সাম্প্রদায়িক শক্তির তৎপরতা সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে
jugantor
সাম্প্রদায়িক শক্তির তৎপরতা সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে

  আজিজুল ইসলাম ভূঁইয়া  

০২ অক্টোবর ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

হাজার বছরের সভ্যতার উত্তরাধিকার আমরা। বাঙালি সভ্যতা অসাম্প্রদায়িকতার অহংকার ও গর্ব নিয়ে পৃথিবীর বুকে টিকে আছে। মানুষে মানুষে অকৃত্রিম ভালোবাসা ও বন্ধুত্ব নিয়ে মানবতার জয়গানে মুখর। বিশেষ করে এদেশের মানুষ মরমি কবির ভাষায় ‘শোনরে মানুষ ভাই, সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই’-এ আদর্শে বিশ্বাসী; এই মহান নীতিতে অবিচল। এর একমাত্র ব্যত্যয় ঘটেছিল ১৯৪৭ সালের ভারত বিভাগের প্রাক্কালে, যখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের শেষ ভাইসরয় লর্ড মাউন্ট ব্যাটেন করম চাঁদ গান্ধী ও মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে শিখণ্ডী দাঁড় করিয়ে শুধু ভারতকে দ্বিখণ্ডিত করেননি, মানুষে মানুষে, ধর্মে-গোত্রে হিংসা-হানাহানিতে বিষাক্ত করে তুলেছিলেন ভারতীয় সভ্যতাকে। ১৯৪৬ সালের গ্রেট ক্যালকাটা রায়ট থেকে শুরু করে ১৯৫০ সালের আদমজীর ভয়াবহ হিন্দু-মুসলিম রায়ট ভূলুণ্ঠিত করেছিল আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও জীবনবোধকে।

যা হোক, তথাকথিত ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকে কথায় কথায় সাম্প্রদায়িক সংকট সৃষ্টি করে এদেশে মানবতাকে পুরোপুরি কলুষিত করা হয়েছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যদিও দৃঢ়কণ্ঠে ঘোষণা দিয়েছিলেন, আমি মুসলমান ও আমি বাঙালি, তবুও এদেশ রক্তাক্ত হয়েছে ভাইয়ে ভাইয়ে দাঙ্গায়। বিশেষ করে কয়েকটি স্বার্থবাদী মহল রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করার জন্য এদেশের জনপথকে রক্তে রঞ্জিত করেছে বারবার। কয়েকটি উদাহরণ দিলেই এ সত্য পরিষ্কার হবে। বিশেষ করে জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে আমাদের স্বাধীনতার পরাজিত শত্রু ও সাম্প্রদায়িক শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে, তারা আমাদের শান্তিনীড়ে অশান্তির মর্মভেদী আগুন জ্বালিয়ে দিতে পারে। আর এজন্যই সমাজের সব অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক শক্তি, বিশেষ করে সাংবাদিক, লেখকসহ মিডিয়া কর্মীদের সজাগ ও সচেষ্ট থাকতে হবে, যাতে কেউ সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে তাদের রাজনৈতিক সুবিধা হাসিল করতে না পারে।

আমাদের স্মৃতিতে এখনো জ্বলজ্বল করছে-শুধু স্বদেশেই নয়, বিশ্বজুড়ে তোলপাড় হয়ে যাওয়া ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে সংঘটিত সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে নাসিরনগর উপজেলার বিভিন্ন স্থানে হিন্দু সম্প্রদায়ের মন্দিরে ভাঙচুর ও বসতবাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। পরবর্তীকালে এ ঘটনার জের ধরে আরও চার দফায় আগুন লাগানো হয় বিভিন্ন স্থানে।

‘কমিউনাল রায়ট’ বা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা একটি ভয়াবহ ঘটনা। কোথাও এ বিষবাষ্প স্পর্শ করলে মুহূর্তেই তা চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে। শুরু হয় প্রলয়ংকরী মানবিক বিপর্যয়। বিষয়টি একইসঙ্গে খুবই স্পর্শকাতরও বটে, বিশেষ করে সব ধরনের সংবাদমাধ্যমের জন্য। কারণ কোনো কোনো সময় সাংবাদিকের কলম প্রচণ্ড অগ্নিগর্ভা হয়ে উঠতে পারে। তাদের একটি বাক্যে, একটি শব্দে হয়ে যেতে পারে সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবন লণ্ডভণ্ড। এ কারণে সাংবাদিকদের সব পরিস্থিতিতেই সংযমী ও দায়িত্বশীল হতে হয়। মানুষে মানুষে যাতে ভেদাভেদ সৃষ্টি না হয়, অহেতুক উত্তেজনা সৃষ্টি না হয়, কিংবা মারামারি-হানাহানি সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়ে কলম সৈনিকদের থাকতে হয় সদা সজাগ, অতন্দ্র প্রহরীর মতো।

সাদামাটাভাবে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বলতে বোঝায় দুই বা ততধিক সম্প্রদায় বা গোষ্ঠীর লোকজন প্রবল উত্তেজনাবশত বা প্রতিহিংসাবশত একে অপরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়াকে। তারা হত্যানেশায় লাঠিসোঁটা, দা, কুড়াল, পিস্তল-বন্দুক ইত্যাদি মারণাস্ত্র নিয়ে উন্মাদের মতো শুরু করে সর্বগ্রাসী ও সর্বনাশী মরণ খেলা। অসহায় মানবতা আর্তনাদ করতে থাকে ভূতলে পড়ে, অকালে জীবন হারায় নির্দোষ-নিরপরাধ মানুষ। মুহূর্তের মধ্যে সোনার সংসার ছারখার হয়ে যায়। আগুনে পুড়ে ঘরবাড়ি, দোকানপাট ভস্মীভূত হয় চোখের নিমিষে। বাস্তুভিটার মায়া ছেড়ে মানুষ পাড়ি জমায় নিরুদ্দেশের ঠিকানায়।

নাসিরনগরের মর্মান্তিক ঘটনা সংঘটিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘটনাস্থলে ছুটে যান আমাদের প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার শত শত কর্মী। তারা বিপন্ন মানবতার পাশে গিয়ে দাঁড়ান। এটাই তো মিডিয়া কর্মীদের প্রধান দায়িত্ব, করণীয়। তারা বাস্তব চিত্র গোটা জাতির কাছে তুলে ধরার পাশাপাশি বুদ্ধি-পরামর্শ ও মতামত ব্যক্ত করেন। ঘটনার বিস্তার ও পুনরাবৃত্তি রোধে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। একইসঙ্গে তারা তাদের লেখনী ও চিত্রের মাধ্যমে প্রশাসনকে সহায়তা করেন ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে বিচারে সোপর্দ করার স্বার্থে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগে ও সাংবাদিকতা বিভাগের ছাত্রছাত্রীদের রিপোর্টিং ক্লাসে সাংবাদিকতার কিছু এথিক্স পড়ানো হয়। অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে কঠিনভাবে সতর্ক করা হয় ধর্ম, বিশ্বাস, সামাজিক ব্যবস্থা ইত্যাদি স্পর্শকাতর বিষয়ের রিপোর্ট করার ক্ষেত্রে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, এমন কোনো বাক্য ও শব্দ যেন ব্যবহার করা না হয়, যা সমাজে উত্তেজনা কিংবা জাতিতে জাতিতে বা গোষ্ঠীতে গোষ্ঠীতে কোনো দ্বন্দ্ব ও সংঘাত সৃষ্টি করতে পারে। যেমন ধরা যাক, হিন্দু সম্প্রদায়ের বিজয়া দশমীর বিসর্জন মিছিল কোনো মসজিদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় মুসল্লিদের দ্বারা আক্রান্ত হলো অথবা একটি রামমন্দির বা কালিমন্দিরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় শিয়া মুসলমানদের একটি তাজিয়া মিছিল উগ্র হিন্দুবাদীদের কোপানলে পড়ল। এ ধরনের ঘটনার রিপোর্ট করতে গেলে একটি সমাজসচেতন ও দায়িত্বশীল সাংবাদিক এভাবে রিপোর্ট করেন : নগরীর অমুক রাস্তা দিয়ে বিজয়া দশমীর বিসর্জন মিছিল অতিক্রমের সময় কিছু দুষ্কৃতকারী আক্রমণ করে এবং একই দিনে নগরীর অপর একটি রাস্তা দিয়ে মহররমের তাজিয়া মিছিল অতিক্রমকালে কিছু দুর্বৃত্ত হামলা চালায়। কোনো অবস্থাতেই মুসলিম, হিন্দু, মসজিদ, মন্দির ইত্যাদি শব্দ লেখা যাবে না। বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার দোহাই দিয়ে অনেকে বলতে চাইবেন, যা ঘটেছে তা-ই তো লিখতে হবে। না, এটা সর্বক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য নয়। সাংবাদিকদের দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ বলে একটি বিষয় রয়েছে এবং সব বিষয়ের মধ্যে এ উপলব্ধিটাই মুখ্য। সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়, মানুষে মানুষে বিভেদ-সংঘর্ষ বাধে, এমন লেখা থেকে বিরত থাকতে হবে-এটাই সাংবাদিকতার নীতি অথবা এথিক্স অব জার্নালিজম। এটি মিডিয়া কর্মীদের মনে রাখতে হবে। রিপোর্টিং করার সময় প্রত্যেক সাংবাদিককে দায়িত্বশীল ও সংযত হতে হবে। অনেক প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া নাসিরনগরের ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে এ এথিক্স মানেনি। সংগত কারণেই সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে এ ন্যক্কারজনক ঘটনার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিল হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ।

আজিজুল ইসলাম ভূঁইয়া : সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা

সাম্প্রদায়িক শক্তির তৎপরতা সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে

 আজিজুল ইসলাম ভূঁইয়া 
০২ অক্টোবর ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

হাজার বছরের সভ্যতার উত্তরাধিকার আমরা। বাঙালি সভ্যতা অসাম্প্রদায়িকতার অহংকার ও গর্ব নিয়ে পৃথিবীর বুকে টিকে আছে। মানুষে মানুষে অকৃত্রিম ভালোবাসা ও বন্ধুত্ব নিয়ে মানবতার জয়গানে মুখর। বিশেষ করে এদেশের মানুষ মরমি কবির ভাষায় ‘শোনরে মানুষ ভাই, সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই’-এ আদর্শে বিশ্বাসী; এই মহান নীতিতে অবিচল। এর একমাত্র ব্যত্যয় ঘটেছিল ১৯৪৭ সালের ভারত বিভাগের প্রাক্কালে, যখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের শেষ ভাইসরয় লর্ড মাউন্ট ব্যাটেন করম চাঁদ গান্ধী ও মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে শিখণ্ডী দাঁড় করিয়ে শুধু ভারতকে দ্বিখণ্ডিত করেননি, মানুষে মানুষে, ধর্মে-গোত্রে হিংসা-হানাহানিতে বিষাক্ত করে তুলেছিলেন ভারতীয় সভ্যতাকে। ১৯৪৬ সালের গ্রেট ক্যালকাটা রায়ট থেকে শুরু করে ১৯৫০ সালের আদমজীর ভয়াবহ হিন্দু-মুসলিম রায়ট ভূলুণ্ঠিত করেছিল আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও জীবনবোধকে।

যা হোক, তথাকথিত ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকে কথায় কথায় সাম্প্রদায়িক সংকট সৃষ্টি করে এদেশে মানবতাকে পুরোপুরি কলুষিত করা হয়েছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যদিও দৃঢ়কণ্ঠে ঘোষণা দিয়েছিলেন, আমি মুসলমান ও আমি বাঙালি, তবুও এদেশ রক্তাক্ত হয়েছে ভাইয়ে ভাইয়ে দাঙ্গায়। বিশেষ করে কয়েকটি স্বার্থবাদী মহল রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করার জন্য এদেশের জনপথকে রক্তে রঞ্জিত করেছে বারবার। কয়েকটি উদাহরণ দিলেই এ সত্য পরিষ্কার হবে। বিশেষ করে জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে আমাদের স্বাধীনতার পরাজিত শত্রু ও সাম্প্রদায়িক শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে, তারা আমাদের শান্তিনীড়ে অশান্তির মর্মভেদী আগুন জ্বালিয়ে দিতে পারে। আর এজন্যই সমাজের সব অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক শক্তি, বিশেষ করে সাংবাদিক, লেখকসহ মিডিয়া কর্মীদের সজাগ ও সচেষ্ট থাকতে হবে, যাতে কেউ সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে তাদের রাজনৈতিক সুবিধা হাসিল করতে না পারে।

আমাদের স্মৃতিতে এখনো জ্বলজ্বল করছে-শুধু স্বদেশেই নয়, বিশ্বজুড়ে তোলপাড় হয়ে যাওয়া ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে সংঘটিত সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে নাসিরনগর উপজেলার বিভিন্ন স্থানে হিন্দু সম্প্রদায়ের মন্দিরে ভাঙচুর ও বসতবাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। পরবর্তীকালে এ ঘটনার জের ধরে আরও চার দফায় আগুন লাগানো হয় বিভিন্ন স্থানে।

‘কমিউনাল রায়ট’ বা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা একটি ভয়াবহ ঘটনা। কোথাও এ বিষবাষ্প স্পর্শ করলে মুহূর্তেই তা চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে। শুরু হয় প্রলয়ংকরী মানবিক বিপর্যয়। বিষয়টি একইসঙ্গে খুবই স্পর্শকাতরও বটে, বিশেষ করে সব ধরনের সংবাদমাধ্যমের জন্য। কারণ কোনো কোনো সময় সাংবাদিকের কলম প্রচণ্ড অগ্নিগর্ভা হয়ে উঠতে পারে। তাদের একটি বাক্যে, একটি শব্দে হয়ে যেতে পারে সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবন লণ্ডভণ্ড। এ কারণে সাংবাদিকদের সব পরিস্থিতিতেই সংযমী ও দায়িত্বশীল হতে হয়। মানুষে মানুষে যাতে ভেদাভেদ সৃষ্টি না হয়, অহেতুক উত্তেজনা সৃষ্টি না হয়, কিংবা মারামারি-হানাহানি সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়ে কলম সৈনিকদের থাকতে হয় সদা সজাগ, অতন্দ্র প্রহরীর মতো।

সাদামাটাভাবে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বলতে বোঝায় দুই বা ততধিক সম্প্রদায় বা গোষ্ঠীর লোকজন প্রবল উত্তেজনাবশত বা প্রতিহিংসাবশত একে অপরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়াকে। তারা হত্যানেশায় লাঠিসোঁটা, দা, কুড়াল, পিস্তল-বন্দুক ইত্যাদি মারণাস্ত্র নিয়ে উন্মাদের মতো শুরু করে সর্বগ্রাসী ও সর্বনাশী মরণ খেলা। অসহায় মানবতা আর্তনাদ করতে থাকে ভূতলে পড়ে, অকালে জীবন হারায় নির্দোষ-নিরপরাধ মানুষ। মুহূর্তের মধ্যে সোনার সংসার ছারখার হয়ে যায়। আগুনে পুড়ে ঘরবাড়ি, দোকানপাট ভস্মীভূত হয় চোখের নিমিষে। বাস্তুভিটার মায়া ছেড়ে মানুষ পাড়ি জমায় নিরুদ্দেশের ঠিকানায়।

নাসিরনগরের মর্মান্তিক ঘটনা সংঘটিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘটনাস্থলে ছুটে যান আমাদের প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার শত শত কর্মী। তারা বিপন্ন মানবতার পাশে গিয়ে দাঁড়ান। এটাই তো মিডিয়া কর্মীদের প্রধান দায়িত্ব, করণীয়। তারা বাস্তব চিত্র গোটা জাতির কাছে তুলে ধরার পাশাপাশি বুদ্ধি-পরামর্শ ও মতামত ব্যক্ত করেন। ঘটনার বিস্তার ও পুনরাবৃত্তি রোধে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। একইসঙ্গে তারা তাদের লেখনী ও চিত্রের মাধ্যমে প্রশাসনকে সহায়তা করেন ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে বিচারে সোপর্দ করার স্বার্থে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগে ও সাংবাদিকতা বিভাগের ছাত্রছাত্রীদের রিপোর্টিং ক্লাসে সাংবাদিকতার কিছু এথিক্স পড়ানো হয়। অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে কঠিনভাবে সতর্ক করা হয় ধর্ম, বিশ্বাস, সামাজিক ব্যবস্থা ইত্যাদি স্পর্শকাতর বিষয়ের রিপোর্ট করার ক্ষেত্রে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, এমন কোনো বাক্য ও শব্দ যেন ব্যবহার করা না হয়, যা সমাজে উত্তেজনা কিংবা জাতিতে জাতিতে বা গোষ্ঠীতে গোষ্ঠীতে কোনো দ্বন্দ্ব ও সংঘাত সৃষ্টি করতে পারে। যেমন ধরা যাক, হিন্দু সম্প্রদায়ের বিজয়া দশমীর বিসর্জন মিছিল কোনো মসজিদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় মুসল্লিদের দ্বারা আক্রান্ত হলো অথবা একটি রামমন্দির বা কালিমন্দিরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় শিয়া মুসলমানদের একটি তাজিয়া মিছিল উগ্র হিন্দুবাদীদের কোপানলে পড়ল। এ ধরনের ঘটনার রিপোর্ট করতে গেলে একটি সমাজসচেতন ও দায়িত্বশীল সাংবাদিক এভাবে রিপোর্ট করেন : নগরীর অমুক রাস্তা দিয়ে বিজয়া দশমীর বিসর্জন মিছিল অতিক্রমের সময় কিছু দুষ্কৃতকারী আক্রমণ করে এবং একই দিনে নগরীর অপর একটি রাস্তা দিয়ে মহররমের তাজিয়া মিছিল অতিক্রমকালে কিছু দুর্বৃত্ত হামলা চালায়। কোনো অবস্থাতেই মুসলিম, হিন্দু, মসজিদ, মন্দির ইত্যাদি শব্দ লেখা যাবে না। বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার দোহাই দিয়ে অনেকে বলতে চাইবেন, যা ঘটেছে তা-ই তো লিখতে হবে। না, এটা সর্বক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য নয়। সাংবাদিকদের দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ বলে একটি বিষয় রয়েছে এবং সব বিষয়ের মধ্যে এ উপলব্ধিটাই মুখ্য। সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়, মানুষে মানুষে বিভেদ-সংঘর্ষ বাধে, এমন লেখা থেকে বিরত থাকতে হবে-এটাই সাংবাদিকতার নীতি অথবা এথিক্স অব জার্নালিজম। এটি মিডিয়া কর্মীদের মনে রাখতে হবে। রিপোর্টিং করার সময় প্রত্যেক সাংবাদিককে দায়িত্বশীল ও সংযত হতে হবে। অনেক প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া নাসিরনগরের ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে এ এথিক্স মানেনি। সংগত কারণেই সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে এ ন্যক্কারজনক ঘটনার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিল হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ।

আজিজুল ইসলাম ভূঁইয়া : সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন