আসামে নাগরিকত্ব নিয়ে অমানবিকতা

  পবিত্র সরকার ১০ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আসামে নাগরিকত্ব নিয়ে অমানবিকতা

ভারতের পুবপ্রান্তে একটি সুন্দর প্রদেশ আসাম, তার সংস্কৃতি সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যপূর্ণ। ইংরেজি বর্ণানুক্রমে ভারতীয় রাজ্যগুলোর প্রথমে থাকলেও তা এতকাল কিছুটা গৌণ ও প্রান্তিক অবস্থানেই ছিল।

হঠাৎ সারা পৃথিবীর কৌতূহলী দৃষ্টির সামনে এই রাজ্য উঠে এসেছে, সবাই ওই ছোট্ট প্রদেশটিতে কী ঘটছে তা কমবেশি বোঝার চেষ্টা করছে।

অন্যদের কাছে যা নিছক কৌতূহল, প্রায় চল্লিশ লাখ ভারতবাসীর কাছে তা জীবন-মরণ সমস্যা। ভারতের অন্যান্য প্রদেশে যা শোনা যায়নি, আসামের ক্ষেত্রে তা কার্যকর করা হয়েছে, একটি এনআরসি বা ‘ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজেনস’ তৈরি করে চল্লিশ লাখের মতো মানুষকে নাগরিক নয় বলে ঘোষণা করা হয়েছে। মনে রাখতে হবে, কয়েক মাস আগে আরেকটি এনআরসি তালিকা প্রকাশিত হয়েছিল, তাতে বরাক উপত্যকার খ্যাতিমান নাগরিক তপোধীর ভট্টাচার্যের নাম বাদ ছিল। এবারের তালিকায় তিনি তার নাম উদ্ধার করতে পেরেছেন (তপোধীর আসামের বাঙালিদের একজন সংগ্রামী মুখপাত্র), কিন্তু বাদ গেছে অসম বিধানসভার ডেপুটি স্পিকারের স্ত্রীর নাম, মোরিগাঁওয়ের বিধায়কের নামসহ আরও অনেকের নাম। তিরিশ বছর ভারতীয় সেনাবাহিনীতে চাকরি করে আসামবাসী মহম্মদ আজমল হক দ্বিতীয় তালিকা থেকেও বাদ পড়েছেন। অর্থাৎ দুটি তালিকাই নানা কারণে প্রশ্নাধীন হয়ে উঠেছে, যদি বিদ্বেষপ্রণোদিত বা হাস্যকর নাও বলা যায়।

প্রশ্ন উঠবে- দেশটা তো ভারত, আসাম ভারতেরই অংশ। এখানে যারা ভোগ দেয় তারা ভারতের নাগরিক, কোনো রাজ্যের নাগরিক নয়। তবে আসামে অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় যা ছিল, তাকে ইংরেজিতে ‘প্যারানোইয়া’ বলা যায়, বাংলায় বলতে পারি ‘ভ্রমাতঙ্ক’, অর্থাৎ একটা ভুল ধারণাজনিত আতঙ্ক। মূল আসামবাসীর মনোভাব যাই হোক, আসামের শাসকেরা এই আতঙ্ক জিইয়ে রেখে ভোট-নদী পার হওয়ার চেষ্টা করেছেন; কংগ্রেস, অগপ- কেউ বাদ ছিলেন না।

সে আতঙ্ক দুটি বিষয়ে। এক. আসাম ভাষাগত সংখ্যালঘু হয়ে পড়েছে, অর্থাৎ মূলত বাংলাভাষীদের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার ফলে তাদের সংখ্যা কমে যাচ্ছে; আর দুই. এরা ধর্মীয় সংখ্যালঘুও হয়ে পড়ছেন, কারণ আগেকার পূর্ববঙ্গ, পূর্ব পাকিস্তান আর পরে বাংলাদেশ থেকে আগত মুসলমানরা আসামে প্রবেশ করে সেখানকার হিন্দু জনসংখ্যা কমিয়ে আনছেন।

অর্থাৎ ভাষা ও ধর্ম- দু’দিক থেকেই অসমিয়া হিন্দুরা আক্রান্ত হয়ে পড়ছেন। তাই ভারতের অন্যান্য প্রদেশের ক্ষেত্রে না হলেও আসামের সেনসাস বা জনগণনা প্রায়ই বিঘ্নিত হয়েছে।

ঠিকঠাক জনগণনা হলেই নাকি ওই ভয়ংকর ছবি বেরিয়ে আসবে- এই ছিল আতঙ্কের মূলে। সব দলের সরকারকেই এই আতঙ্কের সঙ্গে বোঝাপড়া করতে হয়েছে, তা আমরা আগে বলেছি। আসলে এনআরসি শুরুই হয়েছিল রাজীব গান্ধীর আমলে, ১৯৮৫ সালে, তার সঙ্গে অল আসাম স্টুডেন্টস ইউনিয়ন বা ‘আসু’র এক চুক্তির মাধ্যমে।

বাংলা ভাষা সম্বন্ধে অসমিয়াদের ভীতির একটা ঐতিহাসিক কারণ আছে, হয়তো বাঙালিদের সম্বন্ধেও। এক সময় আসাম বঙ্গ প্রদেশের সঙ্গে যুক্ত ছিল, পরে পৃথক হওয়ার পরও বাংলা ভাষার আধিপত্য ছিল আসামের স্কুলে, রবীন্দ্রনাথও এক সময় সাময়িক মতিভ্রমবশত এই ভাষার আধিপত্যকে সমর্থন করেছিলেন। পরে তিনি নিজের ভুল সংশোধন করেন এবং আসামও নিজের ভাষা আর সংস্কৃতিকে এখন এক সমৃদ্ধ অবস্থানে নিয়ে আসতে পেরেছে।

অন্যদিকে আসামের বাঙালিরা বহুলাংশে বহিরাগত নয়। বরাক উপত্যকায় হিন্দু-মুসলমান বাঙালি ভূমিপুত্র হিসেবে শতাব্দীর পর শতাব্দী বাস করে এসেছে। এই বাংলাভাষী হিন্দু-মুসলমানদের বহিরাগত বলে মার্কা মেরে দেয়া বা তথাকথিত illegal migrant-এর তকমা দেয়া সত্যের ঘৃণ্য অপলাপ মাত্র। আর পূর্ব পাকিস্তান থেকে যেসব বাঙালি মুসলমান আসামে গেছেন, তা অনেক সময় অসমিয়াদেরই আমন্ত্রণে, তাদের জমি চাষ করার জন্য। এবং সে জমিতে তারা সোনা ফলিয়েছেন। তাদের অনেকেই অসমিয়া ভাষা শিখে অসমিয়া জনজীবনে মিশে গেছেন, অনেককে জনগণনায়

মাতৃভাষা হিসেবে অসমিয়াকে লিখতে বাধ্য করা হয়েছে।

এখন ভাষা আর ধর্ম- দুই-ই হয়ে উঠেছে এনআরসির স্ক্রুটিনির বস্তু, দুটোই সমান অপরাধ। যেন এ দুটোই বেআইনি বহিরাগতদের অভ্রান্ত প্রমাণ। এরা অনেকেই আসামের নির্বাচনে ভোট দেয়, ফলে ভারতের বৈধ নাগরিক। হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্রশক্তি এদের নাগরিক অধিকার কেড়ে নিতে বদ্ধপরিকর। যদি বহিরাগত কেউ থাকে- দুই রাষ্ট্রের সীমানা তো ইস্পাতের দেয়ালে গাঁথা নয় যে, মানুষ বা প্রাণী ঢুকে পড়তে পারবে না। আর প্রয়োজন মানুষকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করে, সাময়িক হোক, আর দীর্ঘস্থায়ী। যেখানে এক বাড়ির মাঝখান দিয়ে দু’দেশের সীমানা চলে যায়, গ্রামের হাট পড়ে ওপারে, সেখানে মানুষকে কে রুখবে। আমরা মুখে ‘দ্য গ্লোবাল ভিলেজ’ বা ‘ভুবনগ্রাম’ বলব আর মানুষকে তার রাষ্ট্রের সীমানায় শেকল বেঁধে রাখব, এমন কি কখনও হতে পারে? আর পৃথিবীতে একরঙা রাষ্ট্র বলে কিছু থাকবে কিনা সন্দেহ- সাদা, খ্রিস্টান, হিন্দু, বৌদ্ধ- এ রকম মোটা রঙে কোনো মানচিত্র আঁকা সম্ভব হবে না। তাই যারা আসামের দীর্ঘদিনের নাগরিক, শাসকের সংকীর্ণ দর্শনের ধাক্কায় তাদের বহিষ্কার করা শুধু দেশের নয়, আন্তর্জাতিক আইনেরও পরিপন্থী হবে। আমেরিকা, ব্রিটেন আর অবিমিশ্রভাবে সাদা নেই, এক ধর্মের দেশও নয়। এই উপমহাদেশ এক সময় ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ হয়েছিল, তা টেকেনি, কারণ তা মানুষের কোনো সমস্যার সমাধান করেনি। যারা ভেবেছিল এক ধর্মের দেশ হলেই দেশে দুধ আর মধুর নদী বয়ে যাবে, তারা পাকিস্তানের দশা দক্ষে শিক্ষা নিতে পারেন।

রাষ্ট্র যদি তথাকথিত অনুপ্রবেশকারীকে আটকাতে না পারে, সেটা রাষ্ট্রের ব্যর্থতা। যতদূর মনে হয়, তা আটকানোর কোনো ছিদ্রহীন উপায় রাষ্ট্রের হাতে নেই। রাষ্ট্রকে এই বাস্তবতা স্বীকার করতে হবে। এই ব্যর্থতাকে ঢাকবার জন্য রাষ্ট্র প্রতিহিংসার আশ্রয় নেবে, এর চেয়ে অমানবিক আর কিছু হতে পারে না। কিন্তু মানবিকতা নামক বিষয়টি দেখছি রাষ্ট্রের বিবেচনার মধ্যে পড়ে না।

পবিত্র সরকার : লেখক; সাবেক উপাচার্য, রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা

ঘটনাপ্রবাহ : আসামে বাঙালি সংকট

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter