শতফুল ফুটতে দাও

যে সমুদ্র গর্জন করে, তা একটু আগেও হয়তো নিস্তরঙ্গ ছিল

  ড. মাহবুব উল্লাহ্ ২৬ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ছাত্র-কিশোরদের নিজ হাতে লেখা ফেস্টুনে বিভিন্ন দাবি
ফাইল ছবি

সাম্প্রতিক সময়ে দুটি আন্দোলন দেশকে ভীষণভাবে ঝাঁকুনি দিয়েছে। এদেশে স্বাধীনতা-উত্তরকালে আন্দোলন-সংগ্রামের যে ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে তার মধ্যে সহিংসতার উপাদান কম-বেশি সব আন্দোলনেই ছিল। মনে হয়েছিল ককটেল ফাটানো, গাড়ি ভাংচুর করা এবং অগ্নিসংযোগ করে সরকারি-বেসরকারি সম্পদের ক্ষতিসাধন করতে না পারলে কোনো আন্দোলনই হয় না।

এমনকি ১৯৬৯-এ যে গণঅভ্যুত্থান হয়েছিল, সেই অভ্যুত্থানে লাখ লাখ মানুষের অংশগ্রহণই ছিল মূল বৈশিষ্ট্য এবং এ অভ্যুত্থানে সহিংসতা হয়নি, এমন নয়। ২৪ জানুয়ারি ৬৯-এ গণঅভ্যুত্থান সর্বোচ্চ শিখরে গিয়ে পৌঁছেছিল। সেদিন তৎকালীন দৈনিক পাকিস্তান ও মর্নিং নিউজ অফিসে অগ্নিসংযোগ এবং একজন মুসলিম লীগ নেতার মালিকানাধীন ফিলিং স্টেশনে অগ্নিসংযোগ ব্যতীত বড় ধরনের কোনো হিংসাত্মক ঘটনা ঘটেনি।

ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের লাখ লাখ ছাত্র, শ্রমিক ও মধ্যবিত্ত আন্দোলনের মিছিলে অংশগ্রহণ করে রাজপথ প্রকম্পিত করেছিল। অর্থাৎ এ অভ্যুত্থানে জনগণের সক্রিয় ও সাহসী অংশগ্রহণের পাশে হিংসার উপাদানগুলোকে খুবই বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলেই প্রতীয়মান হয়েছিল। জনতার শক্তি বলতে যা বোঝায় তারই স্বতঃস্ফূর্ত বহিঃপ্রকাশই ছিল সেদিনের মুখ্য বিষয়। ’৬৯-এর আন্দোলনের শেষ পর্যায়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের কোনো কোনো গ্রামীণ জনপদে কৃষকের মধ্যে ভয়ংকর সহিংসতা লক্ষ করা গিয়েছিল। বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার জামালপুর এবং চাঁদপুরের হাইমচরে কৃষক দারুণ রুদ্ররোষে তাদের চেনাজানা গরু চোরদের জবাই করে হত্যা করেছিল।

একজন কৃষকের জন্য হালের বলদ ছাড়া অন্য কোনো মূল্যবান সম্পদ কল্পনা করাও কঠিন। কারণ যে কৃষক ফসলের আবাদ করে জীবিকা সংগ্রহ করে, তার জন্য এক টুকরো জমি ও হালের বলদ ছাড়া অন্যকিছু অধিকতর মূল্যবান হতে পারে না। একজন কৃষকের কাছে হালের বলদ অনেকটাই মাতৃসম। অথচ বছরের পর বছর ধরে সেই হালের বলদই খোয়া যেত গরু চোরদের উৎপাতে। এ উৎপাতের কাছে কৃষক ছিল খুবই অসহায়। কারণ গরু চোররা থাইলতদারদের সহযোগিতা পেত। এ থাইলতদাররা ছিল গ্রামসমাজের বদ-মাতব্বর। ’৬৯-এর অভ্যুত্থান কৃষকের জন্য হাজির হয়েছিল দীর্ঘদিনের অপতৎপরতার প্রতিশোধ নেয়ার সুযোগ হিসেবে। নিঃসন্দেহে ব্যাপারটি ছিল খুবই আতঙ্কজনক। কিন্তু সংগ্রামী জনতা দীর্ঘদিনের আতঙ্কের বদলা নিতে চেয়েছিল আতঙ্ককারীদের মধ্যে আতঙ্কের বিভীষিকা ছড়িয়ে দিয়ে। তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশেই গো-বেচারা কৃষক বিশাল গণঅভ্যুত্থানের সুযোগে এভাবে প্রতিশোধ গ্রহণের প্রয়াস পায়।

এজন্যই হয়তো মাওজেদং বলেছিলেন, বিপ্লব কোনো সূচিশিল্প নয়, অথবা ডিনার পার্টিও নয়। সেদিন গ্রামে-গঞ্জে এরকম হিংসাত্মক ঘটনার খবর শুনে খোদ ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের নেতারাও শঙ্কিত বোধ করেছিলেন। তারা এ হিংসার আগুন প্রশমিত করার জন্য হিংসাকবলিত এলাকাগুলোতেও ছুটে গিয়েছিলেন এবং পাশে রেখেছিলেন স্থানীয় প্রশাসনকে, যে প্রশাসন বিশাল গণঅভ্যুত্থানের মুখে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছিল। এরকম ব্যতিক্রমী হিংসাত্মক ঘটনা সত্ত্বেও ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান ছিল গণশক্তির উদ্বোধন।

বাংলাদেশ-উত্তরকালে বিশাল গণশক্তির ওপর ভর করে তেমন কোনো আন্দোলন গড়ে উঠতে দেখিনি। কিন্তু এবার স্কুল-কলেজের শিশু-কিশোররা নিরাপদ সড়কের দাবিতে যে আন্দোলন গড়ে তুলল, তাতে সহিংসতার উল্লেখযোগ্য কোনো বৈশিষ্ট্য ছিল না। শিশু-কিশোররা যখন হাজারে হাজারে রাজপথে নেমে এলো তখন নিরাপত্তা বাহিনীর লোকদের পক্ষে হতভম্ব হওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প ছিল না।

কচি শিশু-কিশোরদের বুকে গুলি চালায় এমন দুঃসাহস কার? বরং এ আন্দোলনকে একটি ন্যায্য আন্দোলন বলে ঘোষণা দিয়ে এ আন্দোলনকে স্তিমিত করার জন্য ধূর্ত পদক্ষেপের সন্ধান করাই ছিল শাসকগোষ্ঠীর কৌশল। ফলে কিছু অনভিপ্রেত ঘটনাও ঘটল। এরকম ঘটনা একেবারেই কাম্য ছিল না। শাসকগোষ্ঠীর আচরণ সময়-কাল-পাত্র নির্বিশেষে এমনটাই হয়ে থাকে। গণশক্তির জাগরণের বিরুদ্ধে ক্ষমতার মসনদে বসে কিছু ক্ষমতা দেখাতে না পারলে তাদের ক্ষমতায় থাকাটাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে বলে ধরে নেয় তারা। এরকম ধরে নেয়াটা অনেক সময় তাদের বিপর্যয়ও ডেকে আনে।

এবারের ছাত্র-কিশোরদের আন্দোলন এবং তারও আগে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্রদের কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন সরকারবিরোধী আন্দোলন ছিল না। এ আন্দোলন ছিল অন্যায্য রাষ্ট্রব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন। এসব আন্দোলন বিদ্যমান কোনো ছাত্রসংগঠনের নেতৃত্বে সংঘটিত হয়নি। কোটা সংস্কার আন্দোলনের একটি কমিটি থাকলেও ছাত্র-কিশোরদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে কোনো কেন্দ্রবিন্দু ছিল, এমনটা ঠাহর করা যায়নি। অথচ কোনো কেন্দ্রীয় সংস্থার আহ্বান ব্যতিরেকে একযোগে এমন ঘটনা কীভাবে ঘটতে পারল তা এক গবেষণার বিষয়।

ছাত্র-কিশোররা নিজ হাতে লেখা ফেস্টুনে দাবি জানালো, ‘We want justice.’ তারা বেশকিছু কাব্যিক সুষমামণ্ডিত স্লোগানও তুলেছিল। যেমন, ‘আমরা যদি না জাগি মা, কেমনে সকাল হবে’। ‘যদি তুমি ভয় কর তবে তুমি শেষ, যদি তুমি রুখে দাঁড়াও তবেই বাংলাদেশ।’

এ ছাত্র-কিশোররা একটি অকল্পনীয় সৃজনধর্মী পথনির্দেশিকা দিয়েছিল। নির্দেশিকাটি ছিল, ‘সাময়িক অসুবিধার জন্য দুঃখিত, রাষ্ট্র মেরামতের কাজ চলিতেছে।’ এ ছাত্র-কিশোরদের জাস্টিসের দাবি খুবই তাৎপর্যমণ্ডিত। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণার উৎস ছিল ন্যায়বিচার বা ইনসাফের দাবি। এ দাবি নবীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ কতটা পূরণ করেছে তা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে; কিন্তু ন্যায়বিচার বা ইনসাফ নির্দিষ্ট কোনো সময়ের গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকতে পারে না।

সময়ের গতি প্রবাহে নিত্যনতুন অবিচার বা বে-ইনসাফের উৎপত্তি ঘটে। সেজন্য কোনো একটি বিপ্লব বিদ্যমান অবিচারের অবসান ঘটালেও বিপ্লবোত্তরকালে নতুন ধরনের অবিচারের উদ্ভব ঘটে। এ কারণেই হয়তো নিরন্তর বিপ্লবের দর্শনের উদ্ভব ঘটেছে।

তবে প্রশ্ন উঠতে পারে, একটি সমাজে স্থিতিশীলতা ও বৈপ্লবিক পরিবর্তনের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক কী? স্থিতিশীলতাকে অগ্রাহ্য করে কেবল পরিবর্তন বা বিপ্লব অব্যাহত রাখা হবে নৈরাজ্যের শামিল, যা ধংসাত্মকও বটে। অন্যদিকে শুধু স্থিতিশীলতা হয়ে উঠতে পারে জনগণের আকাক্সক্ষাগুলো বাস্তবায়নের পথে বিরাট প্রতিবন্ধকতা। এ দুয়ের মধ্যে অবশ্যই দ্বান্দ্বিক বিশ্লেষণের পথে ভারসাম্য খুঁজে পেতে হবে।

ছাত্র-কিশোররা রাষ্ট্র মেরামতের দাবি করেছে। আমাদের বুদ্ধিজীবীরা অনেকেই বলে থাকেন, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। একটি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো যখন জরাজীর্ণ হয়ে পড়ে, তখন মূল রাষ্ট্রটিকেই টিকিয়ে রাখা চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়ে।

শিশু-কিশোররা সুশৃঙ্খলভাবে ঢাকা নগরীর যানবাহন পরীক্ষা করতে গিয়ে দেখতে পায়, অনেক যানবাহনের লাইসেন্স নেই, ফিটনেস নেই, এমনকি চালকেরও লাইসেন্স নেই। এসব যানবাহন পরীক্ষা করতে গিয়ে গাড়িতে কোনো হোমড়া-চোমড়া ব্যক্তি বসে আছেন কিনা তা নিয়ে তারা কোন বাছবিচার করেনি। দেখা গেছে, সমাজের উচ্চমহলে অবস্থানকারীরাও আইন ভঙ্গ করার ক্ষেত্রে সাধারণের মতোই সাধারণ। নিরাপত্তা বাহিনীর যানবাহনগুলোও এর ব্যতিক্রম ছিল না। এ কারণেই সব মহলই স্বীকার করেছে শিশু-কিশোররা সবার চোখ খুলে দিয়েছে।

শিশু-কিশোররা এক সময়কার ছাত্রসংগঠনগুলোর মতো বিপ্লবের কথা বলেনি। তারা রাষ্ট্র মেরামত বা সংস্কারের কথাই বলেছে। ভাবতে অবাক লাগে কী করে তারা বুঝতে পেরেছিল বিপ্লব তাদের কাজ নয়। শুধু পরিবহন খাতের অসঙ্গতিগুলোর প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে তারা যেন বলতে চেয়েছিল রাষ্ট্রের সমুদয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার প্রয়োজন। এ কাজ করতে গিয়ে তারা কোনো বাড়াবাড়ি করেনি। তারা যা কিছু করেছে তার পুরোটাই ছিল শালীনতা ও সংযত আচরণের চৌহদ্দির মধ্যে সীমাবদ্ধ।

এ আন্দোলনের একপর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাও সংহতি জানাতে রাজপথে নেমে এসেছিল। তাদের কাউকে কাউকে প্রশ্ন করে জানা গেছে প্রচলিত ব্যবস্থা সম্পর্কে তাদের মূল্যায়ন। তারা মনে করে বাংলাদেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক দলই রাষ্ট্রের এ জীর্ণ দশার জন্য দায়ী।

বোধহয় ব্যাপক অনুসন্ধানী জরিপ চালালে এখনকার সাধারণ ছাত্রদের মধ্যে এ মনোভাবটিই প্রাধান্যে আসবে। তবে আওয়ামী লীগ অথবা বিএনপি বুঝতে পারে কিনা জানি না, নতুন প্রজন্ম থেকে তারা কতদূরে অবস্থান করছে। সুতরাং রাষ্ট্র মেরামতের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোরও মেরামতের প্রয়োজন আছে। শুধু জিন্দাবাদ-মুর্দাবাদ স্লোগান দিয়ে অথবা কাউকে রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রকারী আখ্যা দিয়ে যে রাজনীতি চলমান, সেই রাজনীতি কোনোক্রমেই নতুন যুগের চাহিদা মেটাতে পারবে না। এজন্য তাদের একটু স্থিতধী হয়ে আত্মবিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। তাদের অঙ্গ-সংগঠনগুলোর ভূমিকা ও করণীয় নিয়ে অনেক কিছু ভাবতে হবে। এসব সংগঠনকে নিছক লাঠিয়াল বাহিনীর ভূমিকা পালন করতে দেয়া হবে আত্মবিনাশী।

নতুন প্রজন্ম সম্পর্কে এবারের আন্দোলন আমাদের লালিত চিন্তাকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। নতুন প্রজন্ম দেশের ও দশের কথা ভাবে না, এমন ধারণা যে কত ভ্রান্ত, এ আন্দোলনই তার প্রমাণ। সুতরাং নতুন প্রজন্ম চুপচাপ বসে আছে দেখে যা ইচ্ছা তাই করব, এমন মনোভাবও ভ্রান্তিদোষে দুষ্ট। নিস্তরঙ্গ প্রকৃতির মধ্যেও টর্নেডো হতে পারে, এমন চিন্তাও সবাইকে মাথায় রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে, শতবর্ষের নীরবতা ভেঙে সমুদ্রের উত্তাল জোয়ারের মতো কখনও না কখনও শৃঙ্খলিত মানুষ শৃঙ্খল চূর্ণ করে জেগে ওঠে।

ড. মাহবুব উল্লাহ : অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ

ঘটনাপ্রবাহ : বিমানবন্দর সড়কে দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যু

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
.