রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রয়োজন প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা

  আহমেদ সুমন ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রাজনীতি
ফাইল ছবি

বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা এবং বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া পরস্পর তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বী। ভিনদেশি মিডিয়াগুলো উভয়ের পরিচয় দিয়েছে ‘ব্যাটলিং বেগমস’।

দি ইকোনমিস্টের এক সংখ্যায় দুই নেত্রীর কর্মকাণ্ডকে ‘জিরো-সাম’ অর্থাৎ ফলশূন্য রাজনীতি বলে মন্তব্য করা হয়েছে। একইসঙ্গে বাংলাদেশের রাজনীতিকে বিশ্বখ্যাত ইতালিয়ান কার্টুন ‘পাঞ্চ অ্যান্ড জেডি’র সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।

১২ বছর ধরে ক্ষমতার বাইরে বিএনপির অধিকাংশ নেতাকর্মী সরকারি দলের নেতাকর্মীদের দ্বারা হামলা-মামলায় জর্জরিত হয়ে রাজপথ থেকে বিতাড়িত। দলীয় অফিসে সংবাদ সম্মেলন করে বক্তব্য-বিবৃতি দেয়ার মধ্যে এ দলের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সীমিত।

বলা প্রয়োজন, বিএনপি দলীয় অফিসে তাদের কার্যক্রমের চৌহদ্দি নির্দিষ্টকরণ স্বউদ্যোগে করেনি। রাজপথে সুযোগ না পেয়ে বলা যায় টিকতে না পেরে তারা ঘরে ঢুকতে বাধ্য হয়েছে। নিজেদের এ সংকুচিত অবস্থা সত্ত্বেও গত ১ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিনে নয়াপল্টনের অফিসের সামনে বিএনপি সমাবেশের আয়োজন করতে সক্ষম হয়েছে।

এজন্য বিএনপি সাধুবাদ পেতে পারে। দীর্ঘদিন পর বিএনপি তাদের রাজনীতিকে রাজপথে ফিরিয়ে এনেছে। সমাবেশে লোকজনের উপস্থিতিও ছিল উল্লেখযোগ্য। অপরদিকে, আসন্ন নির্বাচন বিবেচনায় নিয়ে হলেও সরকার সভা-সমাবেশের মতো গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অধিকারে বাধা সৃষ্টি করেনি, অনুমতি দিয়েছে। এজন্য সরকারও ধন্যবাদ পেতে পারে।

বিএনপি আগামী নির্বাচন নিয়েও কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। দলটি যে নিরপেক্ষ নির্বাচনকালীন সরকারের দাবিতে বিগত নির্বাচন বর্জন করেছিল- এখনও সেই দাবি পূরণে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। অক্টোবরে গঠিত হবে নির্বাচনকালীন সরকার। বিএনপি সংসদের বাইরে।

নির্বাচনকালীন সরকার কীভাবে গঠিত হবে, সে বিষয়ে দলটির যেসব প্রস্তাব বিভিন্ন সময়ে উত্থাপন করা হয়েছে, তা গ্রহণে সরকারের বিন্দুমাত্র আগ্রহ লক্ষ করা যায় না। এ পরিস্থিতিতে সরকারকে চ্যালেঞ্জ জানানোর জন্য বিএনপির ঘুরে দাঁড়ানো প্রয়োজন।

কিন্তু দলটির সাংগঠনিক অবস্থা সেই পর্যায়ে নেই। বিএনপির হিতাকাক্সক্ষীরা ধারণা করেন, খালেদা জিয়া যদি জেল থেকে মুক্ত হয়ে জনগণের কাছে যেতে পারেন তাহলে যত প্রতিকূল পরিস্থিতি আছে, তা সরে যাবে। বিএনপি নিজেকে সুসংহত করতে পারবে।

তবে এমন ধারণায় যে বাস্তব ফল মিলবে, তা নিশ্চিত করে কে বলতে পারে? খালেদা জিয়া ৬ মাস ধরে কারাগারে থাকার আগে বাইরেই ছিলেন। তখন কিন্তু বিএনপির পক্ষে জনআন্দোলন গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি।

সরকারের নানা ধরনের কৌশলের কাছে অব্যাহতভাবে কুলাতে না পারলেও বিএনপি এখনও বড় দল। যুক্তফ্রন্ট, গণফোরাম নিয়ে সরকার কথা বলতে শুরু করলেও এখনও আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপি।

আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিপক্ষের মর্যাদা বিএনপি এখনও অক্ষুণ্ণ রাখতে পেরেছে এটা যেমন সত্য, তেমনি একথাও অসত্য নয়, জিয়া পরিবারের বাইরে নেতৃত্ব দেয়ার মতো আস্থাশীল ও বিশ্বস্ত ব্যক্তি এ দলে নেই। এমন অভিমতের যৌক্তিকতা নিরূপণে তথ্য-উপাত্ত বের করতে ব্যাপক অনুসন্ধানের প্রয়োজন নেই।

লক্ষ করুন, দলের চেয়ারপারসন কারাগারে। সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান থাকেন বিদেশে। এতদসত্ত্বেও তাকেই দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। সাধারণ ধারণা হল, জিয়া পরিবারের বাইরে অন্য কোনো ব্যক্তিকে এ দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেয়া হলে সরকারের নানা ধরনের কৌশল ও চাপে দলে ভাঙন দেখা দেবে কিনা, সেই আশঙ্কা থেকে জিয়া পরিবার দলের নেতৃত্ব ছাড়েনি।

বিগত ওয়ান-ইলেভেনে গঠিত ড. ফখরুদ্দিনের নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় বিএনপি যে তিক্ত অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, সেই অভিজ্ঞতার আলোকে হয়তো দলীয় চেয়ারপারসন এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

সরকারি দল আওয়ামী লীগ এখন নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে। আওয়ামী লীগ পরিবর্তিত সংবিধান অনুযায়ী বর্তমান সরকারের অধীনে অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে নির্বাচন করতে তাদের দৃঢ় ইচ্ছার কথা ব্যক্ত করছে। অপরদিকে, বিএনপি নির্দলীয়, নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আসছে।

বিএনপির নেতারা বলছেন, আন্দোলনের লক্ষ্য তারা নির্ধারণ করেছেন। পরিকল্পনা করে কর্মসূচি দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। কর্মসূচি বাস্তবায়নে বিএনপির সক্ষমতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন আছে। আওয়ামী লীগের মতো আন্দোলন গড়ে তুলতে বিএনপি পারে না- এমন কথা প্রচলিত আছে।

তুমুল আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য প্রাণ উজাড় করে দিতে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা পিছপা হন না। বিএনপিতে এমন ত্যাগী নেতাকর্মীর সংখ্যা কম। বিএনপি বিগত দশ বছরে সরকারকে অনেক আলটিমেটাম দিয়েছে। সরকার দৃশ্যত তাদের কোনো কথাকে পাত্তা দেয়নি।

উল্টো আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বিরোধী দল হিসেবে সরকারের বিরুদ্ধে যে কোনো ধরনের আন্দোলন গড়ে তোলার ব্যর্থতার দায় নিয়ে বিএনপির সব শীর্ষ নেতাকে একযোগে পদত্যাগ করতে বলার মধ্য দিয়ে এক ধরনের উপহাস করেছেন।

আওয়ামী লীগ প্রায় ১০ বছর ধরে ক্ষমতায়। সরকার পরিচালনায় তাদের অর্জন উল্লেখ করার মতো। আবার ব্যর্থতাও আছে। স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী প্রাচীন দল হিসেবে আওয়ামী লীগের জনভিত্তি ব্যাপক। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলে যেমন সুবিধা আছে, তেমনি আছে অসুবিধাও।

ক্ষমতার স্বাদ ভোগরত অনেক নেতাকর্মী গা ভাসিয়ে চলেন। একটা পর্যায়ে নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হন। বিচ্ছিন্নভাবে দেশের বিভিন্ন জায়গায় আওয়ামী লীগের সঙ্গে আওয়ামী লীগ, যুবলীগের সঙ্গে যুবলীগ, ছাত্রলীগের সঙ্গে ছাত্রলীগের দ্বন্দ্ব ও মারামারির খবর প্রায়ই গণমাধ্যমে লক্ষ করি।

তাদের কীর্তিকলাপে অনেক সাধারণ মানুষ হতাশ হন, মুখ ফিরিয়ে নেন। আওয়ামী লীগবিরোধী এ মনোভাব বিএনপির বড় পুঁজি হতে পারে। নিজ দলের ভোটের প্রাচুর্য খুব বেশি না হলেও প্রতিপক্ষবিরোধী মনোভাবের ভোটে নির্বাচনে জিতে সরকার গঠন করা যায়, ২০০১ সালে বিএনপি তা দেখিয়েছে। এখন বিএনপি হয়তো সেই ভরসায় দিন গুনছে।

দশম সংসদ নির্বাচনের আগে সরকারি দল আওয়ামী লীগ বিএনপির জন্য একাধিক মন্ত্রিত্বের ছাড় দিতে চাইলেও বিএনপি তাতে রাজি হয়নি। এ ফাঁকে সুবিধা হয়েছিল আওয়ামী লীগের। তারা এ সুযোগে সংবিধানের বাধ্যবাধকতার দোহাই দিয়ে একতরফাভাবে দশম সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন করে ফেলে।

এরপর বিএনপি আর আওয়ামী লীগের নাগাল পায়নি। এখন পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন। সংলাপের জন্য বিএনপি এখন দেশ-বিদেশে নালিশ জানাচ্ছে। আওয়ামী লীগ তাতেও পাত্তা দিচ্ছে না। পাত্তা দেয়ার মতো অবস্থায় বিএনপি নেই। আওয়ামী লীগ এখন বিএনপিকে কোণঠাসা করে একতরফাভাবে খেলে যাচ্ছে।

নেপালে অনুষ্ঠিত বিমসটেক সম্মেলন থেকে ফিরে প্রধানমন্ত্রী আবার সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, বিএনপির সঙ্গে কোনো আলোচনা নয়। প্রধানমন্ত্রীর এমন মনোভাবের বিপরীতে বিএনপিকে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে। নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে সংলাপ-সমঝোতার সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।

সব সম্ভাবনা যখন শেষ হয়ে যায়, তখন আসে বলপ্রয়োগের বিষয়। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই পক্ষই রাজনীতির মাঠ দখলে মরিয়া হয়ে যার যার সৈন্যসামন্ত নিয়ে মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে। চল্লিশতম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে জনসমাগম বিএনপির প্রস্তুতিতে প্রেরণা জোগাচ্ছে। দুই দলের এ খেলায় বাড়তি যুক্ত হয়েছেন যুক্তফ্রন্ট ও গণফোরামের নেতারা।

বর্তমান সরকারের শুরুর দিকে উপজেলা নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে। এর আগে দশম সংসদ নির্বাচন বর্জন ও প্রতিহতের ঘোষণা দিয়ে বিএনপির লাগাতার হরতাল ও অবরোধকেন্দ্রিক জ্বালাও-পোড়াওয়ের রাজনৈতিক কর্মসূচি জনমনে আতঙ্ক তৈরি করেছিল।

দেশ-বিদেশে এসব কর্মসূচির সমালোচনা আমলে নিয়ে বিএনপি ওইসব কর্মসূচি থেকে সরে উপজেলা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। নিরাপদ জনজীবন, দেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতার স্বার্থে বড় রাজনৈতিক পক্ষগুলোর মধ্যে ন্যূনতম ঐকমত্য থাকা প্রয়োজন।

বিএনপির সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা করা হবে না, প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে একথা জানানোর পর নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা নিয়ে বিএনপি রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছে। সাধারণ মানুষ সরকারি দল হিসেবে আওয়ামী লীগের কাছে সহনশীল ও উদার আচরণ প্রত্যাশা করে।

বিএনপিকে শিক্ষা দিতে গিয়ে দেশে যাতে নির্বাচন ঘিরে ফের অশান্তি ও অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয়, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব আওয়ামী লীগেরই। সুতরাং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সবকিছু নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করতে হবে।

আহমেদ সুমন : গবেষক ও বিশ্লেষক

[email protected]

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter