বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে নেই পরিকল্পনার ছাপ
jugantor
বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে নেই পরিকল্পনার ছাপ

  মেজবাহ হোসেন  

০৬ ডিসেম্বর ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দেশে উচ্চশিক্ষা প্রসারের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়। এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ইতিহাস লক্ষ করলে দেখা যাবে এর সঙ্গে রাজনৈতিক নেতৃত্বের পাশাপাশি শিক্ষাসংশ্লিষ্ট পণ্ডিত ব্যক্তিরা ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন (নামকরা কলেজের অধ্যক্ষ ও অধ্যাপকরা)। ব্যারিস্টার নাথানের নেতৃত্বে গঠিত কমিটির রিপোর্টের ধারাবাহিকতায় ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কাঠামো লাভ করে এবং এর কার্যক্রম শুরু হয়। ব্রিটিশদের আমলে প্রতিষ্ঠিত এ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরতে পরতে ব্রিটিশদের ভাবনা/দর্শন, কাজের গুণগত মান ও শৈল্পিক রুচির প্রমাণ মেলে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) বিষয়টিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুরূপ। ১৮৭৬ সালের ঢাকা সার্ভে স্কুল, পরবর্তী সময়ে আহসানউল্লাহ স্কুল অব ইঞ্জিনিয়ারিং আর স্বাধীনতার পর বুয়েট। ঢাকা শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠান দুটির ভবনগুলোর নকশা, পরিবেশগত সৌন্দর্য, নিয়মিত পরিচর্যা করা ফুলের বাগান ও মাঠের ঘাস, সৌন্দর্যবর্ধক গাছের সারি লক্ষণীয়।

১৯৫৩ সালে প্রাদেশিক আইনসভায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের যে আইন পাশ হয়, তার পেছনে মূল ভূমিকা রেখেছিল স্যাডলার কমিশনের সুপারিশ। ১৯৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস থেকে জানা যায়, প্রতিষ্ঠানটির জন্য জায়গা নির্বাচন কমিশন করা হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য ড. এম ওসমান গনিকে চেয়ারম্যান এবং ড. কুদরাত-এ-খুদা, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, এম ফেরদৌস খান ও ড. মফিজ উদ্দিন আহমদকে (পরবর্তীকালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য) সদস্য নির্বাচন করে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকল্প পরিচালক হিসাবে নিযুক্ত হয়েছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. আজিজুর রহমান মল্লিক।

এসব উদাহরণ থেকে ধারণা পাওয়া যায় এ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ঠিক কী কারণে আমাদের রাষ্ট্রের অন্যতম শক্তিশালী স্তম্ভে পরিণত হয়ে উঠেছে। তবে ১৯৬১ সালে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং পাকিস্তান আমলের সর্বশেষ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক চেতনা তেমন একটা লক্ষ করা যায়নি। পাকিস্তান আমলের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আয়তনের দিক থেকে বিশাল ও প্রাকৃতিকভাবে নৈসর্গিক সৌন্দর্যমণ্ডিত হলেও ঢাবি ও বুয়েটের মতো স্থাপত্যশৈলী ও আভিজাত্য সেখানে তেমন একটা নজর কাড়ে না; তবে এগুলোরও লেখাপড়ার মান জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে বেশ প্রসিদ্ধ।

বাংলাদেশ জমানায় প্রবেশ করলে এখানে সুস্পষ্টভাবে দুটি ধারা লক্ষণীয়। প্রথমত, স্বাধীনতার পর থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত একরকম চিত্র আর পরবর্তীকালে ভিন্ন চিত্র। বাংলাদেশ সরকারের প্রথম প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় হলো ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৮০), দ্বিতীয় স্থানে আছে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৯১)। এগুলো প্রতিষ্ঠায় আগের মতো বিশেষজ্ঞ প্যানেলের সমন্বয়ে কোনো কমিশন গঠিত না হলেও (২/১টি ছাড়া) প্রয়োজন, বিবেচনাবোধ ও জনগণের চাহিদার সঙ্গে অনেকটাই সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। তবে এ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আয়তন, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, স্থাপত্যশৈলী ও নান্দনিকতা বহুগুণে হ্রাস পেয়েছে বা বিষয়গুলোকে হয়তো বিবেচনাতেই নেওয়া হয়নি। এগুলোর পড়ালেখার মান নিয়ে যেমন প্রশ্নের কমতি নেই, তেমনি গবেষণারও কোনো বালাই বা পরিবেশ নেই। তবুও উচ্চ জনসংখ্যার এ দেশে শিক্ষার হার বাড়াতে এবং ক্রমবর্ধমান শিক্ষার্থীদের চাপ সামলাতে সেগুলো ভূমিকা রেখে চলছে।

পরবর্তীকালে দেশের জেলায় জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হলেও এগুলোর জন্য কোনো একক/জাতীয় কমিশন গঠন করা হয়নি, যারা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার যাবতীয় মানদণ্ড বিচার-বিশ্লেষণ করে সরকারকে প্রতিবেদন/পরামর্শ দিতে পারত যে কোনো জেলায়, কোন স্থানে, কী ধরনের বিশ্ববিদ্যালয় উপযোগী; কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য কত একর জায়গা নির্ধারিত হওয়া দরকার; বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কেমন হবে এবং সেগুলো কত বছরে বাস্তবায়নযোগ্য ও তার জন্য পর্যায়ক্রমিক করণীয় কী ইত্যাদি। সরকারের মন্ত্রিপরিষদ বা উপদেষ্টা পরিষদ বা সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে তেমন কোনো শিক্ষাবিদ বা শিক্ষা-গবেষণা নিয়ে কাজ করা ব্যক্তির সংখ্যাও সেভাবে দৃশ্যমান নয়, যারা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে কারিগরি বা নীতিগত বিষয়ে পরামর্শ দিতে পারে। যারা আছেন তাদের শিক্ষা বা বিশ্ববিদ্যালয় কাঠামো বিষয়ে বিশেষ কোনো অভিজ্ঞতা নেই। তারা নিজেদের কর্তৃত্ব বজায় রেখে অনেকটা মনগড়া একটা আইন বানিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দিলে সেটিকে প্রথমে মন্ত্রিসভার বৈঠকে অনুমোদন, তারপর বিল আকারে সংসদে উত্থাপন করে পাশ করা হয়। জেলার ডিসি সাহেব রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে আলোচনা করে শহরের উপকণ্ঠে বা উপজেলা পর্যায়ে স্থান নির্ধারণ করেন কোনো শিক্ষাবিদ বা নগরপরিকল্পনাবিদকে ছাড়াই। এরপর দলান্ধ কোনো শিক্ষককে নিয়োগ করা হয় উপাচার্য-কাম প্রকল্প পরিচালক (পিডি) হিসাবে। এভাবে মাত্র কয়েক একর জায়গায় উপাচার্য নিয়োগ দিয়ে ও বাসাভাড়া করে শুরু হয় শিক্ষা কার্যক্রম, যেখানে থাকে না প্রয়োজনীয় শিক্ষক, শ্রেণিকক্ষ, ল্যাব, ছাত্রাবাস, লাইব্রেরি ও জিমনেশিয়ামের মতো অত্যাবশ্যকীয় উপাদানগুলো। শিক্ষক নিয়োগের ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আগে কিছুটা স্বাধীনতা ভোগ করলেও এখন আর সে অবস্থা নেই। ফলে শিক্ষক নিয়োগে ইউজিসির অনুমোদনের অপেক্ষায় কেটে যায় বছরের পর বছর। যেটুকু অনুমোদন পাওয়া যায়, তারও সিংহভাগ হলো প্রভাষক পদ। মাঝেমধ্যে সিনিয়র পদে অল্পকিছু নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হলেও যোগ্য প্রার্থীর অভাবে (ঢাকার বাইরে) ওই পদগুলোতে ঘুরেফিরে প্রভাষকই নিয়োগ দেওয়া হয়। নতুন এই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে স্নাতকোত্তর পাশ প্রভাষকরা যতটুকুও সক্ষমতা রাখেন, ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদ যেমন কম্পিউটার সায়েন্স, সিভিল, যন্ত্র কৌশল বা স্থাপত্য বিদ্যার মতো কঠিন ও অভিজ্ঞতাসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে শুধু স্নাতকসম্পন্ন শিক্ষকরা কি ততটুকুও সক্ষমতা রাখেন? নতুন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থাও অনুরূপ। তাহলে এ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার মান কীভাবে উন্নত হবে এবং এগুলো প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যই বা কী-এটি এক বড় প্রশ্ন।

যে কোনো রাষ্ট্র বা জাতির জন্য বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ একটি সম্পদ। কিন্তু অপরিকল্পিতভাবে স্থাপিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জাতির একরকম বোঝায় পরিণত হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষার্থীদের প্রবণতা থাকে বড় শহরের বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার। সেক্ষেত্রে উত্তরে নাটোর বা নওগাঁর মতো ছোট শহরের পরিবর্তে বগুড়ায় একটি বড় বিশ্ববিদ্যালয় করা হলে সেটি সবার কাছে অনেক বেশি আকর্ষণীয় ও গ্রহণযোগ্য হতো। সুনামগঞ্জের মতো অনুন্নত হাওড় এলাকার বিশ্ববিদ্যালয়ে কি খোদ সুনামগঞ্জের ছেলেমেয়েরাই আগ্রহী হবে? তার থেকে যদি ওই পরিমাণ বাজেট দিয়ে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আসনসংখ্যা বৃদ্ধি, নতুন বিভাগ খোলা, আবাসন সুবিধা বৃদ্ধি এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা হতো তাহলে প্রতিষ্ঠানটি সামগ্রিকভাবে ওই অঞ্চলে, দেশে, এমনকি বিশ্বপরিমণ্ডলে অধিকতর সুনাম ও পরিচিতি অর্জন করতে সক্ষম হতো।

নতুন প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেখানে বিভাগপ্রতি ৪-৫ জন শিক্ষক আর ১-২টি ক্লাসরুম নিয়ে স্নাতক পর্যায়ে কার্যক্রম চালাচ্ছে, সেখানেও এমফিল, পিএইচডির অনুমোদন দিয়ে রাখা হয়েছে! ইউজিসি বা শিক্ষা মন্ত্রণালয় আসলে কী কাজটা করছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মানোন্নয়নে, শিক্ষকদের পায়ে শেকল পরানো ছাড়া (কর্মঘণ্টা নির্ধারণ, অভিন্ন নীতিমালা প্রণয়ন ও যোগদানকালীন ইনক্রিমেন্ট বন্ধ করা)? তাহলে ড. সলিমুল্লাহ খানের সেই আলোচিত বক্তব্যই কি যথার্থ নয়, যেখানে তিনি বলেছিলেন, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার মান মাদ্রাসার থেকেও নিম্ন পর্যায়ে চলে গেছে। আর স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরেও যদি নিজেদের জন্য পাকিস্তানি ও ব্রিটিশদের থেকে ভালো/সমমানের একটি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে না তুলতে পারি, তাহলে এ স্বাধীনতা বা স্বশাসনের তাৎপর্য কতটুকু?

মেজবাহ হোসেন : শিক্ষক, রসায়ন বিভাগ, হাবিপ্রবি; বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অধ্যয়নরত

mezbahhossain15@gmail.com

বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে নেই পরিকল্পনার ছাপ

 মেজবাহ হোসেন 
০৬ ডিসেম্বর ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দেশে উচ্চশিক্ষা প্রসারের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়। এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ইতিহাস লক্ষ করলে দেখা যাবে এর সঙ্গে রাজনৈতিক নেতৃত্বের পাশাপাশি শিক্ষাসংশ্লিষ্ট পণ্ডিত ব্যক্তিরা ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন (নামকরা কলেজের অধ্যক্ষ ও অধ্যাপকরা)। ব্যারিস্টার নাথানের নেতৃত্বে গঠিত কমিটির রিপোর্টের ধারাবাহিকতায় ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কাঠামো লাভ করে এবং এর কার্যক্রম শুরু হয়। ব্রিটিশদের আমলে প্রতিষ্ঠিত এ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরতে পরতে ব্রিটিশদের ভাবনা/দর্শন, কাজের গুণগত মান ও শৈল্পিক রুচির প্রমাণ মেলে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) বিষয়টিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুরূপ। ১৮৭৬ সালের ঢাকা সার্ভে স্কুল, পরবর্তী সময়ে আহসানউল্লাহ স্কুল অব ইঞ্জিনিয়ারিং আর স্বাধীনতার পর বুয়েট। ঢাকা শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠান দুটির ভবনগুলোর নকশা, পরিবেশগত সৌন্দর্য, নিয়মিত পরিচর্যা করা ফুলের বাগান ও মাঠের ঘাস, সৌন্দর্যবর্ধক গাছের সারি লক্ষণীয়।

১৯৫৩ সালে প্রাদেশিক আইনসভায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের যে আইন পাশ হয়, তার পেছনে মূল ভূমিকা রেখেছিল স্যাডলার কমিশনের সুপারিশ। ১৯৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস থেকে জানা যায়, প্রতিষ্ঠানটির জন্য জায়গা নির্বাচন কমিশন করা হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য ড. এম ওসমান গনিকে চেয়ারম্যান এবং ড. কুদরাত-এ-খুদা, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, এম ফেরদৌস খান ও ড. মফিজ উদ্দিন আহমদকে (পরবর্তীকালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য) সদস্য নির্বাচন করে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকল্প পরিচালক হিসাবে নিযুক্ত হয়েছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. আজিজুর রহমান মল্লিক।

এসব উদাহরণ থেকে ধারণা পাওয়া যায় এ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ঠিক কী কারণে আমাদের রাষ্ট্রের অন্যতম শক্তিশালী স্তম্ভে পরিণত হয়ে উঠেছে। তবে ১৯৬১ সালে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং পাকিস্তান আমলের সর্বশেষ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক চেতনা তেমন একটা লক্ষ করা যায়নি। পাকিস্তান আমলের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আয়তনের দিক থেকে বিশাল ও প্রাকৃতিকভাবে নৈসর্গিক সৌন্দর্যমণ্ডিত হলেও ঢাবি ও বুয়েটের মতো স্থাপত্যশৈলী ও আভিজাত্য সেখানে তেমন একটা নজর কাড়ে না; তবে এগুলোরও লেখাপড়ার মান জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে বেশ প্রসিদ্ধ।

বাংলাদেশ জমানায় প্রবেশ করলে এখানে সুস্পষ্টভাবে দুটি ধারা লক্ষণীয়। প্রথমত, স্বাধীনতার পর থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত একরকম চিত্র আর পরবর্তীকালে ভিন্ন চিত্র। বাংলাদেশ সরকারের প্রথম প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় হলো ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৮০), দ্বিতীয় স্থানে আছে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৯১)। এগুলো প্রতিষ্ঠায় আগের মতো বিশেষজ্ঞ প্যানেলের সমন্বয়ে কোনো কমিশন গঠিত না হলেও (২/১টি ছাড়া) প্রয়োজন, বিবেচনাবোধ ও জনগণের চাহিদার সঙ্গে অনেকটাই সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। তবে এ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আয়তন, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, স্থাপত্যশৈলী ও নান্দনিকতা বহুগুণে হ্রাস পেয়েছে বা বিষয়গুলোকে হয়তো বিবেচনাতেই নেওয়া হয়নি। এগুলোর পড়ালেখার মান নিয়ে যেমন প্রশ্নের কমতি নেই, তেমনি গবেষণারও কোনো বালাই বা পরিবেশ নেই। তবুও উচ্চ জনসংখ্যার এ দেশে শিক্ষার হার বাড়াতে এবং ক্রমবর্ধমান শিক্ষার্থীদের চাপ সামলাতে সেগুলো ভূমিকা রেখে চলছে।

পরবর্তীকালে দেশের জেলায় জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হলেও এগুলোর জন্য কোনো একক/জাতীয় কমিশন গঠন করা হয়নি, যারা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার যাবতীয় মানদণ্ড বিচার-বিশ্লেষণ করে সরকারকে প্রতিবেদন/পরামর্শ দিতে পারত যে কোনো জেলায়, কোন স্থানে, কী ধরনের বিশ্ববিদ্যালয় উপযোগী; কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য কত একর জায়গা নির্ধারিত হওয়া দরকার; বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কেমন হবে এবং সেগুলো কত বছরে বাস্তবায়নযোগ্য ও তার জন্য পর্যায়ক্রমিক করণীয় কী ইত্যাদি। সরকারের মন্ত্রিপরিষদ বা উপদেষ্টা পরিষদ বা সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে তেমন কোনো শিক্ষাবিদ বা শিক্ষা-গবেষণা নিয়ে কাজ করা ব্যক্তির সংখ্যাও সেভাবে দৃশ্যমান নয়, যারা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে কারিগরি বা নীতিগত বিষয়ে পরামর্শ দিতে পারে। যারা আছেন তাদের শিক্ষা বা বিশ্ববিদ্যালয় কাঠামো বিষয়ে বিশেষ কোনো অভিজ্ঞতা নেই। তারা নিজেদের কর্তৃত্ব বজায় রেখে অনেকটা মনগড়া একটা আইন বানিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দিলে সেটিকে প্রথমে মন্ত্রিসভার বৈঠকে অনুমোদন, তারপর বিল আকারে সংসদে উত্থাপন করে পাশ করা হয়। জেলার ডিসি সাহেব রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে আলোচনা করে শহরের উপকণ্ঠে বা উপজেলা পর্যায়ে স্থান নির্ধারণ করেন কোনো শিক্ষাবিদ বা নগরপরিকল্পনাবিদকে ছাড়াই। এরপর দলান্ধ কোনো শিক্ষককে নিয়োগ করা হয় উপাচার্য-কাম প্রকল্প পরিচালক (পিডি) হিসাবে। এভাবে মাত্র কয়েক একর জায়গায় উপাচার্য নিয়োগ দিয়ে ও বাসাভাড়া করে শুরু হয় শিক্ষা কার্যক্রম, যেখানে থাকে না প্রয়োজনীয় শিক্ষক, শ্রেণিকক্ষ, ল্যাব, ছাত্রাবাস, লাইব্রেরি ও জিমনেশিয়ামের মতো অত্যাবশ্যকীয় উপাদানগুলো। শিক্ষক নিয়োগের ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আগে কিছুটা স্বাধীনতা ভোগ করলেও এখন আর সে অবস্থা নেই। ফলে শিক্ষক নিয়োগে ইউজিসির অনুমোদনের অপেক্ষায় কেটে যায় বছরের পর বছর। যেটুকু অনুমোদন পাওয়া যায়, তারও সিংহভাগ হলো প্রভাষক পদ। মাঝেমধ্যে সিনিয়র পদে অল্পকিছু নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হলেও যোগ্য প্রার্থীর অভাবে (ঢাকার বাইরে) ওই পদগুলোতে ঘুরেফিরে প্রভাষকই নিয়োগ দেওয়া হয়। নতুন এই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে স্নাতকোত্তর পাশ প্রভাষকরা যতটুকুও সক্ষমতা রাখেন, ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদ যেমন কম্পিউটার সায়েন্স, সিভিল, যন্ত্র কৌশল বা স্থাপত্য বিদ্যার মতো কঠিন ও অভিজ্ঞতাসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে শুধু স্নাতকসম্পন্ন শিক্ষকরা কি ততটুকুও সক্ষমতা রাখেন? নতুন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থাও অনুরূপ। তাহলে এ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার মান কীভাবে উন্নত হবে এবং এগুলো প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যই বা কী-এটি এক বড় প্রশ্ন।

যে কোনো রাষ্ট্র বা জাতির জন্য বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ একটি সম্পদ। কিন্তু অপরিকল্পিতভাবে স্থাপিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জাতির একরকম বোঝায় পরিণত হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষার্থীদের প্রবণতা থাকে বড় শহরের বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার। সেক্ষেত্রে উত্তরে নাটোর বা নওগাঁর মতো ছোট শহরের পরিবর্তে বগুড়ায় একটি বড় বিশ্ববিদ্যালয় করা হলে সেটি সবার কাছে অনেক বেশি আকর্ষণীয় ও গ্রহণযোগ্য হতো। সুনামগঞ্জের মতো অনুন্নত হাওড় এলাকার বিশ্ববিদ্যালয়ে কি খোদ সুনামগঞ্জের ছেলেমেয়েরাই আগ্রহী হবে? তার থেকে যদি ওই পরিমাণ বাজেট দিয়ে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আসনসংখ্যা বৃদ্ধি, নতুন বিভাগ খোলা, আবাসন সুবিধা বৃদ্ধি এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা হতো তাহলে প্রতিষ্ঠানটি সামগ্রিকভাবে ওই অঞ্চলে, দেশে, এমনকি বিশ্বপরিমণ্ডলে অধিকতর সুনাম ও পরিচিতি অর্জন করতে সক্ষম হতো।

নতুন প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেখানে বিভাগপ্রতি ৪-৫ জন শিক্ষক আর ১-২টি ক্লাসরুম নিয়ে স্নাতক পর্যায়ে কার্যক্রম চালাচ্ছে, সেখানেও এমফিল, পিএইচডির অনুমোদন দিয়ে রাখা হয়েছে! ইউজিসি বা শিক্ষা মন্ত্রণালয় আসলে কী কাজটা করছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মানোন্নয়নে, শিক্ষকদের পায়ে শেকল পরানো ছাড়া (কর্মঘণ্টা নির্ধারণ, অভিন্ন নীতিমালা প্রণয়ন ও যোগদানকালীন ইনক্রিমেন্ট বন্ধ করা)? তাহলে ড. সলিমুল্লাহ খানের সেই আলোচিত বক্তব্যই কি যথার্থ নয়, যেখানে তিনি বলেছিলেন, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার মান মাদ্রাসার থেকেও নিম্ন পর্যায়ে চলে গেছে। আর স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরেও যদি নিজেদের জন্য পাকিস্তানি ও ব্রিটিশদের থেকে ভালো/সমমানের একটি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে না তুলতে পারি, তাহলে এ স্বাধীনতা বা স্বশাসনের তাৎপর্য কতটুকু?

মেজবাহ হোসেন : শিক্ষক, রসায়ন বিভাগ, হাবিপ্রবি; বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অধ্যয়নরত

mezbahhossain15@gmail.com

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন