ইরানি মন, হিজাব ও মানবাধিকার
jugantor
শতফুল ফুটতে দাও
ইরানি মন, হিজাব ও মানবাধিকার

  ড. মাহবুব উল্লাহ্  

০৮ ডিসেম্বর ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ইরানে ১৯৭৯ সালের বিপ্লব সভ্যতার ইতিহাসে ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। ইরান ছিল রাজতন্ত্র।

সে সময় দেশটিতে শাসন করতেন রেজা শাহ পাহলভি। রেজা শাহ ইরানে পরিবর্তন আনতে চেয়েছিলেন। সেই পরিবর্তন ছিল ইরানের সভ্যতাকে আধুনিক করে তোলা। রেজা শাহের এ প্রয়াস ‘শ্বেত বিপ্লব’ নামে পরিচিতি পায়। এক কথায় বলা যায়, তিনি চেয়েছিলেন ইরানকে সব দিক থেকে পাশ্চাত্যায়িত দেশে পরিণত করতে। কিন্তু ১৯৭৯ সালের বিপ্লব ইরানকে ইসলামি প্রজাতন্ত্রে পরিণত করে।

সে সময় ইরানি জনগণ ইরানকে আধুনিক দেশ হিসাবে রূপান্তরিত করার জন্য শাহের এ প্রয়াসকে সমর্থন করতে পারেনি। ইরানি সভ্যতার ইতিহাস দীর্ঘকালের পুরোনো। এ সভ্যতা নিয়ে ইরানিরা গর্ব করত এবং এখনো করে। আমরা জানি, ইরানে নওরোজ নামে নববর্ষ উৎসব চালু আছে। বর্ণাঢ্য এ নববর্ষের উৎসবটি ইরানি সভ্যতার মতোই প্রাচীন। ইরানি জনগণ তাদের সভ্যতা নিয়ে গর্ব করে। যে সভ্যতা হাফেজ, রুমী ও ওমর খৈয়ামের মতো কবি ও দার্শনিকদের জন্ম দিয়েছে, সে সভ্যতার পাটাতন যে গ্রানাইড পাথরের মতো শক্ত ভিতের ওপর প্রতিষ্ঠিত, তার জনগণ কখনোই ভুল পথে হাঁটবে না।

ইরানে ১৯৭৯ সালের বিপ্লব ঘটেছে পাহলভির স্বৈরতন্ত্র, আয়াতুল্লাহ খোমেনির নির্বাসন এবং সামাজিক অবিচারসহ সব ধরনের অনাচার ও অন্যায্যতার বিরুদ্ধে। শাহের আধুনিক ইরান গঠনের প্রয়াস যে অর্থহীন ছিল, তা আমরা বুঝতে পারি ইরানি জনগণ যেভাবে ইমাম খোমেনির ডাকে সাড়া দিয়েছিল তা থেকে। পাশ্চাত্যের কাছ থেকে কিছু মেকী চালচলন রপ্ত করলেই একটা সমাজ উন্নত হয়ে যায় না। আমাদের মনে রাখতে হবে, জনগোষ্ঠী সমৃদ্ধ অতীতের উত্তরাধিকারীদের হঠাৎ করে বিলেতি সাহেবে পরিণত করা সম্ভব নয়। ইরানের শাহের এ প্রচেষ্টা জনগণ গ্রহণ করেনি। তারা আলিঙ্গন করেছে ইসলামি বিপ্লবের খোমেনি দর্শনকে।

৪০ বছরেরও কিছু বেশি সময় আগে আয়াতুল্লাহ খোমেনি ফ্রান্সে তার নির্বাসিত জীবন থেকে দেশে ফিরে ইরানে ইসলামি বিপ্লবের সূচনা করেছিলেন। বিংশ শতাব্দীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল এটি। বলা হয়ে থাকে, ফরাসি বিপ্লব ও রুশ বিপ্লবের পরই ইরানের এ বিপ্লবের স্থান, যার ফলে ইরানি সমাজে প্রাচীন ঐতিহ্যের ইসলামি কালচারের সমন্বয় ঘটে। ফ্রান্সে নির্বাসিত থাকা অবস্থায় ইমাম খোমেনি ইরানে তার রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করতেন। প্যারিসের অদূরে একটি গ্রামে অবস্থান করতেন তিনি। সেই থেকে আজ পর্যন্ত দুনিয়া অনেক বদলে গেছে। ফ্রান্সের এ গ্রামটিতে নীরবে নিভৃতে যা কিছু ঘটেছিল, তা আমাদের এ পৃথিবীকে অনেক বদলে দিয়েছে। একটি বহুমাতৃক বিশ্বব্যবস্থার প্রসব বেদনা আমরা অনুভব করছি। ইরান সেই প্রসব ঘটানোর জন্য সেবিকার মতো কাজ করে যাচ্ছে। ভুল সিদ্ধান্ত ও বিপর্যয়ের কারণে ১৯৭৮ সালে ইরানে যখন চরম অস্থিরতা ও সহিংসতা শুরু হয়, আয়াতুল্লাহ খোমেনি তখন ইরাকে শিয়াদের পবিত্র নগরী নাজাফে কড়া পাহারায় নির্বাসিত জীবনে ছিলেন। ইরাকে তখন সাদ্দাম হোসেনের শাসন। ইরানের শাহ্ আয়াতুল্লাহ খোমেনিকে ইরাক থেকে বহিষ্কারের জন্য সাদ্দাম হোসেনকে অনুরোধ করেন। চরম ভুল করেছিলেন শাহ। বহিষ্কৃত আয়াতুল্লাহ ফ্রান্সে পাড়ি জমালেন এবং সেখান থেকে প্রায় বিনা ক্লেশে গোটা পৃথিবীর উদ্দেশে কথা বলার সুযোগ পেয়ে গেলেন। তার আপসহীন ও জোরালো সব বক্তব্যের কারণে দ্রুত তিনি সারা বিশ্বের নজর কাড়েন। শেষ পর্যন্ত ১৯৭৯ সালের জানুয়ারিতে যখন শাহ্ দেশ ছাড়তে বাধ্য হন, আয়াতুল্লাহ দেশে ফেরার সুযোগ পান এবং ফিরেই রাজতন্ত্র উচ্ছেদ করে ফেলেন।

ইরানে শাহের বিরুদ্ধে প্রাথমিকভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল দেশটির তুদেহ্ পার্টি। তুদেহ্ পার্টি ছিল ইরানের ঐতিহ্যবাহী কমিউনিস্ট পার্টি। এ পার্টি শুরুর দিকে শাহ্বিরোধী আন্দোলনে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু ধীরে ধীরে এ আন্দোলন কমিউনিস্টদের হাতছাড়া হয়ে যায় এবং খোমেনি ও খোমেনির অনুসারীরা এ আন্দোলনের ওপর মজবুত প্রভাব বিস্তার করে। এক পর্যায়ে কমিউনিস্টদের ভূমিকা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। খোমেনি এ পর্যায়ে ইরানি জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতীক হিসাবে দাঁড়িয়ে যান। ইরানের আয়াতুল্লাহরা শিক্ষা-দীক্ষা ও চিন্তা-চেতনার দিক থেকে ছিল খুবই ঋদ্ধ মানুষ। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বার্ষিক অধিবেশনে ইরানি প্রেসিডেন্টদের সারগর্ভ ভাষণ পুরো বিশ্বকে মুগ্ধ করে দেয়।

গত ৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশের দৈনিকগুলোতে খবর বেরিয়েছে, ইরানের নৈতিক পুলিশ বিলুপ্ত হতে যাচ্ছে। ইরানে গত ২ মাসেরও বেশি সময় ধরে চলতে থাকা রক্তাক্ত বিক্ষোভের মুখে অবশেষে বিতর্কিত ‘নৈতিক পুলিশ’ বিলুপ্ত করেছে দেশটির সরকার। এর আগে দেশটির বাধ্যতামূলক হিজাব আইনও সংস্কার করার ইঙ্গিত দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। আল জাজিরা ও এএফপি সূত্রে এ খবরটি জানা গেছে।

কঠোর বিধি মেনে হিজাব না পরার অভিযোগে গত ১৩ সেপ্টেম্বর রাজধানী তেহরানে কুর্দি তরুণী মাহসা আমিনিকে নৈতিক পুলিশ গ্রেফতারের পর তার মৃত্যু হয়। নির্যাতনের ফলে মাহসার মৃত্যু হয়েছে দাবি করে ইরানের মানুষ রাজপথে নেমে আসে। এই একটি মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ইরানজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ইরানি কর্তৃপক্ষ দমনপীড়ন জোরদার করে। বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে গিয়ে অন্তত ২০০ ইরানি নিহত হয়েছেন বলে কর্তৃপক্ষ স্বীকার করেছে। মানবাধিকার সংগঠনের হিসাবে এ সংখ্যা কম করে হলেও দ্বিগুণ।

দেশটির অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ জাফর মনতাজেরি গত শনিবার বলেছেন, ‘বিচার বিভাগের সঙ্গে নৈতিক পুলিশের কোনো সম্পর্ক নেই। এটি বিলুপ্ত করা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘এটি অতীত যে জায়গা থেকে চালু করা হয়েছিল, সেখান থেকেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।’ অ্যাটর্নি জেনারেলের বক্তব্য ব্যবচ্ছেদ করলে যা দাঁড়াতে পারে তা হলো, শাসনতান্ত্রিক চৌহদ্দির বাইরে কোনো শক্তিকেন্দ্র থেকে এর উদ্ভব ঘটেছিল। গত ৪০ বছরে ‘নৈতিক পুলিশ’ নিয়ে এখনকার মতো এমন আন্দোলন কখনো হয়নি। একটা পর্যায় পর্যন্ত ‘নৈতিক পুলিশে’র কার্যক্রম নিয়ে উল্লেখযোগ্য কোনো দ্বিমতের কথা শোনা যায়নি। সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত থেকে বলা যাচ্ছে না এ বাহিনী অনির্দিষ্টকালের জন্য বাতিল করা হয়েছে কিনা।

ইরানের ‘নৈতিক পুলিশ’ মূলত ফার্সি ‘গাতে-ই-এরাদ’ বা গাইডেন্স পেট্রল নামে পরিচিত। তাদের কাজ হলো, ইরানের কঠোর পোশাকবিধি অমান্যকারী ব্যক্তিদের আটক করে ব্যবস্থা নেওয়া। তারা ইরানের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংযুক্ত। ইরানের শীর্ষ ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের ঠিক করা ইসলামি নীতি-নৈতিকতা মানুষ মানছে কিনা, তা তারা নিশ্চিত করে। ‘নৈতিক পুলিশে’র প্রতিটি ইউনিটে একটি করে ভ্যান আছে। এ ভ্যানগাড়িতে বাহিনীর নারী ও পুরুষ উভয় ধরনের সদস্যরা থাকে। তারা জনাকীর্ণ স্থানে টহল দেয়। আবার কিছু ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আটক করে থানা বা সংশোধনাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে পুরুষ অভিভাবকদের ডেকে তাদের জিম্মায় আটক ব্যক্তিকে ছেড়ে দেওয়া হয়। ‘নৈতিক পুলিশ’ কিছু ক্ষেত্রে নিয়ম লঙ্ঘনকারী ব্যক্তিদের জরিমানা করে। তবে জরিমানার ক্ষেত্রে সাধারণ কোনো নিয়ম নেই। প্রশ্ন উঠতে পারে, ইরানব্যাপী যে গণবিক্ষোভ চলছে, তার প্রত্যক্ষ কারণ কী? এটা কি হিজাব বর্জনের দাবি, নাকি পুলিশ হেফাজতে নিরীহ নারীর মৃত্যুর প্রতিবাদ। একটাকে অন্যটি থেকে আলাদা করে অবশ্যই দেখতে হবে। বিক্ষোভে ২০০ কিংবা ৪০০ মানুষের মৃত্যু কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

মাহসার মৃত্যুর পর ইরানের অভ্যন্তরে ও বাইরে ব্যাপক প্রতিবাদ ও সংহতি জানাতে গিয়ে নারীরা তাদের মাথার আবরণ পুড়িয়েছেন এবং তাদের চুল কেটে ফেলেছেন। ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ প্রতিবাদকারীদের প্রধান স্লোগান হয়ে উঠেছে। ইরানি কর্তৃপক্ষ চলমান এ বিক্ষোভের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল, ইউরোপীয় দেশগুলো এবং সৌদি আরবকে অভিযুক্ত করেছে। তেহরানের দাবি, এসব শক্তি ইরানকে অস্থিতিশীল ও দুর্বল করার জন্য মাহসার মৃত্যুকে অজুহাত হিসাবে ব্যবহার করেছে। ইরানি কর্তৃপক্ষের এ দাবির পেছনে বাস্তব ভিত্তি রয়েছে। ইরানি কর্তৃপক্ষ হিজাব আইন সংস্কারের ইঙ্গিত দিয়েছে। দেশটির অ্যাটর্নি জেনারেল মনতাজেরি গত শুক্রবার বলেছেন, নারীদের বাধ্যতামূলকভাবে হিজাব পরিধান সংক্রান্ত আইনের প্রয়োজনীয় সংস্কার আনতে সংসদ ও বিচার বিভাগ কাজ করছে। তবে বিদ্যমান আইনে কী পরিবর্তন আনা হচ্ছে সে ব্যাপারে কোনো ইঙ্গিত দেননি তিনি। ইরানে ১৯৮৩ সালে হিজাব সংক্রান্ত আইন চালু করা হয়। তখন থেকেই প্রত্যেক প্রাপ্ত বয়স্ক নারীর হিজাব পরা বাধ্যতামূলক করা হয়।

দেখা যাচ্ছে, ইরানে সরকারিভাবে হিজাব চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বিপ্লবের চার বছর পর। এ বিলম্বের কারণ খুঁজতে গেলে দেখা মিলতে পারে-মানুষকে অভ্যস্ত করে তুলতে ইরানের বিপ্লবী সরকার কিছুটা সময় নিয়েছিল। তবে ইউরোপ-আমেরিকার দেশগুলোসহ বিশ্বের সব দেশে নারীদের মধ্যে হিজাব পরার প্রবণতা বাড়ছে। আন্তর্জাতিক পরিসরে মুসলমান নারীদের মধ্যে হিজাব পরার প্রবণতা যখন বাড়ছে, তখন ইরানে এর বিরুদ্ধে আন্দোলন হচ্ছে-এমন সিদ্ধান্তে আসা সঠিক নাও হতে পারে। আমার কাছে মনে হয়েছে, ইরানের এ আন্দোলন প্রধানত মানবাধিকার অস্বীকার করার বিরুদ্ধে। ৪০ বছর আগে ইরানের যে মূল্যবোধগুলো তরতাজা হয়ে উঠেছিল, সেগুলো ৪০ বছর পর শুকনো পাতার মতো বৈশাখী বাতাসে বৃন্তচ্যুত হবে-এমনটি কী করে ভাবা যায়! ইরানের জনগণের মন নিয়ে যদি কোনো সমাজ গবেষক গবেষণা করতেন, তাহলে ইসলামি সভ্যতার মধ্যেও বিবর্তনের বাঁকগুলো বোঝা সম্ভব হতো।

ড. মাহবুব উল্লাহ : শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ

শতফুল ফুটতে দাও

ইরানি মন, হিজাব ও মানবাধিকার

 ড. মাহবুব উল্লাহ্ 
০৮ ডিসেম্বর ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ইরানে ১৯৭৯ সালের বিপ্লব সভ্যতার ইতিহাসে ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। ইরান ছিল রাজতন্ত্র।

সে সময় দেশটিতে শাসন করতেন রেজা শাহ পাহলভি। রেজা শাহ ইরানে পরিবর্তন আনতে চেয়েছিলেন। সেই পরিবর্তন ছিল ইরানের সভ্যতাকে আধুনিক করে তোলা। রেজা শাহের এ প্রয়াস ‘শ্বেত বিপ্লব’ নামে পরিচিতি পায়। এক কথায় বলা যায়, তিনি চেয়েছিলেন ইরানকে সব দিক থেকে পাশ্চাত্যায়িত দেশে পরিণত করতে। কিন্তু ১৯৭৯ সালের বিপ্লব ইরানকে ইসলামি প্রজাতন্ত্রে পরিণত করে।

সে সময় ইরানি জনগণ ইরানকে আধুনিক দেশ হিসাবে রূপান্তরিত করার জন্য শাহের এ প্রয়াসকে সমর্থন করতে পারেনি। ইরানি সভ্যতার ইতিহাস দীর্ঘকালের পুরোনো। এ সভ্যতা নিয়ে ইরানিরা গর্ব করত এবং এখনো করে। আমরা জানি, ইরানে নওরোজ নামে নববর্ষ উৎসব চালু আছে। বর্ণাঢ্য এ নববর্ষের উৎসবটি ইরানি সভ্যতার মতোই প্রাচীন। ইরানি জনগণ তাদের সভ্যতা নিয়ে গর্ব করে। যে সভ্যতা হাফেজ, রুমী ও ওমর খৈয়ামের মতো কবি ও দার্শনিকদের জন্ম দিয়েছে, সে সভ্যতার পাটাতন যে গ্রানাইড পাথরের মতো শক্ত ভিতের ওপর প্রতিষ্ঠিত, তার জনগণ কখনোই ভুল পথে হাঁটবে না।

ইরানে ১৯৭৯ সালের বিপ্লব ঘটেছে পাহলভির স্বৈরতন্ত্র, আয়াতুল্লাহ খোমেনির নির্বাসন এবং সামাজিক অবিচারসহ সব ধরনের অনাচার ও অন্যায্যতার বিরুদ্ধে। শাহের আধুনিক ইরান গঠনের প্রয়াস যে অর্থহীন ছিল, তা আমরা বুঝতে পারি ইরানি জনগণ যেভাবে ইমাম খোমেনির ডাকে সাড়া দিয়েছিল তা থেকে। পাশ্চাত্যের কাছ থেকে কিছু মেকী চালচলন রপ্ত করলেই একটা সমাজ উন্নত হয়ে যায় না। আমাদের মনে রাখতে হবে, জনগোষ্ঠী সমৃদ্ধ অতীতের উত্তরাধিকারীদের হঠাৎ করে বিলেতি সাহেবে পরিণত করা সম্ভব নয়। ইরানের শাহের এ প্রচেষ্টা জনগণ গ্রহণ করেনি। তারা আলিঙ্গন করেছে ইসলামি বিপ্লবের খোমেনি দর্শনকে।

৪০ বছরেরও কিছু বেশি সময় আগে আয়াতুল্লাহ খোমেনি ফ্রান্সে তার নির্বাসিত জীবন থেকে দেশে ফিরে ইরানে ইসলামি বিপ্লবের সূচনা করেছিলেন। বিংশ শতাব্দীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল এটি। বলা হয়ে থাকে, ফরাসি বিপ্লব ও রুশ বিপ্লবের পরই ইরানের এ বিপ্লবের স্থান, যার ফলে ইরানি সমাজে প্রাচীন ঐতিহ্যের ইসলামি কালচারের সমন্বয় ঘটে। ফ্রান্সে নির্বাসিত থাকা অবস্থায় ইমাম খোমেনি ইরানে তার রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করতেন। প্যারিসের অদূরে একটি গ্রামে অবস্থান করতেন তিনি। সেই থেকে আজ পর্যন্ত দুনিয়া অনেক বদলে গেছে। ফ্রান্সের এ গ্রামটিতে নীরবে নিভৃতে যা কিছু ঘটেছিল, তা আমাদের এ পৃথিবীকে অনেক বদলে দিয়েছে। একটি বহুমাতৃক বিশ্বব্যবস্থার প্রসব বেদনা আমরা অনুভব করছি। ইরান সেই প্রসব ঘটানোর জন্য সেবিকার মতো কাজ করে যাচ্ছে। ভুল সিদ্ধান্ত ও বিপর্যয়ের কারণে ১৯৭৮ সালে ইরানে যখন চরম অস্থিরতা ও সহিংসতা শুরু হয়, আয়াতুল্লাহ খোমেনি তখন ইরাকে শিয়াদের পবিত্র নগরী নাজাফে কড়া পাহারায় নির্বাসিত জীবনে ছিলেন। ইরাকে তখন সাদ্দাম হোসেনের শাসন। ইরানের শাহ্ আয়াতুল্লাহ খোমেনিকে ইরাক থেকে বহিষ্কারের জন্য সাদ্দাম হোসেনকে অনুরোধ করেন। চরম ভুল করেছিলেন শাহ। বহিষ্কৃত আয়াতুল্লাহ ফ্রান্সে পাড়ি জমালেন এবং সেখান থেকে প্রায় বিনা ক্লেশে গোটা পৃথিবীর উদ্দেশে কথা বলার সুযোগ পেয়ে গেলেন। তার আপসহীন ও জোরালো সব বক্তব্যের কারণে দ্রুত তিনি সারা বিশ্বের নজর কাড়েন। শেষ পর্যন্ত ১৯৭৯ সালের জানুয়ারিতে যখন শাহ্ দেশ ছাড়তে বাধ্য হন, আয়াতুল্লাহ দেশে ফেরার সুযোগ পান এবং ফিরেই রাজতন্ত্র উচ্ছেদ করে ফেলেন।

ইরানে শাহের বিরুদ্ধে প্রাথমিকভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল দেশটির তুদেহ্ পার্টি। তুদেহ্ পার্টি ছিল ইরানের ঐতিহ্যবাহী কমিউনিস্ট পার্টি। এ পার্টি শুরুর দিকে শাহ্বিরোধী আন্দোলনে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু ধীরে ধীরে এ আন্দোলন কমিউনিস্টদের হাতছাড়া হয়ে যায় এবং খোমেনি ও খোমেনির অনুসারীরা এ আন্দোলনের ওপর মজবুত প্রভাব বিস্তার করে। এক পর্যায়ে কমিউনিস্টদের ভূমিকা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। খোমেনি এ পর্যায়ে ইরানি জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতীক হিসাবে দাঁড়িয়ে যান। ইরানের আয়াতুল্লাহরা শিক্ষা-দীক্ষা ও চিন্তা-চেতনার দিক থেকে ছিল খুবই ঋদ্ধ মানুষ। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বার্ষিক অধিবেশনে ইরানি প্রেসিডেন্টদের সারগর্ভ ভাষণ পুরো বিশ্বকে মুগ্ধ করে দেয়।

গত ৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশের দৈনিকগুলোতে খবর বেরিয়েছে, ইরানের নৈতিক পুলিশ বিলুপ্ত হতে যাচ্ছে। ইরানে গত ২ মাসেরও বেশি সময় ধরে চলতে থাকা রক্তাক্ত বিক্ষোভের মুখে অবশেষে বিতর্কিত ‘নৈতিক পুলিশ’ বিলুপ্ত করেছে দেশটির সরকার। এর আগে দেশটির বাধ্যতামূলক হিজাব আইনও সংস্কার করার ইঙ্গিত দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। আল জাজিরা ও এএফপি সূত্রে এ খবরটি জানা গেছে।

কঠোর বিধি মেনে হিজাব না পরার অভিযোগে গত ১৩ সেপ্টেম্বর রাজধানী তেহরানে কুর্দি তরুণী মাহসা আমিনিকে নৈতিক পুলিশ গ্রেফতারের পর তার মৃত্যু হয়। নির্যাতনের ফলে মাহসার মৃত্যু হয়েছে দাবি করে ইরানের মানুষ রাজপথে নেমে আসে। এই একটি মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ইরানজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ইরানি কর্তৃপক্ষ দমনপীড়ন জোরদার করে। বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে গিয়ে অন্তত ২০০ ইরানি নিহত হয়েছেন বলে কর্তৃপক্ষ স্বীকার করেছে। মানবাধিকার সংগঠনের হিসাবে এ সংখ্যা কম করে হলেও দ্বিগুণ।

দেশটির অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ জাফর মনতাজেরি গত শনিবার বলেছেন, ‘বিচার বিভাগের সঙ্গে নৈতিক পুলিশের কোনো সম্পর্ক নেই। এটি বিলুপ্ত করা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘এটি অতীত যে জায়গা থেকে চালু করা হয়েছিল, সেখান থেকেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।’ অ্যাটর্নি জেনারেলের বক্তব্য ব্যবচ্ছেদ করলে যা দাঁড়াতে পারে তা হলো, শাসনতান্ত্রিক চৌহদ্দির বাইরে কোনো শক্তিকেন্দ্র থেকে এর উদ্ভব ঘটেছিল। গত ৪০ বছরে ‘নৈতিক পুলিশ’ নিয়ে এখনকার মতো এমন আন্দোলন কখনো হয়নি। একটা পর্যায় পর্যন্ত ‘নৈতিক পুলিশে’র কার্যক্রম নিয়ে উল্লেখযোগ্য কোনো দ্বিমতের কথা শোনা যায়নি। সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত থেকে বলা যাচ্ছে না এ বাহিনী অনির্দিষ্টকালের জন্য বাতিল করা হয়েছে কিনা।

ইরানের ‘নৈতিক পুলিশ’ মূলত ফার্সি ‘গাতে-ই-এরাদ’ বা গাইডেন্স পেট্রল নামে পরিচিত। তাদের কাজ হলো, ইরানের কঠোর পোশাকবিধি অমান্যকারী ব্যক্তিদের আটক করে ব্যবস্থা নেওয়া। তারা ইরানের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংযুক্ত। ইরানের শীর্ষ ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের ঠিক করা ইসলামি নীতি-নৈতিকতা মানুষ মানছে কিনা, তা তারা নিশ্চিত করে। ‘নৈতিক পুলিশে’র প্রতিটি ইউনিটে একটি করে ভ্যান আছে। এ ভ্যানগাড়িতে বাহিনীর নারী ও পুরুষ উভয় ধরনের সদস্যরা থাকে। তারা জনাকীর্ণ স্থানে টহল দেয়। আবার কিছু ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আটক করে থানা বা সংশোধনাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে পুরুষ অভিভাবকদের ডেকে তাদের জিম্মায় আটক ব্যক্তিকে ছেড়ে দেওয়া হয়। ‘নৈতিক পুলিশ’ কিছু ক্ষেত্রে নিয়ম লঙ্ঘনকারী ব্যক্তিদের জরিমানা করে। তবে জরিমানার ক্ষেত্রে সাধারণ কোনো নিয়ম নেই। প্রশ্ন উঠতে পারে, ইরানব্যাপী যে গণবিক্ষোভ চলছে, তার প্রত্যক্ষ কারণ কী? এটা কি হিজাব বর্জনের দাবি, নাকি পুলিশ হেফাজতে নিরীহ নারীর মৃত্যুর প্রতিবাদ। একটাকে অন্যটি থেকে আলাদা করে অবশ্যই দেখতে হবে। বিক্ষোভে ২০০ কিংবা ৪০০ মানুষের মৃত্যু কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

মাহসার মৃত্যুর পর ইরানের অভ্যন্তরে ও বাইরে ব্যাপক প্রতিবাদ ও সংহতি জানাতে গিয়ে নারীরা তাদের মাথার আবরণ পুড়িয়েছেন এবং তাদের চুল কেটে ফেলেছেন। ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ প্রতিবাদকারীদের প্রধান স্লোগান হয়ে উঠেছে। ইরানি কর্তৃপক্ষ চলমান এ বিক্ষোভের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল, ইউরোপীয় দেশগুলো এবং সৌদি আরবকে অভিযুক্ত করেছে। তেহরানের দাবি, এসব শক্তি ইরানকে অস্থিতিশীল ও দুর্বল করার জন্য মাহসার মৃত্যুকে অজুহাত হিসাবে ব্যবহার করেছে। ইরানি কর্তৃপক্ষের এ দাবির পেছনে বাস্তব ভিত্তি রয়েছে। ইরানি কর্তৃপক্ষ হিজাব আইন সংস্কারের ইঙ্গিত দিয়েছে। দেশটির অ্যাটর্নি জেনারেল মনতাজেরি গত শুক্রবার বলেছেন, নারীদের বাধ্যতামূলকভাবে হিজাব পরিধান সংক্রান্ত আইনের প্রয়োজনীয় সংস্কার আনতে সংসদ ও বিচার বিভাগ কাজ করছে। তবে বিদ্যমান আইনে কী পরিবর্তন আনা হচ্ছে সে ব্যাপারে কোনো ইঙ্গিত দেননি তিনি। ইরানে ১৯৮৩ সালে হিজাব সংক্রান্ত আইন চালু করা হয়। তখন থেকেই প্রত্যেক প্রাপ্ত বয়স্ক নারীর হিজাব পরা বাধ্যতামূলক করা হয়।

দেখা যাচ্ছে, ইরানে সরকারিভাবে হিজাব চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বিপ্লবের চার বছর পর। এ বিলম্বের কারণ খুঁজতে গেলে দেখা মিলতে পারে-মানুষকে অভ্যস্ত করে তুলতে ইরানের বিপ্লবী সরকার কিছুটা সময় নিয়েছিল। তবে ইউরোপ-আমেরিকার দেশগুলোসহ বিশ্বের সব দেশে নারীদের মধ্যে হিজাব পরার প্রবণতা বাড়ছে। আন্তর্জাতিক পরিসরে মুসলমান নারীদের মধ্যে হিজাব পরার প্রবণতা যখন বাড়ছে, তখন ইরানে এর বিরুদ্ধে আন্দোলন হচ্ছে-এমন সিদ্ধান্তে আসা সঠিক নাও হতে পারে। আমার কাছে মনে হয়েছে, ইরানের এ আন্দোলন প্রধানত মানবাধিকার অস্বীকার করার বিরুদ্ধে। ৪০ বছর আগে ইরানের যে মূল্যবোধগুলো তরতাজা হয়ে উঠেছিল, সেগুলো ৪০ বছর পর শুকনো পাতার মতো বৈশাখী বাতাসে বৃন্তচ্যুত হবে-এমনটি কী করে ভাবা যায়! ইরানের জনগণের মন নিয়ে যদি কোনো সমাজ গবেষক গবেষণা করতেন, তাহলে ইসলামি সভ্যতার মধ্যেও বিবর্তনের বাঁকগুলো বোঝা সম্ভব হতো।

ড. মাহবুব উল্লাহ : শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন