সোশ্যাল মিডিয়ায় মাদকের বেচাকেনার নিয়ন্ত্রণ জরুরি
jugantor
সোশ্যাল মিডিয়ায় মাদকের বেচাকেনার নিয়ন্ত্রণ জরুরি

  ড. অরূপরতন চৌধুরী  

০৪ ডিসেম্বর ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সরকারের ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গড়ে তোলার প্রক্রিয়ায় অন্যতম অনুষঙ্গ হলো ইন্টারনেট; যা তথ্য-উপাত্ত, সেবাপ্রাপ্তিসহ আমাদের প্রাত্যহিক জীবনযাপন এবং অসংখ্য কাজকে অনেক ক্ষেত্রেই সহজ করে দিয়েছে। তবে কিছু ক্ষেত্রে ইন্টারনেটের অপব্যবহার আমাদের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের প্রায় ১৩ কোটি মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। এর মধ্যে ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব, টিকটক ও ইনস্টাগ্রামসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীই বেশি। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) সর্বশেষ তথ্যমতে, বর্তমানে দেশে শুধু ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৫ কোটি ২৮ লাখ। দিনদিন এ সংখ্যা বেড়েই চলেছে।

উদ্বেগজনক বিষয় হলো, বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সম্পৃক্ততা। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, দীর্ঘদিন থেকেই বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল প্লাটফরমগুলোয় খোলামেলাভাবেই বিক্রি হচ্ছে মাদকজাতীয় দ্রব্য। অসাধু মাদক ব্যবসায়ী ও খুচরা বিক্রেতারা ক্রেতাদের (বিশেষত তরুণ জনগোষ্ঠী, যারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো বেশি ব্যবহার করে) মধ্যে নিরাপদ যোগাযোগ স্থাপনের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই নেটওয়ার্ক তৈরি করেছেন। আর এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি যে মাধ্যমটি ব্যবহৃত হচ্ছে, সেটি হচ্ছে ফেসবুক। সোশ্যাল মিডিয়ায় মাদকদ্রব্য বিক্রি শুরু হয় করোনাকালে, যখন তরুণরা ঘরে বসে ফেসবুকসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফরম ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়। এ সুযোগে মাদক ব্যবসায়ীরা সোশ্যাল মিডিয়াকে বেছে নেয় তাদের বাণিজ্যের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে। যখন তারা দেখল, সোশ্যাল মিডিয়াতে তরুণরা মাদক কিনতে আগ্রহী, তখন তারা এ রুটকেই মাদক বিক্রির মূল ঘাঁটি হিসাবে ব্যবহার শুরু করে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তরুণদের বেশির ভাগ সময় বন্ধুবান্ধবদের পাল্লায় পড়ে অ্যালকোহল বিজ্ঞাপন ও সেই সঙ্গে অন্যান্য অবৈধ মাদকদ্রব্যের আসক্তিতে আসেন এবং বন্ধুবান্ধবরাই এগুলোকে নজরে আনেন। সম্প্রতি মার্কিন মাদকদ্রব্যের একটি গবেষণায়ও দেখা গেছে, ইন্টারনেট ব্যবহারকারী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অ্যালকোহল, গাঁজা ও ভ্যাপিং বা ই-সিগারেট জাতীয় মাদকের ব্যবহার শুরু হয়েছে। সুইডিস একটি গবেষণায়ও একই ফলাফল পাওয়া গেছে। তবে এ কথাটি অবশ্যই বলতে হবে-সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সঙ্গে সঙ্গে সবচেয়ে বড় যে বিষয়টি গবেষণায় উঠে এসেছে-Pear Group Pressure; অর্থাৎ বন্ধুবান্ধবদের পাল্লায় পড়া ও পিতামাতার তদারকির অভাবকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশে ভয়ংকর চিত্র হচ্ছে, ইয়াবা গ্রহণকারী ৮৫ শতাংশই তরুণ যুবসমাজ। এসব মাদকাসক্তরা নানা ধরনের জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। তাদের কিডনি, লিভার ছাড়াও মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কাজকর্ম নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। একটি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, জীবনীশক্তি ধ্বংসকারী ইয়াবা সেবনকারীরা অল্প সময়ের মধ্যেই মানসিক বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন এবং যৌনশক্তি হারিয়ে ফেলেছেন চিরতরে। বিভিন্ন মাদক নিরাময় কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন ইয়াবা আসক্তদের ওপর পর্যবেক্ষণ করে চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা এসব তথ্য জানিয়েছেন। সূত্র জানায়, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন মাদক নিরাময় কেন্দ্রে প্রায় ১৫ হাজার মাদকাসক্ত চিকিৎসা নিচ্ছেন। এর মধ্যে প্রায় ৯ হাজার ইয়াবাসেবী। একটানা মাত্র দুই-আড়াই বছর ইয়াবা সেবনের ফলে তারা মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তাদের নার্ভগুলো সম্পূর্ণ বিকল হয়ে পড়েছে।

দেশে ইয়াবা আসক্তির সংখ্যা ৩০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে বলে ধারণা করছে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। বিভিন্ন সূত্র বলছে-দেশের তরুণ প্রজন্মের এক চতুর্থাংশই কোনো না কোনো ধরনের নেশায় আসক্ত। বিত্তবানদের একটা অংশ ছেলে এবং মেয়েরা মদ না খেলেও নিয়মিত সিসা খায়। বস্তি কিংবা রাজপথে দেখা যায়-ছিন্নমূল শিশু-কিশোররা জুতা তৈরির গাম, যা ডান্ডি নামে পরিচিত-সেগুলো দিয়ে নিয়মিত নেশা করে। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৭৫ লাখ মাদকাসক্ত রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। দেশে এত বিপুলসংখ্যক রোগীর জন্য নেই প্রয়োজনীয় হাসপাতাল বা নিরাময়কেন্দ্র। এদের চিকিৎসার জন্য দেশের ৪৪ জেলায় অনুমোদনপ্রাপ্ত মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্র আছে ৩৫১টি। এর মধ্যে শতাধিক ঢাকায়।

পরিসংখ্যানে জানা যায়, দেশে গত তিন বছরে নারী ও শিশু মাদকাসক্ত বেড়েছে তিনগুণ। অপরিকল্পিত গর্ভপাতসহ বিভিন্ন কারণে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছেন নারীরা। উচ্চবিত্ত পরিবারের নারীদের মধ্যে এ নিয়ে চিকিৎসা নেওয়ার প্রবণতা বাড়লেও, মধ্য ও নিম্নবিত্তের মধ্যে তা বাড়েনি। সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপে এখনো অধিকাংশ মাদকাসক্ত নারী চিকিৎসার বাইরে। সূত্র থেকে জানা যায়, আমাদের দেশে মাদকাসক্তদের ৮৪ শতাংশ পুরুষ, ১৬ শতাংশ নারী; এর মধ্যে ৮০ শতাংশ তরুণ, ৬০ শতাংশ বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত, ৯৮ শতাংশ ধূমপায়ী, ৫৭ শতাংশ যৌন অপরাধী এবং ৭ শতাংশ নেশা গ্রহণকারী এইচআইভি আক্রান্ত। বাংলাদেশে বর্তমানে জনপ্রিয় নেশা ইয়াবা এবং এ ইয়াবা আসক্তদের ৮০ শতাংশ শিক্ষার্থী। ইয়াবা এমনই একটি ধ্বংসাত্মক মাদক, যেটা গ্রহণ করলে সাময়িক উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলেও চরম শারীরিক ও মানসিক অবসাদ হয় এবং সেটা থেকে চরম হতাশা, নৈরাজ্য ও বিষাদে পতিত হয়। শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যা করতে পারে এ ইয়াবা গ্রহণকারী।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যবিবরণীতে জানা যায়, গত ১০ বছরে নেশাখোর সন্তানের হাতে প্রায় ২০০ বাবা-মা খুন হয়েছেন; স্বামী হত্যা করেছে স্ত্রীকে, স্ত্রী হত্যা করেছে স্বামীকে। খুন, রাহাজানি, ধর্ষণ, পরকীয়া, দাম্পত্য কলহ, অর্থ লেনদেন, হত্যা, সন্ত্রাসী কার্যক্রম সবকিছুর মূলেই রয়েছে এ মাদকের নেশা। মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠজীব; কিন্তু সেই মানুষ মাদকের নেশায় হয়ে উঠে হিংস্র দানব, নরপশু। সড়ক দুর্ঘটনার ৩৩ শতাংশ ক্ষেত্রে দায়ী চালকের মাদকসেবন।

মেয়েদের মধ্যেও মাদকের নেশা এখন অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। মাদকাসক্তদের মধ্যে শতকরা পাঁচজন নারী। তাদের বয়স ১৫-৩৫ বছরের মধ্যে। নারী মাদকাসক্তদের ৪৩ শতাংশ ইয়াবাসেবী। কিছু ভ্রান্ত ধারণা থেকে তারা মাদক নেয়; যেমন স্লিম হওয়া যায়, রাত জেগে পড়া যায়, যৌনশক্তি বৃদ্ধি হয়। কিন্তু সবই ভুল, আসলে তার উলটোটি হয়। মাদক ধীরে ধীরে জীবনীশক্তি হ্রাস করে। শিরায় মাদক গ্রহণকারীদের মধ্যে সংক্রমণের হার ২২ শতাংশ। অনুসন্ধানে দেখা যায়, দিনদিনই বাড়ছে মাদকসেবীর সংখ্যা। মাদকসেবী বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মাদকের বাজারও বিস্তৃত হচ্ছে। শহর থেকে তা গ্রাম-গ্রামান্তরে ছড়িয়ে পড়ছে। দেশে ১৫ বছরের বেশি মাদকসেবী আছে ৬৩ দশমিক ২৫ শতাংশ; অর্থাৎ প্রতি ১৭ জনে একজন তরুণ মাদকাসক্ত।

গবেষকরা বলছেন, মানুষে মানুষে সরাসরি যোগাযোগ কমে যাওয়ায় তরুণরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশি আকৃষ্ট এবং অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়া’র গবেষক রবিন স্টিভেন্সের মতামত যথার্থ। তিনি বলেছেন, ‘তরুণরা প্রায়ই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাদকসেবন করে নিজেদের মানসিক চাপ, কষ্ট, আতঙ্ক ইত্যাদিকে ভুলে থাকার বিষয়টি প্রকাশ করে। সবার জীবনেই এ সমস্যাগুলো আছে, আর সেখানেই মাদকসেবনকারীদের এ যুক্তি অন্য তরুণদের মাদকের প্রতি হাতছানি দেবে। তাদের মনে হবে-মাদকের মধ্যেই হয়তো আমিও শান্তি পাব।’ তার মতে, তরুণ প্রজন্মের মাদকাসক্তি এখনো একটি বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সমস্যা। আর মাদকসেবনসংক্রান্ত বিভিন্ন ‘কনটেন্ট’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো কিংবা সেগুলো দেখা একজন তরুণকে কীভাবে প্রভাবিত করে, সে সম্পর্কে আমরা অনেকাংশেই অজ্ঞ।’

ফ্যাশন হিসাবে অসংখ্য তরুণ আজকাল মাদকসেবনের দৃশ্য সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দিচ্ছেন। সম্প্রতি নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার জনৈক ব্যক্তির মাদকসেবনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এগুলো মানুষকে ক্ষতিকর নেশা সেবনে উদ্বুদ্ধ করে। সম্প্রতি অ্যাকশনএইডের ‘বাংলাদেশে অনলাইনে নারীর প্রতি সহিংসতা’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা যায়, অনলাইনে প্রায় ৬৪ শতাংশ নারী সহিংসতার শিকার হচ্ছেন, যা আগের বছরের তুলনায় বেশি। নারীরা সবচেয়ে বেশি সহিংসতার শিকার হচ্ছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক ও অনলাইনে বার্তা আদান-প্রদানের মাধ্যম মেসেঞ্জারে। এ সহিংসতার ঘটনাগুলো নারীকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলছে। সহিংসতার শিকার ৬৫ শতাংশ নারী হতাশা ও বিষণ্নতায় ভুগছেন। বিষণ্নতা থেকে মাদক গ্রহণ, এমনকি জীবনকে বিপন্ন করে তুলছেন অনেকে।

মাদকের বিস্তারের ক্ষেত্রে বড় উপাদান হলো-তামাকজাত দ্রব্য। গবেষণায় দেখা গেছে, মাদকাসক্তদের মধ্যে ৯৮ শতাংশই ধূমপায়ী এবং তাদের মধ্যে ৬০ শতাংশ বিভিন্ন অপরাধ ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত। যারা মাদকদ্রব্য সেবন করে, তারা প্রথমে ধূমপানে অভ্যস্ত হয়, তারপর মাদকদ্রব্য সেবন শুরু করে থাকে। পরবর্তীকালে তারা গাঁজা, ইয়াবা, ফেনসিডিল, সিসা, হেরোইন, কোকেনসহ বিভিন্ন মরণনেশায় আসক্ত হয়। তরুণদের মাদকের রাজ্যে টানতে তথ্যপ্রযুক্তির সুযোগ লুফে নিচ্ছে অসাধু মাদক ব্যবসায়ী ও চোরাকারবারিরা। আকাশ, নৌ ও স্থলপথে মাদক নিয়ন্ত্রণে কাজ হচ্ছে; তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাদকের যে দ্রুত বিস্তার ঘটছে, তা আশু পদক্ষেপের মাধ্যমে রুখতে হবে। তা না হলে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। কারণটা অনুমেয়-বর্তমান বাংলাদেশের বড় অংশের জনগোষ্ঠী কিশোর-তরুণ, যে কারণে বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীকে বলা হয় ইয়ুথ ডিভিডেন্ট। ইউএনডিপি-এশীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন অনুসারে, বাংলাদেশে ৪৯ শতাংশ মানুষের বয়স ২৪ বা এর নিচে। অর্থাৎ ৪৯ শতাংশ জনগোষ্ঠী বয়সে তরুণ। দেশে কর্মক্ষম জনসংখ্যা ১০ কোটি ৫৬ লাখ। মোট জনসংখ্যার ৬৬ শতাংশ কর্মক্ষম। অপরদিকে ইয়াবা গ্রহণকারী ৮৫ শতাংশই তরুণ যুবসমাজ। এসব ইয়াবা গ্রহণকারী মাদকাসক্ত নানা ধরনের জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে, তার মধ্যে কিডনি, লিভার ছাড়াও মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কাজকর্ম নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তরুণ জনগোষ্ঠীকে মাদক ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার থেকে বিরত রাখতে হবে। সুনাগরিক হিসাবে গড়ে উঠতে ও স্বাস্থ্যকর জীবনের জন্য তরুণদের ধূমপান, মাদকসহ সব নেশা থেকে দূরে থাকা জরুরি।

মাদকসক্তি একটি রোগ। তাই মাদকাসক্তদের শাসন বা ঘৃণা-অবহেলা না করে তাকে স্নেহ-ভালোবাসা দিয়ে নিরাময়কেন্দ্রে নিয়ে গিয়ে সম্পূর্ণ চিকিৎসা দিতে হবে। সে সুস্থ হয়ে আবার পরিবারে ফিরে আসবে। পিতামাতার প্রতি অনুরোধ-আপনার সন্তানকে মাদকাসক্ত হওয়ার কারণে লুকিয়ে রাখবেন না, ঘৃণা করবেন না; বরং তাকে স্নেহ-ভালোবাসা দিয়ে মাদকাসক্ত নিরাময়কেন্দ্রে নিয়ে যান। তাকে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা দিন। মাদকাসক্তরা পরিস্থিতির শিকার। পাপকে ঘৃণা করুন, পাপীকে নয়। আসুন, আমরা সবাই মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে সাহায্য করি, তাদের পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা ব্যবস্থার সুযোগ করে দিই। তাহলেই তারা সমাজের বোঝা না হয়ে বরং সুস্থ হয়ে পরিবারে ফিরে আসবে, সমাজকে সঠিক পথে পরিচালিত করবে।

ড. অরূপরতন চৌধুরী : প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থা (মানস); সদস্য, জাতীয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ বোর্ড এবং জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ টাস্কফোর্স কমিটি; অধ্যাপক, ইব্রাহিম মেডিকেল কলেজ

prof.arupratanchoudhury@yahoo.com

সোশ্যাল মিডিয়ায় মাদকের বেচাকেনার নিয়ন্ত্রণ জরুরি

 ড. অরূপরতন চৌধুরী 
০৪ ডিসেম্বর ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সরকারের ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গড়ে তোলার প্রক্রিয়ায় অন্যতম অনুষঙ্গ হলো ইন্টারনেট; যা তথ্য-উপাত্ত, সেবাপ্রাপ্তিসহ আমাদের প্রাত্যহিক জীবনযাপন এবং অসংখ্য কাজকে অনেক ক্ষেত্রেই সহজ করে দিয়েছে। তবে কিছু ক্ষেত্রে ইন্টারনেটের অপব্যবহার আমাদের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের প্রায় ১৩ কোটি মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। এর মধ্যে ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব, টিকটক ও ইনস্টাগ্রামসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীই বেশি। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) সর্বশেষ তথ্যমতে, বর্তমানে দেশে শুধু ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৫ কোটি ২৮ লাখ। দিনদিন এ সংখ্যা বেড়েই চলেছে।

উদ্বেগজনক বিষয় হলো, বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সম্পৃক্ততা। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, দীর্ঘদিন থেকেই বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল প্লাটফরমগুলোয় খোলামেলাভাবেই বিক্রি হচ্ছে মাদকজাতীয় দ্রব্য। অসাধু মাদক ব্যবসায়ী ও খুচরা বিক্রেতারা ক্রেতাদের (বিশেষত তরুণ জনগোষ্ঠী, যারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো বেশি ব্যবহার করে) মধ্যে নিরাপদ যোগাযোগ স্থাপনের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই নেটওয়ার্ক তৈরি করেছেন। আর এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি যে মাধ্যমটি ব্যবহৃত হচ্ছে, সেটি হচ্ছে ফেসবুক। সোশ্যাল মিডিয়ায় মাদকদ্রব্য বিক্রি শুরু হয় করোনাকালে, যখন তরুণরা ঘরে বসে ফেসবুকসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফরম ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়। এ সুযোগে মাদক ব্যবসায়ীরা সোশ্যাল মিডিয়াকে বেছে নেয় তাদের বাণিজ্যের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে। যখন তারা দেখল, সোশ্যাল মিডিয়াতে তরুণরা মাদক কিনতে আগ্রহী, তখন তারা এ রুটকেই মাদক বিক্রির মূল ঘাঁটি হিসাবে ব্যবহার শুরু করে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তরুণদের বেশির ভাগ সময় বন্ধুবান্ধবদের পাল্লায় পড়ে অ্যালকোহল বিজ্ঞাপন ও সেই সঙ্গে অন্যান্য অবৈধ মাদকদ্রব্যের আসক্তিতে আসেন এবং বন্ধুবান্ধবরাই এগুলোকে নজরে আনেন। সম্প্রতি মার্কিন মাদকদ্রব্যের একটি গবেষণায়ও দেখা গেছে, ইন্টারনেট ব্যবহারকারী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অ্যালকোহল, গাঁজা ও ভ্যাপিং বা ই-সিগারেট জাতীয় মাদকের ব্যবহার শুরু হয়েছে। সুইডিস একটি গবেষণায়ও একই ফলাফল পাওয়া গেছে। তবে এ কথাটি অবশ্যই বলতে হবে-সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সঙ্গে সঙ্গে সবচেয়ে বড় যে বিষয়টি গবেষণায় উঠে এসেছে-Pear Group Pressure; অর্থাৎ বন্ধুবান্ধবদের পাল্লায় পড়া ও পিতামাতার তদারকির অভাবকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশে ভয়ংকর চিত্র হচ্ছে, ইয়াবা গ্রহণকারী ৮৫ শতাংশই তরুণ যুবসমাজ। এসব মাদকাসক্তরা নানা ধরনের জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। তাদের কিডনি, লিভার ছাড়াও মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কাজকর্ম নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। একটি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, জীবনীশক্তি ধ্বংসকারী ইয়াবা সেবনকারীরা অল্প সময়ের মধ্যেই মানসিক বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন এবং যৌনশক্তি হারিয়ে ফেলেছেন চিরতরে। বিভিন্ন মাদক নিরাময় কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন ইয়াবা আসক্তদের ওপর পর্যবেক্ষণ করে চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা এসব তথ্য জানিয়েছেন। সূত্র জানায়, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন মাদক নিরাময় কেন্দ্রে প্রায় ১৫ হাজার মাদকাসক্ত চিকিৎসা নিচ্ছেন। এর মধ্যে প্রায় ৯ হাজার ইয়াবাসেবী। একটানা মাত্র দুই-আড়াই বছর ইয়াবা সেবনের ফলে তারা মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তাদের নার্ভগুলো সম্পূর্ণ বিকল হয়ে পড়েছে।

দেশে ইয়াবা আসক্তির সংখ্যা ৩০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে বলে ধারণা করছে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। বিভিন্ন সূত্র বলছে-দেশের তরুণ প্রজন্মের এক চতুর্থাংশই কোনো না কোনো ধরনের নেশায় আসক্ত। বিত্তবানদের একটা অংশ ছেলে এবং মেয়েরা মদ না খেলেও নিয়মিত সিসা খায়। বস্তি কিংবা রাজপথে দেখা যায়-ছিন্নমূল শিশু-কিশোররা জুতা তৈরির গাম, যা ডান্ডি নামে পরিচিত-সেগুলো দিয়ে নিয়মিত নেশা করে। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৭৫ লাখ মাদকাসক্ত রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। দেশে এত বিপুলসংখ্যক রোগীর জন্য নেই প্রয়োজনীয় হাসপাতাল বা নিরাময়কেন্দ্র। এদের চিকিৎসার জন্য দেশের ৪৪ জেলায় অনুমোদনপ্রাপ্ত মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্র আছে ৩৫১টি। এর মধ্যে শতাধিক ঢাকায়।

পরিসংখ্যানে জানা যায়, দেশে গত তিন বছরে নারী ও শিশু মাদকাসক্ত বেড়েছে তিনগুণ। অপরিকল্পিত গর্ভপাতসহ বিভিন্ন কারণে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছেন নারীরা। উচ্চবিত্ত পরিবারের নারীদের মধ্যে এ নিয়ে চিকিৎসা নেওয়ার প্রবণতা বাড়লেও, মধ্য ও নিম্নবিত্তের মধ্যে তা বাড়েনি। সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপে এখনো অধিকাংশ মাদকাসক্ত নারী চিকিৎসার বাইরে। সূত্র থেকে জানা যায়, আমাদের দেশে মাদকাসক্তদের ৮৪ শতাংশ পুরুষ, ১৬ শতাংশ নারী; এর মধ্যে ৮০ শতাংশ তরুণ, ৬০ শতাংশ বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত, ৯৮ শতাংশ ধূমপায়ী, ৫৭ শতাংশ যৌন অপরাধী এবং ৭ শতাংশ নেশা গ্রহণকারী এইচআইভি আক্রান্ত। বাংলাদেশে বর্তমানে জনপ্রিয় নেশা ইয়াবা এবং এ ইয়াবা আসক্তদের ৮০ শতাংশ শিক্ষার্থী। ইয়াবা এমনই একটি ধ্বংসাত্মক মাদক, যেটা গ্রহণ করলে সাময়িক উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলেও চরম শারীরিক ও মানসিক অবসাদ হয় এবং সেটা থেকে চরম হতাশা, নৈরাজ্য ও বিষাদে পতিত হয়। শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যা করতে পারে এ ইয়াবা গ্রহণকারী।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যবিবরণীতে জানা যায়, গত ১০ বছরে নেশাখোর সন্তানের হাতে প্রায় ২০০ বাবা-মা খুন হয়েছেন; স্বামী হত্যা করেছে স্ত্রীকে, স্ত্রী হত্যা করেছে স্বামীকে। খুন, রাহাজানি, ধর্ষণ, পরকীয়া, দাম্পত্য কলহ, অর্থ লেনদেন, হত্যা, সন্ত্রাসী কার্যক্রম সবকিছুর মূলেই রয়েছে এ মাদকের নেশা। মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠজীব; কিন্তু সেই মানুষ মাদকের নেশায় হয়ে উঠে হিংস্র দানব, নরপশু। সড়ক দুর্ঘটনার ৩৩ শতাংশ ক্ষেত্রে দায়ী চালকের মাদকসেবন।

মেয়েদের মধ্যেও মাদকের নেশা এখন অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। মাদকাসক্তদের মধ্যে শতকরা পাঁচজন নারী। তাদের বয়স ১৫-৩৫ বছরের মধ্যে। নারী মাদকাসক্তদের ৪৩ শতাংশ ইয়াবাসেবী। কিছু ভ্রান্ত ধারণা থেকে তারা মাদক নেয়; যেমন স্লিম হওয়া যায়, রাত জেগে পড়া যায়, যৌনশক্তি বৃদ্ধি হয়। কিন্তু সবই ভুল, আসলে তার উলটোটি হয়। মাদক ধীরে ধীরে জীবনীশক্তি হ্রাস করে। শিরায় মাদক গ্রহণকারীদের মধ্যে সংক্রমণের হার ২২ শতাংশ। অনুসন্ধানে দেখা যায়, দিনদিনই বাড়ছে মাদকসেবীর সংখ্যা। মাদকসেবী বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মাদকের বাজারও বিস্তৃত হচ্ছে। শহর থেকে তা গ্রাম-গ্রামান্তরে ছড়িয়ে পড়ছে। দেশে ১৫ বছরের বেশি মাদকসেবী আছে ৬৩ দশমিক ২৫ শতাংশ; অর্থাৎ প্রতি ১৭ জনে একজন তরুণ মাদকাসক্ত।

গবেষকরা বলছেন, মানুষে মানুষে সরাসরি যোগাযোগ কমে যাওয়ায় তরুণরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশি আকৃষ্ট এবং অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়া’র গবেষক রবিন স্টিভেন্সের মতামত যথার্থ। তিনি বলেছেন, ‘তরুণরা প্রায়ই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাদকসেবন করে নিজেদের মানসিক চাপ, কষ্ট, আতঙ্ক ইত্যাদিকে ভুলে থাকার বিষয়টি প্রকাশ করে। সবার জীবনেই এ সমস্যাগুলো আছে, আর সেখানেই মাদকসেবনকারীদের এ যুক্তি অন্য তরুণদের মাদকের প্রতি হাতছানি দেবে। তাদের মনে হবে-মাদকের মধ্যেই হয়তো আমিও শান্তি পাব।’ তার মতে, তরুণ প্রজন্মের মাদকাসক্তি এখনো একটি বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সমস্যা। আর মাদকসেবনসংক্রান্ত বিভিন্ন ‘কনটেন্ট’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো কিংবা সেগুলো দেখা একজন তরুণকে কীভাবে প্রভাবিত করে, সে সম্পর্কে আমরা অনেকাংশেই অজ্ঞ।’

ফ্যাশন হিসাবে অসংখ্য তরুণ আজকাল মাদকসেবনের দৃশ্য সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দিচ্ছেন। সম্প্রতি নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার জনৈক ব্যক্তির মাদকসেবনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এগুলো মানুষকে ক্ষতিকর নেশা সেবনে উদ্বুদ্ধ করে। সম্প্রতি অ্যাকশনএইডের ‘বাংলাদেশে অনলাইনে নারীর প্রতি সহিংসতা’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা যায়, অনলাইনে প্রায় ৬৪ শতাংশ নারী সহিংসতার শিকার হচ্ছেন, যা আগের বছরের তুলনায় বেশি। নারীরা সবচেয়ে বেশি সহিংসতার শিকার হচ্ছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক ও অনলাইনে বার্তা আদান-প্রদানের মাধ্যম মেসেঞ্জারে। এ সহিংসতার ঘটনাগুলো নারীকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলছে। সহিংসতার শিকার ৬৫ শতাংশ নারী হতাশা ও বিষণ্নতায় ভুগছেন। বিষণ্নতা থেকে মাদক গ্রহণ, এমনকি জীবনকে বিপন্ন করে তুলছেন অনেকে।

মাদকের বিস্তারের ক্ষেত্রে বড় উপাদান হলো-তামাকজাত দ্রব্য। গবেষণায় দেখা গেছে, মাদকাসক্তদের মধ্যে ৯৮ শতাংশই ধূমপায়ী এবং তাদের মধ্যে ৬০ শতাংশ বিভিন্ন অপরাধ ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত। যারা মাদকদ্রব্য সেবন করে, তারা প্রথমে ধূমপানে অভ্যস্ত হয়, তারপর মাদকদ্রব্য সেবন শুরু করে থাকে। পরবর্তীকালে তারা গাঁজা, ইয়াবা, ফেনসিডিল, সিসা, হেরোইন, কোকেনসহ বিভিন্ন মরণনেশায় আসক্ত হয়। তরুণদের মাদকের রাজ্যে টানতে তথ্যপ্রযুক্তির সুযোগ লুফে নিচ্ছে অসাধু মাদক ব্যবসায়ী ও চোরাকারবারিরা। আকাশ, নৌ ও স্থলপথে মাদক নিয়ন্ত্রণে কাজ হচ্ছে; তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাদকের যে দ্রুত বিস্তার ঘটছে, তা আশু পদক্ষেপের মাধ্যমে রুখতে হবে। তা না হলে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। কারণটা অনুমেয়-বর্তমান বাংলাদেশের বড় অংশের জনগোষ্ঠী কিশোর-তরুণ, যে কারণে বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীকে বলা হয় ইয়ুথ ডিভিডেন্ট। ইউএনডিপি-এশীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন অনুসারে, বাংলাদেশে ৪৯ শতাংশ মানুষের বয়স ২৪ বা এর নিচে। অর্থাৎ ৪৯ শতাংশ জনগোষ্ঠী বয়সে তরুণ। দেশে কর্মক্ষম জনসংখ্যা ১০ কোটি ৫৬ লাখ। মোট জনসংখ্যার ৬৬ শতাংশ কর্মক্ষম। অপরদিকে ইয়াবা গ্রহণকারী ৮৫ শতাংশই তরুণ যুবসমাজ। এসব ইয়াবা গ্রহণকারী মাদকাসক্ত নানা ধরনের জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে, তার মধ্যে কিডনি, লিভার ছাড়াও মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কাজকর্ম নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তরুণ জনগোষ্ঠীকে মাদক ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার থেকে বিরত রাখতে হবে। সুনাগরিক হিসাবে গড়ে উঠতে ও স্বাস্থ্যকর জীবনের জন্য তরুণদের ধূমপান, মাদকসহ সব নেশা থেকে দূরে থাকা জরুরি।

মাদকসক্তি একটি রোগ। তাই মাদকাসক্তদের শাসন বা ঘৃণা-অবহেলা না করে তাকে স্নেহ-ভালোবাসা দিয়ে নিরাময়কেন্দ্রে নিয়ে গিয়ে সম্পূর্ণ চিকিৎসা দিতে হবে। সে সুস্থ হয়ে আবার পরিবারে ফিরে আসবে। পিতামাতার প্রতি অনুরোধ-আপনার সন্তানকে মাদকাসক্ত হওয়ার কারণে লুকিয়ে রাখবেন না, ঘৃণা করবেন না; বরং তাকে স্নেহ-ভালোবাসা দিয়ে মাদকাসক্ত নিরাময়কেন্দ্রে নিয়ে যান। তাকে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা দিন। মাদকাসক্তরা পরিস্থিতির শিকার। পাপকে ঘৃণা করুন, পাপীকে নয়। আসুন, আমরা সবাই মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে সাহায্য করি, তাদের পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা ব্যবস্থার সুযোগ করে দিই। তাহলেই তারা সমাজের বোঝা না হয়ে বরং সুস্থ হয়ে পরিবারে ফিরে আসবে, সমাজকে সঠিক পথে পরিচালিত করবে।

ড. অরূপরতন চৌধুরী : প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থা (মানস); সদস্য, জাতীয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ বোর্ড এবং জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ টাস্কফোর্স কমিটি; অধ্যাপক, ইব্রাহিম মেডিকেল কলেজ

prof.arupratanchoudhury@yahoo.com

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন