দীর্ঘসূত্রতায় প্রকল্পের ব্যয়বৃদ্ধি কি অপচয় নয়?
jugantor
দীর্ঘসূত্রতায় প্রকল্পের ব্যয়বৃদ্ধি কি অপচয় নয়?

  মুঈদ রহমান  

০৪ ডিসেম্বর ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বর্তমানে পত্রিকার পাতা খুললেই পাওয়া যাচ্ছে নানা ধরনের হতাশা আর উদ্বেগের খবর। সংবাদগুলো আশার আলো দেখাতে পারছে না। নেতিবাচক সংবাদ কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।

রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক প্রভৃতি কোনো বিষয়েই স্বস্তির কোনো খবর চোখে পড়ছে না। আবার কোনো উৎকণ্ঠার খবর প্রকাশে শঙ্কিত হয়ে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করলে সরকারসমর্থকদের পক্ষ থেকে পালটা প্রতিক্রিয়ায় বৈপরীত্য দেখা যাচ্ছে।

সরকারের উপর মহল থেকে আগামী দিনগুলো নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করলে তাকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নেওয়া হয়; কিন্তু কোনো গবেষকের উৎকণ্ঠার বিপরীতে তাকে হেয়প্রতিপন্ন করতে পিছপা হন না। একজন খ্যাতিমান গবেষক ২০২৭ সালে আমাদের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য সংকটের কথা বলায় অনেক সরকারসমর্থক অশালীন ভাষায় তার বক্তব্যের জবাব দিয়েছেন। তাই সত্য প্রকাশ এখন বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। এগুলোকে অনেকে ফ্যাসিজমের আলামত বলে মনে করেন। তারপরও আমাদের সত্য বলা থেকে বিরত থাকলে চলবে না।

দেখা যাক, আগামী দিনগুলো সম্পর্কে খোদ প্রধানমন্ত্রী কী ভাবছেন। পরিস্থিতির কেমন মূল্যায়ন করছেন। গত ২৭ নভেম্বর সচিবদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। প্রায় এক বছরেরও বেশি সময় পর এ ধরনের বৈঠক অনুষ্ঠিত হলো। বৈঠকে ২০২৩ সাল আমাদের জীবনযাত্রার ক্ষেত্রে আরও ‘কঠিন’ হতে পারে বলে মতামত ব্যক্ত করা হয়। এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দুর্ভিক্ষ আমাদের দেশকে কখনই যেন ক্ষতিগ্রস্ত করতে না পারে, সেজন্য এখন থেকেই আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। ... এটি আমার কথা নয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বলা হচ্ছে যে, বিশ্বে দুর্ভিক্ষ দেখা দিতে পারে।...আমরা এখনই যে বিপদে পড়েছি, তা কিন্তু নয়। কিন্তু আমার কথাটা হচ্ছে, আমাদের আগাম ব্যবস্থা নিতে হবে, যেন ভবিষ্যতে দেশ কোনো বিপদে না পড়ে বা দেশের মানুষ না পড়ে। আমাদের সেই সতর্কতাটা একান্তভাবে দরকার এবং সেই সতর্কবার্তাটাই কিন্তু আমাদের দিচ্ছে।’

সচিবদের এ বৈঠকে যেসব বিষয়ে সহমত প্রকাশ করা হয়েছে, তার মধ্যে আছে-ইসলামী ব্যাংকসহ কয়েকটি ব্যাংকের প্রকৃত চিত্র অবহিত করার নির্দেশ; জ্বালানি, সার ও খাদ্যপণ্যের আমদানির ওপর গুরুত্ব দেওয়া; বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পতিত প্রায় আড়াই লাখ একর জমিতে উৎপাদন করার উদ্যোগ এবং সরকারিভাবে খাদ্যশস্য মজুতের পরিমাণ যেন কোনোক্রমেই ১৫ লাখ টনের নিচে না নামে সেদিকে দৃষ্টি রাখা।

অবশ্য এরই মাঝে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের চলতি বছরের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত সরকারিভাবে খাদ্যশস্য মজুতের একটি তথ্য পাওয়া গেছে। তাতে দেখা যায়, সরকারিভাবে দেশে মোট খাদ্যশস্য মজুতের পরিমাণ ১৬ লাখ ৯ হাজার ৫ টন। এর মধ্যে চাল ১৩ লাখ ২৩ হাজার ৭২৫ টন, গম ২ লাখ ৮২ হাজার ৫৯৪ টন এবং ধান মজুত আছে ৪ হাজার ১৩৩ টন (ধানকে চালের আকারে রূপান্তরিত করলে পরিমাণ হবে প্রায় ২৬০০ টন)। বর্তমানে অবস্থা এমনই দাঁড়িয়েছে যে, দলীয় আনুগত্যের বাইরে থেকে যে কোনো মূল্যায়ন কিংবা আশঙ্কা প্রকাশ অমার্জিত অপরাধ হিসাবে গণ্য করা হচ্ছে। সেক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর সাবধানবাণি সমালোচনাকারীদের রক্ষাকবচ হিসাবে কাজ করতে পারে।

বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম এরই মধ্যে সরকারের বিভিন্ন প্রকল্প বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর মনোভাব ও নির্দেশনা তুলে ধরেছেন। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্য ছিল-প্রকল্প করার সময় সম্ভাব্যতা যাচাই এবং প্রাক্কলিত ব্যয় যেন ঠিকমতো ধরা হয়। আর দক্ষ জনবল দিয়ে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে।

বর্তমান সময়ের কথা বিবেচনায় নিয়ে অগ্রাধিকার ঠিক করে প্রকল্প হাতে নিতে হবে। বিশেষ করে বিদেশি সাহায্য বা ঋণে চলা যেসব প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে, সেগুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে। বর্তমান সংকটকালে সরকারের প্রধান নির্বাহীর কাছ থেকে আমরা এমন নির্দেশনাই প্রত্যাশা করি। কিন্তু বিস্মিত হই, যখন দেখি এসব মূল্যবান নির্দেশনার বাস্তব রূপ প্রতিফলিত হয় না। কেন হয় না, কার ইশারায় হয় না, তা আমাদের মতো আমজনতার জানার উপায় ও ক্ষমতা নেই।

চলমান অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকটে মূল আলোচনার বিষয়টি দখল করে আছে ‘প্রকল্প’। দায়িত্বপ্রাপ্তদের গাফিলতি, নকশায় ত্রুটি, অহেতুক দীর্ঘসূত্রতা, বাস্তবায়নে নানা অনিয়ম, পণ্যমূল্য বেড়ে যাওয়া, যথাসময়ে অর্থ না পাওয়া এবং নতুন নতুন কাজ অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কারণে দেশের ১০টি চলমান প্রকল্পে অতিরিক্ত খরচ হবে ৫২ হাজার ৪৪১ কোটি ৯৫ লাখ টাকা; যা দিয়ে আমরা আরও প্রায় দুটি স্বপ্নের পদ্মা সেতু নির্মাণ করতে পারতাম। চলতি প্রকল্পগুলোর মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে আড়াই থেকে নয় বছর পর্যন্ত। যুগান্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী যে ১০টি প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে ও ব্যয়ে শেষ হয়নি সেগুলো হলো-এক. পদ্মা সেতু; দুই. কর্ণফুলী টানেল নির্মাণ; তিন. সাপোর্ট টু ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে পিপিপি প্রজেক্ট; চার. পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ; পাঁচ. দোহাজারি-রামু-গুনদুম রেলপথ নির্মাণ; ছয়. বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি); সাত. খুলনা-মোংলা রেলপথ নির্মাণ; আট. সিরাজগঞ্জ শিল্পপার্ক স্থাপন; নয়. চিটাগাং সিটি আউটার রিংরোড এবং দশ. খুলনা শিপইয়ার্ড সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্প। প্রকল্পগুলোর মূল অনুমোদিত ব্যয় ধরা হয়েছিল ৬৩ হাজার ৭৫৭ কোটি টাকা। অথচ এ মুহূর্তে পরিমাণটা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ১৯৮ কোটি টাকা। টাকার অঙ্কটা বেড়ে যাওয়ার পেছনে প্রকল্পগুলোর মেয়াদ বৃদ্ধি একটা বড় কারণ। উল্লিখিত প্রকল্পগুলোর মেয়াদ বৃদ্ধির চিত্রটি দেখলে বিস্মিত হওয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। পদ্মা সেতুর নির্মাণের সময়কাল ধরা হয়েছিল ৮ বছর; প্রকল্পটি শেষ হতে সময় লেগেছে ১৪ বছর। কর্ণফুলী টানেলের সময় ধরা হয়েছিল ৪ বছর, যা পরবর্তী সময়ে ৮ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে সাড়ে ৭ বছর সময় বেড়ে ৫ বছরের প্রকল্পটি মেয়াদকাল সাড়ে ১২ বছর হয়েছে। পদ্মা সেতুতে রেল-সংযোগ একটি বড় প্রকল্প। এর মেয়াদ ধরা হয়েছিল ৫ বছর, কিন্তু বাস্তবে সময়টা ৮ বছরেরও বেশি হতে পারে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সময়ক্ষেপণ হয়েছে দোহাজারী-রামু-গুনদুম প্রকল্পটিতে। প্রকল্পটি প্রাথমিক পর্যায়ে সাড়ে ৩ বছরের মধ্যে সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, তা ১২ বছরেও শেষ করা যাবে না। ৪ বছর মেয়াদি বিআরটি প্রকল্প সময় নিচ্ছে ১১ বছর। সর্বোচ্চ সময়ক্ষেপণ হচ্ছে খুলনা-মোংলা রেলপথ; যা নির্মাণের সময়কাল ধরা হয়েছিল ৩ বছর, এখন তা ১২ বছর লাগবে। তাছাড়া সিরাজগঞ্জ শিল্পপার্ক নির্মাণে অতিরিক্ত সময় লাগবে সাড়ে ৮ বছর আর চিটাগাং সিটি আউটার রিংরোড প্রকল্পে অতিরিক্ত সময় লাগবে ৮ বছর।

কোনো দেশে কোনো বিষয়ে সমস্যা থাকা অস্বাভাবিক বিষয় নয়। সমস্যা চিহ্নিত হলে সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। কিন্তু একই সমস্যা বারবার উপস্থিত হওয়া এবং কোনো প্রকার প্রতিকার না করে স্থায়ী রূপ দেওয়া কারও কাম্য নয়। আমাদের দেশে সমস্যা সমাধানের প্রধান অন্তরায় হলো নীতিনির্ধারকদের অনীহা। তারা কোনো গুরুতর সমস্যায় বিচলিত না হয়ে তাকে স্বাভাবিক হিসাবেই ধরে নিতে অভ্যস্ত। যে কারণে এ অর্থনষ্টকেও তারা আমলে নিচ্ছেন না। প্রকল্পগুলোর এ আকাশচুম্বী ব্যয়বৃদ্ধির প্রতিক্রিয়ায় বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সচিব আবু হেনা মুর্শেদ জামানের বক্তব্য হলো-এ বাড়তি ব্যয়কে অপচয় বলা যায় না। কারণ অনেক সময় সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় ভুল থাকে। আবার সমীক্ষা ঠিক থাকলে বাস্তবতার কারণে নতুন অঙ্গ অন্তর্ভুক্তি কিংবা পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটে। আবার বর্তমানে যেমন ডলারের দাম বাড়ায় অনেক ক্ষেত্রে খরচ বাড়ছে। ফলে তখন ব্যয়বৃদ্ধি বা সংশোধন ছাড়া উপায় থাকে না। আর একটি প্রকল্প যখন চলমান থাকে, তখন সেটি শেষ না করলে তো এরই মধ্যে করা বিনিয়োগ নষ্ট হয়ে যাবে। ফলে শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন করতে হয়। ব্যস! এমনতর আত্মতৃপ্তি থাকলে তো আর কথা চলে না। ডলারের দাম বৃদ্ধির সময়টা এক বছরও হয়নি। কিন্তু প্রকল্পের মেয়াদ ৯ বছর বাড়ল কেন? এর কোনো জবাব নেই।

তাই প্রধানমন্ত্রীর কেবল নির্দেশনা কোনো কার্যকর ফল বয়ে আনবে বলে মনে হয় না। প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার আওতায় নিয়ে আসতে হবে। গুটিকয় মানুষের গাফিলতি, অনিয়ম ও দুর্নীতির দায় সাধারণ মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া একরকম অবিচার। যে দেশের মানুষ আধাপেটা খেয়ে জীবনযাপন করে, সে দেশের মানুষ ৫২ হাজার কোটি টাকার অপচয়ের ভার বহন করবে কীভাবে?

মুঈদ রহমান : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

দীর্ঘসূত্রতায় প্রকল্পের ব্যয়বৃদ্ধি কি অপচয় নয়?

 মুঈদ রহমান 
০৪ ডিসেম্বর ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বর্তমানে পত্রিকার পাতা খুললেই পাওয়া যাচ্ছে নানা ধরনের হতাশা আর উদ্বেগের খবর। সংবাদগুলো আশার আলো দেখাতে পারছে না। নেতিবাচক সংবাদ কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।

রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক প্রভৃতি কোনো বিষয়েই স্বস্তির কোনো খবর চোখে পড়ছে না। আবার কোনো উৎকণ্ঠার খবর প্রকাশে শঙ্কিত হয়ে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করলে সরকারসমর্থকদের পক্ষ থেকে পালটা প্রতিক্রিয়ায় বৈপরীত্য দেখা যাচ্ছে।

সরকারের উপর মহল থেকে আগামী দিনগুলো নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করলে তাকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নেওয়া হয়; কিন্তু কোনো গবেষকের উৎকণ্ঠার বিপরীতে তাকে হেয়প্রতিপন্ন করতে পিছপা হন না। একজন খ্যাতিমান গবেষক ২০২৭ সালে আমাদের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য সংকটের কথা বলায় অনেক সরকারসমর্থক অশালীন ভাষায় তার বক্তব্যের জবাব দিয়েছেন। তাই সত্য প্রকাশ এখন বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। এগুলোকে অনেকে ফ্যাসিজমের আলামত বলে মনে করেন। তারপরও আমাদের সত্য বলা থেকে বিরত থাকলে চলবে না।

দেখা যাক, আগামী দিনগুলো সম্পর্কে খোদ প্রধানমন্ত্রী কী ভাবছেন। পরিস্থিতির কেমন মূল্যায়ন করছেন। গত ২৭ নভেম্বর সচিবদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। প্রায় এক বছরেরও বেশি সময় পর এ ধরনের বৈঠক অনুষ্ঠিত হলো। বৈঠকে ২০২৩ সাল আমাদের জীবনযাত্রার ক্ষেত্রে আরও ‘কঠিন’ হতে পারে বলে মতামত ব্যক্ত করা হয়। এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দুর্ভিক্ষ আমাদের দেশকে কখনই যেন ক্ষতিগ্রস্ত করতে না পারে, সেজন্য এখন থেকেই আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। ... এটি আমার কথা নয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বলা হচ্ছে যে, বিশ্বে দুর্ভিক্ষ দেখা দিতে পারে।...আমরা এখনই যে বিপদে পড়েছি, তা কিন্তু নয়। কিন্তু আমার কথাটা হচ্ছে, আমাদের আগাম ব্যবস্থা নিতে হবে, যেন ভবিষ্যতে দেশ কোনো বিপদে না পড়ে বা দেশের মানুষ না পড়ে। আমাদের সেই সতর্কতাটা একান্তভাবে দরকার এবং সেই সতর্কবার্তাটাই কিন্তু আমাদের দিচ্ছে।’

সচিবদের এ বৈঠকে যেসব বিষয়ে সহমত প্রকাশ করা হয়েছে, তার মধ্যে আছে-ইসলামী ব্যাংকসহ কয়েকটি ব্যাংকের প্রকৃত চিত্র অবহিত করার নির্দেশ; জ্বালানি, সার ও খাদ্যপণ্যের আমদানির ওপর গুরুত্ব দেওয়া; বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পতিত প্রায় আড়াই লাখ একর জমিতে উৎপাদন করার উদ্যোগ এবং সরকারিভাবে খাদ্যশস্য মজুতের পরিমাণ যেন কোনোক্রমেই ১৫ লাখ টনের নিচে না নামে সেদিকে দৃষ্টি রাখা।

অবশ্য এরই মাঝে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের চলতি বছরের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত সরকারিভাবে খাদ্যশস্য মজুতের একটি তথ্য পাওয়া গেছে। তাতে দেখা যায়, সরকারিভাবে দেশে মোট খাদ্যশস্য মজুতের পরিমাণ ১৬ লাখ ৯ হাজার ৫ টন। এর মধ্যে চাল ১৩ লাখ ২৩ হাজার ৭২৫ টন, গম ২ লাখ ৮২ হাজার ৫৯৪ টন এবং ধান মজুত আছে ৪ হাজার ১৩৩ টন (ধানকে চালের আকারে রূপান্তরিত করলে পরিমাণ হবে প্রায় ২৬০০ টন)। বর্তমানে অবস্থা এমনই দাঁড়িয়েছে যে, দলীয় আনুগত্যের বাইরে থেকে যে কোনো মূল্যায়ন কিংবা আশঙ্কা প্রকাশ অমার্জিত অপরাধ হিসাবে গণ্য করা হচ্ছে। সেক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর সাবধানবাণি সমালোচনাকারীদের রক্ষাকবচ হিসাবে কাজ করতে পারে।

বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম এরই মধ্যে সরকারের বিভিন্ন প্রকল্প বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর মনোভাব ও নির্দেশনা তুলে ধরেছেন। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্য ছিল-প্রকল্প করার সময় সম্ভাব্যতা যাচাই এবং প্রাক্কলিত ব্যয় যেন ঠিকমতো ধরা হয়। আর দক্ষ জনবল দিয়ে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে।

বর্তমান সময়ের কথা বিবেচনায় নিয়ে অগ্রাধিকার ঠিক করে প্রকল্প হাতে নিতে হবে। বিশেষ করে বিদেশি সাহায্য বা ঋণে চলা যেসব প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে, সেগুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে। বর্তমান সংকটকালে সরকারের প্রধান নির্বাহীর কাছ থেকে আমরা এমন নির্দেশনাই প্রত্যাশা করি। কিন্তু বিস্মিত হই, যখন দেখি এসব মূল্যবান নির্দেশনার বাস্তব রূপ প্রতিফলিত হয় না। কেন হয় না, কার ইশারায় হয় না, তা আমাদের মতো আমজনতার জানার উপায় ও ক্ষমতা নেই।

চলমান অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকটে মূল আলোচনার বিষয়টি দখল করে আছে ‘প্রকল্প’। দায়িত্বপ্রাপ্তদের গাফিলতি, নকশায় ত্রুটি, অহেতুক দীর্ঘসূত্রতা, বাস্তবায়নে নানা অনিয়ম, পণ্যমূল্য বেড়ে যাওয়া, যথাসময়ে অর্থ না পাওয়া এবং নতুন নতুন কাজ অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কারণে দেশের ১০টি চলমান প্রকল্পে অতিরিক্ত খরচ হবে ৫২ হাজার ৪৪১ কোটি ৯৫ লাখ টাকা; যা দিয়ে আমরা আরও প্রায় দুটি স্বপ্নের পদ্মা সেতু নির্মাণ করতে পারতাম। চলতি প্রকল্পগুলোর মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে আড়াই থেকে নয় বছর পর্যন্ত। যুগান্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী যে ১০টি প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে ও ব্যয়ে শেষ হয়নি সেগুলো হলো-এক. পদ্মা সেতু; দুই. কর্ণফুলী টানেল নির্মাণ; তিন. সাপোর্ট টু ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে পিপিপি প্রজেক্ট; চার. পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ; পাঁচ. দোহাজারি-রামু-গুনদুম রেলপথ নির্মাণ; ছয়. বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি); সাত. খুলনা-মোংলা রেলপথ নির্মাণ; আট. সিরাজগঞ্জ শিল্পপার্ক স্থাপন; নয়. চিটাগাং সিটি আউটার রিংরোড এবং দশ. খুলনা শিপইয়ার্ড সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্প। প্রকল্পগুলোর মূল অনুমোদিত ব্যয় ধরা হয়েছিল ৬৩ হাজার ৭৫৭ কোটি টাকা। অথচ এ মুহূর্তে পরিমাণটা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ১৯৮ কোটি টাকা। টাকার অঙ্কটা বেড়ে যাওয়ার পেছনে প্রকল্পগুলোর মেয়াদ বৃদ্ধি একটা বড় কারণ। উল্লিখিত প্রকল্পগুলোর মেয়াদ বৃদ্ধির চিত্রটি দেখলে বিস্মিত হওয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। পদ্মা সেতুর নির্মাণের সময়কাল ধরা হয়েছিল ৮ বছর; প্রকল্পটি শেষ হতে সময় লেগেছে ১৪ বছর। কর্ণফুলী টানেলের সময় ধরা হয়েছিল ৪ বছর, যা পরবর্তী সময়ে ৮ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে সাড়ে ৭ বছর সময় বেড়ে ৫ বছরের প্রকল্পটি মেয়াদকাল সাড়ে ১২ বছর হয়েছে। পদ্মা সেতুতে রেল-সংযোগ একটি বড় প্রকল্প। এর মেয়াদ ধরা হয়েছিল ৫ বছর, কিন্তু বাস্তবে সময়টা ৮ বছরেরও বেশি হতে পারে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সময়ক্ষেপণ হয়েছে দোহাজারী-রামু-গুনদুম প্রকল্পটিতে। প্রকল্পটি প্রাথমিক পর্যায়ে সাড়ে ৩ বছরের মধ্যে সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, তা ১২ বছরেও শেষ করা যাবে না। ৪ বছর মেয়াদি বিআরটি প্রকল্প সময় নিচ্ছে ১১ বছর। সর্বোচ্চ সময়ক্ষেপণ হচ্ছে খুলনা-মোংলা রেলপথ; যা নির্মাণের সময়কাল ধরা হয়েছিল ৩ বছর, এখন তা ১২ বছর লাগবে। তাছাড়া সিরাজগঞ্জ শিল্পপার্ক নির্মাণে অতিরিক্ত সময় লাগবে সাড়ে ৮ বছর আর চিটাগাং সিটি আউটার রিংরোড প্রকল্পে অতিরিক্ত সময় লাগবে ৮ বছর।

কোনো দেশে কোনো বিষয়ে সমস্যা থাকা অস্বাভাবিক বিষয় নয়। সমস্যা চিহ্নিত হলে সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। কিন্তু একই সমস্যা বারবার উপস্থিত হওয়া এবং কোনো প্রকার প্রতিকার না করে স্থায়ী রূপ দেওয়া কারও কাম্য নয়। আমাদের দেশে সমস্যা সমাধানের প্রধান অন্তরায় হলো নীতিনির্ধারকদের অনীহা। তারা কোনো গুরুতর সমস্যায় বিচলিত না হয়ে তাকে স্বাভাবিক হিসাবেই ধরে নিতে অভ্যস্ত। যে কারণে এ অর্থনষ্টকেও তারা আমলে নিচ্ছেন না। প্রকল্পগুলোর এ আকাশচুম্বী ব্যয়বৃদ্ধির প্রতিক্রিয়ায় বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সচিব আবু হেনা মুর্শেদ জামানের বক্তব্য হলো-এ বাড়তি ব্যয়কে অপচয় বলা যায় না। কারণ অনেক সময় সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় ভুল থাকে। আবার সমীক্ষা ঠিক থাকলে বাস্তবতার কারণে নতুন অঙ্গ অন্তর্ভুক্তি কিংবা পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটে। আবার বর্তমানে যেমন ডলারের দাম বাড়ায় অনেক ক্ষেত্রে খরচ বাড়ছে। ফলে তখন ব্যয়বৃদ্ধি বা সংশোধন ছাড়া উপায় থাকে না। আর একটি প্রকল্প যখন চলমান থাকে, তখন সেটি শেষ না করলে তো এরই মধ্যে করা বিনিয়োগ নষ্ট হয়ে যাবে। ফলে শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন করতে হয়। ব্যস! এমনতর আত্মতৃপ্তি থাকলে তো আর কথা চলে না। ডলারের দাম বৃদ্ধির সময়টা এক বছরও হয়নি। কিন্তু প্রকল্পের মেয়াদ ৯ বছর বাড়ল কেন? এর কোনো জবাব নেই।

তাই প্রধানমন্ত্রীর কেবল নির্দেশনা কোনো কার্যকর ফল বয়ে আনবে বলে মনে হয় না। প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার আওতায় নিয়ে আসতে হবে। গুটিকয় মানুষের গাফিলতি, অনিয়ম ও দুর্নীতির দায় সাধারণ মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া একরকম অবিচার। যে দেশের মানুষ আধাপেটা খেয়ে জীবনযাপন করে, সে দেশের মানুষ ৫২ হাজার কোটি টাকার অপচয়ের ভার বহন করবে কীভাবে?

মুঈদ রহমান : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন