনীয় পর্যায়ে চলে গেছে/যাচ্ছে। কিছুদিন আগে শুনেছিলাম, সদাশয় বাণিজ্যমন্ত্রী নয়টি পণ্যের দাম ঠিক করে দেবেন। এর মধ্যে চাল, ডালসহ সাতটি নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য, বাকি দুটি নির্মাণ শিল্পের সামগ্রী। না, মন্ত্রী পারলেন না। একদিন বাদেই তিনি বললেন, তা হচ্ছে না। পরে বোঝা গেল মূল্য নির্ধারণ করার ‘জটিল’ দায়িত্ব বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একার কাজ নয়। এতে জড়িত হতে চান অনেক মন্ত্রণালয়ের সচিবরা। তাই শেষ পর্যন্ত সমন্বয়ের কথা বলে ওই সিদ্ধান্ত স্থগিত করা হয়।

অবশ্য দাম নির্ধারণ করলেই তো হলো না। সেই নির্ধারিত মূল্য বাস্তবায়ন করার মতো শক্তি/মনোবল/রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকতে হবে। এটা আমাদের নেই। স্বাধীনতার ৫০ বছরেও সিএনজিচালিত অটোরিকশার ভাড়া অনুসরণ করানো যায়নি। যাত্রীদের দুই-তিনগুণ ভাড়ায় সিএনজিতে চড়তে হয়। সয়াবিন তেলের নির্ধারিত দাম নিয়েও একই ঘটনা ঘটে। ফলে ঝগড়ার শেষ নেই ভোক্তা ও বিক্রেতাদের মধ্যে। দেখাই যাচ্ছে, সরকার নির্ধারিত দাম বাস্তবায়ন করতে অপারগ। যেমন অপারগ রাস্তা থেকে হকার উচ্ছেদ কর্মে। সকালে উচ্ছেদ, বিকালে ‘যথা পূর্বং তথা পরং’।

অভিযোগ আছে, অভিযানের খবর আগেভাগেই তাদের দিয়ে দেওয়া হয়। জানি না বাসে এখন সব ক্ষেত্রে টিকিট দেওয়া হয় কিনা। কিছুদিন আগ পর্যন্ত তা করা হতো না। বোঝা যাচ্ছে-মূল্য নির্ধারণ, নির্ধারিত মূল্য বাস্তবায়নে সরাসরি সফলতা প্রায় শূন্যের কোঠায়। এমনকি কোথাও কোথাও তো ‘ফ্রি ফর অল’। যেমন বিমানের টিকিট। আজ এক দাম, কাল আরেক দাম, পরশু অন্য দাম। এটাই নাকি বাজার অর্থনীতি! চাহিদা-সরবরাহ ঠিক করবে মূল্য। এটাই যদি হবে তাহলে বাজারে হস্তক্ষেপ কেন? যে বাজার নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নেই, সে বাজারে হাত দেওয়া কেন? দিতে হয়। মুখরক্ষার খাতিরে। রাজনীতি করার জন্য।

মানুষ দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিতে কাহিল। অতএব, একটা প্রয়াস। এই যেমন সর্বশেষ দেখলাম একটি খবর। ছোট্ট খবর, কিন্তু ঘটনা বড়। সে খবরে দেখা যাচ্ছে, দেশের ৩৬টি বড় কোম্পানির বিরুদ্ধে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে অস্থিরতা সৃষ্টির অভিযোগে মামলা করা হয়েছে। কে করেছে? করেছে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন। কোন কোন পণ্যের মূল্যে অস্থিরতা সৃষ্টির অভিযোগ? চাল, আটা, ময়দা, ডিম, মুরগি ও প্রসাধনসামগ্রী আছে এসবের মধ্যে। যুগান্তরে যেসব নাম দেখলাম, তাতে পিলে চমকে যাওয়ার মতো অবস্থা। কারণ দেশের বড় বড় যত কোম্পানি, গ্রুপ, ব্যবসায়ী আছেন, তাদের প্রায় সবাই রয়েছে এ তালিকায়। কী করে তা সম্ভব? এতগুলো নামকরা কোম্পানির সবাই পণ্যমূল্যে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করেছে। প্রায় অসম্ভব কল্পনা! এত সাহস বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন কোথায় পেল? সাহসের প্রশ্ন পরে।

একটা কাজ হয়েছে, এতে ‘প্রতিযোগিতা কমিশন’ বলে যে একটা প্রতিষ্ঠান আছে, আমরা জানলাম, জনগণ জানল। পরের প্রশ্ন, শেষ পর্যন্ত কী হবে? এতগুলো কোম্পানি? কার্যত তারাই নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। এদের কেউ কেউ আমদানি ব্যবসা করে, উৎপাদন করে, বিপণন করে। কারও কারও রয়েছে ব্যাংক-বিমা ব্যবসা। এতগুলো কোম্পানির বিরুদ্ধে একযোগে অভিযান, অভিযোগ এই প্রথম আমার মনে হয়।

এতে কি হিতে বিপরীত হবে? জানি না কী হবে। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন তাদের অভিযোগ প্রমাণ করতে পারবে তো? মামলা হবে, অভিযোগ সুনির্দিষ্ট করতে হবে, অভিযোগনামা দায়ের করতে হবে। উকিল লাগবে। কোম্পানিগুলোর পক্ষে দাঁড়াবেন ‘দেশবরেণ্য’ অইনজীবীরা; আর কমিশনের পক্ষে দাঁড়াবেন কে? তারা পারবেন তো জাঁদরেলদের সম্মুখ সমরে পরাস্ত করতে? অনেক প্রশ্ন। আবার, তারা সবাই মিলে সরবরাহ ঠিক রাখতে সরকারকে অসহযোগিতা করবে না তো? কিছুই আমরা জানি না। আমরা শুধু জানি-মূল্যস্ফীতি, পণ্যমূল্যে কারসাজি, সরকারি স্তরে মূল্যবৃদ্ধি-এই তিনের সাঁড়াশি আক্রমণে জনগণ পর্যুদস্ত। সবই যুদ্ধের অজুহাতে-রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ।

এ যুদ্ধ কবে শেষ হবে, তা আমরা কেউ জানি না। তাহলে কি ধরে নেওয়া যায়, মূল্যস্ফীতি অব্যাহত থাকবে? জিনিসপত্রের দাম যে স্তরে উঠেছে, তা থেকে আর নামবে না? না নামলেই বিপদ, যদি না মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ে, আয় বৃদ্ধি পায়। কর্মহীনতা, বেকারত্ব, চাকরিচ্যুতি ইত্যাদি যদি ঘটতেই থাকে, তাহলেই বিপদ। বহু মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাবে। মধ্যবিত্ত হবে নিম্নবিত্ত। নিম্নবিত্ত হবে বিত্তহীন। দরিদ্র হবে অতিদরিদ্র। আর মূল্যস্ফীতিতে যারা লাভবান হয়, সেই অতিধনীরা হবে আরও ধনী। তাদের অনেকেই পাচার করবে অর্থ। সিঙ্গাপুর, দুবাই, আমেরিকা, কানাডা, ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়ায় বসতি গাড়বে তারা। দুর্বলরাই থাকবে দেশে!

ড. আর এম দেবনাথ : অর্থনীতি বিশ্লেষক; সাবেক শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

নীতি দুর্নীতি অর্থনীতি

মূল্যস্ফীতির চাপে কমছে জীবনযাত্রার মান

 ড. আর এম দেবনাথ 
০১ অক্টোবর ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

খারাপ খবর দিয়ে কলাম শুরু করা ঠিক নয়। তবু অবস্থা বিপাকে তা আজ করতে হচ্ছে। কারণ দেখা যাচ্ছে-সাধারণ মানুষ, নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের জন্য তিনটি খারাপ খবর যুগপৎভাবে উপস্থিত। এর মধ্যে একটি তো হচ্ছে মূল্যস্ফীতি, উচ্চতর ও ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি। দ্বিতীয় খারাপ খবরটি হচ্ছে, ‘নিত্যপণ্যের দামে অস্থিরতা’ সৃষ্টির অভিযোগে ৩৬টি কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা। আর তৃতীয়টি হচ্ছে, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির সুপারিশ অর্থ মন্ত্রণালয়ের।

বলাই বাহুল্য, তিনটি খবরই সাধারণ মানুষের জন্য দুশ্চিন্তার, সরকারের জন্য অস্বস্তির। খবরগুলো বড় হলেও ‘মিডিয়া’ দেখলাম রয়েসয়ে রিপোর্ট করছে, বিশেষ করে মূল্যবৃদ্ধির কারসাজি সংক্রান্ত খবরটি। তা হতেই পারে। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, এসব খবরে মানুষ আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে। বিশেষ করে সর্বশেষ খবরটিতে। এ খবরের শিরোনাম : ‘ভর্তুকির টাকা ছাড়ের সঙ্গে শর্ত-বিদ্যুতের দাম বাড়াতে বলল অর্থ মন্ত্রণালয়’।

আমরা জানি, বিদ্যুতে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হয়। বিদ্যুতের উৎপাদনমূল্য বেশি, বিক্রয়মূল্য কম সাধারণের স্বার্থে। তাহলে বাকি টাকা আসবে কোত্থেকে? অর্থাৎ লোকসানের টাকা পোষাবে কে? সরকার পোষাবে-ভর্তুকি দিয়ে। একটি খবরে দেখা যাচ্ছে, বলা হচ্ছে-‘বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) লোকসান বাড়ছে। এতে সরকারকে ভর্তুকি বাবদ বরাদ্দ বাড়াতে হচ্ছে।

অবশ্য এতে ভর্তুকি দিতে নারাজ অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ। তারা বিদ্যুৎ বিভাগকে চিঠি দিয়ে বিদ্যুতের দাম বাড়াতে বলেছে।’ পাশাপাশি একই চিঠিতে বিদ্যুৎকেন্দ্র অলস বসিয়ে রেখে যে ভাড়া বা ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়, তা কমাতে বলা হয়েছে।

এসবের অর্থ একটিই-বিদ্যুৎ বিভাগকে বাধ্য হয়ে বিদ্যুতের মূল্য বাড়াতে হবে। না বাড়ালে তারা লোকসানের বোঝা বহন করতে অপারগ হবে। কারণ অর্থ মন্ত্রণালয় আর ভর্তুকি বাড়াতে রাজি নয়। অর্থ মন্ত্রণালয় হচ্ছে ‘মন্ত্রণালয়গুলোর মন্ত্রণালয়’-সবার ‘গুরু’। তারা টাকা না দিতে পারলে সরকারের আর কোনো ভরসা নেই। অতএব, ফল হবে একটিই-শেষ পর্যন্ত বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি পাবে। প্রশ্ন শুধু সময়ের। এখন দিন গোনার পালা-কবে থেকে কত পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে।

আতঙ্ক এখানেই। আমাদের অভিজ্ঞতা হলো, সরকারের কোনো ‘বৃদ্ধি কার্যক্রম’ই অল্পে হয় না। ৫-১০ শতাংশ নয়, সরকার সাধারণত একবারে ২০-৩০-৪০ শতাংশ পর্যন্ত মূল্য বৃদ্ধি করে। এটা সহ্যের অতীত। কিন্তু অসহায় মানুষ কী আর করবে? প্রস্তুতি এখন নিতে হবে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির চাপ বহনের জন্য। বলাই বাহুল্য, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির চাপ শুধু মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত বিদ্যুৎ ভোক্তার ওপরই পড়বে না, এ মূল্যবৃদ্ধি সার্বিকভাবে অর্থনীতিতে ব্যাপক অস্বস্তিকর অবস্থা সৃষ্টি করবে। মূল্যস্ফীতির হার আরও বাড়বে।

ইতোমধ্যেই ভর্তুকি কমাতে গত আগস্ট মাসে পেট্রল, ডিজেল, কেরোসিন ও অকটেনের দাম বাড়ানো হয়। বাড়ানো মানে স্বাভাবিক বাড়ানো নয়, একেবারে খড়গহস্ত বাড়ানো। বৃদ্ধির হাল ছিল ৩৪ টাকা থেকে ৪৬ টাকা প্রতি লিটারে। এর আগে কখনো এত বৃদ্ধি দেখা যায়নি। এতে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। শেষ পর্যন্ত সরকার ক্ষোভে কিছুটা জল ঢালে। লিটারে দাম কমায় মাত্র পাঁচ টাকা। ঠিক আছে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে দেশের বাজারে দাম বাড়ানো হয়েছে। এখন কী হবে? এখন তেলের দাম বেশ কমেছে। এখন কি ‘মূল্য সমন্বয়’ করা হবে?

এর আগে দেখা গেছে, সরকার কিনেছে কম দামে, বিক্রি করেছে বেশি দামে। প্রচুর লাভ করেছে পিডিবি। সেই টাকা জরুরি তহবিলে জমা করা যেত ভবিষ্যৎ বৃদ্ধির বোঝা কমানোর জন্য। না, তা করা হয়নি। এতগুলো টাকা কোথায় গেল? এর হিসাব সন্তোষজনক ছিল কি? পেট্রল, ডিজেল, কেরোসিন ও অকটেনের মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা সামলাতে না সামলাতেই আসছে বিদ্যুতের ঝড়। এই ঝড় মানুষ সামলাবে কীভাবে?

জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে দ্রব্যমূল্য কীভাবে বেড়েছে তার খবর শুনে আতঙ্কিত হতে হয়। এ খবর পাওয়া যায় মূল্যস্ফীতির হারের খবরে। মূল্যস্ফীতি কী হারে বেড়েছে, তা সাধারণ মানুষ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। কিন্তু সরকারি কোনো তথ্য আমরা পাচ্ছি না। সেপ্টেম্বর মাস শেষ। এখন পর্যন্ত মূল্যস্ফীতির হার কত ছিল আগস্ট মাসে, তা আমরা জানতে পারিনি। আগে প্রতি মাসের প্রথম সপ্তাহে মূল্যস্ফীতির হার সম্পর্কে জানান দেওয়া হতো। দিতেন স্বয়ং মন্ত্রী। এখন কী যে হলো মন্ত্রী মহোদয়দের, তারা এ সম্পর্কে কোনো ‘রা’ করেন না।

মুশকিল হচ্ছে এখানেই। এখানেই সন্দেহ হয়। অতীতের অভিজ্ঞতাও তা-ই। যখন মূল্যস্ফীতির হার কম থাকে, তখন সরকার ঘটা করে সংবাদ সম্মেলন করে তা প্রকাশ করে। যেমন বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের খবর। আগে কয়েকদিন পরপর রিজার্ভ বৃদ্ধির খবর দেওয়া হতো। এখন আর তা হয় না। এতেই মানুষের সন্দেহ বাড়ে, ‘স্পেকুলেশন’ হয়, যা কারও জন্য ভালো নয়। সঠিক খবর মানুষ আশা করে। এতে অনেক কিছুর ফয়সালা হয়। বোঝা যাচ্ছে, মূল্যস্ফীতির হার বেশ বেড়েছে। বিবিএস এর হিসাব করে ফেলেছে; কিন্তু অজ্ঞাত কারণে তা প্রকাশ করছে না। বলা হচ্ছে, সার্বিক মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশ ছুঁইছুঁই। খাদ্য মূল্যস্ফীতি দুই সংখ্যার ঘরে, যা খুবই উদ্বেগজনক।

আন্তর্জাতিক বাজারে জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে, জাহাজ ভাড়া বেড়েছে, এলসি (ঋণপত্র) খরচ বেড়েছে। অতএব, জানা কথা, জিনিসপত্রের দাম কিছুটা বাড়বে। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্যস্তর দেশীয় বাজারে রক্ষিত হয় না। ওখানে দাম বাড়লে সঙ্গে সঙ্গে দেশের বাজারে দাম বাড়ে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে তার কোনো সুফল আমরা পাই না। বাজেটের সময়ও তাই। বা

জেটে কর হ্রাস পায়, কিন্তু পণ্যের দাম বাজারে কমে না। অথচ কর একটু বাড়লেই সঙ্গে সঙ্গেই মূল্যবৃদ্ধি ঘটে। বাজারের এই ‘অত্যাচার’ এক অসহনীয় পর্যায়ে চলে গেছে/যাচ্ছে। কিছুদিন আগে শুনেছিলাম, সদাশয় বাণিজ্যমন্ত্রী নয়টি পণ্যের দাম ঠিক করে দেবেন। এর মধ্যে চাল, ডালসহ সাতটি নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য, বাকি দুটি নির্মাণ শিল্পের সামগ্রী। না, মন্ত্রী পারলেন না। একদিন বাদেই তিনি বললেন, তা হচ্ছে না। পরে বোঝা গেল মূল্য নির্ধারণ করার ‘জটিল’ দায়িত্ব বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একার কাজ নয়। এতে জড়িত হতে চান অনেক মন্ত্রণালয়ের সচিবরা। তাই শেষ পর্যন্ত সমন্বয়ের কথা বলে ওই সিদ্ধান্ত স্থগিত করা হয়।

অবশ্য দাম নির্ধারণ করলেই তো হলো না। সেই নির্ধারিত মূল্য বাস্তবায়ন করার মতো শক্তি/মনোবল/রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকতে হবে। এটা আমাদের নেই। স্বাধীনতার ৫০ বছরেও সিএনজিচালিত অটোরিকশার ভাড়া অনুসরণ করানো যায়নি। যাত্রীদের দুই-তিনগুণ ভাড়ায় সিএনজিতে চড়তে হয়। সয়াবিন তেলের নির্ধারিত দাম নিয়েও একই ঘটনা ঘটে। ফলে ঝগড়ার শেষ নেই ভোক্তা ও বিক্রেতাদের মধ্যে। দেখাই যাচ্ছে, সরকার নির্ধারিত দাম বাস্তবায়ন করতে অপারগ। যেমন অপারগ রাস্তা থেকে হকার উচ্ছেদ কর্মে। সকালে উচ্ছেদ, বিকালে ‘যথা পূর্বং তথা পরং’।

অভিযোগ আছে, অভিযানের খবর আগেভাগেই তাদের দিয়ে দেওয়া হয়। জানি না বাসে এখন সব ক্ষেত্রে টিকিট দেওয়া হয় কিনা। কিছুদিন আগ পর্যন্ত তা করা হতো না। বোঝা যাচ্ছে-মূল্য নির্ধারণ, নির্ধারিত মূল্য বাস্তবায়নে সরাসরি সফলতা প্রায় শূন্যের কোঠায়। এমনকি কোথাও কোথাও তো ‘ফ্রি ফর অল’। যেমন বিমানের টিকিট। আজ এক দাম, কাল আরেক দাম, পরশু অন্য দাম। এটাই নাকি বাজার অর্থনীতি! চাহিদা-সরবরাহ ঠিক করবে মূল্য। এটাই যদি হবে তাহলে বাজারে হস্তক্ষেপ কেন? যে বাজার নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নেই, সে বাজারে হাত দেওয়া কেন? দিতে হয়। মুখরক্ষার খাতিরে। রাজনীতি করার জন্য।

মানুষ দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিতে কাহিল। অতএব, একটা প্রয়াস। এই যেমন সর্বশেষ দেখলাম একটি খবর। ছোট্ট খবর, কিন্তু ঘটনা বড়। সে খবরে দেখা যাচ্ছে, দেশের ৩৬টি বড় কোম্পানির বিরুদ্ধে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে অস্থিরতা সৃষ্টির অভিযোগে মামলা করা হয়েছে। কে করেছে? করেছে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন। কোন কোন পণ্যের মূল্যে অস্থিরতা সৃষ্টির অভিযোগ? চাল, আটা, ময়দা, ডিম, মুরগি ও প্রসাধনসামগ্রী আছে এসবের মধ্যে। যুগান্তরে যেসব নাম দেখলাম, তাতে পিলে চমকে যাওয়ার মতো অবস্থা। কারণ দেশের বড় বড় যত কোম্পানি, গ্রুপ, ব্যবসায়ী আছেন, তাদের প্রায় সবাই রয়েছে এ তালিকায়। কী করে তা সম্ভব? এতগুলো নামকরা কোম্পানির সবাই পণ্যমূল্যে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করেছে। প্রায় অসম্ভব কল্পনা! এত সাহস বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন কোথায় পেল? সাহসের প্রশ্ন পরে।

একটা কাজ হয়েছে, এতে ‘প্রতিযোগিতা কমিশন’ বলে যে একটা প্রতিষ্ঠান আছে, আমরা জানলাম, জনগণ জানল। পরের প্রশ্ন, শেষ পর্যন্ত কী হবে? এতগুলো কোম্পানি? কার্যত তারাই নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। এদের কেউ কেউ আমদানি ব্যবসা করে, উৎপাদন করে, বিপণন করে। কারও কারও রয়েছে ব্যাংক-বিমা ব্যবসা। এতগুলো কোম্পানির বিরুদ্ধে একযোগে অভিযান, অভিযোগ এই প্রথম আমার মনে হয়।

এতে কি হিতে বিপরীত হবে? জানি না কী হবে। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন তাদের অভিযোগ প্রমাণ করতে পারবে তো? মামলা হবে, অভিযোগ সুনির্দিষ্ট করতে হবে, অভিযোগনামা দায়ের করতে হবে। উকিল লাগবে। কোম্পানিগুলোর পক্ষে দাঁড়াবেন ‘দেশবরেণ্য’ অইনজীবীরা; আর কমিশনের পক্ষে দাঁড়াবেন কে? তারা পারবেন তো জাঁদরেলদের সম্মুখ সমরে পরাস্ত করতে? অনেক প্রশ্ন। আবার, তারা সবাই মিলে সরবরাহ ঠিক রাখতে সরকারকে অসহযোগিতা করবে না তো? কিছুই আমরা জানি না। আমরা শুধু জানি-মূল্যস্ফীতি, পণ্যমূল্যে কারসাজি, সরকারি স্তরে মূল্যবৃদ্ধি-এই তিনের সাঁড়াশি আক্রমণে জনগণ পর্যুদস্ত। সবই যুদ্ধের অজুহাতে-রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ।

এ যুদ্ধ কবে শেষ হবে, তা আমরা কেউ জানি না। তাহলে কি ধরে নেওয়া যায়, মূল্যস্ফীতি অব্যাহত থাকবে? জিনিসপত্রের দাম যে স্তরে উঠেছে, তা থেকে আর নামবে না? না নামলেই বিপদ, যদি না মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ে, আয় বৃদ্ধি পায়। কর্মহীনতা, বেকারত্ব, চাকরিচ্যুতি ইত্যাদি যদি ঘটতেই থাকে, তাহলেই বিপদ। বহু মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাবে। মধ্যবিত্ত হবে নিম্নবিত্ত। নিম্নবিত্ত হবে বিত্তহীন। দরিদ্র হবে অতিদরিদ্র। আর মূল্যস্ফীতিতে যারা লাভবান হয়, সেই অতিধনীরা হবে আরও ধনী। তাদের অনেকেই পাচার করবে অর্থ। সিঙ্গাপুর, দুবাই, আমেরিকা, কানাডা, ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়ায় বসতি গাড়বে তারা। দুর্বলরাই থাকবে দেশে!

ড. আর এম দেবনাথ : অর্থনীতি বিশ্লেষক; সাবেক শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন