বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি সম্পর্কে কিছু জরুরি কথা

  ড. মো. রফিকুল ইসলাম ১১ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বড়পুকুরিয়া

আমার পুরনো কর্মস্থল হিসেবে এবং বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির ওপর জাপানি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলাদেশের প্রথম ডক্টরেট ডিগ্রিধারী হওয়ার সুবাদে প্রিয় ছাত্রছাত্রীসহ দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অসংখ্য আগ্রহী পাঠক আমাকে বারবার প্রশ্ন করছেন, বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির উত্তোলিত কয়লা চুরির অভিযোগ নিয়ে আপনি কেন চুপ করে বসে আছেন? কয়লা খনির প্রযুক্তিগত দিকসংক্রান্ত সঠিক বার্তা দেশবাসীকে অবহিত করছেন না কেন? আগ্রহী পাঠকের মনের প্রশ্নগুলো সামনে রেখে এ প্রবন্ধটি লেখার অবতারণা।

মিডিয়ায় খবর প্রকাশের পরদিন ক্লাসে আসার পরপরই আমার প্রিয় ছাত্রছাত্রীদের প্রথম প্রশ্ন ছিল, বড়পুকুরিয়া কয়লা খনিতে হরিলুট হয়েছে এবং ২০০৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে শুরু করে ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত সময়ের ব্যবধানে ১ লাখ ৪৪ হাজার মেট্রিক টন (প্রায়) কয়লা গায়েব হওয়ার ঘটনার সত্যতা সম্পর্কে আপনার প্রযুক্তিগত মতামত কী? বললাম, আমি আজ মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের একজন গবেষক শিক্ষক না হয়ে যদি বড়পুকুরিয়া কয়লা খনিতে কর্মরত থাকতাম, তাহলে মিডিয়া জগতের অনেকেই কিছু বুঝে, না বুঝে এবং সাধারণ মানুষের অনেকেই আমাকেও নানা বিশেষণে বিশেষায়িত করত। ফলে বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশীসহ দেশবাসী সবার সামনে আজীবন হেয়প্রতিপন্ন হয়ে চলতে হতো।

আমার প্রিয় ছাত্রছাত্রীদের ক্লাসে বললাম, ভূগর্ভস্থ কয়লা-বেসিনের অনুসন্ধান, কয়লা-বেসিনে কয়লার গভীরতা নিরূপণ, কয়লাস্তরের পুরুত্ব ও কাঠামো নিরূপণ করা, কয়লার রাসায়নিক উপাদান নিরূপণের পাশাপাশি কয়লার আর্দ্রতা নির্ণয় করা, spontaneous combustion in coal/অক্সিডেশন, মাইনিং পদ্ধতি নির্ধারণ, খনি এলাকায় উত্তোলিত কয়লার পরিমাপ ও পরিবহন পদ্ধতি, স্টকইয়ার্ডে কয়লা সংরক্ষণ পদ্ধতি এবং ঘাটতির বিভিন্ন দিক ইত্যাদি বিষয় মূলত ভূতত্ত্ববিদ, ভূ-পদার্থবিদ, মাইনিং ভূতত্ত্ববিদ ও মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারদের একান্ত বিষয়। কিন্তু বড়পুকুরিয়া কয়লা খনিতে এগুলোর কোনো ধারাবাহিকতা রক্ষা করা হয় না।

২০০৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে শুরু করে ২০১৮ সালের ২৯ জুন পর্যন্ত সময়ের ব্যবধানে ১ লাখ ৪৪ হাজার মেট্রিক টন কয়লা গায়েব বা চুরি হওয়াসংক্রান্ত যেসব সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে, তা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করার জন্য তিনটি বিষয় অবশ্যই সামনে রাখা দরকার।

এগুলো হল- ১. কয়লা খনির ফেইস থেকে কয়লা উত্তোলন ও পরিবহনসংক্রান্ত কয়লা ঘাটতির প্রযুক্তিগত দিক, ২. উত্তোলিত কয়লা ভূপৃষ্ঠে আসার পর আবারও তা স্কিপ শ্যাফটের কাছে বেল্ট কনভ্যেয়রে লোড করার পর থেকে দীর্ঘ সময় ধরে স্টকইয়ার্ডে ফেলে রাখার কারণে washout, oxidation/spontaneous combustion জনিত কয়লা ঘাটতির প্রযুক্তিগত দিক এবং ৩. অসৎ পন্থায় কয়লা বিক্রি করে প্রায় ২৩০ কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনার দিক।

আমি এ নিবন্ধে প্রথম ও দ্বিতীয়টির ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত দিক উদাহরণসহ তুলে ধরার চেষ্টা করব। আর তৃতীয় বিষয়টি আমার জ্ঞানের পরিধির বাইরে। সরকারের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা, দুদক এবং মিডিয়াগুলো তৃতীয় বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান চালিয়ে এর সত্যতা উদঘাটন করতে পারে।

এবার মূল আলোচনায় আসি। বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির স্টকইয়ার্ডে কয়লা ঘাটতির বিষয়টি ধরা পড়ে ১২১০ নং (ডাউন) প্যানেল/ফেইস থেকে কয়লা উত্তোলন শেষ হওয়ার পর এবং ১৩১৪ নং প্যানেল/ফেইস থেকে কয়লা উত্তোলন শুরু করার পূর্বমুহূর্তে। ১২১০ নং প্যানেল/ফেইস থেকে কয়লা উত্তোলন শেষ হয় ২৯.০৬.২০১৮ তারিখে। মাঝখানে ৪০ থেকে ৪৫ দিন সময় ‘ডাউন-টাইম’ রেখে আগস্টের মাঝামাঝি থেকে ১৩১৪ নং প্যানেল/ফেইস থেকে কয়লা উত্তোলন শুরু করার কথা ছিল।

এর মধ্যেই ঘটে গেল যতসব কাণ্ড। এখানে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার- বিশ্বব্যাপী ভূগর্ভস্থ কয়লা উত্তোলনের ক্ষেত্রে দুটি পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে হয় : ১. পানিস্তরের নিচ থেকে খনি করে কয়লা উত্তোলন এবং ২. পানিস্তরের উপরে খনি করে কয়লা উত্তোলন। দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়ায় প্রায় ১০০ থেকে ১৩০ মিটার পুরু ভূগর্ভস্থ আঞ্চলিক পানিস্তরের নিচ থেকে খনি করে কয়লা উত্তোলন করা হচ্ছে। আঞ্চলিক পানিস্তরের নিচে অবস্থিত বেলে-পাথর, সিল্ট-পাথর এবং কয়লার স্তরগুলো আবার বহুমুখী জয়েন্ট ও নরমাল-ফল্ট দ্বারা সংযুক্ত এবং পানি প্রবাহের উপযোগী।

আর এসব কারণে বড়পুকুরিয়া কয়লা বেসিনের কয়লাস্তর পুরোটাই যেমন শুষ্ক নয়, তেমনি পুরোটা ভেজাও নয়। বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির প্রতিটি প্যানেল/ফেইস থেকে কয়লা আহরণের সময় তিনটি প্রধান উপকরণ ব্যবহার করতে হয় : ১. ফেইস থেকে কয়লা কাটার জন্য শেয়ারার (Shearer) মেশিন, ২. কয়লা উত্তোলনের নিরাপত্তার জন্য শেয়ারার মেশিনের ওপর কয়লা স্তর ও পাথরের স্তর ধরে রাখার জন্য হাইড্রোলিক সাপোর্ট ব্যবহার করা এবং ৩. শেয়ারার মেশিন দিয়ে ফেইস থেকে কয়লা কাটার পর তা সরানোর জন্য এবং বেল্ট কনভ্যেয়র পর্যন্ত বয়ে নিয়ে যাওযার জন্য এএফসি (Armored Face Conveyor) ব্যবহার করা।

এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য, শুধু বড়পুকুরিয়া কয়লাখনিতেই নয়, বিশ্বের অধিকাংশ কয়লাখনির ফেইস থেকে কয়লা কাটার প্রক্রিয়াগুলো চলাকালে প্রচুর কোল-ডাস্ট উৎপন্ন হয়, যা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য সার্বক্ষণিক পানি স্প্রে করতে হয়। পানি স্প্রে করে কোল-ডাস্ট নিয়ন্ত্রণ না করলে কয়লাখনি শ্রমিকদের নিউমোকোনিওসিস ও সিলিকোসিস নামক জটিল রোগ হয়। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, কয়লা ফেইস থেকে কয়লা কাটার সময় ব্যবহৃত পানির একটি অংশ কয়লার সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে কয়লাকে অধিকতর পরিবেশবান্ধব প্রক্রিয়ায় পরিবহনের জন্য বেল্ট কনভ্যেয়রে অনেক সময় হালকা পানির স্প্রে করতে হয়।

গবেষণার ফলাফল থেকে এটাও জানা গেছে, বড়পুকুরিয়া বেসিনের কয়লার মধ্যে inherent moisture হিসেবে শতকরা প্রায় ৫.১০ ভাগ পানির উপস্থিতি রয়েছে। সুতরাং এটা পরিষ্কার, ভূগর্ভস্থ কয়লাখনির উত্তোলন ফেইস থেকে বেল্ট কনভ্যেয়র হয়ে ভূগর্ভস্থ কোল বাংকার পর্যন্ত কয়লা পরিবহন এবং কোল বাংকার হয়ে স্কিপ শ্যাফটের তলদেশ থেকে ভূপৃষ্ঠে কয়লা উত্তোলন পর্যন্ত সময়ের ব্যবধানে কয়লার আর্দ্রতা কমতে শুরু করবে এবং ওজন হ্রাস পেতে থাকবে, এটাই স্বাভাবিক নিয়ম।

স্কিপ শ্যাফটের মাধ্যমে ভূগর্ভ থেকে ভূপৃষ্ঠে কয়লা উত্তোলন করার পর যদি তা বেল্ট কনভ্যেয়রের মাধ্যমে আবারও পরিবহন করে দূরবর্তী কোনো স্টকইয়ার্ডে নিয়ে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ভূপৃষ্ঠের উন্মুক্ত বাতাসে ফেলে রাখা হয়, তাহলে কয়লার মধ্যে বিদ্যমান inherent moisture শুকিয়ে যাবে এবং ওজনের তারতম্য ঘটবে। এছাড়াও দিনের বেলায় সূর্যের প্রচণ্ড তাপদাহে কয়লার স্টকইয়ার্ডে আগুন লেগে যাওয়া (spontaneous combustion) বিশ্বব্যাপী একটি সাধারণ ঘটনা, যা কয়লার ওজন হ্রাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত।

পাঠকের সুবিধার্থে কিছু উদাহরণ তুলে ধরছি। ‘ওয়ার্ল্ড কোল সোর্সে’র ২০১৬ সালের মার্চ মাসের রিপোর্ট অনুযায়ী কয়লার স্টকইয়ার্ডে ফিজিক্যাল ইনভেন্টরি ৫ শতাংশ পর্যন্ত পার্থক্য হতে পারে। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা ২০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। স্টকইয়ার্ডে spontaneous combustion-জনিত কারণে কয়লার ওজনে ২ শতাংশ পর্যন্ত পার্থক্য হতে পারে (IEA Clean Coal Center, 2012)।

স্টকইয়ার্ডে কয়লা যদি যথাযথভাবে কমপ্যাক্ট করে না রাখা হয় তাহলে spontaneous combustion-জনিত কারণে ১২.৫ শতাংশ পর্যন্ত ওজনের ঘাটতি হতে পারে (Fuel Processing Technology, 59(1999), 23-24)। এমনকি স্টকইয়ার্ডে সংরক্ষিত কয়লার ওজনের সঙ্গে অফিসিয়াল রেকর্ড বইয়ে সংরক্ষিত কয়লার ওজনের পার্থক্য ৫ শতাংশ হতে পারে (A‡M Report 2015-2016, Bharat Coking Coal, Section 6: Inventories 6.1)। OIML (The Organization Internationale de Metrlogic Legale)-এর মতে বেল্ট ওয়েইং স্কেলের কারণে কয়লার ওজনে ০.৫ থেকে ২ শতাংশ পর্যন্ত পার্থক্য হতে পারে।

বড়পুকুরিয়া খনি থেকে উত্তোলন করা কয়লার ওজন দুটি ধাপে বেল্ট ওয়েইং স্কেলের মাধ্যমে পরিমাপ করা হয়। প্রথম ধাপে কয়লার ওজন নিরূপণ সম্পন্ন করা হয় স্কিপ শ্যাফটের কাছে সারফেসে স্থাপিত বেল্ট ওয়েইং স্কেলের মাধ্যমে। প্রথম ধাপে বেল্ট ওয়েইং স্কেলে পরিমাপ করার পর ওই কয়লা বেল্ট কনভ্যেয়রের মাধ্যমে আবারও পরিবহন করে সারফেস সাইলো হয়ে স্টকইয়ার্ডে নিয়ে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত জমা রাখা হয়।

এ অবস্থায় মজুদকৃত কয়লা দীর্ঘদিন ধরে স্টকইয়ার্ডে পড়ে থাকার ফলে কয়লা থেকে পানির অংশ (inherent moisture) শুকিয়ে গিয়ে ওজন হ্রাস ঘটায়। এছাড়াও বর্ষাকালে ভারি বর্ষণের ফলে স্টকইয়ার্ডের কয়লার মধ্যে বিদ্যমান কোল-ডাস্ট বৃষ্টির পানির সঙ্গে ধুয়ে চলে যায় এবং একাংশ স্টকইয়ার্ডের ফ্লোরে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকে। এক্ষেত্রেও স্টকইয়ার্ডের কয়লার ওজনের হ্রাস ঘটে।

দ্বিতীয় ধাপে কয়লার ওজন নিরূপণ সম্পন্ন করা হয় কয়লাখনির স্টকইয়ার্ডে স্থাপিত বেল্ট ওয়েইং স্কেলের মাধ্যমে। দ্বিতীয় ধাপে বেল্ট ওয়েইং স্কেলে পরিমাপ করার পর ওই কয়লা বেল্ট কনভ্যেয়রের মাধ্যমে আবারও পরিবহন করে কয়লাখনির স্টকইয়ার্ড থেকে বড়পুকুরিয়ার কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়।

উপরে উল্লেখিত রিভিউয়ের আলোকে এটি পরিষ্কার যে, দুটি ধাপে বেল্ট ওয়েইং স্কেলের কারণে বড়পুকুরিয়ায় কয়লার ওজনে ০.৫ থেকে ২ শতাংশ পর্যন্ত পার্থক্য হতে পারে। এ প্রেক্ষাপটে এটি স্পষ্ট যে, ১. ভূগর্ভস্থ কয়লার ফেইস থেকে কয়লা কাটার পর তা ভূপৃষ্ঠ পর্যন্ত উত্তোলনের বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করে আবারও কয়লার স্টকইয়ার্ডে জমা রাখা পর্যন্ত সময়ের ব্যবধানে মজুদ কয়লা থেকে ক্রমান্বয়ে inherent moisture শুকিয়ে কয়লার ওজন হ্রাস পাওয়া, ২. স্টকইয়ার্ডে spontaneous combustion-জনিত কারণে কয়লার ওজন ২ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পাওয়া এবং ৩. বেল্ট ওয়েইং স্কেলের কারণে কয়লার ওজনে ০.৫ থেকে ২ শতাংশ পর্যন্ত পার্থক্য হওয়া ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত। এগুলোকে অস্বীকার করা বা এড়িয়ে চলার কোনো উপায় নেই।

এক্ষেত্রে আবেগতাড়িত হয়ে কিছু বলার সুযোগ নেই। আবার ২০০৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে শুরু করে ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত প্রায় ১৩ বছর সময়ের ব্যবধানে ১ লাখ ৪৪ হাজার মেট্রিক টন (প্রায়) কয়লা গায়েব হওয়ার ঘটনার সত্যতা অস্বীকার করারও কোনো উপায় নেই। স্টকইয়ার্ডে কয়লা মজুদের হিসাবের গরমিলের সমন্বয় করতে হলে প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক যৌক্তিকতার পাশাপাশি কয়লা গায়েব হওয়ার অভিযোগ- এ দুটি বিষয়কে তদন্ত কমিটির মাথায় রাখতে হবে।

বিষয়টা যেন এমন যে, উৎপাদন ও বিতরণ সম্পৃক্ত শিল্প-কারখানায় ‘সিস্টেম লস’ যেমন অস্বীকার করা বা এড়িয়ে চলার কোনো উপায় নেই, ঠিক তেমনি বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি থেকে উত্তোলিত কয়লার ওজনের ক্ষেত্রেও ‘সিস্টেম লস’ অস্বীকার করার উপায় নেই। মনে করুন বড়পুকুরিয়ার কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপন্ন করে জাতীয় গ্রিড লাইনে সরবরাহ করা হল।

কিন্তু বিউবো কি গ্রাহকের কাছ থেকে শতভাগ (৫০০ মেগাওয়াট) বিদ্যুৎ বিল আদায় করতে পারবে? আমাদের অভিজ্ঞতা বলে, বিউবো সেটা পারবে না এবং ‘সিস্টেম লস’ দেখিয়ে সমন্বয় করবে। দেশের বিভিন্ন গ্যাস ক্ষেত্র থেকে গ্যাস উত্তোলনের পর তা বিভিন্ন জায়গায় পাইপলাইনের মাধ্যমে পরিবহন ও বিতরণের পর উত্তোলিত গ্যাসের শতভাগ বিল কি কখনও কোনো কোম্পানি আদায় করতে পেরেছে? এক্ষেত্রেও উত্তর আসবে ‘না’ এবং ‘সিস্টেম লস’ দেখিয়ে গ্যাস উৎপাদন ও বিতরণ কোম্পানিগুলো সমন্বয় করবে।

এখানেই আমার জোরালো প্রশ্ন, বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি কর্তৃপক্ষ কেন ‘সিস্টেম লসের’ বিষয়টি মাথায় রাখল না? এরকম বোকামির ফাঁদে তারা কীভাবে পা দিল? তারা ২০০৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৮ সালের জুলাই পর্যন্ত যদি ১.৫ থেকে ২ শতাংশ ‘সিস্টেম লসের’ বিষয়টি বোর্ড মিটিংয়ের অনুমোদন সাপেক্ষে রেকর্ড রাখত, তাহলে প্রায় ১৩ বছরের ব্যবধানে ১ লাখ ৪৪ হাজার মেট্রিক টন কয়লার কিউমুলেটিভ লসের বিষয়টি ধরা পড়ত এবং আজকের মতো এরকম জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না।

বর্তমান পরিস্থিতি এমন জটিল আকার ধারণ করেছে যে, বৈজ্ঞানিকভাবে স্বীকৃত বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির ক্ষেত্রে শতভাগ ‘সিস্টেম লস’ যেমন মেনে নেয়া যাচ্ছে না, তেমনি মেনে নেয়া যাচ্ছে না শতভাগ কয়লা উধাও হওয়ার যুক্তি। এ যেন শাঁখের করাত। বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির সাবেক চার এমডিসহ কোম্পানি বোর্ডের কোনো সদস্য এর দায় এড়াতে পারেন না। আর সেই সঙ্গে কঠোর শাস্তি এড়াতে পারেন না কোম্পানির সদ্য সাবেক সচিব আবুল কাশেম।

আবুল কাশেম সম্পর্কে জনশ্রুতি আছে, তিনি একজন আমলার লেখা চিরকুট নিয়ে এসে একজন কর্মচারীর পদের পরিবর্তে জুনিয়র অফিসার হিসেবে কয়লা খনি প্রকল্পে যোগদানের পর থেকে অতি অল্প সময়ের ব্যবধানে জিএম পর্যন্ত পদোন্নতির পাশাপাশি কোম্পানি সচিব হয়েছেন এবং সেই সঙ্গে অতি অল্প সময়ের ব্যবধানে নামে-বেনামে বিপুল বিত্ত-বৈভবের মালিক হয়েছেন।

ব্যাপক অনিয়মের মাধ্যমে নিজের পদোন্নতি নেয়ার পাশাপাশি প্রমোশন বাণিজ্য ও কয়লা বাণিজ্য তার অন্যতম কাজ ছিল বলে সংবাদমাধ্যমে অভিযোগ উঠেছে। ওই ব্যক্তির পদোন্নতির প্রোফাইল অতি সূক্ষ্মভাবে যাচাই-বাছাই করা হলে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ও দুদক বহু অজানা তথ্য বের করতে পারবে বলে মনে করা হয়। অভিযুক্ত সাবেক চার এমডির মধ্যে প্রথম দুজনের (কামরুজ্জামান ও আমিনুজ্জামান) নামে-বেনামে ক্রয় করা স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির হিসাব নেয়ার পাশাপাশি আমিনুজ্জামানের সর্বশেষ স্নাতকোত্তর শিক্ষা সনদের বিষয়টি তদন্তে নেয়া প্রয়োজন বলে অনেকে মনে করেন।

এছাড়া যেসব অভিজ্ঞতার সনদপত্র ব্যবহার করে চাকরিতে প্রবেশ ও পদোন্নতি নিয়ে সদ্যবিদায়ী এমডি হাবিবুদ্দিন দায়িত্ব পালন করছিলেন, সেগুলোর সত্যতা যাচাই-বাছাই করার পাশাপাশি পেট্রোবাংলার বিধিমোতাবেক প্রমোশন প্রোফাইল তদন্ত করে দেখা উচিত। হিসাব বিভাগের সাবেক জিএম ও বর্তমানে পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানির এমডি আবদুল মান্নান পাটোয়ারীর ফুলবাড়ির আশপাশে নামে-বেনামে ক্রয় করা জমিজমা ও নগদ সম্পদের হিসাব এবং ভিন্ন/নিকটজনের নামে বড়পুকুরিয়া থেকে কয়লা ক্রয়-বিক্রয়ের লাইসেন্স ইত্যাদি খতিয়ে দেখার পাশাপাশি পেট্রোবাংলার বিধিমোতাবেক পদোন্নতির প্রোফাইল অতি সূক্ষ্মভাবে যাচাই-বাছাই করা উচিত। উল্লেখ্য, অভিযুক্ত ২১ ব্যক্তির তালিকায় আবদুল মান্নান পাটোয়ারীর নাম থাকায় অতীতে ও বর্তমানে নির্যাতিত বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির অনেক কর্মকর্তা ও কর্মচারীর মনে আনন্দ ফিরে এসেছে।

পরিশেষে বলতে হয়, আমার সাবেক কর্মস্থলের কেলেঙ্কারির সংবাদে আমি দুঃখিত ও মর্মাহত। ইতিমধ্যেই পেট্রোবাংলা কর্তৃক গঠিত তদন্ত কমিটির রিপোর্টের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে এবং সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। মাইনিং বিষয়ে প্রযুক্তিগত জ্ঞানহীন আমলাকেন্দ্রিক আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে শোনা যাচ্ছে। বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত জ্ঞানহীন ওই কমিটির ভুল তদন্ত রিপোর্ট যদি একবার মাইনিং সেক্টরে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়, তাহলে অদূর ভবিষ্যতে দেশে নতুন নতুন কয়লাখনির উন্নয়ন, উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনা একেবারে ভেঙে পড়বে। কাজেই সময় থাকতে সাধু সাবধান।

এক্ষেত্রে সরকার যদি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইনিং ভূতত্ত্ব ও মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে বাস্তব জ্ঞানসম্পন্ন গবেষক শিক্ষকদের নিয়ে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি গঠন করে, তাহলে অনেক ভালো ও গ্রহণযোগ্য ফলাফল বেরিয়ে আসবে বলে আমি মনে করি। বড়পুকুরিয়া কয়লা খনিতে অর্জিত অভিজ্ঞতা, গবেষণা, বৈজ্ঞানিক মডেলিং এবং শাবিপ্রবির পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে শিক্ষকতা ও গবেষণার অভিজ্ঞতার সুবাদে সরকার চাইলে কয়লা খনির চলমান ক্রান্তিকালে এ লেখকের কাছ থেকে তদন্ত কাজে সহায়তা নিতে পারে। তবে তা হতে হবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইনিং ভূতত্ত্ব ও মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে বাস্তব জ্ঞানসম্পন্ন গবেষক শিক্ষকদের সমন্বয়ে গঠিত একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটির ফ্রেমে, আমলাকেন্দ্রিক তদন্ত কমিটির ফ্রেমে নয়।

ড. মো. রফিকুল ইসলাম : বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি নিয়ে উচ্চতর গবেষণা করা প্রথম বাংলাদেশি, যিনি জাপানের রিউকিউজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে President's Honorary Award-2009 পেয়েছেন। বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির ওপর International Journal of Coal Geology-তে প্রকাশিত চারটি বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধের জন্য ইতালিভিত্তিক The World Academy of Sciences (TWAS) এবং বাংলাদেশের Bangladesh Academy of Sciences (BAS) কর্তৃক Young Scientist Prize (Gold Medal-2013) প্রাপ্ত বিজ্ঞানী; সহযোগী অধ্যাপক, পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter