তৃতীয় মত

গণহত্যার পর ইয়াঙ্গুনের নাৎসিদের মিথ্যাচার!

প্রকাশ : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

সাম্প্রতিক বিশ্বের সবচেয়ে বর্বর গণহত্যা অনুষ্ঠানের পাশাপাশি মিয়ানমারের সামরিক জান্তা এখন শুরু করেছে নাৎসিদের কায়দায় বিশ্বময় এই অপরাধ ঢেকে রাখার জন্য মিথ্যা প্রচারের অভিযান। ত্রিশের দশকের জার্মানির নাৎসিদের জাতিবিদ্বেষ ছিল ইহুদিদের বিরুদ্ধে। তাদের ওপর নাৎসিরা যে ভয়াবহ জাতিগত নিধনযজ্ঞ চালিয়েছিল তাকে বলা হয় হলোকাস্ট। এই হলোকাস্টের বিবরণ যারা জানেন, তারা সেই আতঙ্ক থেকে এখনও মুক্ত হতে পেরেছেন কিনা সন্দেহ। মিয়ানমারে চলছে একই কাণ্ড।

হলোকাস্ট নিয়ে বিশ্বে শয়ে শয়ে বই লেখা হয়েছে, ছবি তৈরি হয়েছে। একটি ছবিতে দেখা যায়, এক মায়ের কোলে তার দুই শিশুকন্যা, তার একটিকে রেখে আরেকটিকে নাৎসি সেনারা কীভাবে হত্যার জন্য টেনে নিয়ে যাচ্ছে। ‘লাইট পোর্টার’ নামের একটি বিখ্যাত ফিল্মে দেখা যায় ইহুদি তরুণীদের কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে নিয়ে নাৎসি সেনাপতিদের যৌন লালসার শিকার করা হয়েছে।

নাৎসিরা জার্মানিতে ক্ষমতায় থাকাকালে এই বর্বরতার কথা অস্বীকার করেছে। পাল্টা প্রচারণা চালিয়েছে সাধারণ ইহুদিদের বিরুদ্ধে। জার্মানিতে ইহুদিদের ‘সর্বনাশা ধ্বংসাত্মক ভূমিকার’ কথা বিশ্বময় প্রচার ছিল হিটলারের প্রচারযন্ত্রের একটা বড় কাজ। নাৎসিদের এই মিথ্যা প্রচার এবং বীভৎস গণহত্যার নীতি ১৯৭১ সালে হুবহু অনুকরণ করেছিলেন পাকিস্তানের সামরিক জান্তার তখনকার নেতা জেনারেল ইয়াহিয়া খান।

বাংলাদেশে পাকিস্তানের হানাদার বাহিনী হত্যা করেছে ত্রিশ লাখের মতো নর-নারী। নির্যাতন ও ধর্ষণ করেছে চার লাখের মতো বাঙালি নারী। লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ, বোমাবর্ষণ দ্বারা ধ্বংস করেছে বাংলাদেশের অসংখ্য জনপদ। এই বর্বরতার কথা তারা শুরু থেকে অস্বীকার করেছে, এখনও করছে। বাঙালিদের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে এখনও ঢাহা অসত্য প্রচারণা চালাচ্ছে। বিদেশি নামকরা সাহিত্যিক ভাড়া করে প্রচারণা চালাচ্ছে- ‘৭১-এর গণহত্যা বাঙালিদের প্রচার। আসলে তারাই সে দেশের অবাঙালি বিহারিদের ওপর গণহত্যা চালিয়েছে।’

অথচ একাত্তরের যুদ্ধের বিবরণ ঘাঁটলে দেখা যায়, সেই সময়েই হানাদারদের নেতা ইয়াহিয়া খান এই গণহত্যার কথা পরোক্ষভাবে স্বীকার করে গেছেন। বাংলাদেশে যখন পুরোদমে গণহত্যা চলছে এবং বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানি জেলে, তখন এক ফরাসি সাংবাদিক ইয়াহিয়া খানকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, বাংলাদেশে পাকিস্তানি সেনারা নাকি গণহত্যা চালাচ্ছে? উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার সেনাবাহিনী কি সেখানে প্রীতি ফুটবল খেলা খেলতে গেছেন?’ শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের জেলে বন্দি আছেন কিনা জানতে চাইলে তিনি তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলেন, ‘আপনাদের প্রেসিডেন্ট কি জানেন, দেশের কোন্ দুর্বৃত্তকে কোন্ জেলে আটক রাখা হয়েছে?’ সত্তরের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের অধিকারী শেখ মুজিবকে দু’দিন আগে যিনি দেশের ভাবি প্রধানমন্ত্রী বলে অভিহিত করেছেন, দু’দিন পর তাকে বলছেন দুর্বৃত্ত।

মিয়ানমারের প্রতিবেশী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শুধু বারো-চৌদ্দ লাখ অত্যাচারিত রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে আশ্রয় দিয়েই ক্ষান্ত থাকেননি, তিনি রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর এই হত্যাভিযান এবং লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেয়াকে ’৭১ সালে বাংলাদেশের এক কোটি মানুষকে পাকিস্তানের হানাদাররা যেভাবে ভারতে ঠেলে দিয়েছিল, তার সঙ্গে তুলনা করে বলেছেন, এটা ’৭১ সালের বাংলাদেশের মতো গণহত্যা।

তিনি যে অত্যুক্তি করেননি তার প্রমাণ, জাতিসংঘ এখন বলছে এটা গণহত্যা। দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর জাতিসংঘের মিয়ানমারবিষয়ক তথ্য সংগ্রহ মিশনের চেয়ারপারসন এই রায় দিয়েছেন। শুধু জাতিসংঘ নয়, সারা বিশ্বমিডিয়ায় মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর সেনাবাহিনীর নির্মম অত্যাচারের বিবরণ ও ছবি ছাপা হচ্ছে। বাংলাদেশে শরণার্থীদের মানবেতর জীবনযাপনের চিত্র তুলে ধরা হচ্ছে। এই লাখ লাখ শরণার্থীর, যাদের বাংলাদেশে আগমন এখনও অব্যাহত আছে, তাদের আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ মহানুভবতার পরিচয় দিয়েছে। কিন্তু একা বাংলাদেশের পক্ষে এই বিরাট শরণার্থীর চাপ সহ্য করা সম্ভব নয়। তাদের সাহায্য ও পুনর্বাসনে বিশ্বের ধনী দেশগুলোর এগিয়ে আসা উচিত।

বিশ্বের বহু দেশই এই সাহায্যদানে এগিয়ে এসেছে। কিন্তু সাময়িক সাহায্য দ্বারা রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান হবে না। দরকার রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার নিশ্চয়তা ও অধিকার দান, তাদের নাগরিকত্বের ব্যবস্থা করা। এজন্য বাংলাদেশ মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনা করছে এবং প্রতিবেশীসুলভ শান্তিপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে সমস্যাটির সমাধানের চেষ্টা চালাচ্ছে। এই ব্যাপারে বিশ্বের অধিকাংশ দেশই বাংলাদেশের ভূমিকাকে প্রশংসা করছে এবং সমর্থন দিচ্ছে।

কিন্তু ইয়াঙ্গুনের নাৎসিরা তাতে সাড়া দিচ্ছে না। তারা জার্মান নাৎসি গোয়েবলসের কায়দায় নিজেদের বর্বরতা ঢাকার জন্য মিথ্যা প্রোপাগান্ডা শুরু করেছে। কিন্তু তা-ও বিশ্ববাসীর চোখে ধরা পড়ে গেছে। রোহিঙ্গা সংকটের আসল সত্য প্রকাশের নামে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী একটি বই প্রকাশ করেছে। তাতে বহু ছবি ও তথ্য রয়েছে। রয়টার্সের অনুসন্ধানে ধরা পড়েছে এসব ছবি ও তথ্য সবই ভুয়া। যেমন ১৯৯৬ সালে রুয়ান্ডায় সহিংসতার পর হুতু শরণার্থীদের দেশত্যাগের একটি ছবি তুলেছিলেন পিটার্সবার্গ পোস্ট গেজেটের এক আলোকচিত্র শিল্পী। এই ছবিটিকে মিয়ানমার সেনাবাহিনী তাদের বইতে ছেপে দিয়েছে এবং ক্যাপশন দিয়েছে ব্রিটিশ আমলে বাঙালিরা মিয়ানমারে (তৎকালীন বার্মায়) প্রবেশ করছে। ১৯৭১ সালে ঢাকায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী গণহত্যা চালানোর পর বুড়িগঙ্গা নদীরপাড়ে পড়ে থাকা বাঙালিদের ছবি ছেপে বলা হয়েছে ‘বাঙালিরা বৌদ্ধদের ওপর নিধনযজ্ঞ চালাচ্ছে।’

বাংলাদেশে ও বহির্বিশ্বে এই মিথ্যাচারের খবর ছাপা হয়েছে। সুতরাং এ সম্পর্কে সব তথ্য এখানে উল্লেখের দরকার নেই। ২০১৬ সাল থেকে এই নির্বিচার গণহত্যা এবং মিথ্যা প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী। তাতে বিশ্ববাসী তাদের ধিক্কার দিচ্ছে। তাতে তারা কর্ণপাত করা প্রয়োজন মনে করছে না। তারা জানে বিশ্বের শক্তিশালী দেশগুলো মুখে ধিক্কার দিলেও প্রতিকারের কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করবে না। দুটি প্রতিবেশী বড় দেশ ভারত ও চীনের সহযোগিতায় বাংলাদেশ রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের জন্য চাপ সৃষ্টি করতে পারত। কিন্তু খনিজসম্পদে পূর্ণ রাখাইন রাজ্যের দিকে ভারত এবং চীন দুই দেশেরই নজর থাকায় তারা মিয়ানমারের সামরিক জান্তাকে চটাতে চাচ্ছে না।

নইলে সার্বিয়ায় গণহত্যার নায়ক মিলোচোভিচের হেগের আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার ও দণ্ড হতে পারলে মিয়ানমারের সামরিক জান্তাদের একই অপরাধে বিচার ও দণ্ড হতে পারবে না কেন? জাতিসংঘ ইতিমধ্যেই মিয়ানমারের সেনাপ্রধান এবং তার আরও পাঁচ শীর্ষ সহযোগীকে বিচারের মুখোমুখি করা ও দণ্ডদান আবশ্যক ঘোষণা করেছে। কিন্তু বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে? মিলোচোভিচের বেলায় দণ্ডদানে জাতিসংঘের অক্ষমতার কারণে ব্রিটেনের তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার আমেরিকার সহায়তায় তার বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে মিয়ানমারের জান্তা সর্দারদের বিরুদ্ধে প্রয়োজন হলে এ ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে কে বা কারা? সবার মুখেই শান্তিপূর্ণ মীমাংসার কথা। কিন্তু শান্তির ললিত বাণী ব্যর্থ পরিহাসে পরিণত হবে একথা সবাই জানেন।

ভরসা ছিল অং সান সু চির ওপর। তিনি শান্তির জন্য নোবেল পুরস্কারজয়ী এবং গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রামের একজন নির্ভীক সৈনিক ছিলেন। কিন্তু তার চরিত্র সম্পূর্ণ পরিবর্তিত হয়েছে। তিনি তার বিবেক ও মানবিকবোধ সামরিক জান্তার হাতে জিম্মি রেখেছেন। তাই তাকে সামনে শিখণ্ডী হিসেবে খাড়া করে রোহিঙ্গাদের ওপর সামরিক জান্তা বর্বরতা চালানোর দুঃসাহস দেখাচ্ছে।

জান্তা মিথ্যা প্রচার চালাচ্ছে, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশকারী। তারা কালচার ও শারীরিক গঠনের দিক থেকে মিয়ানমারের বৌদ্ধ অধিবাসীদের সঙ্গে মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের কোনো অমিল নেই। যদি রোহিঙ্গাদের বাঙালি বলতে হয়, তাহলে ব্রিটিশ আমলের প্রথমদিকে মিয়ানমার ব্রহ্মদেশ নামে অবিভক্ত বাংলার অন্তর্ভুক্ত ছিল। ফলে গোটা মিয়ানমারই তো বাংলাদেশের এখতিয়ারভুক্ত।

মিয়ানমার জান্তার অভিযোগ, রোহিঙ্গাদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসী আছে। অবশ্যই রোহিঙ্গাদের মধ্যে কিছুসংখ্যক সন্ত্রাসী আছে- তারা পাকিস্তান, সৌদি আরব ও বাংলাদেশের জামায়াতিদের মদদপুষ্ট। এ ধরনের সন্ত্রাসী অনেক দেশেই আছে। সেজন্য গোটা সংখ্যালঘু সমাজকে দায়ী করে গণহত্যা ও গণবিতাড়নের নীতি গ্রহণ করা হয় না সেখানে। কোনো দেশ নিজ দেশের সংখ্যালঘু শ্রেণীর নাগরিকদের নাগরিকত্ব হরণ করে না, তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে না। মানবতার বিরুদ্ধে চরম অপরাধ করে না।

মিয়ানমারের জান্তা আজ এই চরম অপরাধই করছে। যদি শান্তি ও সমঝোতার মাধ্যমে তারা সমস্যার সমাধানের প্রস্তাবে কান না দেয়, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে সামরিক তৎপরতা গ্রহণের কথা ভাবতে হবে। একা কোনো দেশের পক্ষে তা গ্রহণের কথা ভাবা সম্ভব নয়, উচিতও না। জাতিসংঘ মিয়ানমারের জান্তাকে গণহত্যার জন্য দায়ী করেছে, তাদেরই উচিত এ তৎপরতা গ্রহণের কথা জরুরি ভিত্তিতে বিবেচনা করা।

লন্ডন ২ সেপ্টেম্বর, রবিবার, ২০১৮