পরিস্থিতি এখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবির অনুকূলে
jugantor
দেশপ্রেমের চশমা
পরিস্থিতি এখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবির অনুকূলে

  সম্পাদকীয়  

২৩ জানুয়ারি ২০২৩, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশি নাগরিক সমাজে একাদশ সংসদ নির্বাচনের প্রশ্নবিদ্ধ নৈশভোটের পর থেকে কতিপয় প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। প্রশ্নগুলো হলো-কেমন হবে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন? এ নির্বাচন কি গত দুটি সংসদ নির্বাচনের মতো ফন্দিফিকিরের নির্বাচন হবে? ভোটাররা কি স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবেন? নির্বাচনি ফলাফলে কি ভোটারদের প্রদত্ত রায়ের প্রতিফলন ঘটবে? নির্বাচনটি ব্যালটে, নাকি মেশিনে হবে? নির্বাচনে কি সব দল অংশগ্রহণ করবে? নির্বাচনটি গ্রহণযোগ্য হবে? প্রশাসন ও পোশাকধারী বাহিনী কি পেশাদারত্বের সঙ্গে অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে পারবে? নির্বাচন ক্ষমতাসীন সরকারাধীনে, নাকি দলনিরপেক্ষ সরকারের অধীনে হবে? নির্বাচন দলনিরপেক্ষ সরকারাধীনে হলে কি বর্তমান নির্বাচন কমিশন থাকবে? সরকার কি সংসদে অস্থায়ী নির্বাচনকালীন সরকারের বিল পাশের উদ্যোগ নেবে? সরকার কি অধিকাংশ রাজনৈতিক দল ও বন্ধুপ্রতিম পরাশক্তিধর দেশগুলোর অনুরোধ উপেক্ষা করে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে চাইবে? এ ক্ষেত্রে সরকার কি প্রতিবেশী দেশের সহায়তা পাবে? এসব প্রশ্নের উত্তর দুভাবে প্রদত্ত হচ্ছে। সরকারি ব্যাখ্যায় একভাবে এবং বিরোধী দলগুলোর পক্ষ থেকে প্রশ্নগুলোর উত্তর অন্যভাবে দেওয়া হচ্ছে। এমন পরিস্থিতি বাংলাদেশে নতুন নয়।

দেশ একইরকম পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছিল ১৯৯৬ সালে। খালেদা জিয়া যখন প্রথমে নিজেকে নির্বাচিত সরকার দাবি করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে রাজি হচ্ছিলেন না। ওই সময় প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগ, জামায়াত ও জাতীয় পার্টি তত্ত্বাবধায়ক সরকারাধীনে সংসদ নির্বাচনের জন্য ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন শুরু করে। কঠোর আন্দোলন করে আওয়ামী লীগ ১৭৩ দিন হরতাল এবং সংসদ থেকে সম্মিলিত পদত্যাগ করে বিএনপি সরকারকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারাধীনে নির্বাচন দিতে রাজি করিয়েছিল। তবে বিএনপি রাস্তার আন্দোলনে নতি স্বীকার করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার দেয়নি। দলটি সাংবিধানিক আইন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার দিতে রাজি হয়। কিন্তু সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় সরকার আরেকটি যেনতেন নির্বাচন (ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচন) করে ওই সংসদে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিল পাশ করে সংসদ ভেঙে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দেয়।

তবে ১৯৯৬ সালের সার্বিক পরিস্থিতির চেয়ে বর্তমান সময়ের নির্বাচনি পরিস্থিতি অনেক খারাপ। ওই সময় আওয়ামী লীগ মাগুরা উপনির্বাচনের পর ঘোষণা দেয়, দলটি বিএনপি সরকারের অধীনে আর কোনো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে না। মাগুরা নির্বাচনের পর যেসব সংসদীয় উপনির্বাচন হয়েছিল, আওয়ামী লীগ সেসব নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি। এ কথা সত্য, মাগুরা নির্বাচনে সরকারদলীয় নেতাকর্মীরা বাড়াবাড়ি করেছিলেন। কিন্তু অন্য বড় দলগুলো যে সেখানে শক্তি প্রদর্শন করেনি, এমন নয়। আওয়ামী লীগ এবং জাতীয় পার্টি তাদের প্রার্থীদের পক্ষে যথেষ্ট শক্তি প্রয়োগ করেছিল। এ কারণে মোহাম্মদপুর উপজেলার ২০টি ভোটকেন্দ্রে জাতীয় পার্টির প্রার্থী সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়েছিলেন। ওই উপনির্বাচনে কেবল সরকারি দল ভোট কাটেনি। এর পক্ষে প্রকাশিত প্রমাণ রয়েছে। যেমন, ওই নির্বাচনে তিনটি ভোটকেন্দ্রে সন্ত্রাসজনিত কারণে সংশ্লিষ্ট প্রিসাইডিং অফিসাররা ভোটগ্রহণ বন্ধ করেন।

উল্লেখ্য, প্রিসাইডিং অফিসারকে ভোটগ্রহণ বন্ধ করতে হলে নির্বাচনি নিয়মানুযায়ী লিখিতভাবে রিটার্নিং অফিসারকে জানাতে হয়। উল্লিখিত তিনটি ভোটকেন্দ্রের একটি ছিল কুল্লিয়া হাইস্কুল। ওই কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার মো. শামীম হায়দার রিটার্নিং অফিসারকে ভোটগ্রহণ স্থগিতকরণ প্রসঙ্গে প্রদত্ত চিঠিতে লিখেন,-‘ভোটগ্রহণ সকাল ৮টা থেকে শুরু হইয়া চলিয়া আসিতেছিল। হঠাৎ বেলা ১টার সময় ১০/১৫ জন সশস্ত্র যুবক জোরপূর্বক ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করেন এবং পিস্তল ধরিয়া আমাকে রুমের মধ্যে আটকাইয়া রাখে এবং জীবননাশের বিভিন্ন রকম হুমকি দিতে থাকে। তাহারা ভোটকেন্দ্রের বিভিন্ন বুথে প্রবেশ করিয়া জোরপূর্বক সিল মারিয়া বাক্স ভর্তি করিতে থাকে। কিছু মুড়ি বইও তাহারা জোরপূর্ব্বক নিয়ে নেয়।’ একই চিঠির শেষদিকে তিনি লিখেন, ‘তার কিছু সময় পরেই প্রায় ১৫০০-২০০০ (আনুমানিক) মানুষ আবার আমাকে আটকাইয়া ফেলিয়া ভয়ভীতি প্রদর্শন করিতে থাকে এবং তাহারা জোরপূর্ব্বক ব্যালট বাক্সে সিল মারা ব্যালট পেপারসমূহ বাহির করিয়া পোড়াইয়া ফেলে’ (পূর্ণ চিঠির জন্য দেখুন Electoral Corruption in Bangladesh, Ashgate, 2001, Routletge, 2019)। চিঠিটি প্রমাণ করে, মাগুরা উপনির্বাচনে কেবল সরকারি দল বাড়াবাড়ি করেনি। অন্য দলও ভোট কাটাকাটিতে জড়িত ছিল। তা না হলে যারা বেলা ১টার সময় সশস্ত্রভাবে এসে প্রিসাইডিং অফিসারকে জিম্মি করে ব্যালট পেপারে সিল মেরে বাক্সে ভরেছিলেন, তারা নিশ্চয়ই আবার পরে এসে সে ভোট ব্যালট বাক্স থেকে বের করে পুড়িয়ে ফেলবেন না। কমপক্ষে এখানে দুই দল নির্বাচনি সন্ত্রাসে জড়িত ছিলেন। এমন একটি উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে যদি ওই সময়ের বিরোধী দল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন করতে পারে, তাহলে প্রশ্নবিদ্ধ দশম এবং নৈশভোটের একাদশ সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপিসহ যেসব রাজনৈতিক দল দলনিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে আন্দোলন করছে, তাকে অযৌক্তিক বলা যায় না।

যে দল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচনের দাবিতে অন্য কতিপয় দলকে সঙ্গে নিয়ে ১৭৩ দিন হরতাল করে দাবি আদায় করেছিল, সে দলটিই অসাংবিধানিক ফখরুদ্দিন সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নবম সংসদ নির্বাচনের পর সরকারে এসে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল করে দেয়। সর্বসম্মতভাবে গৃহীত তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থে বাতিল করা হয় এককভাবে। এমনভাবে সংবিধান সাজানো হয়, যাতে ভবিষ্যতে অন্য কোনো দল ক্ষমতায় আসতে না পারে। এরপর বিরোধী দলগুলোর ওপর চালানো হয় রাজনৈতিক নিপীড়ন ও মামলা-হামলা। দুবার প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন করে সরকার ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করে। প্রশাসন ও পোশাকধারী বাহিনী ব্যবহার করে যেভাবে সরকার দুবার নির্বাচনি প্রহসন করে, তাতে জনগণ ও বিরোধী দলগুলো বুঝতে পারে যে, দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে ওই নির্বাচন জেতা সম্ভব হবে না। এ কারণে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন নিকটবর্তী হওয়ায় এবার অধিকাংশ বিরোধী দল দলীয় সরকারাধীনে নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এ ব্যাপারে পরাশক্তিধর বন্ধু দেশগুলোর কাছ থেকেও দলগুলো পরোক্ষ সমর্থন পাচ্ছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। প্রায় সব গণতান্ত্রিক দেশ বাংলাদেশে অংশগ্রহণমূলক ও অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পক্ষে সরব ভূমিকা পালন করছে। প্রতিবেশী ভারতও জনগণের পাল্স বুঝে সরকারের পক্ষে প্রকাশ্য সমর্থন দেখাচ্ছে না। এ কারণে দলীয় সরকারাধীনে সংসদ নির্বাচনের সরকারি অবস্থান ক্রমান্বয়ে দুর্বল হয়ে আসছে। বিরোধীদলীয় নেতাদের সঙ্গে সরকারদলীয় নেতারা এ প্রসঙ্গে বিতর্কে সুবিধা করতে পারছেন না।

সরকারদলীয় নেতাদের নিজদলীয় তত্ত্বাবধানে সংসদ নির্বাচন করার পক্ষে প্রদত্ত যুক্তি দুর্বল মনে হচ্ছে। অনেক নেতাই তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে ‘দানব’ বলেছেন। তারা বলছেন, এমন সরকার শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করেছিল। সরকারদলীয় নেতারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সমালোচনা করতে গিয়ে বেশিরভাগ সময় ফখরুদ্দিন সরকারের সমালোচনা করেন, যা গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, ওই সরকারটি তো তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছিল না। ওটি ছিল একটি অবৈধ অসাংবিধানিক সরকার। কারণ, ১৯৯৬-পরবর্তী সময়ে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী পাশ হওয়ার পর কীভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হবে, তা সংবিধানের ৫৮ অনুচ্ছেদে লিখিত ছিল। সে নিয়মানুযায়ী ফখরুদ্দিন সরকার গঠিত হয়নি। কেউ যদি ফখরুদ্দিন-মইনুদ্দিনের ২ বছরের সরকারকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বলেন, তাহলে ফজলি আমকে সাগর কলা বলার মতো বড় রকমের ভুল হবে। সরকারদলীয় নেতা-মন্ত্রীরা যদি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সমালোচনা করতে চান, তাহলে তাদের হাবিবুর রহমান এবং লতিফুর রহমান সরকারের সমালোচনা করতে হবে। সে সমালোচনা কমই শোনা যায়। অবশ্য বিচারপতি লতিফুর রহমান পদে এসে দ্রুত ১৩ সচিবকে বদলি করে দেওয়ার বিষয়টিকে সরকারদলীয় নেতা-মন্ত্রীরা সমালোচনা করে থাকেন। এ সমালোচনাও গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, এ বদলি সম্পর্কে স্বয়ং বিচারপতি রহমান তার লেখা ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দিনগুলো ও আমার কথা’ শীর্ষক বইয়ে বলেছেন। তিনি বলেন, তিনি জানতেন যে তার হাতে সময় খুব কম। সেজন্য পদে আসার আগেই তিনি হোমওয়ার্ক করে এসেছেন এবং সময় বাঁচাতে কাকে কাকে বদলি করতে হবে তা আগেই ঠিক করে রেখেছিলেন। তার এ কাজকে ওই সময় ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং রাশেদ খান মেনন প্রশংসা করেছিলেন।

বিরাজমান বাস্তবতা এবং গত কয়েকটি সংসদ নির্বাচন দেখার পর নাগরিক সমাজের কাছে এটি স্পষ্ট, অবাধ নির্বাচন করতে নির্দলীয় সরকারের বিকল্প নেই। আর নির্বাচনটি করতে হবে কাগজের ব্যালটে। ইভিএমে নির্বাচন হলে আবার ডিজিটাল কারচুপি হবে। ইভিএমের দোষ নেই। ইভিএম নিষ্পাপ যন্ত্র। যন্ত্র প্রদত্ত কমান্ড পালন করবে। আমেরিকা, জার্মানিসহ আরও কতিপয় প্রযুক্তিসমৃদ্ধ দেশ যখন ইভিএম থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে, তখন প্রযুক্তিঅসচেতন, স্বল্পশিক্ষিত, গরিব ভোটারের দেশে ইভিএমে নির্বাচন করা সমর্থন করা যায় না। গোঁয়ার্তুমি করে ইভিএমে নির্বাচন করতে চাইলে ইসির উচিত হবে গণভোটের মাধ্যমে জনগণের রায় নিয়ে মেশিনে নির্বাচন করা। তবে ওই গণভোটটি অবশ্যই ব্যালট পেপারে করতে হবে। সরকারের নির্বাচন নিয়ে ফন্দিফিকির বিরোধী দল এবং বিদেশি গণতান্ত্রিক দেশগুলো বুঝতে পারছে। সে কারণে নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের দাবিতে অধিকাংশ বিরোধী দল একত্রিত হয়ে আন্দোলন করছে। স্বচ্ছ নির্বাচন করার লক্ষ্যে আন্দোলনরত দলগুলো গণতান্ত্রিক দেশগুলোর কাছ থেকে পরোক্ষ উৎসাহ পাচ্ছে। বিরাজমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির সতর্ক পাঠ বলছে, দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন ক্ষমতাসীন দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা কম। সরকারের পক্ষ থেকে পুরোনো গীত গাওয়া চলছে। উন্নয়ন ফিরিস্তির বর্ণনা, আর সংবিধান থেকে না নড়ার অজুহাত। এ যুক্তি নাগরিক সমাজের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। তারা ভোট দিতে চান। তারা বলছেন, সংবিধান মানুষের জন্য। জনগণের প্রয়োজনে ১৭ বার সংবিধান সংশোধিত হতে পারলে গণতন্ত্র ও স্বচ্ছ নির্বাচনের স্বার্থে আরেকবার সংবিধান সংশোধন করতে অসুবিধা কোথায়? কাজেই দলনিরপেক্ষ অস্থায়ী সরকারাধীনে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি এখন বিবেকবান সুশীলসমাজ ও দেশপ্রেমিক জনগণের কাছে যৌক্তিক মনে হচ্ছে।

ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার : অধ্যাপক (এলপিআর), রাজনীতিবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

akhtermy@gmail.com

দেশপ্রেমের চশমা

পরিস্থিতি এখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবির অনুকূলে

 সম্পাদকীয় 
২৩ জানুয়ারি ২০২৩, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশি নাগরিক সমাজে একাদশ সংসদ নির্বাচনের প্রশ্নবিদ্ধ নৈশভোটের পর থেকে কতিপয় প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। প্রশ্নগুলো হলো-কেমন হবে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন? এ নির্বাচন কি গত দুটি সংসদ নির্বাচনের মতো ফন্দিফিকিরের নির্বাচন হবে? ভোটাররা কি স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবেন? নির্বাচনি ফলাফলে কি ভোটারদের প্রদত্ত রায়ের প্রতিফলন ঘটবে? নির্বাচনটি ব্যালটে, নাকি মেশিনে হবে? নির্বাচনে কি সব দল অংশগ্রহণ করবে? নির্বাচনটি গ্রহণযোগ্য হবে? প্রশাসন ও পোশাকধারী বাহিনী কি পেশাদারত্বের সঙ্গে অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে পারবে? নির্বাচন ক্ষমতাসীন সরকারাধীনে, নাকি দলনিরপেক্ষ সরকারের অধীনে হবে? নির্বাচন দলনিরপেক্ষ সরকারাধীনে হলে কি বর্তমান নির্বাচন কমিশন থাকবে? সরকার কি সংসদে অস্থায়ী নির্বাচনকালীন সরকারের বিল পাশের উদ্যোগ নেবে? সরকার কি অধিকাংশ রাজনৈতিক দল ও বন্ধুপ্রতিম পরাশক্তিধর দেশগুলোর অনুরোধ উপেক্ষা করে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে চাইবে? এ ক্ষেত্রে সরকার কি প্রতিবেশী দেশের সহায়তা পাবে? এসব প্রশ্নের উত্তর দুভাবে প্রদত্ত হচ্ছে। সরকারি ব্যাখ্যায় একভাবে এবং বিরোধী দলগুলোর পক্ষ থেকে প্রশ্নগুলোর উত্তর অন্যভাবে দেওয়া হচ্ছে। এমন পরিস্থিতি বাংলাদেশে নতুন নয়।

দেশ একইরকম পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছিল ১৯৯৬ সালে। খালেদা জিয়া যখন প্রথমে নিজেকে নির্বাচিত সরকার দাবি করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে রাজি হচ্ছিলেন না। ওই সময় প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগ, জামায়াত ও জাতীয় পার্টি তত্ত্বাবধায়ক সরকারাধীনে সংসদ নির্বাচনের জন্য ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন শুরু করে। কঠোর আন্দোলন করে আওয়ামী লীগ ১৭৩ দিন হরতাল এবং সংসদ থেকে সম্মিলিত পদত্যাগ করে বিএনপি সরকারকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারাধীনে নির্বাচন দিতে রাজি করিয়েছিল। তবে বিএনপি রাস্তার আন্দোলনে নতি স্বীকার করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার দেয়নি। দলটি সাংবিধানিক আইন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার দিতে রাজি হয়। কিন্তু সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় সরকার আরেকটি যেনতেন নির্বাচন (ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচন) করে ওই সংসদে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিল পাশ করে সংসদ ভেঙে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দেয়।

তবে ১৯৯৬ সালের সার্বিক পরিস্থিতির চেয়ে বর্তমান সময়ের নির্বাচনি পরিস্থিতি অনেক খারাপ। ওই সময় আওয়ামী লীগ মাগুরা উপনির্বাচনের পর ঘোষণা দেয়, দলটি বিএনপি সরকারের অধীনে আর কোনো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে না। মাগুরা নির্বাচনের পর যেসব সংসদীয় উপনির্বাচন হয়েছিল, আওয়ামী লীগ সেসব নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি। এ কথা সত্য, মাগুরা নির্বাচনে সরকারদলীয় নেতাকর্মীরা বাড়াবাড়ি করেছিলেন। কিন্তু অন্য বড় দলগুলো যে সেখানে শক্তি প্রদর্শন করেনি, এমন নয়। আওয়ামী লীগ এবং জাতীয় পার্টি তাদের প্রার্থীদের পক্ষে যথেষ্ট শক্তি প্রয়োগ করেছিল। এ কারণে মোহাম্মদপুর উপজেলার ২০টি ভোটকেন্দ্রে জাতীয় পার্টির প্রার্থী সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়েছিলেন। ওই উপনির্বাচনে কেবল সরকারি দল ভোট কাটেনি। এর পক্ষে প্রকাশিত প্রমাণ রয়েছে। যেমন, ওই নির্বাচনে তিনটি ভোটকেন্দ্রে সন্ত্রাসজনিত কারণে সংশ্লিষ্ট প্রিসাইডিং অফিসাররা ভোটগ্রহণ বন্ধ করেন।

উল্লেখ্য, প্রিসাইডিং অফিসারকে ভোটগ্রহণ বন্ধ করতে হলে নির্বাচনি নিয়মানুযায়ী লিখিতভাবে রিটার্নিং অফিসারকে জানাতে হয়। উল্লিখিত তিনটি ভোটকেন্দ্রের একটি ছিল কুল্লিয়া হাইস্কুল। ওই কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার মো. শামীম হায়দার রিটার্নিং অফিসারকে ভোটগ্রহণ স্থগিতকরণ প্রসঙ্গে প্রদত্ত চিঠিতে লিখেন,-‘ভোটগ্রহণ সকাল ৮টা থেকে শুরু হইয়া চলিয়া আসিতেছিল। হঠাৎ বেলা ১টার সময় ১০/১৫ জন সশস্ত্র যুবক জোরপূর্বক ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করেন এবং পিস্তল ধরিয়া আমাকে রুমের মধ্যে আটকাইয়া রাখে এবং জীবননাশের বিভিন্ন রকম হুমকি দিতে থাকে। তাহারা ভোটকেন্দ্রের বিভিন্ন বুথে প্রবেশ করিয়া জোরপূর্বক সিল মারিয়া বাক্স ভর্তি করিতে থাকে। কিছু মুড়ি বইও তাহারা জোরপূর্ব্বক নিয়ে নেয়।’ একই চিঠির শেষদিকে তিনি লিখেন, ‘তার কিছু সময় পরেই প্রায় ১৫০০-২০০০ (আনুমানিক) মানুষ আবার আমাকে আটকাইয়া ফেলিয়া ভয়ভীতি প্রদর্শন করিতে থাকে এবং তাহারা জোরপূর্ব্বক ব্যালট বাক্সে সিল মারা ব্যালট পেপারসমূহ বাহির করিয়া পোড়াইয়া ফেলে’ (পূর্ণ চিঠির জন্য দেখুন Electoral Corruption in Bangladesh, Ashgate, 2001, Routletge, 2019)। চিঠিটি প্রমাণ করে, মাগুরা উপনির্বাচনে কেবল সরকারি দল বাড়াবাড়ি করেনি। অন্য দলও ভোট কাটাকাটিতে জড়িত ছিল। তা না হলে যারা বেলা ১টার সময় সশস্ত্রভাবে এসে প্রিসাইডিং অফিসারকে জিম্মি করে ব্যালট পেপারে সিল মেরে বাক্সে ভরেছিলেন, তারা নিশ্চয়ই আবার পরে এসে সে ভোট ব্যালট বাক্স থেকে বের করে পুড়িয়ে ফেলবেন না। কমপক্ষে এখানে দুই দল নির্বাচনি সন্ত্রাসে জড়িত ছিলেন। এমন একটি উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে যদি ওই সময়ের বিরোধী দল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন করতে পারে, তাহলে প্রশ্নবিদ্ধ দশম এবং নৈশভোটের একাদশ সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপিসহ যেসব রাজনৈতিক দল দলনিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে আন্দোলন করছে, তাকে অযৌক্তিক বলা যায় না।

যে দল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচনের দাবিতে অন্য কতিপয় দলকে সঙ্গে নিয়ে ১৭৩ দিন হরতাল করে দাবি আদায় করেছিল, সে দলটিই অসাংবিধানিক ফখরুদ্দিন সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নবম সংসদ নির্বাচনের পর সরকারে এসে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল করে দেয়। সর্বসম্মতভাবে গৃহীত তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থে বাতিল করা হয় এককভাবে। এমনভাবে সংবিধান সাজানো হয়, যাতে ভবিষ্যতে অন্য কোনো দল ক্ষমতায় আসতে না পারে। এরপর বিরোধী দলগুলোর ওপর চালানো হয় রাজনৈতিক নিপীড়ন ও মামলা-হামলা। দুবার প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন করে সরকার ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করে। প্রশাসন ও পোশাকধারী বাহিনী ব্যবহার করে যেভাবে সরকার দুবার নির্বাচনি প্রহসন করে, তাতে জনগণ ও বিরোধী দলগুলো বুঝতে পারে যে, দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে ওই নির্বাচন জেতা সম্ভব হবে না। এ কারণে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন নিকটবর্তী হওয়ায় এবার অধিকাংশ বিরোধী দল দলীয় সরকারাধীনে নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এ ব্যাপারে পরাশক্তিধর বন্ধু দেশগুলোর কাছ থেকেও দলগুলো পরোক্ষ সমর্থন পাচ্ছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। প্রায় সব গণতান্ত্রিক দেশ বাংলাদেশে অংশগ্রহণমূলক ও অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পক্ষে সরব ভূমিকা পালন করছে। প্রতিবেশী ভারতও জনগণের পাল্স বুঝে সরকারের পক্ষে প্রকাশ্য সমর্থন দেখাচ্ছে না। এ কারণে দলীয় সরকারাধীনে সংসদ নির্বাচনের সরকারি অবস্থান ক্রমান্বয়ে দুর্বল হয়ে আসছে। বিরোধীদলীয় নেতাদের সঙ্গে সরকারদলীয় নেতারা এ প্রসঙ্গে বিতর্কে সুবিধা করতে পারছেন না।

সরকারদলীয় নেতাদের নিজদলীয় তত্ত্বাবধানে সংসদ নির্বাচন করার পক্ষে প্রদত্ত যুক্তি দুর্বল মনে হচ্ছে। অনেক নেতাই তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে ‘দানব’ বলেছেন। তারা বলছেন, এমন সরকার শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করেছিল। সরকারদলীয় নেতারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সমালোচনা করতে গিয়ে বেশিরভাগ সময় ফখরুদ্দিন সরকারের সমালোচনা করেন, যা গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, ওই সরকারটি তো তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছিল না। ওটি ছিল একটি অবৈধ অসাংবিধানিক সরকার। কারণ, ১৯৯৬-পরবর্তী সময়ে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী পাশ হওয়ার পর কীভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হবে, তা সংবিধানের ৫৮ অনুচ্ছেদে লিখিত ছিল। সে নিয়মানুযায়ী ফখরুদ্দিন সরকার গঠিত হয়নি। কেউ যদি ফখরুদ্দিন-মইনুদ্দিনের ২ বছরের সরকারকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বলেন, তাহলে ফজলি আমকে সাগর কলা বলার মতো বড় রকমের ভুল হবে। সরকারদলীয় নেতা-মন্ত্রীরা যদি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সমালোচনা করতে চান, তাহলে তাদের হাবিবুর রহমান এবং লতিফুর রহমান সরকারের সমালোচনা করতে হবে। সে সমালোচনা কমই শোনা যায়। অবশ্য বিচারপতি লতিফুর রহমান পদে এসে দ্রুত ১৩ সচিবকে বদলি করে দেওয়ার বিষয়টিকে সরকারদলীয় নেতা-মন্ত্রীরা সমালোচনা করে থাকেন। এ সমালোচনাও গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, এ বদলি সম্পর্কে স্বয়ং বিচারপতি রহমান তার লেখা ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দিনগুলো ও আমার কথা’ শীর্ষক বইয়ে বলেছেন। তিনি বলেন, তিনি জানতেন যে তার হাতে সময় খুব কম। সেজন্য পদে আসার আগেই তিনি হোমওয়ার্ক করে এসেছেন এবং সময় বাঁচাতে কাকে কাকে বদলি করতে হবে তা আগেই ঠিক করে রেখেছিলেন। তার এ কাজকে ওই সময় ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং রাশেদ খান মেনন প্রশংসা করেছিলেন।

বিরাজমান বাস্তবতা এবং গত কয়েকটি সংসদ নির্বাচন দেখার পর নাগরিক সমাজের কাছে এটি স্পষ্ট, অবাধ নির্বাচন করতে নির্দলীয় সরকারের বিকল্প নেই। আর নির্বাচনটি করতে হবে কাগজের ব্যালটে। ইভিএমে নির্বাচন হলে আবার ডিজিটাল কারচুপি হবে। ইভিএমের দোষ নেই। ইভিএম নিষ্পাপ যন্ত্র। যন্ত্র প্রদত্ত কমান্ড পালন করবে। আমেরিকা, জার্মানিসহ আরও কতিপয় প্রযুক্তিসমৃদ্ধ দেশ যখন ইভিএম থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে, তখন প্রযুক্তিঅসচেতন, স্বল্পশিক্ষিত, গরিব ভোটারের দেশে ইভিএমে নির্বাচন করা সমর্থন করা যায় না। গোঁয়ার্তুমি করে ইভিএমে নির্বাচন করতে চাইলে ইসির উচিত হবে গণভোটের মাধ্যমে জনগণের রায় নিয়ে মেশিনে নির্বাচন করা। তবে ওই গণভোটটি অবশ্যই ব্যালট পেপারে করতে হবে। সরকারের নির্বাচন নিয়ে ফন্দিফিকির বিরোধী দল এবং বিদেশি গণতান্ত্রিক দেশগুলো বুঝতে পারছে। সে কারণে নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের দাবিতে অধিকাংশ বিরোধী দল একত্রিত হয়ে আন্দোলন করছে। স্বচ্ছ নির্বাচন করার লক্ষ্যে আন্দোলনরত দলগুলো গণতান্ত্রিক দেশগুলোর কাছ থেকে পরোক্ষ উৎসাহ পাচ্ছে। বিরাজমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির সতর্ক পাঠ বলছে, দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন ক্ষমতাসীন দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা কম। সরকারের পক্ষ থেকে পুরোনো গীত গাওয়া চলছে। উন্নয়ন ফিরিস্তির বর্ণনা, আর সংবিধান থেকে না নড়ার অজুহাত। এ যুক্তি নাগরিক সমাজের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। তারা ভোট দিতে চান। তারা বলছেন, সংবিধান মানুষের জন্য। জনগণের প্রয়োজনে ১৭ বার সংবিধান সংশোধিত হতে পারলে গণতন্ত্র ও স্বচ্ছ নির্বাচনের স্বার্থে আরেকবার সংবিধান সংশোধন করতে অসুবিধা কোথায়? কাজেই দলনিরপেক্ষ অস্থায়ী সরকারাধীনে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি এখন বিবেকবান সুশীলসমাজ ও দেশপ্রেমিক জনগণের কাছে যৌক্তিক মনে হচ্ছে।

 

ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার : অধ্যাপক (এলপিআর), রাজনীতিবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

akhtermy@gmail.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন