লেনিনের দেশে পুতিনের বিশ্বকাপ

  আলমগীর স্বপন ০৫ জুলাই ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পুতিন

তখন সময় আর কত হবে? সকাল ৯টা, সাড়ে ৯টা। মস্কো থেকে হাজার মাইল দূরের শহর রোস্তভের ডন নদীর তীর ধরে হাঁটছি। সাজানো গোছানো নদীর পাড়। পর্যটকদের ভিড়ে গমগম করছে। আগের রাতে ব্রাজিল-সুইজারল্যান্ড ম্যাচ দেখেছি ডন নদীর তীরবর্তী রোস্তভ অন ডন স্টেডিয়ামে।

কিন্তু সকালে সেই মহাযজ্ঞের চিহ্ন নেই নদীর পাড়ে। খেলা শেষে ৪৫ হাজার দর্শক ডন নদীর উপরের ব্রিজ দিয়ে শহরে ফিরেছে। অথচ সূর্যের আলো ফোটার আগেই ভেলকিবাজির মতো সব সাফসুতরো হয়ে গেছে।

আকাশে রোদের তেজ থাকলেও হালকা ঠাণ্ডা বাতাসে চনমনে আমরা। গ্রীষ্মকাল হওয়ায় তাপমাত্রা ১৫ থেকে ২১ ডিগ্রির মধ্যে ওঠানামা করছে। তাই শীতের কামড় নেই। এর মাঝে দেখা রুশ কিশোরী দাসার সঙ্গে। ফোর্থ গ্রেডে পড়ে সে। বিশ্বকাপ উপলক্ষে রাশিয়ার কমসোমলস্কায়া থেকে দাদির শহর রোস্তভে এসেছে ইতিহাসের সাক্ষী হতে।

রাশিয়ার দক্ষিণের রাজধানী রোস্তভ অন ডন। জর্জিয়া ও ইউক্রেন সীমান্তবর্তী শহরে প্রথমবারের মতো কোনো আন্তর্জাতিক ম্যাচের আয়োজন। তাও আবার পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল ও সুইজারল্যান্ডের ম্যাচ। তাই ‘রথ দেখা ও কলা বেচা’র উপলক্ষ পেয়ে দাসা তার পরিবারসহ চলে এসেছে দাদির পিতৃভূমিতে।

‘এক ঢিলে কয়েকটি পাখি মারা’র সেই লক্ষ্য অনেকটা পূরণ হয়েছে বলে জানাল দাসা। আগের রাতে ব্রাজিল-সুইজারল্যান্ড ম্যাচে তার পছন্দের দল ব্রাজিল জিতলে অবশ্য ষোলোকলা পূর্ণ হতো বলে একটু অতৃপ্তিও ঝরল তার কণ্ঠে। পাশেই বসে ছিলেন দাদি। তার নাম ভলানতিনা। দাসার কথা শুনে হাসলেন। সান্ত্বনা দিলেন নাতনিকে।

সে রুশ ভাষায় কথা বলায় এর মর্ম বুঝলাম দাসার অনুবাদে। স্বেচ্ছায় সে কথা বলায় সুযোগ বুঝে দাসার মাধ্যমে জানতে চাইলাম, ‘কেমন আছে রশিয়া?’ এ কথা বলায় একটু চুপ মেরে গেলেন সত্তর বছর বয়সী বৃদ্ধা ভলানতিনা। খুব ছোটবেলায় স্তালিনের লৌহকঠিন কমিউনিস্ট শাসন দেখেছেন।

নিকিতা ক্রুশ্চেভ, ব্রেজনেভের শাসন পেরিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন দেখেছেন গর্বাচেভের ‘গ্লাসনস্ত’ ও ‘পেরেস্ত্রইকা’য়। বরিস ইয়েলৎসিন আমলের নৈরাজ্যের শাসনের পর শুরু পুতিন যুগ। সমাজতন্ত্র থেকে পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় উত্তরণের দীর্ঘ এই পথ নিয়ে কী থেকে কী বলবেন, একটু ভেবে নিলেন ভলানতিনা।

তবে উত্তর দিলেন অল্প কথায়। কূটনীতিকের মতো করে বললেন, ‘এখন আমরা ভালো আছি, তবে আরও ভালো থাকতে পারতাম।’

নাতনি দাসা অবশ্য এর বিস্তর ব্যাখ্যায় গেল। নিশ্চুপ থাকল না। মাত্র ফোর্থ গ্রেডের ছাত্রী হলেও ঠিকই জানে নিজের দেশের রাজনীতির ইতিহাস। বলল, ‘আমাদের এখন সক্ষমতা বেড়েছে। যেখানে সেখানে অবাধে যেতে পারি, ঘুরতে পারি। স্তালিনের শাসনের সময় এসব ক্ষেত্রে নানা সমস্যা ছিল।’

তাহলে সমাজতন্ত্র কি যুৎসই ছিল না সোভিয়েত ইউনিয়নের জন্য? এ কথায় দাসা ‘না’ সূচক মাথা নাড়ায় কিছুটা অবাক হলাম। বলল, ‘১৯১৭-এর বলশেভিক বিপ্লবের পর আমাদের মহান নেতা ভ­াদিমির ইলিচ লেনিন মাত্র সাত বছর বেঁচেছিলেন। তিনি যদি আরও অনেক দিন বেঁচে থাকতেন, সমাজতন্ত্র কায়েমে তার দর্শন, পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারতেন।

তাহলে ইতিহাস অন্যভাবে লিখিত হতো। দুনিয়াব্যাপী সোভিয়েত ইউনিয়ন শোষণমুক্ত সমাজব্যবস্থার যে বীজ বপন করেছিল, তা ফুলে-ফলে অনেক ফলবতী হতে পারত। কিন্তু তার মৃত্যু কমিউনিস্ট শাসনকে ভুল পথে চালিত করেছে। সর্বহারা মানুষের শাসনের চেয়ে কিছু নেতার শাসনে ভুল বার্তা পেয়েছিল রুশ জনগণ। তলে তলে সেই ভুলগুলো জড়ো হয়ে ৭০ বছর পর পতন ঘটিয়েছে সোভিয়েতের।’ খুব কম কথায় পরাক্রমশালী কমিউনিস্ট রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের কিছু কারণ জানাল দাসা।

একইভাবে ভ্লাদিমির পুতিনের নেতৃত্বাধীন বর্তমান রাশিয়ার অবস্থাও ব্যাখ্যা করল ছোট্ট দাসা। তার মতে, ‘পুতিনের নেতৃত্বে আমরা হারানো গৌরব ফিরে পেয়েছি। শাসক হিসেবেও খারাপ না। বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন। কিন্তু আমরা যুদ্ধ চাই না। এর মাধ্যমে ক্ষমতা বিস্তারই যদি লক্ষ্য হয় তাহলে রাশিয়ার অবস্থা খারাপের দিকেই যাবে।’

এ কথা বলে দাসা আবারও লেনিনের কাছে ফিরে গেল। বলল, ‘রুশ বিপ্লবের পর একদলীয় শাসনব্যবস্থা কায়েম হলেও লেনিন চেয়েছিলেন জনগণের শাসন। সর্বহারার শাসন। জনগণকে ক্ষমতায়িত করতে চেয়েছিলেন। পুতিন শাসক হিসেবে ভালো হলেও এ ক্ষেত্রে তার ঘাটতি আছে।’

বিশ্বকাপের খেলা দেখতে এসে রাজনীতির আলাপ আর না বাড়িয়ে বিদায় নেই দাসার কাছ থেকে। সেদিন বিকালে রোস্তভ ছেড়ে রওনা দেই রাজধানী মস্কোর পথে। রোস্তভ থেকে মস্কোর ভনুকোভা বিমানবন্দর প্রায় আড়াই ঘণ্টার পথ। বিমানের ভেতরজুড়ে বিশ্বকাপের রং। কেউ ব্রাজিলের জার্সি গায়ে কেউ সুইজারল্যান্ডের।

আর্জেন্টিনা-ইতালির জার্সি পরিহিতও আছেন কেউ কেউ। নিজেদের মধ্যে আলাপ জমিয়েছেন। নিজেদের ভাষায় তাদের আলাপ-সালাপ না বুঝলেও এর বিষয়বস্তু যে শুধুই ফুটবল তা বুঝতে বাকি থাকে না। এর মাঝেই আমরা পৌঁছে যাই মস্কোর ভনুকোভা বিমানবন্দরে।

বিশ্বকাপ উপলক্ষে পৃথিবীর নানা প্রান্ত, দেশ থেকে আসা মানুষ ঘাঁটি গেড়েছে মস্কোয়। সেখানে থেকে প্রিয় দেশের খেলা দেখতে ছুটে যাচ্ছেন বিভিন্ন ভেন্যুতে। তবে রাশিয়ায় শুধু তারা খেলা দেখতেই আসেননি। দুনিয়ার সবচেয়ে বড় দেশটির বিশালত্ব ও একসময়ের কমিউনিস্ট শাসনের নানা স্থাপত্যও আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু পর্যটকদের কাছে।

তা না হলে প্রতিদিন রুশ বিপ্লবের ঐতিহাসিক স্থান মস্কোর রেড স্কোয়ারে কি লাখো মানুষের ভিড় জমে? রুশ বিপ্লবের জনক ভ­াদিমির ইলিচ লেনিনের সমাধি দেখতে কি প্রতিদিন হাজারও মানুষ লাইন ধরে?

বিশ্বকাপ দেখতে আসা পর্যটকদের ভিড়ে, তাদের শরীরে জড়ানো দেশের পতাকার রঙের জার্সিতে রেড স্কোয়ার সত্যিই রংধনুতে পরিণত হয়েছে। নানা বর্ণের, নানা দেশের, নানা জাতির মহামিলন ঘটেছে ঐতিহাসিক স্থানটিতে। খেলা রাশিয়ার যেখানেই হোক, মস্কো থেকে ৪০০ কিংবা ২০০০ কিলোমিটার দূরের স্টেডিয়ামে, পর্যটকদের ৯০ ভাগই একবারের জন্য হলেও রেড স্কোয়ার ঘুরে গেছেন, যাচ্ছেন।

বিশেষ করে লাইন ধরে ঘণ্টাখানেক অপেক্ষা করে অনেককে ফিরতে হয়েছে লেনিনের সমাধি না দেখেই। প্রথম দিন রেড স্কোয়ার ঘুরে, সেখানকার সেন্ট বেসিল’স ক্যাথেড্রালের সামনে ছবি তুলে লেনিনের সমাধি খুঁজতে থাকি। এক প্রহরীর শরণাপন্ন হলে দূরের বিশাল এক লাইনের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করলেন। সেখানে গিয়ে দেখি সামনে হাজারখানেক মানুষ।

দাঁড়িয়ে যাই। লাইনে দাঁড়িয়ে আছি, ২০ মিনিট পর এক কর্মচারী জানান দিলেন, লেনিনের সমাধি চত্বরে ঢোকার সময় আছে আর মাত্র ৪০ মিনিট। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত লেনিনের সমাধি দেখার সুযোগ দেয়া হয়। কিন্তু নিয়মটি না জানায় আমরা রেড স্কোয়ারের খোলা চত্বর, পাশের শপিংমলে সময় বেশি কাটাই।

তাই আফসোস নিয়ে ভাবতে থাকি এই ৪০ মিনিটে সামনের হাজারখানেক মানুষকে পেরিয়ে কি ঢোকা যাবে? লেনিনের সমাধি দেখার জন্য যে আবেগ, উৎসাহ ও উত্তেজনা নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়েছিলাম তাতে জল ঢেলে দেয় সেই কর্মচারীই। দুপুর ১টা বেজে গেছে। বলল, সময় শেষ। তখনও প্রায় ৮০০ পর্যটক দাঁড়িয়ে লাইনে।

বিফল মনোরথে ঢুকে পড়ি পাশের ঐতিহাসিক জাদুঘরে। জারের শাসন থেকে কমিউনিস্ট সোভিয়েতের স্মৃতিসম্ভার জাদুঘরজুড়ে। রুশ জাতির সমৃদ্ধ ইতিহাস, সংগ্রাম গাথা দেখা হয়ে যায় এ জাদুঘরে।

এরপরও লেনিনের সমাধি দেখতে না পারায় মন খারাপ নিয়ে ফিরলাম লুভলিনোতে। সেখানকার সবুজ ম্যাপললিফে ঘেরা ২২, এস্ত্রাপোলস্কায়ার যে বাড়িটিতে উঠেছি, রাতটা সেখানে কাটিয়ে সাত সকালে আবার রওনা হয়ে যাই মেট্রোতে। আধঘণ্টার যাত্রা শেষে রেড স্কোয়ার পৌঁছতে পৌঁছতে ১১টা বেজে যায়।

সামনে প্রায় দেড়-দু’হাজার পর্যটকের লাইন। তবে এ দফায় দু’ঘণ্টা সময় হাতে থাকায় শেষ মুহূর্তে লেনিনের সমাধিস্থলে ঢুকতে পেরেছিলাম। তিনতলা যে ঘরটিতে লেনিনের মোমি করা মরদেহ রাখা আছে এর বাইরে নজরে আসে স্তালিন, ক্রুশ্চেভসহ সোভিয়েত আমলের কমিউনিস্ট নেতাদের কবর।

সেখানে বিশেষ করে স্তালিন ও ক্রুশেভের কবরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাচ্ছে পর্যটকদের অনেকে। তবে রেড স্কোয়ারে সমাদৃত অক্টোবর রুশ বিপ্লবের জনক লেনিন। লেনিনের নেতৃত্বে একশ’ বছর আগে ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লব পাল্টে দিয়েছিল পৃথিবীর মানচিত্র। দুনিয়ার অনেক দেশে কায়েম হয়েছিল সমাজতন্ত্র। সোভিয়েতের পতনের পর পরিস্থিতি পাল্টেছে। তবে রুশ জনগণ ভোলেনি তাদের মহান নেতাকে।

মস্কোর ঐতিহাসিক রেড স্কোয়ার, যেখানে লেনিনের নেতৃত্বে বিজয়ের ঝাণ্ডা উড়েছিল বিপ্লবের, সেখানে মমি করে রাখা হয়েছে তার মরদেহ। খয়েরি রঙের তিনতলা সমাধিসৌধের সব দ্বারেই কড়া প্রহরা। যারা ঢুকছেন তাদের প্রত্যেককেই স্যুট-টাই পরা প্রহরীরা জানিয়ে দিচ্ছেন, ‘ভেতরে কোনো ছবি তোলা যাবে না।’ উপর থেকে এক সিঁড়ি নিচে নামতেই আলোকিত এক ঘরে লেনিন। শুয়ে আছেন শোষণমুক্ত সমাজ গড়ার অগ্রসৈনিক। মনে হচ্ছিল বিশ্রামে আছেন। ঘুম থেকে উঠেই নেমে পড়বেন সমাজতন্ত্র কায়েমের মূল লড়াইয়ে।

এ ভাবনায় ছেদ পড়ে প্রহরীর ইশারায়। দেখার সময় শেষ। বেরিয়ে যেতে হবে সমাধি থেকে। আফসোস হচ্ছিল- আরও একটু যদি থাকা যেত। যেমন আফসোস থেকেই গেছে সারা দুনিয়ার শোষণমুক্ত সমাজব্যবস্থা কায়েমের রাজনৈতিক কর্মীদের। কারণ রুশ বিপ্লবের পর মাত্র সাত বছর জীবিত ছিলেন লেনিন। ৫৩ বছর বয়সে বিপ্লবের অনেক কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই চলে গেছেন। ঘটেনি মার্কসবাদ-লেনিনবাদের প্রকৃত প্রয়োগ।

১৯৯০-এ সোভিয়েতের পতন ও পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় পদার্পণের পরও এ নিয়ে আফসোস আছে রুশ জনগণেরও। শুধু কি রুশ জনগণ? লেনিন আছেন সারা দুনিয়ার মেহনতি মানুষের লড়াই-সংগ্রামে। রেড স্কোয়ারে লেনিনের সমাধি এক মূহর্তের জন্য দেখতে লাখো মানুষের তাড়না হয়তো এরই সাক্ষ্য দেয়।

তবে লেনিন শ্রমিক-কৃষক-সর্বহারা মানুষের রাজ কায়েমে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নের যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, বিপ্লবে নেতৃত্বে দিয়েছিলেন, সেই পথে এখন আর নেই রাশিয়া। মস্কোর পথে পথে পুঁজিবাদের ছোঁয়া। রেড স্কোয়ার লাগোয়া অনন্য স্থাপত্যের শপিংমল ‘গুম’-এ দুনিয়ার সব ব্র্যান্ডের পোশাক-আশাক, ঘড়ি, জুয়েলারির ব্যবসা জাঁকিয়ে বসেছে। চড়া দামে ব্যবসা করছে চুটিয়ে। কিছুদূর এগোলেই আন্ডারগ্রাউন্ড শপিংমল। সেখানেও ভিড়বাট্টা লেগে আছে।

পোশাকে, আচার-আচরণে পাল্টে গেছে অনেকের জীবন। আবার লেনিনগ্রাদ মেট্রোতে দেখা গেল রুশ ভাষায় গান গেয়ে, গিটারের ঝংকার তুলে রুবল কামাই করছেন দুই তরুণ। সোভিয়েত ইউনিয়ন আমলের শেষদিকে মস্কোয় গেছেন, গর্বাচেভ-ইয়েলৎসিনের পুতিনের শাসন দেখেছেন এমন একজন বাঙালি প্রকৌশলী সোহরাব হোসেনের সঙ্গে কথা হল পাল্টে যাওয়া রাশিয়া নিয়ে।

মস্কোর বেদেনখা মেট্রো থেকে তার গাড়িতে চড়ে আমরা এগোচ্ছিলাম পিপলস ফ্রেন্ডশিপ বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে। প্রায় দেড় ঘণ্টার পথ। এর মাঝে মাঝে তিনি দেখাচ্ছিলেন সোভিয়েত আমলের নানা স্থাপনা। বেদেনখায় এক চত্বরে দেখা গেল সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট ব্যবস্থার স্মারক কাস্তে-হাতুড়ি নিয়ে আগুয়ান এক নারী ও তরুণের বিশাল মূর্তি।

স্তালিনের বাহিনীর হাতে যে স্থানে একদিনে হাজারখানেক প্রতিবাদী মানুষ নিহত হয়েছিল সেই শাখার এভিনিউতে একটু স্লথ হল আমাদের গাড়ি। দূর থেকে প্রকৌশলী সোহরাব দেখালেন স্তালিনের নৃশংসতার স্থানটি। আমরা এগিয়ে যাই রুশ ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু ক্রেমলিনের কাছাকাছি।

বিশ্বরাজনীতিতে ছড়ি ঘোরানোর নানা ছক কষা হয় যে স্থানে সেই কেজিবি ভবনের সামনে চলে আসি। লুবিয়াঙ্কা স্কোয়ারের গোল চত্বর ঘুরে দেখলাম রুশ গোয়েন্দা সংস্থার ঘিয়া রঙের ভবনটি। তবে সেখানে নিরাপত্তার খুব একটা বাড়বাড়ন্ত ছিল না। রেড স্কোয়ার পেরিয়ে মস্কোভা নদীর তীর ঘেঁষেই অবস্থান ক্রেমলিনের। যেখানে বসবাস বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের। পুরনো আমলের স্থাপত্যের ঐতিহাসিক ক্রেমলিন ভবনে থেকেই সারা দুনিয়ায় কলকাঠি নাড়েন পুতিন।

আমরা সামনে এগোই। ক্রেমলিনের প্রায় উল্টোপাশে মস্কোভা নদীর অন্য পাড়ে সবুজে ঘেরা গোর্কি পার্ক। মাক্সিম গোর্কি, অন্যতম প্রধান এই রুশ সাহিত্যিকের নামে পার্কটি তৈরি হয়েছে ১৯২৮ সালে। বেশখানিকটা এগোতেই এ পথেই বিজ্ঞান একাডেমি পেরিয়ে চোখে পড়ে লুঝনিকি স্টেডিয়াম। মস্কোভা নদীর তীর ঘেঁষা অনন্য সুন্দর স্থাপত্যশৈলীর এ স্টেডিয়ামেই হবে বিশ্বকাপের ফাইনাল।

যেখানে সুরাহা হবে বিশ্ব ফুটবলে নতুন কোনো চ্যাম্পিয়ন আসছে নাকি পুরনো চ্যাম্পিয়নদের হাতেই উঠবে বিশ্বকাপ। তখন স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৮টা। অন্ধকার নামেনি। গ্রীষ্মে রাত ১০টায়ও অন্ধকার নামে না মস্কোয়। এর মাঝেই জ্বলজ্বল করতে থাকা লুঝনিকি স্টেডিয়াম পেরিয়ে যাই। সবুজে ঘেরা মস্কো বিশ্ববিদ্যালয় পেরিয়ে এগোতে থাকি সাজানো-গোছানো মস্কো শহরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে।

পিপলস ফ্রেন্ডশিপ বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে আসি আমরা। এখানে প্রকৌশলী সোহরাবের কাছে আবারও জানতে চাই, সোভিয়েত আমলের যে চিত্র আমরা জানতাম এর কতটা পাল্টেছে? তিনি জানালেন, ‘যে পথে এলাম, এই পথে অনেক শপিংমল, হাইরাইজ বিল্ডিং দেখেছেন। বিশ্বখ্যাত নানা ব্র্যান্ডের পণ্য ও খাবারের দোকান নতুন করে হয়েছে।

সমাজতন্ত্র থেকে বেরিয়ে পুরোপুরি পুঁজিবাদের পথে এখন রাশিয়া। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ ও ভোগবাদী পথেই এখন তারা। রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই আলগা হয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য ব্যক্তিমালিকানায় এসেছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের শেষদিকে একখণ্ড পাউরুটি আর দুধের জন্য রুশদের লাইন ধরতে হতো রেশনের দোকানে। খাদ্য সংকটে থাকা সেই সোভিয়েত আর নেই, পাল্টে গেছে।

সাইবার যুদ্ধে এগিয়ে থাকা, সামরিক শক্তি বৃদ্ধির পাশাপাশি খাদ্য উৎপাদনেও পিছিয়ে নেই এখন রাশিয়া। পরাশক্তি হিসেবে পুতিনের নেতৃত্বে আবারও বিশ্বমঞ্চে রুশরা। সাইবার যুদ্ধের মাধ্যমে চিরশত্রু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ক্ষমতায় আনার অভিযোগ দেশটির দিকে। এমন রুশ পরাক্রমে সাধারণ রাশিয়ানরা অবশ্য খুশি। তাই নির্বাচনে একতরফা বিজয়, পুতিনের একনায়কতান্ত্রিক শাসনেরও বড় বিরোধিতা নেই।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অবরোধে অবশ্য মন্দা যাচ্ছে রুশ অর্থনীতিতে। এর প্রভাব পড়ছে ব্যবসা-বাণিজ্যে। মস্কোয় থাকা প্রায় সাড়ে তিন হাজার বাঙালিও এর শিকার। তবে বিশ্বকাপের স্বাগতিক হওয়ায় সেই পরিস্থিতি পাল্টে যাচ্ছে বলে জানালেন ব্যবসায়ী ও রাজনীতিক মোহাম্মদ সালাউদ্দিন। বিশ্বকাপ গতি ফিরিয়েছে রুশ অর্থনীতিতে। আসলে ফুটবল বিশ্বকাপ তো এমনই।

যুদ্ধবিগ্রহ ফেলে সারা দুনিয়ার মানুষ মজে আছে ফুটবলে। যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা থেমে থাকার পাশাপাশি রাশিয়ার ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপিয়ান দেশগুলোর হুমকি-ধমকিতে যতি পড়েছে। বিশেষ করে এক রুশ গোয়েন্দার ওপর হামলা নিয়ে যে চাপানউতোর গেল লন্ডন ও মস্কোর মাঝে, তাতে আপাতত ছেদ পড়েছে।

১৯৬৬’র বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ড বিভোর এখন বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নে। আর এর সুযোগ নিয়েছেন কৌশলী পুতিন। কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাওয়ার এই মিশনে অনেকটা কামিয়াবও বলা যায় চতুর পুতিনকে। বিশ্বকাপ ফুটবলকে সাধে তো আর বলা হয় না, ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’। যেখানে মাঠের যুদ্ধে এক হয়ে যায় পুরো বিশ্ব, বাইরের যুদ্ধেও ঘুচে যায় বিভেদ, আনে ঐক্য।

আলমগীর স্বপন : সাংবাদিক

[email protected]

ঘটনাপ্রবাহ : বিশ্বকাপ ফুটবল ২০১৮

 

 

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter