সাফজয়ী বাঘিনী এবং একটি মাঠের আর্তনাদ
jugantor
সাফজয়ী বাঘিনী এবং একটি মাঠের আর্তনাদ

  ড. এম মেসবাহউদ্দিন সরকার  

০৩ অক্টোবর ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সাফ নারী ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপে নতুন ইতিহাস গড়েছে বাংলাদেশ। নেপালকে ৩-১ গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়নের মুকুট পরেছেন বাংলাদেশি এ খেলোয়াড়রা। ইতিহাস গড়া এ শিরোপা জয়ে দেশবাসী যেমন গর্বিত, তেমনি আনন্দিত ও উল্লসিত। তারা শুধু শিরোপাই জেতেননি, পুরো টুর্নামেন্টে ছিলেন অপরাজিত। তাদের এ কৃতিত্বের জন্য প্রাণঢালা অভিনন্দন জানাতে বিমানবন্দরে ভিড় করেছে ফুটবলপ্রেমী দেশবাসী। ফুটবলে পুরুষ দলে বিপরীতচিত্র লক্ষ করা যাচ্ছে। কোনোভাবেই যেন তাদের দিয়ে কোনো শিরোপা ঘরে আনা যাচ্ছে না। কত কোচিং, কত বাজেট, আরও কত কিছুই হচ্ছে এদের নিয়ে। এক সময়ের দাপুটে খেলোয়াড়রা এখন বাফুফের কর্মকর্তা সেজে এসি রুমে বসে সংবাদ সম্মেলন করেন, আর বলেন, অমুক সালে বাংলাদেশ বিশ্বকাপে খেলবে। ফুটবলপ্রেমী আমজনতা শুধু অপেক্ষার প্রহর গোনে, কিন্তু যেই লাউ সেই কদু। কর্মকর্তা ও খেলোয়াড়দের কথার সঙ্গে কাজের বিস্তর ফারাক। কোনোরকম পুরুষ ফুটবল নামক একটা টিম এখনো বাংলাদেশ আছে এটুকুই সান্ত্বনা। দেশে যখন ক্রিকেট অত জনপ্রিয় হয়নি, তখন এ দেশের মানুষ শুধুই ফুটবল খেলা দেখত আর গল্প করত চুন্নু, মুকুল, সালাউদ্দিন, আসলাম, কায়সার হামিদ-এরা এ দেশের মানুষকে মাতিয়ে রাখতেন তাদের জাদুকরি ফুটবল নৈপুণ্য দিয়ে। যদিও তখন তেমন কোনো আন্তর্জাতিক খেলা হতো না। প্রেসিডেন্ট গোল্ডকাপ, বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ এ কথাগুলো তখন বেশ শোনা যেত। যারা স্টেডিয়ামে খেলা দেখতে যেতে পারতেন না, তারা রেডিওতেই খেলা শুনতেন; ধারাভাষ্যকারদের বর্ণনা শুনলেই মন ভরে যেত। চৌধুরী জাফরউল্লাহ শারাফাতসহ আরও অনেকের ধারাভাষ্য আজও কানে বাজে।

নারী ফুটবল দলের এ খেলোয়াড়রা উঠে এসেছেন অভাব-অনটনের মধ্য দিয়ে। তাদের অনেকেরই নেই ঘরবাড়ি, ছিল না কোনো পৃষ্ঠপোষক। প্রথম দিন খেলার জন্য কে যে তাদের ফুটবল কিনে দিয়েছিল, সেটিও তারা বলতে পারবেন না; হয়তো পাহাড়ি জনপদে কুড়িয়ে পেয়েছিলেন সেই ফুটবলটি আজ যে রুপনা চাকমা গোলবারে দাঁড়িয়ে একের পর এক প্রতিপক্ষের শট আটকে দেন। প্রথম চার ম্যাচে একটিও বল জালে ঢুকতে দেননি, তার ঘরের ভাঙা চাল বৃষ্টির জল আটকাতে পারে না, তার ঘরের ভাঙা বেড়ার ফাঁক দিয়ে উত্তরের হিমেল হাওয়ার অবারিত আসা-যাওয়া। যে রুপনার কারণে বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে-তার ঘরে মাথা নিচু না করে ঢোকা যায় না। রুপনার মতো অনেকেই বাবা-মার সঙ্গে খেতে-খামারে কাজ করে, ঘুমায় ওই ভাঙা ছনের ঘরে আকাশের চাঁদ দেখে দেখে। অভাব-অনটন তাদের ইচ্ছাকে দমাতে পারেনি, বরং হয়েছে আকাশের মতো সীমাহীন। স্বপ্নও দেখেছেন বিশাল ভাঙা ঘরে থাকার সংকুলান না হওয়ায় হয়তো সময় কেটেছে তাদের ঘরের বাইরে গ্রামীণ মাঠে হাঁটিহাঁটি পা-পা করতে করতেই তারা ফুটবলকে ভালোবেসেছেন, স্বপ্ন দেখেছেন দেশের পতাকা ওড়াবে আন্তর্জাতিক মাঠে। এ মেয়েগুলো ভাগ্যক্রমে যদি শহরে আসত, তাহলে আর এ স্বপ্ন দেখা হতো না; কারণ এখানে কোনো মাঠ নেই, মাঠ রক্ষার জন্য কোনো উদ্যোগও নেই। একের পর এক মাঠগুলো দখল হয়ে যাচ্ছে। এ মাঠেই আবাহনী-মোহামেডানের মতো খেলা দেখতে মানুষ ছুটে আসত; কিন্তু এখন সেই মাঠের ওপর বিশাল অট্টালিকা। এ মাঠগুলোর মনে বড় দুঃখ, যেখানে থাকার কথা দূর্বা আর ঘাস। ছোট-বড় সবার নানা রকম খেলাধুলা করার কথা, সেখানে আজ শুধুই সুউচ্চ ভবনের ফাঁকে ফাঁকে যতটুকু জায়গা আছে, সেগুলোও বখাটে ও মাদকসেবনের দখলে। যারা মাঠে বসে গল্প করত, খেলাধুলা করত। তাদের জন্য আমার (আমি একটি মাঠ) খুব খারাপ লাগে।

আমার বুকে অনুষ্ঠিত হতো কত বৈশাখী মেলা, বসন্ত উৎসব, ঈদের জামাত আরও কত কী কী। ভালো লাগত আমার যখন ছোট-ছোট কচি পাগুলো বুকের ওপর সুড়সুড়ি দিত, পাখির ডাকের মতো ওদের হৈহল্লা আমাকে আপ্লুত করত। আমিও আদর করে বরণ করে নিতাম তাদের। কিন্তু আজ এগুলো নেই। আমার বুককে ঝাঁজরা করে যখন ১০০ ফুট গভীর পর্যন্ত পাইলিং করেছে, কেউ বাধা দিতে আসেনি, কয়েক হাজার টন ইট-পাথর, সিমেন্ট, রড বুকে ধারণ করে আমি কীভাবে যে বেঁচে আছি তা কেউ জানে না। এগুলো ভেবে আমার মনটা আজ খুবই ভারাক্রান্ত, বুক ফেটে রক্ত ঝরছে, যখন দেখি সেই ভবনে বসে তাদের ছেলেমেয়েরা এখন ফুটবল খেলা দেখে মোবাইলে অথবা ল্যাপটপে। মাঠের ঘাসের সঙ্গে দৌড়াদৌড়ি করে যারা থাকত, সুস্থ-সবল তারা আজ ঘরের কোণে বসে চোখ নষ্ট করছে, আয়ু কমাচ্ছে লেখাপড়া বাদ দিয়ে। এ বয়সেই তারা কী যেন কী দেখছে, ডিজিটাল ডিভাইসে বেঁচে থাকতে আমি এ দৃশ্য কীভাবে ধারণ করি, এ কষ্টের কথা আমি কাকে বলব? আমি তো এসেছিলাম আপনাদের ছেলেমেয়েদের সেবা করার জন্য, সুস্থ রাখার জন্য; কিন্তু আমি কি তা করতে পারি? আমি যেন বেঁচে থেকেও মৃত। আমার অবস্থা যাই হোক, আমার সতীর্থ অবশিষ্ট মাঠগুলো রক্ষা করুন, নিজে এবং ছেলেমেয়েদের সুস্থ রাখুন, ওদের খেলাধুলার ন্যূনতম ব্যবস্থা নিশ্চিত করুন। তাহলেই বের হয়ে আসবে অসংখ্য ফুটবলার, ক্রিকেটারসহ অনেক খেলোয়াড়। তা-ও যদি করতে না পারেন, পাহাড়-পর্বত, বন-জঙ্গল, বান্দরবান, পার্বত্য চট্টগ্রাম, রাঙামাটি ইত্যাদি অঞ্চলের জায়গাগুলো দখলদারদের হাত থেকে রক্ষা করুন। দখলদাররা সেখানেও লোভনীয় সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দিয়েছে অত্যাধুনিক শহর গড়ার লক্ষ্যে। এগুলো থামাতে না পারলে আমার চেয়েও খারাপ পরিণতি হবে আমার সতীর্থদের, রুপনার মতো খেলোয়াড় তৈরির পথ বন্ধ হবে চিরতরে।

ক্রিকেট খেলায়ও বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক মহলে অনেক পরিচিতি এনে দিয়েছেন, তবে এ খেলার ছন্দপতন অনেকেই বোঝে না। বিশেষ করে যখন দেখি টাইগাররা আফগানিস্তানের সঙ্গে পরাজিত হয়, কোনো কোনো দলের সঙ্গে হোয়াইটওয়াশ হয়, তখন কোনোভাবেই আর হিসাব মেলাতে পারি না আমি। অনেকের সঙ্গে আমিও একমত যে, ক্রিকেটের উত্থান যতটুকু হয়েছে, তার চেয়ে বেশি গতিতে নিুমুখী হয়েছে তাদের অতিরিক্ত পুরস্কৃত করার কারণে।

নারী ফুটবলের হিসাবটা সম্পূর্ণ ভিন্ন হবে। বাংলাদেশের সর্ব ক্ষেত্রে নারীর অগ্রযাত্রা ঈর্ষণীয়। ধৈর্য, মায়া ও মমতায় তারা কর্মক্ষেত্রে পুরুষের চেয়ে এগিয়ে আছে সর্বত্র। পোশাকশিল্প থেকে শুরু করে হাটে-মাঠে সর্বত্র। সর্বশেষ বিশ্ব দরবারেও বাংলাদেশকে পরিচিত করালেন মায়ের জাত এ নারীরাই। তাই তাদের ন্যূনতম চাহিদা পূরণে যথাযথ উদ্যোগ নেবেন, পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে বাঁচিয়ে রাখবেন নারী ফুটবলারদের, এটাই প্রত্যাশা। নারী ক্রিকেট দলের সাফল্যও সন্তোষজনক। ইতোমধ্যেই তারা বিশ্বকাপ ক্রিকেটে যাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছেন। তাই আমি শেষ হয়ে গেলেও আমার সতীর্থদের নিয়ে খুবই আশাবাদী। ইনশাআল্লাহ, সেদিন আর বেশিদিন নয়, যেদিন নারী বিশ্বকাপ ফুটবল এবং ক্রিকেট দুটিতেই বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন হবে। আমার এ আর্তনাদ আপনাদের কাছে পৌঁছাবে কিনা জানি না।

ড. এম মেসবাহউদ্দিন সরকার : অধ্যাপক, ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন টেকনোলজি (আইআইটি), জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

সাফজয়ী বাঘিনী এবং একটি মাঠের আর্তনাদ

 ড. এম মেসবাহউদ্দিন সরকার 
০৩ অক্টোবর ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সাফ নারী ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপে নতুন ইতিহাস গড়েছে বাংলাদেশ। নেপালকে ৩-১ গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়নের মুকুট পরেছেন বাংলাদেশি এ খেলোয়াড়রা। ইতিহাস গড়া এ শিরোপা জয়ে দেশবাসী যেমন গর্বিত, তেমনি আনন্দিত ও উল্লসিত। তারা শুধু শিরোপাই জেতেননি, পুরো টুর্নামেন্টে ছিলেন অপরাজিত। তাদের এ কৃতিত্বের জন্য প্রাণঢালা অভিনন্দন জানাতে বিমানবন্দরে ভিড় করেছে ফুটবলপ্রেমী দেশবাসী। ফুটবলে পুরুষ দলে বিপরীতচিত্র লক্ষ করা যাচ্ছে। কোনোভাবেই যেন তাদের দিয়ে কোনো শিরোপা ঘরে আনা যাচ্ছে না। কত কোচিং, কত বাজেট, আরও কত কিছুই হচ্ছে এদের নিয়ে। এক সময়ের দাপুটে খেলোয়াড়রা এখন বাফুফের কর্মকর্তা সেজে এসি রুমে বসে সংবাদ সম্মেলন করেন, আর বলেন, অমুক সালে বাংলাদেশ বিশ্বকাপে খেলবে। ফুটবলপ্রেমী আমজনতা শুধু অপেক্ষার প্রহর গোনে, কিন্তু যেই লাউ সেই কদু। কর্মকর্তা ও খেলোয়াড়দের কথার সঙ্গে কাজের বিস্তর ফারাক। কোনোরকম পুরুষ ফুটবল নামক একটা টিম এখনো বাংলাদেশ আছে এটুকুই সান্ত্বনা। দেশে যখন ক্রিকেট অত জনপ্রিয় হয়নি, তখন এ দেশের মানুষ শুধুই ফুটবল খেলা দেখত আর গল্প করত চুন্নু, মুকুল, সালাউদ্দিন, আসলাম, কায়সার হামিদ-এরা এ দেশের মানুষকে মাতিয়ে রাখতেন তাদের জাদুকরি ফুটবল নৈপুণ্য দিয়ে। যদিও তখন তেমন কোনো আন্তর্জাতিক খেলা হতো না। প্রেসিডেন্ট গোল্ডকাপ, বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ এ কথাগুলো তখন বেশ শোনা যেত। যারা স্টেডিয়ামে খেলা দেখতে যেতে পারতেন না, তারা রেডিওতেই খেলা শুনতেন; ধারাভাষ্যকারদের বর্ণনা শুনলেই মন ভরে যেত। চৌধুরী জাফরউল্লাহ শারাফাতসহ আরও অনেকের ধারাভাষ্য আজও কানে বাজে।

নারী ফুটবল দলের এ খেলোয়াড়রা উঠে এসেছেন অভাব-অনটনের মধ্য দিয়ে। তাদের অনেকেরই নেই ঘরবাড়ি, ছিল না কোনো পৃষ্ঠপোষক। প্রথম দিন খেলার জন্য কে যে তাদের ফুটবল কিনে দিয়েছিল, সেটিও তারা বলতে পারবেন না; হয়তো পাহাড়ি জনপদে কুড়িয়ে পেয়েছিলেন সেই ফুটবলটি আজ যে রুপনা চাকমা গোলবারে দাঁড়িয়ে একের পর এক প্রতিপক্ষের শট আটকে দেন। প্রথম চার ম্যাচে একটিও বল জালে ঢুকতে দেননি, তার ঘরের ভাঙা চাল বৃষ্টির জল আটকাতে পারে না, তার ঘরের ভাঙা বেড়ার ফাঁক দিয়ে উত্তরের হিমেল হাওয়ার অবারিত আসা-যাওয়া। যে রুপনার কারণে বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে-তার ঘরে মাথা নিচু না করে ঢোকা যায় না। রুপনার মতো অনেকেই বাবা-মার সঙ্গে খেতে-খামারে কাজ করে, ঘুমায় ওই ভাঙা ছনের ঘরে আকাশের চাঁদ দেখে দেখে। অভাব-অনটন তাদের ইচ্ছাকে দমাতে পারেনি, বরং হয়েছে আকাশের মতো সীমাহীন। স্বপ্নও দেখেছেন বিশাল ভাঙা ঘরে থাকার সংকুলান না হওয়ায় হয়তো সময় কেটেছে তাদের ঘরের বাইরে গ্রামীণ মাঠে হাঁটিহাঁটি পা-পা করতে করতেই তারা ফুটবলকে ভালোবেসেছেন, স্বপ্ন দেখেছেন দেশের পতাকা ওড়াবে আন্তর্জাতিক মাঠে। এ মেয়েগুলো ভাগ্যক্রমে যদি শহরে আসত, তাহলে আর এ স্বপ্ন দেখা হতো না; কারণ এখানে কোনো মাঠ নেই, মাঠ রক্ষার জন্য কোনো উদ্যোগও নেই। একের পর এক মাঠগুলো দখল হয়ে যাচ্ছে। এ মাঠেই আবাহনী-মোহামেডানের মতো খেলা দেখতে মানুষ ছুটে আসত; কিন্তু এখন সেই মাঠের ওপর বিশাল অট্টালিকা। এ মাঠগুলোর মনে বড় দুঃখ, যেখানে থাকার কথা দূর্বা আর ঘাস। ছোট-বড় সবার নানা রকম খেলাধুলা করার কথা, সেখানে আজ শুধুই সুউচ্চ ভবনের ফাঁকে ফাঁকে যতটুকু জায়গা আছে, সেগুলোও বখাটে ও মাদকসেবনের দখলে। যারা মাঠে বসে গল্প করত, খেলাধুলা করত। তাদের জন্য আমার (আমি একটি মাঠ) খুব খারাপ লাগে।

আমার বুকে অনুষ্ঠিত হতো কত বৈশাখী মেলা, বসন্ত উৎসব, ঈদের জামাত আরও কত কী কী। ভালো লাগত আমার যখন ছোট-ছোট কচি পাগুলো বুকের ওপর সুড়সুড়ি দিত, পাখির ডাকের মতো ওদের হৈহল্লা আমাকে আপ্লুত করত। আমিও আদর করে বরণ করে নিতাম তাদের। কিন্তু আজ এগুলো নেই। আমার বুককে ঝাঁজরা করে যখন ১০০ ফুট গভীর পর্যন্ত পাইলিং করেছে, কেউ বাধা দিতে আসেনি, কয়েক হাজার টন ইট-পাথর, সিমেন্ট, রড বুকে ধারণ করে আমি কীভাবে যে বেঁচে আছি তা কেউ জানে না। এগুলো ভেবে আমার মনটা আজ খুবই ভারাক্রান্ত, বুক ফেটে রক্ত ঝরছে, যখন দেখি সেই ভবনে বসে তাদের ছেলেমেয়েরা এখন ফুটবল খেলা দেখে মোবাইলে অথবা ল্যাপটপে। মাঠের ঘাসের সঙ্গে দৌড়াদৌড়ি করে যারা থাকত, সুস্থ-সবল তারা আজ ঘরের কোণে বসে চোখ নষ্ট করছে, আয়ু কমাচ্ছে লেখাপড়া বাদ দিয়ে। এ বয়সেই তারা কী যেন কী দেখছে, ডিজিটাল ডিভাইসে বেঁচে থাকতে আমি এ দৃশ্য কীভাবে ধারণ করি, এ কষ্টের কথা আমি কাকে বলব? আমি তো এসেছিলাম আপনাদের ছেলেমেয়েদের সেবা করার জন্য, সুস্থ রাখার জন্য; কিন্তু আমি কি তা করতে পারি? আমি যেন বেঁচে থেকেও মৃত। আমার অবস্থা যাই হোক, আমার সতীর্থ অবশিষ্ট মাঠগুলো রক্ষা করুন, নিজে এবং ছেলেমেয়েদের সুস্থ রাখুন, ওদের খেলাধুলার ন্যূনতম ব্যবস্থা নিশ্চিত করুন। তাহলেই বের হয়ে আসবে অসংখ্য ফুটবলার, ক্রিকেটারসহ অনেক খেলোয়াড়। তা-ও যদি করতে না পারেন, পাহাড়-পর্বত, বন-জঙ্গল, বান্দরবান, পার্বত্য চট্টগ্রাম, রাঙামাটি ইত্যাদি অঞ্চলের জায়গাগুলো দখলদারদের হাত থেকে রক্ষা করুন। দখলদাররা সেখানেও লোভনীয় সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দিয়েছে অত্যাধুনিক শহর গড়ার লক্ষ্যে। এগুলো থামাতে না পারলে আমার চেয়েও খারাপ পরিণতি হবে আমার সতীর্থদের, রুপনার মতো খেলোয়াড় তৈরির পথ বন্ধ হবে চিরতরে।

ক্রিকেট খেলায়ও বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক মহলে অনেক পরিচিতি এনে দিয়েছেন, তবে এ খেলার ছন্দপতন অনেকেই বোঝে না। বিশেষ করে যখন দেখি টাইগাররা আফগানিস্তানের সঙ্গে পরাজিত হয়, কোনো কোনো দলের সঙ্গে হোয়াইটওয়াশ হয়, তখন কোনোভাবেই আর হিসাব মেলাতে পারি না আমি। অনেকের সঙ্গে আমিও একমত যে, ক্রিকেটের উত্থান যতটুকু হয়েছে, তার চেয়ে বেশি গতিতে নিুমুখী হয়েছে তাদের অতিরিক্ত পুরস্কৃত করার কারণে।

নারী ফুটবলের হিসাবটা সম্পূর্ণ ভিন্ন হবে। বাংলাদেশের সর্ব ক্ষেত্রে নারীর অগ্রযাত্রা ঈর্ষণীয়। ধৈর্য, মায়া ও মমতায় তারা কর্মক্ষেত্রে পুরুষের চেয়ে এগিয়ে আছে সর্বত্র। পোশাকশিল্প থেকে শুরু করে হাটে-মাঠে সর্বত্র। সর্বশেষ বিশ্ব দরবারেও বাংলাদেশকে পরিচিত করালেন মায়ের জাত এ নারীরাই। তাই তাদের ন্যূনতম চাহিদা পূরণে যথাযথ উদ্যোগ নেবেন, পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে বাঁচিয়ে রাখবেন নারী ফুটবলারদের, এটাই প্রত্যাশা। নারী ক্রিকেট দলের সাফল্যও সন্তোষজনক। ইতোমধ্যেই তারা বিশ্বকাপ ক্রিকেটে যাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছেন। তাই আমি শেষ হয়ে গেলেও আমার সতীর্থদের নিয়ে খুবই আশাবাদী। ইনশাআল্লাহ, সেদিন আর বেশিদিন নয়, যেদিন নারী বিশ্বকাপ ফুটবল এবং ক্রিকেট দুটিতেই বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন হবে। আমার এ আর্তনাদ আপনাদের কাছে পৌঁছাবে কিনা জানি না।

ড. এম মেসবাহউদ্দিন সরকার : অধ্যাপক, ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন টেকনোলজি (আইআইটি), জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন