বাজেট বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জগুলো

  ড. মো. সেলিম উদ্দিন ১৫ জুন ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাজেট

কোনো ধরনের তাৎপর্যপূর্ণ নতুন করারোপ ছাড়াই নির্বাচনমুখী এই বিশাল ও উচ্চাভিলাষী বাজেটের উন্নয়ন ও অনুন্নয়ন ব্যয়ের কমপক্ষে ৩৫ শতাংশ যদি আগামী ছয় মাসে সঠিক অর্থে ও মানসম্মতভাবে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে সামগ্রিক চাহিদা বৃদ্ধি, অবকাঠামো ঘাটতি হ্রাস এবং দরিদ্রবান্ধব, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা বিধানমূলক ব্যয় ইত্যাদির মাধ্যমে প্রস্তাবিত বাজেট সার্বিক জনকল্যাণে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে শক্তিশালী ভূমিকা রাখবে।

বিগত দুই বছর এবং চলতি বছরে জিডিপি যথাক্রমে ৭.১১, ৭.২৪ ও ৭.৬৫ অর্জন এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার আলোকে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭.৮ শতাংশ।

প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ব্যয় প্রাক্কলন হয়েছে ৪,৬৪,৫৭৩ কোটি টাকা, যা সংশোধিত ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেট থেকে ৯৩,০৭৮ কোটি টাকা বা ২৫ শতাংশ বেশি।

একইভাবে মোট রাজস্ব আয় ধরা হয়েছে ৩,৩৯,২৮০ কোটি টাকা, যা সংশোধিত ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেট থেকে ৭৯,৮২৬ কোটি টাকা বা ৩১ শতাংশ বেশি। বাজেটে প্রস্তাবিত ব্যয়ের প্রবৃদ্ধির চেয়ে রাজস্ব আয়ের প্রবৃদ্ধির শতাংশ অনেক বেশি, যা কাম্য নয়। এ ছাড়া বিগত কয়েক বছরের বাজেট ও প্রকৃত অর্জন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রাক্কলিত রাজস্ব আহরণে এবং প্রস্তাবিত ঘাটতি অর্থায়নে ব্যর্থতার কারণে বাজেট পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। উদাহরণস্বরূপ, বিগত ২০১৫-১৬ অর্থবছরে মোট ব্যয় ৫৬,৬৫৭ কোটি টাকা বা বাজেটের ১৯ শতাংশ বাস্তবায়িত হয়নি। ৩৫,৪৯০ কোটি টাকা বা ১৭ শতাংশ রাজস্ব আহরণে এবং ২১,১৭৭ কোটি টাকা বা ২৪ শতাংশ ঘাটতি অর্থায়ন করতে সমর্থ হয়নি। উল্লেখ্য, ২১,১৭৭ কোটি টাকার ঘাটতি অর্থায়নের মধ্যে ১৫,৩৭৯ কোটি টাকা বা ৫১ শতাংশ বৈদেশিক উৎস থেকে অর্থায়নে ব্যর্থ হয়। এজন্য রাজস্ব আহরণে এবং ঘাটতি অর্থায়নে, বিশেষ করে বৈদেশিক উৎস থেকে অর্থায়নে সাফল্য দেখাতে না পারলে প্রস্তাবিত বাজেট পুরোপুরি বাস্তবায়ন কঠিন হবে। নির্বাচনী বছর হওয়ায় এ সমস্যা আরও ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়নে বিভিন্ন কলাকৌশলসহ প্রশাসনিক ব্যবস্থা অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি নিতে হবে।

প্রস্তাবিত বাজেটে জনকল্যাণমূলক বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তামূলক কর্মসূচি এবং কর সহনীয়করণসহ প্রবৃদ্ধি সঞ্চারি মেগা প্রকল্পগুলো এবং স্থবির বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির নানা কলাকৌশল অগ্রাধিকার পেয়েছে। দেশের অপার উন্নয়ন সম্ভাবনা, জনগণের প্রত্যাশা, ভোগ ও চাহিদার ক্রমোন্নতি, বর্তমান অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও বিভিন্ন অর্থনৈতিক সূচকের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করে বলা যায়, বাজেটের আকার রক্ষণশীল না হওয়াই ভালো। বড় আকারের বাজেটে, অনেকে মনে করেন, অর্থের অপচয় ও অপব্যবহার হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই আমি বলব, অর্থ বরাদ্দে উদারতা থাকা ভালো এবং অনেক সময় সফলতা আসে, তবে অর্থ ব্যবহারে যথেষ্ট সতর্ক থাকা এবং অর্থের অপব্যবহার বা অপচয় রোধকল্পে সচেতনতাসহ কঠোরতা অবলম্বন করলে এ বাজেট বাস্তবায়ন সম্ভব। তবে জুলাই ২০১৮ থেকে এর বাস্তবায়নে সব পক্ষকে আগ্রহ সহকারে অংশগ্রহণ করতে হবে। বাজেটের বিভিন্ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাজেট বক্তৃতায় সুনির্দিষ্ট অনেক প্রস্তাবনা এসেছে। প্রস্তাবনাগুলো সঠিক সময়ে বাস্তবায়িত হলে এ বাজেট বাস্তবায়ন করা সম্ভব। প্রস্তাবনার মধ্যে দক্ষ জনবল সৃষ্টির লক্ষ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের বিশেষ সুবিধা, সঞ্চয়পত্র ব্যবস্থাপনায় বন্ড মার্কেটের উন্নয়ন, নারী উদ্যোক্তা ও নারী উন্নয়নে বরাদ্দ, পল্লী উন্নয়নে বরাদ্দ, সহনীয় বিনিয়োগ উৎসাহসহ ব্যক্তিখাতের বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপের ব্যাপারে চলমান নীতি জোরদারকরণ, প্রকল্প বাস্তবায়নের দুর্বলতা স্বীকার এবং ব্যবস্থা গ্রহণের পদক্ষেপ, কাঠামো রূপান্তরে বৃহৎ প্রকল্প, অবকাঠামো নির্মাণে অনমনীয় ও সোচ্চার ইত্যাদি বিষয় বাজেটের বলিষ্ঠ দিক। উল্লেখ্য, মোট ব্যয় ৪,৬৪,৫৭৩ কোটি টাকার মধ্যে সামাজিক অবকাঠামো খাতে ১,২৭,০১৯ কোটি টাকা (২৭.৩৪ শতাংশ), ভৌত অবকাঠামোতে ১,৪৩,৯৮২ কোটি টাকা (৩১ শতাংশ), সাধারণ সেবা খাতে ১,১৭,৫৪২ (২৫.৩০ শতাংশ) কোটি টাকা এবং সুদ পরিশোধ খাতে ৫১,৩৪০ কোটি টাকা (১১.০৫ শতাংশ) বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বিশ্লেষণে দেখা যায়, শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে, যা মানবসম্পদ উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে। এছাড়া স্বাস্থ্য, কৃষি, স্থানীয় সরকার, বিদ্যুৎ-জ্বালানি, যোগাযোগ ইত্যাদি খাতকে বিগত কয়েক বছরের মতো অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। এছাড়াও স্থানীয় শিল্পের সংরক্ষণ ও রফতানি খাতকে প্রণোদনা দেয়ার চেষ্টা এবং রাজস্ব আদায়ে বিভিন্ন উদ্যোগসহ দেশের সার্বিক অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক দিকগুলোকে বাজেটে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। ব্যক্তি খাত ও সরকারি খাতে অব্যাহত বিনিয়োগ প্রসঙ্গ বাজেটে গুরুত্ব পেয়েছে, যা নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, গ্রামীণ অর্থনৈতিক উন্নয়ন, খাদ্য নিরাপত্তা, পল্লী উন্নয়ন, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং আর্থিক খাতের উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে।

উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য বর্তমান বিনিয়োগ যথেষ্ট নয়। সক্ষমতার অভাবে এডিপি বাস্তবায়ন পুরোপুরি না হওয়ায় সরকারি বিনিয়োগ কাক্সিক্ষত মাত্রায় বাড়ছে না। আবার বছর বছর সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধিই যথেষ্ট নয়, এর গুণগতমান বৃদ্ধি এবং অর্থবছরের শেষ তিন মাসে অত্যধিক ব্যয় প্রবণতার কারণে সরকারি অর্থের অপচয়, কাজে নিুমান ও গুণগতমান হ্রাস, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা ইত্যাদি ক্ষেত্রে অসামঞ্জস্য দেখা দেয়। অন্যদিকে নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে ব্যক্তিখাতের বিনিয়োগ গত কয়েক বছর ধরে ২১ থেকে ২৩ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে। কাক্সিক্ষত প্রবৃদ্ধির জন্য এই হার জিডিপির ২৬-২৭ শতাংশে উন্নীত করা দরকার। সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা, বিশেষ করে ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগ আগামী অর্থবছরে উচ্চ সুদের হার, বিনিময় হার, চলমান তারল্য সংকট, খেলাপি ঋণ সংকট, মুদ্রাস্ফীতির হার, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগকারীর আস্থা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলসহ পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি প্রবণতা ইত্যাদি কারণে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হওয়ার আশঙ্কা রেয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়নে অন্যান্য চ্যালেঞ্জের মধ্যে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আহরণ, অবকাঠামোগত ঘাটতি, সরকারি ব্যয়ের অগ্রাধিকার ঠিক করা, ঘাটতি বাজেটের অর্থায়ন ব্যবস্থাপনা, বিশেষ করে বৈদেশিক উৎস থেকে অর্থ প্রাপ্তির অনিশ্চয়তা, ব্যক্তিখাতে ঋণ প্রবাহের প্রতিবন্ধকতাগুলো, রফতানি বৈচিত্র্যকরণ, রফতানির প্রবৃদ্ধির তুলনায় আমদানি প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিক বৃদ্ধি, কাক্সিক্ষত মাত্রায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সঞ্চয় বিনিয়োগ তারতম্য ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

উপরোক্ত চ্যালেঞ্জগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে উন্নয়ন প্রকল্পগুলো ব্যয়াধিক্য (Cost Overrun) এবং বাস্তবায়ন সময়োত্তর্ণের (Time overrun) সঠিক ঝুঁকি নির্ণয়, মাসিক ও রেজাল্ট ভিত্তিতে প্রকল্প মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকা দরকার। ব্যক্তিখাতের বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে বৈদেশিক সূত্র থেকে ঝামেলামুক্ত ঋণ প্রবাহ নিশ্চিত, সুদের হার, বিনিময় হার, মুদ্রাস্ফীতির হার, আস্থার উন্নতি, বিদ্যুৎ-জ্বালানি, পরিবহন ও যোগাযোগ ইত্যাদি চলমান কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হওয়ার ওপর জোর তদারকি ও স্থিতিশীলতা অন্যতম নিয়ামক হিসেবে কাজ করবে। এছাড়া বাজেট সঠিক বাস্তবায়নে সক্ষমতা, বাজেট বাস্তবায়নের স্বচ্ছ রোডম্যাপ, রাজস্ব আদায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা, প্রকল্প বাস্তবায়নে গুণগত পরিবর্তন ইত্যাদি বিষয় বিবেচনায় নিলে বাজেট বাস্তবায়নের অনেক চ্যালেঞ্জ বা প্রতিবন্ধকতা দূর হবে।

দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, ব্যবসার ব্যয় হ্রাস, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান, অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি এবং দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে বাজেটে সামাজিক ও ভৌত অবকাঠামো খাতে উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। তবে ব্যয়ের গুণগতমান, বাস্তবায়ন সময়, মোট প্রকল্প ব্যয় ইত্যাদির ওপর অধিক গুরুত্বারোপ করে সঠিক ব্যয়ে, সঠিক সময়ে এবং সঠিক গুণে ও মানে প্রকল্প কার্য সম্পন্ন হওয়ার জন্য সঠিক মানদণ্ড নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান এক দেশ বা অঞ্চলে কেন্দ্রিভূত না করে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমসুযোগ প্রদান করে প্রকল্প বাস্তবায়নে কিছু ঝুঁকি হ্রাস করা যায়। চলমান বৃহৎ প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়নের হার সময় সময় প্রেস ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে জনসমক্ষে প্রচারের ব্যবস্থা থাকা উচিত। যেমন- বাংলাদেশে দৈনিক কতটুকু বা কত কিলোমিটার রাস্তা সম এককে (equivalent unit) তৈরি হচ্ছে, দৈনিক কত কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে ইত্যাদি প্রকাশ করার জন্য সুপারিশ করছি। সামাজিক ও ভৌত অবকাঠামোর কারণে সুফলগুলো সুস্পষ্ট করা উচিত বলে মনে করি।

ড. মো. সেলিম উদ্দিন : অধ্যাপক, হিসাব বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ হাউস বিল্ডিং ফিন্যান্স কর্পোরেশন

ঘটনাপ্রবাহ : বাজেট ২০১৮

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×