ঘুঁটির চালটা বোধহয় ভুল হয়ে গেল

প্রকাশ : ২৪ জুলাই ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  এ কে এম শাহনাওয়াজ

ফাইল ছবি: যুগান্তর

ঘুঁটির চাল একবার ভুল হয়ে গেলে ক্ষতি পোষানো যে কতটা কঠিন- মুখে না বললেও বিএনপি নেতারা তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন। ঘাটে ঘাটে ভুল করেছে বিএনপি। আগের সব খেরোখাতা না হয় লাল সালু দিয়ে বেঁধে রাখলাম।

২০১৪-এর নির্বাচনকে তো আর চোখ বন্ধ করলেই ভুলে থাকা যাবে না! ভুলের ওপরেও তো ভুল হয়। নির্বাচন ঠেকানোর নামে যে চরম সন্ত্রাসের আগুন ছড়িয়ে দেয়া হয়েছিল, তাতে সাধারণ মানুষ যতটা পুড়েছিল এর চেয়ে বেশি দগ্ধ হয়েছিলেন বিএনপির শুভবুদ্ধির নেতারা। তারা কী-ই বা করতে পারতেন! জামায়াতের এজেন্ডা ছিল মাঝপথে যুদ্ধাপরাধীর বিচার থামিয়ে দিয়ে ক্ষমতার কাছাকাছি এগিয়ে আসা।

পাঠকের নিশ্চয় মনে আছে সেই মহাসন্ত্রাসের সময়টাতে মাঠে সক্রিয় ছিল বিএনপি-ছাত্রদলের চেয়ে শিবিরের সন্ত্রাসীরা। আমাদের কথার দাম-ই বা কতটুকু! সে সময়ে কলাম লিখে বিএনপি নেতাদের সতর্ক করেছিলাম যে, এটি ছিল জামায়াতের দূরদর্শী চাল। পাঠক নিশ্চয় স্মরণ করতে পারবেন সে সময় বিএনপি নেত্রীর জনসভায় লোক আনা থেকে সার্বিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব অনেক ক্ষেত্রে জামায়াত নিয়ে নিত। বিনিময়ে সভামঞ্চের সামনের অনেকটা অংশ দখলে থাকত জামায়াতের।

এ নিয়ে ছাত্রদলের সঙ্গে মনকষাকষিও কম হয়নি। বিএনপি নেতারা সময়মতো এসব ষড়যন্ত্র হয়তো বুঝতে পারেননি। নয়তো নেতৃত্বের দ্বৈত শাসনে কুপোকাত ছিলেন। তাই এ কয় বছরেও ‘কাত’ থেকে সোজা হতে পারলেন না।

বিএনপির এ পরিণতি না হয় অঙ্কের হিসাবে মেলানো যায়; কিন্তু আওয়ামী লীগের ভুলের অঙ্ক তো মিলছে না কোনোভাবে। এখানে তো দ্বৈত শাসনের চাপ নেই। আওয়ামী লীগের নেতা-নেত্রীরা নিজ ভারেই নিজেরা ভারাক্রান্ত? ছেলেবেলা থেকেই শুনেছি আত্মবিশ্বাস ভালো, তবে অতি আত্মবিশ্বাস পতনের দিকে টেনে নিয়ে যায়। আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব কি এখন অতি আত্মবিশ্বাসী? বাগধারায় একটি শব্দ ছিল ‘পায়াভারি’। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বেরও কি ভায়াভারি দশা? ‘কী হনুরে’ ভাব যেন চারদিকে।

নেতা-নেত্রীদের ভাষায় মোটেও মার্জিত রূপ দেখা যাচ্ছে না। শিক্ষক, সুধী সমাজ থেকে ছাত্র যারাই সরকার পরিচালকদের মনের মতো করে, সরকারদলীয় ছাত্র-শিক্ষকদের মতো করে- একই সুরে- একই শব্দে কথা বলছেন না, তাদের মুহূর্তেই বিরোধী দলের এজেন্ট আর জামায়াত-শিবির বানিয়ে দিচ্ছেন।

অথচ এদেশের লাখ লাখ মানুষ আছে যারা আওয়ামী লীগ কিংবা ছাত্রলীগে যুক্ত নন; কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করেন, তাদের পক্ষে জামায়াত, বিএনপি বা জাতীয় পার্টি হয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বকে পছন্দ না করলেও নিরুপায় হয়ে নৌকার বাক্সেই ভোট দেয়ার কথা।

কিন্তু বেলাশেষে দেখা যাচ্ছে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের হামবড়াভাব এতটা বেড়ে গেছে যে, বন্ধু বাড়ানো দূরের কথা হাত বাড়ালেই যাদের বন্ধু করা যায়- তাদের শত্র“তে পরিণত করছেন। এমন ভাবনার সূত্র আমাকে শঙ্কিত করল দিন কয়েক আগে। ওরা আমার খুব পরিচিত, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী- সাংস্কৃতিক কর্মী। ২০১৪ সালে বিএনপি-জামায়াতের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে পথনাটক করে ঘৃণা জানিয়েছে। ওদের চোখেমুখে প্রত্যয়।

 

দেশপ্রেমের শক্তি অনুভব করে নিজেদের মধ্যে। কোটা আন্দোলনের মতো একটি নিরীহ আন্দোলন নিয়ে অহেতুক খেলতে গিয়ে এই স্বাধীন দেশের তরুণদের যেভাবে বিভাজিত করা হচ্ছে, সরকারবিরোধী চক্রান্তকারী হিসেবে প্রতিপন্ন করা হচ্ছে তা আমাকে চমকে দিল। আমি দেখেছি এ শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাস থেকে ছাত্রশিবির বিতাড়িত করে নিজেদের গর্বিত মনে করে। ওদের অনেকেরই পরিবার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত ছিল।

ঢালাওভাবে তাদের রাজাকার তকমা পরিয়ে দিলেন, এখনও দিয়ে যাচ্ছেন সরকারের দায়িত্ববান মন্ত্রীরা। মানসিকভাবে আহত এ শিক্ষার্থীদের কয়েকজন সেদিন এলো। বলল এবার প্রথম ভোটার হয়েছি। কত শখ ছিল আনন্দ করে ভোট দেব। নৌকা ছাড়া আমাদের বিকল্পও নেই অন্য কোনো প্রতীকের পক্ষে থাকা। ছাত্রলীগের সন্ত্রাসে আমরা ক্যাম্পাসে বরাবরই বিপন্ন।

আর এ বাস্তবতায় আওয়ামী লীগের নেতা-নেত্রীরা যদি আমাদেরই অরাজকতা সৃষ্টিকারী আর জামায়াত-শিবিরের তিলক কপালে পরিয়ে দেয় তো আমাদের পক্ষে নৌকায় ভোট দেয়া কঠিন হয়ে পড়বে। আমি ভেতরে ভেতরে চমকে গেলাম। মুখে বললাম, যদিও তোমাদের ব্যক্তিগত বিষয় তবুও যুক্তির কারণেই জানতে চাই তাহলে কোন প্রতীকে ভোট দেবে? ওরা জানাল ওদের আর কোনো অপশন নেই। প্রথমবার ভোটার হয়েও ভোটদানে বোধহয় বিরতই থাকতে হবে।

এ সত্যটি আমাকে ভাবিয়ে তুলল। ওরা মুখ ফুটে না বললেও এমনটিই ছিল আমার হিসাব। আওয়ামী লীগ অন্য কোনো উপায়ে যদি নির্বাচনে জেতার পথ পরিষ্কার না করে তাহলে বলা যায় নিগৃহীত ছাত্রছাত্রী এবং তাদের অভিভাবকদের অসংখ্য ভোট আওয়ামী লীগ অবশ্যই হারাবে। এবং এটিই হয়তো আগামী নির্বাচনে অনেক ক্ষেত্রে ফলাফল নির্ধারণের নিয়ামক হবে।

আমাদের পোড়খাওয়া রাজনীতিকদের এ সত্যটি নিশ্চয় অজানা নয় যে, সরকারের এতসব দৃশ্যমান উন্নয়ন এদেশের বাস্তবতায় ভোটের রাজনীতিতে খুব বড় প্রভাব ফেলবে না। সাধারণ মানুষের ভোটে প্রভাব ফেলে নিত্যদিনের দুঃখ-আনন্দ। পারিবারিক জীবনে হয়তো কিছুটা অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্য এসেছে; কিন্তু এ আনন্দের চেয়ে তিনি কষ্ট পাচ্ছেন সরকারদলীয় জনপ্রতিনিধিদের নানা ধরনের অত্যাচারে।

এমপি থেকে শুরু করে মেয়র-কাউন্সিলর পর্যন্ত পৌঁছতে নানা ধাপ পেরোতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়ে অভিযোগ জানাতে আসা মানুষ। ঘুষ-দুর্নীতির অক্টোপাস সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধতা বাড়াতে থাকে। ২০০৮-এর নির্বাচনের আগে নির্বাচনী মেনিফেস্টোতে ভোটারকে স্বপ্ন দেখাতে পেরেছিল আওয়ামী লীগ। এবার দলটি দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকায় মানুষ স্বপ্ন পূরণের খতিয়ান না দেখে স্বপ্নভঙ্গের হিসাব করবে বেশি।

কোটা আন্দোলনের প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে ঢাকা বিশ্বদ্যিালয়ের ভিসি পর্যন্ত সবাই বারবার অবস্থান পরিবর্তন করছেন। আমাদের ক্ষমতাধর নেতা-নেত্রীরা সবসময় নিজেদের বক্তব্যকে বেদবাক্য বলে মনে করেন। ভুল বা ত্র“টি ধরা পড়লে দুঃখিত বলে সরে আসতে শেখেননি। উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপিয়ে হলেও নিজেরাই নিজেদের জিতিয়ে দিতে চান সবসময়।

সরকারি নেতা-মন্ত্রীরা সপ্ত আকাশের ওপরে থাকেন বলে মাটির মানুষদের ঠিকমতো দেখতে পারেন না। তাদের হয়ে যাদের দেখার কথা তারাও মনে হয় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ভাষা ও ভালোলাগা বিবেচনা করে সেই মতো রিপোর্ট দেন। যেমন বিশ্ববিদ্যালয়ের দলীয় ভিসি, দলীয় শিক্ষকরা বিবেক দিয়ে নয়, নেত্রী খুশি হবেন কী বললে সেই সুরে কথা বলেন।

অবাক বিষয়, আওয়ামী লীগের মতো মাঠের রাজনীতি করা দল ছাত্রলীগকে কেমন করে শিবিরের মতো সন্ত্রাসী সংগঠনে পরিণত করছে। কোটা আন্দোলনকে থামানোর জন্য যেভাবে এ তরুণদের পেটোয়া বাহিনীর মতো মাঠে নামানো হল, শেষ পর্যন্ত কি সামাল দেয়া সম্ভব হবে?

নেতারা যদি ছাত্রলীগের সন্ত্রাসের দায় না নেন, তবে স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন আসবে আন্দোলনকারী ছাত্রছাত্রীদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে অন্যান্য নেতা-মন্ত্রীরা যেভাবে দোষী বানাচ্ছেন, তা তারা পারেন কি? পাশাপাশি বেদনার সঙ্গে লক্ষ করা গেল প্রকাশ্য সন্ত্রাস করা ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের ব্যাপারে একটি টুঁ শব্দও করছেন না কেউ। নাকি ছাত্রলীগের ক্যাডাররা আদিষ্ট হয়ে অমন হিংস্র হয়েছে?

বিস্মিত হলাম ১৯ জুলাই মাননীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে। যদিও এসব কূটমন্তব্যে তাকে তেমন দেখা যায় না। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কূটনীতিকদের কাছে মন্ত্রী যেন কোটা আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে বিচার দিলেন। বিদেশিদের কাছে বিচার দেয়ার অভিযোগ তো ছিল বিএনপির বিরুদ্ধে। আওয়ামী লীগ সরকারের কী এমন করুণ দশা যে, এখন কোটা আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধেও উষ্মা প্রকাশ করতে হয় বিদেশিদের কাছে! নৌ-পরিবহনমন্ত্রী বা খাদ্যমন্ত্রীর নিত্যকার প্রতিক্রিয়ার কথা না হয় বাদই দিলাম। এসব দেশবাসীর গা সওয়া হয়ে গেছে।

ওবায়দুল কাদেরের মতো একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা সেদিন কী বললেন তা আমাদের বোধের অগম্য। ছাত্রলীগের সন্ত্রাস নিয়ে তারা মুখ খুলবেন না বোঝাই যাচ্ছিল। কোটা আন্দোলনকারীদের ওপর ছাত্রলীগের বর্বরোচিত সন্ত্রাস এতটাই প্রকাশ্য যে মুখ খুলতে না চাইলেও সংকট। তাই সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আওয়ামী লীগের এ বাকপটু নেতা বলেই ফেললেন যেহেতু কোথাও ছাত্রলীগের কমিটি নেই, তাই এ সন্ত্রাসকারীদের ছাত্রলীগ বলা যাবে না। ভালো কথা।

যদি তাই হয় তাহলে এ সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কিছু বলা হচ্ছে না কেন? কোটা আন্দোলনকারীদের পুলিশ-র‌্যাব খুঁজে খুঁজে ধরতে পারছে আর এদের টিকি ছুঁতে পারছে না কেন? তাছাড়া আওয়ামী লীগের দুর্বলতাও কি বেরিয়ে আসছে না? এতদিন গেল ছাত্রলীগের কমিটি গঠন করতে পারলেন না দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা। চারপাশটা যেভাবে বৈরী করে তোলা হচ্ছে, এখন তো দেখি ছাত্রলীগ ছাড়া তরুণ প্রজন্মের আর কোনো অংশ আওয়ামী লীগের বা সরকারের পাশে নেই। ভুল নীতিতে সরকার পক্ষই ওদের সরিয়ে দিয়েছে।

আমরা মনে করি রাজনীতির দাবার ঘুঁটিতে এ ভুল চালের খেসারত অনেকটাই দিতে হবে আওয়ামী লীগ ও আওয়ামী লীগ সরকারকে। এর মধ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা কোথাও কোথাও সংঘবদ্ধ হচ্ছে। কোটা সংস্কার আন্দোলন এখন দমন-পীড়নবিরোধী আন্দোলনে রূপান্তরিত হচ্ছে যেন।

দীর্ঘদিন থেকে ছাত্রলীগ ক্যাম্পাসগুলোতে সাধারণ ও ভিন্নমতের শিক্ষার্থীদের ওপর নানাভাবে পীড়ন করে আসছিল। তাই একটি চাপা ক্ষোভ ছিল সবার মধ্যে। অবস্থার এই পরিপ্রেক্ষিত এখন সুযোগ এলেই বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে। আওয়ামী লীগের নেতারা কি ভেবে দেখেছেন নির্বাচনের আগে এতসব সংকট থেকে বেরিয়ে আসা কতটা সহজ হবে?

ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]