পৃথিবীর সম্পদ ক্রমাগত নিঃশেষ করে ফেলছি আমরা
jugantor
পৃথিবীর সম্পদ ক্রমাগত নিঃশেষ করে ফেলছি আমরা

  নূরে আলম সিদ্দিকী  

২৮ নভেম্বর ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আমাদের এ পৃথিবীর সব সম্পদ আগে যা ধারণা করা হয়েছিল, তার চেয়ে দ্রুতগতিতে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। আমরা জানি, মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর দ্বারা প্রতিনিয়ত ব্যবহৃত বা ভোগকৃত সম্পদের শূন্যস্থান প্রাকৃতিকভাবেই পূরণ হয়। সম্পদের নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার মানে হচ্ছে, একটা নির্দিষ্ট সময়ে ব্যবহৃত ও ভোগকৃত সম্পদের পুনরুদ্ধার বা শূন্যস্থান পূরণ হয়ে আগের অবস্থানে ফিরে আসার আগেই নিঃশেষ হয়ে অতিরিক্ত চাহিদার সৃষ্টি হওয়া; অর্থাৎ পৃথিবীতে সঞ্চিত সম্পদের মধ্য থেকে সমগ্র মানবজাতি ও অন্যান্য প্রাণীরা এক বছরে যে পরিমাণ সম্পদ ভোগ বা ব্যবহার করে, সেই পরিমাণ সম্পদ যদি একই বছরে রিকভার বা পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে নতুনভাবে তৈরি হয়ে যায়, তাহলে পৃথিবীতে সম্পদের পরিমাণ সব সময় একই রকম থাকবে।

প্রাকৃতিক সম্পদকে নবায়নযোগ্য এবং অনবায়নযোগ্য এ দুই ভাগে ভাগ করা যায়। সম্পদের মূল্য নির্ধারিত হয় তার চাহিদা, সহজলভ্যতা, দুষ্প্রাপ্যতা এবং তার উৎপাদন ও আহরণ খরচের ওপর ভিত্তি করে। সম্পদের পরিমাণ এবং জোগান যতই হ্রাস পেতে থাকবে, তার চাহিদা এবং মূল্য ততই বাড়তে থাকবে।

বিভিন্নভাবে আমাদের এ পৃথিবীর সম্পদ হ্রাস পাচ্ছে। যেমন এক্যুইফার অর্থাৎ মাটি বা শিলার যে স্তর দিয়ে পানিবাহিত হতে পারে তার ক্ষয়, বনভূমি ধ্বংস, বন্যপ্রাণীর বিলুপ্তি, জীবশ্ম জ্বালানি ও অন্যান্য খনিজের ব্যাপক উত্তোলন, পানিসম্পদের ব্যাপক দূষণ ও বিষাক্তকরণ, বনভূমি জ্বালিয়ে ও ধ্বংস করে খাদ্য শস্য উৎপাদন, ভূমিধস, সম্পদের অতিমাত্রায় এবং অপ্রয়োজনীয় ভোগ ও ব্যবহার ইত্যাদি।

জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির আওতায় আন্তর্জাতিক রিসোর্স প্যানেল সর্বশেষ ‘গ্লোবাল রিসোর্স আউটলুক-২০১৯’ নামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যেখানে ভবিষ্যতে মানবজাতি কী পরিমাণ প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ করতে চায় এবং তার পরিণতি কী হতে পারে; ১৯৭০ সাল থেকে নিয়ে তার একটি পরিসংখ্যানভিত্তিক গতিপ্রকৃতি তুলে ধরা হয়েছিল। প্রতিবেদনটিতে যা তুলে ধরা হয়েছিল তা নিম্নরূপ-

১. বস্তু, জ্বালানি, খাদ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রভৃতি কর্মকাণ্ড বৈশ্বিক গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণের অর্ধেক এবং ৯০ শতাংশ জীববৈচিত্র্য ধ্বংস ও পানি দূষণের জন্য দায়ী।

২. ১৯৭০ সালের তুলনায় খনিজসম্পদ উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে ৩ গুণ, অধাতব খনিজের ব্যবহার বেড়েছে ৫ গুণ এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বেড়েছে ৪৫ শতাংশ।

৩. ২০৬০ সালের মধ্যে ধাতব পদার্থের ব্যবহার দ্বিগুণ হয়ে ১৯০ বিলিয়ন টনে দাঁড়াবে। সেই সালে গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ বেড়ে দাঁড়াবে ৪৩ শতাংশ।

৪. পরিবহণ খাত ছাড়াও সম্পদের বহুবিধ ব্যবহারের আরেকটি বড় খাত হচ্ছে নির্মাণ খাত। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে (চাথাম হাউজ রিপোর্ট) দেখা গেছে, নির্মাণ খাতের প্রধান উপাদান সিমেন্টের উৎপাদন বায়ুমণ্ডলে ৮ শতাংশ কার্বন নিঃসরণের জন্য দায়ী। নির্মাণ উপাদান কংক্রিট এবং ইট উৎপাদনে প্রচুর শক্তির প্রয়োজন হয়। এ প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে কাঁচামাল সংগ্রহ, পরিবহণ এবং কারখানার চুল্লিগুলোকে প্রজ্বলিত রাখার জন্য ব্যবহৃত জ্বালানি।

অনেক ধনী রাষ্ট্র আফ্রিকার দরিদ্র রাষ্ট্রগুলোয় অবিরাম খনিজসম্পদ আহরণ করে যাচ্ছে, যা তার পরিবেশ ও প্রতিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করছে এবং সেই সঙ্গে সম্পদের বৈষম্য ব্যাপক মাত্রায় বাড়িয়ে তুলছে। পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ, নিকলাস হেজেলবার্গ-এর মতে, নিয়ন্ত্রণহীন খনিজসম্পদ আহরণ জলবায়ুর বিরূপ পরিবর্তন ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের জন্য প্রধানত দায়ী। বিশ্বনেতৃত্ব যদি এর প্রক্রিয়াগত সংস্কারে মনোযোগী না হয়, তাহলে এর পরিণতি আরও খারাপ হতে বাধ্য। তার মতে, এর সংস্কার অবশ্যই প্রয়োজন এবং সেটি অসম্ভব কিছু নয়। উদাহরণস্বরূপ, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে একসময় তা নিঃশেষ হয়ে যাবে। লাখ লাখ বছর ধরে তৈরি হওয়া জীবাশ্ম জ্বালানি আমরা মাত্র ১০০ বছরের মধ্যেই প্রায় নিঃশেষ করে ফেলেছি। এ বাস্তবতার নিরিখে আমাদের বায়ু ও সূর্যের আলো থেকে উৎপাদিত নবায়নযোগ্য বিকল্প জ্বালানির আবিষ্কার, উৎপাদন ও ব্যবহার বাড়াতে হবে।

সম্পদ এবং খাদ্যশস্যের সীমাহীন ভোগ ও ব্যবহার আর অপরিণামদর্শী অপচয়, অতিরিক্ত ভোগ-বিলাস এবং ভয়াবহ অস্ত্র প্রতিযোগিতা বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতির একটা ক্ষতিকর দিক। এ থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে-এ পৃথিবীতে এক বছরে উৎপাদিত খাদ্যশস্যের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হয়তো নষ্ট; কিংবা অপচয় হয়, যার পরিমাণ প্রায় ১.৩ বিলিয়ন টন। খাদ্যশস্যের এ ধ্বংস কিংবা অপচয় যদি আর্থিক মূল্যে নির্ধারণ করা হয়, তাহলে দেখা যাবে, এক বছরে ৬৮০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের খাদ্য নষ্ট হয় উন্নয়নশীল ও দরিদ্র দেশে। অথচ এ ভয়াবহ অপচয় রোধ করে লাখ লাখ দরিদ্র মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়। একই সঙ্গে হ্রাস করা যায় জলবায়ুর বিরূপ পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক সম্পদের ক্রমাগত হ্রাস পাওয়াকে।

একটি অলাভজনক সংস্থা, ‘গ্লোবাল ফুটপ্রিন্ট নেটওয়ার্ক’ প্রতিবছর আমাদের এ পৃথিবীর সঠিক ‘অভারসুট ডে’ নির্ধারণ করে থাকে। এ দিনটি তারা অঙ্ক কষে নির্ধারণ করে থাকে। প্রথমে তারা একটা বছরে ব্যবহারযোগ্য নির্ধারিত সম্পদকে মানুষের দ্বারা ভোগকৃত মোট সম্পদ দিয়ে ভাগ করে এবং সে সংখ্যাকে বছরের মোট দিনের সংখ্যা দিয়ে গুণ করা হয়। সেই হিসাবে ২০২১ সালের সেই দিনটি ছিল ২৯ জুলাই। অর্থাৎ যেই সম্পদের ব্যবহার ডিসেম্বরের শেষ দিনটি পর্যন্ত চালিয়ে নেওয়ার কথা, সেটা আমরা ২৯ জুলাইয়ে শেষ করে ফেলেছি এবং বছরের বাকি সময়টা আমরা জমাকৃত সম্পদ থেকে অতিরিক্ত ভোগ করে পৃথিবীর মোট সম্পদকে ক্রমাগত নিঃশেষ করে ফেলছি। কিন্তু আমরা যদি ডিসেম্বরের শেষ দিন পর্যন্ত সেই সম্পদ ভোগ করতে পারতাম, তাহলে সম্পদের ব্যবহারের পরিমাণ এ পৃথিবীর এক বছরের সম্পদের নবায়ন করার ক্ষমতার সমান হতো। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, ‘অভারসুট ডে’ ক্রমাগত পিছিয়ে আসছে, যা ২০২২ সালে ছিল ২৮ জুলাই।

‘অভারসুট ডে’ প্রথম ২০০৬ সাল থেকে নির্ধারণ করা শুরু হয়, যেখানে দেখা যায়, পৃথিবী ১ বছরে যে পরিমাণ সম্পদের রিনিউ বা ঘাটতি পূরণ করতে পারে, আমাদের চাহিদা তাকে ছাড়িয়ে যায়। কিন্তু অতিরিক্ত মৎস্য আহরণ, বনভূমি ধ্বংস করে ফসল উৎপাদন এবং অতিমাত্রায় কার্বন নিঃসরণের ফলে মাত্র ১ যুগের কিছু বেশি ব্যবধানে অর্থাৎ ২০২১ সালেই দেখা যায়, যেই সম্পদ ৩৬৫ দিন ব্যবহার করার কথা ছিল, সেটা আমরা মাত্র ২১২ দিনেই শেষ করে ফেলেছি। অর্থাৎ আমরা সম্পদের এমন একটি চাহিদার সৃষ্টি করেছি, যা পূরণ করতে ১.৭ গুণ পৃথিবীর প্রয়োজন। গ্লোবাল ফুটপ্রিন্ট নেটওয়ার্ক-এর মেথিস একারনাগেল ‘ইকোলজিক্যাল ফুটপ্রিন্ট’ নামে অন্য আরেকটি ধারণার প্রবক্তা। তিনি সেখানে একজন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী পরিবেশের ওপর কী প্রভাব ফেলে, তা ব্যাখ্যা করেছেন। সেটি তিনি প্রকাশ করেছেন মাথাপিছু জমির পরিমাণ দিয়ে, যেই পরিমাণ জমি একজন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারের পরিমাণকে বজায় রাখে।

মেথিস একারনাগেলের মতে, একজন ব্যক্তির সম্পদের ব্যবহারের দিকে যদি আমরা তাকাই, তাহলে আমরা দেখতে পাব যে, উচ্চ আয়ের দেশগুলো, যেমন লুক্সেমবার্গ, কাতার, অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা প্রভৃতি বছরে যে পরিমাণ সম্পদ ব্যবহার করে তা নিম্ন-আয়ের দেশ যেমন: ইরিত্রিয়া, হাইতি এবং বুরুন্ডি থেকে অনেক বেশি। সেই হিসাবে দেখা যায়, শুধু চীন এবং আমেরিকা এ গ্রহের মোট ইকোলজিক্যাল ফুটপ্রিন্ট বা সম্পদের দুই-পঞ্চমাংশ ব্যবহার করে, যাদের প্রত্যেকের অংশ রয়েছে প্রায় ২১ শতাংশ করে। উদাহরণস্বরূপ, পৃথিবীর সব মানুষ যদি জার্মানির সমমানের জীবনযাপন করত, তাহলে ৩.২টা অর্থাৎ ৩টির বেশি পৃথিবীর সম্পদের প্রয়োজন হতো। অপরদিকে পৃথিবীর সব মানুষ যদি আফ্রিকার দেশ মুজাম্বিকের সমমানের জীবনযাপন করত, তাহলে বর্তমান পৃথিবীর অর্ধেকের কম সম্পদেই বছর চলে যেত।

এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে, এ ভয়াবহ পরিস্থিতির উত্তরণ আমরা কীভাবে ঘটাতে পারি? সেই লক্ষ্যে প্রথমেই আমাদের পরিবেশবান্ধব গ্রিন ভবন নির্মাণ করতে হবে। খাদ্যের অপচয় এবং মাংস ভক্ষণ যথাসম্ভব কমিয়ে আনতে হবে। আর এভাবেই ‘অভারসুট ডে’কে আমরা কাঙ্ক্ষিত জায়গায় নিয়ে যেতে পারি। গ্লোবাল ফুটপ্রিন্ট নেটওয়ার্কের মতে, ইকোলজিক্যাল ফুটপ্রিন্টের কার্বন উপাদানকে ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনার মাধ্যমে আমরা ১.৭ গুণ পৃথিবীকে ১.২ গুণে নামিয়ে আনতে পারি। সর্বোপরি, আমাদের ভোগবিলাসে, আভিজাত্যে এবং বৈশ্বিক সম্পদ ব্যবহারে হতে হবে অধিকতর যৌক্তিক, মানবিক ও জীবনযাপনে নৈতিকতাপূর্ণ। পরিবেশবান্ধব নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনে ব্যাপক রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা বাড়াতে হবে এবং একই সঙ্গে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার ক্রমাগত কমিয়ে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে হবে। শিল্পায়ন, নগরায়ণ আর বাণিজ্য নীতি হতে হবে পরিবেশবান্ধব। নির্বিচারে বনাঞ্চল ধ্বংস বন্ধ করতে হবে। আমাদের ভোগ-বিলাসিতার অভ্যাসে পরিবর্তন আনতে হবে। একই সঙ্গে সম্পদ ও আভিজাত্যের প্রতি সীমাহীন লোভ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। আর এভাবেই আমাদের এ গ্রহটিকে চূড়ান্ত ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা যেতে পারে।

নূরে আলম সিদ্দিকী : পরিবেশবিষয়ক লেখক

পৃথিবীর সম্পদ ক্রমাগত নিঃশেষ করে ফেলছি আমরা

 নূরে আলম সিদ্দিকী 
২৮ নভেম্বর ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আমাদের এ পৃথিবীর সব সম্পদ আগে যা ধারণা করা হয়েছিল, তার চেয়ে দ্রুতগতিতে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। আমরা জানি, মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর দ্বারা প্রতিনিয়ত ব্যবহৃত বা ভোগকৃত সম্পদের শূন্যস্থান প্রাকৃতিকভাবেই পূরণ হয়। সম্পদের নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার মানে হচ্ছে, একটা নির্দিষ্ট সময়ে ব্যবহৃত ও ভোগকৃত সম্পদের পুনরুদ্ধার বা শূন্যস্থান পূরণ হয়ে আগের অবস্থানে ফিরে আসার আগেই নিঃশেষ হয়ে অতিরিক্ত চাহিদার সৃষ্টি হওয়া; অর্থাৎ পৃথিবীতে সঞ্চিত সম্পদের মধ্য থেকে সমগ্র মানবজাতি ও অন্যান্য প্রাণীরা এক বছরে যে পরিমাণ সম্পদ ভোগ বা ব্যবহার করে, সেই পরিমাণ সম্পদ যদি একই বছরে রিকভার বা পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে নতুনভাবে তৈরি হয়ে যায়, তাহলে পৃথিবীতে সম্পদের পরিমাণ সব সময় একই রকম থাকবে।

প্রাকৃতিক সম্পদকে নবায়নযোগ্য এবং অনবায়নযোগ্য এ দুই ভাগে ভাগ করা যায়। সম্পদের মূল্য নির্ধারিত হয় তার চাহিদা, সহজলভ্যতা, দুষ্প্রাপ্যতা এবং তার উৎপাদন ও আহরণ খরচের ওপর ভিত্তি করে। সম্পদের পরিমাণ এবং জোগান যতই হ্রাস পেতে থাকবে, তার চাহিদা এবং মূল্য ততই বাড়তে থাকবে।

বিভিন্নভাবে আমাদের এ পৃথিবীর সম্পদ হ্রাস পাচ্ছে। যেমন এক্যুইফার অর্থাৎ মাটি বা শিলার যে স্তর দিয়ে পানিবাহিত হতে পারে তার ক্ষয়, বনভূমি ধ্বংস, বন্যপ্রাণীর বিলুপ্তি, জীবশ্ম জ্বালানি ও অন্যান্য খনিজের ব্যাপক উত্তোলন, পানিসম্পদের ব্যাপক দূষণ ও বিষাক্তকরণ, বনভূমি জ্বালিয়ে ও ধ্বংস করে খাদ্য শস্য উৎপাদন, ভূমিধস, সম্পদের অতিমাত্রায় এবং অপ্রয়োজনীয় ভোগ ও ব্যবহার ইত্যাদি।

জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির আওতায় আন্তর্জাতিক রিসোর্স প্যানেল সর্বশেষ ‘গ্লোবাল রিসোর্স আউটলুক-২০১৯’ নামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যেখানে ভবিষ্যতে মানবজাতি কী পরিমাণ প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ করতে চায় এবং তার পরিণতি কী হতে পারে; ১৯৭০ সাল থেকে নিয়ে তার একটি পরিসংখ্যানভিত্তিক গতিপ্রকৃতি তুলে ধরা হয়েছিল। প্রতিবেদনটিতে যা তুলে ধরা হয়েছিল তা নিম্নরূপ-

১. বস্তু, জ্বালানি, খাদ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রভৃতি কর্মকাণ্ড বৈশ্বিক গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণের অর্ধেক এবং ৯০ শতাংশ জীববৈচিত্র্য ধ্বংস ও পানি দূষণের জন্য দায়ী।

২. ১৯৭০ সালের তুলনায় খনিজসম্পদ উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে ৩ গুণ, অধাতব খনিজের ব্যবহার বেড়েছে ৫ গুণ এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বেড়েছে ৪৫ শতাংশ।

৩. ২০৬০ সালের মধ্যে ধাতব পদার্থের ব্যবহার দ্বিগুণ হয়ে ১৯০ বিলিয়ন টনে দাঁড়াবে। সেই সালে গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ বেড়ে দাঁড়াবে ৪৩ শতাংশ।

৪. পরিবহণ খাত ছাড়াও সম্পদের বহুবিধ ব্যবহারের আরেকটি বড় খাত হচ্ছে নির্মাণ খাত। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে (চাথাম হাউজ রিপোর্ট) দেখা গেছে, নির্মাণ খাতের প্রধান উপাদান সিমেন্টের উৎপাদন বায়ুমণ্ডলে ৮ শতাংশ কার্বন নিঃসরণের জন্য দায়ী। নির্মাণ উপাদান কংক্রিট এবং ইট উৎপাদনে প্রচুর শক্তির প্রয়োজন হয়। এ প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে কাঁচামাল সংগ্রহ, পরিবহণ এবং কারখানার চুল্লিগুলোকে প্রজ্বলিত রাখার জন্য ব্যবহৃত জ্বালানি।

অনেক ধনী রাষ্ট্র আফ্রিকার দরিদ্র রাষ্ট্রগুলোয় অবিরাম খনিজসম্পদ আহরণ করে যাচ্ছে, যা তার পরিবেশ ও প্রতিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করছে এবং সেই সঙ্গে সম্পদের বৈষম্য ব্যাপক মাত্রায় বাড়িয়ে তুলছে। পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ, নিকলাস হেজেলবার্গ-এর মতে, নিয়ন্ত্রণহীন খনিজসম্পদ আহরণ জলবায়ুর বিরূপ পরিবর্তন ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের জন্য প্রধানত দায়ী। বিশ্বনেতৃত্ব যদি এর প্রক্রিয়াগত সংস্কারে মনোযোগী না হয়, তাহলে এর পরিণতি আরও খারাপ হতে বাধ্য। তার মতে, এর সংস্কার অবশ্যই প্রয়োজন এবং সেটি অসম্ভব কিছু নয়। উদাহরণস্বরূপ, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে একসময় তা নিঃশেষ হয়ে যাবে। লাখ লাখ বছর ধরে তৈরি হওয়া জীবাশ্ম জ্বালানি আমরা মাত্র ১০০ বছরের মধ্যেই প্রায় নিঃশেষ করে ফেলেছি। এ বাস্তবতার নিরিখে আমাদের বায়ু ও সূর্যের আলো থেকে উৎপাদিত নবায়নযোগ্য বিকল্প জ্বালানির আবিষ্কার, উৎপাদন ও ব্যবহার বাড়াতে হবে।

সম্পদ এবং খাদ্যশস্যের সীমাহীন ভোগ ও ব্যবহার আর অপরিণামদর্শী অপচয়, অতিরিক্ত ভোগ-বিলাস এবং ভয়াবহ অস্ত্র প্রতিযোগিতা বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতির একটা ক্ষতিকর দিক। এ থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে-এ পৃথিবীতে এক বছরে উৎপাদিত খাদ্যশস্যের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হয়তো নষ্ট; কিংবা অপচয় হয়, যার পরিমাণ প্রায় ১.৩ বিলিয়ন টন। খাদ্যশস্যের এ ধ্বংস কিংবা অপচয় যদি আর্থিক মূল্যে নির্ধারণ করা হয়, তাহলে দেখা যাবে, এক বছরে ৬৮০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের খাদ্য নষ্ট হয় উন্নয়নশীল ও দরিদ্র দেশে। অথচ এ ভয়াবহ অপচয় রোধ করে লাখ লাখ দরিদ্র মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়। একই সঙ্গে হ্রাস করা যায় জলবায়ুর বিরূপ পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক সম্পদের ক্রমাগত হ্রাস পাওয়াকে।

একটি অলাভজনক সংস্থা, ‘গ্লোবাল ফুটপ্রিন্ট নেটওয়ার্ক’ প্রতিবছর আমাদের এ পৃথিবীর সঠিক ‘অভারসুট ডে’ নির্ধারণ করে থাকে। এ দিনটি তারা অঙ্ক কষে নির্ধারণ করে থাকে। প্রথমে তারা একটা বছরে ব্যবহারযোগ্য নির্ধারিত সম্পদকে মানুষের দ্বারা ভোগকৃত মোট সম্পদ দিয়ে ভাগ করে এবং সে সংখ্যাকে বছরের মোট দিনের সংখ্যা দিয়ে গুণ করা হয়। সেই হিসাবে ২০২১ সালের সেই দিনটি ছিল ২৯ জুলাই। অর্থাৎ যেই সম্পদের ব্যবহার ডিসেম্বরের শেষ দিনটি পর্যন্ত চালিয়ে নেওয়ার কথা, সেটা আমরা ২৯ জুলাইয়ে শেষ করে ফেলেছি এবং বছরের বাকি সময়টা আমরা জমাকৃত সম্পদ থেকে অতিরিক্ত ভোগ করে পৃথিবীর মোট সম্পদকে ক্রমাগত নিঃশেষ করে ফেলছি। কিন্তু আমরা যদি ডিসেম্বরের শেষ দিন পর্যন্ত সেই সম্পদ ভোগ করতে পারতাম, তাহলে সম্পদের ব্যবহারের পরিমাণ এ পৃথিবীর এক বছরের সম্পদের নবায়ন করার ক্ষমতার সমান হতো। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, ‘অভারসুট ডে’ ক্রমাগত পিছিয়ে আসছে, যা ২০২২ সালে ছিল ২৮ জুলাই।

‘অভারসুট ডে’ প্রথম ২০০৬ সাল থেকে নির্ধারণ করা শুরু হয়, যেখানে দেখা যায়, পৃথিবী ১ বছরে যে পরিমাণ সম্পদের রিনিউ বা ঘাটতি পূরণ করতে পারে, আমাদের চাহিদা তাকে ছাড়িয়ে যায়। কিন্তু অতিরিক্ত মৎস্য আহরণ, বনভূমি ধ্বংস করে ফসল উৎপাদন এবং অতিমাত্রায় কার্বন নিঃসরণের ফলে মাত্র ১ যুগের কিছু বেশি ব্যবধানে অর্থাৎ ২০২১ সালেই দেখা যায়, যেই সম্পদ ৩৬৫ দিন ব্যবহার করার কথা ছিল, সেটা আমরা মাত্র ২১২ দিনেই শেষ করে ফেলেছি। অর্থাৎ আমরা সম্পদের এমন একটি চাহিদার সৃষ্টি করেছি, যা পূরণ করতে ১.৭ গুণ পৃথিবীর প্রয়োজন। গ্লোবাল ফুটপ্রিন্ট নেটওয়ার্ক-এর মেথিস একারনাগেল ‘ইকোলজিক্যাল ফুটপ্রিন্ট’ নামে অন্য আরেকটি ধারণার প্রবক্তা। তিনি সেখানে একজন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী পরিবেশের ওপর কী প্রভাব ফেলে, তা ব্যাখ্যা করেছেন। সেটি তিনি প্রকাশ করেছেন মাথাপিছু জমির পরিমাণ দিয়ে, যেই পরিমাণ জমি একজন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারের পরিমাণকে বজায় রাখে।

মেথিস একারনাগেলের মতে, একজন ব্যক্তির সম্পদের ব্যবহারের দিকে যদি আমরা তাকাই, তাহলে আমরা দেখতে পাব যে, উচ্চ আয়ের দেশগুলো, যেমন লুক্সেমবার্গ, কাতার, অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা প্রভৃতি বছরে যে পরিমাণ সম্পদ ব্যবহার করে তা নিম্ন-আয়ের দেশ যেমন: ইরিত্রিয়া, হাইতি এবং বুরুন্ডি থেকে অনেক বেশি। সেই হিসাবে দেখা যায়, শুধু চীন এবং আমেরিকা এ গ্রহের মোট ইকোলজিক্যাল ফুটপ্রিন্ট বা সম্পদের দুই-পঞ্চমাংশ ব্যবহার করে, যাদের প্রত্যেকের অংশ রয়েছে প্রায় ২১ শতাংশ করে। উদাহরণস্বরূপ, পৃথিবীর সব মানুষ যদি জার্মানির সমমানের জীবনযাপন করত, তাহলে ৩.২টা অর্থাৎ ৩টির বেশি পৃথিবীর সম্পদের প্রয়োজন হতো। অপরদিকে পৃথিবীর সব মানুষ যদি আফ্রিকার দেশ মুজাম্বিকের সমমানের জীবনযাপন করত, তাহলে বর্তমান পৃথিবীর অর্ধেকের কম সম্পদেই বছর চলে যেত।

এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে, এ ভয়াবহ পরিস্থিতির উত্তরণ আমরা কীভাবে ঘটাতে পারি? সেই লক্ষ্যে প্রথমেই আমাদের পরিবেশবান্ধব গ্রিন ভবন নির্মাণ করতে হবে। খাদ্যের অপচয় এবং মাংস ভক্ষণ যথাসম্ভব কমিয়ে আনতে হবে। আর এভাবেই ‘অভারসুট ডে’কে আমরা কাঙ্ক্ষিত জায়গায় নিয়ে যেতে পারি। গ্লোবাল ফুটপ্রিন্ট নেটওয়ার্কের মতে, ইকোলজিক্যাল ফুটপ্রিন্টের কার্বন উপাদানকে ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনার মাধ্যমে আমরা ১.৭ গুণ পৃথিবীকে ১.২ গুণে নামিয়ে আনতে পারি। সর্বোপরি, আমাদের ভোগবিলাসে, আভিজাত্যে এবং বৈশ্বিক সম্পদ ব্যবহারে হতে হবে অধিকতর যৌক্তিক, মানবিক ও জীবনযাপনে নৈতিকতাপূর্ণ। পরিবেশবান্ধব নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনে ব্যাপক রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা বাড়াতে হবে এবং একই সঙ্গে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার ক্রমাগত কমিয়ে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে হবে। শিল্পায়ন, নগরায়ণ আর বাণিজ্য নীতি হতে হবে পরিবেশবান্ধব। নির্বিচারে বনাঞ্চল ধ্বংস বন্ধ করতে হবে। আমাদের ভোগ-বিলাসিতার অভ্যাসে পরিবর্তন আনতে হবে। একই সঙ্গে সম্পদ ও আভিজাত্যের প্রতি সীমাহীন লোভ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। আর এভাবেই আমাদের এ গ্রহটিকে চূড়ান্ত ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা যেতে পারে।

নূরে আলম সিদ্দিকী : পরিবেশবিষয়ক লেখক

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন