ভেনিসের এক অধ্যাপকের কথা
jugantor
ভেনিসের এক অধ্যাপকের কথা

  ড. আবু এন এম ওয়াহিদ  

০৮ ডিসেম্বর ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আল্ভা পাভারিটো ইতালির ভেনিসে অবস্থিত এক প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের প্রধান এবং একটি সুপ্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক জার্নালের সম্পাদক।

জার্নাল সম্পাদনা সূত্রে ই-মেইল মারফত তার সঙ্গে আমার পরিচয়। কখনো দেখা হয়নি, এমনকি কথাও হয়নি। বেশ কিছুদিন নীরবতার পর হঠাৎ আল্ভার এক ই-মেইল পেলাম।

লিখেছেন, তিনি তার বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জন্য একটি ওয়ার্কশপ করতে চান এবং এ ইভেন্ট আয়োজনের পুরো দায়িত্ব আমার ওপর ছেড়ে দিতে পারলে খুশি হবেন। ওয়ার্কশপটি হতে হবে একদিনব্যাপী এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন। আর এর বিষয়বস্তু হবে ‘উন্নয়ন অর্থনীতির বিভিন্ন দিক’। আমিসহ ছ’জন অর্থনীতিবিদ লিখিত গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন এবং এর ওপর প্রশ্নোত্তর, মন্তব্য ও আলোচনা-সমালোচনা চলবে সারাদিন ধরে। আমাদের সবার যাওয়া-আসার বিমান ভাড়া, ভেনিসে দু’দিনের হোটেল এবং একটা সোশ্যাল ডিনার বাবত যাবতীয় খরচ তিনিই দেবেন।

আল্ভার ই-মেইল পেয়ে এবং আমার ওপর তার আস্থা দেখে বিস্মিত ও আনন্দিত না হয়ে পারিনি! এ ধরনের আয়োজন আগে কখনো করিনি, তবু সাহসের সঙ্গে দেরি না করেই কাজে লেগে গেলাম। প্রথমে প্রবন্ধের নির্দিষ্ট টপিক ঠিক করে বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা আমার পরিচিত দশ-বারোজন উন্নয়ন বিশেষজ্ঞকে দাওয়াত করলাম। তারপর সপ্তাহে দু’এক দফায় ই-মেইল চালাচালির পর উপস্থাপকদের তালিকা চূড়ান্ত হলো এভাবে-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ইউনিভার্সিটি অব সিয়াটলের মীনাক্ষী ঋষি এবং আমি; বাংলাদেশ থেকে ঢাকা ইউনিভার্সিটির আইবিএ-ডিরেক্টর জিয়াউল হক মামুন এবং সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটির মোহাম্মদ সালাহ্উদ্দিন; নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ড ইউনিভার্সিটি থেকে রাশমী অরোরা এবং মালয়েশিয়ার ইউনিভার্সিটি টেকনোলজি-মারার মনসুর ওয়ান মাহ্মুদ।

জানাজানির জন্য আল্ভা ওয়ার্কশপের একটি রঙিন ফ্লায়ার তৈরি করে তার ইউনিভার্সিটি ওয়েব সাইটে পোস্ট করলেন এবং বেশকিছু হার্ড কপি সারা ক্যাম্পাসের দেওয়ালে দেওয়ালে সেঁটে দিলেন। আমরা প্রবন্ধ উপস্থাপকরা একদিন আগে গন্তব্যে গিয়ে পৌঁছাই। আমি ন্যাশভিল থেকে ডেট্রোয়েট-আমস্টারডাম হয়ে ভেনিস যাই। আমার কিছুক্ষণ আগে ড. মামুন ঢাকা থেকে হংকং এবং রোম হয়ে ভেনিস আসেন। ঘণ্টা দুয়েক পর অন্যরা বিভিন্ন দিক থেকে এসে এমিরেট্সের সরাসরি দুবাই-ভেনিস ফ্লাইট ধরেন। সব অংশগ্রহণকারী একত্র হওয়ার পর হোটেলের পথে রওয়ানা দেওয়ার আগেই আমি আল্ভাকে ফোন করলাম। এয়ারপোর্টে এসে আমাদের রিসিভ করতে পারেননি বলে তিনি দুঃখ প্রকাশ করলেন এবং বলে দিলেন কীভাবে হোটেলে যেতে হবে। আরও বললেন, পরদিন সকাল আটটায় এসে আমাদের সঙ্গে দেখা করবেন এবং তারপর নিয়ে যাবেন ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে।

আল্ভার কথামতো আমরা সাতজন (মীনাক্ষীর সঙ্গে আসা তার স্বামীকে নিয়ে) একসঙ্গে রওয়ানা দিলাম আমাদের জন্য নির্ধারিত স্যান মার্কো স্কোয়ারের এক ঐতিহ্যবাহী হোটেলের উদ্দেশে। ভেনিসের মার্কোপলো এয়ারপোর্ট টার্মিনাল ছেড়ে আনুমানিক কোয়ার্টার মাইল পথ হেঁটে গিয়ে উঠলাম ওয়াটার ট্যাক্সিতে। রোদ ঝলমল দুপুরে খোলা বাতাস আর সাগরের গর্জন আমাদের মাঝে বইয়ে দিল দারুণ এক উচ্ছ্বাস, উদ্দীপনা ও আনন্দের বন্যা। ফলে সহজেই দূর হয়ে গেল দীর্ঘ বিমান ভ্রমণের সব ক্লান্তি।

তখন বেলা প্রায় ৩টা। কড়া রোদের মধ্যে এসে নামলাম ঐতিহাসিক স্যান মার্কো স্কোয়ারে। শানবাঁধানো বিরাট উন্মুক্ত চত্বর। আশপাশ তাকিয়ে দেখি বিল্ডিংগুলো সব পুরোনো-এতই পুরোনো যেন হাজার বছর আগের বানানো ইমারত। কিন্তু হলে কী হবে, একটু গভীর দৃষ্টি ফেললে দালানকোঠার অবয়বে একটা খান্দানি ভাব স্পষ্ট ফুটে ওঠে। ঠিকানা দেখে সবাই মিলে হেঁটে হেঁটে অনেক খোঁজাখুঁজির পর বিরাট এক বাণিজ্যিক ভবনের পেছনে, ছোট্ট খালের ওপারে গিয়ে বের করি লুকিয়ে থাকা হোটেলটি।

হোটেলটি ঐতিহাসিক দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটা গোটা ইউরোপ মহাদেশের পুরোনো হোটেলের মধ্যে অন্যতম। কারও কারও মতে, সবচেয়ে পুরোনো! অতি প্রাচীনকালে ইউরোপিয়ান কাউবয়রা ঘোড়া নিয়ে ওপথে চলাচল করত এবং ওই হোটেলে রাত কাটাত। অনেক নামিদামি কবি, শিল্পী, সাহিত্যিক ও মিউজিক কম্পোজার বিভিন্ন সময়ে এ হোটেলের আতিথেয়তা গ্রহণ করেছেন। ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন স্যার উইনস্টন চার্চিলও এ হোটেলে একবার রাত কাটিয়েছেন। আমরা হোটেলে চেক-ইন করে গোসল সেরে একটু বিশ্রাম নিয়ে দলবেঁধে সবাই দ্বীপ-শহর দেখতে বেরিয়ে পড়ি। সারা বিকাল ঘোরাঘুরি করে খাওয়া-দাওয়া সেরে সন্ধ্যার দিকে হোটেলে ফিরে এলাম। সে রাতে দেরি না করে ঘুমিয়ে পড়ি। সকালে উঠে তৈরি হয়ে হোটেলের রেস্টুরেন্টে নাশতা খেয়ে ৮টার আগেই আমরা সবাই আল্ভার জন্য প্রস্তুত হয়ে রইলাম। ঘড়িতে ৮টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে ওয়াটার ট্যাক্সি নিয়ে তিনি এসে হাজির। ভাটির টানে পানি নিচে থাকায় আগের দিন আমরা ওয়াটার ট্যাক্সি থেকে দূরে নেমে হেঁটে এসেছি, কিন্তু ওই দিন সকালে জোয়ার ছিল বলে ওয়াটার ট্যাক্সি এসে থামল একেবারে হোটেলের লবির খালের দিকের পেছন দরজায়। স্যান মার্কো স্কোয়ারে চাকাওয়ালা কোনো যান চলাচল করে না। যাতায়াতের বাহন, পানিতে বৈঠা বাওয়া কাঠের গন্ডোলা, ওয়াটার ট্যাক্সি অথবা ওয়াটার বাস ছাড়া গত্যন্তর নেই, আর ডাঙায় একমাত্র ভরসা আপন পদযুগল। স্যান মার্কোতে ঢাকার মতো রিকশা চললে ভ্রমণটা হতে পারত অনেক বেশি উত্তেজনাপূর্ণ, চমকপ্রদ ও আনন্দদায়ক!

ওয়াটার ট্যাক্সি করে আধা ঘণ্টার মধ্যে আমরা হোটেল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে গিয়ে পৌঁছালাম। ক্যাম্পাসে গিয়ে কেউ কেউ ঘুরতে বেরোলেন এদিক-ওদিক, আর অন্যরা আল্ভার সঙ্গে কফিশপে গিয়ে চা-কফি খেলেন। আধা ঘণ্টার মধ্যে সবাই আবার একত্র হলাম। তারপর শুরু হলো ওয়ার্কশপ। চলল সারাদিন দুই সেশনজুড়ে। মাঝখানে এক ঘণ্টার লাঞ্চ বিরতি। ওয়ার্কশপের প্রতিটি প্রবন্ধের বিষয়বস্তু ও উপস্থাপনা ছিল চমৎকার-এটা আমার কথা নয়, বলেছেন আল্ভা। প্রশ্ন ও আলোচনা হয়েছিল বিস্তর। ওয়ার্কশপ শেষে ওয়াটার ট্যাক্সি করে আল্ভা আমাদের ফের হোটেলে নামিয়ে দিয়ে বাড়ি চলে গেলেন। যাওয়ার সময় বললেন, ‘তোমরা এখন বিশ্রাম নাও, আমি সন্ধ্যা ৭টায় এসে সবাইকে ডিনারে নিয়ে যাব।’

সন্ধ্যায় ঠিক সময়মতো তিনি এসে হাজির। হোটেল থেকে বেরিয়ে সরু গলিপথে হাঁটা। আল্ভা আগে আগে আর আমরা লাইন ধরে তার পেছনে চলছি। একটা ব্রিজের উপর দিয়ে খাল পেরিয়ে প্রায় আধা মাইল পথ হেঁটে এসে উঠলাম ভেনিসের স্যান মার্কো স্কোয়ারের এক অতি পুরোনো ও সম্ভ্রান্ত রেস্তোরাঁয়। ভেতরে ঢুকেই রেস্তোরাঁ ও তার সাজসজ্জা-পরিবেশ দেখে সহজেই আঁচ করতে পেরেছিলাম, এর রূপমাধুর্য ও আভিজাত্য যেন গা গড়িয়ে ফোঁটা ফোঁটা হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ছে! বসার সঙ্গে সঙ্গে মেনু নিয়ে এলেন এক তরুণ ওয়েটার-নাম রফিক, প্রবাসী বাংলাদেশি। রফিক আমাদের দেখেই হতবাক! মনে করেছেন, পথ ভুলে আমরা এসে পড়েছি তার খান্দানি খাবার দোকানে, কারণ সচরাচর আমাদের মতো বাদামি চামড়ার লোকজন ওখানে খেতে যায় না, যেতে চাইলেও পারে না, দামের কারণে। রফিক প্রথমেই বললেন, ‘আপনারা যে এখানে খেতে এসেছেন, জানেন দাম কত পড়বে?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কত?’ রফিকের কাটা কাটা উত্তর-‘মাথাপিছু কমপক্ষে একশ ইউরো তো হবেই।’ আমি আল্ভাকে দেখিয়ে বললাম, ‘চিন্তার কোনো কারণ নেই, উনি আমাদের নিয়ে এসেছেন।’ আল্ভার সঙ্গে আমাদের দেখে রফিকের বিস্ময় বেড়ে গেল দ্বিগুণ। এবার মোলায়েম সুরে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি উনাকে চেনেন কী করে?’ আমি বললাম, ‘উনি আমার বন্ধু।’ ‘তা কী করে হয়?’ রফিকের আশ্চর্যবোধক প্রশ্ন! পুরো ঘটনা খুলে বলার পর, রফিক বুঝতে পারলেন কেন ও কীভাবে আমরা ওই রাতে তার রেস্তোরাঁয় হাজির হয়েছিলাম। তারপর রফিকের আবদার-‘যাবার আগে আপনার সঙ্গে আমার একটু প্রাইভেট কথা আছে।’

শুরু হলো ডিনারের পালা, কোর্সের পর কোর্স-প্রধানত ‘সি ফুড’-ওয়েস্টার, মাছ, মাছের ডিম, কোনোটা স্টিম্ড, কোনোটা আধা রান্না করা, কোনোটা রান্না করা। এত দামি দামি খাবার, কিন্তু খেতে পারছি না কিছুই, সি ফুডের কাঁচা কাঁচা গন্ধে আমার বমি বমি লাগছিল! অন্যদের অবস্থাও দেখলাম তথৈবচ। সবাই পেট ভরলাম সস্তা পদের আলু খেয়ে। শেষে অবশ্য ডেজার্টটা খুব ভালো লেগেছিল।

সে রাতে খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে রফিকের সঙ্গে আমার কথা হলো বিস্তর। তার কাছ থেকে আল্ভার না জানা অনেক কথা জানতে পারলাম। রফিক বললেন, ‘এ রেস্তোরাঁর মালিক আল্ভার বাবা। আল্ভা তার বাবার একমাত্র ছেলে। আল্ভা পিএইচডি করেছেন অর্থনীতিতে, তার বাবা পিএইচডি করেছেন পরিসংখ্যানে। আল্ভার পিতা একজন অত্যন্ত সফল ব্যবসায়ী, ভেনিসের অন্যতম ধনী ব্যক্তি। আপনারা যে হোটেলে উঠেছেন, তার মালিকও আল্ভার বাবা।’ রফিক আরও জানালেন, ‘ভেনিসের সর্বত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে আল্ভাদের ছোট-বড় অনেক হোটেল এবং অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং। তাছাড়া ভেনিস স্টক মার্কেটেও রয়েছে তার বিরাট অঙ্কের বিনিয়োগ। বড়লোক বাবার ছেলে আল্ভার জীবন অনেকটাই ছন্নছাড়া! মাত্র ক’দিন হলো, আল্ভার স্ত্রী তাকে ফেলে চলে গেছেন। আল্ভার জীবন বড়ই নিঃসঙ্গ, একাকী, দুঃখেরও। বাংলাদেশের প্রতি আল্ভার ভীষণ টান। তিনি বাংলাদেশে কয়েকটি পরিবার চালান, নিয়মিত টাকা পাঠান। বাংলাদেশ থেকে অনেক লোক তার কাছে বিভিন্ন ধরনের ছবি পাঠায় ও চিঠি লিখে। বাংলা চিঠিগুলো আমিই পড়ে দিই।’ সবশেষে রফিক নিজের কথাটা পাড়লেন, তিনি সদ্য বিয়ে করেছেন। ভেনিসে বউ আনতে চান। তার হয়ে আল্ভাকে যেন অনুরোধ করি বেতন বাড়ানোর জন্য।

ডিনার আর রফিকের কথা শেষ হলে আল্ভার সঙ্গে আড্ডা চলল কিছুক্ষণ। আল্ভার কথায় জানতে পারলাম, গেল শতাব্দীর গোড়ার দিকে প্রতি রাতে ওই রেস্তোরাঁর মূল কামরায় আড্ডা বসত ইতালির বিখ্যাত কবি, সাহিত্যিক ও চিত্রশিল্পীদের। সফররত বিদেশি শিল্পী-সাহিত্যিকরাও প্রায়ই এসে ভিড় জমাতেন, আড্ডা বসাতেন। রেস্টুরেন্টের মূল কামরায় দুটো বিখ্যাত চিত্রকর্ম দেখে যতটা না অভিভূত ও মুগ্ধ হয়েছি, তার চেয়ে অবাক হয়েছি ঢের বেশি! প্রথম চিত্রটার বর্ণনা এরূপ-একজন মধ্যবয়সি নারী শাড়ি পরে একখানা ঝাড়ু হাতে নিয়ে খালি পায়ে অনেক কষ্টে হাঁটছেন এবড়োখেবড়ো পাথর আর কঙ্করের উপর দিয়ে। সম্ভবত তিনি একজন পরিছন্নতাকর্মী। তার মুখাবয়ব পাতলা কাপড়ের আবরণে ঢাকা। চেহারা দেখা যাচ্ছে না। দ্বিতীয় ছবিটা একটু ভিন্ন ধরনের-একজন অল্পবয়সি নারী, তিনিও শাড়ি পরা, ঘোমটা মাথায়। নামাজ শেষে জায়নামাজের উপর বসে কেবলামুখী হয়ে দু’হাত তুলে মোনাজাত করছেন। তারও কোনো পরিচয় অনুমান করা গেল না, চেহারাটা লুকিয়ে আছে পাতলা কাপড়ের আড়ালে। ভেনিস শহরের স্যান মার্কো স্কোয়ারের অতি অভিজাত এ রেস্তোরাঁয় কী করে এলো ছবি দু’খানা? কে-ই বা তাদের স্রষ্টা? কী-ই বা ছবিগুলোর মর্মবাণী-কিছুই বুঝতে পারলাম না! রাত অনেক হয়ে গিয়েছিল, আধা রান্না, আধা কাঁচা সি-ফুড খেয়ে আমাদের প্রায় সবারই পেট বিগড়ে বিগড়ে অবস্থা, তাই আল্ভাকেও জিজ্ঞেস করা হলো না আর্ট দু’খানার কথা। আল্ভার সঙ্গে রেস্তোরাঁয় গিয়েছিলাম যে পরিমাণ পেটের খিদে নিয়ে, ফিরে এলাম তার চেয়ে বহুগুণ বেশি মনের খিদেসহ। এ খিদে মেটাতে গেলে আল্ভাকে সঙ্গে করে আবার যেতে হবে ভেনিসের সেই রেস্তোরাঁর মূল কামরায়।

পুনশ্চ : ওয়ার্কশপ সেরে বাড়ি ফিরে আসার পর লেনদেন সংক্রান্ত ব্যাপারে আল্ভার সঙ্গে আমার যোগাযোগ হয়েছে আরও কয়েকবার। এরপর দেখতে দেখতে গড়িয়ে গেছে চার বছরেরও বেশি! আল্ভার কোনো খবর নেই, তার সঙ্গে যোগাযোগও নেই! পাঁচ বছর পর সেইন্ট লুশায় আরেক আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে লাঞ্চ টেবিলে পরিচয় হলো এক তরুণী অধ্যাপকের সঙ্গে। তিনি এসেছেন ভেনিস থেকে, পড়ান সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে, যেখানে আমরা ওয়ার্কশপ করতে গিয়েছিলাম। কথায় কথায় তাকে জিজ্ঞেস করলাম, আল্ভাকে চেনেন কিনা। বললেন, ‘হ্যাঁ’। আল্ভা কেমন আছেন- জানতে চাইলে লক্ষ করি মুহূর্তের মধ্যে তরুণীর চেহারাটা বদলে গেল! তার মনের কথা মুখে আনার আগেই বুঝে গেলাম আল্ভা আর নেই! What a sad coincidence and what a sad surprise! (লেখায় আল্ভার একান্ত ব্যক্তিগত কিছু কথা উঠে আসায় ভেনিসের বিশ্ববিদ্যালয়, স্যান মার্কো স্কোয়ারের হোটেল ও রেস্তোরাঁর নাম এবং আল্ভার আসল পরিচয় আমি ইচ্ছে করে গোপন রেখেছি)।

ড. আবু এন এম ওয়াহিদ : অধ্যাপক, টেনেসি স্টেট ইউনিভার্সিটি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র

wahid2569@gmail.com

ভেনিসের এক অধ্যাপকের কথা

 ড. আবু এন এম ওয়াহিদ 
০৮ ডিসেম্বর ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আল্ভা পাভারিটো ইতালির ভেনিসে অবস্থিত এক প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের প্রধান এবং একটি সুপ্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক জার্নালের সম্পাদক।

জার্নাল সম্পাদনা সূত্রে ই-মেইল মারফত তার সঙ্গে আমার পরিচয়। কখনো দেখা হয়নি, এমনকি কথাও হয়নি। বেশ কিছুদিন নীরবতার পর হঠাৎ আল্ভার এক ই-মেইল পেলাম।

লিখেছেন, তিনি তার বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জন্য একটি ওয়ার্কশপ করতে চান এবং এ ইভেন্ট আয়োজনের পুরো দায়িত্ব আমার ওপর ছেড়ে দিতে পারলে খুশি হবেন। ওয়ার্কশপটি হতে হবে একদিনব্যাপী এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন। আর এর বিষয়বস্তু হবে ‘উন্নয়ন অর্থনীতির বিভিন্ন দিক’। আমিসহ ছ’জন অর্থনীতিবিদ লিখিত গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন এবং এর ওপর প্রশ্নোত্তর, মন্তব্য ও আলোচনা-সমালোচনা চলবে সারাদিন ধরে। আমাদের সবার যাওয়া-আসার বিমান ভাড়া, ভেনিসে দু’দিনের হোটেল এবং একটা সোশ্যাল ডিনার বাবত যাবতীয় খরচ তিনিই দেবেন।

আল্ভার ই-মেইল পেয়ে এবং আমার ওপর তার আস্থা দেখে বিস্মিত ও আনন্দিত না হয়ে পারিনি! এ ধরনের আয়োজন আগে কখনো করিনি, তবু সাহসের সঙ্গে দেরি না করেই কাজে লেগে গেলাম। প্রথমে প্রবন্ধের নির্দিষ্ট টপিক ঠিক করে বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা আমার পরিচিত দশ-বারোজন উন্নয়ন বিশেষজ্ঞকে দাওয়াত করলাম। তারপর সপ্তাহে দু’এক দফায় ই-মেইল চালাচালির পর উপস্থাপকদের তালিকা চূড়ান্ত হলো এভাবে-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ইউনিভার্সিটি অব সিয়াটলের মীনাক্ষী ঋষি এবং আমি; বাংলাদেশ থেকে ঢাকা ইউনিভার্সিটির আইবিএ-ডিরেক্টর জিয়াউল হক মামুন এবং সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটির মোহাম্মদ সালাহ্উদ্দিন; নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ড ইউনিভার্সিটি থেকে রাশমী অরোরা এবং মালয়েশিয়ার ইউনিভার্সিটি টেকনোলজি-মারার মনসুর ওয়ান মাহ্মুদ।

জানাজানির জন্য আল্ভা ওয়ার্কশপের একটি রঙিন ফ্লায়ার তৈরি করে তার ইউনিভার্সিটি ওয়েব সাইটে পোস্ট করলেন এবং বেশকিছু হার্ড কপি সারা ক্যাম্পাসের দেওয়ালে দেওয়ালে সেঁটে দিলেন। আমরা প্রবন্ধ উপস্থাপকরা একদিন আগে গন্তব্যে গিয়ে পৌঁছাই। আমি ন্যাশভিল থেকে ডেট্রোয়েট-আমস্টারডাম হয়ে ভেনিস যাই। আমার কিছুক্ষণ আগে ড. মামুন ঢাকা থেকে হংকং এবং রোম হয়ে ভেনিস আসেন। ঘণ্টা দুয়েক পর অন্যরা বিভিন্ন দিক থেকে এসে এমিরেট্সের সরাসরি দুবাই-ভেনিস ফ্লাইট ধরেন। সব অংশগ্রহণকারী একত্র হওয়ার পর হোটেলের পথে রওয়ানা দেওয়ার আগেই আমি আল্ভাকে ফোন করলাম। এয়ারপোর্টে এসে আমাদের রিসিভ করতে পারেননি বলে তিনি দুঃখ প্রকাশ করলেন এবং বলে দিলেন কীভাবে হোটেলে যেতে হবে। আরও বললেন, পরদিন সকাল আটটায় এসে আমাদের সঙ্গে দেখা করবেন এবং তারপর নিয়ে যাবেন ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে।

আল্ভার কথামতো আমরা সাতজন (মীনাক্ষীর সঙ্গে আসা তার স্বামীকে নিয়ে) একসঙ্গে রওয়ানা দিলাম আমাদের জন্য নির্ধারিত স্যান মার্কো স্কোয়ারের এক ঐতিহ্যবাহী হোটেলের উদ্দেশে। ভেনিসের মার্কোপলো এয়ারপোর্ট টার্মিনাল ছেড়ে আনুমানিক কোয়ার্টার মাইল পথ হেঁটে গিয়ে উঠলাম ওয়াটার ট্যাক্সিতে। রোদ ঝলমল দুপুরে খোলা বাতাস আর সাগরের গর্জন আমাদের মাঝে বইয়ে দিল দারুণ এক উচ্ছ্বাস, উদ্দীপনা ও আনন্দের বন্যা। ফলে সহজেই দূর হয়ে গেল দীর্ঘ বিমান ভ্রমণের সব ক্লান্তি।

তখন বেলা প্রায় ৩টা। কড়া রোদের মধ্যে এসে নামলাম ঐতিহাসিক স্যান মার্কো স্কোয়ারে। শানবাঁধানো বিরাট উন্মুক্ত চত্বর। আশপাশ তাকিয়ে দেখি বিল্ডিংগুলো সব পুরোনো-এতই পুরোনো যেন হাজার বছর আগের বানানো ইমারত। কিন্তু হলে কী হবে, একটু গভীর দৃষ্টি ফেললে দালানকোঠার অবয়বে একটা খান্দানি ভাব স্পষ্ট ফুটে ওঠে। ঠিকানা দেখে সবাই মিলে হেঁটে হেঁটে অনেক খোঁজাখুঁজির পর বিরাট এক বাণিজ্যিক ভবনের পেছনে, ছোট্ট খালের ওপারে গিয়ে বের করি লুকিয়ে থাকা হোটেলটি।

হোটেলটি ঐতিহাসিক দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটা গোটা ইউরোপ মহাদেশের পুরোনো হোটেলের মধ্যে অন্যতম। কারও কারও মতে, সবচেয়ে পুরোনো! অতি প্রাচীনকালে ইউরোপিয়ান কাউবয়রা ঘোড়া নিয়ে ওপথে চলাচল করত এবং ওই হোটেলে রাত কাটাত। অনেক নামিদামি কবি, শিল্পী, সাহিত্যিক ও মিউজিক কম্পোজার বিভিন্ন সময়ে এ হোটেলের আতিথেয়তা গ্রহণ করেছেন। ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন স্যার উইনস্টন চার্চিলও এ হোটেলে একবার রাত কাটিয়েছেন। আমরা হোটেলে চেক-ইন করে গোসল সেরে একটু বিশ্রাম নিয়ে দলবেঁধে সবাই দ্বীপ-শহর দেখতে বেরিয়ে পড়ি। সারা বিকাল ঘোরাঘুরি করে খাওয়া-দাওয়া সেরে সন্ধ্যার দিকে হোটেলে ফিরে এলাম। সে রাতে দেরি না করে ঘুমিয়ে পড়ি। সকালে উঠে তৈরি হয়ে হোটেলের রেস্টুরেন্টে নাশতা খেয়ে ৮টার আগেই আমরা সবাই আল্ভার জন্য প্রস্তুত হয়ে রইলাম। ঘড়িতে ৮টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে ওয়াটার ট্যাক্সি নিয়ে তিনি এসে হাজির। ভাটির টানে পানি নিচে থাকায় আগের দিন আমরা ওয়াটার ট্যাক্সি থেকে দূরে নেমে হেঁটে এসেছি, কিন্তু ওই দিন সকালে জোয়ার ছিল বলে ওয়াটার ট্যাক্সি এসে থামল একেবারে হোটেলের লবির খালের দিকের পেছন দরজায়। স্যান মার্কো স্কোয়ারে চাকাওয়ালা কোনো যান চলাচল করে না। যাতায়াতের বাহন, পানিতে বৈঠা বাওয়া কাঠের গন্ডোলা, ওয়াটার ট্যাক্সি অথবা ওয়াটার বাস ছাড়া গত্যন্তর নেই, আর ডাঙায় একমাত্র ভরসা আপন পদযুগল। স্যান মার্কোতে ঢাকার মতো রিকশা চললে ভ্রমণটা হতে পারত অনেক বেশি উত্তেজনাপূর্ণ, চমকপ্রদ ও আনন্দদায়ক!

ওয়াটার ট্যাক্সি করে আধা ঘণ্টার মধ্যে আমরা হোটেল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে গিয়ে পৌঁছালাম। ক্যাম্পাসে গিয়ে কেউ কেউ ঘুরতে বেরোলেন এদিক-ওদিক, আর অন্যরা আল্ভার সঙ্গে কফিশপে গিয়ে চা-কফি খেলেন। আধা ঘণ্টার মধ্যে সবাই আবার একত্র হলাম। তারপর শুরু হলো ওয়ার্কশপ। চলল সারাদিন দুই সেশনজুড়ে। মাঝখানে এক ঘণ্টার লাঞ্চ বিরতি। ওয়ার্কশপের প্রতিটি প্রবন্ধের বিষয়বস্তু ও উপস্থাপনা ছিল চমৎকার-এটা আমার কথা নয়, বলেছেন আল্ভা। প্রশ্ন ও আলোচনা হয়েছিল বিস্তর। ওয়ার্কশপ শেষে ওয়াটার ট্যাক্সি করে আল্ভা আমাদের ফের হোটেলে নামিয়ে দিয়ে বাড়ি চলে গেলেন। যাওয়ার সময় বললেন, ‘তোমরা এখন বিশ্রাম নাও, আমি সন্ধ্যা ৭টায় এসে সবাইকে ডিনারে নিয়ে যাব।’

সন্ধ্যায় ঠিক সময়মতো তিনি এসে হাজির। হোটেল থেকে বেরিয়ে সরু গলিপথে হাঁটা। আল্ভা আগে আগে আর আমরা লাইন ধরে তার পেছনে চলছি। একটা ব্রিজের উপর দিয়ে খাল পেরিয়ে প্রায় আধা মাইল পথ হেঁটে এসে উঠলাম ভেনিসের স্যান মার্কো স্কোয়ারের এক অতি পুরোনো ও সম্ভ্রান্ত রেস্তোরাঁয়। ভেতরে ঢুকেই রেস্তোরাঁ ও তার সাজসজ্জা-পরিবেশ দেখে সহজেই আঁচ করতে পেরেছিলাম, এর রূপমাধুর্য ও আভিজাত্য যেন গা গড়িয়ে ফোঁটা ফোঁটা হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ছে! বসার সঙ্গে সঙ্গে মেনু নিয়ে এলেন এক তরুণ ওয়েটার-নাম রফিক, প্রবাসী বাংলাদেশি। রফিক আমাদের দেখেই হতবাক! মনে করেছেন, পথ ভুলে আমরা এসে পড়েছি তার খান্দানি খাবার দোকানে, কারণ সচরাচর আমাদের মতো বাদামি চামড়ার লোকজন ওখানে খেতে যায় না, যেতে চাইলেও পারে না, দামের কারণে। রফিক প্রথমেই বললেন, ‘আপনারা যে এখানে খেতে এসেছেন, জানেন দাম কত পড়বে?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কত?’ রফিকের কাটা কাটা উত্তর-‘মাথাপিছু কমপক্ষে একশ ইউরো তো হবেই।’ আমি আল্ভাকে দেখিয়ে বললাম, ‘চিন্তার কোনো কারণ নেই, উনি আমাদের নিয়ে এসেছেন।’ আল্ভার সঙ্গে আমাদের দেখে রফিকের বিস্ময় বেড়ে গেল দ্বিগুণ। এবার মোলায়েম সুরে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি উনাকে চেনেন কী করে?’ আমি বললাম, ‘উনি আমার বন্ধু।’ ‘তা কী করে হয়?’ রফিকের আশ্চর্যবোধক প্রশ্ন! পুরো ঘটনা খুলে বলার পর, রফিক বুঝতে পারলেন কেন ও কীভাবে আমরা ওই রাতে তার রেস্তোরাঁয় হাজির হয়েছিলাম। তারপর রফিকের আবদার-‘যাবার আগে আপনার সঙ্গে আমার একটু প্রাইভেট কথা আছে।’

শুরু হলো ডিনারের পালা, কোর্সের পর কোর্স-প্রধানত ‘সি ফুড’-ওয়েস্টার, মাছ, মাছের ডিম, কোনোটা স্টিম্ড, কোনোটা আধা রান্না করা, কোনোটা রান্না করা। এত দামি দামি খাবার, কিন্তু খেতে পারছি না কিছুই, সি ফুডের কাঁচা কাঁচা গন্ধে আমার বমি বমি লাগছিল! অন্যদের অবস্থাও দেখলাম তথৈবচ। সবাই পেট ভরলাম সস্তা পদের আলু খেয়ে। শেষে অবশ্য ডেজার্টটা খুব ভালো লেগেছিল।

সে রাতে খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে রফিকের সঙ্গে আমার কথা হলো বিস্তর। তার কাছ থেকে আল্ভার না জানা অনেক কথা জানতে পারলাম। রফিক বললেন, ‘এ রেস্তোরাঁর মালিক আল্ভার বাবা। আল্ভা তার বাবার একমাত্র ছেলে। আল্ভা পিএইচডি করেছেন অর্থনীতিতে, তার বাবা পিএইচডি করেছেন পরিসংখ্যানে। আল্ভার পিতা একজন অত্যন্ত সফল ব্যবসায়ী, ভেনিসের অন্যতম ধনী ব্যক্তি। আপনারা যে হোটেলে উঠেছেন, তার মালিকও আল্ভার বাবা।’ রফিক আরও জানালেন, ‘ভেনিসের সর্বত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে আল্ভাদের ছোট-বড় অনেক হোটেল এবং অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং। তাছাড়া ভেনিস স্টক মার্কেটেও রয়েছে তার বিরাট অঙ্কের বিনিয়োগ। বড়লোক বাবার ছেলে আল্ভার জীবন অনেকটাই ছন্নছাড়া! মাত্র ক’দিন হলো, আল্ভার স্ত্রী তাকে ফেলে চলে গেছেন। আল্ভার জীবন বড়ই নিঃসঙ্গ, একাকী, দুঃখেরও। বাংলাদেশের প্রতি আল্ভার ভীষণ টান। তিনি বাংলাদেশে কয়েকটি পরিবার চালান, নিয়মিত টাকা পাঠান। বাংলাদেশ থেকে অনেক লোক তার কাছে বিভিন্ন ধরনের ছবি পাঠায় ও চিঠি লিখে। বাংলা চিঠিগুলো আমিই পড়ে দিই।’ সবশেষে রফিক নিজের কথাটা পাড়লেন, তিনি সদ্য বিয়ে করেছেন। ভেনিসে বউ আনতে চান। তার হয়ে আল্ভাকে যেন অনুরোধ করি বেতন বাড়ানোর জন্য।

ডিনার আর রফিকের কথা শেষ হলে আল্ভার সঙ্গে আড্ডা চলল কিছুক্ষণ। আল্ভার কথায় জানতে পারলাম, গেল শতাব্দীর গোড়ার দিকে প্রতি রাতে ওই রেস্তোরাঁর মূল কামরায় আড্ডা বসত ইতালির বিখ্যাত কবি, সাহিত্যিক ও চিত্রশিল্পীদের। সফররত বিদেশি শিল্পী-সাহিত্যিকরাও প্রায়ই এসে ভিড় জমাতেন, আড্ডা বসাতেন। রেস্টুরেন্টের মূল কামরায় দুটো বিখ্যাত চিত্রকর্ম দেখে যতটা না অভিভূত ও মুগ্ধ হয়েছি, তার চেয়ে অবাক হয়েছি ঢের বেশি! প্রথম চিত্রটার বর্ণনা এরূপ-একজন মধ্যবয়সি নারী শাড়ি পরে একখানা ঝাড়ু হাতে নিয়ে খালি পায়ে অনেক কষ্টে হাঁটছেন এবড়োখেবড়ো পাথর আর কঙ্করের উপর দিয়ে। সম্ভবত তিনি একজন পরিছন্নতাকর্মী। তার মুখাবয়ব পাতলা কাপড়ের আবরণে ঢাকা। চেহারা দেখা যাচ্ছে না। দ্বিতীয় ছবিটা একটু ভিন্ন ধরনের-একজন অল্পবয়সি নারী, তিনিও শাড়ি পরা, ঘোমটা মাথায়। নামাজ শেষে জায়নামাজের উপর বসে কেবলামুখী হয়ে দু’হাত তুলে মোনাজাত করছেন। তারও কোনো পরিচয় অনুমান করা গেল না, চেহারাটা লুকিয়ে আছে পাতলা কাপড়ের আড়ালে। ভেনিস শহরের স্যান মার্কো স্কোয়ারের অতি অভিজাত এ রেস্তোরাঁয় কী করে এলো ছবি দু’খানা? কে-ই বা তাদের স্রষ্টা? কী-ই বা ছবিগুলোর মর্মবাণী-কিছুই বুঝতে পারলাম না! রাত অনেক হয়ে গিয়েছিল, আধা রান্না, আধা কাঁচা সি-ফুড খেয়ে আমাদের প্রায় সবারই পেট বিগড়ে বিগড়ে অবস্থা, তাই আল্ভাকেও জিজ্ঞেস করা হলো না আর্ট দু’খানার কথা। আল্ভার সঙ্গে রেস্তোরাঁয় গিয়েছিলাম যে পরিমাণ পেটের খিদে নিয়ে, ফিরে এলাম তার চেয়ে বহুগুণ বেশি মনের খিদেসহ। এ খিদে মেটাতে গেলে আল্ভাকে সঙ্গে করে আবার যেতে হবে ভেনিসের সেই রেস্তোরাঁর মূল কামরায়।

পুনশ্চ : ওয়ার্কশপ সেরে বাড়ি ফিরে আসার পর লেনদেন সংক্রান্ত ব্যাপারে আল্ভার সঙ্গে আমার যোগাযোগ হয়েছে আরও কয়েকবার। এরপর দেখতে দেখতে গড়িয়ে গেছে চার বছরেরও বেশি! আল্ভার কোনো খবর নেই, তার সঙ্গে যোগাযোগও নেই! পাঁচ বছর পর সেইন্ট লুশায় আরেক আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে লাঞ্চ টেবিলে পরিচয় হলো এক তরুণী অধ্যাপকের সঙ্গে। তিনি এসেছেন ভেনিস থেকে, পড়ান সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে, যেখানে আমরা ওয়ার্কশপ করতে গিয়েছিলাম। কথায় কথায় তাকে জিজ্ঞেস করলাম, আল্ভাকে চেনেন কিনা। বললেন, ‘হ্যাঁ’। আল্ভা কেমন আছেন- জানতে চাইলে লক্ষ করি মুহূর্তের মধ্যে তরুণীর চেহারাটা বদলে গেল! তার মনের কথা মুখে আনার আগেই বুঝে গেলাম আল্ভা আর নেই! What a sad coincidence and what a sad surprise! (লেখায় আল্ভার একান্ত ব্যক্তিগত কিছু কথা উঠে আসায় ভেনিসের বিশ্ববিদ্যালয়, স্যান মার্কো স্কোয়ারের হোটেল ও রেস্তোরাঁর নাম এবং আল্ভার আসল পরিচয় আমি ইচ্ছে করে গোপন রেখেছি)।

ড. আবু এন এম ওয়াহিদ : অধ্যাপক, টেনেসি স্টেট ইউনিভার্সিটি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র

wahid2569@gmail.com

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন