রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের তীব্রতা কি আরও বাড়বে?
jugantor
বাইফোকাল লেন্স
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের তীব্রতা কি আরও বাড়বে?

  একেএম শামসুদ্দিন  

০৩ অক্টোবর ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

অবশেষে ইউক্রেনের দোনেস্ক, লুহানস্ক, জাপোরিঝঝিয়া ও খেরসন আনুষ্ঠানিকভাবে রাশিয়ার অন্তর্ভুক্ত হলো। ৩০ সেপ্টেম্বর মস্কোর ক্রেমলিন প্যালেসের সেন্ট জর্জেস হলে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন এক চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে ইউক্রেনের এ চারটি অঞ্চল রুশ ফেডারেশনে অন্তর্ভুক্তের ঘোষণা দিলেন। পুতিন বলেন, তিনি চান ইউক্রেন ও পশ্চিমা বিশ্ব জানুক, দনবাস অঞ্চলের মানুষ চিরতরে রাশিয়ার নাগরিক হয়ে যাবে। কিয়েভ সরকারের উচিত জনগণের এ ইচ্ছার অভিব্যক্তিটিকে ‘সম্মান দেখানো।’ অনুষ্ঠানে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছাড়াও ওই চার অঞ্চলের রুশ মনোনীত নেতারা উপস্থিত ছিলেন। পশ্চিমা বিশ্ব রাশিয়ার এ পদক্ষেপের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে এবং একইসঙ্গে রাশিয়ার ওপর আরও নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা দিয়েছে। অপরদিকে ইউক্রেন উল্লেখিত এলাকা উদ্ধারের লড়াই চালিয়ে যাওয়ার কথা বলেছে।

রাশিয়া বলেছে, গণভোটের ফলাফল ঘোষণার পর এ চার অঞ্চলের শাসকদের অনুরোধে সাড়া দিয়ে তাদের রুশ ফেডারেশনের সঙ্গে যুক্ত করতে প্রেসিডেন্ট পুতিন এ সংক্রান্ত দলিলে স্বাক্ষর করেছেন। রাশিয়ার এমন পদক্ষেপের পর ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি বলেছেন, রাশিয়ার সামরিক বাহিনীর বন্দুকের নলের মুখে দাঁড় করিয়ে ভোটারদের ভোট দিতে বাধ্য করা হয়েছে। কাজেই রাশিয়ার এ গণভোটের কোনো মূল্য নেই। তাতে বাস্তবতার কোনো পরিবর্তন ঘটবে না। ইউক্রেন গণভোটের এ ফলাফলকে নাকচ করে দিয়েছে। তারা বলেছে, ভোট এবং ভোটের ফলাফলকে তারা কোনোমতেই গ্রহণ করবে না। পশ্চিমা দেশগুলোও এ গণভোটকে জালিয়াতির ভোট বলে বর্ণনা করেছে। অপরদিকে এ গণভোটকে সমর্থন জানিয়ে প্রেসিডেন্ট পুতিন বলেছেন, এসব অঞ্চলে বসবাসরত নাগরিক ‘জাতিগত রাশিয়ান’। রাশিয়ান ভাষাভাষী জনগণের ওপর দমন-পীড়ন বন্ধ করার জন্য ভোটের আয়োজন করা হয়েছে। রাশিয়ার দখলকৃত যুদ্ধবিধ্বস্ত এ চারটি অঞ্চলের প্রায় ৪০ লাখ মানুষকে ভোট দেওয়ার জন্য আহ্বান জানানো হয়েছিল। গণভোট দিয়ে ইউক্রেনের অঞ্চল রুশ ফেডারেশনের সঙ্গে যুক্ত করার ঘটনা এবারই প্রথম নয়। ২০১৪ সালে গোটা ক্রিমিয়া নিজেদের দখলে এনে গণভোট দিয়ে রুশ ফেডারেশনের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল। এবার যে চারটি অঞ্চল রাশিয়ার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, তাতে ইউক্রেন, ৯০ হাজার বর্গকিলোমিটার অর্থাৎ তাদের মোট ভূখণ্ডের ১৫ শতাংশ হারাবে। এ পরিমাণ এলাকা, ইউরোপের হাঙ্গেরি অথবা পর্তুগালের মতো দেশের সমান। এসব অঞ্চল হাতছাড়া হয়ে যাওয়ায় ইউক্রেনের কৃষি উৎপাদন কমে যাবে ১৩ থেকে ১৬ শতাংশ। তবে রাশিয়া দোনেৎস্কের সম্পূর্ণ ভূখণ্ড দখল করতে পারেনি। ৪০ শতাংশ ভূখণ্ড এখনো ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণে আছে। এ কারণে দোনেৎস্কে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাশিয়া।

রাশিয়া এ চারটি অঞ্চল নিজেদের অংশ করে নেওয়ায় আশঙ্কা করা হচ্ছে, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ আরও ভিন্ন ও বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছানোর সম্ভাবনা আছে। কারণ এসব অঞ্চল পুনরুদ্ধারের জন্য ইউক্রেন যখন আক্রমণ করবে, তখন রাশিয়া, তাদের সার্বভৌম ভূমিতে আঘাত হিসাবে গণ্য করবে। পুতিন বলেছেন, রাশিয়ায় যুক্ত হওয়া চারটি অঞ্চল যে কোনো মূল্যে রক্ষা করবেন। পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারেরও প্রচ্ছন্ন হুমকি তিনি দিয়েছেন। পুতিনের এ হুমকি যতটা না ইউক্রেনের দিকে, তারচেয়ে পশ্চিমাদের উদ্দেশেই হুঁশিয়ারি উচ্চারণ বলে সামরিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। অপরদিকে জেলেনস্কি আগেই ঘোষণা দিয়েছেন, এ চারটি অঞ্চল উদ্ধারে লড়াই তারা চালিয়ে যাবেন। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোও চাচ্ছে ইউক্রেনের মাটি থেকে একজন রুশ দখলদার সৈন্য থাকতে ইউক্রেন যুদ্ধ চালিয়ে যাক। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এযাবৎ রাশিয়ার সামরিক বাহিনী ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে নিয়েছে। তবে সম্প্রতি ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, সেপ্টেম্বরের শুরুতে পালটা আক্রমণ শুরু করার পর রাশিয়ার কাছ থেকে আনুমানিক ৩ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা মুক্ত করেছে। সামরিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউক্রেন পালটা আক্রমণ করে যেভাবে ভূমি পুনরুদ্ধার করতে শুরু করেছে, তাতে তাদের অগ্রাভিযানে গতি সঞ্চার হয়েছে। আর এসব কিছুই সম্ভব হয়েছে পশ্চিমা দেশগুলোর পক্ষ থেকে ইউক্রেনকে অত্যাধুনিক অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামাদি দেওয়ার জন্য। পশ্চিমা দেশগুলোর এ সামরিক সহায়তা এখনো অব্যাহত আছে। বিশ্বের ৩০টিরও বেশি দেশ এ যুদ্ধে অস্ত্র ও সরঞ্জাম দিয়ে সাহায্য করছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর গত আগস্ট পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছে। তার পরেই আছে পোল্যান্ড। ব্রিটেনের অবস্থান তৃতীয়। ডলারের অঙ্ক হিসাবে যুক্তরাষ্ট্র দিয়েছে ৮৭৯ কোটি ডলার। তবে তারা গত ২৪ আগস্ট আরও ৩০০ কোটি ডলার এবং ৯ সেপ্টেম্বর ৬৭.৫ কোটি ডলারের অস্ত্র দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ফলে সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সাহায্যের পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১২৫০ কোটি ডলার। পোল্যান্ড দিয়েছে ১৮৩ কোটি ডলার এবং ব্রিটেন ১৩৬ কোটি ডলার। তাছাড়া অন্যান্য পশ্চিমা দেশ দিয়েছে ২৯৮ কোটি ডলার।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি আরও সাহায্য পাঠাতে মিত্র দেশগুলোর কাছে অনুরোধ করেছেন। এক পরিসংখানে দেখা গেছে, যুদ্ধ করতে গিয়ে প্রতিরক্ষা খাতে ইউক্রেনের মাসে প্রায় ৫৯৯ কোটি ডলার খরচ হচ্ছে। এ খরচ ইউক্রেনের পক্ষে এককভাবে বহন করা সম্ভব নয়। সুতরাং সহজেই বোঝা যাচ্ছে, রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে ইউক্রেনকে মিত্র দেশগুলোর ওপরই নির্ভর করতে হবে। জানা গেছে, এ পর্যন্ত আনুমানিক ৬০ হাজারেরও বেশি বিদেশি নাগরিক ইউক্রেনের পক্ষে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করছে। সামরিক বিশেষজ্ঞদের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্রের দুর্র্ধর্ষ কমান্ডো বাহিনী ‘রেন্জার্স’ ও ‘গ্রীন’ ব্যারেটের অনেক সদস্যই ইউক্রেন সেনাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া ছাড়াও সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করছে। কাজেই একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধ না করলেও ইউক্রেনের মাধ্যমে প্রক্সি যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। ইউক্রেনের দোনেৎস্ক, লুহানস্ক, জাপোরিঝঝিয়া ও খেরসন রুশ ফেডারেশনে যুক্ত হওয়ায় ইউক্রেন ও তার মিত্ররা স্বীকার করুক বা না করুক এ অঞ্চলগুলো এখন থেকে রাশিয়ার অংশ হিসাবে বিবেচিত হবে। এসব অঞ্চল পুনরুদ্ধারের জন্য ইউক্রেন যদি গোলাবর্ষণ করে, তাহলে রাশিয়া তাদের ভূখণ্ডের ওপর সরাসরি আক্রমণ বলে বিবেচনা করবে?

অপরদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাইডেন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বলেছেন, ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন জাতিসংঘ সনদের মূল নীতির নির্লজ্জ লঙ্ঘন। তিনি আরও বলেছেন, একমাত্র মস্কোর সরকার ছাড়া কেউই সংঘাত চায় না। যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রেসিডেন্ট যখন জাতিসংঘ সনদের মূলনীতির লঙ্ঘনের কথা বলেন, তখন প্রশ্ন জাগে, যুক্তরাষ্ট্র এযাবৎ কতবার জাতিসংঘকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে জাতিসংঘ সনদের মূল নীতি লঙ্ঘন করে একতরফা যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান ও ইরাকে অন্যায় যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়ে লাখ লাখ মানবসন্তান হত্যা করে দেশ দুটোকে একেবারে পঙ্গু করে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো জোটের সেই আগ্রাসনের জেরে, সে দেশের জনগণ নিজেদের পায়ের ওপর শক্ত করে দাঁড়াতে, আরও কত বছর যে ভুগবে তা ভবিষ্যৎই বলতে পারবে। ইউক্রেন যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি কোনো দেশ যদি লাভবান হয়ে থাকে, তা হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এ যুদ্ধে জানমাল সবদিক দিয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ইউক্রেন। তারপর রাশিয়া। যুদ্ধ করে মানুষ মরছে রাশিয়া ও ইউক্রেনের; ওদিকে জমিয়ে অস্ত্র বিক্রি করছে যুক্তরাষ্ট্র।

ইউক্রেনের চারটি অঞ্চল রাশিয়ার অন্তর্ভুক্তির ঘোষণার পরপরই যুক্তরাষ্ট্র ও আলবেনিয়া যৌথভাবে একটি খসড়া নিন্দা প্রস্তাব জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে তুলেছিল। প্রস্তাবে রুশ দখলকৃত অংশে অনুষ্ঠিত গণভোটকে অবৈধ ঘোষণা করে নিন্দা ও ইউক্রেনের সীমানায় কোনো পরিবর্তনের স্বীকৃতি না দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। নিরাপত্তা পরিষদের ১০টি দেশ এ প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয়। তবে রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ চীন, ভারতসহ ব্রাজিল ও গ্যাবন ভোটদানে বিরত থাকে। একমাত্র রাশিয়া প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দেয়। তবে রাশিয়া এ প্রস্তাবে ভেটো দেওয়ায় তা বাতিল হয়ে যায়। জাতিসংঘে ইউক্রেনের রাষ্ট্রদূত সার্গেই কিসলিতস বলেছেন, প্রস্তাবের বিপক্ষে রাশিয়া নিজেদের ভোট ছাড়া আর কোনো ভোট পড়েনি, তাতে প্রমাণিত হয় রাশিয়া বিচ্ছিন্ন, একঘরে হয়ে পড়েছে। অপরদিকে রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ চীন ও ভারত ভোটদানে বিরত থাকায় জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত বলেছেন, ভোট না দেওয়া মানে রাশিয়ার পক্ষ নেওয়া নয়। রাশিয়া ছাড়া রাশিয়ার পক্ষে একটি দেশও ভোট দেয়নি। ভোটদানে বিরত মানে রাশিয়ার পক্ষ নেওয়া পরিষ্কার করে না।

ইউক্রেনের চার অঞ্চল অন্তর্ভুক্ত করার পর যুক্তরাষ্ট্র আবারও রাশিয়ার সামরিক খাতসহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর কড়া নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। এমনকি রাশিয়ার সহায়তাকারী দেশের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেবে বলে যুক্তরাষ্ট্র হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে। এ চারটি অঞ্চল রাশিয়ার অংশ করার বিষয়ে যেসব দেশ, বিদেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান মস্কোকে সমর্থন দেবে, তাদের ওপরও নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার হুমকি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ইউক্রেন যুদ্ধে জড়িত রাশিয়ার সমরাস্ত্র নির্মাণশিল্প, মিলিটারি ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স ছাড়াও দেশটির বড় দুটি আন্তর্জাতিক অস্ত্র সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান, রাশিয়ার কিছু জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার পরিবার ও রাশিয়ার আইনসভার ২৭৮ জন সদস্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।

নতুন যুক্ত অঞ্চলগুলো রক্ষায় পশ্চিমা দেশগুলোকে ইঙ্গিত করে পুতিনের পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বাইডেন হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, তার দেশ পুতিনের বেপরোয়া হুমকির পরোয়া করে না। তিনি আরও বলেছেন, ন্যাটোর অন্তর্ভুক্ত প্রতি ইঞ্চি অঞ্চল রক্ষায় মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরি প্রস্তুত। ইউক্রেনের চারটি অঞ্চল রাশিয়ার অন্তর্ভুক্তির পর জেলেনস্কি চাইছেন যত দ্রুত সম্ভব ন্যাটো জোটে যোগ দিতে এবং সে মোতাবেক খুব শিগ্গির আবেদন করবেন বলে জানিয়েছেন। জেলেনস্কি দ্রুত ন্যাটোর সদস্য হওয়ার চেষ্টা করলেও তা সম্ভব কিনা দেখার বিষয়। কারণ, ন্যাটোতে যোগ দিতে গেলে জোটভুক্ত সব সদস্য দেশের অকুণ্ঠ সমর্থন লাগবে ইউক্রেনের। তবে সময় যতই লাগুক, ইউক্রেন ন্যাটো জোটভুক্ত হলে যুদ্ধের পুরো দৃশ্যপটই হয়তো পালটে যাবে। তখন শুধু রাশিয়া-ইউক্রেন নয়; ন্যাটোভুক্ত জোটের সঙ্গে হয়তো রাশিয়ার যুদ্ধ বেধে যেতে পারে। তবে আপাতত সে সম্ভাবনা খুব কম।

ইউক্রেন পশ্চিমা দেশগুলোর সাহায্য নিয়ে যেভাবে রাশিয়ার দখলকৃত এলাকা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করে যাচ্ছে, তাতে পরিস্থিতি দ্রুতই পালটে যাবে বলে মনে হচ্ছে। এ লেখা যখন লিখছি, তখন ইউক্রেনের সর্বশেষ পরিস্থিতি হলো, রাশিয়ার দখলে থাকা লিমান শহরে রুশ সেনাদের একটি বড় অংশ ঘিরে ফেলেছে ইউক্রেন বাহিনী। সেই সঙ্গে শহরটির চারপাশের বসতবাড়িগুলো পুনরুদ্ধার করেছে তারা। এরূপ পরিস্থিতি যদি চলতে থাকে, তাহলে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের তীব্রতা বেড়ে যেতে পারে। কাজেই অদূর ভবিষ্যতে ইউক্রেন পরিস্থিতি যেদিকেই মোড় নিক না কেন, তা দেখার জন্য আমাদের হয়তো আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।

একেএম শামসুদ্দিন: অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা

বাইফোকাল লেন্স

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের তীব্রতা কি আরও বাড়বে?

 একেএম শামসুদ্দিন 
০৩ অক্টোবর ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

অবশেষে ইউক্রেনের দোনেস্ক, লুহানস্ক, জাপোরিঝঝিয়া ও খেরসন আনুষ্ঠানিকভাবে রাশিয়ার অন্তর্ভুক্ত হলো। ৩০ সেপ্টেম্বর মস্কোর ক্রেমলিন প্যালেসের সেন্ট জর্জেস হলে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন এক চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে ইউক্রেনের এ চারটি অঞ্চল রুশ ফেডারেশনে অন্তর্ভুক্তের ঘোষণা দিলেন। পুতিন বলেন, তিনি চান ইউক্রেন ও পশ্চিমা বিশ্ব জানুক, দনবাস অঞ্চলের মানুষ চিরতরে রাশিয়ার নাগরিক হয়ে যাবে। কিয়েভ সরকারের উচিত জনগণের এ ইচ্ছার অভিব্যক্তিটিকে ‘সম্মান দেখানো।’ অনুষ্ঠানে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছাড়াও ওই চার অঞ্চলের রুশ মনোনীত নেতারা উপস্থিত ছিলেন। পশ্চিমা বিশ্ব রাশিয়ার এ পদক্ষেপের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে এবং একইসঙ্গে রাশিয়ার ওপর আরও নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা দিয়েছে। অপরদিকে ইউক্রেন উল্লেখিত এলাকা উদ্ধারের লড়াই চালিয়ে যাওয়ার কথা বলেছে।

রাশিয়া বলেছে, গণভোটের ফলাফল ঘোষণার পর এ চার অঞ্চলের শাসকদের অনুরোধে সাড়া দিয়ে তাদের রুশ ফেডারেশনের সঙ্গে যুক্ত করতে প্রেসিডেন্ট পুতিন এ সংক্রান্ত দলিলে স্বাক্ষর করেছেন। রাশিয়ার এমন পদক্ষেপের পর ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি বলেছেন, রাশিয়ার সামরিক বাহিনীর বন্দুকের নলের মুখে দাঁড় করিয়ে ভোটারদের ভোট দিতে বাধ্য করা হয়েছে। কাজেই রাশিয়ার এ গণভোটের কোনো মূল্য নেই। তাতে বাস্তবতার কোনো পরিবর্তন ঘটবে না। ইউক্রেন গণভোটের এ ফলাফলকে নাকচ করে দিয়েছে। তারা বলেছে, ভোট এবং ভোটের ফলাফলকে তারা কোনোমতেই গ্রহণ করবে না। পশ্চিমা দেশগুলোও এ গণভোটকে জালিয়াতির ভোট বলে বর্ণনা করেছে। অপরদিকে এ গণভোটকে সমর্থন জানিয়ে প্রেসিডেন্ট পুতিন বলেছেন, এসব অঞ্চলে বসবাসরত নাগরিক ‘জাতিগত রাশিয়ান’। রাশিয়ান ভাষাভাষী জনগণের ওপর দমন-পীড়ন বন্ধ করার জন্য ভোটের আয়োজন করা হয়েছে। রাশিয়ার দখলকৃত যুদ্ধবিধ্বস্ত এ চারটি অঞ্চলের প্রায় ৪০ লাখ মানুষকে ভোট দেওয়ার জন্য আহ্বান জানানো হয়েছিল। গণভোট দিয়ে ইউক্রেনের অঞ্চল রুশ ফেডারেশনের সঙ্গে যুক্ত করার ঘটনা এবারই প্রথম নয়। ২০১৪ সালে গোটা ক্রিমিয়া নিজেদের দখলে এনে গণভোট দিয়ে রুশ ফেডারেশনের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল। এবার যে চারটি অঞ্চল রাশিয়ার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, তাতে ইউক্রেন, ৯০ হাজার বর্গকিলোমিটার অর্থাৎ তাদের মোট ভূখণ্ডের ১৫ শতাংশ হারাবে। এ পরিমাণ এলাকা, ইউরোপের হাঙ্গেরি অথবা পর্তুগালের মতো দেশের সমান। এসব অঞ্চল হাতছাড়া হয়ে যাওয়ায় ইউক্রেনের কৃষি উৎপাদন কমে যাবে ১৩ থেকে ১৬ শতাংশ। তবে রাশিয়া দোনেৎস্কের সম্পূর্ণ ভূখণ্ড দখল করতে পারেনি। ৪০ শতাংশ ভূখণ্ড এখনো ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণে আছে। এ কারণে দোনেৎস্কে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাশিয়া।

রাশিয়া এ চারটি অঞ্চল নিজেদের অংশ করে নেওয়ায় আশঙ্কা করা হচ্ছে, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ আরও ভিন্ন ও বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছানোর সম্ভাবনা আছে। কারণ এসব অঞ্চল পুনরুদ্ধারের জন্য ইউক্রেন যখন আক্রমণ করবে, তখন রাশিয়া, তাদের সার্বভৌম ভূমিতে আঘাত হিসাবে গণ্য করবে। পুতিন বলেছেন, রাশিয়ায় যুক্ত হওয়া চারটি অঞ্চল যে কোনো মূল্যে রক্ষা করবেন। পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারেরও প্রচ্ছন্ন হুমকি তিনি দিয়েছেন। পুতিনের এ হুমকি যতটা না ইউক্রেনের দিকে, তারচেয়ে পশ্চিমাদের উদ্দেশেই হুঁশিয়ারি উচ্চারণ বলে সামরিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। অপরদিকে জেলেনস্কি আগেই ঘোষণা দিয়েছেন, এ চারটি অঞ্চল উদ্ধারে লড়াই তারা চালিয়ে যাবেন। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোও চাচ্ছে ইউক্রেনের মাটি থেকে একজন রুশ দখলদার সৈন্য থাকতে ইউক্রেন যুদ্ধ চালিয়ে যাক। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এযাবৎ রাশিয়ার সামরিক বাহিনী ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে নিয়েছে। তবে সম্প্রতি ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, সেপ্টেম্বরের শুরুতে পালটা আক্রমণ শুরু করার পর রাশিয়ার কাছ থেকে আনুমানিক ৩ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা মুক্ত করেছে। সামরিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউক্রেন পালটা আক্রমণ করে যেভাবে ভূমি পুনরুদ্ধার করতে শুরু করেছে, তাতে তাদের অগ্রাভিযানে গতি সঞ্চার হয়েছে। আর এসব কিছুই সম্ভব হয়েছে পশ্চিমা দেশগুলোর পক্ষ থেকে ইউক্রেনকে অত্যাধুনিক অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামাদি দেওয়ার জন্য। পশ্চিমা দেশগুলোর এ সামরিক সহায়তা এখনো অব্যাহত আছে। বিশ্বের ৩০টিরও বেশি দেশ এ যুদ্ধে অস্ত্র ও সরঞ্জাম দিয়ে সাহায্য করছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর গত আগস্ট পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছে। তার পরেই আছে পোল্যান্ড। ব্রিটেনের অবস্থান তৃতীয়। ডলারের অঙ্ক হিসাবে যুক্তরাষ্ট্র দিয়েছে ৮৭৯ কোটি ডলার। তবে তারা গত ২৪ আগস্ট আরও ৩০০ কোটি ডলার এবং ৯ সেপ্টেম্বর ৬৭.৫ কোটি ডলারের অস্ত্র দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ফলে সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সাহায্যের পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১২৫০ কোটি ডলার। পোল্যান্ড দিয়েছে ১৮৩ কোটি ডলার এবং ব্রিটেন ১৩৬ কোটি ডলার। তাছাড়া অন্যান্য পশ্চিমা দেশ দিয়েছে ২৯৮ কোটি ডলার।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি আরও সাহায্য পাঠাতে মিত্র দেশগুলোর কাছে অনুরোধ করেছেন। এক পরিসংখানে দেখা গেছে, যুদ্ধ করতে গিয়ে প্রতিরক্ষা খাতে ইউক্রেনের মাসে প্রায় ৫৯৯ কোটি ডলার খরচ হচ্ছে। এ খরচ ইউক্রেনের পক্ষে এককভাবে বহন করা সম্ভব নয়। সুতরাং সহজেই বোঝা যাচ্ছে, রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে ইউক্রেনকে মিত্র দেশগুলোর ওপরই নির্ভর করতে হবে। জানা গেছে, এ পর্যন্ত আনুমানিক ৬০ হাজারেরও বেশি বিদেশি নাগরিক ইউক্রেনের পক্ষে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করছে। সামরিক বিশেষজ্ঞদের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্রের দুর্র্ধর্ষ কমান্ডো বাহিনী ‘রেন্জার্স’ ও ‘গ্রীন’ ব্যারেটের অনেক সদস্যই ইউক্রেন সেনাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া ছাড়াও সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করছে। কাজেই একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধ না করলেও ইউক্রেনের মাধ্যমে প্রক্সি যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। ইউক্রেনের দোনেৎস্ক, লুহানস্ক, জাপোরিঝঝিয়া ও খেরসন রুশ ফেডারেশনে যুক্ত হওয়ায় ইউক্রেন ও তার মিত্ররা স্বীকার করুক বা না করুক এ অঞ্চলগুলো এখন থেকে রাশিয়ার অংশ হিসাবে বিবেচিত হবে। এসব অঞ্চল পুনরুদ্ধারের জন্য ইউক্রেন যদি গোলাবর্ষণ করে, তাহলে রাশিয়া তাদের ভূখণ্ডের ওপর সরাসরি আক্রমণ বলে বিবেচনা করবে?

অপরদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাইডেন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বলেছেন, ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন জাতিসংঘ সনদের মূল নীতির নির্লজ্জ লঙ্ঘন। তিনি আরও বলেছেন, একমাত্র মস্কোর সরকার ছাড়া কেউই সংঘাত চায় না। যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রেসিডেন্ট যখন জাতিসংঘ সনদের মূলনীতির লঙ্ঘনের কথা বলেন, তখন প্রশ্ন জাগে, যুক্তরাষ্ট্র এযাবৎ কতবার জাতিসংঘকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে জাতিসংঘ সনদের মূল নীতি লঙ্ঘন করে একতরফা যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান ও ইরাকে অন্যায় যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়ে লাখ লাখ মানবসন্তান হত্যা করে দেশ দুটোকে একেবারে পঙ্গু করে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো জোটের সেই আগ্রাসনের জেরে, সে দেশের জনগণ নিজেদের পায়ের ওপর শক্ত করে দাঁড়াতে, আরও কত বছর যে ভুগবে তা ভবিষ্যৎই বলতে পারবে। ইউক্রেন যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি কোনো দেশ যদি লাভবান হয়ে থাকে, তা হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এ যুদ্ধে জানমাল সবদিক দিয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ইউক্রেন। তারপর রাশিয়া। যুদ্ধ করে মানুষ মরছে রাশিয়া ও ইউক্রেনের; ওদিকে জমিয়ে অস্ত্র বিক্রি করছে যুক্তরাষ্ট্র।

ইউক্রেনের চারটি অঞ্চল রাশিয়ার অন্তর্ভুক্তির ঘোষণার পরপরই যুক্তরাষ্ট্র ও আলবেনিয়া যৌথভাবে একটি খসড়া নিন্দা প্রস্তাব জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে তুলেছিল। প্রস্তাবে রুশ দখলকৃত অংশে অনুষ্ঠিত গণভোটকে অবৈধ ঘোষণা করে নিন্দা ও ইউক্রেনের সীমানায় কোনো পরিবর্তনের স্বীকৃতি না দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। নিরাপত্তা পরিষদের ১০টি দেশ এ প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয়। তবে রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ চীন, ভারতসহ ব্রাজিল ও গ্যাবন ভোটদানে বিরত থাকে। একমাত্র রাশিয়া প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দেয়। তবে রাশিয়া এ প্রস্তাবে ভেটো দেওয়ায় তা বাতিল হয়ে যায়। জাতিসংঘে ইউক্রেনের রাষ্ট্রদূত সার্গেই কিসলিতস বলেছেন, প্রস্তাবের বিপক্ষে রাশিয়া নিজেদের ভোট ছাড়া আর কোনো ভোট পড়েনি, তাতে প্রমাণিত হয় রাশিয়া বিচ্ছিন্ন, একঘরে হয়ে পড়েছে। অপরদিকে রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ চীন ও ভারত ভোটদানে বিরত থাকায় জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত বলেছেন, ভোট না দেওয়া মানে রাশিয়ার পক্ষ নেওয়া নয়। রাশিয়া ছাড়া রাশিয়ার পক্ষে একটি দেশও ভোট দেয়নি। ভোটদানে বিরত মানে রাশিয়ার পক্ষ নেওয়া পরিষ্কার করে না।

ইউক্রেনের চার অঞ্চল অন্তর্ভুক্ত করার পর যুক্তরাষ্ট্র আবারও রাশিয়ার সামরিক খাতসহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর কড়া নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। এমনকি রাশিয়ার সহায়তাকারী দেশের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেবে বলে যুক্তরাষ্ট্র হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে। এ চারটি অঞ্চল রাশিয়ার অংশ করার বিষয়ে যেসব দেশ, বিদেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান মস্কোকে সমর্থন দেবে, তাদের ওপরও নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার হুমকি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ইউক্রেন যুদ্ধে জড়িত রাশিয়ার সমরাস্ত্র নির্মাণশিল্প, মিলিটারি ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স ছাড়াও দেশটির বড় দুটি আন্তর্জাতিক অস্ত্র সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান, রাশিয়ার কিছু জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার পরিবার ও রাশিয়ার আইনসভার ২৭৮ জন সদস্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।

নতুন যুক্ত অঞ্চলগুলো রক্ষায় পশ্চিমা দেশগুলোকে ইঙ্গিত করে পুতিনের পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বাইডেন হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, তার দেশ পুতিনের বেপরোয়া হুমকির পরোয়া করে না। তিনি আরও বলেছেন, ন্যাটোর অন্তর্ভুক্ত প্রতি ইঞ্চি অঞ্চল রক্ষায় মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরি প্রস্তুত। ইউক্রেনের চারটি অঞ্চল রাশিয়ার অন্তর্ভুক্তির পর জেলেনস্কি চাইছেন যত দ্রুত সম্ভব ন্যাটো জোটে যোগ দিতে এবং সে মোতাবেক খুব শিগ্গির আবেদন করবেন বলে জানিয়েছেন। জেলেনস্কি দ্রুত ন্যাটোর সদস্য হওয়ার চেষ্টা করলেও তা সম্ভব কিনা দেখার বিষয়। কারণ, ন্যাটোতে যোগ দিতে গেলে জোটভুক্ত সব সদস্য দেশের অকুণ্ঠ সমর্থন লাগবে ইউক্রেনের। তবে সময় যতই লাগুক, ইউক্রেন ন্যাটো জোটভুক্ত হলে যুদ্ধের পুরো দৃশ্যপটই হয়তো পালটে যাবে। তখন শুধু রাশিয়া-ইউক্রেন নয়; ন্যাটোভুক্ত জোটের সঙ্গে হয়তো রাশিয়ার যুদ্ধ বেধে যেতে পারে। তবে আপাতত সে সম্ভাবনা খুব কম।

ইউক্রেন পশ্চিমা দেশগুলোর সাহায্য নিয়ে যেভাবে রাশিয়ার দখলকৃত এলাকা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করে যাচ্ছে, তাতে পরিস্থিতি দ্রুতই পালটে যাবে বলে মনে হচ্ছে। এ লেখা যখন লিখছি, তখন ইউক্রেনের সর্বশেষ পরিস্থিতি হলো, রাশিয়ার দখলে থাকা লিমান শহরে রুশ সেনাদের একটি বড় অংশ ঘিরে ফেলেছে ইউক্রেন বাহিনী। সেই সঙ্গে শহরটির চারপাশের বসতবাড়িগুলো পুনরুদ্ধার করেছে তারা। এরূপ পরিস্থিতি যদি চলতে থাকে, তাহলে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের তীব্রতা বেড়ে যেতে পারে। কাজেই অদূর ভবিষ্যতে ইউক্রেন পরিস্থিতি যেদিকেই মোড় নিক না কেন, তা দেখার জন্য আমাদের হয়তো আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।

একেএম শামসুদ্দিন: অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন