বাজারে নগদ অর্থ কি আসলেই বেশি?
jugantor
নীতি দুর্নীতি অর্থনীতি
বাজারে নগদ অর্থ কি আসলেই বেশি?

  ড. আর এম দেবনাথ  

০৩ ডিসেম্বর ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

‘ক্যাশ’ মানে নগদ টাকা। নগদ টাকা বা ক্যাশ পছন্দ করে না এমন কোনো মানুষ আছে? ক্যাশ বস্তুত সবাই চায়। ‘চেকের’ চেয়ে বেশি চায়। ধরা যাক কোটি কোটি টাকার নোট (ক্যাশ) রাস্তায় পড়ে আছে। বদ্ধ উন্মাদ থেকে শুরু করে সুস্থ মানুষ-কে তা থেকে কিছু তুলে নেবে না পকেটে, পারলে ব্যাগে! এই ক্যাশের ওপর একটা গানই আছে-‘দে মা আমায় তহশীলদারি’। ক্যাশ এত কাম্য ও জরুরি। এহেন ক্যাশ বা নগদ টাকা থাকতে পারে আমাদের যার যার হাতে, যাকে ব্যাংকিংয়ের পরিভাষায় বলা হয় ‘ক্যাশ কারেন্সি আউটসাইড ব্যাংকস’।

আবার কিছু ক্যাশ থাকে ব্যাংকের ভল্টে, যা থেকে ব্যাংক গ্রাহকদের দৈনন্দিন উত্তোলন চাহিদা মেটানো হয়। কিছু ক্যাশ থাকে বাংলাদেশ ব্যাংকের হাতে। এসবের বিভিন্ন নাম আছে ব্যাংকিং হিসাবে-রিজার্ভ মানি, ন্যারো মানি-১, ব্রড মানি-২ এবং ব্রড মানি-৩। এগুলোর হিসাব করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিয়মিত। কোনটা বাড়ল, লোকটা কমল, কোনটা স্থিতিশীল-এসব দেখে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঠিক করে তার মুদ্রানীতি। এই অর্থে মানি বা টাকার হিসাব খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর দ্বারা বোঝা যায় আমরা অর্থনীতি কোন পর্যায়ে আছি, অর্থনীতিতে নগদ অর্থ বেশি নাকি কম, কত থাকা উচিত ইত্যাদি।

এখানেই বলা দরকার, গত সপ্তাহে অন্তত দুটি কাগজে আমি নগদ অর্থের একটা হিসাব দেখেছি। আমাদের অর্থনীতিতে বা খোলাবাজারে কী পরিমাণ টাকা চালু আছে, অতীতে কত ছিল ইত্যাদি। প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে, আমাদের বাজারে টাকা বা নগদ অর্থের প্রচলন অনেকটা বেশি। ধীরে ধীরে তা বাড়ছে। এর সঙ্গে সম্পর্কিত করা হয়েছে ‘কালো টাকা’, হুন্ডি, অর্থ পাচার, ঘুস-দুর্নীতি ইত্যাদির।

বলা হয়েছে, অর্থনীতিতে ক্যাশের ব্যবহার বৃদ্ধি কালো অর্থনীতির ইঙ্গিতবহ। অতএব তা পরিত্যাজ্য। হওয়া উচিত ‘ক্যাশলেস অর্থনীতি’। অর্থাৎ নগদ অর্থের পরিবর্তে ব্যবহার হবে চেক ও ডিজিটাল ব্যবস্থা। ব্যবহার হবে ডেবিট কার্ড, ক্রেডিট কার্ড, এজেন্ট ব্যাংকিং, অনলাইন ব্যাংকিং ইত্যাদি। আক্ষেপ প্রকাশ করে বলা হয়েছে, ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের প্রসার সত্ত্বেও বাজারে/অর্থনীতিতে ক্যাশের ব্যবহার আমাদের দেশে বেশি হচ্ছে। উন্নত দেশে এর চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত।

প্রতিবেদন দুটি পড়তে পড়তে আমার মনে পড়ে গেল মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের কথা। দেশ রক্তাক্ত যুদ্ধের পর স্বাধীন হয়েছে। সাবেক পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থিত স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানের (এসবিপি) বদলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আমাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংক-বাংলাদেশ ব্যাংক। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো রাষ্ট্রায়ত্ত। গোটা ব্যাংক খাত সরকারি মালিকানায়। চারদিকে দেশ গড়ার অঙ্গীকার। উত্তেজনা সর্বত্র। কী কী করতে হবে, কী কী বিষয়ে দেরি করা যাবে না-ইত্যাদির আলোচনা সর্বত্র।

দেশপ্রেমে সারা দেশ উজ্জীবিত। মুক্তিযোদ্ধাদের তখন সবকিছুতেই ‘তাড়াতাড়ি’। তখনকার বাংলাদেশের অর্থনীতির এক নম্বর কাজ ছিল অর্থনীতিকে সচল করা। মিল-ফ্যাক্টরি চালু করা, ব্যবসা পুনরায় চালু করা। সর্বত্র উদ্দীপনা। ১৯৭৩ সাল। ব্যাংকে ব্যাংকে আলোচনা ক্যাশলেস সোসাইটির, নগদবিহীন অর্থনীতির। পাশাপাশি চলছে গ্রামাঞ্চলে ব্যাংক শাখা খোলার তোড়জোড়। আওয়াজ একটাই-‘রুরাল ডেভেলপমেন্ট’। সেমিনার, ওয়ার্কশপ, আলোচনা সভা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশ আসছে ঘনঘন। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) গঠিত হয় ১৯৭৫-৭৬-এর দিকে। ব্যাংকারদের প্রশিক্ষণের জন্য। নতুন অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্যে। জেলায় জেলায় সেমিনার, ওয়ার্কশপ-‘রুলার ডেভেলপমেন্ট’, ‘মানিটাইজেশন’ ইত্যাদি হচ্ছে মুখ্য বিষয়।

ক্যাশলেস অর্থনীতির কথা বাংলাদেশ ব্যাংকে গেলেই শোনা যায়। এ কে এন আহমেদ (ব্যাংকার) তখন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর; এরপর নুরুল ইসলাম (সিএসপি)। আজ ৫০/৫২ বছর পর আবারও শুনতে পাচ্ছি ‘ক্যাশলেস’ সোসাইটির কথা। দিকে দিকে শোনা যাচ্ছে ডিজিটালাইজেশনের কথা, ব্যাংকিং সেবা গ্রামেগঞ্জে ছড়িয়ে দেওয়ার কথা। ইচ্ছা শতভাগ।

কিন্তু উল্লিখিত প্রতিবেদন দুটি পড়ে মনে হচ্ছে আমরা উলটো পথে হাঁটছি। ক্যাশের ব্যবহার, নগদ টাকার ব্যবহার কমবে তো দূরের কথা, বরং বাড়ছে। এখানেই প্রশ্ন, আমরা কি সত্যি সত্যি বেশি ক্যাশ ব্যবহার করছি, না ক্যাশ ব্যবহার সীমার মধ্যেই আছে? ‘ক্যাশ ব্যবহার বেশি’ মানেই কি তা হুন্ডি, কালোবাজার, টাকা পাচার, ঘুস-দুর্নীতি ইত্যাদির পরিচায়ক? কঠিন প্রশ্ন, জবাবও কঠিন। সরলীকরণের কোনো সুযোগ নেই। এজন্যই প্রথমে দেখা দরকার ক্যাশের ব্যবহার আজকের দিনে কেমন।

এর পরিসংখ্যানের জন্য যেতে হবে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশনা ‘মান্থলি ইকোনমিক ট্রেন্ডসে’। সর্বশেষ এ সংক্রান্ত প্রকাশনা সেপ্টেম্বরের। অবশ্যই ২০২২ সালের। এর সঙ্গে যোগ করতে হবে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন দুটির পরিসংখ্যান। দেখা যাচ্ছে, ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ‘কারেন্সি আউটসাইড ব্যাংকস’ বা নগদ অর্থ বাজারে ছিল ১ লাখ ৮৯ হাজার ১৯৮ কোটি টাকা। ২০২১ সালের একই সময়ে এর পরিমাণ বেড়ে হয় ২ লাখ ৯ হাজার ৬১৮ কোটি টাকা। আর ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে হয় ২ লাখ ৩৯ হাজার ৯৯৮ কোটি টাকা।

তাহলে দেখা যাচ্ছে, ২০২০-এর সেপ্টেম্বরের তুলনায় পরবর্তী এক বছরে বাজারে নগদ অর্থ বেড়েছে ১০ দশমিক ৭৯ শতাংশ। আর এর পরবর্তী বছরে বেড়েছে ১৪ শতাংশ। আবার অন্য এক হিসাবে দেখা যাচ্ছে, ২০২২-এর জুনের তুলনায় একই বছরের সেপ্টেম্বরের মধ্যে বেড়েছে মাত্র শূন্য ১ দশমিক ৯ ভাগ। এখন প্রশ্ন, এই বৃদ্ধি কি মাত্রাতিরিক্ত? আবার অন্য হিসাবও আছে-তা হচ্ছে অর্থবছরের হিসাবে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে পূর্ববর্তী অর্থবছরের তুলনায় বাজারে নগদ অর্থের সরবরাহ বৃদ্ধি পায় ৯ দশমিক ৪৮ শতাংশ হারে। ২০১৯-২০-এ হঠাৎ তা বৃদ্ধি পায় ২৪ দশমিক ৫ শতাংশ হারে। ২০২০-২১-এ নগদ অর্থের পরিমাণ বৃদ্ধি পায় মাত্র ৯ দশমিক ৫ শতাংশ হারে। আর ২০২১-২২ অর্থবছরে এর পরিমাণ মাত্র ১২ দশমিক ৮৫ শতাংশ। একমাত্র ২০১৯-২০ অর্থবছর বাদ দিলে দেখা যাচ্ছে, নগদ অর্থ বৃদ্ধির পরিমাণ সাড়ে ৯ শতাংশ থেকে ১৪ শতাংশের মধ্যে।

এসব পরিসংখ্যান ব্যবহার করে কি বলা যায়, বাজারে অর্থ সরবরাহের পরিমাণ মাত্রাতিরিক্ত হারে বেড়েছে? এবং তা কালোবাজার, হুন্ডি, অর্থ পাচার ও ঘুস-দুর্নীতি বৃদ্ধির পরিচায়ক? ধরা যাক সেপ্টেম্বর ২০২০ এবং সেপ্টেম্বর ২০২২-এর মধ্যবর্তী ঘটনার কথা। এ সময়ে প্রথমে বেড়েছে প্রায় ১১ শতাংশ এবং পরবর্তী বছরে বেড়েছে ১৪ শতাংশ। এই সময়ে কি একটা বড় ঘটনা ঘটেনি? তেলের মূল্যবৃদ্ধি কি এ সময়ের ঘটনা নয়? তেলের মূল্য ৪০-৫২ শতাংশ বৃদ্ধির ফলে রাতারাতি মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায়। ১০ টাকার পণ্য কিনতে হয় ১৫ টাকা দিয়ে। এর অর্থ কী? এর অর্থ হচ্ছে, দৈনন্দিন লেনদেন করতে বেশি টাকা লাগবে।

বস্তুত বাজারের ক্যাশ দৈনন্দিন লেনদেনের জন্য, জরুরি চাহিদা মেটানোর জন্য। মূল্যস্ফীতি বাড়লে দৈনন্দির লেনদেনের জন্য টাকার/ক্যাশের চাহিদা বাড়ে। অর্থনীতি বড় হলে, গ্রামীণ অর্থনীতি বড় হলে এবং এর বিপরীতে ‘মানিটাইজেশনের’ গতি ধীর হলে ক্যাশের প্রয়োজন বাড়বে না? বস্তুত বাংলাদেশ ব্যাংক যখন মানিটাইজেশনের পরিকল্পনা করে তখন জিডিপি প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি ও মানিটাইজেশনকে হিসাবে নিয়ে পরিকল্পনা করে। স্বাভাবিক কারণেই বাজারে ‘মানি’ বাড়বে এবং তা থাকবে চার আকারে : তলবি আমানত, মেয়াদি আমানত, ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকে গচ্ছিত টাকা।

এর ওপর ভিত্তি করেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘মানিকে’ ন্যারো মানি, ব্রড মানি হিসাবে হিসাবায়ন করে। একটির সঙ্গে আরেকটির সম্পর্ক গভীর। ক্যাশের সঙ্গে অন্য দুটির সম্পর্ক নিবিড়। সবই বাড়ছে। অতএব, মন্তব্য করার সময় সব কিছুকেই হিসাবে নিতে হবে। ঢালাও মন্তব্য করা বিবেচনাপ্রসূত হবে না। অহেতুক আতঙ্ক সৃষ্টি হবে। যেমন ‘হুন্ডি’। ‘হুন্ডি’ নগদে হয় সামান্য। বেশিরভাগ আজকাল হয় ওভার ইনভয়েসিং এবং আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে। পণ্যের দাম বেশি/কম করে অর্থ পাচার হয় বৈদেশিক বাণিজ্যের মাধ্যমে। এখানে নগদ অর্থের লেনদেন কোথায়?

বর্তমান ক্ষেত্রে ২০১৯-২০ অর্থবছরে হঠাৎ করে বাজারে নগদ অর্থের পরিমাণ মাত্রাতিরিক্ত হারে কেন বাড়ল, তা গভীরভাবে বিচার-বিশ্লেষণ করে দেখা দরকার। অন্যান্য বছর, এমনকি সেপ্টেম্বর ২০২২-এর পরিসংখ্যানও বাজারে মাত্রাতিরিক্ত নগদ অর্থের পরিচয় বহন করে কি? তারপরও কথা আছে। নগদ অর্থ বাড়ার কিছু যৌক্তিক কারণ আছে ইদানীংকালে। প্রথমত, করোনার প্রভাব। এ সময়ে মানুষ ঘরে নগদ অর্থ বেশি রাখত জরুরি প্রয়োজন মেটানোর জন্য। দ্বিতীয়ত, ইদানীং হচ্ছে অতিরিক্ত মূল্যস্ফীতি, যা ১০ শতাংশের উপরে। এর জন্য দৈনন্দিন লেনদেনের প্রয়োজনে বেশি ক্যাশ দরকার হয়।

তৃতীয়ত, সুদনীতি। মানুষ ব্যাংকে টাকা রাখবে কেন? ব্যাংক তো কোনো সুদ দেয় না। মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশের উপরে। আমানতের ওপর সুদের হার ৫ থেকে ৭ শতাংশ। ব্যাংকে টাকা রাখা আর না রাখা সমান। ব্যাংকে টাকা রাখার কোনো প্রণোদনা নেই। চতুর্থত, মানি লন্ডারিং প্রিভেনশন আইন। যতটুকু জানি, বর্তমানে ১০ লাখের উপর নগদ জমা এবং তুলতে গেলেই ব্যাংক প্রশ্ন করে। বাংলাদেশ ব্যাংকে রিপোর্ট পাঠায়। এই ভয়ও কাজ করে। আর কিছু লেনদেন আছে, যার একটা অংশ নগদে করতেই হয়। যেমন জমি বা ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে। এ জন্য অর্থমন্ত্রী ‘সিস্টেম’কে দায়ী করেছেন।

ড. আর এম দেবনাথ : অর্থনীতি বিশ্লেষক; সাবেক শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

নীতি দুর্নীতি অর্থনীতি

বাজারে নগদ অর্থ কি আসলেই বেশি?

 ড. আর এম দেবনাথ 
০৩ ডিসেম্বর ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

‘ক্যাশ’ মানে নগদ টাকা। নগদ টাকা বা ক্যাশ পছন্দ করে না এমন কোনো মানুষ আছে? ক্যাশ বস্তুত সবাই চায়। ‘চেকের’ চেয়ে বেশি চায়। ধরা যাক কোটি কোটি টাকার নোট (ক্যাশ) রাস্তায় পড়ে আছে। বদ্ধ উন্মাদ থেকে শুরু করে সুস্থ মানুষ-কে তা থেকে কিছু তুলে নেবে না পকেটে, পারলে ব্যাগে! এই ক্যাশের ওপর একটা গানই আছে-‘দে মা আমায় তহশীলদারি’। ক্যাশ এত কাম্য ও জরুরি। এহেন ক্যাশ বা নগদ টাকা থাকতে পারে আমাদের যার যার হাতে, যাকে ব্যাংকিংয়ের পরিভাষায় বলা হয় ‘ক্যাশ কারেন্সি আউটসাইড ব্যাংকস’।

আবার কিছু ক্যাশ থাকে ব্যাংকের ভল্টে, যা থেকে ব্যাংক গ্রাহকদের দৈনন্দিন উত্তোলন চাহিদা মেটানো হয়। কিছু ক্যাশ থাকে বাংলাদেশ ব্যাংকের হাতে। এসবের বিভিন্ন নাম আছে ব্যাংকিং হিসাবে-রিজার্ভ মানি, ন্যারো মানি-১, ব্রড মানি-২ এবং ব্রড মানি-৩। এগুলোর হিসাব করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিয়মিত। কোনটা বাড়ল, লোকটা কমল, কোনটা স্থিতিশীল-এসব দেখে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঠিক করে তার মুদ্রানীতি। এই অর্থে মানি বা টাকার হিসাব খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর দ্বারা বোঝা যায় আমরা অর্থনীতি কোন পর্যায়ে আছি, অর্থনীতিতে নগদ অর্থ বেশি নাকি কম, কত থাকা উচিত ইত্যাদি।

এখানেই বলা দরকার, গত সপ্তাহে অন্তত দুটি কাগজে আমি নগদ অর্থের একটা হিসাব দেখেছি। আমাদের অর্থনীতিতে বা খোলাবাজারে কী পরিমাণ টাকা চালু আছে, অতীতে কত ছিল ইত্যাদি। প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে, আমাদের বাজারে টাকা বা নগদ অর্থের প্রচলন অনেকটা বেশি। ধীরে ধীরে তা বাড়ছে। এর সঙ্গে সম্পর্কিত করা হয়েছে ‘কালো টাকা’, হুন্ডি, অর্থ পাচার, ঘুস-দুর্নীতি ইত্যাদির।

বলা হয়েছে, অর্থনীতিতে ক্যাশের ব্যবহার বৃদ্ধি কালো অর্থনীতির ইঙ্গিতবহ। অতএব তা পরিত্যাজ্য। হওয়া উচিত ‘ক্যাশলেস অর্থনীতি’। অর্থাৎ নগদ অর্থের পরিবর্তে ব্যবহার হবে চেক ও ডিজিটাল ব্যবস্থা। ব্যবহার হবে ডেবিট কার্ড, ক্রেডিট কার্ড, এজেন্ট ব্যাংকিং, অনলাইন ব্যাংকিং ইত্যাদি। আক্ষেপ প্রকাশ করে বলা হয়েছে, ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের প্রসার সত্ত্বেও বাজারে/অর্থনীতিতে ক্যাশের ব্যবহার আমাদের দেশে বেশি হচ্ছে। উন্নত দেশে এর চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত।

প্রতিবেদন দুটি পড়তে পড়তে আমার মনে পড়ে গেল মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের কথা। দেশ রক্তাক্ত যুদ্ধের পর স্বাধীন হয়েছে। সাবেক পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থিত স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানের (এসবিপি) বদলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আমাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংক-বাংলাদেশ ব্যাংক। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো রাষ্ট্রায়ত্ত। গোটা ব্যাংক খাত সরকারি মালিকানায়। চারদিকে দেশ গড়ার অঙ্গীকার। উত্তেজনা সর্বত্র। কী কী করতে হবে, কী কী বিষয়ে দেরি করা যাবে না-ইত্যাদির আলোচনা সর্বত্র।

দেশপ্রেমে সারা দেশ উজ্জীবিত। মুক্তিযোদ্ধাদের তখন সবকিছুতেই ‘তাড়াতাড়ি’। তখনকার বাংলাদেশের অর্থনীতির এক নম্বর কাজ ছিল অর্থনীতিকে সচল করা। মিল-ফ্যাক্টরি চালু করা, ব্যবসা পুনরায় চালু করা। সর্বত্র উদ্দীপনা। ১৯৭৩ সাল। ব্যাংকে ব্যাংকে আলোচনা ক্যাশলেস সোসাইটির, নগদবিহীন অর্থনীতির। পাশাপাশি চলছে গ্রামাঞ্চলে ব্যাংক শাখা খোলার তোড়জোড়। আওয়াজ একটাই-‘রুরাল ডেভেলপমেন্ট’। সেমিনার, ওয়ার্কশপ, আলোচনা সভা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশ আসছে ঘনঘন। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) গঠিত হয় ১৯৭৫-৭৬-এর দিকে। ব্যাংকারদের প্রশিক্ষণের জন্য। নতুন অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্যে। জেলায় জেলায় সেমিনার, ওয়ার্কশপ-‘রুলার ডেভেলপমেন্ট’, ‘মানিটাইজেশন’ ইত্যাদি হচ্ছে মুখ্য বিষয়।

ক্যাশলেস অর্থনীতির কথা বাংলাদেশ ব্যাংকে গেলেই শোনা যায়। এ কে এন আহমেদ (ব্যাংকার) তখন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর; এরপর নুরুল ইসলাম (সিএসপি)। আজ ৫০/৫২ বছর পর আবারও শুনতে পাচ্ছি ‘ক্যাশলেস’ সোসাইটির কথা। দিকে দিকে শোনা যাচ্ছে ডিজিটালাইজেশনের কথা, ব্যাংকিং সেবা গ্রামেগঞ্জে ছড়িয়ে দেওয়ার কথা। ইচ্ছা শতভাগ।

কিন্তু উল্লিখিত প্রতিবেদন দুটি পড়ে মনে হচ্ছে আমরা উলটো পথে হাঁটছি। ক্যাশের ব্যবহার, নগদ টাকার ব্যবহার কমবে তো দূরের কথা, বরং বাড়ছে। এখানেই প্রশ্ন, আমরা কি সত্যি সত্যি বেশি ক্যাশ ব্যবহার করছি, না ক্যাশ ব্যবহার সীমার মধ্যেই আছে? ‘ক্যাশ ব্যবহার বেশি’ মানেই কি তা হুন্ডি, কালোবাজার, টাকা পাচার, ঘুস-দুর্নীতি ইত্যাদির পরিচায়ক? কঠিন প্রশ্ন, জবাবও কঠিন। সরলীকরণের কোনো সুযোগ নেই। এজন্যই প্রথমে দেখা দরকার ক্যাশের ব্যবহার আজকের দিনে কেমন।

এর পরিসংখ্যানের জন্য যেতে হবে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশনা ‘মান্থলি ইকোনমিক ট্রেন্ডসে’। সর্বশেষ এ সংক্রান্ত প্রকাশনা সেপ্টেম্বরের। অবশ্যই ২০২২ সালের। এর সঙ্গে যোগ করতে হবে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন দুটির পরিসংখ্যান। দেখা যাচ্ছে, ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ‘কারেন্সি আউটসাইড ব্যাংকস’ বা নগদ অর্থ বাজারে ছিল ১ লাখ ৮৯ হাজার ১৯৮ কোটি টাকা। ২০২১ সালের একই সময়ে এর পরিমাণ বেড়ে হয় ২ লাখ ৯ হাজার ৬১৮ কোটি টাকা। আর ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে হয় ২ লাখ ৩৯ হাজার ৯৯৮ কোটি টাকা।

তাহলে দেখা যাচ্ছে, ২০২০-এর সেপ্টেম্বরের তুলনায় পরবর্তী এক বছরে বাজারে নগদ অর্থ বেড়েছে ১০ দশমিক ৭৯ শতাংশ। আর এর পরবর্তী বছরে বেড়েছে ১৪ শতাংশ। আবার অন্য এক হিসাবে দেখা যাচ্ছে, ২০২২-এর জুনের তুলনায় একই বছরের সেপ্টেম্বরের মধ্যে বেড়েছে মাত্র শূন্য ১ দশমিক ৯ ভাগ। এখন প্রশ্ন, এই বৃদ্ধি কি মাত্রাতিরিক্ত? আবার অন্য হিসাবও আছে-তা হচ্ছে অর্থবছরের হিসাবে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে পূর্ববর্তী অর্থবছরের তুলনায় বাজারে নগদ অর্থের সরবরাহ বৃদ্ধি পায় ৯ দশমিক ৪৮ শতাংশ হারে। ২০১৯-২০-এ হঠাৎ তা বৃদ্ধি পায় ২৪ দশমিক ৫ শতাংশ হারে। ২০২০-২১-এ নগদ অর্থের পরিমাণ বৃদ্ধি পায় মাত্র ৯ দশমিক ৫ শতাংশ হারে। আর ২০২১-২২ অর্থবছরে এর পরিমাণ মাত্র ১২ দশমিক ৮৫ শতাংশ। একমাত্র ২০১৯-২০ অর্থবছর বাদ দিলে দেখা যাচ্ছে, নগদ অর্থ বৃদ্ধির পরিমাণ সাড়ে ৯ শতাংশ থেকে ১৪ শতাংশের মধ্যে।

এসব পরিসংখ্যান ব্যবহার করে কি বলা যায়, বাজারে অর্থ সরবরাহের পরিমাণ মাত্রাতিরিক্ত হারে বেড়েছে? এবং তা কালোবাজার, হুন্ডি, অর্থ পাচার ও ঘুস-দুর্নীতি বৃদ্ধির পরিচায়ক? ধরা যাক সেপ্টেম্বর ২০২০ এবং সেপ্টেম্বর ২০২২-এর মধ্যবর্তী ঘটনার কথা। এ সময়ে প্রথমে বেড়েছে প্রায় ১১ শতাংশ এবং পরবর্তী বছরে বেড়েছে ১৪ শতাংশ। এই সময়ে কি একটা বড় ঘটনা ঘটেনি? তেলের মূল্যবৃদ্ধি কি এ সময়ের ঘটনা নয়? তেলের মূল্য ৪০-৫২ শতাংশ বৃদ্ধির ফলে রাতারাতি মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায়। ১০ টাকার পণ্য কিনতে হয় ১৫ টাকা দিয়ে। এর অর্থ কী? এর অর্থ হচ্ছে, দৈনন্দিন লেনদেন করতে বেশি টাকা লাগবে।

বস্তুত বাজারের ক্যাশ দৈনন্দিন লেনদেনের জন্য, জরুরি চাহিদা মেটানোর জন্য। মূল্যস্ফীতি বাড়লে দৈনন্দির লেনদেনের জন্য টাকার/ক্যাশের চাহিদা বাড়ে। অর্থনীতি বড় হলে, গ্রামীণ অর্থনীতি বড় হলে এবং এর বিপরীতে ‘মানিটাইজেশনের’ গতি ধীর হলে ক্যাশের প্রয়োজন বাড়বে না? বস্তুত বাংলাদেশ ব্যাংক যখন মানিটাইজেশনের পরিকল্পনা করে তখন জিডিপি প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি ও মানিটাইজেশনকে হিসাবে নিয়ে পরিকল্পনা করে। স্বাভাবিক কারণেই বাজারে ‘মানি’ বাড়বে এবং তা থাকবে চার আকারে : তলবি আমানত, মেয়াদি আমানত, ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকে গচ্ছিত টাকা।

এর ওপর ভিত্তি করেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘মানিকে’ ন্যারো মানি, ব্রড মানি হিসাবে হিসাবায়ন করে। একটির সঙ্গে আরেকটির সম্পর্ক গভীর। ক্যাশের সঙ্গে অন্য দুটির সম্পর্ক নিবিড়। সবই বাড়ছে। অতএব, মন্তব্য করার সময় সব কিছুকেই হিসাবে নিতে হবে। ঢালাও মন্তব্য করা বিবেচনাপ্রসূত হবে না। অহেতুক আতঙ্ক সৃষ্টি হবে। যেমন ‘হুন্ডি’। ‘হুন্ডি’ নগদে হয় সামান্য। বেশিরভাগ আজকাল হয় ওভার ইনভয়েসিং এবং আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে। পণ্যের দাম বেশি/কম করে অর্থ পাচার হয় বৈদেশিক বাণিজ্যের মাধ্যমে। এখানে নগদ অর্থের লেনদেন কোথায়?

বর্তমান ক্ষেত্রে ২০১৯-২০ অর্থবছরে হঠাৎ করে বাজারে নগদ অর্থের পরিমাণ মাত্রাতিরিক্ত হারে কেন বাড়ল, তা গভীরভাবে বিচার-বিশ্লেষণ করে দেখা দরকার। অন্যান্য বছর, এমনকি সেপ্টেম্বর ২০২২-এর পরিসংখ্যানও বাজারে মাত্রাতিরিক্ত নগদ অর্থের পরিচয় বহন করে কি? তারপরও কথা আছে। নগদ অর্থ বাড়ার কিছু যৌক্তিক কারণ আছে ইদানীংকালে। প্রথমত, করোনার প্রভাব। এ সময়ে মানুষ ঘরে নগদ অর্থ বেশি রাখত জরুরি প্রয়োজন মেটানোর জন্য। দ্বিতীয়ত, ইদানীং হচ্ছে অতিরিক্ত মূল্যস্ফীতি, যা ১০ শতাংশের উপরে। এর জন্য দৈনন্দিন লেনদেনের প্রয়োজনে বেশি ক্যাশ দরকার হয়।

তৃতীয়ত, সুদনীতি। মানুষ ব্যাংকে টাকা রাখবে কেন? ব্যাংক তো কোনো সুদ দেয় না। মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশের উপরে। আমানতের ওপর সুদের হার ৫ থেকে ৭ শতাংশ। ব্যাংকে টাকা রাখা আর না রাখা সমান। ব্যাংকে টাকা রাখার কোনো প্রণোদনা নেই। চতুর্থত, মানি লন্ডারিং প্রিভেনশন আইন। যতটুকু জানি, বর্তমানে ১০ লাখের উপর নগদ জমা এবং তুলতে গেলেই ব্যাংক প্রশ্ন করে। বাংলাদেশ ব্যাংকে রিপোর্ট পাঠায়। এই ভয়ও কাজ করে। আর কিছু লেনদেন আছে, যার একটা অংশ নগদে করতেই হয়। যেমন জমি বা ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে। এ জন্য অর্থমন্ত্রী ‘সিস্টেম’কে দায়ী করেছেন।

ড. আর এম দেবনাথ : অর্থনীতি বিশ্লেষক; সাবেক শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন