দুর্বৃত্তায়নের এই বলয় ভাঙতে হবে

  আসিফ রশীদ ৩১ জুলাই ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাসের চাকায় পিষ্ট হওয়া দুই সহপাঠীকে হারিয়ে শিক্ষার্থীদের বিমানবন্দর সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ
বাসের চাকায় পিষ্ট হওয়া দুই সহপাঠীকে হারিয়ে শিক্ষার্থীদের বিমানবন্দর সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ। ছবি: যুগান্তর

আমাদের স্কুল ও কলেজ জীবনে ঢাকা নগরী বেশ ছিমছাম ছিল। রিকশায় ঘুরে বেড়াতে ভালো লাগত। সে সময় বিদেশ থেকে, বিশেষ করে পাশের কোনো দেশ থেকে কেউ ঢাকায় এলে মুগ্ধ হয়ে যেতেন। দেখতে পেতেন পরিচ্ছন্ন নগরী। রাস্তাগুলো প্রশস্ত। যানজট নেই। যান চলাচলে নেই বিশৃঙ্খলা। প্রায় প্রতিটি মোড়ে স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল ব্যবস্থা।

ট্রাফিক পুলিশ না থাকলেও সব গাড়িচালক সিগন্যাল মেনে চলেন। মনে আছে, সে সময় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ঢাকা বেড়িয়ে গিয়ে কলকাতার দেশ ম্যাগাজিনে একটি নিবন্ধ লিখেছিলেন, যেখানে ঢাকা নগরী দেখে তিনি তার মুগ্ধ হওয়ার কথা তুলে ধরেছিলেন। লিখেছিলেন, ঢাকার তুলনায় কলকাতার অনেককিছুই ‘ম্যাড়মেড়ে’। আরও মনে পড়ে, আমার এক আত্মীয় কলকাতা বেড়িয়ে এসে বলেছিলেন, ওখানে কোলাহল, হৈ-হট্টগোল, কেউ সিগন্যাল মানে না, বিশৃঙ্খল অবস্থা- সে তুলনায় আমাদের ঢাকা অনেক ভালো। বিরানব্বইয়ে কলকাতা সফরে গিয়ে আমারও প্রায় একই অনুভূতি হয়েছিল। সত্যি বলতে কী, নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত ঢাকা অনেকটাই সহনীয় ছিল।

সেই দৃশ্যপট এখন পাল্টে গেছে। নগরীতে জনসংখ্যা বেড়েছে। কয়েকগুণ বেড়েছে যানবাহন। কিন্তু এসবের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণভাবে আমরা নগরীর সম্প্রসারণ ঘটাতে পারিনি। গড়ে তুলতে পারিনি যথাযথ নগর ব্যবস্থাপনা। ফলে ঢাকা এখন এক বিশৃঙ্খল নগরী। প্রতিটি রাস্তায় যানজট। যত্রতত্র খানাখন্দ। রাস্তা খোঁড়া হয় যখন-তখন। স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল ব্যবস্থা দূরে থাক, ট্রাফিক পুলিশের সিগন্যালও কেউ মানতে চায় না। গণপরিবহন নিয়ম মানে না। যে যেমন খুশি চলে, যেমন খুশি থামে, যাত্রী ওঠায়-নামায়। ভাড়া নেয়ার ক্ষেত্রেও স্বেচ্ছাচারিতা। সিটিং সার্ভিস নাম দিয়ে আদায় করা হয় বাড়তি ভাড়া; যদিও চলে লোকাল বাসের নিয়মে। ওভারটেকিংয়ের জন্য এক বাস (আসলে মিনিবাস) আরেক বাসের গা ঘেঁষে চলে, যেন ক্রসকান্ট্রি রেস! এক বাস আরেক বাসকে ইচ্ছা করে আঘাত করতেও দ্বিধা করে না। তাই নগরীর মধ্যেও দুর্ঘটনার শিকার হয় মানুষ। একে তো যানজট, তার ওপর গণপরিবহনের অভাব; ফলে মানুষের জন্য অফিস-আদালত বা প্রয়োজনীয় স্থানে যাতায়াত হয়ে দাঁড়ায় দুর্বিষহ।

আগে এ নগরীতে বড় বড় বাস চলত, যা বেশি যাত্রী বহন করতে পারত। এখন সেই জায়গা দখল করে নিয়েছে মিনিবাস, যা রাস্তায় জায়গা দখল করে বড় বাসের সমানই; কিন্তু যাত্রী বহন করতে পারে না বেশি। শোনা যায়, কী এক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নাকি পরিবহন শ্রমিক-মালিকরা মিলে রাস্তা থেকে বড় বাস উঠিয়ে দিয়েছে! এ নগরীতে যে সিএনজিচালিত বেবিট্যাক্সি চলে, সেগুলোর অবস্থাও অনেকটা বাসেরই মতো। বারবার ভাড়ার হার বাড়িয়েও কোনো বেবিট্যাক্সি চালককে মিটারে চলতে বাধ্য করা যায় না। তারাও চলে নিজেদের মর্জিমাফিক, যাত্রীদের কাছ থেকে ভাড়া আদায় করে নির্ধারিত ভাড়ার কয়েকগুণ বেশি। সবকিছু মিলিয়ে অনেকের কাছেই এই নগরীকে মনে হয় নরকতুল্য। একান্তই চাকরি বা ব্যবসায়িক প্রয়োজন না থাকলে যে এখানে এত মানুষ বসবাস করত না, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

বহু বছর পর সম্প্রতি কলকাতা যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। সেখানে যে পরিবর্তন দেখতে পেলাম তা চোখে পড়ার মতো। মূল কলকাতা নগরীর দালানগুলো পুরনো হলেও যোগাযোগ ব্যবস্থা, রাস্তাঘাট জনবান্ধব। কোথাও রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির কাজ দেখিনি। কোথাও কোথাও ফ্লাইওভারের উন্নয়ন কাজ চললেও জনভোগান্তি যথাসম্ভব কমানোর চেষ্টা রয়েছে। যানজট বলতে তেমন কিছু দেখিনি, স্বয়ংক্রিয় সিগন্যালে যেটুকু সময় গাড়ি আটকে থাকে সেটুকু ছাড়া। আরেকটি লক্ষণীয় ব্যাপার হল, সিগন্যাল মেনে চলার প্রবণতা। সবাই সিগন্যাল মেনে চলে। এমনকি ভোরবেলায়ও দেখেছি, রাস্তা পুরো ফাঁকা থাকা সত্ত্বেও সিগন্যাল পড়ামাত্রই ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে গেল। কলকাতায় কোনো মিনিবাস দেখিনি। অল্পকিছু বড় বাস চললেও সেগুলো ট্রাফিক শৃঙ্খলা মেনে চলে। কোনো অসুস্থ প্রতিযোগিতা নেই। বেবিট্যাক্সিও কম। ট্যাক্সি আছে নানা ধরনের। সেগুলো নিয়ম মেনে চলে। বিমানবন্দর, রেলস্টেশনসহ কয়েকটি জায়গায় রয়েছে প্রিপেইড ট্যাক্সিক্যাব, নগরীতে নতুন কেউ এলে তাকে ঠকানোর সুযোগ কম। কলকাতায় প্রাইভেট কারই বেশি। ভারতে তিন থেকে ছয় লাখ টাকার মধ্যে নতুন গাড়ি পাওয়া যায়। আট লাখে মেলে নতুন হোন্ডা এইচআরভি জিপ! ফলে যে কোনো মধ্যবিত্ত গাড়ি কেনার সামর্থ্য রাখে। তবে কলকাতার সবচেয়ে অসাধারণ বাহন মেট্রোরেল নামে পরিচিত পাতালরেল। এর মাধ্যমে মাত্র ১০ টাকায় পার্ক স্ট্রিট থেকে দমদম পর্যন্ত যাওয়া যায় অতি অল্প সময়ে। দেখেশুনে মনে হল এ নগরীতে সবকিছুতেই গণমানুষের সুবিধা-অসুবিধাকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে, আমাদের রাজধানীতে যা অনুপস্থিত।

ঢাকা কখনও কলকাতার সঙ্গে তুলনীয় নয়। ঢাকা একটি রাষ্ট্রের রাজধানী, আর কলকাতা রাজ্যের। তারপরও ঢাকার সঙ্গে কোনো শহরের নাগরিক সুযোগ-সুবিধা বা অন্যকিছুর তুলনা করতে গেলে প্রথমেই কলকাতার নামটি চলে আসে। এর কারণ হল উভয়ই দুই দেশের বাঙালির প্রধান শহর। তাছাড়া ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটও এ তুলনার একটি কারণ বৈকি।

ঢাকায় এতদিনে মেট্রোরেল নামের উড়াল রেলব্যবস্থা নির্মিত হচ্ছে বটে, তবে পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের স্বার্থ কাটিয়ে এটি কতটা জনবান্ধব পরিবহন হয়ে উঠবে, তা নিয়ে সংশয় দূর করতে পারি না। মনে পড়ে, বাস মালিক-শ্রমিকদের প্রতারণা বন্ধে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী সিটিং নামের চিটিং সার্ভিস উঠিয়ে দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু সবকিছু জেনেশুনে শেষমেশ তাকেও পিছু হটতে হয়েছে। আরও শুনি ময়মনসিংহ থেকে ঢাকামুখী ট্রেনের সময়সূচি এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে কেউ দিনে ঢাকায় এসে কাজ শেষে দিনে ফিরে যেতে না পারেন। সবই নাকি চলছে বাস মালিকদের স্বার্থে! ট্রেনের পরিবর্তে যেন যেতে হয় বাসে! এই যখন অবস্থা, তখন সরকার চাইলেও কি দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা জনবান্ধব করা সম্ভব?

হ্যাঁ, সম্ভব। যদি দেশের প্রধান নির্বাহী এদিকে দৃষ্টি দেন। প্রধানমন্ত্রী প্রায়ই বলে থাকেন, ‘আমার চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই।’ তাই যদি হয়ে থাকে তাহলে দেশের পরিবহন সেক্টরে যে দুর্বৃত্তায়ন ঘটেছে, তা নির্মূলে প্রধানমন্ত্রীর বাধা কোথায়? পরিবহন সেক্টরের দুর্বৃত্তায়ন কতটা ভয়াবহ হয়ে উঠেছে, হানিফ এন্টারপ্রাইজ বাসের তিন কর্মচারী যেভাবে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ছাত্র পায়েলকে হত্যা করেছে সে ঘটনাই এর বড় প্রমাণ। কিংবা রোববার বিমানবন্দর সড়কে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের সামনে জাবালে নূর পরিবহনের একটি বাস যেভাবে দুই কলেজ শিক্ষার্থীর মৃত্যু এবং অনেকের আহতের কারণ হয়েছে সেই ঘটনাটির কথাই ধরুন।

এ ক্ষেত্রে দুই বাসের রেষারেষি দায়ী বললে সবটা বলা হয় না। এ বাসগুলো যাত্রীদের কাছ থেকে সিটিং সার্ভিসের নামে ভাড়া আদায় করে থাকে। সেই হিসেবে ঘাতক বাসটির ওই স্থান থেকে যাত্রী তোলার কথা নয়। কিন্তু যত্রতত্র যাত্রী তুলতে গিয়েই তারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এই সেক্টরটি যেভাবে চলছে, যে নৈরাজ্য ও স্বেচ্ছাচারিতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তা কোনো সভ্য দেশের উদাহরণ হতে পারে না। অনেক অনিষ্টের মূলে রয়েছে দেশের পরিবহন খাত। এরা মানুষ খুন করেও বিচার মানতে নারাজ! এদের আর এভাবে চলতে দেয়া উচিত নয়। এ ব্যাপারে কিছু একটা করার সময় এখনই।

গত শনিবার রামপুরা-বাড্ডা-প্রগতি সরণি এলাকায় হাতিরঝিল প্রকল্পের নর্থ ইউ-লুপ উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় তিনি রাজধানীর যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং যানজট নিরসনে নিজের ভবিষ্যৎ পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে বলেছেন, সমগ্র ঢাকাকে ঘিরে একটি এলিভেটেড রিং রোড নির্মাণ করা হবে, যানবাহন শুধু রাস্তা দিয়ে নয়, উপর দিয়েও চলবে। ভবিষ্যতে পাতালরেল নির্মাণের পরিকল্পনার কথাও বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। বলেছেন ঢাকা-চট্টগ্রাম বুলেট ট্রেন চালু করার কথা। মানুষ ঢাকায় দিনে দিনে কাজ সেরে যে যার গন্তব্যে যেন ফিরে যেতে পারেন সে লক্ষ্য থেকেই এই পরিকল্পনা প্রণয়ন করার কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। সন্দেহ নেই খুবই জনবান্ধব পরিকল্পনা। কিন্তু কায়েমিগোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষার যে প্রবণতা দেশে চলে আসছে বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ, সেটা ভেঙে দিতে না পারলে যে পরিকল্পনাই নেয়া হোক না কেন, তা কখনও জনবান্ধব হয়ে উঠবে না।

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রতিটি ক্ষেত্রে জবাবদিহিতার একটা ব্যাপার থাকে, যেটা ভারতে আছে; কিন্তু আমাদের দেশে নেই। আর নেই বলেই সব ক্ষেত্রে কায়েমিগোষ্ঠী তার স্বার্থরক্ষায় তৎপর থাকে। এতে জনস্বার্থ হয় উপেক্ষিত। এখানে ট্রেনের টিকিট কাটার মতো সামান্য বিষয়েও একজনকে ভোগান্তিতে পড়তে হয়। টিকিট হয়তো পাওয়া গেল, কিন্তু সিটটি পাওয়া যায় না কাক্সিক্ষত স্থানে। আপনি হয়তো এসি বার্থ বা চেয়ারে যেতে চাইছেন; কিন্তু বলা হবে- টিকিট নেই, সব বুকড হয়ে গেছে। সবকিছুই যেন ভিআইপিদের জন্য সংরক্ষিত! আসলে এসব ক্ষেত্রেও চলছে দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়ন। সাধারণ মানুষ এখানে অপাঙ্ক্তেয়।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, এই দুর্বৃত্তায়নের বলয় শক্ত হাতে ভেঙে দিন। জনগণ আপনাকে মনে রাখবে।

আসিফ রশীদ : সাংবাদিক ও লেখক

[email protected]

বদরুদ্দীন উমরের আজকের নির্ধারিত লেখাটি প্রকাশিত হবে বৃহস্পতিবার। -বি.স.

ঘটনাপ্রবাহ : বিমানবন্দর সড়কে দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যু

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
.