নির্বাচনে সংসদীয় দলগুলোর দায়িত্ব প্রসঙ্গে

  বদরুদ্দীন উমর ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

জাতীয় সংসদ ভবন
জাতীয় সংসদ ভবন

অবস্থা দেখে মনে হয়, ২০১৪ সাল থেকে বিগত পাঁচ বছরে দেশের পরিস্থিতির মধ্যে যে পরিবর্তন হয়েছে তার কোনো হদিসই আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের নেই এবং এই সময়ে দেশে জনগণের বিভিন্ন অংশের মধ্যে তাদের শাসনের যে প্রতিক্রিয়া হয়েছে, এর বিরুদ্ধে যেসব আন্দোলন হয়েছে, সাম্প্রতিক শিক্ষার্থী আন্দোলনসহ, তার থেকে কোনো শিক্ষাই তারা গ্রহণ করেননি।

কয়েক দিন আগে নেপাল থেকে ফিরে এসে ২ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা এক সংবাদ সম্মেলনে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, তার সরকারের অধীনেই সংবিধান অনুযায়ী আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এ নিয়ে কারও সঙ্গে আলোচনার সুযোগ নেই। আলোচনার প্রশ্নই ওঠে না। অথচ শুধু আলোচনার প্রশ্নই নয়, এ ইস্যুটি নিয়েই সব বিরোধী দল এবং জনগণের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা এখন বাংলাদেশের রাজনীতিতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে এই প্রশ্নের গুরুত্ব কারও অস্বীকার করার উপায় নেই। অস্বীকার করলে সেটা হবে বাস্তব পরিস্থিতির কোনো পরোয়া না করা, তার দিকে না তাকিয়ে চোখ বন্ধ রাখা অর্থাৎ নিজেকে অন্ধ রাখা। নিজেকে অন্ধ রাখা ভালো নয়, তার মধ্যে প্রজ্ঞার কোনো পরিচয় নেই। উপরন্তু বিপদের সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে যুগান্তরের প্রথম পৃষ্ঠায় প্রকাশিত এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, ‘আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন মহলের সংশয়-সন্দেহকে উড়িয়ে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, নির্বাচন হবেই। কেউ বানচাল করতে পারবে না। এটা ঠেকানোর কারও কোনো শক্তি নেই। বিএনপির নির্বাচনে অংশ নেয়ার বিষয়টি তাদের দলীয় বিষয় মন্তব্য করে তিনি বলেন, বিএনপিকে নির্বাচনে আনতেও যাব না, বাধাও দেব না। তবে, বিএনপির সঙ্গে সংলাপে বসবেন না বলে সাফ জানিয়ে দেন তিনি। তিনি আরও বলেন, সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচিত সরকারের অধীনেই নির্বাচন হবে (যুগান্তর, ০৩.০৯.২০১৮)।

নির্বাচনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপির সঙ্গে কোনো সংলাপে সরকারি দল আওয়ামী লীগ বসবে না, এ ঘোষণা সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। তাছাড়া দেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে সেখানে ক্ষমতাসীন দল থেকে নিয়ে বিরোধী দলের যে কেউই নির্বাচনে আসতে পারে, না-ও আসতে পারে। তাতে সরকারি দলের কোনো কিছু করার নেই। কারণ নির্বাচনের মালিক সরকার নয়। সংসদীয় ব্যবস্থায় সেটা সাংবিধানিক আইন অনুযায়ীই হয়ে থাকে। সে ক্ষেত্রে সরকারি দলের কাজ হচ্ছে, ক্ষমতায় থেকে এই নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে মসৃণ করা। এর জন্য দরকার সব সংসদীয় দলের নির্বাচনে অংশগ্রহণ। অন্যের অংশগ্রহণ বাধাগ্রস্ত করে অথবা তাদেরকে বাইরে রেখে নির্বাচন করা নয়, যেভাবে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন হয়েছে। সেই নির্বাচন যে একটি একতরফা ও অগ্রহণযোগ্য নির্বাচন ছিল এবং জনগণের ভোট ছাড়াই জাতীয় সংসদে আওয়ামী লীগ ১৫৩টি আসনে ‘জয়লাভ’ করে সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা যেভাবে লাভ করছিল, এটা সংসদীয় গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক কোনো জয় ছিল না। উপরন্তু বলা চলে, এ ধরনের ব্যাপার সংসদীয় গণতন্ত্রকে পরাজিত করারই শামিল। বাংলাদেশের জনগণ এর পুনরাবৃত্তি আর চান না। এবং তারা যে এটা চান না তা দেশের জনগণের বিভিন্ন ধরনের আন্দোলনের মাধ্যমে ইতিমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে। এর প্রমাণসিদ্ধতা নিয়ে কোনো সৎ ও বুদ্ধিমান লোকেরই কোনো সন্দেহ থাকতে পারে না।

আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী নেপাল থেকে ফিরে এসে ঘোষণা করেছেন যে, বর্তমান সরকারের অধীনেই নির্বাচন হবে। কিন্তু কয়েক দিন আগে পর্যন্ত তিনি ও তার লোকজন বলছিলেন, নির্বাচনের আগে বর্তমান সরকার ভেঙে দিয়ে সংসদ সদস্যদেরকে নিয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে নির্বাচনকালীন সরকার গঠিত হবে। এভাবে হঠাৎ করে মত পরিবর্তনের কারণ বোঝা মুশকিল। কিন্তু বাংলাদেশের এ মুহূর্তের বাস্তবতা হচ্ছে, বর্তমান সরকার অথবা শুধু বর্তমান জাতীয় সংসদের সদস্যদের দিয়ে গঠিত শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠানের অনুপযুক্ত। কাজেই সে ধরনের সরকার বাদ দিয়ে একটি নতুন জাতীয় সরকারের মাধ্যমে নির্বাচন করা দরকার। এটা এক জটিল ব্যাপার হলেও এর ভিত্তিতেই এখন সব নির্বাচনী রাজনীতি পরিচালিত হচ্ছে।

ইতিহাসের নিজের একটা গতি আছে এবং এই গতিও কতকগুলো নিয়মের অধীন। এই গতি ও নিয়মের প্রতি কোনো খেয়াল না করে, তাকে পরোয়া না করে অনগ্রসর হতে থাকলে কারও সাফল্য নিশ্চিত হবে এটা বলার উপায় নেই। উপরন্তু এর ফল বিপরীত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। এটা লক্ষ না করলে চলবে না যে, ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে বিরোধী দলগুলোর মধ্যে নির্বাচন নিয়ে বিশেষ কোনো তৎপরতা না থাকলেও এখন নির্বাচন সামনে রেখেই সংসদীয় বিরোধী দলগুলো যথেষ্ট চাঙ্গা হয়েছে এবং তারা নানা ধরনের তোড়জোড় করছে। তাছাড়া প্রধান বিরোধী দল বিএনপির প্রতি ২০১৪ সালে জনগণের একটা অংশের মধ্যে যে বিরুদ্ধ মনোভাব তৈরি হয়েছিল তাদের নির্বুদ্ধিতা, জ্বালাও-পোড়াও আন্দোলনের কারণে, সেটা এখন আর নেই। এদিক দিয়ে তারা এখন শক্তিশালী। কাজেই এভাবে শক্তি সঞ্চয় করে নির্বাচন সামনে রেখে তারা যে তৎপরতা এখন চালিয়ে যাচ্ছে, তাকে ‘চক্রান্ত’ আখ্যা দিয়ে বসে থাকলে সেটা রাজনৈতিক প্রজ্ঞাসম্মত কাজ হবে না। উপরন্তু এটা করলে আওয়ামী লীগকে অদূর ভবিষ্যতে বড়রকম রাজনৈতিক খেসারত দিতে হবে।

কয়েক দিন আগে সিলেটে গিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী মেয়র নির্বাচনে আওয়ামী লীগের শোচনীয় পরাজয়ের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেছেন, এক সময়ে সিলেট ছিল আওয়ামী লীগের ঘাঁটি। কিন্তু এখন সিলেটে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা ও শক্তি তলানিতে এসে দাঁড়িয়েছে। অন্য মেয়র নির্বাচনগুলোতে আওয়ামী লীগ সরকার বেশ ‘সাফল্যের’ সঙ্গে নির্বাচন অনুষ্ঠান করলেও সিলেটে তারা এটা করতে না পারায় তাদের পরাজয় হয়েছে। তাদের এই পরাজয়ের মাধ্যমে সত্য যেভাবে উঁকিঝুঁকি মেরেছে, সেটা দেখেই যে আওয়ামী লীগ নেতা সিলেটে নিজেদের অবস্থা সম্পর্কে উপরোক্ত মন্তব্য করেছেন এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু তারা আরও ভালোভাবে সারা বাংলাদেশের দিকে যদি চোখ খুলে তাকিয়ে দেখেন তাহলে দেখতে পাবেন, সিলেট কোনো ব্যতিক্রম নয়। সারা বাংলাদেশেই এ অবস্থা এখন বিরাজ করছে। কাজেই এ অবস্থাকে পরোয়া না করার অর্থ হল, রাজনৈতিকভাবে আগ্নেয়গিরির ওপর বসে থাকা।

সংসদীয় গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে ক্ষমতা হাতে আসে নির্বাচনের মাধ্যমে। ক্ষমতার হাতবদল হয় নির্বাচনের মাধ্যমে। এটাই নিয়ম। কাজেই কোনো ক্ষমতাসীন দল নির্বাচনে পরাজিত হয়ে ক্ষমতাচ্যুত হলে সেটা লজ্জার বা চূড়ান্ত পরাজয়ের কোনো ব্যাপার নয়। এ কারণে সংসদীয় রাজনীতিতে ক্ষমতার এই হাতবদল সবাই মেনে নেয়। অন্যথায় এর ফলাফল অন্যরকম দাঁড়ায়। বুর্জোয়া সংসদীয় রাজনীতিতে যে কোনো সরকারের আমলে জনগণের ওপর অল্পবিস্তর শোষণ-নির্যাতন হয়। এই শোষণ-নির্যাতনের ফলে জনগণের মধ্যে ক্ষোভ ও বিরোধিতার সৃষ্টি হয়। নির্বাচন হল এই ক্ষোভের বাষ্প নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে বের করে দেয়ার ব্যাপার। একে বের করে না দিলে অথবা এই বাষ্প বের হওয়ার সব পথ বন্ধ করলে সে সমাজে রাজনৈতিক বিস্ফোরণ অনিবার্য হয়। এবং এই বিস্ফোরণের মাধ্যমে যে ক্ষমতার হাতবদল হয় এটা বলাই বাহুল্য। নিয়মতান্ত্রিক পথে জনগণের মধ্যে সঞ্চারিত ক্ষোভের বাষ্প বের হতে না দিলে তার পরিণতি এড়িয়ে যাওয়া কারও পক্ষে সম্ভব নয়। সংসদীয় গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে এ জন্যই সুষ্ঠু নির্বাচনের গুরুত্ব অপরিসীম। পশ্চিমা বুর্জোয়া বা পুঁজিবাদী দেশগুলো সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন করেই নিজেদের শাসন-শোষণকে যথাসাধ্য মসৃণ করে রেখেছে। কিন্তু তুলনায় অনুন্নত ও পশ্চাৎপদ দেশগুলোতে সংসদীয় রাজনীতি প্রবর্তিত হলেও এর নিয়মকানুন ঠিকমতো মান্য না করে চলার কারণে এসব দেশে গণতন্ত্রের বিকাশ ঘটে না এবং শাসন ক্ষেত্রে দমনপীড়নের প্রয়োজন হয়। সংসদীয় রাজনীতির নিয়মকানুন মেনে না চললে যা হওয়ার তা-ই হয়।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, বিএনপি বা অন্য কোনো দলের, পরিবারের বা ব্যক্তির জমিদারি নয়। জনগণ যতই নানা ধরনের শৃঙ্খলে আবদ্ধ থাকুক, শেষ বিচারে দেশ জনগণেরই। কাজেই জনগণ কারও প্রজা নন। তাদের ওপর জমিদারি ফলাতে যাওয়া কারও পক্ষে বুদ্ধিমত্তার কাজ নয়। কিন্তু সেটা না হলেও ক্ষমতা ক্ষেত্রবিশেষে মানুষের বুদ্ধিচর্চাকে বাধাগ্রস্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত করে। অনেক সময় বুদ্ধিকে বিধ্বস্তও করে। সে অবস্থার পরিণতি রাজনৈতিকভাবে কখনোই ভালো হয় না। দুনিয়ার বিভিন্ন দেশে এবং আমাদের এ অঞ্চলেও এর উদাহরণের অভাব নেই।

বাংলাদেশে এখন একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন জরুরি হয়েছে। এই সত্যটি সবারই উপলব্ধি করা দরকার। অপশাসনের কারণে এখানে এই লক্ষ্য অর্জন করা সহজ নয়। কিন্তু এর প্রয়োজন যেখানে জরুরি সেখানে সমস্যা যতই কঠিন হোক, তার সমাধান না হলে শুধু যে জনগণ চরম দুর্দশার মধ্যে পতিত হবেন তাই নয়, সমগ্র শাসক শ্রেণীই এর মাধ্যমে এক অদৃষ্টপূর্ব সংকটে নিক্ষিপ্ত হবে। কাজেই আগামী নির্বাচন নিয়ে আবোলতাবোল কথাবার্তা, ইতিমধ্যে জটিল পরিস্থিতিকে আরও জটিল করার মতো কাজ করা হলে তার খেসারত সবাইকেই দিতে হবে। এদিক দিয়ে ক্ষমতাসীন দল ও সরকারের দায়িত্ব ও করণীয় যে সব থেকে বেশি, এটা কোনো নির্বোধের পক্ষেও উপলব্ধি করা কঠিন নয়।

০৩.০৯.২০১৮

বদরুদ্দীন উমর : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল

ঘটনাপ্রবাহ : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
.