পরিস্থিতির মোকাবেলা সরকারকেই করতে হবে

  বদরুদ্দীন উমর ২১ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

কোটা পদ্ধতি
ছবি: সংগৃহীত

স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের নিরাপদ সড়কের জন্য আন্দোলন বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক অগ্ন্যুৎপাতের সৃষ্টি করেছিল সে অগ্ন্যুৎপাত বন্ধ হয়েছে। কিন্তু এটা মনে করার কোনো কারণ নেই যে, যেজন্য সেই অগ্ন্যুৎপাত হয়েছিল তার কারণ আর নেই। মোটেই তা নয়।

কোনো তীব্র আন্দোলনই ক্রমাগত চলতে থাকে না। একটা পর্যায়ে এসে বন্ধ হয়। কিন্তু যে সমস্যার কারণে আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল তার সমাধান যদি না হয়, তাহলে যা হয়েছে তার থেকে আরও অনেক বড় ও ব্যাপক অগ্ন্যুৎপাতের সম্ভাবনা থেকেই যায়। বাংলাদেশের অবস্থা সেরকমই দাঁড়িয়েছে।

দু’জন শিক্ষার্থী বাসচাপা পড়ে নিহত হওয়ার পর যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল সেটা এখন আর না থাকলেও রাজনৈতিক আন্দোলনের অগ্ন্যুৎপাতের সম্ভাবনা যে শেষ হয়েছে বা কমেছে, এটা মনে করার কারণ নেই। কেউ যদি সেটা মনে করে থাকেন, তাহলে তার থেকে রাজনৈতিক মূর্খতা আর কিছুই হতে পারে না।

সম্প্রতি দুটি সমস্যাকে কেন্দ্র করে ছাত্র-ছাত্রীরা আন্দোলনে নেমেছিল। একটা হল চাকরিতে কোটা পদ্ধতি এবং দ্বিতীয়টা হল সড়ক দুর্ঘটনা ও সড়কপথে নিরাপত্তা বলতে কিছু না থাকা। এ দুই সমস্যার কার্যকর সমাধানের ইচ্ছা যদিও সরকারের নেই। কোটা সংস্কার আন্দোলনের শীর্ষ পর্যায়ে ভীত হয়ে সরকার ঘোষণা করেছিল, সব ধরনের কোটা উঠিয়ে নেয়া হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই মর্মে সংসদে ঘোষণা দিয়েছিলেন।

কিন্তু আন্দোলনের তীব্রতা ও ব্যাপকতা কমে আসার পরই তারা তাদের এ প্রতিশ্রুতি থেকে পিছিয়ে গেছেন। এটা কোনো সরকার বা ক্ষমতাসীন দলের পক্ষে প্রশংসনীয় কাজ নয়। তবে এটা কোনো ব্যতিক্রমী ব্যাপার নয়। হরহামেশাই এ ধরনের কারবার সরকারকে করতে দেখা গেছে।

সরকার মুক্তিযোদ্ধা কোটায় রেখেছে ৩০ শতাংশ চাকরি। এ চাকরি সংরক্ষিত থাকবে মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান ও তাদের সন্তানদের জন্য। কিন্তু কেন? যারা প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা তারা কোনো নগদ পাওয়ার উদ্দেশ্যে যুদ্ধ করেননি। দেশের প্রতি ভালোবাসা এবং দেশকে শত্র“মুক্ত করার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়েই তারা যুদ্ধে নেমেছিলেন। অনেকে জীবন দিয়েছিলেন, পঙ্গু হয়েছিলেন, বাড়িঘর হারিয়েছিলেন।

যুদ্ধের পর তাদের মধ্যে যারা অসুস্থ হয়েছিলেন, তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা জরুরি দায়িত্ব ও কর্তব্য ছিল। যারা বড় আকারে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন, তাদেরকে যথাসাধ্য সাহায্য করাও সরকারের দায়িত্ব ছিল। লক্ষ করলে দেখা যাবে, সেদিক দিয়ে সব সরকারেরই যথেষ্ট ঘাটতি ছিল। তাছাড়া যেসব গরিব লোক মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন, তারা সব থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তারা প্রকৃতপক্ষে কিছুই পাননি।

তাদের অনেকে ভিক্ষা করে জীবন নির্বাহ করছেন, এমন খবর সংবাদপত্রের পাতায় প্রায়ই দেখা যায়। তবে তাদের দুই-একজনকে বড় কিছু পাইয়ে দিয়ে তাই নিয়ে প্রচারণার ঢেড়ি পেটাতে ক্ষমতাসীনদের দেখা যায়। তার থেকে মনে হয় তারা আসল মুক্তিযোদ্ধাদের বড় বন্ধু ও খেদমতগার। কিন্তু এসব কিছুই না। লক্ষ করার বিষয় যে, ১৯৭১ সালের পর ৪৭ বছর পার হলেও এখনও পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা তৈরি শেষ হয়নি!

কারা মুক্তিযোদ্ধা তার কোনো হিসাবও ঠিক নেই। সেসব কাজে মনোনিবেশ না করে সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান ও তাদের সন্তান অর্থাৎ তাদের নাতি-নাতনিদের জন্য কর্মসংস্থানে ব্যস্ত! আসলে এ ক্ষেত্রে যা হচ্ছে তা হল, সরকারের সঙ্গে সম্পর্কিত লোকজনদের মুক্তিযোদ্ধা সাজিয়ে ও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ঘোষণা করে এক তালিকা তৈরি করে তাদের চাকরির ব্যবস্থা করে প্রশাসনে দল ভারির জন্যই এ কাজ করা হচ্ছে।

এর সঙ্গে দেশপ্রেম অথবা প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি দায়িত্ব-কর্তব্য পালনের কোনো সম্পর্ক নেই। এর মধ্যে পবিত্র কোনো ব্যাপার নেই। অর্থাৎ অতি ক্ষুদ্র রাজনৈতিক স্বার্থেই মুক্তিযোদ্ধা কোটা প্রবর্তন করা হয়েছে এবং বিশেষ বিবেচনায় যাদের চাকরি প্রাপ্তির কোনো যৌক্তিকতা নেই, তাদেরকে চাকরিতে ঢোকানোর ব্যবস্থাই এর দ্বারা হয়েছে।

কাজেই মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বিশেষ কোটা ব্যবস্থা রাখার প্রশ্ন ছাড়াও যাদের জন্য এ ব্যবস্থা করা হচ্ছে তারা প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা কিনা এটা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করারও প্রয়োজন আছে।

কিন্তু এ তদন্তের কোনো উদ্যোগ নেই, নিরপেক্ষ তদন্ত করার চিন্তা তো আকাশ কুসুম কল্পনা ছাড়া আর কিছুই নয়। সরকার নিজের স্বার্থে যেভাবে মুক্তিযোদ্ধার তালিকা তৈরি করছে তাতে প্রকৃত গরিব ও সাহায্য পাওয়ার যোগ্যরা কিছুই পাননি, পাবেনও না।

এখানে অন্য যে প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ তা হল, ১৯৭১ সালে যারা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন, তাদের বিপুল অধিকাংশই আর বেঁচে নেই অথবা কর্মক্ষম নেই। চাকরি করার মতো বয়স ও সক্ষমতা তাদের নেই। এ অবস্থায় মুক্তিযোদ্ধা কোটা অর্থহীন। কিন্তু সরকার এতই বদান্য যে, শুধু খোদ মুক্তিযোদ্ধা নয়, তাদের সন্তান ও তাদের সন্তানদের জন্য পর্যন্ত চাকরির ব্যবস্থা করতে চায়! কিন্তু কেন? খোদ মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সরকারের করণীয় কর্তব্য ছিল।

কিন্তু বংশ পরম্পরায় এভাবে সুবিধা প্রদানের ব্যবস্থা তো কোনো দেশের ইতিহাসে নেই। এটা বাংলাদেশ সরকারের আবিষ্কার। তরুণ ও যুব সম্প্রদায়ের একটা অংশ যেমন ছাত্রলীগে ঢুকে সরকারের তাঁবেদারি ও সরকারের পক্ষে গুণ্ডামি ইত্যাদি করছে, তেমনি মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান বা তাদের সন্তানদের কোটায় চাকরি দিয়ে তাদেরকে সরকারি দলের ও সরকারের খেদমতগার হিসেবে কাজে লাগানোর উদ্দেশ্যেই কোটা ব্যবস্থার প্রবর্তন হয়েছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।

কাজেই এদিক দিয়েও কোটা ব্যবস্থা বহাল রাখার কোনো প্রয়োজন নেই। কোনো নৈতিক ভিত্তি নেই। কোটা সংরক্ষণবিষয়ক সংস্কার কমিটিও তাদের সুপারিশে এ কথাই বলেছেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী কোটা সংস্কার আন্দোলনের শীর্ষে সংসদে দাঁড়িয়ে কোটা সম্পূর্ণ উঠিয়ে দেয়ার ঘোষণা দেয়া সত্ত্বেও তারা আবার কোটা পদ্ধতি অপরিবর্তিত রাখার ঘোষণা দিয়েছে।

এর কারণ মুক্তিযোদ্ধা কোটায় যারা চাকরি পাবে তারা ছাত্রলীগ, যুবলীগের থেকেই আসবে এবং প্রশাসনে থেকে সরকারি দলের খেদমত করবে। এই প্রত্যাশাতেই সরকার নিজেদের প্রতিশ্র“তির বরখেলাপ করে কোটা ব্যবস্থা সংস্কারের জন্য যারা আন্দোলন করছে তাদের বিরুদ্ধে পুলিশি ব্যবস্থা নিচ্ছে। তাদেরকে ধরপাকড় করছে। তাদের বিরুদ্ধে মামলা দিচ্ছে।

সরকার মনে করছে, নতুন করে দমনপীড়ন চালিয়ে তারা কোটাবিরোধী আন্দোলনকে শেষ করে নিশ্চিন্তে দেশ শাসন করবে। কিন্তু আগেই বলেছি, এ ধরনের আশা খুব ভ্রান্ত চিন্তার ফল।

শুধু কোটা সংস্কার আন্দোলনের ক্ষেত্রেই নয়, নিরাপদ সড়কের জন্য প্রায়-শিশু, কিশোর-কিশোরী, যুবক-যুবতী, স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী পর্যন্ত যারা আন্দোলন করেছে, তাদের সম্পর্কেও এ রকম ধারণা পোষণ করে নিশ্চিত থাকাও একই ধরনের ভ্রান্ত চিন্তার ফল। এভাবে ভ্রান্ত চিন্তার বশবর্তী হয়ে সরকার যে নীতির ওপর এখন দাঁড়িয়ে আছে, সেটা তাদেরকে খুব বড় রকম বিপর্যয়ের মধ্যেই নিক্ষেপ করবে এবং এর জন্য দায়ী থাকবে তারা নিজেরাই।

নিরাপদ সড়কের জন্য শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পর সরকার এর প্রতিকারের কথা বলে অনেক ধরনের তৎপরতার মহড়া দিচ্ছে। সড়ক পরিবহনমন্ত্রী অনেক লম্বা-চওড়া কথা বলছেন। কিন্তু বিভিন্ন সংবাদপত্র রিপোর্ট থেকে দেখা যায়, কার্যক্ষেত্রে কিছুই হচ্ছে না।

প্রথমত, সড়ক দুর্ঘটনা কমে আসার পরিবর্তে একই রকম আছে। শুধু তাই নয়, এখন তা বৃদ্ধি পেয়েছে বলেই সংবাদপত্র রিপোর্ট থেকে জানা যায়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সরকারের নিশ্চিন্ত ভাব দেখলে অবাক হতে হয়। তারা এ ক্ষেত্রে কোনো চিন্তাভাবনা বাদ দিয়ে নিজেদের দলীয় কর্মসূচি বাস্তবায়নেই ব্যস্ত, যদিও এসব কর্মসূচিতে জনগণের কোনো অংশগ্রহণ নেই।

অদক্ষ ও লাইসেন্সবিহীন চালকদের দ্বারা গাড়ি চালানো বন্ধে উপযুক্ত প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের জন্য নতুন করে লাইসেন্সের ব্যবস্থার কথা বলা হলেও এবং এ নিয়ে কাজ শুরু হওয়া সত্ত্বেও কিছুই হচ্ছে না। কারণ সংবাদপত্র রিপোর্ট অনুযায়ী, যেখানে একেকজনের কাগজ পরীক্ষা থেকে নিয়ে তাদের গাড়ি চালানোর দক্ষতা পরীক্ষায় চার ঘণ্টা সময় দরকার, সেখানে এক মিনিটের কম সময়ের মধ্যে চালকদের লাইসেন্স দেয়া হচ্ছে!

এর থেকে বিপজ্জনক আর কী হতে পারে? এছাড়া সড়কপথে চলাচল-অযোগ্য গাড়ির ফিটনেস পরীক্ষার ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার হচ্ছে। কাজেই পরিস্থিতির মধ্যে কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। কয়েকজন ড্রাইভারকে আটক করা হয়েছে। হয়তো কয়েকজনকে শাস্তিও দেয়া হবে লোক দেখানোর জন্য। কিন্তু যে মালিকরা এসব দুর্ঘটনার জন্য আসলে দায়ী, তারা এখনও ধরাছোঁয়ার সম্পূর্ণ বাইরে।

তাদের একজনকেও গ্রেফতার করা হয়নি, একজনের বিরুদ্ধেও মামলা দেয়া হয়নি। তারা এসব দুর্ঘটনার ঘটক হলেও, মূল দায়িত্ব তাদের হলেও, তারা নিরাপদেই আছে; কারণ তারা সরকারের লোক।

এসব গাড়ির মালিক হলেন সরকারের মন্ত্রী, এমপি, দলীয় নেতা অথবা তাদের আত্মীয়, বন্ধু-বান্ধব। কাজেই তাদের সাত খুন মাফ। তাদের গায়ে হাত দেয়ার উপায় নেই। কাজেই সড়ক দুর্ঘটনার জন্য যারা প্রকৃতপক্ষে দায়ী, তাদেরকে দায়মুক্ত রাখার কারণেই পরিস্থিতি কোনো উন্নতি হচ্ছে না। হওয়ার কথাও নয়। এটাই হচ্ছে এখন বাংলাদেশের বাস্তব পরিস্থিতি।

দেশে কোটা সংস্কার আন্দোলন, নিরাপদ সড়কের জন্য আন্দোলন ছাত্র-ছাত্রীরা করছে। এগুলো দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো ব্যাপার নয়। যে বিক্ষোভ ও আন্দোলন ছাত্র-ছাত্রীরা করেছে, সেটা যে জনগণের অন্যান্য অংশের দ্বারা হবে না এটা চিন্তা করা এক মস্ত রাজনৈতিক মূঢ়তা। কাজেই পরিস্থিতি যে অবস্থায় আছে তাতে ছাত্র-ছাত্রীরা আবার আন্দোলনে নামতে পারে এবং সেই সঙ্গে জনগণের অন্যান্য অংশেরও আন্দোলনে নামার কথা।

সে অবস্থায় সরকার দেশজুড়ে এক প্রতিরোধ ও মহা আন্দোলনের মুখোমুখি হবে। সেই পরিস্থিতি কিভাবে সামাল দেয়ার চেষ্টা করবে এটা সরকারের ব্যাপার। এক্ষেত্রে সরকারের বুদ্ধিজীবী ও দালালদের চাটুকারিতা এবং অসার কথাবার্তা তাদের কোনো কাজে আসবে না। এর মোকাবেলার চেষ্টা তাদের নিজেদেরকেই করতে হবে।

১৯.০৮.২০১৮

বদরুদ্দীন উমর : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল

ঘটনাপ্রবাহ : কোটাবিরোধী আন্দোলন ২০১৮

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter