এসব কী হল এ ক’দিন?

প্রকাশ : ১১ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  আনু মুহাম্মদ

পরপর কয়েকদিন ধরে হেলমেট, লাঠি, দা, চাপাতি, রিভলবারসহ যারা সাধারণ শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকদের ওপর হামলা করেছে, গাড়ি-ক্যামেরা ভাংচুর করেছে, তাদের গ্রেফতারে কোনো উদ্যোগ নেই, থাকার কথাও নয়, কারণ তারা পুলিশের সঙ্গেই ছিল। কিন্তু অন্যদিকে ত্রাস সৃষ্টি করা হয়েছে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে।

ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে ‘কটূক্তি’ করার অভিযোগেও শিক্ষার্থীদের বহিষ্কার করা হয়েছে, স্কুলগুলোতে নোটিশ পাঠানো হয়েছে তালিকা পাঠাতে, পথেঘাটে তরুণ-কিশোরদের হয়রান করা হচ্ছে। আটক করে রিমান্ডে পাঠানো হয়েছে তরুণ শিক্ষার্থীদের। প্রায় দেড় হাজার অজ্ঞাতনামা শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে মামলা করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে সারা দেশে ত্রাস বিস্তারের, আটক বাণিজ্যের, সর্বস্তরে জুলুম করার অধিকার। বস্তুত গত কয়েক মাসে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর একটানা আক্রমণের রেকর্ড করেছে সরকার।

সাতদিন ধরে সড়কে ছিল কিশোর বাহিনী। কোনো বিশৃঙ্খলা করেনি, ভাংচুর করেনি। সরকারের আশ্বাস বাস্তবায়নের পথ দেখতে চেয়ে নিজেরাই দিনভর পরিশ্রমের পথ বেছে নিয়েছে। লাইসেন্স-ফিটনেস দেখেছে, রাস্তায় শৃঙ্খলা এনেছে। শৃঙ্খলাবদ্ধ হয়েছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের সড়ক চলাচল, বিনা পয়সায় তারা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করেছে।

উল্টো সারা দেশে জনগণের সমস্যা হয়েছে মাফিয়া চক্রের ধর্মঘটের কারণে, সন্ত্রাসী তৎপরতার কারণে। তারা লাইসেন্স ও ফিটনেস ছাড়াই বাস ও দেশ চালাতে চায়, সমস্যা সেখানেই! এই আন্দোলনের মধ্যেও সড়ক দুর্ঘটনায় শিক্ষার্থী, শিক্ষক, চালক, পথচারীসহ ১০ জনেরও বেশি নিহত হয়েছেন।

সরকার তখন বলেছে আমরা নতুন আইন করব। শিক্ষার্থীদের বক্তব্য ছিল, তাতে কী লাভ হবে? মন্ত্রী, পুলিশ কর্মকর্তাসহ সরকারি বড় কর্মকর্তা, ভিআইপি, সিআইপি ধরা খেয়েছে এই কিশোরদের হাতে। বহু গাড়ি চালকের লাইসেন্স নেই কিংবা মেয়াদোত্তীর্ণ, ফিটনেস নেই। পুরনো আইনে কি এগুলো চলে? চলে না। তাহলে নতুন আইন করব বললেই আস্থা পাবে কী করে মানুষ?

সেজন্যই কিশোর শিক্ষার্থীরা রাস্তা ছাড়ার যুক্তি পায়নি। তারা সরকারের দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখতে চেয়েছে। আর সর্বজনের স্বার্থে শ্রমক্লান্ত, ক্ষুধার্ত, ঘর্মাক্ত সেই শিশু-কিশোরদের ওপরই পুলিশ সহযোগে ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীদের হামলা ঘটেছে। নিরস্ত্র, দায়িত্বশীল, সুশৃঙ্খল, শান্তিপূর্ণ, প্রতিবাদী কিশোর ছেলেমেয়েরা সারা দেশ এবং বিশ্বের মানুষের সামনে এক মুগ্ধ বিস্ময় ও আশাবাদিতা তৈরি করেছে এবং তাদের ওপরই ঝাঁপিয়ে পড়েছে দুর্বৃত্তরা লাঠিসোটা, গোলাবারুদ নিয়ে। গুলি, যৌন আক্রমণ, লাঠি কোনোকিছুই বাদ দেয়নি এরা। সাংবাদিকরাও রেহাই পায়নি। শতাধিক শিশু-কিশোর শিক্ষার্থী ছেলেমেয়ের শরীরে এখন সরকারি পুলিশ কিংবা সন্ত্রাসীদের আঘাত।

৪ আগস্ট বেলা ১টা থেকে শিক্ষার্থীদের ওপর আক্রমণ শুরু হয়েছে ব্যাপকভাবে। ক্যামেরা ভাংচুর করে সাংবাদিক পিটিয়ে তাড়ানোর পর বিকাল থেকে নানা সত্য-মিথ্যা খবরে ভারি হয়েছে শহর। সন্ধ্যা থেকে সরকার ও মিডিয়া নিহত ও ধর্ষণের খবর যে গুজব সে কথাই বারবার বলেছে।

কিন্তু এসব গুজব রটার পেছনে দায়ী কে? যদি খবর প্রকাশে বাধা দেয়া হয়, যদি সাংবাদিকদের ক্যামেরা-ল্যাপটপ আছড়ে ভেঙে ফেলা হয়, যদি অকুস্থলে সাংবাদিকদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয় তাহলেই গুজবের ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়। প্রত্যক্ষদর্শী লাবনী মণ্ডল জানিয়েছেন, ছাত্রলীগ-যুবলীগের সন্ত্রাসীরা ‘ছাত্রীদের শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেছে... মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছে। পুলিশ লাঠিচার্জ করেছে, গুলি, টিয়ার শেল ছুড়েছে। হাসপাতালে ইমার্জেন্সির গেট বন্ধ করে দিয়েছে।

মিডিয়ার ক্যামেরা, ব্যক্তিগত মোবাইল, ক্যামেরা ভেঙে দিয়েছে, কেড়ে নিয়েছে। ছাত্রীদের পরিবারকে হুমকি দিয়েছে। ছাত্রের চোখে আঘাত করে চোখ উপড়িয়ে ফেলার চেষ্টা করেছে। নারীদের চুল ধরে টানাটানি হয়েছে, স্কুল ড্রেস ছিঁড়ে ফেলেছে।’ সাংবাদিক মাহতাব উদ্দীন জানিয়েছেন, ‘ছাত্রলীগ-যুবলীগের যত চোটপাট দেখলাম সেটা পুলিশ প্রটেকশনে। জিগাতলা বাসস্ট্যান্ডে। পুলিশের টিয়ার গ্যাসের সহায়তা ছাড়া কিশোরদের পাল্টা ধাওয়া ঠেকাতে তারা অক্ষম ছিল। কিশোররা প্রায় সবাই চলে যাওয়ার পরে অবশ্য তাদের চোটপাটের এলাকা বিস্তৃত হয়েছিল।...ছাত্রলীগ-যুবলীগের পাশে পুলিশ ছাড়া আর কেউ ছিল না। কিশোরদের সর্বতোভাবে সাহায্য করছিলেন এলাকাবাসী। কিশোর আন্দোলনকারীরা এমন স্পিরিটে ছিল যে তারা আক্ষরিক অর্থেই মরার জন্য প্রস্তুত ছিল। কিন্তু তবু তারা দাবি না আদায় করে সরবে না। তাদের দেখে আমার মনে হয়েছিল যে আমি কিশোর আন্দোলনকারীদের নয়, জীবন বাজি রাখা মুক্তিযোদ্ধাদের দেখছি। এত মার খাওয়ার পরও কিশোরদের মাঝে আমি কোনো আহা-উহু দেখিনি। দেখেছি ক্রোধ আর মুক্তিযোদ্ধার শক্ত চোয়াল।’

আরেকজন প্রত্যক্ষদর্শী নৃবিজ্ঞানী নাসরিন সিরাজ জানিয়েছেন কীভাবে জখম নিয়ে কিশোর শিক্ষার্থীরা রাস্তায় পড়ে ছিল, কীভাবে বিভিন্ন বয়সের মানুষকে মায়েরা উঠিয়ে নিয়ে হাসপাতালে গেছে। প্রত্যক্ষদর্শী শিক্ষক বীথি ঘোষ জানিয়েছেন, রাত ১০টা নাগাদও কয়েকশ’ শিক্ষার্থীসহ অনেকে বিভিন্ন ভবনে আটকে ছিল। ৫-৬ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদে নামলে সরকারি সন্ত্রাস আরও বিস্তৃত হয়। এসব ঘটনা নিয়ে কথা বলার অপরাধেই বিশ্ববিখ্যাত আলোকচিত্র শিল্পী শহিদুল আলমকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে নির্যাতন করেছে সরকারি বাহিনী।

শুধু এই হামলাতেই সরকারের নির্বোধ তৎপরতা সীমিত ছিল না। পরিবহন শ্রমিকদের উসকানি দিয়ে শিক্ষার্থীদের মুখোমুখি দাঁড় করানোরও চেষ্টা করা হয়েছে। লাইসেন্স-ফিটনেস ধরার ভয়ে শহরে আগেই কমে গিয়েছিল বাস চলাচল, এরপর ‘নিরাপত্তার’ অজুহাতে সারা দেশে যান চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে তারা। এসব কাজে শ্রমিকদেরই ব্যবহার করা হয়, অথচ পরিবহন শ্রমিক সংগঠন নামে সরকারি মন্ত্রী নেতৃত্বাধীন যে সংগঠন আছে তা কখনই এই খাতের শ্রমিকদের প্রকৃত স্বার্থ দেখেনি।

সব আমলেই টার্মিনাল দখল, বিশাল চাঁদা আদায়, মাদক পাচার, প্রতিপক্ষ দমনের কাজে তাদের ব্যবহার করা হয়েছে। তাদের কাজের সময়, আয়, জীবনযাপন, সন্তানদের ভবিষ্যৎ সবকিছুকেই অনিশ্চয়তায় ঝুলিয়ে তাদের লাঠিয়াল বানানো হয়েছে। শ্রমিকরা যাতে ৮ ঘণ্টা কাজ করে বাঁচার মতো মজুরি পায় তার চেষ্টাও কখনও করা হয়নি। প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে তাদের সক্ষম করে তোলা হয়নি। তাদের মজুরি, ছুটি, বোনাস, সন্তানদের শিক্ষা, চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়নি, এসব দাবি নিয়ে আন্দোলনও করা হয়নি। আশা রাখি, যে শিক্ষার্থীরা রাস্তা ঠিক করতে নেমেছিল তারাই একদিন পরিবহন শ্রমিকদের এসব দাবি নিয়েও প্রয়োজনে রাস্তায় দাঁড়াবে। শিক্ষার্থী ও শ্রমিকের ঐক্যই বাংলাদেশকে উদ্ধার করতে পারবে মাফিয়াদের হাত থেকে।

‘যদি তুমি ভয় পাও তবে তুমি শেষ, যদি তুমি রুখে দাঁড়াও তবে তুমি বাংলাদেশ’; ‘রাস্তা বন্ধ। রাষ্ট্র মেরামতের কাজ চলিতেছে।’.... ‘আমরা যদি না জাগি মা কেমনে সকাল হবে?’- এরকম অসাধারণ সব স্লোগান নিয়ে সারা দেশে অভূতপূর্ব জাগরণ এনেছিল স্কুলের ছোট ছেলেমেয়েরা। মন্ত্রী থেকে পুলিশ, ভিআইপি থেকে সিআইপি সবার ওপর কর্তৃত্ব করেছে ওরা। হাতেনাতে প্রমাণ করেছে এই রাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তিরা আইন-নিয়ম ভেঙে গায়ের জোরে দেশের ওপর কর্তৃত্ব করছে, তাদের জন্যই মানুষের জীবন ও সম্পদ হুমকির মুখে।

এই ছোট ছেলেমেয়েদের রাস্তা দখল আর কর্তৃত্বের অধিকার কে দিল? দিল তাদের তিক্ত অভিজ্ঞতা আর মালিকানাবোধ। তারা বড়দের শেখাচ্ছে এদেশের মানুষ প্রজা নয়, তারা নাগরিক, নাগরিকের অধিকার লুণ্ঠিত হলে তা প্রতিষ্ঠার অধিকার ও দায়িত্ব তাদের আছে। এদেশের মালিক এদেশের মানুষ; কিছু লোভী ব্যক্তি আর নিপীড়ক গোষ্ঠী নয়। বড়রা যদি এই মালিকানা দাবি করতে না পারে তাহলে ছোটরাই করবে। বয়সে ছোটরাই বয়সে বড়দের পথ দেখাবে।

রাস্তায় নেমে আসা শিক্ষার্থীরা বড় হয়েছে গত দশ বছরে এই আওয়ামী লীগ শাসনামলেই। এ সময়ে তারা অসংখ্যবার শুনেছে, পড়েছে এবং আত্মস্থও করেছে এই কথাই : ‘আর দাবায়া রাখতে পারবা না..’ ‘রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেবো...’। এদের প্রতারণা করে, নিপীড়ন করে, রক্ত নিয়ে, দাবায়া রাখার বাহাদুরি করে কোনো লাভ হবে না।

বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক নাম পিপলস রিপাবলিক অব বাংলাদেশ। এর বাংলা করা হয়েছে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ। রিপাবলিকের বাংলা কেন প্রজাতন্ত্র? প্রজা থাকলে তো রাজাও থাকে, ঘটনা তাই ঘটেছে। রাজার ভাব নিয়ে দেশের শাসকরা দেশ চালিয়ে যাচ্ছে দশকের পর দশক। কিন্তু আমরা কারও প্রজা নই, আমরা নাগরিক। নাগরিকদের নাগরিক হয়ে ওঠার ঘটনার মধ্য দিয়েই আমরা নিজেদের খুঁজে পাই। এরকম মুহূর্তেই তৈরি হয় প্রকৃত বাংলাদেশ।

আনু মুহাম্মদ : অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ