নিজের মুখটাকে খুঁজছে মানুষ
jugantor
নিজের মুখটাকে খুঁজছে মানুষ

  ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী  

২৯ নভেম্বর ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আমরা এমন এক সমাজে বসবাস করছি যেখানে ভালো মানুষ সব সময় পিছিয়ে পড়ে, প্রতারক গোছের মানুষ তর তর করে উপরে উঠতে থাকে। মানুষের চোখেও জং ধরেছে, সে চোখে স্যুটবুট পরা একজন প্রতারকের মূল্য যতটা বেশি সাধারণ গোছের বেশভূষার মানুষের মূল্য ততটাই কম। সাহেদের বিষয়টি পত্রিকা মারফত জেনেছি, এখন সবাই তাকে প্রতারক উপাধি দিয়েছে। অথচ প্রতারক উপাধি দেওয়া অনেক মানুষের ভেতরেও হয়তো সাহেদের মতো প্রতারক বাস করছে। এই আধুনিক যুগে সবাইকে বোকা বানিয়ে একটা মানুষ এতটা উপরে একা উঠতে পারে, এটা বিশ্বাস করা খুব কঠিন। সাহেদের পেছনে অন্য সাহেদ আছে, তার পেছনের পেছনেও আরও অনেক দৃশ্যমান-অদৃশ্যমান সাহেদ হয়তো আছে। সেই পেছনের সুতোটা ঠিক কোথায় গিয়ে শেষ হয়েছে সেটা বলা খুব কঠিন।

সাহেদের ভাগ্য খারাপ, সে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুর খুব কাছাকাছি পৌঁছেও শেষ পর্যন্ত তার প্রতারণার অভিনয়টা মঞ্চস্থ করতে পারেনি। হয়তো কোনো ধরনের অলিখিত দরকষাকষিতে ভুল করে ফেলেছে বলেই তার প্রতারক চরিত্রটা সবার সামনে এসেছে। সেটা যদি না ঘটত তবে নির্ঘাত সে হয়তো একদিন আরও প্রভাবশালী হয়ে বহু মানুষের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করত। তারপরও যতটা সে করেছে সেটাইবা কম কী?

ভয় হয় সাহেদের মতো প্রতারণা করতে করতে এখন হয়তো অনেকেই সমাজে প্রভাবশালী হয়ে সাধারণ মানুষের ওপর ছড়ি চালাচ্ছে-ক্ষমতা, অর্থ ও মানুষ সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছে। এ সমাজের সাধারণ মানুষও খুব অদ্ভুত-না জেনে না বুঝে এদের মতো অনেক ভুঁইফোঁড় লোককে মাথায় তুলে নিয়ে নাচছে। অথচ তাদের উত্থানের পেছনের গল্পটা কেউ জানার চেষ্টা করছে না, তার শেকড়ের খোঁজও কেউ করছে না। সবাই কেমন যেন একটা ঘোরের মধ্যে আছে, সেখানে নিজের পরিচয়টাও তারা ভুলে যাচ্ছে।

একটা মোমবাতি, সবাই এর আলোটা দেখে, মোমবাতিকে ধারণ করে রাখা নিচের অন্ধকার ভিত্তিটা দেখে না। যোগ্যরা এভাবে হারিয়ে যায়, অযোগ্যরা যোগ্যদের জায়গাগুলো দখল করে নেয়। কারণ যোগ্যরা নিজেদের আলোয় আনতে চান না, ভয় একটাই যদি সেটা করতে গিয়ে নিজেদের ব্যক্তিত্ব ও স্বকীয়তাকেই হারিয়ে ফেলেন। আর অযোগ্যদের কোনো ভয় নেই, তারা নিজেদের স্বার্থে বড় বড় মানুষের পা চাটতেও লজ্জাবোধ করে না।

আমরা এখন পার করছি আলো-আঁধারে ঘেরা একটা সময়; যখন যোগ্যদের দর্শক সারিতে বসে অযোগ্যদের বড় বড় উপদেশ শুনতে হয়, মুখ লুকানোর জায়গাটাও পায় না নিভৃতে বসে থাকা যোগ্য মানুষগুলো। এখন যেদিকে তাকাই, মানুষ খুব কম দেখি; যতই চারপাশে তাকাই চোখে পড়ে সাহেদের মতো বড় বড় মুখোশ পরা বহু সাহেদ, এদের ভাগ্য সুপ্রসন্ন ছিল বলেই প্রতারক হিসাবে চিহ্নিত হওয়ার আগেই বড় জায়গাগুলো দখল করে নিয়েছে। এতক্ষণ চোখটা বন্ধ ছিল। চোখ বন্ধ থাকা অবস্থায় অনেক কিছু দেখা যায়; চোখ খোলা থাকলে অনেককিছু চোখে পড়ে না। চোখ রগড়াতে রগড়াতে ভাবছি, এতক্ষণ ঘুমন্ত অবস্থায় স্বপ্ন দেখছিলাম, নাকি ঘুম ভেঙে স্বপ্ন দেখছি। সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে নেই।

২.

গবেষণা গবেষণা করে দিনরাত চিৎকার করলেও যারা প্রকৃত গবেষক তাদের কাজকে হেয়প্রতিপন্ন করা যেন একটা কালচারে পরিণত হয়েছে এখন। আমাদের দেশে এ কালচারের চর্চা অনেক বেশি। বিদেশিদের উদ্ভট গবেষণা ও চিন্তাকে মেনে নিলেও স্বজাতির যে কোনো মৌলিক বা ফলিত চিন্তাকে সন্দেহের চোখে দেখেন আমাদের অনেক সহকর্মী। আমাদের নিজেদের দোষটা আগে আয়নায় দেখা উচিত। এমনকি আমাদের যারা এখনো গবেষণা অব্যাহত রেখেছেন, তাদের আর্টিক্যাল জার্নালে প্রকাশিত হলেও সমালোচনার শেষ নেই। আসলে গবেষণায় যাদের মন নেই, তারাও চায় দল ভারী হোক।

চতুর্থ শিল্পবিপ্লব বলে বলে মুখে ফেনা তুলে ফেললেও ইন্টিগ্রেটেড গবেষণা করতে গিয়ে অপমানিত হতে হয় প্রতিনিয়ত। সারা পৃথিবীর মানুষ যখন বহুমাত্রিক ধারণা দ্বারা প্রভাবিত, তখনো এক রিসার্চ ফিল্ডের সঙ্গে অন্য রিসার্চ ফিল্ডের যোগসূত্র ঘটালে এটাকে আমাদের দেশে চরম স্পর্ধা হিসাবে দেখেন অনেকে। সারা পৃথিবীতে সেটা হয়তো স্বাভাবিক ঘটনা। কেউ ইতিবাচকভাবে উপরে উঠলে তাকে টেনে ধরে নিচে নামানোর মানসিকতা যেখানে, সেখানে ধোয়া তুলসী পাতা হয়ে একেক সময় একেক চরিত্রের অভিনেতা সাজাটা অনেকটা নিজেদের সঙ্গে নিজেদের প্রতারণার নামান্তর।

যতদিন আমরা একে অন্যকে শ্রদ্ধা ও সম্মান করতে শিখব না, ততদিন তৃতীয়পক্ষ এর সুযোগ নেবেই। তৃতীয়পক্ষের পেছনে আমাদের স্বজাতির ভূমিকাও থাকতে পারে, অন্তত ইতিহাস এ কথা বলবে। হতে পারে আমাদের স্বজাতির কারও কারও তার গবেষণার অর্জনকে কভাবে ম্লান করা যায়-সেই নেতিবাচক মনোভাব কাজ করেছে। এটা অনুমানভিত্তিক, সত্য না হলেই ভালো। কারণ সব সম্ভবের জনপদে আমাদের বসবাস বলেই হয়তো এমনটা মনে হচ্ছে।

গবেষণায় ভুল হতে পারে, চিন্তাকে উদ্ভট মনে হতে পারে, গবেষণাপত্র লেখাতে দুর্বলতা থাকতে পারে; কিন্তু সেটা নিয়ে যখন আমরাই নিজেরা নিজেদের মধ্যে তালগোল পাকাই, তখন বোধহয় অন্যদের কাছ থেকে ইতিবাচক চিন্তা আশা করাটাই বৃথা। বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসুর উদ্ভিদের প্রাণ সংক্রান্ত গবেষণা নিয়ে উপহাসে বিদেশিদের সঙ্গে স্বজাতিরও ভূমিকা ছিল। এদেশে এত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও যারা গবেষণা করে যাচ্ছেন, তাদের এ সমাজ বোকা ভাবে। এখানে গবেষণার চেয়ে ক্ষমতার মূল্য অনেক বেশি।

এতদিন পরে এসে মনে হচ্ছে, গবেষণা করাটা একটা পাপ, মহাপাপ। অথচ বিদেশিরা আমাদের গবেষকদের মূল্যায়ন করতে কখনো পেছপা হয় না। আসলে সংকীর্ণতা যদি মনে বাসা বাঁধে, তখন সবকিছুই ভুয়া মনে হয়। আর সবচেয়ে বড় কথা, যে দেশে গুণীদের সম্মান নেই সেদেশে গুণীরা জন্মান না।

৩.

ফেসবুকে এমন একটা লেখা পেলাম-‘চারপাশে এত হুল্লোড়!! শুধু উৎসব আর উৎসব!! চর্চার নিবিষ্টতা নেই, ধ্যান নেই, নিমগ্নতা নেই!!??!!’ দীর্ঘক্ষণ বসে লেখাটা নিয়ে চিন্তা করলাম। লেখাটার ভেতরে প্রবশে করে সত্য উপলব্ধি করতে পারলাম। কিন্তু তাতে লাভ কী? মানুষ এখন গভীরতা খুঁজে না, তপস্যার মর্মবাণী বোঝে না, ত্যাগের মূল্য বোঝে না। সব যেন ঠুনকো কাচের মতো। যতই গড়ি ততই ভেঙে যায়। মানুষের সব কাজ এখন অনেকটা লোকদেখানো আদিখ্যেতা। যতটা না মানুষ অর্জন করে তার চেয়ে মানুষ সেটা নিয়ে উৎসব করে, গর্ব করে, নিজেকে বড় বানিয়ে অন্যদের ছোট দেখানোর চেষ্টা করে। সেই উৎসবের আমেজ একটা শীতের মতো, শীত এলেই চাদরের মূল্য বাড়ে। শীত বিদায় নিয়ে গ্রীষ্মের উত্তাপ ছড়ালেই চাদরটার কদর মুহূর্তেই কমে যায়। আবার শীত এলে মানুষ আরেকটা নতুন চাদর শরীরে জড়িয়ে আগের চাদরটাকে নির্বাসনে পাঠায়। যে কাজের গভীরতা নেই তা বেশিদিন বাঁচে না। তার চাকচিক্য ও ঢাকঢোল পেটানো আগমনটা চারপাশের মানুষকে হয়তো মুহূর্তের জন্য আকৃষ্ট করতে পারে; তবে তা স্থায়ী হয় না।

এখন এমন একটা দুঃসময় দেখছি, সবাই তিলে তিলে নিজেকে ক্ষয় করতে করতে মানুষ হওয়ার চেয়ে উৎসবমুখী তত্ত্বে ভরসা করে মুখোশ-মানুষ হচ্ছে, অভিনেতা হচ্ছে। ভুঁইফোঁড়রা ক্যারিশমাটিক ধূম্রজাল সৃষ্টি করে প্রতিনিয়ত প্রতারণা করতে করতে সমাজের মাথা হয়ে বসছে। সমাজেও পচন ধরেছে। তাই সমাজে এসব মানুষের মূল্য বাড়ছে। অবক্ষয়ের শিকার এসব মানুষ অতীত বিশ্লেষণ করতেও যেন ভুলে গেছে। এদের হাতে সমাজের ভবিষ্যৎ কী?

একসময় মানুষ তার কাজকে ভালোবাসত, তার কাজকে তপস্যার অংশ বলে মনে করত। সেখানে নিজেকে জাহির করার উৎসব ছিল না, বরং নীরবে-নিভৃতে মানুষ তার কাজের গভীরে প্রবেশ করে জীবনের কঠিন সত্যগুলো উপলব্ধির চেষ্টা করত। অনেকে সারা জীবন লোকচক্ষুর আড়ালে থেকে মানুষের মঙ্গলের জন্য সাধনা করে যেতেন। এ সমাজ তাকে কী দিল, কী দিল না সেটা তাদের কাছে মূল্যবান ছিল না বরং সমাজের মানুষের জন্য কতটা ত্যাগ তারা করতে পারলেন সেটাই তাদের কাছে মুখ্য ছিল। তাদের চিন্তায় দেশপ্রেমের পরিচয় পওয়া যেত।

সে মানুষগুলো কোথায় যেন হারিয়ে গেল। শামুকের মতো নিজেদের আরও গুটিয়ে নিল। লজ্জাবতী গাছের মতো আরও জড়সড় হয়ে গেল। অথচ আমরা জানি, সভ্যতার বিকাশে রয়েছে চিন্তাশীল মানুষের গুরুত্বপূর্ণ অবদান। অনেকে রঙিন জীবন দেখে আনন্দিত হয়; সাদাকালো জীবন বা সাধারণ মানুষের গল্প শুনতে তাদের আগ্রহ কম। অথচ সভ্যতার বিকাশে সাধারণ মানুষের অবদানও কম নয়।

ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী : অধ্যাপক, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর

নিজের মুখটাকে খুঁজছে মানুষ

 ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী 
২৯ নভেম্বর ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আমরা এমন এক সমাজে বসবাস করছি যেখানে ভালো মানুষ সব সময় পিছিয়ে পড়ে, প্রতারক গোছের মানুষ তর তর করে উপরে উঠতে থাকে। মানুষের চোখেও জং ধরেছে, সে চোখে স্যুটবুট পরা একজন প্রতারকের মূল্য যতটা বেশি সাধারণ গোছের বেশভূষার মানুষের মূল্য ততটাই কম। সাহেদের বিষয়টি পত্রিকা মারফত জেনেছি, এখন সবাই তাকে প্রতারক উপাধি দিয়েছে। অথচ প্রতারক উপাধি দেওয়া অনেক মানুষের ভেতরেও হয়তো সাহেদের মতো প্রতারক বাস করছে। এই আধুনিক যুগে সবাইকে বোকা বানিয়ে একটা মানুষ এতটা উপরে একা উঠতে পারে, এটা বিশ্বাস করা খুব কঠিন। সাহেদের পেছনে অন্য সাহেদ আছে, তার পেছনের পেছনেও আরও অনেক দৃশ্যমান-অদৃশ্যমান সাহেদ হয়তো আছে। সেই পেছনের সুতোটা ঠিক কোথায় গিয়ে শেষ হয়েছে সেটা বলা খুব কঠিন।

সাহেদের ভাগ্য খারাপ, সে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুর খুব কাছাকাছি পৌঁছেও শেষ পর্যন্ত তার প্রতারণার অভিনয়টা মঞ্চস্থ করতে পারেনি। হয়তো কোনো ধরনের অলিখিত দরকষাকষিতে ভুল করে ফেলেছে বলেই তার প্রতারক চরিত্রটা সবার সামনে এসেছে। সেটা যদি না ঘটত তবে নির্ঘাত সে হয়তো একদিন আরও প্রভাবশালী হয়ে বহু মানুষের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করত। তারপরও যতটা সে করেছে সেটাইবা কম কী?

ভয় হয় সাহেদের মতো প্রতারণা করতে করতে এখন হয়তো অনেকেই সমাজে প্রভাবশালী হয়ে সাধারণ মানুষের ওপর ছড়ি চালাচ্ছে-ক্ষমতা, অর্থ ও মানুষ সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছে। এ সমাজের সাধারণ মানুষও খুব অদ্ভুত-না জেনে না বুঝে এদের মতো অনেক ভুঁইফোঁড় লোককে মাথায় তুলে নিয়ে নাচছে। অথচ তাদের উত্থানের পেছনের গল্পটা কেউ জানার চেষ্টা করছে না, তার শেকড়ের খোঁজও কেউ করছে না। সবাই কেমন যেন একটা ঘোরের মধ্যে আছে, সেখানে নিজের পরিচয়টাও তারা ভুলে যাচ্ছে।

একটা মোমবাতি, সবাই এর আলোটা দেখে, মোমবাতিকে ধারণ করে রাখা নিচের অন্ধকার ভিত্তিটা দেখে না। যোগ্যরা এভাবে হারিয়ে যায়, অযোগ্যরা যোগ্যদের জায়গাগুলো দখল করে নেয়। কারণ যোগ্যরা নিজেদের আলোয় আনতে চান না, ভয় একটাই যদি সেটা করতে গিয়ে নিজেদের ব্যক্তিত্ব ও স্বকীয়তাকেই হারিয়ে ফেলেন। আর অযোগ্যদের কোনো ভয় নেই, তারা নিজেদের স্বার্থে বড় বড় মানুষের পা চাটতেও লজ্জাবোধ করে না।

আমরা এখন পার করছি আলো-আঁধারে ঘেরা একটা সময়; যখন যোগ্যদের দর্শক সারিতে বসে অযোগ্যদের বড় বড় উপদেশ শুনতে হয়, মুখ লুকানোর জায়গাটাও পায় না নিভৃতে বসে থাকা যোগ্য মানুষগুলো। এখন যেদিকে তাকাই, মানুষ খুব কম দেখি; যতই চারপাশে তাকাই চোখে পড়ে সাহেদের মতো বড় বড় মুখোশ পরা বহু সাহেদ, এদের ভাগ্য সুপ্রসন্ন ছিল বলেই প্রতারক হিসাবে চিহ্নিত হওয়ার আগেই বড় জায়গাগুলো দখল করে নিয়েছে। এতক্ষণ চোখটা বন্ধ ছিল। চোখ বন্ধ থাকা অবস্থায় অনেক কিছু দেখা যায়; চোখ খোলা থাকলে অনেককিছু চোখে পড়ে না। চোখ রগড়াতে রগড়াতে ভাবছি, এতক্ষণ ঘুমন্ত অবস্থায় স্বপ্ন দেখছিলাম, নাকি ঘুম ভেঙে স্বপ্ন দেখছি। সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে নেই।

২.

গবেষণা গবেষণা করে দিনরাত চিৎকার করলেও যারা প্রকৃত গবেষক তাদের কাজকে হেয়প্রতিপন্ন করা যেন একটা কালচারে পরিণত হয়েছে এখন। আমাদের দেশে এ কালচারের চর্চা অনেক বেশি। বিদেশিদের উদ্ভট গবেষণা ও চিন্তাকে মেনে নিলেও স্বজাতির যে কোনো মৌলিক বা ফলিত চিন্তাকে সন্দেহের চোখে দেখেন আমাদের অনেক সহকর্মী। আমাদের নিজেদের দোষটা আগে আয়নায় দেখা উচিত। এমনকি আমাদের যারা এখনো গবেষণা অব্যাহত রেখেছেন, তাদের আর্টিক্যাল জার্নালে প্রকাশিত হলেও সমালোচনার শেষ নেই। আসলে গবেষণায় যাদের মন নেই, তারাও চায় দল ভারী হোক।

চতুর্থ শিল্পবিপ্লব বলে বলে মুখে ফেনা তুলে ফেললেও ইন্টিগ্রেটেড গবেষণা করতে গিয়ে অপমানিত হতে হয় প্রতিনিয়ত। সারা পৃথিবীর মানুষ যখন বহুমাত্রিক ধারণা দ্বারা প্রভাবিত, তখনো এক রিসার্চ ফিল্ডের সঙ্গে অন্য রিসার্চ ফিল্ডের যোগসূত্র ঘটালে এটাকে আমাদের দেশে চরম স্পর্ধা হিসাবে দেখেন অনেকে। সারা পৃথিবীতে সেটা হয়তো স্বাভাবিক ঘটনা। কেউ ইতিবাচকভাবে উপরে উঠলে তাকে টেনে ধরে নিচে নামানোর মানসিকতা যেখানে, সেখানে ধোয়া তুলসী পাতা হয়ে একেক সময় একেক চরিত্রের অভিনেতা সাজাটা অনেকটা নিজেদের সঙ্গে নিজেদের প্রতারণার নামান্তর।

যতদিন আমরা একে অন্যকে শ্রদ্ধা ও সম্মান করতে শিখব না, ততদিন তৃতীয়পক্ষ এর সুযোগ নেবেই। তৃতীয়পক্ষের পেছনে আমাদের স্বজাতির ভূমিকাও থাকতে পারে, অন্তত ইতিহাস এ কথা বলবে। হতে পারে আমাদের স্বজাতির কারও কারও তার গবেষণার অর্জনকে কভাবে ম্লান করা যায়-সেই নেতিবাচক মনোভাব কাজ করেছে। এটা অনুমানভিত্তিক, সত্য না হলেই ভালো। কারণ সব সম্ভবের জনপদে আমাদের বসবাস বলেই হয়তো এমনটা মনে হচ্ছে।

গবেষণায় ভুল হতে পারে, চিন্তাকে উদ্ভট মনে হতে পারে, গবেষণাপত্র লেখাতে দুর্বলতা থাকতে পারে; কিন্তু সেটা নিয়ে যখন আমরাই নিজেরা নিজেদের মধ্যে তালগোল পাকাই, তখন বোধহয় অন্যদের কাছ থেকে ইতিবাচক চিন্তা আশা করাটাই বৃথা। বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসুর উদ্ভিদের প্রাণ সংক্রান্ত গবেষণা নিয়ে উপহাসে বিদেশিদের সঙ্গে স্বজাতিরও ভূমিকা ছিল। এদেশে এত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও যারা গবেষণা করে যাচ্ছেন, তাদের এ সমাজ বোকা ভাবে। এখানে গবেষণার চেয়ে ক্ষমতার মূল্য অনেক বেশি।

এতদিন পরে এসে মনে হচ্ছে, গবেষণা করাটা একটা পাপ, মহাপাপ। অথচ বিদেশিরা আমাদের গবেষকদের মূল্যায়ন করতে কখনো পেছপা হয় না। আসলে সংকীর্ণতা যদি মনে বাসা বাঁধে, তখন সবকিছুই ভুয়া মনে হয়। আর সবচেয়ে বড় কথা, যে দেশে গুণীদের সম্মান নেই সেদেশে গুণীরা জন্মান না।

৩.

ফেসবুকে এমন একটা লেখা পেলাম-‘চারপাশে এত হুল্লোড়!! শুধু উৎসব আর উৎসব!! চর্চার নিবিষ্টতা নেই, ধ্যান নেই, নিমগ্নতা নেই!!??!!’ দীর্ঘক্ষণ বসে লেখাটা নিয়ে চিন্তা করলাম। লেখাটার ভেতরে প্রবশে করে সত্য উপলব্ধি করতে পারলাম। কিন্তু তাতে লাভ কী? মানুষ এখন গভীরতা খুঁজে না, তপস্যার মর্মবাণী বোঝে না, ত্যাগের মূল্য বোঝে না। সব যেন ঠুনকো কাচের মতো। যতই গড়ি ততই ভেঙে যায়। মানুষের সব কাজ এখন অনেকটা লোকদেখানো আদিখ্যেতা। যতটা না মানুষ অর্জন করে তার চেয়ে মানুষ সেটা নিয়ে উৎসব করে, গর্ব করে, নিজেকে বড় বানিয়ে অন্যদের ছোট দেখানোর চেষ্টা করে। সেই উৎসবের আমেজ একটা শীতের মতো, শীত এলেই চাদরের মূল্য বাড়ে। শীত বিদায় নিয়ে গ্রীষ্মের উত্তাপ ছড়ালেই চাদরটার কদর মুহূর্তেই কমে যায়। আবার শীত এলে মানুষ আরেকটা নতুন চাদর শরীরে জড়িয়ে আগের চাদরটাকে নির্বাসনে পাঠায়। যে কাজের গভীরতা নেই তা বেশিদিন বাঁচে না। তার চাকচিক্য ও ঢাকঢোল পেটানো আগমনটা চারপাশের মানুষকে হয়তো মুহূর্তের জন্য আকৃষ্ট করতে পারে; তবে তা স্থায়ী হয় না।

এখন এমন একটা দুঃসময় দেখছি, সবাই তিলে তিলে নিজেকে ক্ষয় করতে করতে মানুষ হওয়ার চেয়ে উৎসবমুখী তত্ত্বে ভরসা করে মুখোশ-মানুষ হচ্ছে, অভিনেতা হচ্ছে। ভুঁইফোঁড়রা ক্যারিশমাটিক ধূম্রজাল সৃষ্টি করে প্রতিনিয়ত প্রতারণা করতে করতে সমাজের মাথা হয়ে বসছে। সমাজেও পচন ধরেছে। তাই সমাজে এসব মানুষের মূল্য বাড়ছে। অবক্ষয়ের শিকার এসব মানুষ অতীত বিশ্লেষণ করতেও যেন ভুলে গেছে। এদের হাতে সমাজের ভবিষ্যৎ কী?

একসময় মানুষ তার কাজকে ভালোবাসত, তার কাজকে তপস্যার অংশ বলে মনে করত। সেখানে নিজেকে জাহির করার উৎসব ছিল না, বরং নীরবে-নিভৃতে মানুষ তার কাজের গভীরে প্রবেশ করে জীবনের কঠিন সত্যগুলো উপলব্ধির চেষ্টা করত। অনেকে সারা জীবন লোকচক্ষুর আড়ালে থেকে মানুষের মঙ্গলের জন্য সাধনা করে যেতেন। এ সমাজ তাকে কী দিল, কী দিল না সেটা তাদের কাছে মূল্যবান ছিল না বরং সমাজের মানুষের জন্য কতটা ত্যাগ তারা করতে পারলেন সেটাই তাদের কাছে মুখ্য ছিল। তাদের চিন্তায় দেশপ্রেমের পরিচয় পওয়া যেত।

সে মানুষগুলো কোথায় যেন হারিয়ে গেল। শামুকের মতো নিজেদের আরও গুটিয়ে নিল। লজ্জাবতী গাছের মতো আরও জড়সড় হয়ে গেল। অথচ আমরা জানি, সভ্যতার বিকাশে রয়েছে চিন্তাশীল মানুষের গুরুত্বপূর্ণ অবদান। অনেকে রঙিন জীবন দেখে আনন্দিত হয়; সাদাকালো জীবন বা সাধারণ মানুষের গল্প শুনতে তাদের আগ্রহ কম। অথচ সভ্যতার বিকাশে সাধারণ মানুষের অবদানও কম নয়।

ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী : অধ্যাপক, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন