শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের রাজনৈতিক ফলাফল

প্রকাশ : ১৪ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  বদরুদ্দীন উমর

ছবি: সংগৃহীত

১৯ জুলাই ২০১৮ তারিখে বাসের নিচে পড়ে দু’জন শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার পর বাংলাদেশজুড়ে যে আন্দোলন হয়েছে এবং সে আন্দোলনে স্কুলের ছাত্রছাত্রী থেকে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যত বিশাল আকারে পথে নেমেছে, মেয়েরা যত বিপুল সংখ্যায় অংশগ্রহণ করেছে, যত দীর্ঘদিন ধরে এ আন্দোলন সরকারের বিরুদ্ধে পরিচালিত হয়েছে- এর কোনো পূর্ব উদাহরণ শুধু বাংলাদেশে নয়, দক্ষিণ এশিয়ার কোথাও নেই।

১৯৫২ সালেও ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে আন্দোলন এতদিন স্থায়ী হয়নি। তার তুফান ২৪ তারিখের দিকেই স্তিমিত হয়েছিল। ১৯৫২ সালের আন্দোলনে তৎকালীন যুবলীগের মতো প্রগতিশীল সংগঠনের একটা ভূমিকা থাকলেও বর্তমান আন্দোলন হল একেবারেই স্বতঃস্ফূর্ত। কোনো রাজনৈতিক দল ও গ্রুপের সঙ্গেই এর কোনো সম্পর্ক ছিল না।

তবে একদিক দিয়ে ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে এ আন্দোলনের অবশ্যই বড় রকম মিল আছে। ২১ ফেব্রুয়ারির ছাত্র আন্দোলন শুধু ছাত্রদেরই আন্দোলন ছিল না। ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৫১ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানি শাসন-শোষণ দেশের ব্যাপক জনগণের মধ্যে যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল তারই একটা বিস্ফোরণমূলক অভিব্যক্তি ঘটেছিল ভাষা আন্দোলনের মধ্যে।

পুলিশের গুলির স্ফুলিঙ্গ এ কারণেই সারা পূর্ব বাংলায় দাবানল সৃষ্টি করেছিল। বর্তমানে নিরাপদ সড়কের জন্য ছাত্রছাত্রীরা শুধু ঢাকা নয়, দেশের সর্বত্র ব্যাপক সংখ্যায় তীব্র ক্ষোভের সঙ্গে রাস্তায় নেমে প্রায় ৮-৯ দিনের মতো তা জারি রেখেছে। এর কারণ শুধু ১৯ জুলাইয়ের শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার মধ্যে খুঁজলে পাওয়া যাবে না, তার শক্তির সন্ধান এভাবে মিলবে না।

১৯৫২ সালের মতো এ আন্দোলনও হল দেশজুড়ে ২০০৯ সাল থেকে, বিশেষত ২০১৪ সালের ভুয়া নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আবার আসার পর আওয়ামী লীগ সরকারের ব্যাপক শোষণ-নির্যাতন, চুরি-দুর্নীতি ও লুটপাটের বিরুদ্ধে এক গভীর ও তীব্র প্রতিক্রিয়া। এ আন্দোলনে বিদ্যমান সরকার যেভাবে আঘাতপ্রাপ্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, এর কারণে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, এটা ১৯৫২ সালে মুসলিম লীগ সরকার যেভাবে আঘাতপ্রাপ্ত, ক্ষতিগ্রস্ত ও জনবিচ্ছিন্ন হয়েছিল তার সঙ্গে তুলনীয়।

নিজেদের এই করুণ অবস্থা জনগণের চোখের আড়াল করার জন্য সরকার আবিষ্কার করেছে যে, এ আন্দোলন কিছু দেশদ্রোহী, বাইরের শক্তির মদদেই সৃষ্টি ও পরিচালিত হয়েছে। কিন্তু জনগণের যতই সীমাবদ্ধতা থাকুক, এ আন্দোলনকে সঠিক পরিপ্রেক্ষিতে দেখার ক্ষমতা তাদের আছে।

জনগণ নিজেদের জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়েই এ আন্দোলনের কারণ যেমন চিহ্নিত করতে পেরেছেন, তেমনি তারা পেরেছেন সরকারি প্রচারণার অসত্যতাকে চিহ্নিত করতে। এর ফলাফল অদূর ভবিষ্যতেই দেশের রাজনীতিতে প্রতিফলিত হবে। ইতিহাস এদিক দিয়ে মুসলিম লীগ, আওয়ামী লীগ বা অন্য কোনো লীগের ক্ষেত্রে পক্ষপাতিত্ব করে না।

প্রকৃতির মতো ইতিহাসেরও নিয়মকানুন আছে। প্রকৃতির নিয়মকানুন যেমন অমান্য করা যায় না, তেমনি মিথ্যা প্রচারণার মাধ্যমে ইতিহাসের নিয়মকানুনকেও লেঙ্গি মারা যায় না।

বাংলাদেশের ইতিহাসের একটা লক্ষণীয় ব্যাপার হচ্ছে, এখানে বড় বড় রাজনৈতিক আন্দোলনের সূচনা ছাত্র আন্দোলন থেকেই হয়েছে, অথবা এসব আন্দোলনে ছাত্ররা একটা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে। এর কারণ ছাত্ররা সমষ্টিগতভাবে কায়েমি স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করে না, যদিও সাধারণভাবে তারা মধ্যবিত্ত শ্রেণীর অংশ।

কাজেই দেশে নানা শোষণ-নির্যাতন, চুরি-দুর্নীতি, লুটপাট ইত্যাদির সঙ্গে তারা ছাত্র অবস্থায়, শ্রেণীগত গাঁটছড়ায় বাঁধা থাকে না। আওয়ামী লীগ ছাত্রলীগকে একটি দুর্নীতিগ্রস্ত মারদাঙ্গা বাহিনীতে বা প্রতিক্রিয়াশীল জঙ্গি সংগঠনে পরিণত করলেও সম্প্রদায় হিসেবে ছাত্রদের এটাই সাধারণ ও স্বাভাবিক চরিত্র।

এ কারণে কোটা সংস্কার আন্দোলন, নিরাপদ সড়কের জন্য আন্দোলন, সরকারি নির্যাতনের এবং চুরি-দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে দাঁড়িয়ে স্কুল থেকে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত ছাত্রছাত্রীরা যেভাবে সরকারের নানা গণবিরোধী নীতি ও কার্যকলাপের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে- একে ছোট করে দেখার, একে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করার এবং এর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানোর চেষ্টা এই অপপ্রচারকারীদের কোনো কাজেই আসবে না। ইতিহাসের অমোঘ নিয়ম দ্বারাই তাদের ভাগ্য নির্ধারিত হবে।

সড়ক দুর্ঘটনার বিষয় সামনে এসে সমগ্র পরিবহন ব্যবস্থার মধ্যে পচনের যে অবস্থা জনগণের চোখের সামনে উদ্ঘাটিত হয়েছে, এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যাপার নয়। সমগ্র রাষ্ট্রব্যবস্থায় সরকার যে ধরনের নৈরাজ্য তৈরি করেছে, তার সঙ্গেও জনগণের পরিচয়ের পথ এ আন্দোলন খুলে দিয়েছে। এতদিন ধরে পুলিশ, র‌্যাব, আমলাতন্ত্র, ব্যাংক, শিল্পকারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য ইত্যাদি ক্ষেত্রে দলীয়করণের নানা তথ্য বিক্ষিপ্তভাবে দেখা গেছে।

সেগুলোর সঙ্গে সড়ক পরিবহন ব্যবস্থা যুক্ত হওয়ায় দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতির চেহারা এখন জনগণের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখার আর কোনো উপায় নেই। এদিক দিয়ে বলা চলে, ছাত্রছাত্রীদের এ আন্দোলন শাসন-শোষণ ক্ষেত্রে সরকার যে পর্দা ঝুলিয়ে রেখে এসেছে, তা ছিঁড়ে ফেলেছে।

পর্দা ছিঁড়ে বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থার ভয়াবহ পচনশীলতা এবং এই পচনশীল ব্যবস্থার পরিচালকদের চরিত্র উন্মোচিত করেছে। সরকার যদি ভেবে থাকে এ সবের রাজনৈতিক ফলাফল থেকে তারা মিথ্যা প্রচারণার দ্বারা ও গায়ের জোর খাটিয়ে রক্ষা পাবে, তাহলে তার থেকে ভুল প্রত্যাশা আর কিছুই হতে পারে না।

পরিবহন ব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর কথা বলে সরকার এখন নানা ধরনের ধানাইপানাই নীতির ঘোষণা দিচ্ছে। নানা পদক্ষেপের ঘোষণা তারা দিচ্ছে। প্রথমত, এগুলো কোনো সমাধানই নয়। দ্বিতীয়ত, তারা যা বলছে তা কার্যকর করা তাদের পক্ষে কোনোক্রমেই সম্ভব নয়। কারণ শর্ষের মধ্যে ভূত।

যেসব অঘটন পরিবহন সংস্থার মধ্যে ঘটছে তার পরিবর্তন কিছুতেই সম্ভব নয় এ কারণে যে, এর সবকিছুর জন্যই পরিবহন মালিকরাই দায়ী এবং এই মালিকরা সরকারের লোক। সরকারের খুঁটিতেই এরা বাঁধা আছে। কাজেই বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই যে, আজ পর্যন্ত এ ক্ষেত্রে শাস্তির নামে সরকারপক্ষ থেকে ঢাকঢোল পেটানো সত্ত্বেও কোনো পরিবহন মালিককেই গ্রেফতার করা, তাদের বিরুদ্ধে মামলা দেয়া বা অন্য কোনো ধরনের শাস্তির কোনো ব্যবস্থা হয়নি।

সব শাস্তির ব্যবস্থা শুধু গাড়ির চালকদের বিরুদ্ধে। এর থেকেই বোঝা যায়, এত বড় একটা ধাক্কা খাওয়ার পরও এদের কোনো শিক্ষা হয়নি, অভিজ্ঞতা থেকে কোনো জ্ঞানোদয় হয়নি। তারা আগে যেভাবে চলছিল, এখনও ঠিক সেভাবেই চলছে, যদিও শীর্ষস্থানীয় নেতারা একঘেয়েভাবে বলেই চলেছেন, প্রকৃত অপরাধীরা ছাড় পাবে না, তাদেরকে রেহাই দেয়া হবে না।

কিন্তু এসব ঘোষণা একেবারেই মিথ্যা ও অকার্যকর। কারণ সরকার এই পরিবহন মালিকদের, শুধু এই মালিকদেরই নয়, সব ক্ষেত্রেই সব ধরনের মালিককে ছাড় ও রেহাই দেয়া এবং রক্ষা করার নীতির ওপরই দাঁড়িয়ে আছে। কাজেই জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় এই মালিকদের বিরুদ্ধে গেলে সরকারের আর দাঁড়ানোর কোনো জায়গাই থাকবে না।

এ পরিস্থিতির মুখোমুখী হয়ে সরকারের পক্ষে প্রশাসন ক্ষেত্রে কোনো প্রকৃত পরিবর্তন আনাই সম্ভব নয়। সে চেষ্টা করলে তাদের নিজেদের ক্ষমতার ভিত্তির ওপরই তাদের কামান দাগা হবে। এই ত্রিশঙ্কু অবস্থায় সরকার যে বিপদের মধ্যে পড়েছে এর থেকে উদ্ধার লাভের কোনো সম্ভাবনা তাদের নেই।

আগামী নির্বাচন ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির মতো করতে সক্ষম হবে এ চিন্তা আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের ছিল। বলা যায় না, তাদের যা অবস্থা তাতে এ চিন্তা এখনও তাদের থাকতে পারে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সে সম্ভাবনা আগেই কম ছিল, শিক্ষার্থী আন্দোলনের পর একেবারেই ধূলিসাৎ হয়েছে।

২০১৪ সালে তারা জনগণের সামনে হাজির হয়নি। জনগণকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কোনো নির্বাচন ছাড়াই জাতীয় সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে সকার গঠনের সংসদীয় ক্ষমতা অর্জন করেছিল। বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সংসদীয় নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার হাতবদল এক প্রচলিত নিয়ম।

বুর্জোয়া গণতন্ত্রের এই নিয়মকে ফ্যাসিবাদ বেশিদিন ঠেকিয়ে রাখতে পারে না। বাংলাদেশে এর ব্যতিক্রম ঘটবে, এমনটি মনে করার যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই।

১৩.০৮.২০১৮

বদরুদ্দীন উমর : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল