আয়কর আহরণে চাই টেকসই উদ্যোগ
jugantor
আয়কর আহরণে চাই টেকসই উদ্যোগ

  মোহাম্মদ আবদুল মজিদ  

২৯ নভেম্বর ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

প্রাচীনকাল থেকে ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের মাধমে স্বাধীন-সার্বভৌমত্ব লাভের পূর্বপর্যন্ত অধিকাংশ সময় বিদেশি শাসনের অধীনে থাকা আমাদের এ দেশ ও সমাজে খাজনা বা নজরানা সংগ্রহ কার্যক্রমে জোরজবরদস্তি বা বাধ্য করা অর্থে, পাওনা উদ্ধার অর্থে ‘আদায়’ শব্দটি ব্যবহার হয়ে এসেছে। ১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিশ চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তনের মাধ্যমে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্তৃক অধিগ্রহণকৃত এ দেশীয় ভূমির মালিকানা সূত্রে খাজনা সংগ্রহের দায়িত্ব জমিদার শ্রেণির কাছে অর্পিত হয়।

জমিদাররা জমির প্রকৃত মালিক ছিল না, তারা জমির চাষবাসেও ছিল না, তারা কোম্পানির হয়ে খাজনা সংগ্রাহক ছিল মাত্র। এ সংগ্রহ কাজে কোম্পানিকে দেয় পরিশোধের পর উদ্বৃত্ত কমিশন হিসাবে প্রাপ্তির প্রত্যাশী ছিল মধ্যস্বত্বভোগী এ সিন্ডিকেট। ফলে রায়তের সঙ্গে খাজনা সংগ্রহ কর্মে তাদের সম্পর্ক শেষমেশ জুলুম বা জোরজবরদস্তির পর্যায়ে পৌঁছাত। জমিতে ফসল হলো কি না, রায়ত চাষবাস করে টিকে থাকতে পারবে বা পারছে কি না, এটি জমিদারদের বিবেচনার বিষয় ছিল না। আর কোম্পানি বিষয়টি অবশ্যই দেখে বা জেনেও না জানার ভান করত, কেননা তারা তুষ্ট থাকত রাজস্ব পেয়ে, প্রজার সুযোগ-সুবিধা দেখার বিষয়টি তারা আমলে নিতে প্রস্তুত ছিল না। খাজনা সংগ্রহের ক্ষেত্রে আদায় শব্দটি সেভাবে একটা জোর-জুলুম, অত্যাচার, আত্মসাতের প্রতিভূ হিসাবে বিদ্যমান হয়ে দাঁড়ায়। একটি স্বাধীন-সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী দেশে ও পরিবেশে রাষ্ট্রকে দেয় ‘আদায়ের’ ঔপনিবেশিক আমলের এসব মানসিকতা অব্যাহত থাকা যুক্তিগ্রাহ্য হতে পারে না।

নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র কর্তৃক আইনের আওতায় করারোপ আর রাষ্ট্রকে সেই কর পরিশোধের বিষয়টি এ নিরিখে বিচার করলে দেখা যায়, আদায় শব্দটা ততটা জুতসই নয়, যতটা ভূমি কর বা খাজনার ক্ষেত্রে খাটে। আয়করের দর্শন হলো রাষ্ট্রের মধ্যে বসবাস করে নির্ধারিত পরিমাণের বেশি আয় বা সম্পদ অর্জিত হলে রাষ্ট্র তার একটি নির্দিষ্ট অংশ ‘সমাজে সম্পদের বণ্টনব্যবস্থায় সমতা বিধান এবং আয় উপার্জনের পরিবেশ সৃষ্টি তথা অবকাঠামো নির্মাণ বাবদ আয়-উপার্জনের পরিমাণ ভেদে একটা হিস্যা’ হিসাবে, প্রাপ্য হিসাবে চাইতে পারে। ভূমি করের ক্ষেত্রে আগে রাষ্ট্র ভূমি বরাদ্দ দেয় এবং এর ভিত্তিতে খাজনা দাবি করে। এখানে লেনদেন প্রকাশ্য। সুতরাং দাবি বা আদায়ের যৌক্তিকতা সেভাবে আসে। কিন্তু আয়করের ক্ষেত্রে লেনদেন অপ্রকাশ্য। রাষ্ট্র সৃজিত সুযোগ-সুবিধা সবাই ভোগ করলেও সবাই আয় বা সম্পদ অর্জন করতে পারে না। নিজের মেধা, বুদ্ধি, পরিশ্রম প্রয়োগ করে সম্পদ অর্জন করতে হয়। অতএব সেই আয়ের ওপর রাষ্ট্রের যে দাবি, তা নাগরিক দায়িত্ব পালনের অংশ হিসাবে প্রদেয়। এখানে রাষ্ট্রের পক্ষে তা ‘আদায়ের’ যৌক্তিকতা অনেকটাই গৌণ।

আয়কর দেওয়ার মতো আয় যে নাগরিকের আছে, তিনি রাষ্ট্রকে দেয় কর পরিশোধ করবেন স্বেচ্ছায়, আইনগত বাধ্যবাধকতা পালন করে, নাগরিক দায়িত্ব পালনের অংশ হিসাবে। তবে হ্যাঁ, যদি তিনি তা পরিশোধে গড়িমসি করেন, এড়িয়ে চলেন, অসাধু পন্থা অবলম্বন করেন, তাহলে আইনের আওতায় রাষ্ট্রের প্রাপ্য উদ্ধারে রাষ্ট্র প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে। কারণ কেউ কর ফাঁকি দিলে তা উদ্ধারে ব্যর্থতার দায়ভার আহরণকারীর এজন্য যে, তাদের এ অপারগতায় সমাজে ন্যায়-অন্যায়, বৈধ-অবৈধ, অসম অবস্থানে চলে যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে, রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে তো বটেই, সমাজে সম্পদের বণ্টনে বৈষম্য সৃষ্টি হতে পারে। এর ফলে সমাজ ও অর্থনীতিতে ভারসাম্য বিনষ্ট হতে পারে। এ নিরিখেই সব করদাতার সঙ্গে ‘আদায়জনিত’ মনোভাব পোষণ বা ক্ষমতার প্রয়োগ বা সে ধরনের পরিবেশ সৃষ্টি যুক্তিযুক্ত হতে পারে না।

সীমারেখা মেনে চলা জরুরি এজন্য যে, তা না হলে করারোপ, আহরণ, প্রদান ও পরিশোধের ক্ষেত্রে ভিন্ন বা নেতিবাচক পরিস্থিতি উদ্ভব হতে পারে, করারোপ ও আহরণকারীর সঙ্গে করদাতার সম্পর্কের মধ্যে অবিশ্বাস, সংশয় ও সন্দেহ দানা বাঁধতে পারে, আস্থায় চিড় ধরতে পারে। পরস্পরকে এড়িয়ে চলার, জোরজবরদস্তির, পক্ষপাতিত্বের, আঁতাতের মতো অনেক কিছুই ঘটতে পারে। স্বচ্ছতার স্থলে অস্বচ্ছতার অনুপ্রবেশে কর আহরণের মতো রাজস্ব আয়ের দেহে সিস্টেম লস বা ইনফরমাল রেভিনিউরূপী ‘সুগারের’ মাত্রা বেড়ে অর্থনীতি ‘ডায়াবেটিসে’ আক্রান্ত হতে পারে; ‘সাইলেন্ট কিলার’ নামে পরিচিত যে রোগটি মানবদেহে বহু ব্যাধির কারণ।

এদেশে আয়কর আইন প্রবর্তন হওয়ার সমসাময়িক প্রেক্ষাপট পর্যালোচনায় দেখা যায়, একটা ঔপনিবেশিক সরকার এর প্রবর্তক আর কর সংগ্রহ (‘collection of taxes’ আইনের ভাষ্যে শব্দটি এভাবেই আছে) কার্যক্রমটি সে সময়কার ‘আদায়’ মানসিকতা দ্বারা শাসিত। শাসক আর শাসিতের মধ্যে করারোপের আর আদায়ের প্রসঙ্গটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের পারস্পরিক দায়িত্ব পালনের দর্শনের ভিত্তি রচনার পরিবর্তে রাজা, প্রজা, প্রভু, ভৃত্য, বিদেশি বেনিয়া আর দেশীয় (native) প্রতিপক্ষসুলভ। এ পরিবেশেই কর বা রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার, সংশয়-সন্দেহের, জোরজবরদস্তির কিংবা পাকড়াওকরণের চিন্তাচেতনায় Collection of tax (or revenue) হয়ে ওঠে আদায় করার বিষয়। রাজস্ব আহরণকারীর মনোভঙ্গি আইনের দৃষ্টিভঙ্গিসঞ্জাত ‘আদায়কারী’ প্রভু হিসাবে প্রতিভাত হয়। রাজস্ব বিভাগের কর্মীরা সামাজিকভাবে সে পরিচয় পেয়ে যান এবং তাদের এড়িয়ে চলার সুকৌশল বাতাবরণ তৈরির জন্য নানা পেশাদারত্বের উদ্ভব ঘটে সেভাবেই।

রাজস্ব প্রশাসনে কর ‘আদায়’ শব্দটিকে জোরজবরদস্তি ও জুলুম (extortion), দখল, আত্মসাৎ, ফাঁকি, (evade), সংশয়, সন্দেহের বৃত্ত থেকে বের করে এনে ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটিয়ে তাকে স্বচ্ছ, সুশোভন, পারস্পরিক উপলব্ধির মাধ্যমে স্বেচ্ছাপ্রণোদানের ঘাটে ভেড়ানোর জন্য ‘আদায়ের’ পরিবর্তে ‘আহরণে’ (collection of tax or revenue) পরিণত করা এবং এটি যাতে শুধু শব্দের প্রয়োগ পরিবর্তন না হয়, এটি মনমানসিকতায়ও যাতে স্থায়ীভাবে স্থান পায়, তার জন্য আইনের চোখের সংস্কার ও পদ্ধতি প্রক্রিয়ার চিকিৎসার উদ্যোগ আরও জোরদার হওয়া প্রয়োজন। চলমান প্রয়াস-প্রচেষ্টা আরও জোরদার হোক, এটাই প্রত্যাশা ও প্রার্থনা।

সরকারের বিভিন্ন খাত বা ক্ষেত্রের বিশ্লেষণে বলা যায়-রাজস্ব, বিশেষ করে আয়কর আহরণে অগ্রগতি অব্যাহত আছে। আয়কর প্রদানে উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচি তথা করদাতাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টিতে পদ্ধতি প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনার প্রয়াসের ফসল থেকে এ সাফল্য আসছে। এ সাফল্য ধরে রাখতে হবে অর্থনীতিতে কর জিডিপির অনুপাত ন্যায্য পর্যায়ে না পৌঁছানো পর্যন্ত। কাক্সিক্ষত পরিমাণ আয়কর আহরণ সরকারের রাজস্ব তহবিলের স্ফীতির জন্য নয় শুধু, সম্পদ বণ্টনব্যবস্থা সুষমকরণের দ্বারা সামাজিক সুবিচার সুনিশ্চিতকরণে, ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও অঞ্চলগত উন্নয়ন বৈষম্য দূরীকরণের জন্যও জরুরি। দেশকে স্বয়ম্ভর করতে এবং পরনির্ভরতার নিগড় থেকে বের করে আনতে আয়কর অন্যতম প্রভাবক ভূমিকা পালন করবে। আয়কর বিভাগের প্রতিটি প্রয়াসে তাই থাকা চাই বুদ্ধি ও প্রজ্ঞার সম্মিলন, আত্মবিশ্বাস, পদ্ধতি সহজীকরণ এবং করদাতার আস্থা অর্জনের অয়োময় প্রত্যয়।

নতুন নতুন উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি পুরোনো উদ্যোগের ফলোআপ আবশ্যক। ২০০৬-০৭ সালে এবং বছর কয়েক আগে জমকালো জরিপের মাধ্যমে যে লক্ষাধিক করদাতা শামিল হয়েছিলেন, করদাতার মিছিলে তারা কি আছেন? ২০০৭-০৮ কিংবা ২০০৮-০৯ সালে যারা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে করদাতা হয়েছিলেন, তাদের খবর কী? দেশে যে প্রায় নয় লক্ষাধিক ক্রেডিট কার্ডধারী আছেন, আছেন প্রায় সমসংখ্যক গাড়ি-বাড়ির মালিক, তাদের কাছে যাওয়ার সর্বশেষ অবস্থা কী? ইটিআইএন ব্যবহারকারীরা যাতে আয়কর রিটার্ন দাখিল করেন, তাদের করজালের মধ্যে আনার প্রতিবন্ধকতাগুলোর দিকে নজর দেওয়ার সময় ফুরিয়ে যায়নি। আয়কর দাতা যাতে নিজেই রিটার্ন ফরম পূরণ করতে পারেন, সে ব্যাপারে যে সহায়ক নির্দেশিকা প্রকাশিত হয়েছিল, প্রচারিত হয়েছিল সিটিজেন চার্টার, তা কি গণঅবহিতকরণের অবয়বেই আছে এখনো? আগেও যেসব কর তথ্যকেন্দ্র, সেবাকেন্দ্র খোলা হয়েছিল প্রকল্পের প্রেরণায়, সেগুলোর কার্যকারিতা থেমে গেছে কি না তা দেখার অবকাশ রয়েছে। একই কার্যক্রম বারবার ‘নতুন’ করে চালু করা হলে ভিন্ন বার্তা পৌঁছাতে পারে টার্গেট গ্রুপের কাছে।

প্রতিবছর কর মেলায় মানুষের উপচে পড়া ভিড় প্রমাণ করে করদাতাদের আগ্রহ বাড়ছে, অনেকেই ঝামেলামুক্ত উপায়ে বা পরিবেশে কর দিতে চান, কর দেওয়াকে দায়িত্ব মনে করছেন। তাদের এ আগ্রহকে ধরে রাখতে হবে, তাদের দায়িত্ববোধের প্রতি সম্মান দেখাতে হবে, তাদের আগ্রহকে সমীহ করতে হবে। করদাতাদের উদ্বুদ্ধকরণে প্রচার-প্রচারণার কাজে আগে তেমন কোনো বরাদ্দ ছিল না, কর আহরণের ব্যাপারে অতীতে বর্তমানের মতো সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারক থেকে বিশেষ প্রয়াসের নজির ছিল না। এখন এসব সুযোগকে যথাযথভাবে কাজে লাগানোর কোনো বিকল্প নেই। তবে সেই ১৯৯০ সাল থেকে এযাবৎ ৭/৮টি প্রকল্প (বিদেশি সাহায্যপুষ্ট, বিদেশি বিশেষজ্ঞের ভারে ন্যুব্জ) বাস্তবায়ন করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড শুধু অটোমেশন, অনলাইনিং, সিট্রমলাইনিং, স্ট্রেনদেনিংয়ের জন্য। বত্রিশ বছরে সেসব প্রকল্প বাস্তবায়নের দ্বারা অর্জিত অগ্রগতি দৃশ্যগোচর না হোক, অন্তত অনুভব সম্ভব হবে যদি দেখা যায় সবার মাইন্ডসেট ও কর্মকুশলতায় গুণগত পরিবর্তন এসেছে।

তবে এটাও ঠিক, বর্তমানে যে অব্যাহত অগ্রগতি, তার পেছনে সেই সব প্রয়াসের প্রচ্ছন্ন উপস্থিতি এবং তা নেপথ্য প্রেরণা হিসাবে যে কাজ করছে, তা অনস্বীকার্য। একই সঙ্গে সম্মানিত করদাতাদের সার্বিক সহযোগিতা, তাদের অভূতপূর্ব দায়িত্ববোধ এবং জটিল কর আইনগুলো সহজীকরণের প্রতি তাদের প্রত্যাশাকে সাধুবাদ জানাতে হয়।

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ : সাবেক সচিব, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান

আয়কর আহরণে চাই টেকসই উদ্যোগ

 মোহাম্মদ আবদুল মজিদ 
২৯ নভেম্বর ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

প্রাচীনকাল থেকে ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের মাধমে স্বাধীন-সার্বভৌমত্ব লাভের পূর্বপর্যন্ত অধিকাংশ সময় বিদেশি শাসনের অধীনে থাকা আমাদের এ দেশ ও সমাজে খাজনা বা নজরানা সংগ্রহ কার্যক্রমে জোরজবরদস্তি বা বাধ্য করা অর্থে, পাওনা উদ্ধার অর্থে ‘আদায়’ শব্দটি ব্যবহার হয়ে এসেছে। ১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিশ চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তনের মাধ্যমে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্তৃক অধিগ্রহণকৃত এ দেশীয় ভূমির মালিকানা সূত্রে খাজনা সংগ্রহের দায়িত্ব জমিদার শ্রেণির কাছে অর্পিত হয়।

জমিদাররা জমির প্রকৃত মালিক ছিল না, তারা জমির চাষবাসেও ছিল না, তারা কোম্পানির হয়ে খাজনা সংগ্রাহক ছিল মাত্র। এ সংগ্রহ কাজে কোম্পানিকে দেয় পরিশোধের পর উদ্বৃত্ত কমিশন হিসাবে প্রাপ্তির প্রত্যাশী ছিল মধ্যস্বত্বভোগী এ সিন্ডিকেট। ফলে রায়তের সঙ্গে খাজনা সংগ্রহ কর্মে তাদের সম্পর্ক শেষমেশ জুলুম বা জোরজবরদস্তির পর্যায়ে পৌঁছাত। জমিতে ফসল হলো কি না, রায়ত চাষবাস করে টিকে থাকতে পারবে বা পারছে কি না, এটি জমিদারদের বিবেচনার বিষয় ছিল না। আর কোম্পানি বিষয়টি অবশ্যই দেখে বা জেনেও না জানার ভান করত, কেননা তারা তুষ্ট থাকত রাজস্ব পেয়ে, প্রজার সুযোগ-সুবিধা দেখার বিষয়টি তারা আমলে নিতে প্রস্তুত ছিল না। খাজনা সংগ্রহের ক্ষেত্রে আদায় শব্দটি সেভাবে একটা জোর-জুলুম, অত্যাচার, আত্মসাতের প্রতিভূ হিসাবে বিদ্যমান হয়ে দাঁড়ায়। একটি স্বাধীন-সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী দেশে ও পরিবেশে রাষ্ট্রকে দেয় ‘আদায়ের’ ঔপনিবেশিক আমলের এসব মানসিকতা অব্যাহত থাকা যুক্তিগ্রাহ্য হতে পারে না।

নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র কর্তৃক আইনের আওতায় করারোপ আর রাষ্ট্রকে সেই কর পরিশোধের বিষয়টি এ নিরিখে বিচার করলে দেখা যায়, আদায় শব্দটা ততটা জুতসই নয়, যতটা ভূমি কর বা খাজনার ক্ষেত্রে খাটে। আয়করের দর্শন হলো রাষ্ট্রের মধ্যে বসবাস করে নির্ধারিত পরিমাণের বেশি আয় বা সম্পদ অর্জিত হলে রাষ্ট্র তার একটি নির্দিষ্ট অংশ ‘সমাজে সম্পদের বণ্টনব্যবস্থায় সমতা বিধান এবং আয় উপার্জনের পরিবেশ সৃষ্টি তথা অবকাঠামো নির্মাণ বাবদ আয়-উপার্জনের পরিমাণ ভেদে একটা হিস্যা’ হিসাবে, প্রাপ্য হিসাবে চাইতে পারে। ভূমি করের ক্ষেত্রে আগে রাষ্ট্র ভূমি বরাদ্দ দেয় এবং এর ভিত্তিতে খাজনা দাবি করে। এখানে লেনদেন প্রকাশ্য। সুতরাং দাবি বা আদায়ের যৌক্তিকতা সেভাবে আসে। কিন্তু আয়করের ক্ষেত্রে লেনদেন অপ্রকাশ্য। রাষ্ট্র সৃজিত সুযোগ-সুবিধা সবাই ভোগ করলেও সবাই আয় বা সম্পদ অর্জন করতে পারে না। নিজের মেধা, বুদ্ধি, পরিশ্রম প্রয়োগ করে সম্পদ অর্জন করতে হয়। অতএব সেই আয়ের ওপর রাষ্ট্রের যে দাবি, তা নাগরিক দায়িত্ব পালনের অংশ হিসাবে প্রদেয়। এখানে রাষ্ট্রের পক্ষে তা ‘আদায়ের’ যৌক্তিকতা অনেকটাই গৌণ।

আয়কর দেওয়ার মতো আয় যে নাগরিকের আছে, তিনি রাষ্ট্রকে দেয় কর পরিশোধ করবেন স্বেচ্ছায়, আইনগত বাধ্যবাধকতা পালন করে, নাগরিক দায়িত্ব পালনের অংশ হিসাবে। তবে হ্যাঁ, যদি তিনি তা পরিশোধে গড়িমসি করেন, এড়িয়ে চলেন, অসাধু পন্থা অবলম্বন করেন, তাহলে আইনের আওতায় রাষ্ট্রের প্রাপ্য উদ্ধারে রাষ্ট্র প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে। কারণ কেউ কর ফাঁকি দিলে তা উদ্ধারে ব্যর্থতার দায়ভার আহরণকারীর এজন্য যে, তাদের এ অপারগতায় সমাজে ন্যায়-অন্যায়, বৈধ-অবৈধ, অসম অবস্থানে চলে যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে, রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে তো বটেই, সমাজে সম্পদের বণ্টনে বৈষম্য সৃষ্টি হতে পারে। এর ফলে সমাজ ও অর্থনীতিতে ভারসাম্য বিনষ্ট হতে পারে। এ নিরিখেই সব করদাতার সঙ্গে ‘আদায়জনিত’ মনোভাব পোষণ বা ক্ষমতার প্রয়োগ বা সে ধরনের পরিবেশ সৃষ্টি যুক্তিযুক্ত হতে পারে না।

সীমারেখা মেনে চলা জরুরি এজন্য যে, তা না হলে করারোপ, আহরণ, প্রদান ও পরিশোধের ক্ষেত্রে ভিন্ন বা নেতিবাচক পরিস্থিতি উদ্ভব হতে পারে, করারোপ ও আহরণকারীর সঙ্গে করদাতার সম্পর্কের মধ্যে অবিশ্বাস, সংশয় ও সন্দেহ দানা বাঁধতে পারে, আস্থায় চিড় ধরতে পারে। পরস্পরকে এড়িয়ে চলার, জোরজবরদস্তির, পক্ষপাতিত্বের, আঁতাতের মতো অনেক কিছুই ঘটতে পারে। স্বচ্ছতার স্থলে অস্বচ্ছতার অনুপ্রবেশে কর আহরণের মতো রাজস্ব আয়ের দেহে সিস্টেম লস বা ইনফরমাল রেভিনিউরূপী ‘সুগারের’ মাত্রা বেড়ে অর্থনীতি ‘ডায়াবেটিসে’ আক্রান্ত হতে পারে; ‘সাইলেন্ট কিলার’ নামে পরিচিত যে রোগটি মানবদেহে বহু ব্যাধির কারণ।

এদেশে আয়কর আইন প্রবর্তন হওয়ার সমসাময়িক প্রেক্ষাপট পর্যালোচনায় দেখা যায়, একটা ঔপনিবেশিক সরকার এর প্রবর্তক আর কর সংগ্রহ (‘collection of taxes’ আইনের ভাষ্যে শব্দটি এভাবেই আছে) কার্যক্রমটি সে সময়কার ‘আদায়’ মানসিকতা দ্বারা শাসিত। শাসক আর শাসিতের মধ্যে করারোপের আর আদায়ের প্রসঙ্গটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের পারস্পরিক দায়িত্ব পালনের দর্শনের ভিত্তি রচনার পরিবর্তে রাজা, প্রজা, প্রভু, ভৃত্য, বিদেশি বেনিয়া আর দেশীয় (native) প্রতিপক্ষসুলভ। এ পরিবেশেই কর বা রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার, সংশয়-সন্দেহের, জোরজবরদস্তির কিংবা পাকড়াওকরণের চিন্তাচেতনায় Collection of tax (or revenue) হয়ে ওঠে আদায় করার বিষয়। রাজস্ব আহরণকারীর মনোভঙ্গি আইনের দৃষ্টিভঙ্গিসঞ্জাত ‘আদায়কারী’ প্রভু হিসাবে প্রতিভাত হয়। রাজস্ব বিভাগের কর্মীরা সামাজিকভাবে সে পরিচয় পেয়ে যান এবং তাদের এড়িয়ে চলার সুকৌশল বাতাবরণ তৈরির জন্য নানা পেশাদারত্বের উদ্ভব ঘটে সেভাবেই।

রাজস্ব প্রশাসনে কর ‘আদায়’ শব্দটিকে জোরজবরদস্তি ও জুলুম (extortion), দখল, আত্মসাৎ, ফাঁকি, (evade), সংশয়, সন্দেহের বৃত্ত থেকে বের করে এনে ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটিয়ে তাকে স্বচ্ছ, সুশোভন, পারস্পরিক উপলব্ধির মাধ্যমে স্বেচ্ছাপ্রণোদানের ঘাটে ভেড়ানোর জন্য ‘আদায়ের’ পরিবর্তে ‘আহরণে’ (collection of tax or revenue) পরিণত করা এবং এটি যাতে শুধু শব্দের প্রয়োগ পরিবর্তন না হয়, এটি মনমানসিকতায়ও যাতে স্থায়ীভাবে স্থান পায়, তার জন্য আইনের চোখের সংস্কার ও পদ্ধতি প্রক্রিয়ার চিকিৎসার উদ্যোগ আরও জোরদার হওয়া প্রয়োজন। চলমান প্রয়াস-প্রচেষ্টা আরও জোরদার হোক, এটাই প্রত্যাশা ও প্রার্থনা।

সরকারের বিভিন্ন খাত বা ক্ষেত্রের বিশ্লেষণে বলা যায়-রাজস্ব, বিশেষ করে আয়কর আহরণে অগ্রগতি অব্যাহত আছে। আয়কর প্রদানে উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচি তথা করদাতাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টিতে পদ্ধতি প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনার প্রয়াসের ফসল থেকে এ সাফল্য আসছে। এ সাফল্য ধরে রাখতে হবে অর্থনীতিতে কর জিডিপির অনুপাত ন্যায্য পর্যায়ে না পৌঁছানো পর্যন্ত। কাক্সিক্ষত পরিমাণ আয়কর আহরণ সরকারের রাজস্ব তহবিলের স্ফীতির জন্য নয় শুধু, সম্পদ বণ্টনব্যবস্থা সুষমকরণের দ্বারা সামাজিক সুবিচার সুনিশ্চিতকরণে, ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও অঞ্চলগত উন্নয়ন বৈষম্য দূরীকরণের জন্যও জরুরি। দেশকে স্বয়ম্ভর করতে এবং পরনির্ভরতার নিগড় থেকে বের করে আনতে আয়কর অন্যতম প্রভাবক ভূমিকা পালন করবে। আয়কর বিভাগের প্রতিটি প্রয়াসে তাই থাকা চাই বুদ্ধি ও প্রজ্ঞার সম্মিলন, আত্মবিশ্বাস, পদ্ধতি সহজীকরণ এবং করদাতার আস্থা অর্জনের অয়োময় প্রত্যয়।

নতুন নতুন উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি পুরোনো উদ্যোগের ফলোআপ আবশ্যক। ২০০৬-০৭ সালে এবং বছর কয়েক আগে জমকালো জরিপের মাধ্যমে যে লক্ষাধিক করদাতা শামিল হয়েছিলেন, করদাতার মিছিলে তারা কি আছেন? ২০০৭-০৮ কিংবা ২০০৮-০৯ সালে যারা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে করদাতা হয়েছিলেন, তাদের খবর কী? দেশে যে প্রায় নয় লক্ষাধিক ক্রেডিট কার্ডধারী আছেন, আছেন প্রায় সমসংখ্যক গাড়ি-বাড়ির মালিক, তাদের কাছে যাওয়ার সর্বশেষ অবস্থা কী? ইটিআইএন ব্যবহারকারীরা যাতে আয়কর রিটার্ন দাখিল করেন, তাদের করজালের মধ্যে আনার প্রতিবন্ধকতাগুলোর দিকে নজর দেওয়ার সময় ফুরিয়ে যায়নি। আয়কর দাতা যাতে নিজেই রিটার্ন ফরম পূরণ করতে পারেন, সে ব্যাপারে যে সহায়ক নির্দেশিকা প্রকাশিত হয়েছিল, প্রচারিত হয়েছিল সিটিজেন চার্টার, তা কি গণঅবহিতকরণের অবয়বেই আছে এখনো? আগেও যেসব কর তথ্যকেন্দ্র, সেবাকেন্দ্র খোলা হয়েছিল প্রকল্পের প্রেরণায়, সেগুলোর কার্যকারিতা থেমে গেছে কি না তা দেখার অবকাশ রয়েছে। একই কার্যক্রম বারবার ‘নতুন’ করে চালু করা হলে ভিন্ন বার্তা পৌঁছাতে পারে টার্গেট গ্রুপের কাছে।

প্রতিবছর কর মেলায় মানুষের উপচে পড়া ভিড় প্রমাণ করে করদাতাদের আগ্রহ বাড়ছে, অনেকেই ঝামেলামুক্ত উপায়ে বা পরিবেশে কর দিতে চান, কর দেওয়াকে দায়িত্ব মনে করছেন। তাদের এ আগ্রহকে ধরে রাখতে হবে, তাদের দায়িত্ববোধের প্রতি সম্মান দেখাতে হবে, তাদের আগ্রহকে সমীহ করতে হবে। করদাতাদের উদ্বুদ্ধকরণে প্রচার-প্রচারণার কাজে আগে তেমন কোনো বরাদ্দ ছিল না, কর আহরণের ব্যাপারে অতীতে বর্তমানের মতো সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারক থেকে বিশেষ প্রয়াসের নজির ছিল না। এখন এসব সুযোগকে যথাযথভাবে কাজে লাগানোর কোনো বিকল্প নেই। তবে সেই ১৯৯০ সাল থেকে এযাবৎ ৭/৮টি প্রকল্প (বিদেশি সাহায্যপুষ্ট, বিদেশি বিশেষজ্ঞের ভারে ন্যুব্জ) বাস্তবায়ন করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড শুধু অটোমেশন, অনলাইনিং, সিট্রমলাইনিং, স্ট্রেনদেনিংয়ের জন্য। বত্রিশ বছরে সেসব প্রকল্প বাস্তবায়নের দ্বারা অর্জিত অগ্রগতি দৃশ্যগোচর না হোক, অন্তত অনুভব সম্ভব হবে যদি দেখা যায় সবার মাইন্ডসেট ও কর্মকুশলতায় গুণগত পরিবর্তন এসেছে।

তবে এটাও ঠিক, বর্তমানে যে অব্যাহত অগ্রগতি, তার পেছনে সেই সব প্রয়াসের প্রচ্ছন্ন উপস্থিতি এবং তা নেপথ্য প্রেরণা হিসাবে যে কাজ করছে, তা অনস্বীকার্য। একই সঙ্গে সম্মানিত করদাতাদের সার্বিক সহযোগিতা, তাদের অভূতপূর্ব দায়িত্ববোধ এবং জটিল কর আইনগুলো সহজীকরণের প্রতি তাদের প্রত্যাশাকে সাধুবাদ জানাতে হয়।

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ : সাবেক সচিব, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন