বাংলাদেশ কি স্ট্যাগফ্লেশনের ফাঁদে?
jugantor
শতফুল ফুটতে দাও
বাংলাদেশ কি স্ট্যাগফ্লেশনের ফাঁদে?

  ড. মাহবুব উল্লাহ  

০১ ডিসেম্বর ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশ কি যুগপৎ মূল্যস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক স্থবিরতার ফাঁদে পড়তে যাচ্ছে অথবা পড়ে গেছে?

বিগত শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধের প্রথম কিংবা দ্বিতীয় দশকে পাশ্চাত্যের, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে নতুন এক উপসর্গ দেখা দেয়, যাকে অর্থনীতির বিশেষজ্ঞরা নাম দিয়েছেন ‘স্ট্যাগফ্লেশন’। স্ট্যাগফ্লেশন হলো স্ট্যাগনেশন (স্থবিরতা) ও ইনফ্লেশনের যোগফল।

স্ট্যাগফ্লেশন হলো এমন একটি অবস্থা, যখন একটি দেশ ধারাবাহিকভাবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং উচ্চ বেকারত্বে ভোগে। অর্থনীতিবিদরা একসময় মনে করতেন, মূল্যস্ফীতি হলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চাঙা হয় এবং উচ্চ বেকারত্ব মূল্যস্ফীতি হ্রাস করে।

এই বিশ্বাস যদি সঠিক হয়, তাহলে দেখা যাবে কোনো অর্থনৈতিক ব্যবস্থাই দীর্ঘমেয়াদে এই বিবিধ সমস্যার কবলে পড়বে না। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, স্ট্যাগফ্লেশন অসম্ভব একটি ব্যাপার।

দুর্ভাগ্যবশত গত শতাব্দীতে যে স্ট্যাগফ্লেশন হয়েছিল, তা দীর্ঘমেয়াদে কেবল পারস্পরিকভাবে, অর্থাৎ অর্থনৈতিক স্থবিরতা ও মূল্যস্ফীতি একসঙ্গে চলতে নাও পারে।

অর্থনৈতিক স্থবিরতা বা স্ট্যাগনেশন বলতে বোঝায় এমন একটি অবস্থা, যেখানে উৎপাদনের প্রযুক্তি অথবা আয়ের স্তরে তেমন কোনো পরিবর্তন হয় না। এ অবস্থাটি উন্নয়নের বিপরীত। উন্নয়ন না হওয়া মানে উৎপাদন প্রযুক্তিতে পরিবর্তন এবং আয়ের স্তর বৃদ্ধি না পাওয়া।

বাংলাদেশে এখন বহু বছরের মধ্যে উচ্চ মূল্যস্ফীতি স্তর পরিলক্ষিত হচ্ছে। বাজারে সব ধরনের পণ্যসামগ্রীর দাম দেড়-দুই গুণ হয়ে যাচ্ছে। সরকারি হিসাবে মূল্যস্ফীতির হার ৯ শতাংশের মতো। ভোক্তারা তাদের জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে মনে করেন, মূল্যস্ফীতির এ হারটি খুবই রক্ষণশীলভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো যদি মূল্যস্ফীতি নির্ণয়ের পদ্ধতি বিস্তারিতভাবে জনসমক্ষে নিয়ে আসতে পারত, তাহলে মূল্যস্ফীতির হার নিয়ে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হতো।

করোনা মহামারির ফলে বাংলাদেশে উৎপাদন কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়েছিল। ব্যবসা-বাণিজ্য সংকুচিত হয়ে গিয়েছিল।

অনেক মানুষ, যারা শহরে কাজ করত, তারা চাকরি হারিয়ে গ্রামে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছে। ফলে সামগ্রিকভাবে বেকারত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে রিজার্ভের মজুত কমে আসার ফলে আমদানিকারকরা এলসি খুলতে পারছেন না। কারণ বৈদেশিক মুদ্রা মহার্ঘ হয়ে উঠেছে।

টাকার মূল্য হ্রাস পেয়েছে এবং ডলারের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। খোলাবাজারে ১ ডলার কেনার জন্য ১০০ টাকার বেশি অর্থব্যয় করতে হচ্ছে। বিদেশ থেকে আমদানি নিয়ন্ত্রণ করে ডলার সংকট মোকাবিলার চেষ্টা করা হচ্ছে। আমদানি নিয়ন্ত্রণ করার ফলে মধ্যবর্তী পণ্য এবং শিল্পের যন্ত্রসামগ্রী এই নিয়ন্ত্রণের কবলে পড়ে গেছে। আমদানি নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে পণ্যসামগ্রীর উৎপাদন আরও ব্যাহত হচ্ছে। ফলে কর্মসংস্থান বাধার মুখে পড়েছে। তাই আমরা দেখছি, বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পেয়েছে এবং কর্মসংস্থান স্থবির হয়ে পড়েছে অথবা হ্রাস পেয়েছে। এজন্যই ‘স্ট্যাগফ্লেশন’ পরিভাষাটি ব্যবহার করা অসংগত বা অযৌক্তিক হবে না।

সাধারণভাবে মূল্যস্ফীতি কীভাবে হয় তা বোঝাতে গিয়ে এমন একটি অবস্থার কথা বলা হয়, যা হলো-Too much money chasing too few goods. বাজারে যে পরিমাণ পণ্যসামগ্রী ও সেবা লেনদেন হয়, তার তুলনায় সাধারণ মুদ্রা চাহিদার পাশে যখন অতিরিক্ত মুদ্রা বাজারে আসে, তখন মূল্যস্ফীতির পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। দেশে ডলার সংকট হওয়ার অন্য একটি কারণ হচ্ছে, বিদেশে কর্মরত শ্রমিক এবং অন্যান্য পেশাজীবী ব্যাংকের মাধ্যমে তাদের রেমিট্যান্স না পাঠিয়ে হুন্ডির মাধ্যমে পাঠাচ্ছেন। যদিও সরকার প্রতি ডলারে রেমিট্যান্স প্রেরকদের অতিরিক্ত ২ শতাংশ করে টাকা দিচ্ছে, কিন্তু তাতেও সমস্যার সমাধান হচ্ছে বলে মনে হয় না। কারণ ডলারের সরকারি বিনিময়হার বাজারে ডলারের বিনিময়হার থেকে অনেকটাই পেছনে থাকছে। রেমিট্যান্সভোগীরা বেআইনি মাধ্যমে টাকা পাওয়ার ফলে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না বাজারে মুদ্রা সরবরাহ কতটা বাড়ছে। অনিশ্চয়তার এই পরিবেশে নীতিনির্ধারণ জটিল হয়ে উঠছে।

বাংলাদেশের বাজারে মুদ্রা সরবরাহ বৃদ্ধি পাওয়ার পেছনে অন্যতম কারণ হলো বেশকিছু মেগা প্রকল্প একসঙ্গে বাস্তবায়নের চেষ্টা। এ মেগা প্রকল্পগুলো হলো-১. পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প, ২. ঢাকায় মেট্রোরেল প্রকল্প, ৩. পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ প্রকল্প, ৪. দোহাজারি থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু হয়ে গুনদুম পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণ প্রকল্প, ৫. রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প, ৬. মাতারবাড়ী কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মণি প্রকল্প, ৭. এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প, ৮. কয়লাভিত্তিক রামপাল তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প, ৯. পায়রা বন্দর নির্মাণ প্রকল্প। এগুলো মূলত অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প। এগুলোর প্রয়োজনীয়তা নেই এমনটি বলা যাবে না। তবে এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের সঠিক কৌশল না থাকায় জটিল সমস্যার উদ্ভব!হয়েছে। সড়ক, রেলপথ, বন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতু প্রকল্পে বিশাল অঙ্কের অর্থ ব্যয়িত হচ্ছে। প্রকল্পগুলোর জন্য শুরু থেকে ২০২০ সালের জুলাই পর্যন্ত মোট খরচ হয়েছে ১ লাখ ৬ হাজার ৫৭২ কোটি ১৬ লাখ টাকা। সাতটি মেগা প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ২ লাখ ৭৪ হাজার ৫৩৬ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। এতে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ৮৭ হাজার ২৯৪ কোটি ৫৫ লাখ, বৈদেশিক সহায়তা থেকে ১ লাখ ৮৫ হাজার ১২৩ কোটি ৩৩ লাখ এবং বাস্তবায়নকারী সংস্থার তহবিল থেকে ২ হাজার ১১৮ কোটি ৭৭ লাখ টাকা জোগান দেওয়া হয়েছে।

মেগা প্রকল্পের জন্য দেশে এবং দেশের বাইরের বাজারে অতিরিক্ত অর্থের জোগান বিশালভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে। দেশের ভেতরে নানা খাতে প্রধানত উৎপাদন উপকরণ এবং শ্রমিক ও কর্মকর্তাদের বেতন পরিশোধের মাধ্যমে এই টাকা দেশের বাজারে প্রবেশ করেছে। বলা যায়, মুদ্রা সরবরাহ স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। অবকাঠামোভিত্তিক প্রকল্প থেকে যে বেনিফিট আসে, তা আসে দীর্ঘ একটি সময়জুড়ে। এই অর্থ বাজারে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পাওয়ার জন্য সময়ের প্রয়োজন হয়। কিন্তু সেই সময় আসার আগেই অতিরিক্ত অর্থ বাজারে প্রবেশ করায় মূল্যস্ফীতি দেখা দেয়। অনেক নামকরা অর্থনীতিবিদ মনে করেন, অবকাঠামো অর্থনৈতিক উন্নয়নের পূবশর্ত, কিন্তু মুদ্রা সরবরাহ বৃদ্ধির কারকও বটে। একাধিকবার প্রকল্প ব্যয় সংশোধন করার ফলে মোট কত টাকা বাজারে প্রবেশ করেছে, তা সঠিকভাবে বলা যায় না। তবে এটুকু বলা যায়, বাজারে বিশাল অঙ্কের বাড়তি মুদ্রা সরবরাহ স্বল্পমেয়াদে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ভয়ানক ধরনের মূল্যস্ফীতির কারণ হতে পারে।

মেগা প্রকল্পগুলোর অর্থায়নের জন্য সরকার দেশ ও বিদেশ থেকে ঋণ নিচ্ছে। বিদেশি ঋণের সুদের হার আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সংস্থাগুলোর তুলনায় বেশি। প্রশ্ন উঠেছে, লাগাতার মেগা প্রকল্প নিতে গিয়ে বাংলাদেশ কি ঋণের ফাঁদে পড়ে যাচ্ছে? ২০২১ সাল নাগাদ ৪০ বছরে দেশের যে বৈদেশিক দায়দেনা হয়েছে, গত ১০ বছরে হয়েছে তার তুলনায় অনেক বেশি। অতীতে বড় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে বিশ্বব্যাংক, এডিবি ও জাইকার মতো সংস্থার এবং দেশের রেয়াতি ঋণ সহায়তার ফলে। এ ঋণের সুদের বোঝা ছিল কম এবং পরিশোধের সময়সীমা ছিল দীর্ঘ।

তুলনামূলক স্বল্পমেয়াদি এবং বাণিজ্যিক শর্তে এগুলো বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ২০৩০ সাল নাগাদ বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে যে সুদ ও কিস্তি দিতে হবে, তা বাংলাদেশের সহন ক্ষমতার বাইরে চলে যেতে পারে। ঋণের এ বোঝা বহন করতে হবে নতুন প্রজন্মকে। দেশে বিদ্যমান বৈষম্য তীব্র।

অন্য দেশ থেকে সহন ক্ষমতার অতিরিক্ত ঋণ নিয়ে ভিন্ন এক ধরনের অসাম্য সৃষ্টি করা হচ্ছে। এ অসাম্য হবে বর্তমান প্রজন্মের চেয়ে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য অনেক বেশি।

এতে আন্তঃপ্রজন্ম বৈষম্য বৃদ্ধি পাবে। অসাম্যের বিষয়ে সময় ও পরিসরের কথা অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে। এটিও হবে ভিন্ন এক ধরনের সামাজিক বৈষম্য। সমস্যাগুলো গুরুতর। এ সমস্যাগুলো এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

ড. মাহবুব উল্লাহ : শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ

শতফুল ফুটতে দাও

বাংলাদেশ কি স্ট্যাগফ্লেশনের ফাঁদে?

 ড. মাহবুব উল্লাহ 
০১ ডিসেম্বর ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশ কি যুগপৎ মূল্যস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক স্থবিরতার ফাঁদে পড়তে যাচ্ছে অথবা পড়ে গেছে?

বিগত শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধের প্রথম কিংবা দ্বিতীয় দশকে পাশ্চাত্যের, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে নতুন এক উপসর্গ দেখা দেয়, যাকে অর্থনীতির বিশেষজ্ঞরা নাম দিয়েছেন ‘স্ট্যাগফ্লেশন’। স্ট্যাগফ্লেশন হলো স্ট্যাগনেশন (স্থবিরতা) ও ইনফ্লেশনের যোগফল।

স্ট্যাগফ্লেশন হলো এমন একটি অবস্থা, যখন একটি দেশ ধারাবাহিকভাবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং উচ্চ বেকারত্বে ভোগে। অর্থনীতিবিদরা একসময় মনে করতেন, মূল্যস্ফীতি হলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চাঙা হয় এবং উচ্চ বেকারত্ব মূল্যস্ফীতি হ্রাস করে।

এই বিশ্বাস যদি সঠিক হয়, তাহলে দেখা যাবে কোনো অর্থনৈতিক ব্যবস্থাই দীর্ঘমেয়াদে এই বিবিধ সমস্যার কবলে পড়বে না। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, স্ট্যাগফ্লেশন অসম্ভব একটি ব্যাপার।

দুর্ভাগ্যবশত গত শতাব্দীতে যে স্ট্যাগফ্লেশন হয়েছিল, তা দীর্ঘমেয়াদে কেবল পারস্পরিকভাবে, অর্থাৎ অর্থনৈতিক স্থবিরতা ও মূল্যস্ফীতি একসঙ্গে চলতে নাও পারে।

অর্থনৈতিক স্থবিরতা বা স্ট্যাগনেশন বলতে বোঝায় এমন একটি অবস্থা, যেখানে উৎপাদনের প্রযুক্তি অথবা আয়ের স্তরে তেমন কোনো পরিবর্তন হয় না। এ অবস্থাটি উন্নয়নের বিপরীত। উন্নয়ন না হওয়া মানে উৎপাদন প্রযুক্তিতে পরিবর্তন এবং আয়ের স্তর বৃদ্ধি না পাওয়া।

বাংলাদেশে এখন বহু বছরের মধ্যে উচ্চ মূল্যস্ফীতি স্তর পরিলক্ষিত হচ্ছে। বাজারে সব ধরনের পণ্যসামগ্রীর দাম দেড়-দুই গুণ হয়ে যাচ্ছে। সরকারি হিসাবে মূল্যস্ফীতির হার ৯ শতাংশের মতো। ভোক্তারা তাদের জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে মনে করেন, মূল্যস্ফীতির এ হারটি খুবই রক্ষণশীলভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো যদি মূল্যস্ফীতি নির্ণয়ের পদ্ধতি বিস্তারিতভাবে জনসমক্ষে নিয়ে আসতে পারত, তাহলে মূল্যস্ফীতির হার নিয়ে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হতো।

করোনা মহামারির ফলে বাংলাদেশে উৎপাদন কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়েছিল। ব্যবসা-বাণিজ্য সংকুচিত হয়ে গিয়েছিল।

অনেক মানুষ, যারা শহরে কাজ করত, তারা চাকরি হারিয়ে গ্রামে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছে। ফলে সামগ্রিকভাবে বেকারত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে রিজার্ভের মজুত কমে আসার ফলে আমদানিকারকরা এলসি খুলতে পারছেন না। কারণ বৈদেশিক মুদ্রা মহার্ঘ হয়ে উঠেছে।

টাকার মূল্য হ্রাস পেয়েছে এবং ডলারের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। খোলাবাজারে ১ ডলার কেনার জন্য ১০০ টাকার বেশি অর্থব্যয় করতে হচ্ছে। বিদেশ থেকে আমদানি নিয়ন্ত্রণ করে ডলার সংকট মোকাবিলার চেষ্টা করা হচ্ছে। আমদানি নিয়ন্ত্রণ করার ফলে মধ্যবর্তী পণ্য এবং শিল্পের যন্ত্রসামগ্রী এই নিয়ন্ত্রণের কবলে পড়ে গেছে। আমদানি নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে পণ্যসামগ্রীর উৎপাদন আরও ব্যাহত হচ্ছে। ফলে কর্মসংস্থান বাধার মুখে পড়েছে। তাই আমরা দেখছি, বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পেয়েছে এবং কর্মসংস্থান স্থবির হয়ে পড়েছে অথবা হ্রাস পেয়েছে। এজন্যই ‘স্ট্যাগফ্লেশন’ পরিভাষাটি ব্যবহার করা অসংগত বা অযৌক্তিক হবে না।

সাধারণভাবে মূল্যস্ফীতি কীভাবে হয় তা বোঝাতে গিয়ে এমন একটি অবস্থার কথা বলা হয়, যা হলো-Too much money chasing too few goods. বাজারে যে পরিমাণ পণ্যসামগ্রী ও সেবা লেনদেন হয়, তার তুলনায় সাধারণ মুদ্রা চাহিদার পাশে যখন অতিরিক্ত মুদ্রা বাজারে আসে, তখন মূল্যস্ফীতির পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। দেশে ডলার সংকট হওয়ার অন্য একটি কারণ হচ্ছে, বিদেশে কর্মরত শ্রমিক এবং অন্যান্য পেশাজীবী ব্যাংকের মাধ্যমে তাদের রেমিট্যান্স না পাঠিয়ে হুন্ডির মাধ্যমে পাঠাচ্ছেন। যদিও সরকার প্রতি ডলারে রেমিট্যান্স প্রেরকদের অতিরিক্ত ২ শতাংশ করে টাকা দিচ্ছে, কিন্তু তাতেও সমস্যার সমাধান হচ্ছে বলে মনে হয় না। কারণ ডলারের সরকারি বিনিময়হার বাজারে ডলারের বিনিময়হার থেকে অনেকটাই পেছনে থাকছে। রেমিট্যান্সভোগীরা বেআইনি মাধ্যমে টাকা পাওয়ার ফলে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না বাজারে মুদ্রা সরবরাহ কতটা বাড়ছে। অনিশ্চয়তার এই পরিবেশে নীতিনির্ধারণ জটিল হয়ে উঠছে।

বাংলাদেশের বাজারে মুদ্রা সরবরাহ বৃদ্ধি পাওয়ার পেছনে অন্যতম কারণ হলো বেশকিছু মেগা প্রকল্প একসঙ্গে বাস্তবায়নের চেষ্টা। এ মেগা প্রকল্পগুলো হলো-১. পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প, ২. ঢাকায় মেট্রোরেল প্রকল্প, ৩. পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ প্রকল্প, ৪. দোহাজারি থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু হয়ে গুনদুম পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণ প্রকল্প, ৫. রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প, ৬. মাতারবাড়ী কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মণি প্রকল্প, ৭. এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প, ৮. কয়লাভিত্তিক রামপাল তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প, ৯. পায়রা বন্দর নির্মাণ প্রকল্প। এগুলো মূলত অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প। এগুলোর প্রয়োজনীয়তা নেই এমনটি বলা যাবে না। তবে এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের সঠিক কৌশল না থাকায় জটিল সমস্যার উদ্ভব!হয়েছে। সড়ক, রেলপথ, বন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতু প্রকল্পে বিশাল অঙ্কের অর্থ ব্যয়িত হচ্ছে। প্রকল্পগুলোর জন্য শুরু থেকে ২০২০ সালের জুলাই পর্যন্ত মোট খরচ হয়েছে ১ লাখ ৬ হাজার ৫৭২ কোটি ১৬ লাখ টাকা। সাতটি মেগা প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ২ লাখ ৭৪ হাজার ৫৩৬ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। এতে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ৮৭ হাজার ২৯৪ কোটি ৫৫ লাখ, বৈদেশিক সহায়তা থেকে ১ লাখ ৮৫ হাজার ১২৩ কোটি ৩৩ লাখ এবং বাস্তবায়নকারী সংস্থার তহবিল থেকে ২ হাজার ১১৮ কোটি ৭৭ লাখ টাকা জোগান দেওয়া হয়েছে।

মেগা প্রকল্পের জন্য দেশে এবং দেশের বাইরের বাজারে অতিরিক্ত অর্থের জোগান বিশালভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে। দেশের ভেতরে নানা খাতে প্রধানত উৎপাদন উপকরণ এবং শ্রমিক ও কর্মকর্তাদের বেতন পরিশোধের মাধ্যমে এই টাকা দেশের বাজারে প্রবেশ করেছে। বলা যায়, মুদ্রা সরবরাহ স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। অবকাঠামোভিত্তিক প্রকল্প থেকে যে বেনিফিট আসে, তা আসে দীর্ঘ একটি সময়জুড়ে। এই অর্থ বাজারে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পাওয়ার জন্য সময়ের প্রয়োজন হয়। কিন্তু সেই সময় আসার আগেই অতিরিক্ত অর্থ বাজারে প্রবেশ করায় মূল্যস্ফীতি দেখা দেয়। অনেক নামকরা অর্থনীতিবিদ মনে করেন, অবকাঠামো অর্থনৈতিক উন্নয়নের পূবশর্ত, কিন্তু মুদ্রা সরবরাহ বৃদ্ধির কারকও বটে। একাধিকবার প্রকল্প ব্যয় সংশোধন করার ফলে মোট কত টাকা বাজারে প্রবেশ করেছে, তা সঠিকভাবে বলা যায় না। তবে এটুকু বলা যায়, বাজারে বিশাল অঙ্কের বাড়তি মুদ্রা সরবরাহ স্বল্পমেয়াদে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ভয়ানক ধরনের মূল্যস্ফীতির কারণ হতে পারে।

মেগা প্রকল্পগুলোর অর্থায়নের জন্য সরকার দেশ ও বিদেশ থেকে ঋণ নিচ্ছে। বিদেশি ঋণের সুদের হার আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সংস্থাগুলোর তুলনায় বেশি। প্রশ্ন উঠেছে, লাগাতার মেগা প্রকল্প নিতে গিয়ে বাংলাদেশ কি ঋণের ফাঁদে পড়ে যাচ্ছে? ২০২১ সাল নাগাদ ৪০ বছরে দেশের যে বৈদেশিক দায়দেনা হয়েছে, গত ১০ বছরে হয়েছে তার তুলনায় অনেক বেশি। অতীতে বড় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে বিশ্বব্যাংক, এডিবি ও জাইকার মতো সংস্থার এবং দেশের রেয়াতি ঋণ সহায়তার ফলে। এ ঋণের সুদের বোঝা ছিল কম এবং পরিশোধের সময়সীমা ছিল দীর্ঘ।

তুলনামূলক স্বল্পমেয়াদি এবং বাণিজ্যিক শর্তে এগুলো বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ২০৩০ সাল নাগাদ বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে যে সুদ ও কিস্তি দিতে হবে, তা বাংলাদেশের সহন ক্ষমতার বাইরে চলে যেতে পারে। ঋণের এ বোঝা বহন করতে হবে নতুন প্রজন্মকে। দেশে বিদ্যমান বৈষম্য তীব্র।

অন্য দেশ থেকে সহন ক্ষমতার অতিরিক্ত ঋণ নিয়ে ভিন্ন এক ধরনের অসাম্য সৃষ্টি করা হচ্ছে। এ অসাম্য হবে বর্তমান প্রজন্মের চেয়ে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য অনেক বেশি।

এতে আন্তঃপ্রজন্ম বৈষম্য বৃদ্ধি পাবে। অসাম্যের বিষয়ে সময় ও পরিসরের কথা অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে। এটিও হবে ভিন্ন এক ধরনের সামাজিক বৈষম্য। সমস্যাগুলো গুরুতর। এ সমস্যাগুলো এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

ড. মাহবুব উল্লাহ : শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন