তেলে-জলে কীভাবে মিশ খাবে?

প্রকাশ : ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  আশাফা সেলিম

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে একটি মহল দেশে রাজনৈতিক সংকটের আশঙ্কা করছেন। আর এই ‘সংকট’ নিরসনে তারা সংলাপের পরামর্শ দিচ্ছেন। ভাবছেন, সংলাপেই সমাধান। হ্যাঁ, সাধারণত সংলাপের ভূমিকা সেরকমই হওয়ার কথা। ফলপ্রসূ সংলাপের মাধ্যমে অনেক সমস্যারই সমাধান সম্ভব।

কিন্তু সব সংকটের সমাধান কি সংলাপের মাধ্যমে সম্ভব? সেটা হলে তো সমাজে কোনো সংকটই থাকত না। আলোচ্য সংলাপের মূল উদ্দেশ্য- আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে ‘রাজনৈতিক সংকট’ সমাধানে দেশের প্রধান দুটি দলকে সমঝোতায় পৌঁছানো। কিন্তু, ‘তেল-জল মিশ্রণ সূত্র’ বলে- এ দুটি তরল পদার্থকে মেশালে ফল ভালো হয় না।

কারণ, বস্তু দুটির মধ্যে পরস্পর মিশ্রণ উপযোগিতার চেয়ে বিপরীতধর্মী বৈশিষ্ট্যই বেশি। তাই, অযৌক্তিকভাবে এদের জোর করে মেশানো উচিত নয়। তাই হয়তো বলা হয় ‘তেল-জল কখনও মেশে না’।

আওয়ামী লীগ আর বিএনপি বিপরীতধর্মী দুটি রাজনৈতিক দল। এ দুটি দলের সৃষ্টির ইতিহাসও ভিন্ন। আওয়ামী লীগ গড়ে উঠেছে মাতৃভাষা বাংলা, বাঙালির অধিকার প্রতিষ্ঠা আর বাংলাদেশ সৃষ্টির আন্দোলনে নেতৃত্বদানের মধ্য দিয়ে। বিএনপির সৃষ্টি উর্দি পরা এক সেনানায়কের রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের ফসল হিসেবে; তথাকথিত ‘বহুদলীয় গণতন্ত্র’র নামে, বাংলাদেশের মূল ধারণাকেই একটি নড়বড়ে ও বিতর্কিত অবস্থানে দাঁড় করিয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে।

তারা জাতির পিতাকে ‘মরহুম শেখ মুজিব’, আর তাদের প্রয়াত নেতাকে ‘শহীদ’ সম্বোধন করে! এই দল দুটির চিন্তা-চেতনা আদর্শ এবং দৃষ্টিভঙ্গিও বিপরীতধর্মী; অবস্থান পরস্পরবিরোধী, বিদ্বেষপূর্ণ, দ্বান্দ্বিক ও সাংঘর্ষিক! তাই এদেরকে মুখোমুখি বসানো এবং ভালো ফল প্রত্যাশা না করাই ভালো।

দল দুটির সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলো প্রায় একইরকম। যেমন, দুটি দলই : ১. ডানপন্থী; ২. ক্ষমতায় গেলে সহজে ছাড়তে চায় না (যদিও অন্য কোনো দল ক্ষমতায় গেলেও হয়তো একই চরিত্র ধারণ করবে। এমনকি আর্মি ব্যাকড সরকারের বেলায়ও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি।);

৩. বিরোধী দলে গেলে ক্ষমতায় থাকাকালীন কৃত নিজেদের কর্মকাণ্ডগুলো (কখনও কখনও অপকর্ম) ভুলে যায় অথবা অস্বীকার করে; ৪. ক্ষমতামুখী, বুর্জোয়া ‘গণতান্ত্রিক’(?) দল; ৫. দলীয় প্রধানই দলে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী; ৬. পরিবারতন্ত্র বা উত্তরাধিকারতন্ত্রের ধারাকে (প্রত্যক্ষ/পরোক্ষভাবে) সযত্নে লালন করে; ৭. আমলাতোষণ নীতি অনুসরণ করে; ৮. বাহিনীনির্ভর হতে ভালোবাসে; ৯. বাম ঘরানার দলগুলোকে তাচ্ছিল্যের চোখে দেখে।

উল্লিখিত সাধারণ সাদৃশ্যপূর্ণ বৈশিষ্ট্যগুলোর বিপরীতে, দল দুটির মধ্যে বিপরীতধর্মী বৈশিষ্ট্যই বেশি। এবং সেগুলোই দুটি দলের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য সৃষ্টিকারী প্রধান বৈশিষ্ট্য। যেসব ইস্যুকে ঘিরে এই বিপরীতমুখী অবস্থান, সেগুলোর বেশিরভাগই অনাপসযোগ্য। যেমন : ১. নিন্দুকেরা বলেন- এ দুটি দলের একটি হল ‘ভারতপন্থী’, অপরটি ‘পাকিস্তানপন্থী’। ২. একটি অসাম্প্রদায়িক, অপরটি সাম্প্রদায়িক।

৩. একটি বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী, অপরটি বাংলাদেশি। ৪. একটির স্লোগান ‘জয় বাংলা’, অপরটির ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’। ৫. বিএনপি মুক্তিযুদ্ধবিরোধী-যুদ্ধাপরাধীদের পুনর্বাসন করে, ক্ষমতায় বসিয়ে, তাদের গাড়িতে জাতীয় পতাকা তুলে দিয়েছে। আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধবিরোধী-যুদ্ধাপরাধীদের আইনের আওতায় এনে বিচার করে শাস্তি কার্যকর করেছে।

৬. বিএনপি ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বানিয়ে বাংলাদেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সপরিবার হত্যাকাণ্ডের বিচার রহিত করেছে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত করেছে এবং ঘোষণা দিয়েছে- বিএনপি চাইলে, বিএনপির ‘শহীদ’ নেতা হত্যার বিচারও করবে। ৭. আওয়ামী লীগ ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর শাহাদতবার্ষিকীতে জাতীয় শোক দিবস পালন করে। বিএনপি ওই দিন দলীয় প্রধানের ভুয়া জন্মদিন পালন করে।

৮. বিএনপির শাসনামল সন্ত্রাস দমনে সম্পূর্ণ ব্যর্থ! ফলে, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট প্রধান বিরোধী দলের সন্ত্রাসবিরোধী জনসভায় গ্রেনেড হামলায় ২৪ জন নিহত; এ ছাড়া সারা দেশে একযোগে বোমা হামলা, ‘বাংলা ভাই’র সৃষ্টি, ১০ ট্রাক অবৈধ অস্ত্রের চালানের মতো ভয়াবহতম ঘটনাগুলো ঘটেছে। আওয়ামী লীগের শাসনামলে, মাথাচাড়া দিতে চাইলেও নিরাপত্তা বাহিনীর ধারাবাহিক সফল অভিযানের ফলে জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাসবাদের উত্থান রহিত হয়।

৯. বিএনপির শাসনামলে আওয়ামী লীগের সাবেক অর্থমন্ত্রী, সংসদ সদস্য, জনপ্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের হত্যা করা হয়। আওয়ামী লীগের আমলে সেরকম কিছু ঘটেনি; বরং বিএনপিপ্রধান দুর্নীতি মামলায় দণ্ডিত হয়েছেন। ১০. আওয়ামী লীগ ক্ষমতার বাইরে থাকলে আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে দাবি আদায় করে।

অপর দিকে, বিএনপি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর দোষ চাপিয়ে আন্দোলনের বদলে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকে অথবা যে কোনো সামাজিক আন্দোলনের ঘাড়ে চড়ে সরকার হটানোর রাস্তা খোঁজে। ১১. বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালীন সন্ত্রাস দমনে শক্তিশালী এলিট ফোর্স তৈরি করে।

আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে সেরকম করেনি; বরং বিএনপির গঠিত ফোর্সকেই সন্ত্রাস দমনে সফলভাবে ব্যবহার করে। ১২. আওয়ামী লীগপ্রধান তথা সরকারপ্রধান, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপিপ্রধানকে সংলাপের জন্য টেলিফোনে দাওয়াত দেন। উত্তরে বিএনপিপ্রধান দাওয়াতটি প্রত্যাখ্যান করেন।

১৩. আওয়ামী লীগ তথা সরকারপ্রধান বিএনপিপ্রধানের ছেলের মৃত্যুতে সমবেদনা জানাতে যান। বিএনপির শিষ্টাচারবর্জিত আচরণের ফলে সরকারপ্রধান বিএনপিপ্রধানের বাড়িতে ঢোকার অনুমতি না পেয়ে সমবেদনা জানানোর বদলে গেট থেকেই তাকে ফিরে আসতে হয়।

১৪. বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে নিজ দলের দুর্নীতিবাজ মন্ত্রী-এমপি-আমলাদের শাস্তির আওতায় আনেনি। অপরদিকে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে নিজ দলের কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ পেলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তার বিচার করেছে। ডাকসাইটে মন্ত্রী-এমপিদেরও ছাড় দেয়নি। ১৫. বিএনপির শাসনামলে দেশ ৫ বার দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে।

আওয়ামী লীগের আমলে দেশ বিশ্বে চলমান অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যেও ‘৭.৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি’ ও ‘উন্নয়নের রোল মডেল’ হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে। ১৬. আওয়ামী লীগ ক্ষমতার বাইরে থাকতে চূড়ান্ত আন্দোলনে ‘লগি-বৈঠা নিয়ে রাস্তায় নামে’ এবং পরিণামে সরকার বদল হয়। বিএনপি জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রতিহত করতে পেট্রলবোমা দিয়ে সারা দেশে স্মরণকালের ভয়াবহতম আগুনসন্ত্রাস সৃষ্টি করে! দুধের শিশুসহ অসংখ্য মানুষের প্রাণহানি ঘটায়!

ফলস্বরূপ জনগণ তাদের ডাকা লাগাতার হরতাল বয়কট করলে প্রত্যাহার ছাড়াই আপনাআপনি তা এক সময় বাতিল হয়ে যায়। ৭. বিএনপিপ্রধানকে বিদেশি (ইংরেজি) সম্বোধনে ডাকা হয়। আওয়ামী লীগ প্রধানকে দেশীয় সংস্কৃতি অনুযায়ী সম্বোধন করা হয়। ১৮. আওয়ামী লীগ এরশাদবিরোধী এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার অর্জন আন্দোলনে কৌশলগত প্রয়োজনে স্বাধীনতাবিরোধী-যুদ্ধাপরাধীদের দলের সঙ্গে সাময়িকভাবে যুক্ত হয়েছিল।

বিএনপি মুক্তিযুদ্ধ-স্বাধীনতা-যুদ্ধাপরাধীদের সঙ্গে নিয়ে বছরের পর বছর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। ১৯. বিএনপির শাসনামলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও নারী সদস্যদের রাষ্ট্র পরিচালনার উচ্চাসনগুলোতে দেখা যায়নি। আওয়ামী লীগের আমলে দেশের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরে সংখ্যালঘু ও নারী সদস্যদের উচ্চাসনে দেখা যাচ্ছে। ২০. বিএনপিপ্রধান প্রায়ই নানা ধরনের মৌখিক ঘোষণার মাধ্যমে এভারেস্ট জয় করেন (কিন্তু বাস্তবে ঘটে না)।

আওয়ামী লীগপ্রধান ঘোষণা মোতাবেক বেশিরভাগ বাস্তবায়ন করেন। উল্লেখযোগ্য উদাহরণ : আওয়ামী লীগ তথা সরকারপ্রধান জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বলেছিলেন- সংবিধানের বাইরে তিনি একচুলও নড়বেন না। উত্তরে, বিএনপিপ্রধান বলেছিলেন আন্দোলনের ফলে এমন ঝড় উঠবে যে, সব চুলই নাকি উড়ে যাবে। পদ্মা সেতু ও বিদ্যুৎ উৎপাদন নিয়েও উভয় নেতার বিপরীতধর্মী মন্তব্যের ফলাফল সবারই জানা।

প্রসঙ্গত, টিভি লাইভ টকশোগুলোতে আলোচ্য দল দুটির প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকলেই অনুষ্ঠানটি বিদ্বেষপূর্ণ হয়ে ওঠে! সাধারণ টেবিলটকের শিষ্টাচারও হারিয়ে ফেলে! উভয়ের মধ্যেই মারমুখো, আক্রমণাত্মক বিতর্ক শুরু হয়। কখনও কখনও তা নির্লজ্জ হাতাহাতির পর্যায়েও যায়! ফলে সঞ্চালক বাধ্য হয়ে বিরতিতে চলে যান!

নানা কারণেই চিরবৈরী দল দুটির মধ্যে সংলাপের চেষ্টা হাস্যকর! কারণ, সংলাপের পূর্বশর্তই হল, সংশ্লিষ্ট পক্ষ দুটির মধ্যে ন্যূনতম পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও আস্থার উপস্থিতি থাকা; যা এখানে পুরোপুরি অনুপস্থিত। ইতঃপূর্বেও এ ধরনের চেষ্টার ফল আমরা জানি।

২০০৬ সালের ৫ অক্টোবর তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল ও ক্ষমতাসীন বিএনপির মহাসচিব মান্নান ভূঁইয়া বেশ কয়েক দফা বৈঠক করেন। ফলাফল, শূন্য। পরে, শূন্য থেকে মাইনাসে নামে সেই ফল। অর্থাৎ, ওই সংলাপের বিফলতার পথ ধরেই অনাকাক্সিক্ষত এক-এগারোর আর্মি ব্যাকড সরকারের সৃষ্টি।

এসব কারণে ভয় হয়, সংলাপপ্রত্যাশীরা কি দেশকে আবারও কোনো অগণতান্ত্রিক সরকারে নিয়ে যেতে চান? আমরা সাধারণ জনগণ সেটা চাই না। আমরা রাজনৈতিক সংকটের সমাধান চাই। তবে আর্মি ব্যাকড সরকার চাই না। আমরা শুধু উন্নয়ন বা শুধু গণতন্ত্র চাই না। উন্নয়নও চাই, গণতন্ত্রও চাই।

তবে, অবশ্যই তা বাংলাদেশ সৃষ্টির মূল যে ধারণা, স্বপ্ন তাকে বিকিয়ে দিয়ে নয়। আমরা উন্নয়নের জোয়ারের মধ্যেও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসমৃদ্ধ গণতন্ত্র চাই। তবে, সেই গণতন্ত্র চাই না, যা অন্যের গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব করে। যেমন, ২০১৪-এর ৫ জানুয়ারিতে ভোট কেন্দ্রগুলোতে আগুনসন্ত্রাস আর বোমাবাজির মাধ্যমে অনেকেরই ভোটাধিকার খর্ব করা হয়েছিল। আমরা সেই গণতন্ত্র চাই না, যা কোনো একটি দলের ক্ষমতায় যাওয়ার স্বার্থে সাধারণ মানুষকে পুড়িয়ে মারার অধিকার দেয়!

আমাদের এসব চাওয়ার বিপরীতে প্রাপ্তির বিশাল ঘাটতি থাকলে তাকেই আমরা সংকট বলব। কোনো একটি দলকে ক্ষমতায় রাখা কিংবা অন্য দলকে ক্ষমতায় আনার পথে বাধাকে আমরা সংকট বলতে নারাজ। কারণ, তাতে সমগ্র জাতির স্বার্থ থাকে না। থাকে কেবল দলীয় স্বার্থ।

আর, কোনো একটি দলীয় স্বার্থের দ্বারা সমগ্র জাতি উপকৃত হয় না। প্রত্যক্ষভাবে উপকৃত হয় কেবল সংশ্লিষ্ট দলটির নেতাকর্মী-সমর্থকরা। তাই, সংকট যদি কিছু থেকেই থাকে, তাহলে সংলাপ নয়; সংবিধানের আলোকে, সরকারের ভেতরে ও বাইরে থাকা বড় দলগুলোকেই এর বাস্তবসম্মত, কার্যকর ও ফলপ্রসূ সমাধান খুঁজে বের করতে হবে।

আশাফা সেলিম : ছড়াকার ও সংস্কৃতিকর্মী

[email protected]