বাংলাদেশে এখন ‘উন্নয়নের’ পতাকা উড়ছে

  বদরুদ্দীন উমর ১৪ জানুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের উন্নয়ন
প্রতীকী ছবি। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশে এখন ‘উন্নয়নের’ বন্যা বয়ে যাচ্ছে। সরকারি পদাধিকারী ও সরকারি দলের নেতানেত্রীরা তো বটেই, সেই সঙ্গে সরকারি দল আওয়ামী ঘরানার বড়, মাঝারি ও বেঁটে বুদ্ধিজীবী ও লেখকরা এই উন্নয়নের গীত গেয়ে পত্রপত্রিকার পৃষ্ঠা ভরিয়ে দিচ্ছেন। এ সবের ওপর রিপোর্ট এখন বিভিন্ন পত্রপত্রিকার দৈনন্দিন ব্যাপার। কিন্তু উন্নয়নের ওপর এসব কথাবার্তা এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশের জনগণের অবস্থা শোচনীয় থেকে আরও শোচনীয় হচ্ছে। অর্থনৈতিক অবস্থা সংকটজনক হচ্ছে। বাংলাদেশ বৈদেশিক ঋণের জালে বিপজ্জনকভাবে জড়িয়ে পড়ছে।

এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার আগে এ কথা বলা দরকার যে, অসংখ্য উন্নয়ন প্রকল্প, মেগা প্রকল্প ইত্যাদি তৈরি করা এবং সেগুলো হাতে নেয়া সত্ত্বেও জনগণের জীবনের সামান্য উন্নতির জন্য কোনো মেগা প্রকল্প তো নয়ই, এমনকি কোনো সাধারণ উল্লেখযোগ্য প্রকল্পই সরকারের নেই। কে না জানে যে, বাংলাদেশে এখন শিক্ষা, চিকিৎসা, বস্ত্র, বিশেষ করে শীত বস্ত্র, খাদ্য ইত্যাদির সংকটে দেশের জনগণের অবস্থা চরম দুরবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে। এবার শীত মৌসুমে যে শীত পড়েছে তাতে গরিব মানুষের জীবন বিপর্যস্ত হচ্ছে। কুড়িগ্রাম, রংপুর, দিনাজপুর, রাজশাহী ইত্যাদি উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় তাপমাত্রা ৫ থেকে ২ ডিগ্রিতে নেমে এসেছে। অনেক বৃদ্ধ ও শিশু নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে এবং অনেকের মৃত্যুর খবর সংবাদপত্রে পাওয়া যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সরকারের কোনো প্রকল্প নেই। অথচ এখন প্রয়োজন হল এসব শীত-পীড়িত অঞ্চলে গরিবদের মধ্যে লাখ লাখ শীত বস্ত্র ও কম্বল বিতরণ করা। সামান্য গণতান্ত্রিক চেতনাসম্পন্ন যে কোনো সরকারেরই এদিকে নজর দেয়া প্রয়োজন হলেও বাংলাদেশে এর বিন্দুমাত্র দেখা যায় না। সরকারের যা চরিত্র তাতে উন্নয়ন বলতে তাদের মাথায় যাই থাকুক, গরিবদের জীবনের উন্নতির কোনো প্রকল্প তাদের চিন্তাভাবনায় নেই। তাদের একমাত্র লক্ষ্য বাংলাদেশকে ‘মধ্য আয়ের দেশ’, ‘উন্নয়নশীল দেশ’ ইত্যাদির পর্যায়ে উন্নীত করা। এর জন্য পরিকাঠামোগত প্রকল্প ও মেগা প্রকল্পের ওপরই তাদের সর্বাধিক গুরুত্ব, বলা চলে একমাত্র গুরুত্ব।

কিন্তু সরকার, সরকারি দল, সরকারি প্রশাসনের চরম দুর্নীতির জন্য এই প্রকল্প ও মেগা প্রকল্পগুলোর অবস্থা নিয়ে প্রকৃতপক্ষে গৌরব করার কিছু নেই। ঢাকা শহরে বেশ কয়েকটি ফ্লাইওভার বা উড়ালপুল হয়েছে। কিছুদিন আগে এক সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, এখানে এই ফ্লাইওভারগুলো তৈরির খরচ ভারতের ও চীনের খরচের তিনগুণ, এমনকি পাকিস্তানের দ্বিগুণ! এই বিশাল বর্ধিত ব্যয়ের কারণ যে বেপরোয়া চুরি-দুর্নীতি এতে সন্দেহ নেই। এজন্য দেখা যায় অধিকাংশ প্রকল্পের যে হিসাব প্রথমদিকে তৈরি করা হয়, সেটা অল্পদিনের মধ্যেই দুই-তিনগুণ দাঁড়ায়। পদ্মা সেতু নিয়ে সরকারের ঢাকঢোল পেটানোর অন্ত নেই। এ নিয়ে সরকারের মন্ত্রী-আমলারা যা বলেন, তাদের থেকে বেশি বলেন সরকারের ধামাধরা বুদ্ধিজীবীরা। কিন্তু এর খরচ প্রথমদিকে যেখানে ছিল ১০ হাজার কোটি টাকা, সেটা এখন দাঁড়িয়েছে ৩০ হাজার কোটি টাকায়! এই মেগা প্রকল্পের কাজ ২০১৮ সালের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখন তার অনেক বাকি। তাছাড়া কয়েকদিন আগে সেতুমন্ত্রী আবার বলেছেন ‘পদ্মার নিচে অনিশ্চিত অবস্থার’ কথা! এই ‘অনিশ্চিত’ অবস্থার অর্থ কী? প্রকল্প পরিকল্পনার সময় এই ‘অনিশ্চয়তা’ ধরা পড়েনি কেন? এর কারণ কি প্রকল্প নির্মাণের সময় ঠিকাদার ইত্যাদির অযোগ্যতা এবং দুর্নীতির কারণে অযোগ্য ঠিকাদারদের নিযুক্ত করা নয়? এর দায়িত্ব কার? এর দায়িত্ব কি জনগণের, না বিরোধী দলের? কিন্তু সেতুমন্ত্রী আবার বলেছেন, পদ্মা সেতুর কাজের সার্বিক অগ্রগতি ৫০ শতাংশ! অথচ এ পর্যন্ত সেতুর ৪১টি স্প্যানের মধ্যে মাত্র একটি স্প্যান বসানো হয়েছে এবং দ্বিতীয়টি বসানোর তোড়জোড় চলছে!!

কিন্তু শুধু পদ্মা সেতুই নয়, প্রতিটি প্রকল্পেরই একই অবস্থা। এ ধরনের প্রতিটি প্রকল্পকেই বলা হচ্ছে উচ্চাভিলাষী। কিন্তু ব্যয় নির্ধারণের ক্ষেত্রে উচ্চাভিলাষ ছাড়া এই উচ্চাভিলাষের আর কোনো অর্থ নেই। যেভাবে প্রতিটি প্রকল্পের পরিকল্পনা, ব্যয় নির্ধারণ ইত্যাদি হচ্ছে, দুর্নীতির কারণে সেগুলোর ব্যয় অসম্ভব বেশি এবং কার্যকর হতে বিলম্ব ঘটছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প এর একটি বড় দৃষ্টান্ত। পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মহাবিপজ্জনক এ প্রকল্পটি পরিবেশবিদ থেকে নিয়ে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক মহলের বিরোধিতা সত্ত্বেও সরকার এটি তৈরি করছে। পদ্মা সেতুর মতো এ প্রকল্পটির কাজও শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০১৮ সালের মধ্যে। এ প্রকল্পটির জন্য রুশ সংস্থা রোসাটসের সঙ্গে ১২ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার বা এক লাখ কোটি টাকার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। প্রধানত রুশ অর্থায়নে প্রকল্পটিতে প্রতি মেগাওয়াট বিদ্যুতের মূলধন ব্যয় হবে ৫০ লাখ ডলার। অথচ সম্প্রতি স্বাক্ষরিত একটি চুক্তি অনুযায়ী ভারতে একই দেশ রাশিয়ার নির্মিত কুদানকুলাম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ক্ষেত্রে ব্যয় নির্ধারিত হয়েছে প্রতি মেগাওয়াটে ৩০ লাখ ডলার! (প্রথম আলো, ০৮.০১.২০১৮)। চরম দুর্নীতির কারণেই যে একই ধরনের প্রকল্পে বাংলাদেশে ব্যয় এত বেশি ধার্য করা হয়েছে এতে আর সন্দেহ কী?

এ ধরনের বহু প্রকল্পের ওপর বাংলাদেশ সরকারের সাবেক সচিব ফওজুল কবির খানের একটি রিপোর্ট (প্রথম আলো, ০৮.০১.২০১৮) প্রকাশিত হয়েছে। তাতে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিষয়ে তিনি বলেছেন, সুন্দরবনের জন্য হুমকিস্বরূপ রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী ২০১৬ সালের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু এখন তার নতুন সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২১ সাল! প্রকল্পটির নির্মাণের দায়িত্ব পেয়েছে ভারতীয় কোম্পানি ভারত হেভি ইলেকট্রিক্যাল লিমিটেড। ইন্সটিটিউট অফ এনার্জি ইকনোমিক্স অ্যান্ড ফিনান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের ২০১৩ সালের একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে, এ প্রকল্পের উৎপাদন ব্যয় নানারকম ভর্তুকি সত্ত্বেও বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ের থেকে ৩২ শতাংশ বেশি! তাদের হিসাবে বাংলাদেশকে এ প্রকল্পে কয়লা সরবরাহের জন্য নদীর নাব্যতা বজায় রাখতে বছরে গড়ে ২৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ভর্তুকি দিতে হবে!

রিপোর্টটিতে পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর সম্পর্কে বলা হয়েছে, এ প্রকল্পে ব্যয় হবে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার। ২০১৫ সালে অনুমোদিত এ প্রকল্পটি ২০১৮ সালের মধ্যে বাস্তবায়িত হওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত এর ভৌত অগ্রগতির পরিমাণ ২ দশমিক ১ শতাংশ এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের পুনর্নির্ধারিত সময়সীমা ২০২২ সাল!

শুধু এখানে উল্লিখিত এই প্রকল্পগুলোই নয়, প্রতিটি প্রকল্প ও মেগা প্রকল্পের অবস্থা একইরকম, যার মধ্যে আছে ঢাকা মেট্রোরেল প্রকল্প। ২২ হাজার কোটি টাকার এ প্রকল্পের অগ্রগতি মাত্র ১২ শতাংশ। বলা হচ্ছে, এটি শেষ হবে ২০২০ সাল নাগাদ। বোঝা যাচ্ছে যে, এসব প্রকল্পই ২০১৮ সালে অনুষ্ঠেয় নির্বাচন সামনে রেখে তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু সরকারি লোকদের নিজেদেরই চরম দুর্নীতির কারণে তাদের এই রাজনৈতিক লক্ষ্য ভেস্তে যাওয়ার মতো অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে। আগামী নির্বাচন কীভাবে হবে, কারা তাতে জয়লাভ করে ক্ষমতাসীন হবে এটা এখনও সম্পূর্ণ অনিশ্চিত। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার বড় বড় প্রকল্প বাবদ বেপরোয়াভাবে যে বৈদেশিক ঋণের বোঝা ঘাড়ে নিয়েছে তার দায়িত্ব বর্তাবে পরবর্তী সরকারের ওপর এবং যে জনগণের পকেট মেরে দুর্নীতিবাজরা এসব প্রকল্প তৈরি করেছে, তাদের জীবন আরও দুর্দশাগ্রস্ত ও বিপর্যস্ত হবে। নিজেদের এসব অপকীর্তি আড়াল করার উদ্দেশ্যেই আওয়ামী লীগ সরকার এখন হাস্যকরভাবে উন্নয়নের জয়গান করে বাংলাদেশের আকাশ-বাতাস উতলা করছে।

১৩.০১.২০১৮

বদরুদ্দীন উমর : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter