ইউক্রেন যুদ্ধ ও বাংলাদেশি জনগণের প্রতিক্রিয়া
jugantor
ইউক্রেন যুদ্ধ ও বাংলাদেশি জনগণের প্রতিক্রিয়া

  ডা. জাহেদ উর রহমান  

০৬ অক্টোবর ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

পৃথিবীতে বিভিন্ন সময়ে নানা পরীক্ষামূলক পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটানো হলেও জনমানুষের ওপরে পারমাণবিক বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে একবারই-হিরোশিমা আর নাগাসাকিতে জোড়া হামলা।

সেই হামলার ৭৭ বছর পর এ মুহূর্তে পৃথিবী দাঁড়িয়ে আছে আরেকটি পারমাণবিক হামলা হওয়ার ঝুঁকির মুখে।

মাঝের এ পুরো সময়টা পারমাণবিক ঝুঁকি থেকে একেবারে মুক্ত ছিল পৃথিবী, তেমনটি নয়। স্নায়ুযুদ্ধের উত্তাল সময়টাতে, ১৯৬২ সালে কিউবা মিসাইল সংকট পৃথিবীতে একটি প্রলয়ংকরী পারমাণবিক যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি করেছিল। সৌভাগ্যজনকভাবে সে যাত্রা, সেই পরিস্থিতি থেকে পৃথিবীবাসী বেঁচে গিয়েছিল। কিন্তু এবার কি পারবে পৃথিবী সে রকম একটি সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে? এ প্রশ্নের জবাবের আগে জেনে নেওয়া যাক সংকটটা কেন হচ্ছে।

মুখে ভ্লাদিমির পুতিন যতই বলুন না কেন, ইউক্রেনে তিনি কোনো যুদ্ধ করছেন না, চালাচ্ছেন একটি ‘স্পেশাল মিলিটারি অপারেশন’, আসলে প্রথম দিন থেকেই তিনি ইউক্রেনে একটা পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ চালিয়ে গেছেন। সেই যুদ্ধে তার যে স্বপ্ন ছিল, খুব অল্প সময়ের মধ্যে কিয়েভ দখল করে বন্দি করবেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে এবং সেখানে বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কোর মতো একজন পুতুল শাসক বসিয়ে দেশে বীরের বেশে ফিরে আসবে রাশিয়ান বাহিনী, সেটি হয়নি। বরং অল্প সময়ের মধ্যেই সেই অবস্থান থেকে সরে কিয়েভ থেকে বাহিনী সরিয়ে শেষ পর্যন্ত বলা হয় ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলের ডনবাস এলাকা মুক্ত করবে পুতিনের বাহিনী।

যা হোক, নানা চড়াই-উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে যুদ্ধটি চলছে এখনো। কিন্তু কিছুদিন আগে রাশিয়ার অহমে চরম আঘাত করে ইউক্রেন রাশিয়ার অধিকৃত ভূমি থেকে ৮-৯ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা পুনর্দখল করে। এ পরিস্থিতিতেই পুতিন উজবেকিস্তানের সমরখন্দ শহরে সাংহাই কো-অপারেটিভ অর্গানাইজেশনের (এসসিও) শীর্ষ সম্মেলনে যান, যেখানে পুতিনকে একদা ‘সীমাহীন বন্ধুত্বের’ নিশ্চয়তা দেওয়া চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে তার উদ্বেগের কথা জানান। এছাড়া যুদ্ধের শুরু থেকে পুতিনের পক্ষাবলম্বী ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও ‘এই শতাব্দী যুদ্ধের নয়’ বলে নসিহত করেন পুতিনকে। সেই সম্মেলনে পুতিন এ যুদ্ধ শেষ করার জন্য একটা প্রবল চাপ বোধ করেন এটি নিশ্চিত। এর প্রতিফলন দেখা গেল দেশে ফিরে জাতির উদ্দেশে তার দেওয়া ভাষণে।

ইউক্রেন আগ্রাসন শুরুর পর দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে ২১ সেপ্টেম্বর পুতিন জাতির উদ্দেশে ভাষণে জানান, তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রথমবারের মতো সেনা সমাবেশ করতে যাচ্ছেন (পারশিয়াল মোবিলাইজেশন)। জেনারেল মোবিলাইজেশনের ক্ষেত্রে কোনো একটি রাষ্ট্রের যুদ্ধ করার উপযোগী বয়সের (সাধারণত ১৮ থেকে ৬০) সব পুরুষকে সরকারের নির্দেশ পেলে যুদ্ধে যোগ দিতেই হয়। পারশিয়াল মোবিলাইজেশনের আওতায় পুতিন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে কখনো কর্মরত ছিলেন অথবা সেনাবাহিনীর ট্রেনিং পেয়েছেন, এ রকম ব্যক্তিকে (রিজার্ভিস্ট) যুদ্ধে যোগ দিতে হবে। একটি সংখ্যাও জানানো হয়েছে, আপাতত তিন লাখ। এ পদক্ষেপ প্রমাণ করে যুদ্ধক্ষেত্রে খারাপ পরিস্থিতিতে আছে পুতিনের বাহিনী।

এরপর পুতিন সবচেয়ে ভয়ংকর যে কথাটি বলেছেন, সেটা হচ্ছে, ‘আক্রমণাত্মক রুশবিরোধী নীতিতে পশ্চিমা বিশ্ব সীমা অতিক্রম করেছে। এটি কোনো ফাঁকা বুলি নয়। যারা পারমাণবিক অস্ত্র দিয়ে আমাদের ব্ল্যাকমেইল করার চেষ্টা করছে তাদের জানা উচিত, পরিস্থিতি তাদের দিকে ঘুরতে পারে এবং তাদের লক্ষ্যবস্তু বানাতে পারে।’ প্রশ্ন হচ্ছে, আদৌ কি পশ্চিমারা পুতিনকে পারমাণবিক ব্ল্যাকমেইল করছে? কারও কি চোখে পড়েছে রাশিয়াকে পারমাণবিক হামলার হুমকিসংক্রান্ত কোনো খবর? চর্মচক্ষুতে দেখা যাচ্ছে, কাজটা করছেন পুতিন নিজেই।

সেই ভাষণের পর যথারীতি ইউক্রেনের অধিকৃত চারটি এলাকা দোনেৎস্ক, লুহানস্ক, খেরসন ও জাপোরঝিয়ায় তথাকথিত গণভোট আয়োজন করা হয় এবং সেগুলোতে প্রায় সবাই রাশিয়ার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার জন্য ভোট দেয়। এ এলাকাগুলো দীর্ঘদিন থেকে যুদ্ধে আক্রান্ত হয়ে থাকার কারণে অসংখ্য বাসিন্দা এসব এলাকায় এখন থাকছেন না। এমনকি একটা যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে এরকম একটা গণভোট অকল্পনীয়। কিন্তু সেটা হয়েছে। ভোটের নামে এসব এলাকায় আদতে কী হয়েছে, সেটা বোধকরি পুতিনের অন্ধ সমর্থকরাও বোঝেন।

যা হোক, ৩০ সেপ্টেম্বর ঘটা করে ইউক্রেনের এ চারটি এলাকা রাশিয়া তার নিজের বলে একীভূত করে নিয়েছে। এ ভূমির পরিমাণ ইউক্রেনের মোট ভূমির ১৫ শতাংশ। পরিমাণটা একটু বুঝে নেওয়া যাক। ইউক্রেনের আয়তন ৬ লাখ বর্গকিলোমিটারের বেশি। এর ১৫ শতাংশ মানে ৯০ হাজার বর্গকিলোমিটারের বেশি। অর্থাৎ রাশিয়া ইউক্রেনে যে পরিমাণ ভূমি দখল করেছে সেটি বাংলাদেশের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-উত্তর পরিস্থিতিতে পৃথিবীতে এরকম ঘটনা আর দ্বিতীয়টি ঘটেনি। কিন্তু তারপরও রাশিয়ার এ ভয়ংকর কাণ্ডের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা পরিষদে যখন নিন্দা প্রস্তাব এসেছে, তাতে ভোটদানে বিরত ছিল ভারত এবং চীন।

ইউক্রেনে আগ্রাসন শুরুর পর থেকেই এ দেশের খুব সাধারণ শিক্ষিত মানুষ তো বটেই, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে রিয়েলিজম ধারার এ মুহূর্তের সবচেয়ে বড় পণ্ডিত (তর্কযোগ্যভাবে) জন মার্শেইমার ইউক্রেন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমাদের ঘাড়ে সব দোষ দিয়েছেন ‘উসকানি দেওয়া’ তত্ত্ব দিয়ে। ন্যাটো ইউক্রেনকে ন্যাটো জোটভুক্ত করার কথা বলার মাধ্যমে রাশিয়াকে উসকানি দিয়েছে, তাই রাশিয়ার এ আগ্রাসন করা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না-মোটা দাগে কথা এটাই। এটার ভিত্তিতেই একটা দেশের ওপরে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনকে বৈধ বলে মনে করেছে এ দেশের অসংখ্য ‘সচেতন’ মানুষ। এরপর মাসের পর মাস যুদ্ধ চলল, নির্বিচার বোমা হামলা করে ইউক্রেনের একের পর এক শহরকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা হলো, কিন্তু আমরা তবুও সমর্থন করে গেলাম।

সবকিছুর পর বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে একটা দেশের এত বড় একটা অঞ্চল দখল করে ফেলার পরও আমরা অনেকেই এ পদক্ষেপকে সমর্থন করছি। পরিস্থিতি এখন এমন পর্যায়ে গেছে যে, পুতিন ইউক্রেনে পারমাণবিক হামলা করতে প্রস্তুত আছেন বলে জানিয়েছেন। ইউক্রেনের অঞ্চলগুলোকে আনুষ্ঠানিকভাবে রাশিয়ার অংশ হিসাবে ঘোষণা করার পর তিনি আবারও স্পষ্টভাবে হুমকি দিয়ে বলেছেন, এ এলাকাগুলো রক্ষা করার জন্য যে কোনো রকম অস্ত্র ব্যবহারে প্রস্তুত তিনি।

ইউক্রেনে আগ্রাসনের শুরু থেকে ন্যাটো সদস্য দেশগুলো, বিশেষ করে আমেরিকা ইউক্রেনকে প্রকাশ্যভাবে সামরিক সাহায্য দিয়েছে। যুদ্ধাস্ত্র দিয়েছে, দিয়েছে গোয়েন্দা তথ্য। কিন্তু শুরু থেকে এখন পর্যন্ত আমেরিকা একটা ব্যাপারে খুব সতর্ক ও দায়িত্বশীল আচরণ করার চেষ্টা করেছে, সেটা হলো যুদ্ধটা যেন কোনোভাবেই ইউক্রেনের বাইরে ছড়িয়ে না পড়ে। তেমন ঘটনা একটি বিশ্বযুদ্ধ ঘটিয়ে দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।

যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ইউক্রেনের আকাশে নো ফ্লাই জোন নিশ্চিত করার জন্য উপর্যুপরি আহ্বান করেছিলেন ন্যাটোর কাছে। তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাইডেন স্পষ্টভাবেই বলেছিলেন, এর অর্থ ইউক্রেনের মাটিতে ন্যাটোর ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা এবং আকাশে ন্যাটোর বিমান দিয়ে রুশ বিমানকে ভূপাতিত করার মতো পরিস্থিতি হবে। এটি মানে রাশিয়ার সঙ্গে ন্যাটো সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে যাওয়া। তাই তিনি সেটি করবেন না।

সাম্প্রতিক আরেকটি উদাহরণ আছে। যুক্তরাষ্ট্র কিছুদিন আগে তার অত্যাধুনিক মাল্টিপল রকেট লঞ্চিং সিস্টেম হাইমার্স দিয়েছে ইউক্রেনকে। অত্যন্ত নিখুঁত লক্ষ্যভেদী এ রকেট সিস্টেম এতটাই নিখুঁত, যা প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূর থেকে একটি ডিনার প্লেটে গিয়ে আঘাত করতে পারে। এ অস্ত্রের মুখেই সম্প্রতি রাশিয়ান বাহিনী নাকানিচোবানি খেয়েছে। এ রকেট সিস্টেমে ব্যবহারযোগ্য ২০০ কিলোমিটার পাল্লার রকেট ইউক্রেনকে আমেরিকা দেয়নি, কারণ সেটি দিয়ে রাশিয়ার অভ্যন্তরে ইউক্রেন আক্রমণ চালাতে পারবে, যা যুদ্ধকে ছড়িয়ে দিতে পারে। অর্থাৎ আমরা দেখতে পাচ্ছি, আমেরিকা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে খুব বড় ধরনের সংঘাত যাতে তৈরি না হয়ে যায়, সেটি নিশ্চিত করতে। কিন্তু না, এর প্রতিটি আচরণকে দুর্বলতা হিসাবে বিবেচনা করে পুতিন এখন পারমাণবিক হামলা করার স্পষ্ট হুমকি দিচ্ছেন, যেটাকে তিনি নিজেই বলছেন, তিনি ধাপ্পাবাজি করছেন না।

বলা হচ্ছে, পরিস্থিতি তার চরম প্রতিকূলে চলে গেলে পুতিন সতর্কতামূলকভাবে প্রথমে একটি যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার্য তুলনামূলক কম সক্ষমতার (ট্যাকটিক্যাল) পারমাণবিক বোমা ইউক্রেনের জলসীমায় সমুদ্রে কিংবা ইউক্রেনের আকাশসীমায় অনেক উঁচুতে ফাটাবেন, যাতে বড় কোনো ক্ষয়ক্ষতি হবে না। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, তিনি সরাসরি ইউক্রেনের ভূমিতেই সেটা ফাটাতে পারেন। ধরে নেওয়া যাক, ইউক্রেনের ভূমিতেই একটা পারমাণবিক হামলা করলেন পুতিন। আমার ধারণা, এদেশের অসংখ্য মানুষ এরপরও পুতিনকে সমর্থন করবেন।

নিজ দেশের মানুষদের মতামতেরই যেখানে গুরুত্ব নেই পুতিনের কাছে, সেখানে আমাদের সমর্থন বা বিরোধিতায় পুতিনের আসলে কিছু আসে-যায় না। কিন্তু এ যুদ্ধ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে এ সমাজের কতগুলো বাস্তবতা প্রকাশ করে দিয়ে গেছে। এক বিরাট পরাশক্তি দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে থাকা বাংলাদেশের মানুষ সমর্থন করছে আরেক পরাশক্তি কর্তৃক পার্শ্ববর্তী দেশ দখলকেও।

ডা. জাহেদ উর রহমান : শিক্ষক ও নাগরিক অধিকারকর্মী

ইউক্রেন যুদ্ধ ও বাংলাদেশি জনগণের প্রতিক্রিয়া

 ডা. জাহেদ উর রহমান 
০৬ অক্টোবর ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

পৃথিবীতে বিভিন্ন সময়ে নানা পরীক্ষামূলক পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটানো হলেও জনমানুষের ওপরে পারমাণবিক বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে একবারই-হিরোশিমা আর নাগাসাকিতে জোড়া হামলা।

সেই হামলার ৭৭ বছর পর এ মুহূর্তে পৃথিবী দাঁড়িয়ে আছে আরেকটি পারমাণবিক হামলা হওয়ার ঝুঁকির মুখে।

মাঝের এ পুরো সময়টা পারমাণবিক ঝুঁকি থেকে একেবারে মুক্ত ছিল পৃথিবী, তেমনটি নয়। স্নায়ুযুদ্ধের উত্তাল সময়টাতে, ১৯৬২ সালে কিউবা মিসাইল সংকট পৃথিবীতে একটি প্রলয়ংকরী পারমাণবিক যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি করেছিল। সৌভাগ্যজনকভাবে সে যাত্রা, সেই পরিস্থিতি থেকে পৃথিবীবাসী বেঁচে গিয়েছিল। কিন্তু এবার কি পারবে পৃথিবী সে রকম একটি সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে? এ প্রশ্নের জবাবের আগে জেনে নেওয়া যাক সংকটটা কেন হচ্ছে।

মুখে ভ্লাদিমির পুতিন যতই বলুন না কেন, ইউক্রেনে তিনি কোনো যুদ্ধ করছেন না, চালাচ্ছেন একটি ‘স্পেশাল মিলিটারি অপারেশন’, আসলে প্রথম দিন থেকেই তিনি ইউক্রেনে একটা পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ চালিয়ে গেছেন। সেই যুদ্ধে তার যে স্বপ্ন ছিল, খুব অল্প সময়ের মধ্যে কিয়েভ দখল করে বন্দি করবেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে এবং সেখানে বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কোর মতো একজন পুতুল শাসক বসিয়ে দেশে বীরের বেশে ফিরে আসবে রাশিয়ান বাহিনী, সেটি হয়নি। বরং অল্প সময়ের মধ্যেই সেই অবস্থান থেকে সরে কিয়েভ থেকে বাহিনী সরিয়ে শেষ পর্যন্ত বলা হয় ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলের ডনবাস এলাকা মুক্ত করবে পুতিনের বাহিনী।

যা হোক, নানা চড়াই-উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে যুদ্ধটি চলছে এখনো। কিন্তু কিছুদিন আগে রাশিয়ার অহমে চরম আঘাত করে ইউক্রেন রাশিয়ার অধিকৃত ভূমি থেকে ৮-৯ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা পুনর্দখল করে। এ পরিস্থিতিতেই পুতিন উজবেকিস্তানের সমরখন্দ শহরে সাংহাই কো-অপারেটিভ অর্গানাইজেশনের (এসসিও) শীর্ষ সম্মেলনে যান, যেখানে পুতিনকে একদা ‘সীমাহীন বন্ধুত্বের’ নিশ্চয়তা দেওয়া চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে তার উদ্বেগের কথা জানান। এছাড়া যুদ্ধের শুরু থেকে পুতিনের পক্ষাবলম্বী ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও ‘এই শতাব্দী যুদ্ধের নয়’ বলে নসিহত করেন পুতিনকে। সেই সম্মেলনে পুতিন এ যুদ্ধ শেষ করার জন্য একটা প্রবল চাপ বোধ করেন এটি নিশ্চিত। এর প্রতিফলন দেখা গেল দেশে ফিরে জাতির উদ্দেশে তার দেওয়া ভাষণে।

ইউক্রেন আগ্রাসন শুরুর পর দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে ২১ সেপ্টেম্বর পুতিন জাতির উদ্দেশে ভাষণে জানান, তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রথমবারের মতো সেনা সমাবেশ করতে যাচ্ছেন (পারশিয়াল মোবিলাইজেশন)। জেনারেল মোবিলাইজেশনের ক্ষেত্রে কোনো একটি রাষ্ট্রের যুদ্ধ করার উপযোগী বয়সের (সাধারণত ১৮ থেকে ৬০) সব পুরুষকে সরকারের নির্দেশ পেলে যুদ্ধে যোগ দিতেই হয়। পারশিয়াল মোবিলাইজেশনের আওতায় পুতিন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে কখনো কর্মরত ছিলেন অথবা সেনাবাহিনীর ট্রেনিং পেয়েছেন, এ রকম ব্যক্তিকে (রিজার্ভিস্ট) যুদ্ধে যোগ দিতে হবে। একটি সংখ্যাও জানানো হয়েছে, আপাতত তিন লাখ। এ পদক্ষেপ প্রমাণ করে যুদ্ধক্ষেত্রে খারাপ পরিস্থিতিতে আছে পুতিনের বাহিনী।

এরপর পুতিন সবচেয়ে ভয়ংকর যে কথাটি বলেছেন, সেটা হচ্ছে, ‘আক্রমণাত্মক রুশবিরোধী নীতিতে পশ্চিমা বিশ্ব সীমা অতিক্রম করেছে। এটি কোনো ফাঁকা বুলি নয়। যারা পারমাণবিক অস্ত্র দিয়ে আমাদের ব্ল্যাকমেইল করার চেষ্টা করছে তাদের জানা উচিত, পরিস্থিতি তাদের দিকে ঘুরতে পারে এবং তাদের লক্ষ্যবস্তু বানাতে পারে।’ প্রশ্ন হচ্ছে, আদৌ কি পশ্চিমারা পুতিনকে পারমাণবিক ব্ল্যাকমেইল করছে? কারও কি চোখে পড়েছে রাশিয়াকে পারমাণবিক হামলার হুমকিসংক্রান্ত কোনো খবর? চর্মচক্ষুতে দেখা যাচ্ছে, কাজটা করছেন পুতিন নিজেই।

সেই ভাষণের পর যথারীতি ইউক্রেনের অধিকৃত চারটি এলাকা দোনেৎস্ক, লুহানস্ক, খেরসন ও জাপোরঝিয়ায় তথাকথিত গণভোট আয়োজন করা হয় এবং সেগুলোতে প্রায় সবাই রাশিয়ার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার জন্য ভোট দেয়। এ এলাকাগুলো দীর্ঘদিন থেকে যুদ্ধে আক্রান্ত হয়ে থাকার কারণে অসংখ্য বাসিন্দা এসব এলাকায় এখন থাকছেন না। এমনকি একটা যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে এরকম একটা গণভোট অকল্পনীয়। কিন্তু সেটা হয়েছে। ভোটের নামে এসব এলাকায় আদতে কী হয়েছে, সেটা বোধকরি পুতিনের অন্ধ সমর্থকরাও বোঝেন।

যা হোক, ৩০ সেপ্টেম্বর ঘটা করে ইউক্রেনের এ চারটি এলাকা রাশিয়া তার নিজের বলে একীভূত করে নিয়েছে। এ ভূমির পরিমাণ ইউক্রেনের মোট ভূমির ১৫ শতাংশ। পরিমাণটা একটু বুঝে নেওয়া যাক। ইউক্রেনের আয়তন ৬ লাখ বর্গকিলোমিটারের বেশি। এর ১৫ শতাংশ মানে ৯০ হাজার বর্গকিলোমিটারের বেশি। অর্থাৎ রাশিয়া ইউক্রেনে যে পরিমাণ ভূমি দখল করেছে সেটি বাংলাদেশের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-উত্তর পরিস্থিতিতে পৃথিবীতে এরকম ঘটনা আর দ্বিতীয়টি ঘটেনি। কিন্তু তারপরও রাশিয়ার এ ভয়ংকর কাণ্ডের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা পরিষদে যখন নিন্দা প্রস্তাব এসেছে, তাতে ভোটদানে বিরত ছিল ভারত এবং চীন।

ইউক্রেনে আগ্রাসন শুরুর পর থেকেই এ দেশের খুব সাধারণ শিক্ষিত মানুষ তো বটেই, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে রিয়েলিজম ধারার এ মুহূর্তের সবচেয়ে বড় পণ্ডিত (তর্কযোগ্যভাবে) জন মার্শেইমার ইউক্রেন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমাদের ঘাড়ে সব দোষ দিয়েছেন ‘উসকানি দেওয়া’ তত্ত্ব দিয়ে। ন্যাটো ইউক্রেনকে ন্যাটো জোটভুক্ত করার কথা বলার মাধ্যমে রাশিয়াকে উসকানি দিয়েছে, তাই রাশিয়ার এ আগ্রাসন করা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না-মোটা দাগে কথা এটাই। এটার ভিত্তিতেই একটা দেশের ওপরে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনকে বৈধ বলে মনে করেছে এ দেশের অসংখ্য ‘সচেতন’ মানুষ। এরপর মাসের পর মাস যুদ্ধ চলল, নির্বিচার বোমা হামলা করে ইউক্রেনের একের পর এক শহরকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা হলো, কিন্তু আমরা তবুও সমর্থন করে গেলাম।

সবকিছুর পর বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে একটা দেশের এত বড় একটা অঞ্চল দখল করে ফেলার পরও আমরা অনেকেই এ পদক্ষেপকে সমর্থন করছি। পরিস্থিতি এখন এমন পর্যায়ে গেছে যে, পুতিন ইউক্রেনে পারমাণবিক হামলা করতে প্রস্তুত আছেন বলে জানিয়েছেন। ইউক্রেনের অঞ্চলগুলোকে আনুষ্ঠানিকভাবে রাশিয়ার অংশ হিসাবে ঘোষণা করার পর তিনি আবারও স্পষ্টভাবে হুমকি দিয়ে বলেছেন, এ এলাকাগুলো রক্ষা করার জন্য যে কোনো রকম অস্ত্র ব্যবহারে প্রস্তুত তিনি।

ইউক্রেনে আগ্রাসনের শুরু থেকে ন্যাটো সদস্য দেশগুলো, বিশেষ করে আমেরিকা ইউক্রেনকে প্রকাশ্যভাবে সামরিক সাহায্য দিয়েছে। যুদ্ধাস্ত্র দিয়েছে, দিয়েছে গোয়েন্দা তথ্য। কিন্তু শুরু থেকে এখন পর্যন্ত আমেরিকা একটা ব্যাপারে খুব সতর্ক ও দায়িত্বশীল আচরণ করার চেষ্টা করেছে, সেটা হলো যুদ্ধটা যেন কোনোভাবেই ইউক্রেনের বাইরে ছড়িয়ে না পড়ে। তেমন ঘটনা একটি বিশ্বযুদ্ধ ঘটিয়ে দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।

যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ইউক্রেনের আকাশে নো ফ্লাই জোন নিশ্চিত করার জন্য উপর্যুপরি আহ্বান করেছিলেন ন্যাটোর কাছে। তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাইডেন স্পষ্টভাবেই বলেছিলেন, এর অর্থ ইউক্রেনের মাটিতে ন্যাটোর ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা এবং আকাশে ন্যাটোর বিমান দিয়ে রুশ বিমানকে ভূপাতিত করার মতো পরিস্থিতি হবে। এটি মানে রাশিয়ার সঙ্গে ন্যাটো সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে যাওয়া। তাই তিনি সেটি করবেন না।

সাম্প্রতিক আরেকটি উদাহরণ আছে। যুক্তরাষ্ট্র কিছুদিন আগে তার অত্যাধুনিক মাল্টিপল রকেট লঞ্চিং সিস্টেম হাইমার্স দিয়েছে ইউক্রেনকে। অত্যন্ত নিখুঁত লক্ষ্যভেদী এ রকেট সিস্টেম এতটাই নিখুঁত, যা প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূর থেকে একটি ডিনার প্লেটে গিয়ে আঘাত করতে পারে। এ অস্ত্রের মুখেই সম্প্রতি রাশিয়ান বাহিনী নাকানিচোবানি খেয়েছে। এ রকেট সিস্টেমে ব্যবহারযোগ্য ২০০ কিলোমিটার পাল্লার রকেট ইউক্রেনকে আমেরিকা দেয়নি, কারণ সেটি দিয়ে রাশিয়ার অভ্যন্তরে ইউক্রেন আক্রমণ চালাতে পারবে, যা যুদ্ধকে ছড়িয়ে দিতে পারে। অর্থাৎ আমরা দেখতে পাচ্ছি, আমেরিকা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে খুব বড় ধরনের সংঘাত যাতে তৈরি না হয়ে যায়, সেটি নিশ্চিত করতে। কিন্তু না, এর প্রতিটি আচরণকে দুর্বলতা হিসাবে বিবেচনা করে পুতিন এখন পারমাণবিক হামলা করার স্পষ্ট হুমকি দিচ্ছেন, যেটাকে তিনি নিজেই বলছেন, তিনি ধাপ্পাবাজি করছেন না।

বলা হচ্ছে, পরিস্থিতি তার চরম প্রতিকূলে চলে গেলে পুতিন সতর্কতামূলকভাবে প্রথমে একটি যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার্য তুলনামূলক কম সক্ষমতার (ট্যাকটিক্যাল) পারমাণবিক বোমা ইউক্রেনের জলসীমায় সমুদ্রে কিংবা ইউক্রেনের আকাশসীমায় অনেক উঁচুতে ফাটাবেন, যাতে বড় কোনো ক্ষয়ক্ষতি হবে না। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, তিনি সরাসরি ইউক্রেনের ভূমিতেই সেটা ফাটাতে পারেন। ধরে নেওয়া যাক, ইউক্রেনের ভূমিতেই একটা পারমাণবিক হামলা করলেন পুতিন। আমার ধারণা, এদেশের অসংখ্য মানুষ এরপরও পুতিনকে সমর্থন করবেন।

নিজ দেশের মানুষদের মতামতেরই যেখানে গুরুত্ব নেই পুতিনের কাছে, সেখানে আমাদের সমর্থন বা বিরোধিতায় পুতিনের আসলে কিছু আসে-যায় না। কিন্তু এ যুদ্ধ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে এ সমাজের কতগুলো বাস্তবতা প্রকাশ করে দিয়ে গেছে। এক বিরাট পরাশক্তি দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে থাকা বাংলাদেশের মানুষ সমর্থন করছে আরেক পরাশক্তি কর্তৃক পার্শ্ববর্তী দেশ দখলকেও।

ডা. জাহেদ উর রহমান : শিক্ষক ও নাগরিক অধিকারকর্মী

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : রাশিয়া-ইউক্রেন উত্তেজনা