আজও তিনি নারীসমাজের পথপ্রদর্শক
jugantor
রোকেয়া দিবস
আজও তিনি নারীসমাজের পথপ্রদর্শক

  মোছাম্মত শিউলি আক্তার  

০৯ ডিসেম্বর ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলার নারীজাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া ১৮৮০ সালের ৯ ডিসেম্বর রংপুরের মিঠাপুকুর থানার পায়রাবন্দ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম জহীরুদ্দিন মোহাম্মদ আবু আলী হায়দার সাবের এবং মায়ের নাম রাহাতুন্নেসা সাবের চৌধুরী।

রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও রোকেয়া নারীজাগরণের জন্য কাজ করে গেছেন, যে সময় নারীর শিক্ষাগ্রহণ তো দূরের কথা, ঘর থেকে বাইরে বের হওয়াই ছিল কঠিন কাজ। তৎকালীন মুসলিম সমাজব্যবস্থার কারণে রোকেয়া ও তার বোনদের বাইরে পড়াশোনা করতে পাঠানো হয়নি। তাদের ঘরে আরবি ও উর্দু শেখানো হয়। বাংলা শেখা ছিল নিষিদ্ধ! তবে রোকেয়ার বড় ভাই ইব্রাহীম সাবের আধুনিক মনস্ক ছিলেন।

১৮৯৬ সালে ১৬ বছর বয়সে ভাগলপুরের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট উর্দুভাষী ও বিপত্নীক সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন রোকেয়া। স্বামীর কাছ থেকে পেয়েছিলেন মুক্তমনে চিন্তা করার সাহস ও সহযোগিতা। ১৯০৯ সালে সাখাওয়াত হোসেন মারা যান।

অল্প বয়সে স্বামীর মৃত্যু হওয়ায় বেগম রোকেয়া সম্পূর্ণ একা হয়ে পড়েন। এ সময় তিনি সমাজসেবা ও সমাজে নারীশিক্ষার বিস্তারে মনোনিবেশ করেন। তিনি আগে জমানো অর্থে সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গালর্স স্কুল নামে একটি মেয়েদের স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। সাখাওয়াত হোসেনের মৃত্যুর পাঁচ বছর পর বেগম রোকেয়া নারীশিক্ষা বিস্তারের স্বপ্ন ও পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করার লক্ষ্যে ভাগলপুরে মুসলিম বালিকা বিদ্যালয়ের কাজ শুরু করেন।

১৯১০ সালে সম্পত্তি নিয়ে ঝামেলা সৃষ্টি হলে স্কুল বন্ধ করে তিনি কলকাতায় চলে যান। পরে ১৯১১ সালের ১৬ মার্চ কলকাতার ১৩নং ওয়ালিউল্লাহ লেনের ছোট একটি বাড়িতে দ্বিতীয়বার মুসলিম বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। এ স্কুলের নাম রাখা হয় ‘সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল’।

মাত্র ৮ জন ছাত্রী নিয়ে যাত্রা শুরু হয় এ স্কুলের। পরে চার বছরের মধ্যে তা ৮৪ জন ছাত্রীতে দাঁড়ায়। ১৯৩০ সালে স্কুলটি হাইস্কুলে পরিণত হয়। ছাত্রী সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া এবং প্রাতিষ্ঠানিকসহ বিভিন্ন কারণে স্কুলটি বহুবার স্থান বদল করে। প্রায় দুই যুগ ধরে স্কুল পরিচালনায় রোকেয়া তার সর্বশক্তি নিয়োগ করেন।

এরপর থেকে বেগম রোকেয়া তার সব শক্তি, উদ্যম, অর্থ ও সময় নিঃস্বার্থভাবে নিয়োজিত করেন স্কুলটিকে একটি আদর্শ মুসলিম বিদ্যালয় রূপে গড়ে তোলার প্রয়াসে।

সে সময়ের ইতিহাস, পত্রপত্রিকা ও বেগম রোকেয়ার লেখনী থেকে জানা যায় কতটা কষ্ট, লাঞ্ছনা সহ্য করে তিনি ছাত্রী সংগ্রহ করেছিলেন। স্কুল পরিচালনা করতে গিয়ে বারবার তাকে বিরূপ সমালোচনা ও প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হয়েছিল।

সবকিছু মোকাবিলা ও উপেক্ষা করেই স্কুলটিকে তিনি সে যুগের মুসলমান মেয়েদের শিক্ষালাভের অন্যতম প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেন। শৈশব থেকে মুসলমান নারীদের যে দুর্দশা প্রত্যক্ষ করেছেন, তার প্রতিকারে নিজের স্বপ্ন ও আদর্শ বাস্তবায়ন করেন। স্কুল পরিচালনা ও পাঠদানে অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য বেগম রোকেয়া বড় বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করতেন।

বেগম রোকেয়ার সমগ্র সাহিত্যকর্মের মধ্যে প্রতিফলিত হয়েছে সমাজের কুসংস্কার ও অবরোধ-প্রথার কুফল, নারীদের শিক্ষার পক্ষে তার নিজস্ব মতামত, নারীদের প্রতি সামাজিক অবমাননা এবং নারীর অধিকার ও নারীজাগরণ সম্পর্কে ধ্যানধারণা। বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহ প্রথার বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন সব সময় সোচ্চার। পুরুষশাসিত সমাজে নারীর দুরবস্থা এবং দৈহিক-মানসিক জড়তা থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় যে শিক্ষা, এ ধারণা তিনি তুলে ধরেন তীক্ষ্ণ ভাষায় ও তির্যক ভঙ্গিতে।

বেগম রোকেয়ার রচনার সাহিত্য মূল্যের চেয়ে সামাজিক মূল্য নিঃসন্দেহে বেশি। সাহিত্য-সৃষ্টি তার উদ্দেশ্য নয়, বরং সমাজকে নাড়া দেওয়াই ছিল তার লক্ষ্য। আর এই নাড়া দিতে গিয়ে তিনি তার রচনায় যেসব বিষয় বা বক্তব্যের উপস্থাপন করেছেন, তা অত্যন্ত যুক্তিসহকারে ও দৃষ্টান্ত দিয়ে উপস্থাপন করেছেন।

রোকেয়ার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যুক্তিবাদ। তার আগে কোনো বাঙালি নারীকে আমরা যুক্তির এত শৈল্পিক ও সার্থক উপস্থাপন করতে দেখিনি। রোকেয়ার যুক্তি উপস্থাপন রীতির কয়েকটি দৃষ্টান্ত তুলে ধরছি-১. ‘শিশু রক্ষা করতে হলে আগে শিশুর মায়েদের রক্ষা করা দরকার। ভালো ফসল পেতে হলে গাছে সার দেওয়া দরকার।’ ২. ‘মাদক দ্রব্য যতই সর্বনাশা হউক না কেন, মাতাল তাহা ছাড়িতে চাহে না; সেইরূপ আমরা অঙ্গে দাসত্বের নিদর্শন ধারণ করিয়াও আপনাকে গৌরবান্বিতা মনে করি, গর্বে স্ফীত হই!’

তখনকার প্রেক্ষাপটে সাহিত্যিক হিসাবে বেগম রোকেয়া ছিলেন এক ব্যতিক্রমী প্রতিভা। নবনূর, সওগাত, মোহাম্মদী, নবপ্রভা, মহিলা, ভারত মহিলা আল-এসলাম, বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা, নওরোজ, মাহে নও ইত্যাদি পত্রিকায় তিনি নিয়মিত লিখতেন।

বেগম রোকেয়া উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন, মেয়েরা অর্থনৈতিক ভূমিকা পালন করে স্বাবলম্বী হতে না পারলে সত্যিকার অর্থে কখনোই স্বাধীন হতে পারবে না। সেজন্য তিনি তাদের অর্থনৈতিক ভূমিকার ওপর খুব জোর দিয়েছেন। এক্ষেত্রে পূর্ববর্তী নারীদের সঙ্গে তার মিল নেই। বেগম রোকেয়ার আগের প্রজন্মের নারীদের লেখাপড়া শিখে আরও ভালো স্ত্রী হওয়ার প্রতি যতটা ঝোঁক ছিল, নিজেদের স্বাধীনতার দিকে ততটা নজর ছিল না।

বেগম রোকেয়ার সঙ্গে আগেকার নারী প্রগতির পথিকৃৎদের আরেকটি পার্থক্য লক্ষ করা যায়। তারা নারীদের উন্নতির কথা বললেও নারী ও পুরুষের সমান অধিকারের কথা বলেননি। বলেননি, স্বামী প্রভু নন, তার জীবনসঙ্গী মাত্র। বেগম রোকেয়া নারীশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা আর লিঙ্গসমতার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছেন। হাস্যরস আর ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের সাহায্যে পিতৃতান্ত্রিক সমাজে নারীর অসম অবস্থান তুলে ধরে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন।

বেগম রোকেয়া বিশ্বাস করতেন, নারীশিক্ষার প্রসারই অধঃপতিত নারীসমাজকে উন্নত করার প্রধান উপায়। তাই নারীশিক্ষা বিস্তারের জন্য তিনি দুই দশকের অধিককাল নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। নারীশিক্ষা বিস্তার আন্দোলনে তার কঠোর আত্মত্যাগের ফলে বাঙালি মুসলিম সমাজে নারীশিক্ষার প্রসার তার জীবনকালেই পরিলক্ষিত হয়।

১৯১৬ সালে বেগম রোকেয়া প্রতিষ্ঠা করেন ‘আঞ্জুমানে খাওয়াত নে ইসলাম’ বা মুসলিম মহিলা সমিতি। তার জীবনব্যাপী সাধনার অন্যতম ক্ষেত্র এ মহিলা সমিতি। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের নারী আন্দোলনে যেসব মহিলা নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাদের অনেকেই বেগম রোকেয়ার স্কুলে পড়াশোনা করেন এবং তার ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য লাভ করে তার আদর্শে অনুপ্রাণিত হন।

১৯৩২ সালে ৯ ডিসেম্বর বেগম রোকেয়া ইন্তেকাল করেন। অনেক বছর আগে জন্মেও তার দূরদর্শী চিন্তাচেতনা এখনো সমকালীন। এই একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়েও তিনিই নারীসমাজের পথপ্রদর্শক হয়ে আছেন। স্বাধীন বাংলাদেশে তার স্বপ্ন নারীর জীবনে একেকটি সম্ভাবনা হয়ে ধরা দিচ্ছে। মহীয়সী এই আলোকবর্তিকার অনুপ্রেরণা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ছে সময়ের আবর্তে। তার কীর্তি চির অম্লান।

স্বশিক্ষিত রোকেয়া সাখাওয়াত ব্যক্তিজীবনে ছিলেন স্বনির্ভর, মহৎ, সর্বগুণান্বিতা, দরদি, কোমল মনের অধিকারী; অথচ প্রয়োজনে প্রতিবাদী ব্যক্তিত্ব রূপে প্রতিভাত হয়েছেন। নারী আন্দোলনের প্রতিষ্ঠান রূপে তিনি সর্বজনীন স্বীকৃতি পেয়েছেন মানবাধিকারের বাঙালি মুসলিম প্রবক্তা হিসাবে। মেধা ও প্রজ্ঞা দিয়ে তিনি যে আলোর মশাল জ্বালিয়ে দিয়েছেন, তা পথনির্দেশক হয়ে রইবে বর্তমান ও ভবিষ্যতের নারীসমাজের জন্য।

মোছাম্মত শিউলি আক্তার : সহকারী অধ্যাপক, মার্কেটিং বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর

রোকেয়া দিবস

আজও তিনি নারীসমাজের পথপ্রদর্শক

 মোছাম্মত শিউলি আক্তার 
০৯ ডিসেম্বর ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলার নারীজাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া ১৮৮০ সালের ৯ ডিসেম্বর রংপুরের মিঠাপুকুর থানার পায়রাবন্দ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম জহীরুদ্দিন মোহাম্মদ আবু আলী হায়দার সাবের এবং মায়ের নাম রাহাতুন্নেসা সাবের চৌধুরী।

রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও রোকেয়া নারীজাগরণের জন্য কাজ করে গেছেন, যে সময় নারীর শিক্ষাগ্রহণ তো দূরের কথা, ঘর থেকে বাইরে বের হওয়াই ছিল কঠিন কাজ। তৎকালীন মুসলিম সমাজব্যবস্থার কারণে রোকেয়া ও তার বোনদের বাইরে পড়াশোনা করতে পাঠানো হয়নি। তাদের ঘরে আরবি ও উর্দু শেখানো হয়। বাংলা শেখা ছিল নিষিদ্ধ! তবে রোকেয়ার বড় ভাই ইব্রাহীম সাবের আধুনিক মনস্ক ছিলেন।

১৮৯৬ সালে ১৬ বছর বয়সে ভাগলপুরের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট উর্দুভাষী ও বিপত্নীক সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন রোকেয়া। স্বামীর কাছ থেকে পেয়েছিলেন মুক্তমনে চিন্তা করার সাহস ও সহযোগিতা। ১৯০৯ সালে সাখাওয়াত হোসেন মারা যান।

অল্প বয়সে স্বামীর মৃত্যু হওয়ায় বেগম রোকেয়া সম্পূর্ণ একা হয়ে পড়েন। এ সময় তিনি সমাজসেবা ও সমাজে নারীশিক্ষার বিস্তারে মনোনিবেশ করেন। তিনি আগে জমানো অর্থে সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গালর্স স্কুল নামে একটি মেয়েদের স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। সাখাওয়াত হোসেনের মৃত্যুর পাঁচ বছর পর বেগম রোকেয়া নারীশিক্ষা বিস্তারের স্বপ্ন ও পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করার লক্ষ্যে ভাগলপুরে মুসলিম বালিকা বিদ্যালয়ের কাজ শুরু করেন।

১৯১০ সালে সম্পত্তি নিয়ে ঝামেলা সৃষ্টি হলে স্কুল বন্ধ করে তিনি কলকাতায় চলে যান। পরে ১৯১১ সালের ১৬ মার্চ কলকাতার ১৩নং ওয়ালিউল্লাহ লেনের ছোট একটি বাড়িতে দ্বিতীয়বার মুসলিম বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। এ স্কুলের নাম রাখা হয় ‘সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল’।

মাত্র ৮ জন ছাত্রী নিয়ে যাত্রা শুরু হয় এ স্কুলের। পরে চার বছরের মধ্যে তা ৮৪ জন ছাত্রীতে দাঁড়ায়। ১৯৩০ সালে স্কুলটি হাইস্কুলে পরিণত হয়। ছাত্রী সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া এবং প্রাতিষ্ঠানিকসহ বিভিন্ন কারণে স্কুলটি বহুবার স্থান বদল করে। প্রায় দুই যুগ ধরে স্কুল পরিচালনায় রোকেয়া তার সর্বশক্তি নিয়োগ করেন।

এরপর থেকে বেগম রোকেয়া তার সব শক্তি, উদ্যম, অর্থ ও সময় নিঃস্বার্থভাবে নিয়োজিত করেন স্কুলটিকে একটি আদর্শ মুসলিম বিদ্যালয় রূপে গড়ে তোলার প্রয়াসে।

সে সময়ের ইতিহাস, পত্রপত্রিকা ও বেগম রোকেয়ার লেখনী থেকে জানা যায় কতটা কষ্ট, লাঞ্ছনা সহ্য করে তিনি ছাত্রী সংগ্রহ করেছিলেন। স্কুল পরিচালনা করতে গিয়ে বারবার তাকে বিরূপ সমালোচনা ও প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হয়েছিল।

সবকিছু মোকাবিলা ও উপেক্ষা করেই স্কুলটিকে তিনি সে যুগের মুসলমান মেয়েদের শিক্ষালাভের অন্যতম প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেন। শৈশব থেকে মুসলমান নারীদের যে দুর্দশা প্রত্যক্ষ করেছেন, তার প্রতিকারে নিজের স্বপ্ন ও আদর্শ বাস্তবায়ন করেন। স্কুল পরিচালনা ও পাঠদানে অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য বেগম রোকেয়া বড় বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করতেন।

বেগম রোকেয়ার সমগ্র সাহিত্যকর্মের মধ্যে প্রতিফলিত হয়েছে সমাজের কুসংস্কার ও অবরোধ-প্রথার কুফল, নারীদের শিক্ষার পক্ষে তার নিজস্ব মতামত, নারীদের প্রতি সামাজিক অবমাননা এবং নারীর অধিকার ও নারীজাগরণ সম্পর্কে ধ্যানধারণা। বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহ প্রথার বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন সব সময় সোচ্চার। পুরুষশাসিত সমাজে নারীর দুরবস্থা এবং দৈহিক-মানসিক জড়তা থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় যে শিক্ষা, এ ধারণা তিনি তুলে ধরেন তীক্ষ্ণ ভাষায় ও তির্যক ভঙ্গিতে।

বেগম রোকেয়ার রচনার সাহিত্য মূল্যের চেয়ে সামাজিক মূল্য নিঃসন্দেহে বেশি। সাহিত্য-সৃষ্টি তার উদ্দেশ্য নয়, বরং সমাজকে নাড়া দেওয়াই ছিল তার লক্ষ্য। আর এই নাড়া দিতে গিয়ে তিনি তার রচনায় যেসব বিষয় বা বক্তব্যের উপস্থাপন করেছেন, তা অত্যন্ত যুক্তিসহকারে ও দৃষ্টান্ত দিয়ে উপস্থাপন করেছেন।

রোকেয়ার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যুক্তিবাদ। তার আগে কোনো বাঙালি নারীকে আমরা যুক্তির এত শৈল্পিক ও সার্থক উপস্থাপন করতে দেখিনি। রোকেয়ার যুক্তি উপস্থাপন রীতির কয়েকটি দৃষ্টান্ত তুলে ধরছি-১. ‘শিশু রক্ষা করতে হলে আগে শিশুর মায়েদের রক্ষা করা দরকার। ভালো ফসল পেতে হলে গাছে সার দেওয়া দরকার।’ ২. ‘মাদক দ্রব্য যতই সর্বনাশা হউক না কেন, মাতাল তাহা ছাড়িতে চাহে না; সেইরূপ আমরা অঙ্গে দাসত্বের নিদর্শন ধারণ করিয়াও আপনাকে গৌরবান্বিতা মনে করি, গর্বে স্ফীত হই!’

তখনকার প্রেক্ষাপটে সাহিত্যিক হিসাবে বেগম রোকেয়া ছিলেন এক ব্যতিক্রমী প্রতিভা। নবনূর, সওগাত, মোহাম্মদী, নবপ্রভা, মহিলা, ভারত মহিলা আল-এসলাম, বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা, নওরোজ, মাহে নও ইত্যাদি পত্রিকায় তিনি নিয়মিত লিখতেন।

বেগম রোকেয়া উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন, মেয়েরা অর্থনৈতিক ভূমিকা পালন করে স্বাবলম্বী হতে না পারলে সত্যিকার অর্থে কখনোই স্বাধীন হতে পারবে না। সেজন্য তিনি তাদের অর্থনৈতিক ভূমিকার ওপর খুব জোর দিয়েছেন। এক্ষেত্রে পূর্ববর্তী নারীদের সঙ্গে তার মিল নেই। বেগম রোকেয়ার আগের প্রজন্মের নারীদের লেখাপড়া শিখে আরও ভালো স্ত্রী হওয়ার প্রতি যতটা ঝোঁক ছিল, নিজেদের স্বাধীনতার দিকে ততটা নজর ছিল না।

বেগম রোকেয়ার সঙ্গে আগেকার নারী প্রগতির পথিকৃৎদের আরেকটি পার্থক্য লক্ষ করা যায়। তারা নারীদের উন্নতির কথা বললেও নারী ও পুরুষের সমান অধিকারের কথা বলেননি। বলেননি, স্বামী প্রভু নন, তার জীবনসঙ্গী মাত্র। বেগম রোকেয়া নারীশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা আর লিঙ্গসমতার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছেন। হাস্যরস আর ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের সাহায্যে পিতৃতান্ত্রিক সমাজে নারীর অসম অবস্থান তুলে ধরে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন।

বেগম রোকেয়া বিশ্বাস করতেন, নারীশিক্ষার প্রসারই অধঃপতিত নারীসমাজকে উন্নত করার প্রধান উপায়। তাই নারীশিক্ষা বিস্তারের জন্য তিনি দুই দশকের অধিককাল নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। নারীশিক্ষা বিস্তার আন্দোলনে তার কঠোর আত্মত্যাগের ফলে বাঙালি মুসলিম সমাজে নারীশিক্ষার প্রসার তার জীবনকালেই পরিলক্ষিত হয়।

১৯১৬ সালে বেগম রোকেয়া প্রতিষ্ঠা করেন ‘আঞ্জুমানে খাওয়াত নে ইসলাম’ বা মুসলিম মহিলা সমিতি। তার জীবনব্যাপী সাধনার অন্যতম ক্ষেত্র এ মহিলা সমিতি। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের নারী আন্দোলনে যেসব মহিলা নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাদের অনেকেই বেগম রোকেয়ার স্কুলে পড়াশোনা করেন এবং তার ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য লাভ করে তার আদর্শে অনুপ্রাণিত হন।

১৯৩২ সালে ৯ ডিসেম্বর বেগম রোকেয়া ইন্তেকাল করেন। অনেক বছর আগে জন্মেও তার দূরদর্শী চিন্তাচেতনা এখনো সমকালীন। এই একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়েও তিনিই নারীসমাজের পথপ্রদর্শক হয়ে আছেন। স্বাধীন বাংলাদেশে তার স্বপ্ন নারীর জীবনে একেকটি সম্ভাবনা হয়ে ধরা দিচ্ছে। মহীয়সী এই আলোকবর্তিকার অনুপ্রেরণা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ছে সময়ের আবর্তে। তার কীর্তি চির অম্লান।

স্বশিক্ষিত রোকেয়া সাখাওয়াত ব্যক্তিজীবনে ছিলেন স্বনির্ভর, মহৎ, সর্বগুণান্বিতা, দরদি, কোমল মনের অধিকারী; অথচ প্রয়োজনে প্রতিবাদী ব্যক্তিত্ব রূপে প্রতিভাত হয়েছেন। নারী আন্দোলনের প্রতিষ্ঠান রূপে তিনি সর্বজনীন স্বীকৃতি পেয়েছেন মানবাধিকারের বাঙালি মুসলিম প্রবক্তা হিসাবে। মেধা ও প্রজ্ঞা দিয়ে তিনি যে আলোর মশাল জ্বালিয়ে দিয়েছেন, তা পথনির্দেশক হয়ে রইবে বর্তমান ও ভবিষ্যতের নারীসমাজের জন্য।

মোছাম্মত শিউলি আক্তার : সহকারী অধ্যাপক, মার্কেটিং বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন