উত্তপ্ত আরাকান : কোন পথে হাঁটবে বাংলাদেশ?

 ড. আবদুল্লাহ আল ইউসুফ 
১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যে চলমান সহিংসতা বেশ উত্তাপ ছড়াচ্ছে। সেই উত্তাপের আঁচ এসে পড়ছে বাংলাদেশ ভূখণ্ডের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতেও। বিবদমান পক্ষগুলোর লক্ষ্যভ্রষ্ট গুলি, মর্টারশেল এসে পড়ছে আমাদের ভূখণ্ডে। হতাহতের ঘটনা ঘটছে। সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোর বাসিন্দারা প্রচণ্ড উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। যারা পারছেন, ঘরবাড়ি ছেড়ে সরে আসছেন ভেতরের দিকে। সংঘর্ষে বিজিতপক্ষ মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর শত শত সদস্য অস্ত্রশস্ত্রসহ পালিয়ে আশ্রয় নিচ্ছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে। সব মিলে পরিস্থিতি বেশ নাজুক। সময়মতো যথোপযুক্ত ব্যবস্থা না নিলে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত ছড়িয়ে পড়তে পারে সীমান্তের এপারে। আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা পড়তে পারে ঝুঁকির মুখে।

এ সমস্যার টেকসই সমাধানে পৌঁছাতে হলে এ অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার কিছু বিষয় অনুধাবন করা প্রয়োজন। নানা কারণে এ সহস্রাব্দীর শুরু থেকেই বঙ্গোপসাগরের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেড়ে গেছে। অনাদিকাল থেকেই প্রশান্ত মহাসাগর এবং ভারতীয় মহাসাগরের মধ্যকার সেতুবন্ধন হিসাবে বঙ্গোপসাগর পূর্ব ও পশ্চিমের বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছিল। স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থায় পরাশক্তি হিসাবে গণচীনের দ্রুত উত্থান বিশ্বব্যাপী ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষায় বঙ্গোপসাগরের গুরুত্বে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। প্রতিদ্বন্দ্বী পরাশক্তিগুলো বঙ্গোপসাগর তথা উপকূলীয় অঞ্চলকে তাদের নিজ নিজ প্রভাব-বলয়ের মধ্যে ঢুকিয়ে নেওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছে। ফলে এ অঞ্চলে একটি ভূ-রাজনৈতিক সাইক্লোন অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়েছিল। বিশেষ করে আরাকানে একটি ভূ-রাজনৈতিক সাইক্লোনের পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছিল বেশ ক’বছর ধরেই। পরাশক্তিগুলোর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক ক্ষমতার সমীকরণ মেলানো যাচ্ছিল না কিছুতেই। বলাই বাহুল্য, পৃথিবীর ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলো সরাসরি নিজেদের মধ্যে যুদ্ধবিগ্রহে জড়ায় না। ভূ-রাজনীতির জটিল সমীকরণ মেলাতে তারা ব্যবহার করে ক্ষুদ্র, দুর্বল রাষ্ট্রগুলোকে। কখনো প্রলোভন, কখনো ভয়ভীতি দেখিয়ে তারা এসব দেশকে তাদের প্রয়োজনমতো ব্যবহার করে। প্রয়োজনে কাছে টানে, আবার প্রয়োজন ফুরোলেই দূরে ঠেলে দেয়। বড় শক্তিগুলোর স্বার্থের ব্যাপ্তি এবং গতি-প্রকৃতিই নির্ধারণ করে দেয় কোন দেশ বা কোন অঞ্চল কখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসবে।

মিয়ানমারের কারাবন্দি রাজনৈতিক নেত্রী অং সান সু চিকে শান্তির জন্য নোবেল দিয়ে তাকে দৃশ্যপটে আনার নেপথ্যে ক্ষমতাশীল রাষ্ট্রগুলোর কোনোই রাজনৈতিক স্বার্থ ছিল না-একথা হলফ করে বলা যাবে না। ইতিহাসের অতলে হারিয়ে যাওয়া একসময়ের দুর্দান্ত প্রতাপশালী রাজ্য আরাকানকে কেইবা নতুন করে স্মরণ করত, যদি না জাতিগত নিধনের শিকার হয়ে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা দেশান্তরী হতো। এ গণহত্যার নেপথ্যেও যে এক বা একাধিক রাষ্ট্র কিংবা মহলের রাজনৈতিক স্বার্থ লুকিয়ে নেই, সেটাও হলফ করে বলা যাবে না। গত তিন বছর ধরে মিয়ানমারজুড়ে যে তীব্র রক্তক্ষয়ী সংঘাত চলছে, তার নেপথ্যে যেমন পরাশক্তিগুলোর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ইন্ধন রয়েছে, তেমনি ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠা আরাকানে সামরিক শক্তির ভারসাম্য রাষ্ট্রপক্ষ থেকে অরাষ্ট্রপক্ষের (নন-স্টেট অ্যাকটর) দিকে হেলে পড়ার নেপথ্যেও পরাশক্তিগুলোর ভূমিকা রয়েছে বলে অনুমান করা যায়। তবে পরাশক্তিগুলো যেভাবে তাদের নিজ নিজ স্বার্থরক্ষার প্রয়োজনে ছোট রাষ্ট্রগুলোকে ব্যবহার করে, তেমনি ছোট দেশগুলোও এ দ্বন্দ্ব-সংঘাতের মধ্যে থেকেই তাদের নিজ নিজ স্বার্থ গুছিয়ে নিতে পারে। প্রয়োজন শুধু বিচক্ষণ ভূ-রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণ।

ভূ-রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণের একটি অত্যাবশ্যকীয় প্রথম ধাপ হচ্ছে নির্দিষ্ট ইস্যুটির সঙ্গে স্বার্থসংশ্লিষ্ট মহলগুলোর বিশ্লেষণ বা স্টেকহোল্ডার অ্যানালিসিস। প্রথমেই স্বার্থসংশ্লিষ্ট মহলগুলোকে শনাক্ত করতে হয়। এরা হতে পারে অভ্যন্তরীণ কিংবা আন্তর্জাতিক কোনো পক্ষ; হতে পারে কোনো রাষ্ট্র কিংবা অরাষ্ট্র পক্ষ; কিংবা হতে পারে কোনো জোট, গোষ্ঠী বা সংগঠন। এমনকি স্বার্থেরও নানা প্রকারভেদ থাকতে পারে। সেটা হতে পারে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামরিক কিংবা আদর্শিক স্বার্থ। মোদ্দা কথা, যে ব্যক্তি, গোষ্ঠী, সম্প্রদায়, মহল বা রাষ্ট্রেরই ন্যূনতম স্বার্থ আছে, তাদের সবাইকেই ইস্যুটিকে বিবেচনায় রাখতে হবে। এর পরের ধাপ হচ্ছে প্রতিটি পক্ষের স্বার্থগুলোকে সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা। সেই সঙ্গে স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য পক্ষগুলো কতখানি শক্তি প্রয়োগ, সম্পদ বিনিয়োগ বা ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত, সেটাও বিবেচনা করতে হয়।

অস্তিত্বের স্বার্থ বা সারভাইভাল ইন্টারেস্টের জন্য যে কোনো পক্ষ সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত থাকে। অতি গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ বা ভাইটাল ইন্টারেস্ট সংরক্ষণের জন্য পক্ষগুলো জীবন দিতে প্রস্তুত না হলেও সাধ্যের মধ্যে সবটুকু শক্তি ও সম্পদ বিনিয়োগ করে। এর পরের স্বার্থগুলোর তুলনামূলক গুরুত্ব বিবেচনা করে পক্ষগুলো যথাযথ শক্তি প্রয়োগ বা ত্যাগ স্বীকার করে থাকে। এরপর আরেকটি খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মনোযোগ দিতে হয়। সেটি হলো বিভিন্ন পক্ষগুলোর পরিপূরক অথবা পরস্পরবিরোধী স্বার্থগুলোকে শনাক্ত করা। বলাই বাহুল্য, যাদের মধ্যে পরিপূরক স্বার্থ বিদ্যমান রয়েছে, তারা জোট বাঁধবে এবং বিরোধী জোটের সঙ্গে লড়বে।

এবার আরাকানে বিদ্যমান পরিস্থিতির ওপর দৃষ্টি দেওয়া যাক। এ মুহূর্তে আরাকানের সঙ্গে স্বার্থসংশ্লিষ্ট মহলের সংখ্যা অনেক। মোটা দাগে অভ্যন্তরীণ পক্ষগুলো হচ্ছে-রাখাইন সম্প্রদায়, রোহিঙ্গা সম্প্রদায়, আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠন ইউনাইটেড লীগ অফ আরাকান, আরাকান আর্মি, প্রতিবেশী স্টেটগুলোর সাম্প্রদায়িক ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো, মিয়ানমারের মূলধারার রাজনৈতিক সংগঠন ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট, মূলধারার বিপ্লবী সংস্থা পিপলস ডিফেন্স ফোর্স, বিচ্ছিন্নতাবাদী জোট থ্রি ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্স, বার্মিজ সম্প্রদায় এবং সামরিক জান্তা।

আরাকানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সবচেয়ে জটিল দিকটি হচ্ছে এ অভ্যন্তরীণ পক্ষগুলোর মধ্যে পরিপূরক এবং পরস্পরবিরোধী স্বার্থের যুগপৎ উপস্থিতি। যেমন-গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার স্বার্থে সব পক্ষ জান্তাবিরোধী অবস্থানে ঐক্যবদ্ধ। এরা সবাই সামরিক সরকারকে হটিয়ে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েমের লক্ষ্যে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করে যাচ্ছে। আবার, ইউনিয়নের অখণ্ডতার প্রশ্নে মূলধারার রাজনৈতিক ও বিপ্লবী সংগঠনগুলোর সঙ্গে জান্তার কোনো বিরোধ নেই। সামরিক সরকার এবং ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট উভয় পক্ষই পুরো ইউনিয়ন অফ মিয়ানমারকে একটি রাষ্ট্র হিসাবেই দেখতে চায়। পক্ষান্তরে, আঞ্চলিক রাজনৈতিক এবং সশস্ত্র সংগঠনগুলো চায় পূর্ণ স্বাধীনতা অথবা নিদেনপক্ষে স্বায়ত্তশাসন। এ ব্যাপারে মূলধারার রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে রয়েছে তাদের তীব্র বিরোধ।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, জান্তাবিরোধী আন্দোলন শুরুর আগমুহূর্ত পর্যন্ত আরাকান আর্মিকে নিষিদ্ধ সংগঠনের তালিকাভুক্ত করে রেখেছিল মূলধারার গণতন্ত্রপন্থি সু চি সরকার। কৌশলগত কারণেই সামরিক অভ্যুত্থানের পরপরই জান্তা সরকার আরাকান আর্মিকে নিষিদ্ধ সংগঠনের তালিকা থেকে বাদ দিয়ে তাদের সঙ্গে একটি অঘোষিত যুদ্ধবিরতির ব্যবস্থা করে জান্তাবিরোধী ঐক্যে ফাটল ধরানোর চেষ্টা করে। ফলে প্রথম দুটি বছর আরাকান আর্মি জান্তাবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেয়নি। এ সময়টিকে তারা ব্যাপক গণসংযোগের মাধ্যমে জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তাদের রাজনৈতিক অবস্থানকে অধিকতর সুসংহত করার কাজে লাগিয়েছে। বলা বাহুল্য, আরাকান আর্মিই এ মুহূর্তে আরাকানের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে সবচেয়ে শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ পক্ষ। তাদের লক্ষ্য আরাকানের পূর্ণ স্বাধীনতা অথবা নিদেনপক্ষে স্বায়ত্তশাসন।

ওদিকে আরাকান ইস্যুতে এ সময়ের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক পক্ষগুলো হচ্ছে-গণচীন, ভারত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশ। অভ্যন্তরীণ পক্ষগুলোর মতো এদের অস্তিত্বের স্বার্থ না থাকলেও প্রত্যেকের অতি গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ বা ভাইটাল ইন্টারেস্ট জড়িয়ে আছে আরাকান পরিস্থিতিকে ঘিরে। কাজেই আরাকান ইস্যুতে কার্যকর ও টেকসই ভূ-রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণ করতে হলে আন্তর্জাতিক পক্ষগুলোর স্বার্থ চিহ্নিত করা জরুরি।

গণচীনের গভীর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক স্বার্থ রয়েছে আরাকানকে ঘিরে। বস্তুত আরাকানকে বলা যেতে পারে ভারত মহাসাগরে গণচীনের গেটওয়ে বা প্রবেশদ্বার। মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল ও এলএনজি সরবরাহের জন্য দীর্ঘকাল ধরে চীনকে পুরো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ঘুরে মালাক্কা প্রণালি হয়ে সমুদ্রপথে চলাচল করতে হতো। অতিরিক্ত পরিবহণ খরচ ও সময়ের অপচয় ছাড়াও এ দীর্ঘ সমুদ্রপথে যাতায়াতের ক্ষেত্রে কিছু সম্ভাব্য ঝুঁকিও ছিল। দক্ষিণ চীন সাগরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে গণচীনের সঙ্গে এ অঞ্চলে মার্কিন মিত্রদেশগুলোর মধ্যে দীর্ঘকাল ধরেই এক ধরনের শীতল যুদ্ধ চলে আসছে। অতি প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহের জন্য এ ধরনের সমস্যাসংকুল এবং কিছুটা বৈরী সমুদ্রপথে চলাচল চীনের জন্য কিছুটা অস্বস্তিকর ছিল তো বটেই। এ পুরো ব্যাপারটার একটা সহজ, লাভজনক ও কার্যকর সমাধান এনে দিয়েছে চীন-মিয়ানমার তেল ও গ্যাস পাইপলাইন।

চীনের চতুর্থ বৃহত্তম এনার্জি সাপ্লাই রুট হিসাবে বিবেচিত এ পাইপলাইনটি সরাসরি চীনের ইউনান প্রদেশের সঙ্গে আরাকানকে সংযুক্ত করেছে। গ্যাস পাইপলাইনটি ২০১৩ সালের মে থেকে এবং তেল পাইপলাইনটি ২০১৭ সাল থেকে আরাকানের সিত্তোয়ি বন্দর থেকে চীনের ইউনান প্রদেশে নিরবচ্ছিন্নভাবে তেল ও গ্যাস সরবরাহ করে যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, এ পাইপলাইনকে ঘিরে রয়েছে চীনের আরও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা। ‘ফাইভ লাইনস অফ কানেকশনস’ নামে পরিচিত এ পরিকল্পনায় পাইপলাইন দুটির পাশাপাশি ইউনান-আরাকান মহাসড়ক, রেল সড়ক এবং হাইস্পিড কেব্ল কানেকশনেরও স্বপ্ন দেখছে চীন। মিয়ানমারের চলমান অস্থিরতার কারণে পরিকল্পনাটি আপাতত স্থগিত থাকলেও পরিস্থিতি শান্ত হলেই চীন সেটি বাস্তবায়নের পথে এগোবে বলে ধারণা করা যায়।

তবে আরাকানে এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিশাল স্বার্থ আছে চীনের। পুরো মিয়ানমারে চলমান বা পরিকল্পিত তাবৎ চৈনিক প্রকল্পগুলোর মধ্যে ভূ-রাজনৈতিক, ভূ-অর্থনৈতিক ও সামরিক দিক থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত এ প্রকল্পটি হচ্ছে আরাকানের পশ্চিম উপকূলের চকফু বন্দরে একটি বিশেষায়িত অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা। পরিকল্পনায় এর তিনটি অংশ আছে-একটি গভীর সমুদ্রবন্দর, একটি ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক এবং একটি হাউজিং ডেভেলপমেন্ট প্রকল্প। তবে দৃশ্যমান পরিকল্পনার নেপথ্যে চকফু অঞ্চলে গণচীন একটি শক্তিশালী নৌঘাঁটি গড়ে তোলার চিন্তাভাবনা করছে বলেও পাশ্চাত্যের অনেক নিরাপত্তা বিশ্লেষকের ধারণা। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ঠেকাতে চীনের এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণের সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

ভারতেরও গভীর ভূ-রাজনৈতিক ও ভূ-অর্থনৈতিক স্বার্থ রয়েছে আরাকানে। ভারত ও মিয়ানমারের যৌথ উদ্যোগে নির্মীয়মাণ ‘কালাদান মাল্টি-মোডাল ট্রানজিট ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্ট’, সংক্ষেপে ‘কালাদান প্রজেক্টে’র বাস্তবায়নে আরাকানের সহযোগিতা অপরিহার্য। কালাদান প্রজেক্ট ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে আরাকান হয়ে উত্তর-পূর্ব ভারতের অঙ্গরাজ্যগুলোকে সংযুক্ত করার এক মাল্টিমিলিয়ন ডলার প্রজেক্ট। এর তিনটি অংশ। প্রথম অংশ ৫৪০ কিলোমিটারের সমুদ্রপথ, যা বঙ্গোপসাগরের দু’ধারে অবস্থিত পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা এবং আরাকানের সিত্তোয়ি সমুদ্রবন্দরকে সংযুক্ত করেছে। দ্বিতীয় অংশ ১৬০ কিলোমিটারের নদীপথ, যা কালাদান নদী ধরে সিত্তোয়ির সঙ্গে পালেতওয়াকে সংযুক্ত করেছে। শেষ অংশ সড়কপথ, যা পালেতওয়ার সঙ্গে উত্তর-পূর্ব ভারতের অঙ্গরাজ্যগুলোকে সংযুক্ত করেছে। উত্তর-পূর্ব ভারতের অঙ্গরাজ্যগুলোতে উন্নয়ন, নিরাপত্তা বিধান এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় কালাদান প্রজেক্টের বাস্তবায়নের গুরুত্ব বাড়িয়ে বলার অপেক্ষা রাখে না। তাই ভারত অবশ্যই চাইবে আরাকানের নিয়ন্ত্রণ মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ যে পক্ষটির হাতেই থাকুক, তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে।

এ অঞ্চলে নানাবিধ এবং বহুমুখী মার্কিন স্বার্থকে এক কথায় প্রকাশ করা বেশ কঠিন। দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চলকে তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী পরাশক্তি চীনের প্রভাবমুক্ত রাখতে চায়। এজন্য বিদ্যমান মিত্রদের হাতকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি মার্কিনিরা এ অঞ্চলে সমমনা রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে পরিপূরক স্বার্থের ভিত্তিতে জোটবদ্ধ হতে আগ্রহী। মিয়ানমারের জান্তা সরকারের সঙ্গে রয়েছে চীনের দীর্ঘদিনের সখ্য। বলা চলে জান্তার নিরবচ্ছিন্ন সহায়তাই চীনকে মিয়ানমারের মধ্য দিয়ে একটি টেকসই অর্থনৈতিক করিডোর খুলে সরাসরি বঙ্গোপসাগর হয়ে বহির্বিশ্বে পৌঁছে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। পাশাপাশি আরাকান উপকূলে শক্তিশালী নৌঘাঁটি গড়ে তোলার সুযোগ তো থাকছেই। কাজেই চীনের মোকাবিলায় মিয়ানমারে একটি গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির একটি আবশ্যিক পূর্বশর্ত হয়ে পড়েছে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, চীনকে সরাসরি বঙ্গোপসাগরে পৌঁছাতে পুরো মিয়ানমারের সহযোগিতা প্রয়োজন হলেও চীনকে ঠেকিয়ে দিতে আপাতত শুধু আরাকানের সহযোগিতাই মার্কিনিদের জন্য যথেষ্ট। কাজেই আশু ব্যবস্থা হিসাবে আরাকানের স্বাধীনতা বা স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে মার্কিনিদের আগ্রহ তো বটেই, নেপথ্য সমর্থনও থাকতে পারে।

মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পক্ষগুলোর পরস্পরবিরোধী ও পরিপূরক স্বার্থের এ জটিল সমীকরণে বাংলাদেশকে নিজের অবস্থানটি বেছে নিতে হবে খুব সাবধানে। প্রথমেই যা মনে রাখা প্রয়োজন তা হলো, আন্তর্জাতিক সম্পর্কে স্থায়ী বন্ধু বা শত্রু বলে কিছু নেই। এটি দাম্পত্য সম্পর্কের মতো নয় যে মান-অভিমান, দ্বন্দ্ব-সংঘাত শেষে দম্পতিটি আবার সব মিটমাট করে সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে থাকবে। এখানে সম্পর্ক গড়েও ওঠে স্বার্থের ভিত্তিতে, সম্পর্ক ভেঙেও যায় স্বার্থের ভিন্নতার কারণে। শুধু তাই নয়, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক সামষ্টিক অর্থে নয়, বরং পৃথক পৃথক ইস্যুর ভিত্তিতে হয়ে থাকে। যেমন-আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী পরাশক্তি হওয়া সত্ত্বেও এ দুটি দেশ পরস্পরের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার। অর্থাৎ আধিপত্যের প্রশ্নে বিরোধ থাকলেও অর্থনৈতিক স্বার্থে তারা ঠিকই একে অপরের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে। এখানে আবেগ-অনুভূতির কোনো স্থান নেই। সম্পর্কের গোড়াতেই থাকে স্বার্থ।

ঠিক একই কারণে পারস্পরিক সম্পর্ক নির্ধারণের ক্ষেত্রে তৃতীয় কোনো পক্ষকে বিচারক মেনে নেওয়া অথবা সিদ্ধান্ত গ্রহণ কিংবা মধ্যস্থতার দায়িত্ব তৃতীয় কোনো পক্ষের ওপর ন্যস্ত করে হাত গুটিয়ে বসে থাকাও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। কারণ, এক্ষেত্রে তৃতীয় যে পক্ষটিকে বন্ধুরাষ্ট্র হিসাবে ভাবা হয়, সেটিও কিন্তু দিনশেষে প্রেসক্রিপশনটি দেয় তার নিজের স্বার্থের কথাটি মাথায় রেখেই।

বাংলাদেশের নিজের স্বার্থ নিজেকেই দেখতে হবে। সম্পর্ক তৈরি, জোট গঠন কিংবা সমর্থন প্রদানের ক্ষেত্রে অতীত নজিরগুলোকে বিবেচনায় আনতে হবে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রশ্নে নিকট কিংবা সুদূর অতীতে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ পক্ষগুলোর কোনটি কী ধরনের মনোভাব দেখিয়েছে, সেগুলো খতিয়ে দেখতে হবে। অতীত ঘেঁটে দেখতে হবে কোন পক্ষটির সঙ্গে রোহিঙ্গাদের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের দীর্ঘতম ইতিহাস রয়েছে; আর কোন পক্ষগুলো যুগ যুগ ধরে এ অসহায় জনগোষ্ঠীকে স্বার্থ আদায়ের হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করেছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যাদের সঙ্গে আরাকান প্রশ্নে আমাদের স্বার্থের মিল রয়েছে, তাদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে হবে; যৌথ কৌশল নির্ধারণ করতে হবে। সর্বোপরি, ভূ-রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণ করতে হবে ব্যাপক গবেষণার ভিত্তিতে, তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত কিংবা অন্য কোনো রাষ্ট্রের পরামর্শে নয়।

ড. আবদুল্লাহ আল ইউসুফ : আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, শান্তি ও সংঘাত বিশ্লেষক

yusuf.researcher.68@gmail.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন