খাদ্য নিরাপত্তাকে দিতে হবে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার
jugantor
স্বদেশ ভাবনা
খাদ্য নিরাপত্তাকে দিতে হবে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার

  আবদুল লতিফ মণ্ডল  

০৯ ডিসেম্বর ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

গত ২৭ নভেম্বর সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত সচিব সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সচিবদের নির্দেশ দিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘দেশে বর্তমানে ১৬ লাখ টন খাদ্য মজুত রয়েছে। খাদ্যের মজুত যাতে কমে না যায়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।’ এদিকে ১ ডিসেম্বর জেনেভায় গ্লোবাল হিউম্যানিটারিয়ান ওভারভিউ রিপোর্ট ২০২৩ প্রকাশের সময় জাতিসংঘের শীর্ষ জরুরি ত্রাণ কর্মকর্তা মার্টিন গ্রিফিথ বলেছেন, আগামী বছর তীব্র খাদ্য সংকটে পড়বে বিশ্বের ৫৩ দেশের ২২২ মিলিয়ন, তথা ২২ কোটির বেশি মানুষ।

গত অক্টোবরে প্রকাশিত ‘গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্স-২০২২’ অনুযায়ী বর্তমানে পৃথিবীর ৪৪টি দেশে খাদ্য সংকটের কারণে ক্ষুধার মাত্রা ‘গুরুতর’ বা ‘ভয়ংকর’ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এর আগে পাঁচটি আন্তর্জাতিক সংস্থা-জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল (আইএমএফ), বিশ্বব্যাংক, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) প্রধানরা এক যৌথ সতর্কবার্তায় বলেছেন-ইউক্রেন যুদ্ধ, বিশ্বব্যাপী অস্থিরতা, খাদ্যের উৎপাদন হ্রাস, পরিবহণব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটাসহ নানা কারণে আগামী দিনে বিশ্বব্যাপী খাদ্য সংকট আরও তীব্র হবে।

এর প্রভাবে খাদ্য নিরাপত্তাহীন মানুষের সংখ্যা আরও বাড়তে থাকবে। এতে মানুষের মধ্যে পুষ্টির সংকট আরও প্রকট হবে, যা বিশ্বের একটি অংশকে মহামারির দিকে নিয়ে যাবে। বিশ্বব্যাপী খাদ্য সংকটের যে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, বাংলাদেশ তার বাইরে নয়। এফএওর অন্য একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের ৪৫টি দেশে ঘাটতিজনিত মারাত্মক খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার আশঙ্কা এখন সবচেয়ে বেশি।

এর মধ্যে ৩৩টি আফ্রিকা মহাদেশে, আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, শ্রীলংকা ও পাকিস্তানসহ ৯টি এশিয়া মহাদেশে, দুটি ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে এবং একটি ইউরোপ মহাদেশে অবস্থিত। তাই দেশে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ সময়োচিত।

জাতিসংঘের বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা কমিটির সংজ্ঞা অনুযায়ী, খাদ্য নিরাপত্তা তখনই বিরাজমান, যখন সবার কর্মক্ষম, স্বাস্থ্যকর ও উৎপাদনমুখী জীবনযাপনের জন্য সব সময় পর্যাপ্ত পরিমাণে নিরাপদ ও পুষ্টিমানসম্পন্ন খাদ্যের লভ্যতা ও প্রাপ্তির ক্ষমতা বিদ্যমান থাকে। খাদ্য নিরাপত্তা নির্ধারণের তিনটি নিয়ামক হলো-এক. খাদ্যের প্রাপ্যতা, দুই. খাদ্যপ্রাপ্তির ক্ষমতা, তিন. খাদ্যের পুষ্টিমান ও নিরাপত্তা।

খাদ্যের প্রাপ্যতা নির্ধারণে ওইসব ফ্যাক্টর মূল্যায়ন করা হয়, যেগুলো খাদ্যের সরবরাহ ও সহজলভ্যতাকে প্রভাবিত করে। এগুলো হলো-খাবার সরবরাহে প্রাচুর্য, কৃষি গবেষণা ও উন্নয়নে ব্যয়, কৃষি অবকাঠামো, খাদ্য উৎপাদনে অনিশ্চয়তা, দুর্নীতি ও খাদ্য অপচয়।

ক্রয়ক্ষমতা পরিমাপে যে ছয়টি অনুসূচক ব্যবহার করা হয় সেগুলো হলো-একটি খানার সার্বিক ব্যয়ে খাবারের ব্যয়ের পরিমাণ, দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী জনসংখ্যার অনুপাত, মাথাপিছু জিডিপি, কৃষিপণ্য আমদানিতে ট্যারিফের হার, খাদ্য নিরাপত্তামূলক কর্মসূচি এবং কৃষকের আর্থিক সহায়তা লাভের সুযোগ। খাদ্যের গুণগত মান ও নিরাপত্তার নির্দেশক বিশ্লেষণ করা হয় খাদ্যের বহুমুখীকরণ, পুষ্টিমান ও মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টের উপস্থিতি, প্রোটিনের মান এবং নিরাপদ খাদ্য দ্বারা।

দেশে খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনায় প্রথমেই আসে খাদ্যের সরবরাহ ও সহজলভ্যতার বিষয়টি। খাদ্যের মোটামুটি ১১টি উপাদান থাকলেও দেশে খাদ্য বলতে মূলত চাল থেকে তৈরি ভাতকে বোঝায়। আমাদের প্রধান খাদ্যশস্য চালের উৎপাদন কৃষি খাতের (শস্য উপখাত, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপখাত এবং বন উপখাত নিয়ে কৃষি খাত গঠিত) উৎপাদনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। ২০০৯-১০ অর্থবছরে কৃষি খাতের ৬.৫৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হার হ্রাস পেয়ে পরবর্তী এক দশকে গড়ে ৩.৭ শতাংশে দাঁড়ায় (অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতা ২০১৯-২০)।

২০২০-২১ অর্থবছরে কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৩ দশমিক ১৭ শতাংশ। এ খাতে প্রবৃদ্ধির নিম্নমুখী হারের সরাসরি প্রভাব পড়ে শস্য উপখাতের প্রধান ফসল ও আমাদের প্রধান খাদ্য চাল উৎপাদনের ওপর। দেখা দেয় চালের মোট উৎপাদন ও প্রবৃদ্ধি হারে অস্থিতিশীলতা। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ও অন্যান্য রিপোর্টে দেখা যায়, ২০১৭-১৮ অর্থবছর বাদ দিলে ২০১৬-১৭ থেকে ২০২০-২১ অর্থবছর পর্যন্ত চাল উৎপাদনে প্রবৃদ্ধি হার নেতিবাচক থেকে ১.৩০ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল।

সরকারি তথ্য মোতাবেক, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১.৩৭ শতাংশ (২০২০ সালে)। অর্থাৎ এ সময়কালে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার চাল উৎপাদন প্রবৃদ্ধি হারের চেয়ে বেশি ছিল। ওয়ার্ল্ডোমিটারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিগত পাঁচ বছরে দেশে যখন জনসংখ্যা বেড়েছে ৫ দশমিক ২৯ শতাংশ, তখন খাদ্যশস্যের উৎপাদন বেড়েছে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ। এদিকে দীর্ঘ খরা ও ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের কারণে চলতি আমন ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা (১ কোটি ৬৩ লাখ টন) অর্জনের সম্ভাবনা নেই বলেই অভিজ্ঞজনরা মনে করছেন।

আর খাদ্যশস্যের দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা গমের চাহিদা ক্রমেই বেড়ে চললেও পণ্যটির উৎপাদন ১৯৯৮-৯৯ অর্থবছরের ১৯ লাখ ৮ হাজার টন থেকে হ্রাস পেয়ে বর্তমানে ১১-১২ লাখ টনের মধ্যে সীমাবদ্ধ। গমের এ উৎপাদন দেশের চাহিদার (কম-বেশি ৭০ লাখ টন) ছয়ভাগের একভাগ। অর্থাৎ গমের ক্ষেত্রে দেশ প্রায় পুরোপুরি আমদানিনির্ভর হয়ে পড়েছে।

দেশে উৎপাদিত খাদ্যশস্য চাহিদা মেটাতে না পারায় এগুলোর আমদানি ছাড়া আর কোনো বিকল্প থাকে না। চলতি অর্থবছরে সরকারি-বেসরকারি খাতে ১৯ লাখ টন চাল আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হলেও আন্তর্জাতিক বাজারে চালের মূল্য বেড়ে যাওয়া, বিশ্বব্যাপী পরিবহণ ব্যয় অত্যধিক বৃদ্ধি পাওয়া এবং দেশে ডলার সংকট তীব্র আকার ধারণ করায় খাদ্যশস্য আমদানিতে গতি আসেনি।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটের তথ্য মোতাবেক, চলতি অর্থবছরের ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারি খাত মিলে মাত্র ৫ লাখ ১৪ হাজার ৪৩ টন চাল আমদানি হয়েছে। চাহিদার তুলনায় উৎপাদন স্বল্পতা এবং আমদানিতে শ্লথগতির কারণে সব শ্রেণির চালের দাম অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছে।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য মোতাবেক বিপুল চাহিদার বিপরীতে ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত মাত্র ৯ লাখ ১৪ হাজার ৩৯ টন গম আমদানি হয়েছে। আটার দাম অতীতের সব রেকর্ড ভেঙেছে। বাজারে মোটা চালের চেয়ে আটার দাম বেশি হওয়ায় চালের ওপর চাপ বেড়েছে।

খাদ্যশস্যের বাইরে যেসব খাদ্যপণ্যে দেশ প্রায় পুরোপুরি আমদানির্ভর হয়ে পড়েছে, সেগুলোর শীর্ষে রয়েছে ভোজ্যতেল, চিনি ও ডাল। গত জুনে কৃষি মন্ত্রণালয়ে ‘ভোজ্যতেলের আমদানিনির্ভরতা কমাতে কর্মপরিকল্পনা’ বিষয়ক বৈঠকে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে ভোজ্যতেলের চাহিদা রয়েছে প্রায় ২৪ লাখ টন। এর বিপরীতে স্থানীয়ভাবে সরিষা, তিল ও সূর্যমুখী ফসল থেকে উৎপাদিত ভোজ্যতেলের পরিমাণ ৩ লাখ টন, যা চাহিদার ১২ শতাংশ। এর অর্থ, দেশে চাহিদার ৮৮ শতাংশ ভোজ্যতেল আমদানি করতে হয়।

দেশে গত দুই বছরে যেসব পণ্যের দাম সবচেয়ে বেশি বেড়েছে, তার মধ্যে রয়েছে ভোজ্যতেল। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে এক লিটার সয়াবিন তেলের দাম ছিল ১০০ টাকা, যা বর্তমানে ১৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্রাপ্ত তথ্য মোতাবেক, দেশে বছরে কম-বেশি ২০ লাখ টন চিনির চাহিদার বিপরীতে সরকার নিয়ন্ত্রিত চিনিকলগুলোয় উৎপাদনের পরিমাণ ৫০-৬০ হাজার টন। অর্থাৎ চিনিতে আমরা পুরোপুরি আমদানিনির্ভর।

এক বছর আগে সরকারি পর্যায়ে এক কেজি চিনির দাম ছিল ৬৫ টাকা। বর্তমানে পণ্যটির কেজিপ্রতি সরকার নির্ধারিত দাম ১০৮ টাকা। ‘গরিবের প্রোটিন’ হিসাবে খ্যাত ডালের যখন বার্ষিক প্রয়োজন কম-বেশি ২৬ লাখ টন, তখন দেশে উৎপাদিত ডালের পরিমাণ কম-বেশি ৯ লাখ টন। ফলে বছরে প্রায় ১৭ লাখ টন ডাল আমদানি করতে হয়।

খাদ্য নিরাপত্তার দ্বিতীয় নিয়ামক হচ্ছে খাদ্যপ্রাপ্তির ক্ষমতা। খাদ্যের সহজলভ্যতা খাদ্য নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয় না। খাদ্যের সহজলভ্যতার সঙ্গে দরকার খাদ্য কেনার আর্থিক সংগতি। দুবছরের বেশি সময় ধরে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে দেশের অর্থনীতি ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এবং কর্মসংস্থানে মূল ভূমিকা পালনকারী বেসরকারি খাতে চাকরিচ্যুতি, বেতন/মজুরি হ্রাস এবং অন্যান্য কারণে মানুষের আয় কমেছে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক জনমত জরিপ প্রতিষ্ঠান গ্যালাপ পরিচালিত ‘স্টেট অব দ্য গ্লোবাল ওয়ার্কপ্লেস ২০২১’ অনুযায়ী, করোনার সময় বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার ৫৫ শতাংশ মানুষের আয় কমেছে। এর ফলে দেশে দারিদ্র্যহার বেড়েছে। সরকারি হিসাবমতে, ২০১৯ সালে দারিদ্র্যহার ২০ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে আসে। করোনাকালীন তথ্য ও উপাত্তের ভিত্তিতে সরকার এখন পর্যন্ত জনগণকে জানায়নি দেশে বর্তমানে দারিদ্র্যের হার কত।

এদিকে দেশের কয়েকটি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান/সংস্থা যেমন-সিপিডি, পিপিআরসি, বিআইজিডির মতে, করোনা মহামারির কারণে ২০২০-২১ অর্থবছরে দারিদ্র্যহার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৫ থেকে ৪২ শতাংশে। একদিকে দারিদ্র্যহার বৃদ্ধি, অন্যদিকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং গত ৮ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে এ বিরাটসংখ্যক দরিদ্র মানুষের পক্ষে প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে তাদের খাদ্য নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন।

খাদ্য নিরাপত্তা নির্ধারণে তৃতীয় নিয়ামক পুষ্টিমানসম্পন্ন ও নিরাপদ খাদ্যপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের অনেক নিচে। নারী ও শিশুসহ দেশের এক বিরাট জনগোষ্ঠীর মধ্যে পুষ্টি সমস্যা প্রকটভাবে বিদ্যমান। এর কারণ আর্থিক অসচ্ছলতা ও খাদ্যের ত্রুটিপূর্ণ জৈবিক ব্যবহার।

অসামর্থ্যরে কারণে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পক্ষে আমিষজাতীয় খাদ্য কেনা প্রায়ই সম্ভব হয় না। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে বর্তমানে মধ্যবিত্তের পক্ষেও আমিষজাতীয় খাদ্য কেনা কষ্টকর হয়ে পড়েছে। এতে পুষ্টিহীনতা বাড়ছে। খাদ্যের ত্রুটিপূর্ণ ব্যবহারের মধ্যে রয়েছে পুরুষের তুলনায় নারী ও শিশুর প্রয়োজনীয় খাবার না পাওয়া এবং ত্রুটিপূর্ণ রন্ধন পদ্ধতি।

এসব কারণে ‘গ্লোবাল ফুড সিকিউরিটি ইনডেস্ক’ বা ‘বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা সূচক-২০২০’-এ ১১৩ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৮৪তম। শুধু বৈশ্বিকভাবেই নয়, সূচকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সবার নিচে।

আগামী বছর বিশ্বব্যাপী খাদ্য সংকট সৃষ্টির আশঙ্কার প্রেক্ষাপটে আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা যথাসম্ভব নিশ্চিতে স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। স্বল্পমেয়াদি কার্যক্রমের অংশ হিসাবে সরকারের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী চলতি অর্থবছরে চাল, গম এবং অন্যান্য অত্যাবশ্যকীয় খাদ্যপণ্য আমদানি ত্বরান্বিত করতে হবে।

দুই. আসন্ন বোরো মৌসুমে সর্বোচ্চ পরিমাণ ফলন পেতে দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে হবে। তিন. মানুষের, বিশেষ করে নিম্নবিত্তের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির ব্যবস্থা নিতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে-ক. জমি স্বল্পতার কারণে আমাদের চাল ও অন্যান্য খাদ্যপণ্যের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিতে হবে। খ. চালসহ কৃষিপণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধিতে কৃষিজমি অকৃষি খাতে চলে যাওয়া যথাসম্ভব বন্ধ করতে হবে।

গ. চালসহ কৃষিপণ্যের উৎপাদন বাড়াতে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে কৃষি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। পুনঃঅর্থায়ন তহবিলে সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক বরাদ্দকৃত ৫ হাজার কোটি টাকা কৃষি খাতের প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয়। বরাদ্দের পরিমাণ বাড়াতে হবে। ঘ. খাদ্যের পুষ্টিমান বৃদ্ধির দিকে নজর দিতে হবে এবং বাজারে অনিরাপদ খাদ্য সরবরাহ বন্ধ করতে হবে। ঙ. কৃষি খাতের চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় সুপারিশকৃত কৌশলগুলো বাস্তবায়নে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাতে হবে।

আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক খাদ্য সচিব, কলাম লেখক

latifm43@gmail.com

স্বদেশ ভাবনা

খাদ্য নিরাপত্তাকে দিতে হবে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার

 আবদুল লতিফ মণ্ডল 
০৯ ডিসেম্বর ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

গত ২৭ নভেম্বর সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত সচিব সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সচিবদের নির্দেশ দিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘দেশে বর্তমানে ১৬ লাখ টন খাদ্য মজুত রয়েছে। খাদ্যের মজুত যাতে কমে না যায়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।’ এদিকে ১ ডিসেম্বর জেনেভায় গ্লোবাল হিউম্যানিটারিয়ান ওভারভিউ রিপোর্ট ২০২৩ প্রকাশের সময় জাতিসংঘের শীর্ষ জরুরি ত্রাণ কর্মকর্তা মার্টিন গ্রিফিথ বলেছেন, আগামী বছর তীব্র খাদ্য সংকটে পড়বে বিশ্বের ৫৩ দেশের ২২২ মিলিয়ন, তথা ২২ কোটির বেশি মানুষ।

গত অক্টোবরে প্রকাশিত ‘গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্স-২০২২’ অনুযায়ী বর্তমানে পৃথিবীর ৪৪টি দেশে খাদ্য সংকটের কারণে ক্ষুধার মাত্রা ‘গুরুতর’ বা ‘ভয়ংকর’ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এর আগে পাঁচটি আন্তর্জাতিক সংস্থা-জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল (আইএমএফ), বিশ্বব্যাংক, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) প্রধানরা এক যৌথ সতর্কবার্তায় বলেছেন-ইউক্রেন যুদ্ধ, বিশ্বব্যাপী অস্থিরতা, খাদ্যের উৎপাদন হ্রাস, পরিবহণব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটাসহ নানা কারণে আগামী দিনে বিশ্বব্যাপী খাদ্য সংকট আরও তীব্র হবে।

এর প্রভাবে খাদ্য নিরাপত্তাহীন মানুষের সংখ্যা আরও বাড়তে থাকবে। এতে মানুষের মধ্যে পুষ্টির সংকট আরও প্রকট হবে, যা বিশ্বের একটি অংশকে মহামারির দিকে নিয়ে যাবে। বিশ্বব্যাপী খাদ্য সংকটের যে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, বাংলাদেশ তার বাইরে নয়। এফএওর অন্য একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের ৪৫টি দেশে ঘাটতিজনিত মারাত্মক খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার আশঙ্কা এখন সবচেয়ে বেশি।

এর মধ্যে ৩৩টি আফ্রিকা মহাদেশে, আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, শ্রীলংকা ও পাকিস্তানসহ ৯টি এশিয়া মহাদেশে, দুটি ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে এবং একটি ইউরোপ মহাদেশে অবস্থিত। তাই দেশে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ সময়োচিত।

জাতিসংঘের বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা কমিটির সংজ্ঞা অনুযায়ী, খাদ্য নিরাপত্তা তখনই বিরাজমান, যখন সবার কর্মক্ষম, স্বাস্থ্যকর ও উৎপাদনমুখী জীবনযাপনের জন্য সব সময় পর্যাপ্ত পরিমাণে নিরাপদ ও পুষ্টিমানসম্পন্ন খাদ্যের লভ্যতা ও প্রাপ্তির ক্ষমতা বিদ্যমান থাকে। খাদ্য নিরাপত্তা নির্ধারণের তিনটি নিয়ামক হলো-এক. খাদ্যের প্রাপ্যতা, দুই. খাদ্যপ্রাপ্তির ক্ষমতা, তিন. খাদ্যের পুষ্টিমান ও নিরাপত্তা।

খাদ্যের প্রাপ্যতা নির্ধারণে ওইসব ফ্যাক্টর মূল্যায়ন করা হয়, যেগুলো খাদ্যের সরবরাহ ও সহজলভ্যতাকে প্রভাবিত করে। এগুলো হলো-খাবার সরবরাহে প্রাচুর্য, কৃষি গবেষণা ও উন্নয়নে ব্যয়, কৃষি অবকাঠামো, খাদ্য উৎপাদনে অনিশ্চয়তা, দুর্নীতি ও খাদ্য অপচয়।

ক্রয়ক্ষমতা পরিমাপে যে ছয়টি অনুসূচক ব্যবহার করা হয় সেগুলো হলো-একটি খানার সার্বিক ব্যয়ে খাবারের ব্যয়ের পরিমাণ, দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী জনসংখ্যার অনুপাত, মাথাপিছু জিডিপি, কৃষিপণ্য আমদানিতে ট্যারিফের হার, খাদ্য নিরাপত্তামূলক কর্মসূচি এবং কৃষকের আর্থিক সহায়তা লাভের সুযোগ। খাদ্যের গুণগত মান ও নিরাপত্তার নির্দেশক বিশ্লেষণ করা হয় খাদ্যের বহুমুখীকরণ, পুষ্টিমান ও মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টের উপস্থিতি, প্রোটিনের মান এবং নিরাপদ খাদ্য দ্বারা।

দেশে খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনায় প্রথমেই আসে খাদ্যের সরবরাহ ও সহজলভ্যতার বিষয়টি। খাদ্যের মোটামুটি ১১টি উপাদান থাকলেও দেশে খাদ্য বলতে মূলত চাল থেকে তৈরি ভাতকে বোঝায়। আমাদের প্রধান খাদ্যশস্য চালের উৎপাদন কৃষি খাতের (শস্য উপখাত, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপখাত এবং বন উপখাত নিয়ে কৃষি খাত গঠিত) উৎপাদনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। ২০০৯-১০ অর্থবছরে কৃষি খাতের ৬.৫৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হার হ্রাস পেয়ে পরবর্তী এক দশকে গড়ে ৩.৭ শতাংশে দাঁড়ায় (অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতা ২০১৯-২০)।

২০২০-২১ অর্থবছরে কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৩ দশমিক ১৭ শতাংশ। এ খাতে প্রবৃদ্ধির নিম্নমুখী হারের সরাসরি প্রভাব পড়ে শস্য উপখাতের প্রধান ফসল ও আমাদের প্রধান খাদ্য চাল উৎপাদনের ওপর। দেখা দেয় চালের মোট উৎপাদন ও প্রবৃদ্ধি হারে অস্থিতিশীলতা। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ও অন্যান্য রিপোর্টে দেখা যায়, ২০১৭-১৮ অর্থবছর বাদ দিলে ২০১৬-১৭ থেকে ২০২০-২১ অর্থবছর পর্যন্ত চাল উৎপাদনে প্রবৃদ্ধি হার নেতিবাচক থেকে ১.৩০ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল।

সরকারি তথ্য মোতাবেক, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১.৩৭ শতাংশ (২০২০ সালে)। অর্থাৎ এ সময়কালে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার চাল উৎপাদন প্রবৃদ্ধি হারের চেয়ে বেশি ছিল। ওয়ার্ল্ডোমিটারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিগত পাঁচ বছরে দেশে যখন জনসংখ্যা বেড়েছে ৫ দশমিক ২৯ শতাংশ, তখন খাদ্যশস্যের উৎপাদন বেড়েছে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ। এদিকে দীর্ঘ খরা ও ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের কারণে চলতি আমন ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা (১ কোটি ৬৩ লাখ টন) অর্জনের সম্ভাবনা নেই বলেই অভিজ্ঞজনরা মনে করছেন।

আর খাদ্যশস্যের দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা গমের চাহিদা ক্রমেই বেড়ে চললেও পণ্যটির উৎপাদন ১৯৯৮-৯৯ অর্থবছরের ১৯ লাখ ৮ হাজার টন থেকে হ্রাস পেয়ে বর্তমানে ১১-১২ লাখ টনের মধ্যে সীমাবদ্ধ। গমের এ উৎপাদন দেশের চাহিদার (কম-বেশি ৭০ লাখ টন) ছয়ভাগের একভাগ। অর্থাৎ গমের ক্ষেত্রে দেশ প্রায় পুরোপুরি আমদানিনির্ভর হয়ে পড়েছে।

দেশে উৎপাদিত খাদ্যশস্য চাহিদা মেটাতে না পারায় এগুলোর আমদানি ছাড়া আর কোনো বিকল্প থাকে না। চলতি অর্থবছরে সরকারি-বেসরকারি খাতে ১৯ লাখ টন চাল আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হলেও আন্তর্জাতিক বাজারে চালের মূল্য বেড়ে যাওয়া, বিশ্বব্যাপী পরিবহণ ব্যয় অত্যধিক বৃদ্ধি পাওয়া এবং দেশে ডলার সংকট তীব্র আকার ধারণ করায় খাদ্যশস্য আমদানিতে গতি আসেনি।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটের তথ্য মোতাবেক, চলতি অর্থবছরের ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারি খাত মিলে মাত্র ৫ লাখ ১৪ হাজার ৪৩ টন চাল আমদানি হয়েছে। চাহিদার তুলনায় উৎপাদন স্বল্পতা এবং আমদানিতে শ্লথগতির কারণে সব শ্রেণির চালের দাম অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছে।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য মোতাবেক বিপুল চাহিদার বিপরীতে ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত মাত্র ৯ লাখ ১৪ হাজার ৩৯ টন গম আমদানি হয়েছে। আটার দাম অতীতের সব রেকর্ড ভেঙেছে। বাজারে মোটা চালের চেয়ে আটার দাম বেশি হওয়ায় চালের ওপর চাপ বেড়েছে।

খাদ্যশস্যের বাইরে যেসব খাদ্যপণ্যে দেশ প্রায় পুরোপুরি আমদানির্ভর হয়ে পড়েছে, সেগুলোর শীর্ষে রয়েছে ভোজ্যতেল, চিনি ও ডাল। গত জুনে কৃষি মন্ত্রণালয়ে ‘ভোজ্যতেলের আমদানিনির্ভরতা কমাতে কর্মপরিকল্পনা’ বিষয়ক বৈঠকে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে ভোজ্যতেলের চাহিদা রয়েছে প্রায় ২৪ লাখ টন। এর বিপরীতে স্থানীয়ভাবে সরিষা, তিল ও সূর্যমুখী ফসল থেকে উৎপাদিত ভোজ্যতেলের পরিমাণ ৩ লাখ টন, যা চাহিদার ১২ শতাংশ। এর অর্থ, দেশে চাহিদার ৮৮ শতাংশ ভোজ্যতেল আমদানি করতে হয়।

দেশে গত দুই বছরে যেসব পণ্যের দাম সবচেয়ে বেশি বেড়েছে, তার মধ্যে রয়েছে ভোজ্যতেল। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে এক লিটার সয়াবিন তেলের দাম ছিল ১০০ টাকা, যা বর্তমানে ১৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্রাপ্ত তথ্য মোতাবেক, দেশে বছরে কম-বেশি ২০ লাখ টন চিনির চাহিদার বিপরীতে সরকার নিয়ন্ত্রিত চিনিকলগুলোয় উৎপাদনের পরিমাণ ৫০-৬০ হাজার টন। অর্থাৎ চিনিতে আমরা পুরোপুরি আমদানিনির্ভর।

এক বছর আগে সরকারি পর্যায়ে এক কেজি চিনির দাম ছিল ৬৫ টাকা। বর্তমানে পণ্যটির কেজিপ্রতি সরকার নির্ধারিত দাম ১০৮ টাকা। ‘গরিবের প্রোটিন’ হিসাবে খ্যাত ডালের যখন বার্ষিক প্রয়োজন কম-বেশি ২৬ লাখ টন, তখন দেশে উৎপাদিত ডালের পরিমাণ কম-বেশি ৯ লাখ টন। ফলে বছরে প্রায় ১৭ লাখ টন ডাল আমদানি করতে হয়।

খাদ্য নিরাপত্তার দ্বিতীয় নিয়ামক হচ্ছে খাদ্যপ্রাপ্তির ক্ষমতা। খাদ্যের সহজলভ্যতা খাদ্য নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয় না। খাদ্যের সহজলভ্যতার সঙ্গে দরকার খাদ্য কেনার আর্থিক সংগতি। দুবছরের বেশি সময় ধরে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে দেশের অর্থনীতি ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এবং কর্মসংস্থানে মূল ভূমিকা পালনকারী বেসরকারি খাতে চাকরিচ্যুতি, বেতন/মজুরি হ্রাস এবং অন্যান্য কারণে মানুষের আয় কমেছে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক জনমত জরিপ প্রতিষ্ঠান গ্যালাপ পরিচালিত ‘স্টেট অব দ্য গ্লোবাল ওয়ার্কপ্লেস ২০২১’ অনুযায়ী, করোনার সময় বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার ৫৫ শতাংশ মানুষের আয় কমেছে। এর ফলে দেশে দারিদ্র্যহার বেড়েছে। সরকারি হিসাবমতে, ২০১৯ সালে দারিদ্র্যহার ২০ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে আসে। করোনাকালীন তথ্য ও উপাত্তের ভিত্তিতে সরকার এখন পর্যন্ত জনগণকে জানায়নি দেশে বর্তমানে দারিদ্র্যের হার কত।

এদিকে দেশের কয়েকটি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান/সংস্থা যেমন-সিপিডি, পিপিআরসি, বিআইজিডির মতে, করোনা মহামারির কারণে ২০২০-২১ অর্থবছরে দারিদ্র্যহার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৫ থেকে ৪২ শতাংশে। একদিকে দারিদ্র্যহার বৃদ্ধি, অন্যদিকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং গত ৮ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে এ বিরাটসংখ্যক দরিদ্র মানুষের পক্ষে প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে তাদের খাদ্য নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন।

খাদ্য নিরাপত্তা নির্ধারণে তৃতীয় নিয়ামক পুষ্টিমানসম্পন্ন ও নিরাপদ খাদ্যপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের অনেক নিচে। নারী ও শিশুসহ দেশের এক বিরাট জনগোষ্ঠীর মধ্যে পুষ্টি সমস্যা প্রকটভাবে বিদ্যমান। এর কারণ আর্থিক অসচ্ছলতা ও খাদ্যের ত্রুটিপূর্ণ জৈবিক ব্যবহার।

অসামর্থ্যরে কারণে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পক্ষে আমিষজাতীয় খাদ্য কেনা প্রায়ই সম্ভব হয় না। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে বর্তমানে মধ্যবিত্তের পক্ষেও আমিষজাতীয় খাদ্য কেনা কষ্টকর হয়ে পড়েছে। এতে পুষ্টিহীনতা বাড়ছে। খাদ্যের ত্রুটিপূর্ণ ব্যবহারের মধ্যে রয়েছে পুরুষের তুলনায় নারী ও শিশুর প্রয়োজনীয় খাবার না পাওয়া এবং ত্রুটিপূর্ণ রন্ধন পদ্ধতি।

এসব কারণে ‘গ্লোবাল ফুড সিকিউরিটি ইনডেস্ক’ বা ‘বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা সূচক-২০২০’-এ ১১৩ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৮৪তম। শুধু বৈশ্বিকভাবেই নয়, সূচকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সবার নিচে।

আগামী বছর বিশ্বব্যাপী খাদ্য সংকট সৃষ্টির আশঙ্কার প্রেক্ষাপটে আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা যথাসম্ভব নিশ্চিতে স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। স্বল্পমেয়াদি কার্যক্রমের অংশ হিসাবে সরকারের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী চলতি অর্থবছরে চাল, গম এবং অন্যান্য অত্যাবশ্যকীয় খাদ্যপণ্য আমদানি ত্বরান্বিত করতে হবে।

দুই. আসন্ন বোরো মৌসুমে সর্বোচ্চ পরিমাণ ফলন পেতে দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে হবে। তিন. মানুষের, বিশেষ করে নিম্নবিত্তের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির ব্যবস্থা নিতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে-ক. জমি স্বল্পতার কারণে আমাদের চাল ও অন্যান্য খাদ্যপণ্যের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিতে হবে। খ. চালসহ কৃষিপণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধিতে কৃষিজমি অকৃষি খাতে চলে যাওয়া যথাসম্ভব বন্ধ করতে হবে।

গ. চালসহ কৃষিপণ্যের উৎপাদন বাড়াতে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে কৃষি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। পুনঃঅর্থায়ন তহবিলে সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক বরাদ্দকৃত ৫ হাজার কোটি টাকা কৃষি খাতের প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয়। বরাদ্দের পরিমাণ বাড়াতে হবে। ঘ. খাদ্যের পুষ্টিমান বৃদ্ধির দিকে নজর দিতে হবে এবং বাজারে অনিরাপদ খাদ্য সরবরাহ বন্ধ করতে হবে। ঙ. কৃষি খাতের চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় সুপারিশকৃত কৌশলগুলো বাস্তবায়নে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাতে হবে।

আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক খাদ্য সচিব, কলাম লেখক

latifm43@gmail.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন