পাকিস্তানে কৃচ্ছ্রসাধনের নাগরদোলা

প্রকাশ : ৩১ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  আরিফা নুর

নতুন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান সরকারের প্রমোদ ও পরিবহন বাজেটের ক্ষেত্রে মিতব্যয়ী হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

এতে তার সমালোচকরা উচ্চবাচ্য শুরু করেছেন- এটি একধরনের ছলনা এবং এটুকুই যথেষ্ট নয়। এর আগে খাইবার পাকতুনখোয়াতেও একই ধরনের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল; কিন্তু তা কখনও বাস্তবে ঘটেনি। পাকিস্তানের রাজনীতিতে কৃচ্ছ্রসাধন পশ্চিমা বিশ্বের মতো নয়, সেখানে এটি সবসময়ই একটি অস্বাভাবিক ভূমিকা পালন করে।

পশ্চিমা বিশ্বে কৃচ্ছ্রসাধনের জন্য নেয়া পদক্ষেপগুলো সাধারণত সম্পৃক্ত হয় জনকল্যাণমূলক পদক্ষেপগুলোতে রাষ্ট্রের ব্যয়ের ওপর, যেমন- স্বাস্থ্য খাতে। কিন্তু পাকিস্তানে এটি হয়ে থাকে মূলত শাসকরা তাদের জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি বাড়ি ও গাড়িতে কত বেশি মিতব্যয়ী হতে পারেন তার ওপর।

সুতরাং, পিটিআই’র (পাকিস্তান তেহরিক-এ ইনসাফ পার্টি) সমালোচকরা সাবেক সেনাশাসক জিয়াউল হক সম্পর্কে আপত্তিকর বিভিন্ন মন্তব্য করছেন একসময়ের সামরিক একনায়ক যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তার ও বর্তমান সরকারের মধ্যে অস্বস্তিকর তুলনা টানার জন্য। বাস্তবতা হল আমাদের সরকারগুলো কৃচ্ছ্র সাধনের ওপর সবসময় একই ভাঙা বাঁশি বাজায়।

অবশ্য পিপিপি’র (পাকিস্তান পিপলস পার্টি) সরকার এর ব্যতিক্রম- যারা এ ধরনের জনপ্রিয়তা লাভের কৌশলের পথে যাওয়ার ঝামেলায় জড়াতে চেয়েছে খুব কমই।

২০১৩ সালে পিএমএল-এন সরকারও একই ধরনের একটি কৃচ্ছ্রসাধন কার্যক্রম শুরু করেছিল, সরকারি সফরে সাংবাদিকদের বিনা পয়সায় নেয়া হবে না- এমন প্রতিশ্রুতির মধ্য দিয়ে।

পিপিপি সরকারের সময় তথ্য মন্ত্রণালয়ের অর্থ ব্যয়ের স্বেচ্ছাচারিতা নিয়ে সুপ্রিমকোর্টের পদক্ষেপের পরই এমন ঘোষণা এসেছিল নওয়াজ শরিফের সরকারের কাছ থেকে। ওই পদক্ষেপটির প্রশংসা এবং কিছু ক্ষেত্রে জটিলতার সঙ্গে স্বাগত জানানো হয়েছিল এবং শুরুর দিকে

মিডিয়া হাউসগুলোর বিমান টিকিট ও হোটেলের বিল পরিশোধ সংক্রান্ত প্রচুর আলোচনা হয়েছিল।

তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ মন্ত্রিসভা ছোট রাখার মাধ্যমে সরকারের ব্যয় কমানোর প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন (এ ক্ষেত্রেও পিপিপি ব্যতিক্রম- তারা জোটমিত্রদের সুযোগ দেয়ার জন্য নতুন নতুন মন্ত্রণালয় বানিয়েছিল)। সে সময় প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের দিকে না যাওয়ার পরামর্শও দেখা গিয়েছিল।

একইভাবে ১৯৯৭ সালের মেয়াদেও মিতব্যয়িতার সঙ্গে জীবনযাপন করার একই ধরনের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল। নিজের প্রথম দিকের বক্তব্যগুলোতে নওয়াজ শরিফ জোরালোভাবে সরকারের ব্যয় কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

তখন গভর্নর হাউস এবং এ ধরনের অন্য ভবনগুলোকে অর্থ উপার্জনে ব্যবহার করার পরামর্শও দেয়া হয়েছিল। ইমরান খানের প্রতিশ্রুতিগুলো এখন যেমন সমালোচনার মুখে পড়েছে, তখন এ পরামর্শটিও তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছিল; যদিও এখনকার মতো তখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ছিল না।

এতে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই যে, ইমরান খানের দায়িত্ব গ্রহণের পর সাদামাটা শাসনব্যবস্থার প্রতিশ্রুতিগুলোর মধ্যে যেমন চিন্তাচেতনা ছিল, অতীতেও একই ধরনের ভাবনা কাজ করেছিল।

অবশ্য এ ধারাবাহিকতার বিষয়টি খুব কমই স্বীকার করা হবে, কারণ পিটিআইয়ের মধ্যে এমন একটি অন্ধ বিশ্বাসের প্রবণতা আছে যে, এর সরকারের প্রতিটি ঘোষণাই অতীতের রেকর্ডহীন ও নতুন। একই সঙ্গে দলটির সমালোচকদের আচরণও দুর্ভাগ্যজনক, যারা কিনা কৃচ্ছ্রসাধন প্রচারণার ত্রুটি-বিচ্যুতি খোঁজা ও খোঁচা মারার পেছনে খুবই ব্যস্ত। মনে হয় তারা ইতিহাস ভুলে গেছে।

কিন্তু কৃচ্ছ্রসাধন নীতিসংক্রান্ত পাকিস্তানের রাজনীতি এমনভাবে জট পাকিয়ে যায় যে তা সহজে খোলা যায় না। কাজেই এতে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই যে, পিপিপি ঝাঁপিয়ে পড়বে বাদক দল নিয়ে নিজেদের গল্প প্রচার করার জন্য- তারা যখন প্রথম ক্ষমতায় এসেছিল তখন তারা অগ্রবর্তী হয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে প্রথম শ্রেণীতে নয়, কেবল বিজনেস ক্লাসে ভ্রমণ করা যাবে (যে ঘোষণাটি নতুন করে করা হয়েছে নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কর্তৃক)। এটি হচ্ছে বিশ্বে পাকিস্তানের বিশেষ কৃচ্ছ্রসাধন পদক্ষেপ। তবে এটি আরেক গল্প।

আমাদের শাসকরা এবং যাদের তারা শাসন করেন- উভয়ের মাঝে জীবনমানের পার্থক্যের কারণে কৃচ্ছ্রসাধনের এই আচ্ছন্নতা কিন্তু আংশিক। ব্যয়বহুল লাইফস্টাইল, প্রাসাদপম বাসস্থান, ভিআইপি চলাচলের জন্য রাস্তা আটকে রাখা অপব্যয়ী একটি সরকারের প্রতিচ্ছবি তৈরিতে সহায়তা করে, যার কর্মকর্তারা রাজার মতো বাস করেন।

অথচ সাধারণ মানুষ জীবন ধারণের ক্ষেত্রে আয় বুঝে ব্যয় করার সংগ্রামে লিপ্ত। কর্মকর্তাদের বিপরীতমুখী চিত্র এবং তাদের সাঙ্গপাঙ্গদের বড়সড়ো ভবন দারিদ্র্য নিয়ে লড়াই করা মানুষের সঙ্গে সব সময়ই দৃশ্যমান। এ থেকেই বোধগম্য যে, সরকার সেবা না করে বরং শাসন করছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিজেদের বাইক চালিয়ে অফিসে যাওয়া এবং কফি খাওয়ার ছবি দেখার সুযোগ করে দিয়ে আমাদের কর্মকর্তাদের আকাশ-পাতাল ব্যবধান দেখিয়ে সমস্যা বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে। এগুলো মধ্যবিত্তের মধ্যে এমন চেঁচামেচির মনোভাব তৈরি করছে যে, তারা মনে করছে শাসকদের আরও বেশি হারে ‘আমাদের মতো’- মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মতো হওয়া দরকার।

এটিও সমাজের সত্যিকারের নিখুঁত প্রতিকৃতি থেকে অনেক দূরের চিত্র, কারণ ‘আমাদের’ শব্দটি পুরো দেশ থেকে দূরবর্তী বিষয়- আমাদের বলতে ওইসব মানুষ যারা দারিদ্র্যের সঙ্গে বাস করে, এমনকি কোনো আওয়াজ তুলতে পারে না এবং ‘আমাদের’ পক্ষেও কোনো পয়েন্ট তুলে ধরতে পারে না। এটি হচ্ছে অপরিহার্য মধ্যবিত্ত শ্রেণী, অনেককে বাদ দেয়া একটি সামাজিক শ্রেণী।

এই ‘আমাদের’ শব্দটি বলতে যা বোঝায় তা হল শাসকশ্রেণীকে আরও বেশি স্বাভাবিক এবং কম সুবিধাপ্রাপ্ত হতে হবে। এই চাপ সরকারগুলোকে কৃচ্ছ্রতার পদক্ষেপের ঘোষণা দিতে বাধ্য করতে যথেষ্ট ভূমিকা রাখে। সড়ক, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নিরাপত্তা ও পানি- এসব চাহিদা সরকারগুলো মেটাতে সক্ষম নয়, সম্ভবত এমন স্থির ভাবনা তাদের বাধ্য করে কৃচ্ছ্রসাধনের ওপর জোর দেয়ার জন্য। কিছু একটা করা হচ্ছে তা বোঝানোর সহজ ও সংক্ষিপ্ত পথ এটি। যদিও অর্থনৈতিক বিষয়াবলির ক্ষেত্রে এটি খুব বেশিকিছু বোঝায় না।

এ ছাড়াও ব্যয় নিয়ন্ত্রণে আমাদের চিরন্তন উদ্যোগগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ত জটিল অর্থনৈতিক ইস্যুগুলো তুলে ধরার বেলায়ও এটি একটি সহজ পথ। ঋণ-সুদ পুনঃপরিশোধ, সামরিক ব্যয় ও সামান্য রফতানি আয় ব্যাখ্যা করার চেয়ে কৃচ্ছ্রসাধনের বুলি আওড়ানো সহজ। এমনকি মার্গারেট থ্যাচার পর্যন্ত একটি দেশ চালানোকে গৃহস্থালি বাজেট ব্যবস্থাপনার সঙ্গে তুলনা না করে পারেননি। এগুলো কৃচ্ছ্রসাধনের ধারণাকে সুশাসনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার মতো অলীক কল্পনার দিকে নিয়ে যেতে সমাজকে চালিত করে।

কিন্তু অলীক কল্পনাবাদ সত্ত্বেও কৃচ্ছ্রসাধনের ধারণা আমাদের সরকার যেভাবে চর্চা করছে, তা খুব কমই ফলপ্রসূ হয়। এটি পাকিস্তানের অর্থনৈতিক সমস্যার কোনো সমাধান নয়। শাসন প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের সংস্কার ছাড়া এটি শাসকদেরকে জনগণের সেবকেও রূপান্তর করাতে পারবে না। তা সম্ভবত এ জন্য যে, কৃচ্ছ্রসাধনের উদ্যোগের কথা এবং তা নিয়ে বিতর্ক নতুন একটি সরকার দায়িত্ব নেয়ার কয়েক দিন ও সপ্তাহের মধ্যে ভুলে যাওয়া হয়।

বিষয়টি মনে রাখলে পিটিআই ভালো করবে। কৃচ্ছ্রসাধনের পদক্ষেপের মাধ্যমে সরকারের খরচে কেনা বিস্কুটের ধরন ও গাড়ির সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক করে সময় নষ্ট করার চেয়ে বরং শাসন ও সংস্কার করার জন্য এটিই সঠিক সময়। চলুন, আসল কাজের দিকে অগ্রসর হই।

পাকিস্তানের ডন পত্রিকা থেকে ভাষান্তর : সাইফুল ইসলাম

আরিফা নুর : পাকিস্তানি সাংবাদিক