শিষ্টাচারই মানবজীবনের সৌন্দর্য

  সালাহ্ উদ্দিন নাগরী ০৭ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

শিষ্টাচারই মানবজীবনের সৌন্দর্য

আমাদের সমাজে অনেকেই শিষ্টাচার, আদব-কায়দা, ভদ্রতা নিয়ে ভাবেন, চর্চা করেন এবং ভাইবোন, সন্তান-সন্ততির মধ্যে এগুলোর প্রয়োগ ও প্রকাশ দেখতে চান।

শিষ্টাচার অনুসরণ ছাড়া কেউ পরিপূর্ণ মানুষ হতে পারে না। নিজেকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে যেন কথা বলার ধরন, চলাফেরা, আচরণ ছোটদের কাছে অনুকরণীয় হয়। ওরা যেটা জানে না, বোঝে না, সেটা ওদের জানাতে ও বোঝাতে হবে। ওদের প্রতি দায়িত্ব-কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করে তাদের সত্যিকারের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

গ্রামগঞ্জ, শহরতলি ও ছোট শহরে যেখানে মানুষের জীবন অত বেশি ব্যস্ত হয়ে যায়নি, সেসব জায়গায় প্রায়ই চোখে পড়ে- ভোরবেলা বাইরে বা বাসার সামনে দাঁড়িয়ে কেউ হয়তো দাঁত ব্রাশ করতে করতে বিভিন্নজনের সঙ্গে কুশল বিনিময় করছে, আবার কেউ কেউ বাইরে না বেরোলেও বাসার ভেতর হেঁটে হেঁটে দাঁত ব্রাশ করছে। এভাবে হেঁটে হেঁটে দাঁত ব্রাশের ফলে মুখের টুথপেস্ট ছিটকে বাইরে পড়ে, বাসাবাড়ির ওয়াল, ফার্নিচার, কাপড়-চোপড় নষ্ট হয়। যারা এটি দেখে, তাদের মধ্যে অরুচি ভাব তৈরি হয়। দাঁত ব্রাশ ওয়াশরুমেই সম্পন্ন করা উচিত, যা কেউ আমাদের বুঝিয়ে ও শিখিয়ে দিচ্ছে না।

খাওয়ার টেবিলে শব্দহীনভাবে ক্রোকারিজ-কাটলারিজ ব্যবহার করা, ডিশ-বাটি থেকে ভাত, তরিতরকারি নেয়া, মার্জিতভাবে খাওয়া, হাত ধোয়া- সবকিছুর সঙ্গে রুচিজ্ঞান ও সৌন্দর্যবোধ আষ্টেপৃষ্ঠে লেপ্টে আছে, এটা চর্চা ও অনুসরণ করা দরকার।

আমাদের মধ্যে যারা একটু শিষ্টাচার-সচেতন, তাদের অনেকেই সাধারণত খাওয়ার টেবিলে ডান হাত দিয়ে চামচ, বাটি-ডিশ ধরেন না; কিন্তু হাত এঁটো হওয়ার আগে ডান হাত ব্যবহার করতে কসুর করেন না। বেসিনে হাত ধুয়ে ভাত, তরিতরকারির চামচ ধরছেন, হাতের পুরো পানিটা ওইসব খাবারের ডিশ-বাটি, গামলায় পড়ছে, কেউ বিষয়টি লক্ষ করলে ওই খাবারে তার অরুচি আসাটা বিচিত্র নয়। আবার অনেকেই ইচ্ছামতো এঁটো হাত দিয়ে সবকিছু ধরছেন, অন্যকে খাবার তুলে দিচ্ছেন। জোরে জোরে হাপুস হাপুস করে খাচ্ছেন। ডিশ, গামলা, বাটির ওপর দিয়ে বোন প্লেটে হাড়-হাড্ডি, কাঁটা, উচ্ছিষ্টাংশ নিক্ষেপ করছেন, ডিশের ভাত-তরিতরকারির ওপর তা পড়ছে। কেউ কেউ নিজের প্লেটের খাবার পাশের জনকে তুলে দিচ্ছেন। অনেকেই কারও এঁটো খেতে পারেন না, তার জন্য এ ধরনের পরিস্থিতি দুর্বিষহ হয়ে পড়ে। তিনি না পারেন কিছু বলতে, না পারেন সইতে। খাওয়ার মধ্যে কথা বলার সময় যাদের মুখ থেকে খাবার ছিটকে অন্যের গায়ে, মুখে, প্লেটে পড়ে, তাদের কথা না বলে চুপ করে খাওয়াটাই উত্তম।

হল, হোস্টেল, ডরমিটোরিতে ডাইনিং রুমের কাউন্টারে শিক্ষার্থীদের জন্য মাছ, মাংস বা তরকারি বাটিতে বাটিতে ভাগ করা থাকে, ওখান থেকে সবাই একেকটা বাটি নিয়ে টেবিলে যায়। আমাদের অনেকেই ওই কাউন্টারে অন্যের ব্যাঘাত ঘটিয়ে দীর্ঘক্ষণ পরখ করতে থাকেন কোন বাটির মাছ, মাংস বা ডিমটি একটু বড়, পরে যেন আবার ছোট টুকরা নিয়ে আফসোস করতে না হয়। আমার ভাগে যদি ছোট টুকরাটিই পড়ে, তাহলে কি খুব লোকসান হয়ে যাবে? শিক্ষার্থী ও নবাগত চাকরিজীবীদের এ ধরনের মনোবৃত্তি দূর করার উদ্যোগ নিতে হবে।

বিয়ে, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে খাওয়ার শেষের দিকে ওয়েটাররা হাত ধোয়ার জন্য টেবিলে গামলা তুলে দেয়, আমরা মনের সুখে আয়েশ করে সাবান কচলিয়ে হাত ধুই, চারদিকে পানির ছিটা পড়ে। আপনার হাত ধোয়ার পানির ছিটা পাশের জনের প্লেটে পড়ে তার অরুচি সৃষ্টি করতে পারে। খাওয়ার টেবিলে হাত ধোয়ায় কি মর্যাদা বাড়ে?

আমরা অনেকদিন থেকে হোটেল-রেস্তোরাঁয় ব্যুফে পদ্ধতিতে বেশ অভ্যস্ত হয়ে গেছি। স্যুপ, মেইন ডিশ ও ডেজার্টসহ নানা ধরনের আইটেম টেবিলে সাজানো থাকে, যে যার প্রয়োজনমতো সেখান থেকে প্লেটে তুলে নেয়। কিন্তু এত খাবারদাবার দেখে আমরা অনেকেই নিজেকে সংযত রাখতে পারি না। ডিশ থেকে এত বেশি পরিমাণ খাবার একসঙ্গে প্লেটে নেয়া হয়, যা অনেক ক্ষেত্রে দৃষ্টিকটু লাগে। প্লেটে এমন পরিমাণ খাবার তুলতে হবে, যেন কেউ আদেখলা না ভাবে। প্রয়োজনে একাধিকবার একটু একটু করে নেয়াটাই মার্জিতবোধের পরিচায়ক। আমাদের অনেকেই এঁটো প্লেট নিয়ে বারবার খাবার আনতে যায়। এঁটো প্লেট দর্শনে সামনে-পেছনের অন্যদের অরুচি আসতে পারে। ব্যবহার করা প্লেট টেবিলে রেখে ফ্রেশ প্লেট নিয়ে খাবার সংগ্রহের কিউতে দাঁড়ানোটাই যৌক্তিক। বিষয়গুলো শিখে রাখা দরকার।

ডিশ থেকে চামচ দিয়ে অন্যকে খাবার তুলে দেয়া বা নিজে নেয়ার সময় চামচটি প্লেটের এত কাছে নেয়া হয় যে তাতে প্লেটের ভাত, সবজি, ডাল চামচের নিচে লেগে ডিশ-বাটির ভাত-তরকারিকে এঁটো করে ফেলে। চামচ থেকে আঠালো ভাত সরানোয় এঁটো হাত ব্যবহারে চামচে ঝোল, ডাল লেগে অন্যের ব্যবহারের অযোগ্য করে তোলে। এতে ওই চামচ দিয়ে অনেকের আবারও খাবার নেয়ার আগ্রহ উবে যায়।

আমাদের অনেকেই খাওয়া-দাওয়া শেষে দাঁতের ফাঁকে লেগে থাকা মাংস, আঁশালো খাদ্যের অংশ টেনে বের করে সবার সামনে দুই আঙুল দিয়ে কচলিয়ে আবার সেটা মুখে পুরে দেয়। খাওয়া-দাওয়া শেষে সবার সামনে দাঁত খিলাল করা আমাদের অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে। আর সে জন্য বিয়েসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পলিথিনে মোড়ানো পানের সঙ্গে টুথপিকও গেঁথে দেয়া হয়, দাঁত খিলালকে সহজ করে দেয়ার জন্য।

দাঁত খিলালের সময় মুখের বিকৃতি ঘটে ও মাঝে মধ্যে মুখের লালা বের হয়ে হাতে-গায়ে লেগে একাকার হয়ে যায়, এদিকে অনেকেরই ভ্রুক্ষেপ থাকে না। আমাদের মধ্যে কেউ কেউ আবার সবার সামনে দাঁত খিলাল করার সময় এক হাতে মুখটি একটু ঢেকে শিষ্টাচারের পরাকাষ্ঠা দেখানোর চেষ্টা করেন।

মনে রাখা যেতে পারে, সবার সামনে দাঁত খিলাল, সেটা হাত দিয়ে যত ঢেকেই করা হোক না কেন, শিষ্টাচারের কোনো মাপকাঠিতে পড়ে না। এটা একান্তভাবেই ওয়াশরুমে বেসিনের সামনেই অনুমোদনযোগ্য। তাই অনুষ্ঠানগুলোতে খাওয়ার টেবিলে সরবরাহের বদলে ওয়াশরুমের বেসিনের র‌্যাকে টুথপিকের বক্স রাখাটাই মানানসই।

সবার সামনে চোখ কচলানো, কান ও নাকের ময়লা বের করা, শার্টের ভেতর হাত ঢুকিয়ে শরীর চুলকানো, বসা অবস্থায় জোরে জোরে পা নাড়ানো- এগুলো শিষ্টাচারবহির্ভূত কাজ। এ ধরনের আচরণ আপনার শিক্ষা, রুচিবোধ, ভদ্রতা সম্পর্কে অন্যের কাছে ভিন্নতর সিগন্যাল দেয়।

টয়লেট, বিশেষত পাবলিক টয়লেট ব্যবহারের পর পর্যাপ্ত পানি না ঢেলে বা ফ্লাশ না করে বের হয়ে আসা আমাদের অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে। ফলে সেটি অন্যের ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। প্রায়ই মূত্র ত্যাগের পর অনেকেই ব্যবহৃত টয়লেট পেপারটি নির্দিষ্ট ঝুড়িতে না ফেলে আশপাশে ছুড়ে ফেলে, ভেজা হাতে টয়লেট থেকে বের হয়ে অন্যদের জন্য চরম অস্বস্তিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। এ ধরনের বদভ্যাসগুলো ত্যাগ করার চেষ্টা করতে হবে।

আমরা বাস, ট্রেন, লঞ্চ, স্টিমার এবং যে কোনো পাবলিক প্লেসে পাশের জনের সঙ্গে বা মোবাইলে অনেক সময় চিৎকার করে কথা বলি। মনে রাখা দরকার, আমার চিৎকারে যেন অন্যের ব্যাঘাত না ঘটে। আস্তে আস্তে সুন্দরভাবে কথা বলাটা একটা আর্ট, এটা রপ্ত করতে হবে। কোনো অনুষ্ঠানে তিনজনের উপস্থিতিতে দু’জনের ফিসফিসিয়ে বা আড়ালে কথা বলা শিষ্টাচারপরিপন্থী। এ ধরনের পরিস্থিতিতে তৃতীয়জন নিজেকে অপাঙক্তেয় ভাবতে পারে, যা কখনোই কাম্য হতে পারে না।

বয়স, পদবি, আত্মীয়তার সম্পর্কে একজন বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি কোনো কনিষ্ঠজনের সঙ্গে যে আচরণ করতে পারে, কনিষ্ঠজন কখনোই তার সঙ্গে সমআচরণ করতে পারে না। জ্যেষ্ঠজন কনিষ্ঠ কারও ঘাড়ে হাত রেখে কথা বলতেই পারে, তাই বলে কনিষ্ঠজন একই কায়দায় তার প্রত্যুত্তর দিতে পারে না। একইভাবে অনেক সময় বয়োকনিষ্ঠ কেউ হ্যান্ডশেক করার জন্য বয়োজ্যেষ্ঠের দিকে হাত বাড়িয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করে। মনে রাখতে হবে, তিনি অন্যদের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করবেন কিনা, এটা তার অভিরুচি। তাই এ বিষয়গুলো ভালোভাবে জেনে ও বুঝে সেভাবে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া করার চেষ্টা করতে হবে।

মোবাইল নেটওয়ার্কে এ যুগে ফিক্সড ফোনের ব্যবহার প্রতিনিয়ত সীমিত হয়ে আসছে, তারপরও বিভিন্ন দফতরে বিশেষত সরকারি অফিসে ফিক্সড ফোনের ব্যবহার লক্ষণীয়। আমরা অফিসিয়াল ক্যাপাসিটি বা দাফতরিক প্রয়োজনে প্রচলিত প্রটোকল যথাযথভাবে পালন করে অন্যের সঙ্গে কথা বলে থাকি; কিন্তু অফিসিয়াল ক্যাপাসিটির বাইরে বয়োজ্যেষ্ঠ কারও সঙ্গে অফিস ফোনে কথা বলার সময় কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিষ্টাচার লঙ্ঘিত হয়। যেমন কোনো কর্মকর্তা হয়তো পিও/সিএ-কে বললেন- অমুককে ফোনে মিলাও, তখন পিও/সিএ রিং করে সেই ব্যক্তিকে আগে লাইনে নিয়ে পরে বসকে লাইন থ্রো করল। এ ধরনের পরিস্থিতিতে পিও/সিএ-কে আগে বলে রাখা যেতে পারে রিং পড়লেই আগে বসকে লাইনে নিয়ে পরে বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তিকে লাইন থ্রো করতে হবে, তাতে বয়োজ্যেষ্ঠকে রিসিভার ধরে অপেক্ষা করে বিরক্ত হতে হবে না।

কয়েকদিন আগে সন্ধ্যার পর শ্যামলী সিনেমা হলের মোড়ে রিকশার জন্য অপেক্ষা করছি। এমন সময় ২০-২২ বছরের সুন্দর চেহারার কেতাদুরস্ত এক ছেলে তার বাবার বয়সী এক রিকশাওয়ালাকে বলল- এই যাবি? প্রচণ্ডভাবে কানে লাগল ওই ছেলের সম্বোধনটুকু। আমরা আমাদের সন্তানকে কী শেখাচ্ছি? নিজেদের শিক্ষিত, ভদ্র, মার্জিত বলে দাবি করি, অথচ নিুআয়ের খেটে খাওয়া মানুষদের সম্মানের সঙ্গে অ্যাড্রেস করতে শিখিনি। তথাকথিত ‘ম্যানার-এটিকেট’বহির্ভূত ওই অশিক্ষিত লোকেরা কিন্তু আমাদের যথাযথ মর্যাদা দিয়েই কথা বলে। আমরা ‘শিক্ষিত’রা এসব কবে শিখব?

পৃথিবীতে যে জাতি যত বড়, ভদ্রতা ও সৌজন্যবোধেও তারা তত এগিয়ে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠ্যসূচিতে শিষ্টাচার, ভদ্রতা, কথা বলার ধরন, টেবিল ম্যানার ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত করা দরকার। মানুষের মধ্যে এসবের ঘাটতি থাকলে অনেক ভালো গুণও ম্লান হয়ে যায়। এ বিষয়গুলো ছোটবেলায় যদি বাচ্চাদের মনে গেঁথে দেয়া যায়, তারা সারা জীবন তা মনে রাখবে এবং ওইভাবে চলার চেষ্টা করবে। মানুষের জীবনে ভদ্রতা, শিষ্টাচারের গুরুত্ব অপরিসীম। সুসভ্য জাতি হিসেবে বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর জন্য এ বিষয়গুলো রপ্ত না করে উপায় নেই।

সালাহ্উদ্দিন নাগরী : সরকারি চাকরিজীবী

[email protected]

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter