প্রশাসন, না শাসন?

প্রকাশ : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  পবিত্র সরকার

ফাইল ছবি

সম্প্রতি, গত ২৭ আগস্ট তারিখে, এক নৈশ অভিযান চালিয়ে গ্রেফতার করা হয়েছে পাঁচজন ভারতীয় সমাজকর্মী ও মানবাধিকার কর্মীকে, যাদের মধ্যে একজন ভারভারা রাও, তেলুগু ভাষার এক প্রখ্যাত কবি। তাকে ধরা হয়েছে তার বাসস্থান হায়দরাবাদ শহর থেকে।

দিল্লি থেকে ধরা হয়েছে মানবাধিকারকর্মী গৌতম নওলাখাকে, মুম্বাই থেকে মানবাধিকারকর্মী ভার্নন গঞ্জাল্ভেজ, ফরিদাবাদ থেকে মানবাধিকার আইনজীবী সুধা ভরদ্বাজ, মুম্বাইয়ের কাছে ঠানে থেকে আরেক আইনজীবী অরুণ পেরেইরাকে।

শুধু এ ক’জনকে গ্রেফতার নয়, পুলিশ আরও পাঁচজনের বাড়িতে খানাতল্লাশি চালিয়েছে, তাদের মধ্যে দু’জন হলেন রাঁচির খ্রিস্টান ধর্মযাজক ফাদার স্ট্যান স্বামী আর তেলেঙ্গানার সমাজকর্মী ক্রান্তি।

তাদের অপরাধ কী? জানা গেল তাদের অপরাধ ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে ‘খুনের চেষ্টা’। কী করে সেটা জানা গেল? না, একমাস আগে লেখা একটি বেনামি চিঠিতে সে কথা জানানো হয়েছিল।

একে বেনামি চিঠি, যার কোনো আইনগত বৈধতা না থাকারই কথা- তারই ওপর ভিত্তি করে মহারাষ্ট্র সরকারের পুনে শহরের পুলিশ একসঙ্গে মহারাষ্ট্র, গোয়া, দিল্লি, তেলেঙ্গানা আর উত্তরপ্রদেশে হানা দেয় এবং এই চারজনকে জেলে পুরে দেয়ার নাটকীয় ব্যবস্থা করে।

পরে অবশ্য আদালতের ধমকানিতে পুলিশি গারদ বা জেলে নয়, তাদের নিজেদের বাড়িতে বন্দি করে রাখতে বাধ্য হয়।

প্রশ্ন উঠবে, এক মাস আগে একটি বেনামি চিঠি পেল পুলিশ বা স্বরাষ্ট্র দফতর, আর এই এক মাসে এমন কোনো প্র্রমাণ কি পাওয়া গেছে যাতে বোঝা যায় যে, তারা একত্র হয়ে বা ভিন্ন ভিন্ন সূত্রে প্রধানমন্ত্রীর প্রাণনাশের কোনো কাজে অগ্রসর হয়েছিলেন?

প্রধানমন্ত্রীর কোনো সভায় বন্দুক-পিস্তল হাতে তাদের কাউকে দেখা গেছে, কিংবা দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রীর গাছপালাওয়ালা বিশাল বাড়িতে কেউ গাছের ডালে রাইফেল তাক করে বসেছিলেন? না, পুলিশ সে কথা বলছে না।

তাদের কাছে একমাত্র সূত্র ওই চিঠিটি, বেনামি, যেটাকে তারা এদের অপরাধের প্রত্যক্ষ প্রমাণ বলে মনে করছে। কোনো কাজের প্রমাণ যখন নেই, তখন ধরে নিতে হবে ‘ইচ্ছার’ প্রমাণ।

আর কী অবিশ্বাস্য আশ্চর্য কথা- পত্রলেখক এদের সবার মনের মধ্যে ঢুকে গিয়ে তাদের প্রধানমন্ত্রীকে হত্যার ইচ্ছার খবর বার করে এনেছেন এবং মহারাষ্ট্রের পুলিশ সেটাকে ‘ব্যাদ’জ্ঞানে লুফে নিয়েছে।

বলাবাহুল্য, সারা ভারতে এ নিয়ে যে প্রবল আর সর্বব্যাপী প্রতিবাদ ধ্বনিত হয়েছে তার প্রকোপ সামান্য নয় এবং তা এখনও থামেনি। শুধু কংগ্রেস বা সিপিআই (এম) বা অন্যান্য বিরোধী দল নয়, প্রতিবাদ করেছেন লেখিকা অরুন্ধতী রায়, যার কথা- যারা ধৃতদের জন্য আইনি লড়াই করতেন তাদের কণ্ঠ আর সক্রিয়তা রোধের জন্য এই উদ্যোগ।

ঐতিহাসিক রামচন্দ্র্র গুহের কথায় এই কাজ ‘পাশবিক, স্বৈরাচারী, দমনমূলক ও বেআইনি।’ দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেত্রী শেহলা রশিদ, ইতিহাসবিদ পুরঞ্জয় গুহঠাকুরতা, গুজরাটের দলিত নেতা জিগ্নেশ মেবানি, স্বামী অগ্নিবেশ, সমাজকর্মী তিস্তা শীতলবাদ প্রমুখ সবাই এই অপকর্মকে ধিক্কার দিয়েছেন।

রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে রাহুল গান্ধী বিদ্রূপ করেছেন এই বলে যে, ‘আরএসএস ছাড়া আর কোনো স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাকে এ দেশে থাকতে দেয়া হবে না।’ সিপিআই (এম)-এর সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি বলেছেন, ‘দেশে এ হল স্বৈরাচারের নির্ভুল পদপাত।’

এই প্রতিবাদ এখনও থামেনি, আর অঞ্চলের দিক থেকে সারা দেশে ছড়িয়ে গেছে। ২ সেপ্টেম্বর পশ্চিমবঙ্গের বুদ্ধিজীবীরা শঙ্খ ঘোষ, তরুণ মজুমদার, রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত, অশোক মুখোপাধ্যায়, দেবেশ রায় প্রমুখ একটি সভায় সম্মিলিত হয়ে এই রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসকে ধিক্কার জানিয়েছেন।

বোঝাই যাচ্ছে যে, এই প্রতিবাদ ও ধিক্কার চলবে, সহজে ক্ষান্ত হবে না। ২ সেপ্টেম্বরই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী খুব নিষ্পাপ উচ্চারণে বলেছেন, তিনি ‘অনুশাসন’ আনতে চান, কিন্তু সবাই তাকে ‘স্বৈরাচারে’র তকমা দিচ্ছে।

‘অনুশাসন’ বা ‘ডিসিপ্লিন’ কথাটা আমাদের অস্বস্তি বাড়ায়, কারণ আমাদের মনে পড়ে, এই শব্দটি ১৯৭৫-এ শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি অবস্থার সময়েও মুহুর্মুহু ব্যবহৃত হয়েছিল। ‘অনুশাসন’ নিশ্চয়ই, কিন্তু কাদের শর্তে, সেটাই মূল প্রশ্ন।

২.

এই অনুশাসনের দুটি মাত্রা আছে। এক হল তথাকথিত ‘মাওবাদী’দের শায়েস্তা করা। হ্যাঁ, এ কথা ঠিক যে, ভারতের কোথাও কোথাও- মধ্যপ্রদেশ বা ছত্রিশগড়ে যেমন- আদিবাসীদের সংগঠিত করে তথাকথিত নকশাল বা মাওবাদীরা তাদের জমি, খনিজসমৃদ্ধ এলাকা, অরণ্যের অধিকার ইত্যাদির জন্য গেরিলা লড়াইয়ে লিপ্ত আছে।

সরকারের পুলিশ বা সৈন্যবাহিনী তাদের রেয়াত করছে না। প্রায়ই আমরা কাগজে এই সংবাদ শুনতে পাই যে, সম্মুখ বা গোপন সংঘর্ষে এতজন ‘নকশাল’ বা পুলিশ মারা গেছে। কিন্তু তার আড়ালে আছে দলিত আর আদিবাসীদের জমি এবং অধিকারের লড়াই।

শহুরে জমিলুটেরা আর প্রমোটাররা যেমন নানাভাবে দলিত ইত্যাদিদের জমি লুটে ঝাঁপিয়ে পড়ছে, প্রশাসনের সমর্থনে, তেমনি তারাও বাধা দিচ্ছে এবং নিরপরাধ লোকদের জেলে পোরা হচ্ছে। মানবাধিকার কর্মীরা তাদের হয়ে আইনি লড়াই করছেন, তাই তারা রাষ্ট্রের শত্র“ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছেন ক্রমশ।

এতদিন দলিত আর আদিবাসীরা সম্পত্তি দখল আর আত্মসাতের ব্যাপারে শহরের জমি লুটেরাদের ‘সফ্ট টার্গেট’ বা নরম লক্ষ্য ছিল, এখন তারা প্রতিবাদে সংগঠিত হতেই, এবং মানবাধিকারকর্মীরা তাদের পাশে দাঁড়াতেই রাষ্ট্র এদের সবারই বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে এবং প্রায় একটা অলিখিত যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। মধ্যপ্রদেশ-ছত্রিশগড়ে অজস্র ‘নকশাল’ খুন হয়েছে।

কিন্তু ভারতের বর্তমান শাসকদের যুদ্ধ শুধু দলিত, আদিবাসী বা তাদের শহরের বন্ধুদের বিরুদ্ধে নয়- মানবাধিকারকর্মীদের শাসকরা ‘শহুরে মাওবাদী’ বা ‘শহুরে নকশাল’ বলে থাকে, তাদের যুদ্ধ যুক্তির বিরুদ্ধে, মুক্তচিন্তার বিরুদ্ধে, তাদের বিরুদ্ধে যে কোনো ন্যায়সঙ্গত বিরুদ্ধতার বিরুদ্ধে।

গণতন্ত্রে শাসকের বিরুদ্ধে সমালোচনার যে একটি কম-বেশি প্রশস্ত পরিসর থাকা দরকার, তা দেশের সর্বোচ্চ আদালতও বারবার সরকারকে স্মরণ করায়, বলে যে, সরকারের সমালোচনা হল একটি সেফটি ভাল্ভ, যাতে ক্ষোভের নিরুদ্ধ বাষ্প নিষ্কাশিত হতে পারে, তা শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রকে সাহায্যই করে।

কিন্তু ইদানীং ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার এবং কোনো কোনো রাজ্য সরকার এই উপদেশে যথেষ্ট ভরসা রাখতে পারছেন না, যা সবারই চোখে পড়ছে। তাদের বিশ্বাসে যারা সমর্থন জোগায় সেই হিন্দু জনজাগৃতি সমিতি, হিন্দু গোবংশ রক্ষা সমিতি, শ্রীশিবপ্রতিষ্ঠান হিন্দুস্তান ইত্যাদির সঙ্গে যুক্ত কর্মীরা কর্নাটক ও মহারাষ্ট্রে গৌরী লঙ্কেশ, লেখক, সাবেক উপাচার্য (হাম্পি বিশ্ববিদ্যালয়) এমএম কালবুর্গি, যুক্তিবাদী নরেন্দ্র দাভোলকর আর গোবিন্দ্র পানসারের হত্যায় লিপ্ত ছিল বলে গ্রেফতার হয়েছে।

গোয়ার সনাতন সংস্থার নামও এই প্রসঙ্গে উঠে এসেছে। মনে রাখতে হবে যে, ১৯৪৮-এর ৩০ জানুয়ারি মহাত্মা গান্ধীকে হত্যা করেছিল রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের সদস্য নাথুরাম গডসে নামে এক মারাঠি যুবক। এখন তার নামে একটি মন্দির প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে।

ভারতের গণতন্ত্রকামী, যুক্তিবাদী, দরিদ্র ও অবঞ্চিত মানুষের অধিকার রক্ষায় নিবেদিত মানুষের পক্ষে যে বুদ্ধিজীবী সমাজ, তারা এসব লক্ষণে বিশেষ উদ্বিগ্ন। এখানে বিজ্ঞান কংগ্রেসে এখন শাসকরা এসে বক্তৃতা দেন যে, গণেশের হাতির মুণ্ডু প্রাচীন ভারতে প্লাস্টিক সার্জারির প্রমাণ, প্রাচীন ভারতে এরোপ্লেন ছিল এবং নানা মন্ত্রী ও বিচারক গোবরে ক্যান্সার সারে, ময়ূরের চোখের জল পান করে ময়ূরী গর্ভবতী হয়, গরুর মূত্রে সর্বরোগ সেরে যায়- এই সব মহৎ জ্ঞান বিতরণ করেন। গোরক্ষার নামে বা বিধর্মী হওয়ার অপরাধে নিরপরাধ শ্রমিকের হত্যা ঘটে।

বাবরি মসজিদের নিচে রামমন্দির ছিল- এই দাবির অনুকরণে বলেন তাজমহলের নিচে শিবমন্দির ছিল, আর চতুর্দিকে মন্দির প্রতিষ্ঠা, রামনবমীতে রাম স্মরণ, হনুমান-জয়ন্তীতে হনুমান পূজা, জন্মাষ্টমীতে কৃষ্ণমহিমার রমরমা ছড়ানোর প্রকল্পে উদ্যোগী হন। মোঘল বা ইসলামের স্মৃতিজড়িত নামগুলোকে বদলে দেয়ার উদ্যোগ নেন।

দেশকে একরঙা করার আয়োজন চলে। ভারতীয় বুদ্ধিজীবীরা তাই উদ্বেগ, অবিশ্বাস, কিছুটা দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া প্রতিবাদ নিয়ে দিনযাপন করেন।

জানি না, ২০১৯-এ নির্বাচনে পরাজয়ের ভয় শাসককুলকে এই আতঙ্কিত প্রতিক্রিয়ায় বাধ্য করেছে কিনা। কিন্তু আমাদের স্বল্পবুদ্ধিতে যা মনে হয়- এসব কাজ তাদের নির্বাচন উত্তরণে কতটা সাহায্য করবে তা সন্দেহস্থল।

পবিত্র সরকার : সাবেক উপাচার্য, রবীন্দ্র্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা