শেকড় থেকে শুরু হোক রাষ্ট্র মেরামতের কাজ

প্রকাশ : ০৭ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  মো. আনছার আলী খান

জমিদারি প্রথা শেষ হয়েছে সেই কবে। কিন্তু জমিদারদের উত্তরসূরিরা এখনও তাদের জমিদার ভাবতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। কথায়, চাল-চলনে তাদের জমিদারি জমিদারি ভাব। তাদের দিগন্তছোঁয়া ফসলি মাঠ, আস্তাবলে ঘোড়া, বাথান ভরা গরু-মহিষ- সবই আজ অতীত। কিন্তু ভাবখানা তাদের জমিদারি। গায়ে মানে না আপনি মোড়ল- এই আর কী!

জমিদারের হুকুম তামিলে জীবন উৎসর্গ করে যারা একসময় ধন্য হতেন, কালের বিবর্তনে তারাই ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। এভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর বিষয়টি কিন্তু জমিদার বাবুর ক্ষমতাকালীন কোনোদিনই মাথায় আসেনি। কিন্তু সময়মতো ঘটনা ঠিকই ঘটে গেছে।

এখন আর জমিদারদের উত্তরসূরির বাড়ির সামনে কেউ জুতা খুলে বা ছাতা বন্ধ করে হাঁটেন না। বরং মোটরসাইকেলের সাইলেন্সার খুলে অতিরিক্ত ধোঁয়া ছেড়ে বিকট আওয়াজ তুলে জানান দিয়ে যায় জমিদারির দিন শেষ হয়েছে। এমনিভাবে কখন, কার দিন শেষ হবে বা কখন, কে ঘুরে দাঁড়াবে নিশ্চিত করে তা বলা যায় না।

ঘুরে দাঁড়ানোর বিষয়ে কিছু লেখার প্রয়োজনীয়তা থেকে বেশ কিছুদিন পর কলম ধরা। এর আগের কোনো এক লেখায় রাষ্ট্র ও সমাজের ফাঁকফোকড়ে বিভিন্ন রোগের আগাম বার্তার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছিল।

রাষ্ট্র এবং সমাজপতিদের দায়িত্ব সেসব রোগ মহামারী আকার ধারণ করার আগেই তা প্রতিরোধে সাবধানতা অবলম্বন করা। কিন্তু কে শোনে কার কথা এ দেশে! একটি ধ্বংসযজ্ঞ শুরু হলে তখনই ঘুম ভাঙে। মাথা খাটিয়ে, সময় নষ্ট করে, বিনা পারিশ্রমিকে স্বপ্রণোদিতভাবে ভালো কোনো উপদেশ দিলেও পড়ে দেখার তাগিদ কোথায় সংশ্লিষ্টদের? রাষ্ট্র ও সমাজের মঙ্গলের জন্য অনেক ভালো পরামর্শ সংবলিত লেখাগুলোর কোনো কদর সংশ্লিষ্ট মহলে আছে বলে অবহিত না হলেও ঘরের খেয়ে কাজটি অনেকেই করে চলেছেন নিজ নিজ দায় থেকে।

কোমলমতি শিশুদের হাতে যখন প্ল্যাকার্ড দেখা যায় ‘রাস্তা বন্ধ- রাষ্ট্র মেরামতের কাজ চলছে’, সংশ্লিষ্টদের জন্য তখন এটা একটি বিশাল বার্তা। রাষ্ট্র মেরামত করার দায়িত্ব কিন্তু শিশুদের নয়। তবে দায়িত্বপ্রাপ্ত বড়রা যখন এ মেরামতের বিষয়ে তেমন গুরুত্বারোপ করছেন না এবং মেরামত অতি জরুরি হয়ে পড়েছে তখন শিশুরা তো এগিয়ে আসবেই। কারণ দেশটি তাদের জন্য ক্রমান্বয়ে বাসযোগ্যতা হারিয়ে ফেললে তারা যাবে কোথায়?

প্রয়োজনে বিদেশে পাড়ি জমানোর মতো সামর্থ্য কি সব শিশুর বাবা-মা অর্জন করতে সমর্থ হয়েছেন? অবশ্য তাই বলে লেখাপড়া ছেড়ে লম্বা সময় শিশুরা গাড়ি চালকের লাইসেন্স পরীক্ষা করবে, আর এ অজুহাতে দেশের পরিবহন সেক্টর পুরোপুরি ভেঙে পড়বে এটাও তো কাম্য হতে পারে না।

এ ঝাঁকুনি প্রলম্বিত হলে, সংকটাপন্ন কোনো রোগী সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়ে মৃত্যুবরণ করলে, একটানা হেঁটে অফিস-আদালত করতে হলে, পরিবহন সংকটে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের বাজার অস্থিতিশীল হলে একসময় সাধারণ মানুষ বিরক্ত হয়ে ওঠার দৃষ্টান্ত নিকট অতীতে দেশবাসী প্রত্যক্ষ করেছেন। তার খেসারত দিতে গিয়ে অস্তিত্ব সংকটে সংশ্লিষ্টদের নাভিশ্বাস চরমে ওঠার বিষয়টি সুখকর নয়।

যে কোমলমতি শিশুদের মনে কোনো কালিমার দাগ লাগেনি, যাদের দিকে আঙুল তুলে কেউ কোনো অপবাদ দেয়ার সাহস রাখেন না, নষ্ট রাজনীতি যাদের এখনও স্পর্শ করতে পারেনি, তারা যে রাষ্ট্রকে বিরাট আকারে ঝাঁকুনি দিতে পারে তা ইতিমধ্যেই প্রমাণ হয়ে গেছে।

অবস্থা এমন যে, কোমলমতি শিশুদের ন্যায্য অরাজনৈতিক দাবি আদায়ের আন্দোলনকে সরকার পতনের আন্দোলনে মোড় ঘোরানোর অপকৌশল গ্রহণ করে শিশুদের বিতর্কিত করার অপচেষ্টা ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। তাই অভিজ্ঞজনদের অভিমত হল :

শিশুদের আন্দোলনের সম্মানজনক আপাত নিষ্পত্তি হিসেবে তাদের যৌক্তিক দাবিগুলো স্বল্পমেয়াদে পূরণ করার জন্য দিন, তারিখ উল্লেখ করে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা প্রদান;

অধিকাংশ এবং গুরুত্বপূর্ণ দাবি যাতে জাতীয় নির্বাচনের সিডিউল ঘোষণার আগে বাস্তবায়ন হয়, পরীক্ষান্তে অনুরূপ ঘোষণা প্রদান;

অনূর্ধ্ব তিন মাসের জন্য সরকারকে সময় বেঁধে দিয়ে আন্দোলন স্থগিত ঘোষণা করে শিশুদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ফিরে গিয়ে লেখাপড়ায় মনোযোগী হওয়া।

সুনির্দিষ্ট অন্যায়ের বিরুদ্ধে শিশুমনে প্রজ্বলিত বিদ্রোহের আগুনে দেশের পরিবহন খাত যেভাবে ঝাঁকুনি খেয়েছে, এমনি ঝাঁকুনিতে নিজ পরিবার বা তাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো হুমকির মুখে রয়েছে।

রাজপথ থেকে পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ফেরত গিয়ে যদি তারা আবার শুনতে পায়- সদা সত্য কথা বলিবে, গুরুজনকে মান্য করিবে, তখন কি তাদের বিদ্রোহী মনে প্রশ্ন উঠবে না যে, নিজেরাই মিথ্যাচারে ডুবে থেকে, বৃদ্ধ বাবা-মাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে এসে সন্তানদের অনুরূপ কাজে শিক্ষাদান মানানসই নয় । বাবা-মা বা শিক্ষক যিনিই হোন, তাদের এরূপ আচরণে শিশুরা কি ঘুরে দাঁড়াতে পারে না?

শিশুরা এ কাজটি করতে শুরু করলে মেরামতের কাজ শুরু হবে শেকড় থেকে। পরিবারপ্রধানের দায়িত্ব কেবল যেনতেন উপায়ে সম্পদ অর্জন নয়। একটি আদর্শ পরিবার গঠনে যা যা উপকরণ প্রয়োজন, একটি পরিবারে সেসব উপকরণ অনেকটাই অনুপস্থিত। কেবল সম্পদ অর্জনের অস্থির প্রতিযোগিতায় আদর্শ পরিবারের চাহিদা ও জোগানের মধ্যে বিস্তর তফাৎ সৃষ্টি হয়েছে।

বাবা-মায়ের অহেতুক অস্থিরতা শিশুমনকে ভাবিয়ে তুললেও মুখ ফুটে তারা কিছু বলতে পারছে না। যার কাজ যা, তা তিনি না করলে কেউ না কেউ, কখনও না কখনও সে কাজটি করার জন্য এগিয়ে আসতেই পারে। যে দেশের কোমলমতি শিশুরা সহপাঠীর মর্মান্তিক মৃত্যুকে কেন্দ্র করে দেশকে অচল করে দেয়ার ক্ষমতা রাখে তাদের সম্মিলিত শক্তিকে হিসাবে না রাখা অজ্ঞানতার শামিল।

প্রায়ই শোনা যায়, স্কুলফেরত সন্তান বাসায় নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে সময় কাটানোর পথ খুঁজে নিয়েছে। সে নিত্যদিন দেখে আসছে সম্পদের নেশায় মত্ত হয়ে বাবা তার মাকে সময় দেন না। একসময় সেই মাও নিজ সন্তানকে সময় না দিয়ে টিভি সিরিয়াল আর ফেসবুকে সময় কাটান।

একসময় হয়তো বাবা বা মা বা উভয়ের নানা কুকীর্তি সন্তানের সামনে উন্মোচিত হয়ে পড়ে। সংখ্যায় খুব বেশি না হলেও উন্মুক্ত মিডিয়া জগতে মুখরোচক এ ধরনের সংবাদ একেবারে কম চোখে পড়ে না। যদিও প্রকৃত চিত্র আরও ভয়াবহ। ফলে সন্তানের বখে যাওয়া বা মাদকাসক্ত হয়ে মৃত্যুর দিকে ধাবিত হওয়ার বিষয়টি দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। বিষয়টি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে তা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে ইতিমধ্যেই স্থান পেয়েছে।

অপার সম্ভাবনার দেশ আমাদের এই সোনার বাংলাদেশ। মাত্র কয়েকদিনের আন্দোলনে দেশব্যাপী যারা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসতে পারে, তারা অনেক কিছুই করে দেখাতে পারে এ সমাজকে বদলে দিতে। মাঝে-মধ্যে স্লোগান দেখা যায়- ‘আসুন নিজকে বদলাই, দেশ বদলে যাবে’। এ বদলে যাওয়া কেবল ব্রিটিশ ভারত থেকে পাকিস্তান বা পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ নয়। এ বদল হবে রাজার প্রজা হওয়া বা প্রজার রাজা হয়ে প্রজার রাজ্য কায়েম করা।

আন্দোলনরত সব ছাত্রই ক্ষমতা রাখে, এমন একটি পরিবর্তনের, যা সে তার পরিবার থেকেই শুরু করতে পারে। যে শিশু কোনো একটি যুক্তিসঙ্গত ইস্যুতে রাজপথে নেমে সংবাদকর্মী, পুলিশ বা মন্ত্রীর গাড়ি আটকিয়ে গাড়িচালকের লাইসেন্স পরীক্ষা করার সক্ষমতা রাখে সে শিশু তার বাবাকে অবশ্যই জিজ্ঞেস করার ক্ষমতা রাখে তাকে বহনকারী দামি গাড়িটি সৎ আয়ের অর্থে কেনা হয়েছে কিনা।

জিজ্ঞেস করতে পারে তাদের বাড়ি বা সুসজ্জিত ফ্ল্যাটটি কিভাবে কেনা হয়েছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বা ৪-৫টি প্রাইভেট টিচার বা কোচিংয়ের এত এত খরচ কিভাবে জোগান দেয়া হচ্ছে। ঈদ বা নানা পার্বণে জোড়ায় জোড়ায় হরেকরকমের বাহারি পোশাকের যে খরচ তা ঈদ উৎসবের অর্থে মিলছে কিনা ইত্যাদি কত শত প্রশ্ন কি সন্তানরা তাদের বাবা-মাকে করতে পারে না?

নিষ্পাপ শিশুরা অবশ্যই সদা সত্য কথার চর্চা করবে যদি তাকে সেভাবে অভ্যস্ত করে তোলা যায়। সৎ আয়ে উপার্জিত অর্থে বাবা-মায়ের কষ্টকে তারা অবশ্যই শেয়ার করবে যদি বাবা-মায়ের সততায় তাদের মুগ্ধ করা যায়। মন্ত্রী মহোদয়রা যেমন ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেননি স্কুলপড়ুয়া শিশুর কাছে তাদের হেনস্তা হতে হবে। তেমনি বাবা-মাও ভাবতে পারছেন না অবৈধ অর্থে কেনা বাড়ির সুউচ্চ ছাদ থেকে তার আদরের শিশুটি যে কোনো সময় লাফ দিয়ে জানান দিতে পারে এ ঘোষণা দিয়ে যে ‘সে বাড়ি তার কাছে অসহ্য যন্ত্রণা’। কেউ কেউ বলে থাকেন সব সম্ভবের দেশ এই বাংলাদেশ।

এ দেশে মায়ের মুখের ভাষার মর্যাদা রক্ষায় দামাল ছেলেরা বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিতে পারে। দেশকে শত্রুমুক্ত করতে খালি হাতে যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে পারে। দেশমাতৃকার সম্ভ্রম রক্ষায় লাখো জনতা হাসিমুখে প্রাণ বিসর্জন দিতে পারে।

রাষ্ট্র মেরামতের কাজ যদি নিজ নিজ পরিবার থেকে শুরু হয়, তবে এর থেকে ভালো কাজ আর কী হতে পারে! স্কুলপড়ুয়া সন্তানটি যদি এই বলে অনশন শুরু করে যে, সংসারের বৈধ আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সামঞ্জস্য না দেখে সে খাবার টেবিলে বসবে না এবং এরূপ একটি খবর মিডিয়ায় দেখে দেশের সব শিশু যদি সে অনশনের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে তাহলে সারা বিশ্বের সব মিডিয়া ছুটে আসবে।

বাংলাদেশের শিশুদের প্রশংসায় বিশ্ববিবেক জেগে উঠবে। যে শিশুটি তার বাবা-মায়ের অবৈধ কাজটির সঙ্গত প্রতিবাদ করবে সে নিজে নিশ্চয়ই এমন কোনো কাজ করবে না যা দেখে কেউ তাকে লজ্জা দিতে পারে। কোনো ভবনের ৫ জন, পাড়া-মহল্লার ১০ জন, এভাবে কোনো প্রতিষ্ঠানের ১০০ জন, সব মিলিয়ে ৫০০ জন বা যে কোনো একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সব শিশু একত্রিত হয়ে নিজ নিজ পরিবারকে বদলে দেয়ার শপথ নিলে তা থেকে সারা দেশের অগণিত কোমলমতি শিশু উৎসাহিত হয়ে সমাজকে একটি বিশাল ঝাঁকুনি দিতে পারে। এমন একটি ঝাঁকুনি এখন খুবই প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।

এরূপ ঝাঁকুনিতে রাষ্ট্র, সমাজ বা কোনো প্রতিষ্ঠান বিব্রত হবে না। এখানে রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করার কোনো রসদ মিলবে না। সরকারকে ফেলে দেয়ার কোনো হুমকি থাকবে না। নষ্ট রাজনীতি আর ক্ষমতা প্রাপ্তির অভিলাষ চরিতার্থ করার জন্য অহেতুক সুড়সুড়ি দেয়ার সুযোগ থাকবে না। তবে সন্তানকে ত্যাজ্য করার হুমকি দেখা দিতে পারে। সে ক্ষেত্রে সংঘবদ্ধ আন্দোলনে পিতা-মাতারই ত্যাজ্য হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

তবে নাকে খত দিয়ে নিজের একটি আদর্শ পরিবার পুনঃপ্রতিষ্ঠার সুযোগ থাকবে, যে ধরনের আদর্শ পরিবার গঠন করেছিলেন তার পূর্বপুরুষরা। শেকড় যখন মেরামত হয়ে যাবে তখন বৃক্ষ আপনা থেকেই তরতাজা হয়ে উঠবে। পত্রপল্লবে সুশোভিত সে বৃক্ষে সুমিষ্ট গন্ধ ছড়িয়ে ফুল আসবে, সুস্বাদু ফল হবে। দেশি-বিদেশি পাখ-পাখালি উড়ে উড়ে বেড়াবে সে সবের আকর্ষণে। বৃক্ষতলে জমবে মেলা, ধন্য হবে দেশ।

মো. আনছার আলী খান : অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব

[email protected]