কেমন হবে ইমরান খানের পররাষ্ট্রনীতি

  মুঈদ ইউসুফ ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ইমরান খান
ছবি-সংগৃহীত

পাকিস্তান যখন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বহু সমস্যার মুখে রয়েছে, তখন পররাষ্ট্রনীতিতে যৎকিঞ্চিৎ অভিজ্ঞতাধারী ইমরান খান দেশটির ক্ষমতায় এসেছেন।

যুক্তরাষ্ট্র-পাকিস্তান ক্ষয়িষ্ণু সম্পর্কে জোড়া লাগানো বা ভারতের সঙ্গে পারমাণবিক উত্তেজনা প্রশমন করার বিষয়ই হোক- পররাষ্ট্রনীতিতে খানের দিকনির্দেশনা দেয়ার সক্ষমতার বিষয়টি নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক বিষয়াবলিতে ঐতিহাসিকভাবে ইসলামাবাদের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়া পাকিস্তানের শক্তিশালী সেনাবাহিনীর সঙ্গে তার সম্পর্কের ওপর।

ইমরান খান ও তার দল পিটিআই জটিল এমন একটি আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির মধ্যে ক্ষমতার ভার নিয়েছে, যেখানে আফগান শান্তি প্রক্রিয়ায় একটি গতি তৈরি হচ্ছে এবং চীনা ঋণের কারণে তৈরি হতে যাওয়া ঋণ সংকট দ্রুত বিকাশমান চীন-পাকিস্তান সম্পর্ককে আংশিকভাবে হলেও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে যাচ্ছে।

এ পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতি, আঞ্চলিক প্রভাবশালী ও আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে খান কী কী প্রভাব রাখতে পারেন?

প্রথমত, নতুন সরকারের আওতায় ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক কেমন হবে? যদিও নির্বাচনের পর থেকে দুই পক্ষের মধ্যে হওয়া প্রাথমিক বার্তা বিনিময় থেকে আমি উৎসাহী, তারপরও ভারত পাকিস্তান বিষয়ে এর অবস্থান নরম করছে এমন কোনো লক্ষণ আমি দেখছি না।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে পাকিস্তান একটি ইস্যু হয়ে পড়েছে এবং নরেন্দ্র মোদির সরকার আগামী বছর নির্বাচনী বৃত্তে প্রবেশ করতে যাচ্ছে বিধায় এ পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আসা কঠিন।

নিশ্চিত করে বললে, দুই প্রধানমন্ত্রী- নরেন্দ্র মোদি ও ইমরান খানের মধ্যে বৈঠকের সম্ভাবনা এবং তা থেকে ইতিবাচক কিছু প্রস্তাব বেরিয়ে আসার বিষয়টিকে আমি বাতিল করে দিচ্ছি না।

কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ‘পাকিস্তানকে চাপে’ রাখার ভারতের নীতিতে কোনো পরিবর্তন হতে দেখছি না আমি এবং একইসঙ্গে ভারতবিরোধী সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোকে ধ্বংস করতে জোর কোনো উদ্যোগ নেয়ার প্রতি মনোনিবেশ করতেও পাকিস্তানকে দেখা যাচ্ছে না।

ফলে আমরা যে দুর্বিপাকে আটকে আছি তা হল প্রায় দেড়শ’ কোটি ভারতীয় ও পাকিস্তানি মানুষ ‘আমরা’ হয়ে উঠতে পারছে না।

পারমাণবিক ক্ষেত্রে উভয়পক্ষই নিজেদের বাহিনীগুলোর আধুনিকায়নের প্রক্রিয়া চলমান রেখেছে এবং ভবিষ্যতে তা আরও বেশি হারে রাখবে। সত্যিকারার্থে, ভারতের ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা উচ্চমাত্রায় ব্যয়বহুল, কমমাত্রায় ফলদায়ক এবং ভারত-পাকিস্তান পরিস্থিতিতে এটি কার্যকর বলা যায় না।

যা হোক, পাকিস্তান নিজের সক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমে জবাব দিচ্ছে। এতে সন্দেহ নেই বললেই চলে যে, উভয়পক্ষ নৌপথ নিরাপত্তা ও যুদ্ধের দিকে মনোযোগ দেবে এবং দ্বিতীয়মাত্রার হামলার সক্ষমতা অর্জন নিশ্চিত করবে।

সাধারণভাবে বললে, এর অর্থ হচ্ছে এক পক্ষের পারমাণবিক হামলা থেকে নিজেকে রক্ষা করে পাল্টা-হামলা করার যথেষ্ট সক্ষমতা উভয়ে অর্জন করবে- যার ভিত্তি হবে যত বেশি যুদ্ধজ্ঞান লাভ করা যায়। পাকিস্তানের হাতে এমন কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে যা বাহ্যত ভারতের প্রথাগত সীমিত হামলা রোধ করতে পারে।

চূড়ান্তভাবে, আমি মনে করি না পাকিস্তানের নতুন সরকারের কারণে দেশটির ভারত বা আফগানিস্তানবিষয়ক নীতিতে খুব একটা পরিবর্তন আসবে। সদ্য সাবেক পিএমএল-এন সরকারের এ সংক্রান্ত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছিল; কিন্তু অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক অনেক কারণে তা খুব বেশি অগ্রসর হতে পারেনি। ফলে ইমরান খান যে ভালো সুবিধা করতে পারবেন, তা বলা যাচ্ছে না।

দ্বিতীয়ত, পাকিস্তান-আফগানিস্তান সম্পর্ক কি পরিবর্তিত হবে? আফগান শান্তি প্রক্রিয়ায় পাকিস্তানের ভূমিকা কী হবে? যেমনটি আমি ওপরে উল্লেখ করেছি, আমি মনে করি না ইমরান খান ও পিটিআই সরকারের আওতায় পাকিস্তানের আফগাননীতি খুব বেশি পরিবর্তিত হবে।

তবে আফগান তালেবানকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি শান্তি প্রক্রিয়া শুরু করার সাম্প্রতিক প্রচেষ্টা পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যকার সম্পর্ক উন্নত করতে পারে বলে আশা করা যায়। একটি শান্তি প্রক্রিয়া পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যকার স্বার্থাবলিতে প্রাকৃতিক সমকেন্দ্রিকতা তৈরি করতে পারে।

আমি মনে করি, নতুন একটি শুরুর ভালো সম্ভাবনা রয়েছে। এরই মধ্যে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যকার সম্পর্কোন্নয়নের কিছু উদ্যোগ নেয়া হয়েছে এবং সবকিছু ভালোভাবে এগোবে বলে মনে করা হচ্ছে।

ইমরান খানকে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে হবে পাকিস্তান আর্মির সঙ্গে, যারা আফগাননীতি পরিচালনা করছে এটা নিশ্চিত করতে যে, পাকিস্তান রাষ্ট্র যেন সঙ্গতিপূর্ণভাবে কাজ করতে পারে এবং আফগানিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে বিভিন্ন সুযোগ দিতে পারে।

বাস্তবিকপক্ষে, এক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর সঙ্গে দ্বিতীয় বাদ্যযন্ত্র হিসেবে তাকে কাজ করতে হবে। আফগানিস্তানের দিক থেকেও সম্পর্কোন্নয়নে কাজ করতে হবে এবং কোনো ধরনের রাজনৈতিক সমালোচনা ও অচলাবস্থা তৈরি ছাড়াই প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানির জন্য অনেক বেশি সহায়ক পরিস্থিতি তৈরি করতে হবে।

ভারত-পাকিস্তান এবং আফগানিস্তান-পাকিস্তানের মাঝে পার্থক্য হল ভারত-পাকিস্তানের মতো না হয়ে আফগান-পাকিস্তানের ক্ষেত্রে কিছু ইতিবাচক উন্নতি রয়েছে যা শান্তি প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে পাকিস্তানের সবসময়ের চাওয়া মতো সুযোগ করে দিচ্ছে এবং আফগান সরকারও এখন সুযোগ তৈরির জন্য কাজ করে যাচ্ছে। ফলে এখানে দুই পক্ষের মাঝে ভারত-পাকিস্তান থেকে বড় হারে একমুখী স্বার্থ রয়েছে।

তৃতীয়ত, চীন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো বিশ্বশক্তিগুলোর সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক কীভাবে পরিবর্তিত হতে পারে? প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান এখনও তার পররাষ্ট্রনীতি কী হবে তা প্রকাশ করেননি। ফলে দেশগুলোর সঙ্গে কীভাবে নিজেকে পরিচালিত করবেন তিনি, তা এখনই বলা কঠিন।

বলা হয়, অতীতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তার সম্পর্ক ইতিবাচক ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রে তাকে কট্টরপন্থী হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং আফগান তালেবানের প্রতি তার অতীতের সহানুভূতি প্রায়ই উল্লেখ করা হয়।

এর বাইরে চীনের ক্ষেত্রে ইমরান খানের দৃষ্টিভঙ্গি কী সে বিষয়ে খুব একটা তথ্য নেই এবং যেসব শর্তাধীনে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর এগোচ্ছে তা নিয়েও ইমরানের মনোভাব এখনও জানা যায়নি। এগুলো জানতে আরও অপেক্ষা করতে হবে।

তারপরও আপাতত এটা নিরাপদেই বলা যায়, ইমরান খান সেসব চ্যালেঞ্জ ও উত্তেজনার মুখোমুখি হবেন, যে কোনো পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী সাধারণত যেগুলোর মুখোমুখি হয়ে থাকেন চীন-মার্কিন সম্পর্কের ক্ষেত্রে এবং বাস্তবতা হচ্ছে এক্ষেত্রে নিজেদের প্রধান মিত্র হিসেবে পাকিস্তান দ্রুত চীনের দিকে ঝুঁকে পড়েছে।

আমার মনে হয়, যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরা পরিস্থিতি দেখেশুনে পদক্ষেপ নেবেন। তবে তাদের শুরুর পয়েন্টটি স্বচ্ছভাবেই সংশয়পূর্ণ হবে।

যা হোক, যুক্তরাষ্ট্রের মতো সম্পর্কের ক্ষেত্রে চীন একটি বিকল্প হতে পারে না- চীনাদেরও প্রথমেই এটা স্বীকার করে নিতে হবে। সামরিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র অপরিহার্য থেকে যাচ্ছে।

স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্ব দেশগুলোকে একই সময়ে ইতিবাচকভাবে বহুশক্তিকে পরিচালনা করার সুযোগ করে দিয়েছে- এখন আর স্নায়ুযুদ্ধের সময়ের মতো ‘পছন্দ কর ও বেছে নাও’ পরিস্থিতি নেই। এ কারণে আমার মতে ইসলামাবাদ ও ওয়াশিংটন- উভয়ের স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্র-পাকিস্তান সম্পর্ক উন্নত করা দরকার।

এমনকি চীন-পাকিস্তান সম্পর্ক বৃদ্ধির পরও। যদি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত না হয় তবে পাকিস্তান চীনের প্রতি অতিমাত্রায় শ্রদ্ধাশীল হয়ে পড়তে বাধ্য হবে, যা ভারসাম্যমূলক একটি সম্পর্কের জন্য ভালো নয়।

সম্প্রতি ইউএস ইন্সটিটিউট অব পিসে পাকিস্তানের নির্বাচন বিষয়ে বক্তব্য দেয়া দেশটির নতুন অর্থমন্ত্রী আসাদ ওমর যথেষ্ট বিনয়ের সঙ্গে কথা বলেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাকিস্তানের কাজ করার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সঠিক বিষয়গুলো আমি অনুভব করেছি এবং সুনির্দিষ্টভাবে স্বীকার করেছি যে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক ক্রমবর্ধমান হওয়ার পরও পাকিস্তান যদি যুক্তরাষ্ট্র-পাকিস্তান অংশীদারিত্বকে অবহেলা করে তবে তা হবে মারাত্মক ভুল।

আমার মনে হয়, পাকিস্তানের মন্তব্যকারীরা পাকিস্তান-রাশিয়া সম্পর্ক বর্ণনার ক্ষেত্রে কিছুটা বাড়াবাড়ি করেছেন। আমার অভিজ্ঞতা বলে এক্ষেত্রে মস্কো অনেক বেশি সতর্কতার সঙ্গে পদক্ষেপ নিচ্ছে। এটা সত্য যে, মস্কো-ইসলামাবাদ সম্পর্ক আসলেই উন্নতি করছে এবং এটা অংশত যুক্তরাষ্ট্র-পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া উত্তেজনা বাড়ার পরিপ্রেক্ষিতে।

বাস্তবতার নিরিখে আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে রাশিয়া-পাকিস্তান অংশীদারিত্বের সম্ভাবনা দেখছি না আমি। এটি যে কারও কাছেই বোধগম্য হবে না। বরং চূড়ান্ত পর্যায়ে আফগান সমস্যার সমাধান নিহিত রয়েছে আফগানিস্তান সরকার, যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের যৌথভাবে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিতে রাজনৈতিক মীমাংসার জন্য একটি সাধারণ ভিশন খুঁজে বের করার মধ্যে, যাতে করে অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক সব প্রভাবশালী পক্ষের উদ্বেগ লাঘব করা যায়।

ইউএস ইন্সটিটিউট অব পিস (ইউএসআইপি) থেকে ভাষান্তর : সাইফুল ইসলাম

মুঈদ ইউসুফ : ইউএসআইপির এশিয়া সেন্টারের সহযোগী ভাইস প্রেসিডেন্ট

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter