মাদকবিরোধী অভিযান : আরও যা করতে হবে

  ড. এম এ মা ন না ন ২৭ জুলাই ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মাদকবিরোধী অভিযান
মাদকবিরোধী অভিযান। ফাইল ছবি

২৪ জুলাই জেলা প্রশাসকদের সম্মেলনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দৃঢ়কণ্ঠে ঘোষণা করেছেন, যুবসমাজকে মাদকের হাত থেকে রক্ষা করতে হবে এবং মাদকবিরোধী অভিযান চলবে। অত্যন্ত আশা-জাগানিয়া কথা।

আগের অনেক সরকারের আমলেই আমরা দেখেছি, ক্ষমতায় গিয়ে নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিরা কথার ফুলঝুরি ছড়াতে থাকেন, অনেক অনেক আপ্তবাক্য বলেন, প্রতিশ্রুতিতে বিশ্ব-চ্যাম্পিয়ন হওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েন কিন্তু বাস্তবে তেমন কিছুই অর্জিত হয় না, জনগণ তাদের কথা ও কাজের মধ্যে সামঞ্জস্যের পরিবর্তে খুঁজে পায় বিশাল ফারাক। এখন নেতৃত্বের বদলের সঙ্গে সঙ্গে নেতাদের কথার মধ্যেও এসেছে বিপুল পরিবর্তন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার দিনবদলের সঙ্গে সঙ্গে সমাজের অনেক অনাকাক্সিক্ষত জিনিসও বদলে দিচ্ছেন। তারই ধারাবাহিকতায় জনগণের কাছে লৌহমানবী নামে এর মধ্যেই সুুপরিচিত বঙ্গবন্ধুর অকুতোভয় কন্যা পিতার মতোই দৃঢ়চিত্তে মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছেন। এ বছরের ৪ মে থেকে শুরু হওয়া এ অভিযানকে আরও বেগবান করার লক্ষ্যে মাঠপর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তাদের মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার জন্য আবারও নির্দেশ দিলেন এবং অভয় দিলেন ডিসিরা যেন বিনা দ্বিধায় সন্ত্রাস ও টেন্ডারবাজিসহ মাদক নির্মূল করেন- কে কোন দল করে, কে কী করে সেগুলো দেখার কোনো দরকার নেই।

তিনি আরও একটি আশাব্যঞ্জক নির্দেশনা দিয়েছেন: ‘যদি কেউ বাধা দেয়, আপনারা সরাসরি আমার সঙ্গে বা আমার অফিসে যোগাযোগ করতে পারবেন।’ তিনি তাদের স্মরণ করিয়ে দেন, ‘সরকারপ্রধান হতে পারি, আমি কিন্তু জাতির পিতার কন্যা, আপনাদের সেটাও মনে রাখতে হবে।’ আমার প্রায় ঊনসত্তর বছরের জীবনে রাষ্ট্রনেতাদের কাছ থেকে এমন ভয় তাড়ানিয়া অভয় বাণী কখনও শুনিনি।

তিনি অনুধাবন করেছেন, তরুণদের মাদকাসক্ত হওয়ার পেছনে মূল শক্তি হিসেবে কাজ করে তরুণদের নিষ্ক্রিয় জীবনযাপন। তাই তিনি একই সঙ্গে জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিজ নিজ জেলায় ক্রীড়া, বিনোদন ও সৃজনশীল সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ বাড়ানোর জন্যও নির্দেশনা দিয়েছেন।

সবারই জানা, অন্যতম মাদক ইয়াবার উৎপত্তিস্থল হচ্ছে মিয়ানমার। এ দেশটি সীমান্তবর্তী বাংলাদেশ, ভারত আর থাইল্যান্ডে ইয়াবা পাচার করছে বহু বছর ধরে। মিয়ানমারের নির্জন পাহাড়ের ঘন অরণ্যের ভেতরে ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল’ নামক এলাকা ইয়াবা ব্যবসার কেন্দ্রবিন্দু। দেশটির সরকার নিজের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি বৃদ্ধির লোভে এ জীবনবিধ্বংসী ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। কিছু মাদক আফগানিস্তান থেকেও আসে।

ব্রিটিশরা কয়েক শতাব্দী আগেই বিভিন্ন ধরনের মাদক অবিভক্ত ভারত উপমহাদেশে প্রচলন করে দিয়েছিল যাতে প্রজারা রাজার বিরুদ্ধে আন্দোলন করার মতো শক্তি হারিয়ে ফেলে ও মাদকাসক্ত হয়ে দিনরাত ঝিম মেরে পড়ে থাকে। ব্রিটিশরা ভালো করেই জানত, ঝিম মেরে পড়ে থাকা মানুষ জীবনীশক্তি হারিয়ে শুধু পরিবারের বোঝাই বাড়ায় না, তারা অন্যের গলগ্রহ হয়ে বেঁচে থাকে।

মাদক একটি যন্ত্রণার নাম। মাদকের মাদকতায় একবার যারা ডুবেছে, তারা না বুঝলেও তাদের আপনজনরা বোঝে তারা কোন সর্বনাশের লেজে পা দিয়েছে। মাদক তিলে তিলে সমাজকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। মাদক যদি একবার একটা জাতিকে গ্রাস করতে পারে, সে জাতি আর সহজে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না। ব্যক্তি-মাদকসেবীদের যেমন একূল-ওকূল কোনো কূলই থাকে না, তেমনি তাদের জাতিরও আগ-পর সব শেষ। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিরও কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে মাদকসেবীরা।

বাংলাদেশের কিশোর-কিশোরী-তরুণ-তরুণীদের একটা অংশ ডুবে যাচ্ছে মাদকে, হারিয়ে ফেলছে জীবনীশক্তি। অকর্মণ্য হয়ে যাচ্ছে সমাজজীবনে। বোঝা বনে যাচ্ছে পরিবারের, সমাজের এবং দেশের। মাদকগ্রস্ত হয়ে এরা হয়ে যাচ্ছে উচ্ছৃঙ্খল, করছে ছিনতাই, রাস্তায় আর অলিগলিতে করছে বখাটেপনা, জড়িয়ে পড়ছে চুরি-চামারি আর খুনখারাবিতে। মা-বাবা-আত্মীয়স্বজন অসহায় নয়নে দেখছে তাদের প্রিয়জন শুরুর আগেই শেষ হয়ে যাচ্ছে তিলে তিলে।

মাদকসেবীরা কোথাও কোথাও ভাইকে, মাকে, স্ত্রীকে, বাবাকে পর্যন্ত খুন করছে নেশার ঘোরে কিংবা মাদক কেনার টাকার জন্য। কলেজছাত্রী ঐশীর কথা নিশ্চয়ই কেউ ভুলে যায়নি, যে মেয়েটি নেশার কারণেই বাবা-মাকে হত্যা করার অপরাধে আদালতের রায়ে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝোলার জন্য অপেক্ষমাণ।

মাদকবিরোধী অভিযানে জনগণ ভীষণ খুশি। তাদের মনে স্বস্তি আসায় সমর্থন দিচ্ছে অকুণ্ঠচিত্তে। সবাই বুঝতে পেরেছে এক কোটির কাছাকাছি মাদকসেবী শুধু তাদের পরিবারেরই নয়, পুরো দেশটার বোঝায় পরিণত হচ্ছে। শহরের গণ্ডি ছাড়িয়ে গ্রামাঞ্চলেও চলছে মাদকের আগ্রাসন। চাহিদার ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে সঙ্গে মাদক কারবারির সংখ্যাও বাড়ছে সারা দেশে। একই সঙ্গে বাড়ছে সমাজের-দেশের বোঝা। এ বোঝা আরও বাড়তে থাকবে যদি না মাদকের আগ্রাসনের রাশ টেনে ধরা যায়। যে যা বলে বলুক, মাদক অভিযান চালাতেই হবে যতক্ষণ না সমস্যাটি সমূলে উৎখাত হয়।

মাদক নিয়ে সারা বিশ্বের মানুষ বিচলিত। দক্ষিণ আমেরিকার কলম্বিয়া, উত্তর আমেরিকার মেক্সিকো, আফ্রিকার নাইজেরিয়া আর সাউথ আফ্রিকা, এশিয়ার ফিলিপিন্স আর থাইল্যান্ডে মাদকের রমরমা ব্যবসা। এদেশগুলোয় অনেক আগে থেকেই মাদকবিরোধী অভিযান চালানো হচ্ছে। অভিযানে মরছে অসংখ্য মাদক-ব্যবসায়ী আর মাদকসেবী। কাজেই বাংলাদেশ একাই মাদকবিরোধী অভিযান চালাচ্ছে না।

মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান সারা বিশ্বে বহু আগে থেকেই পরিচালিত হয়ে আসছে। ফিলিপিন্সের বর্তমান প্রেসিডেন্ট দুতের্তে তো রীতিমতো মাদকের বিরুদ্ধে ‘ক্রুসেড’ ঘোষণা করেছেন। কিছুদিন আগে ফিলিপিন্সের রাজধানী ম্যানিলায় দেখেছি, সাধারণ মানুষ পর্যন্ত কীভাবে মাদক-কারবারিদের বিরুদ্ধে খক্ষহস্ত। বাংলাদেশেও এমনটি দেখে আমরা আশান্বিত। তবে আমরা কামনা করব, কোনো নিরীহ মানুষ যেন এ অভিযানে হয়রানির শিকার না হয়।

আলোর মধ্যেও কখনও কখনও পোকা ঢুকে আলোকে অনুজ্জ্বল করে ফেলে। মাদকের ক্ষেত্রেও অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে, যারা মাদক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বপ্রাপ্ত তাদের মধ্যে কিছু অসাধু ব্যক্তি মাদক-কারবারিদের সঙ্গে যোগসাজশে লিপ্ত।

কালের কণ্ঠের একটি সংবাদে দেখতে পেলাম, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ২১৩ জন সদস্যকে শনাক্ত করা হয়েছে যারা মাদক ব্যবসায় মদদ দিচ্ছে। এ ধরনের অসুখকর খবর আমাদের উদ্বিগ্ন করে। তবে একটি বিষয় খেয়াল রাখা দরকার। তা হল, শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে এককভাবে মাদক নির্মূল করা যাবে না। মাদক থেকে পরিত্রাণের আরও উপায় খুঁজতে হবে। কিছু উপায় এখানে তুলে ধরলাম।

১. উৎসমূল ধ্বংস করা। মিয়ানমার সীমান্ত এমনভাবে বন্ধ করা দরকার যাতে কোনোভাবেই মাদক দেশের ভেতরে ঢুকতে না পারে। সীমান্তে পাহারা চৌকি তৈরি করে সার্বক্ষণিক পাহারার ব্যবস্থা করার কোনো বিকল্প নেই। মিয়ানমার বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের সঙ্গে সঙ্গে মাদকও বাংলাদেশের ভেতরে ঠেলে দিচ্ছে।

২. চাহিদা বন্ধ করা। বিভিন্ন সামাজিক ও আইনগত উদ্যোগ গ্রহণ করে মাদকসেবীর সংখ্যা শূন্যে বা শূন্যের কাছাকাছি আনতে পারলে বাজার শক্তিসমূহের মিথস্ক্রিয়ায় জোগান এমনিতেই স্বাভাবিক নিয়মে বন্ধ হয়ে যাবে।

৩. সাংস্কৃতিক-বিনোদন কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি। খেলাধুলার পরিবেশ সৃষ্টিসহ জারিগান, সারিগান, যাত্রাগান, বিকালে মাঠে খেলার ব্যবস্থাকরণ, বৈশাখী মেলা, পূজাপার্বণে অনুষ্ঠান, ফুটবলের সুদিন ফিরিয়ে আনা এবং স্কুল-কলেজের মাঠগুলোকে সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া অপরিহার্য।

৪. শিক্ষকদের মাদকবিরোধী সচেতনতা তৈরিতে সম্পৃক্ত করা। দিনের একটা বড় অংশ শিক্ষার্থীরা কাটায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের সান্নিধ্যে। শিশুদের ব্যস্ত রাখতে হবে গানে, খেলায়, বাগানের কাজে, চিত্রাঙ্কনে, নাটকে, বিতর্কে, বৃক্ষরোপণে, গল্প-কবিতা লেখার প্রতিযোগিতায়, রচনা প্রতিযোগিতায়, গল্পের বই পড়ায়। নিরানন্দ, একঘেয়ে লেখাপড়ার হাত থেকে তাদের মুক্তি দিয়ে সৃজনশীল কাজে ব্যস্ত রাখা খুবই জরুরি।

বিড়ি-সিগারেটের কুফল থেকে শুরু করে সব ধরনের নেশাজাতীয় জিনিসের ক্ষতিকর দিকগুলো শিক্ষার্থীদের কাছে প্রাঞ্জল ভাষায় নিয়মিত তুলে ধরতে হবে মাসিক আলোচনা বা মতবিনিময় সভায়।

৫. তিন লাখ মসজিদের ছয় লাখ ইমাম মোয়াজ্জিনের মাধ্যমে সচেতনতা সৃষ্টি। পবিত্র ধর্মগ্রন্থে উল্লিখিত মাদক সংক্রান্ত বিষয়গুলো, বিশেষ করে সূরা মায়িদার ৯০ ও ৯১ আয়াত থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে এবং তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হাদিস তুলে ধরে তারা সব অপরাধ-অনাচার-পাপের জনক মাদক-ব্যবসায়ী ও মাদকসেবীদের আখেরাতে ভয়ংকর পরিণতির কথা প্রচার করতে পারেন।

৬. পরিবার থেকে সচেতনতা শুরু করা। সন্তানদের সঙ্গে পারিবারিক বন্ধন বাড়াতেই হবে। সম্পর্কের উষ্ণতা বাড়াতে না পারলে পরিবারেই বিপর্যয় নেমে আসবে নিজের অজান্তে। পরীক্ষার চাপে রেখে খেলাধুলা কমিয়ে দিয়ে সকালে ক্লাস আর বিকালে কোচিংয়ে পাঠিয়ে সন্তানকে কী উপহার দিচ্ছি আমরা? নিজের অজান্তেই ঠেলে দিচ্ছি মাদকের হাতে।

৭. দেশব্যাপী সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা। কেউ কেউ মাদক নির্মূলের জন্য পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের গুরুত্বকে সামনে নিয়ে এসেছেন। মনে হয়, আইডিয়াটা উত্তম।

৮. অবিশ্বাস্য বিত্তশালীদের ব্যাপারে অনুসন্ধান করা। তাদের অর্থের উৎস কোথায়? একই সঙ্গে কায়েমি স্বার্থবাদীদের চিহ্নিত করে তাদেরও উৎখাতের ব্যবস্থা নিতে হবে। এই কায়েমি স্বার্থবাদীরা তাদের নিজ লোভের কারণে মাদক নির্মূল চায় না। গডফাদারসহ পাইকারি-খুচরা কারবারি সবাইকে আইনের আওতায় আনতে হবে। যারা খায় তাদেরও খাওয়ার অপরাধে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো জরুরি। নতুবা চাহিদার দিকটি উপেক্ষিত থেকে গেলে বাজার-শক্তির সূত্র ধরে জোগান আসতেই থাকবে।

৯. আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভেতরে লুকিয়ে থাকা ভূত তাড়ানো সচেতনভাবে, স্থায়ীভাবে। সরিষার ভেতরে ভূত থেকে গেলে ‘জিন’ তাড়ানো যায় না। তাই প্রশাসনকেও ঢেলে সাজাতে হবে।

১০. বিয়ের আগে বর-কনের ডোপটেস্ট করানো। সমাজের সবার মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিয়ে-শাদির কথা পাকাপোক্ত হওয়ার আগেই বর-কনের মাদক পরীক্ষা (ডোপ টেস্ট) বাধ্যতামূলক করতে হবে। মাদকের অস্তিত্ব পাওয়া গেলে বিয়ে বন্ধ করার পাশাপাশি পরিচিত সবাইকে বিষয়টা ঘটা করে জানিয়ে দিতে হবে, যাতে তার সঙ্গে আর কারও বিয়ে হতে না পারে। ডোপ টেস্ট সার্টিফিকেট ব্যতীত বিয়ে নিবন্ধন না করার জন্য ফরমান জারি করা আবশ্যক। বিভিন্ন পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, বিবাহবিচ্ছেদের অন্যতম কারণ স্বামীর মাদকাসক্তি। ভুলে যাওয়া উচিত নয়, একটি বিবাহবিচ্ছেদ মানে দুটি নর-নারীর জীবন অমানিশায় ঢেকে যাওয়া আর তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ ধ্বংসের পাকে তলিয়ে যাওয়া।

অভিযানকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য মানবাধিকারের ধোয়া তুলে যারা রাজনৈতিক বাঁশি বাজাতে ব্যস্ত, তাদের বাঁশি বাজতে থাকুক; মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান চলতেই থাকুক। কারণ তাদের বাঁশি একবার বাজতে শুরু হলে আর থামে না, থামবেও না। অযথা বাঁশি বাজানো এদের বদাভ্যাস। ক্যান্সারের মতো ছড়িয়ে পড়া মাদকের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া এ যুদ্ধে পিছু হটার কোনো সুযোগ নেই। এ অভিশাপ থেকে তরুণ সম্প্রদায়কে, এ জাতির ভবিষ্যৎকে রক্ষা করতেই হবে।

মাদকের ভয়াবহতা এখন নির্মূল করা না হলে আর সময় কোথায়? যারা এর বিরুদ্ধে কথা বলেন, তারা কিসের জন্য অপেক্ষা করছেন? মাদকসেবীদের ছুরি বুকে নিয়ে রাস্তায় লুটিয়ে পড়ার জন্য, না-কি নিজের নেশাগ্রস্ত সন্তানের হাতে জীবন বিলিয়ে দেয়ার জন্য? বিরোধিতার পথ থেকে সরে এসে মাদক নামক দৈত্যকে রুখে দাঁড়ান, নিজের অস্তিত্ব রক্ষা করুন, নিজে সুস্থ থাকুন এবং কয়েক কোটি তরুণকে অনিবার্য ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করুন।

মাদক ব্যবসায়ীরা দেশের শত্রু, সব নাগরিকের শত্রু। এরা নিজের লাভ ছাড়া আর কিছুই কামনা করে না। এরা আপনার আমার সন্তানের কথা ভাবে না; এরা নিজের সন্তানকে নিরাপদ দূরত্বে রাখে কিংবা ভিনদেশে পাঠিয়ে দিয়ে নিজেদের জীবন নিশ্চিন্ত করে। এদের মানবাধিকারের কথা না বলে দেশের সম্পদ যুবাদের মানবাধিকারের কথা বলুন।

আমরা কি ভুলে গেছি অপিয়াম যুদ্ধের কথা? ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে চীন সপ্তদশ শতাব্দীতে দুটি যুদ্ধ করেছিল শুধু চীনে আফিম রফতানি বন্ধ করার লক্ষ্যে। আমেরিকার গৃহযুদ্ধকালে (১৮৬০-৬৫) সৈনিকদের মধ্যে মাদকের স্বেচ্ছা বিস্তারের কথাও ভুলে যাওয়া যাবে না, যেমনি ভুললে ভুল হবে যদি ভুলে যাই হিটলারের চক্রান্তে জার্মানির সৈন্যদের মধ্যে ঘুম দূর করে দিনের পর দিন চাঙ্গা রাখা আর তাদের মধ্যে ভয়ভীতি তাড়িয়ে সক্রিয় রাখার জন্য লাখ লাখ অপিয়ামের বড়ি বিতরণের বিষয়টিও। ব্রিটিশরা তো আমাদের তখনও ছাড়েনি। ব্রিটিশ শাসকরা এ উপমহাদেশে পরিকল্পিতভাবে মাদকের বিস্তার ঘটিয়েছিল। অগণিত মানুষ মরেছে এসব গিলে। ইতিহাস এসবের সাক্ষী।

ইয়াবা, হেরোইনের মতো দেহ-মন বিধ্বংসকারী মাদক বাংলাদেশে জন্মায় না। এগুলো সরবরাহ করে অন্য দেশের ব্যবসায়ীরা, মূল-পরিকল্পনায় থাকে আন্তর্জাতিক চক্রান্তকারীরা। কে যে কাকে কীভাবে ঠকাচ্ছে, তা দু’চোখে দেখা সম্ভব নয়, তার জন্য প্রয়োজন তৃতীয় নয়ন। এক ঠোঁটে আলতো হাসি হেসে দান-অনুদান দিচ্ছে; আরেক ঠোঁটে বক্র হাসির রেখা ফুটিয়ে অন্য হাতে তুলে দিচ্ছে জীবন-ধর্মবিধ্বংসী মাদকসহ অনেক অনাচারের উপাদান।

ইতিহাসের পাতা উল্টালেই এ রকম অজানা অনেক কিছু জানা যাবে। সপ্তদশ শতাব্দীর ইতিহাস থেকে কয়েকটি পাতা উল্টান, দেখতে পাবেন বিস্ময়কর তথ্য। পাঁচ হাজারের বেশি প্রশিক্ষিত ও উচ্চশিক্ষিত ভিনদেশি গোয়েন্দাকে মুসলিম নাম দিয়ে গুপ্তচর হিসেবে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছিল ইরান, ইরাক, মিসর, তুরস্ক, সৌদি আরবসহ মুসলিম রাষ্ট্রগুলোয়। তখন খিলাফতের হেডকোয়ার্টার ছিল তুরস্কে, যে খেলাফতের পতন ঘটে প্রায় সাড়ে তিনশ’ বছর পর ১৯২৪ সালের মার্চ মাসে। এ গুপ্তচররা কৌশলে এসব দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, মসজিদে, মক্তবে এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সংস্থায় ‘কাজ’ নিয়ে তাদের দেয়া নির্দেশনা অনুযায়ী নানা সমস্যা ঢুকিয়ে দিয়েছে বিভিন্নভাবে।

তার মধ্যে অন্যতম ছিল মদ-জুয়া আর বিভিন্ন নেশার বিস্তার। উদ্দেশ্য, এ সম্প্রদায়কে বিপথে চালিত করে জাতিকে ধ্বংস করে দেয়া, ধীরে ধীরে যাতে শেষ পর্যন্ত খিলাফতই ধ্বংস হয়ে যায়। পরিণামে হয়েছেও তাই। বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানী, দার্শনিক, জ্যোতির্বিদ, প্রজ্ঞাসম্পন্ন শাসক, সমাজসংস্কারক আর শান্তির বাহক হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পাওয়া মর্যাদাসম্পন্ন মুসলিম জাতি ওদের ছড়িয়ে দেয়া মাদক আর অশ্লীলতার কবলে পড়ে ধ্বংস হয়ে গেল, হারিয়ে ফেলল খিলাফত।

তারই জের টানছি আমরা, তাদের উত্তরসূরিরা। এখনও সাবধান না হলে আর সাবধান হব কখন? জাতি ধ্বংসকারী মাদক উড়তে উড়তে আসেনি এ দেশে, আনা হয়েছে এবং হচ্ছে প্রচ্ছন্ন কৌশলে। বিষয়টি বুঝতে পেরেছেন বলেই রশিতে টান দিয়েছেন জাতির জনকের সত্যিকারের উত্তরসূরি সমসাময়িক কালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা। বিনম্র শ্রদ্ধা তার প্রতি এ বহু আকাক্সিক্ষত উদ্যোগের জন্য। জয় হোক মাদকবিরোধী অভিযানের, জয় হোক বাংলাদেশের প্রত্যেক দেশপ্রেমিকের।

ড. এম এ মাননান : শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট; উপাচার্য, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়

ঘটনাপ্রবাহ : মাদকবিরোধী অভিযান ২০১৮

 

 

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter