বিজেপির আস্ফালন প্রসঙ্গে

  বদরুদ্দীন উমর ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বিজেপির সভাপতি অমিত শাহ
ছবি: সংগৃহীত

দিল্লিতে ৮ ও ৯ সেপ্টেম্বর ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) কর্মসমিতির এক সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। দুই দিনের এই সভার দ্বিতীয় দিন বিজেপির সভাপতি অমিত শাহ বলেছেন, ‘আগামী ৫০ বছরেও আমাদের ক্ষমতা থেকে সরাতে পারবে না কেউ।’

প্রকৃতপক্ষে এর সম্ভাবনা না থাকলেও আগামী নির্বাচনে তাদের জয়লাভ ও ক্ষমতায় ফিরে আসার সম্ভাবনা নাকচ করা যায় না, যদিও নিশ্চিতভাবে এটাও বলা যায় না যে, ক্ষমতায় তারা ফিরবেই। তবে বিজেপি আগামী ৫০ বছর ক্ষমতায় থাকুক অথবা আগামী নির্বাচনে ফিরে আসুক, এই সম্ভাবনার কথা শুধু ভারতীয় জনগণ নয়, ভারতের পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর জনগণের জন্যও এক আতঙ্কের ব্যাপার।

বাবরি মসজিদের নিচে রামের জন্মস্থানে রাম মন্দির ছিল, সম্রাট বাবর সেই মন্দির ভেঙে তার ওপর ওই মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন- এই সম্পূর্ণ অনৈতিহাসিক ও মিথ্যা আওয়াজ তুলে বাবরি মসজিদ ধ্বংস করা হয়েছিল। এ কাজ যে শুধু বিজেপি এবং উত্তর প্রদেশে তাদের মুখ্যমন্ত্রী কল্যাণ সিং মিত্র করেছিলেন তা নয়। বাবরি মসজিদ ভাঙায় তৎকালীন কংগ্রেস প্রধানমন্ত্রী নরসিমা রাওয়ের বড়রকম সহযোগিতাও ছিল।

তিনি ইচ্ছা করলেই কেন্দ্রীয় সশস্ত্র বাহিনী বাবরি মসজিদের চারদিকে মোতায়েন করে এই ধ্বংসকাণ্ড রোধ করতে পারতেন। কিন্তু তিনি সেটা না করে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের দিন বিরাট ‘ধার্মিক’ ব্যক্তি হিসেবে তার বাড়িতে সারা দিন পুজোর ঘরে কাটিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন তাকে কেউ যেন বিরক্ত না করে! বিরক্ত না করার বিষয়টি শেষ হয় বাবরি মসজিদ ধ্বংস হওয়ার পর। তারপর তিনি পুজোর ঘর থেকে বের হন।

শুধু বিজেপিই নয়, এই হল ভারতে কংগ্রেসেরও প্রকৃত চরিত্র। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, ভারতে বিজেপি আকাশ থেকে পড়েনি। কংগ্রেসের সাম্প্রদায়িক নীতির ধারাবাহিকতা রক্ষা করেই বিজেপি শক্তি সঞ্চয় করে সাম্প্রদায়িকতাকে অনেক উচ্চপর্যায়ে এনে দাঁড় করিয়েছে।

কাজেই সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ক্ষেত্রে কংগ্রেসের উত্তরসূরি হিসেবেই বিজেপির আবির্ভাব এবং ক্ষমতা দখল। এই সাম্প্রদায়িকতা মুসলমান, খ্রিস্টান, দলিত জনগণ এবং সাধারণভাবে ভারতীয় জনগণের জীবনে এক অভিশাপের মতো উপস্থিত হয়েছে।

ধ্বংস হওয়া বাবরি মসজিদের জায়গায় রামমন্দির করার দাবি বিজেপি প্রথম থেকেই করে আসছে। এর কোনো আইনগত ভিত্তি নেই। কিন্তু তা সত্ত্বেও বিজেপির এই সভায় এ বিষয়ে মারাত্মক কথাবার্তা বলা হয়েছে। তাদের উত্তর প্রদেশ সরকারের সমবায় মন্ত্রী ও বিজেপি নেতা মুকুট বিহারী বর্মন বলেন, ‘রামমন্দির হবেই।

কারণ সুপ্রিমকোর্ট আমাদের’ (যুগান্তর, ১০.০৯.২০১৮)। এই সদম্ভ উক্তি রীতিমতো বিপজ্জনক। কারণ রামমন্দির নির্মাণ সম্পর্কিত বিষয়টি এখনও বিচারাধীন। এ জন্য এই উক্তি আদালত অবমাননার দৃষ্টান্ত। কিন্তু এখন পর্যন্ত এ নিয়ে কিছুই করেননি ভারতের শীর্ষ আদালত সুপ্রিমকোর্ট।

দ্বিতীয়ত, দেশের শীর্ষ আদালতকে নিজেদের দলীয় ব্যাপার বলে দাবি করাও আইনত এক শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কিন্তু এসব বলার জন্য এদের কোনো শাস্তি হবে, অন্তত সুপ্রিমকোর্ট এদেরকে জবাবদিহির জন্য তলব করবে, তার কোনো সম্ভাবনাও এখন দেখা যাচ্ছে না।

বিহারের উপরোক্ত মন্ত্রী ৮ সেপ্টেম্বর উত্তর প্রদেশের এক জনসভায় বলেন, ‘অক্টোবরে রামমন্দির নির্মাণ করা আমাদের শপথ। সুপ্রিমকোর্ট আমাদের। আইন ব্যবস্থা, এ দেশ এবং রামমন্দিরও আমাদের।’ এর থেকে মারাত্মক ফ্যাসিস্ট বক্তব্য ও অঙ্গীকার আর কী হতে পারে? (যুগান্তর, ১০.০৯.২০১৮)।

বিজেপির উপরোক্ত কর্মসমিতির সভার বিষয়ে ফিরে এসে দেখা যাচ্ছে যে, তারা এখন পশ্চিমবঙ্গে দ্রুত প্রভাব বৃদ্ধি ও ক্ষমতা দখলের জন্য মরিয়া হয়েছে। তারা ইতিমধ্যে দাবি করেছে, পশ্চিমবঙ্গে তারা দ্বিতীয় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে এবং বিগত লোকসভা নির্বাচনে তারা সেখানে দুটি আসন পেলেও আশা করছে আগামী নির্বাচনে তারা পাবে ২২টি আসন। সভার প্রথম দিনই তারা পশ্চিমবঙ্গে তাদের কৌশল নিয়ে একটি স্বতন্ত্র বৈঠক করে।

বিজেপি যে পশ্চিমবঙ্গে আগের থেকে বেশি শক্তি সঞ্চয় করেছে এটা ঠিক। তারা দাবি করে এখন তারা পশ্চিমবঙ্গে দ্বিতীয় শক্তি। এর কারণ, তিন দশকেরও বেশি ক্ষমতায় থাকা সিপিএম এখন পশ্চিমবঙ্গে এক অথর্ব রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়েছে। মমতা ব্যানার্জির নানা গণবিরোধী ও ফ্যাসিস্ট অপকর্মের বিরুদ্ধে তারা কথা বললেও তার বিরুদ্ধে কোনো কর্মসূচি তাদের নেই। জনগণের হাজারো সমস্যা।

সেগুলো নিয়ে মাঠে নামার কোনো কর্মসূচি তাদের দেখা যাচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে তাদের অবস্থান মামুলি এক সংসদীয় দলের মতো। বিজেপি সিপিএমের এ অবস্থার সুযোগ নিয়ে চলেছে। তারা এ সুযোগ নিয়ে জনগণের কোনো কাজ করছে না, কিন্তু মমতা ব্যানার্জির বিরুদ্ধে যে ক্ষোভ ও প্রতিরোধের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে সেটা ব্যবহার করে তারা সাম্প্রদায়িক প্রচারণার মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি বিষাক্ত করছে।

কেন্দ্রে নরেন্দ্র মোদি ও বিজেপি সভাপতি অমিত শাহসহ সব নেতাই তাদের ‘উন্নয়ন’ কর্মসূচির ‘সাফল্যের’ কথা বলে ঢেঁড়ি পেটাচ্ছেন। এই উন্নয়নের কথাবার্তা এখন শাসক শ্রেণীর সব দলেরই এক মহা ধাপ্পাবাজি। তাদের এই ‘উন্নয়ন’ যতই হচ্ছে ততই বেকারত্ব বাড়ছে, জনগণের দুর্দশা বাড়ছে, শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংসপ্রাপ্ত হচ্ছে অথবা ধ্বংসের শর্ত তৈরি করছে। মোটকথা, এই উন্নয়নের থেকে লুণ্ঠনজীবী শ্রেণীই উপকৃত হচ্ছে, তারা ফুলেফেঁপে উঠছে এবং জনগণকে শোষণ-নির্যাতনের জাঁতাকলে পিষে মারছে।

ভারতের অর্থনীতির দিকে তাকালে এ বিষয়টি স্পষ্ট হবে। সেখানে ‘উন্নয়নের’ দিক দিয়ে ইতিবাচক কর্মকাণ্ড হচ্ছে, উন্নয়নের নামে জনগণের জন্য অনেক কর্মসূচি গৃহীত হয়েছে, কিন্তু কর্মক্ষেত্রে তার কোনো সুফল জনগণ পাচ্ছে না। বিশেষত তাদের ‘উন্নয়ন’ কর্মসূচি দেশের সংখ্যালঘু জনগণ- মুসলমান, খ্রিস্টান, দলিতদের নীতিগতভাবে এর বাইরে রেখে তাদের অবস্থা আরও দুর্দশাগ্রস্ত করা হচ্ছে।

কর্মসমিতির উপরোক্ত সভায় বিজেপির সভাপতি অমিত শাহ পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির পতাকা ওড়ানোর ‘পণ’ করতে সবাইকে আহ্বান জানান। মমতা ব্যানার্জির বিজেপিবিরোধী জোট গঠনের উদ্যোগকে কটাক্ষ করে তিনি বলেন, ‘মমতা ফ্রন্ট করছেন। উত্তর প্রদেশ, তেলেঙ্গানা বা গুজরাটে কি আদৌ প্রভাব ফেলতে পারবেন? ২০১৪ সালে এ প্রতিটি দলের বিরুদ্ধে আমরা সরাসরি লড়েছি ও তাদের হারিয়েছি। ২০১৯ সালে আরও বেশি সংখ্যা নিয়ে আসব।

আগামী ৫০ বছরের মধ্যেও বিজেপিকে ক্ষমতা থেকে টলাতে পারবে না কেউ’ (যুগান্তর, ১০.০৯.২০১৮)। প্রকৃতপক্ষে এই দম্ভোক্তি ভিত্তিহীন। ২০১৪ সাল এবং ২০১৯ সাল এক নয়। এর মধ্যে পরিস্থিতির অনেক পরিবর্তন হয়েছে। মমতা ব্যানার্জির উদ্যোগে গঠিত জোটের অবস্থা যাই হোক, তার প্রভাব বাইরে পড়ুক অথবা না-ই পড়ুক, বিজেপির অবস্থা যে আগের মতো আর নেই, এর প্রমাণ তো সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোর মধ্যেই পাওয়া গেছে। উত্তর প্রদেশে সাম্প্রতিক কোনো নির্বাচনেই বিজেপির প্রার্থী জয়ী হতে পারেনি।

অন্যান্য রাজ্যেও তাদের প্রার্থীদের অধিকাংশেরই পরাজয় হয়েছে। গুজরাট রাজ্যের বিগত নির্বাচনে তাদের অবস্থার অবনতিই দেখা গেছে। কর্নাটকে তারা বিরোধী জোটের ঐক্যের কারণে সরকার গঠনে ব্যর্থ হয়েছে তাদের সবরকম চেষ্টা সত্ত্বেও। এসব এখানে উল্লেখযোগ্য।

কাজেই বিজেপি সভাপতি তার হৃষ্টপুষ্ট শরীর নিয়ে চিরস্থায়ীভাবে বিজেপির ক্ষমতায় থাকার যে স্বপ্ন দেখছেন তাকে এক অলীক কল্পনাও বলা যায় না। কারণ এটা হল আসলে এক ধাপ্পাবাজি। পরিস্থিতি সম্পর্কে নিজেদের কর্মী মহলে এবং সাধারণভাবে জনগণের মধ্যে মিথ্যা ধারণা সৃষ্টি ছাড়া এর অন্য কোনো উদ্দেশ্য নেই।

বিজেপির এই সভায় কেন্দ্রীয় মানবসম্পদমন্ত্রী প্রকাশ জাভাডেকর বলেন, ‘বিরোধী জোট নিয়ে ভাবার কোনো দরকারই নেই। তাদের কোনো নেতা, নীতি ও রণনীতি নেই। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির রয়েছে ভিশন, প্যাশন ও ইমাজিনেশন (দূরদৃষ্টি, আবেগ, ভাবনা)। তাই মোদি সরকারের আরও একটা পূর্ণ মেয়াদ ক্ষমতায় থাকার ব্যাপারটা নিশ্চিত।

চার বছর ক্ষমতায় থাকার পরও প্রধানমন্ত্রী মোদির জনপ্রিয়তার হার ৭০ শতাংশেই রয়েছে’ (যুগান্তর, ১০.০৯.১৮)। এখানে এই মন্ত্রী অমিত শাহের মতো ৫০ বছরের কথা না বলে বলেছেন ‘আরও একটা পূর্ণ মেয়াদ’-এর কথা। এই জয়ের ব্যাপারে তার আশাবাদের অন্যতম কারণ জরিপে নরেন্দ্র মোদির জনপ্রিয়তার হার ৭০ শতাংশ হওয়া। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায় এসব জরিপ হল ভুয়া ব্যাপার।

বিভিন্ন দেশি-বিদেশি জরিপ সংস্থাকে প্রচুর পরিমাণ টাকা খাইয়ে এসব জরিপ রিপোর্ট বের করা হয়। এভাবে জরিপ রিপোর্ট যতই প্রকাশ করা হোক, বাস্তব অবস্থাই হল আসল ব্যাপার। সেদিক দিয়ে হিসাব করলে নরেন্দ্র মোদির এই তথাকথিত জনপ্রিয়তার প্রভাব আগামী নির্বাচনের ওপর পড়বে বলে মনে হয় না। জনগণের ভোটই এ ক্ষেত্রে পালন করবে নির্ধারক ভূমিকা।

১০.০৯.২০১৮

বদরুদ্দীন উমর : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter