নীতি দুর্নীতি অর্থনীতি

ব্যাংকগুলোয় সাধারণ মানুষ সমাদৃত হয় না কেন?

  ড. আর এম দেবনাথ ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ব্যাংক
ফাইল ছবি

পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তাফা কামালকে কয়েকটা প্রশ্ন করব। এজন্য শুরু করতে হচ্ছে কিছু পরিসংখ্যান ও তথ্য দিয়ে। এগুলো আমার মনগড়া পরিসংখ্যান নয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) গবেষণালব্ধ তথ্য। এর ওপর সেখানে আলোচনা হয়েছে। কাগজে এসব তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।

সেখানে বলা হচ্ছে, সাতটি দেশের মধ্যে একমাত্র পাকিস্তান বাদে অন্যসব দেশের তুলনায় বাংলাদেশে ব্যাংক হিসাবধারীর সংখ্যা সর্বনিম্ন এ দেশগুলো হচ্ছে : ভারত, শ্রীলংকা, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান ও মালয়েশিয়া। পাকিস্তানে ১৩ শতাংশ মানুষের ব্যাংক হিসাব আছে।

বাংলাদেশ, নেপাল ও ভুটানে ব্যাংক হিসাব আছে যথাক্রমে মাত্র ৩১, ৩৩ দশমিক ৮ এবং ৩৩ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষের। সর্বোচ্চ ৮২ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষের ব্যাংক হিসাব আছে শ্রীলংকায়। মালয়েশিয়ায় এ সংখ্যা ৮০ দশমিক ৭ শতাংশ। ভারতে ৫৩ দশমিক ১ শতাংশ মানুষের ব্যাংক হিসাব আছে।

গবেষণাপত্রে আরও তিন ধরনের পরিসংখ্যান দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র একটির পরিসংখ্যান দিয়েই আলোচনা শুরু করব। যারা বেতনভুক্ত তাদের মধ্যে কত শতাংশ মানুষ ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে বেতন নেন। এ ক্ষেত্রেও ওই সাতটি দেশের মধ্যে ইমরান খানের পাকিস্তানের অবস্থান সর্বনিু।

মজার ঘটনা হল, এ ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ রয়েছে দ্বিতীয় অবস্থানে। পাকিস্তান ও বাংলাদেশে যথাক্রমে ১ দশমিক ৪ শতাংশ এবং ১ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে বেতন নেন। মালয়েশিয়া এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ অবস্থানে- ৩০ দশমিক ৮ শতাংশ।

ভারতে ৪ শতাংশ বেতনভুক মানুষ ব্যাংকের মাধ্যমে বেতন নেন। শ্রীলংকায় ৭ দশমিক ১ শতাংশ। এমনকি ভুটানেও ৬ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ ব্যাংকের মাধ্যমে বেতন নেন।

একটু লম্বা সূচনা হয়ে গেল পরিসংখ্যানে। এসব তথ্য উত্থাপনের পর আমার প্রশ্ন পরিকল্পনামন্ত্রীর কাছে : ব্যাংক হিসাবধারীর সংখ্যা এবং ব্যাংকের মাধ্যমে বেতনগ্রহণকারীর সংখ্যা কি আমাদের ‘জিডিপি’ প্রবৃদ্ধির হার, মাথাপিছু আয়, আমদানি-রফতানির পরিমাণ, সাক্ষরতার হার, দারিদ্র্য হ্রাসের হার ইত্যাদির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?

উল্টোভাবে প্রশ্ন করলে প্রশ্নটি হয়- বিআইবিএমের তথ্যগুলো ঠিক আছে তো? আবার প্রশ্ন, পরিকল্পনা কমিশনের প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) পরিসংখ্যান ঠিক আছে তো? এসব প্রশ্নের উত্তর আমার পক্ষে দেয়া সম্ভব নয়। কারণ দুটো প্রতিষ্ঠানই সরকারি- একটি পুরোপুরি সরকারি, আরেকটি আধাসরকারি।

এখন এমন দুটো প্রতিষ্ঠানের তথ্য ও পরিসংখ্যান ধরে এগোতে চাইলে তো ভীষণ বিপদের মধ্যে পড়তে হয়। হোঁচট খেতে হয়। আমাদের সরকারি ব্যাংকিংয়ের বয়স ৪৬-৪৭ বছর। বেসরকারি ব্যাংকের শুরু ১৯৮২-৮৩ সালের দিকে। ইসলামী ধরনের ব্যাংকেরও তাই। হরেকরকম ব্যাংকের জন্ম হয়েছে ইতিমধ্যে।

পুলিশের ব্যাংক আছে, সেনাবাহিনীর ব্যাংক আছে, আনসার-ভিডিপির ব্যাংক আছে, কৃষির জন্য ব্যাংক আছে। বাণিজ্যিক ব্যাংক অগণিত। দফায় দফায় বেসরকারি ব্যাংক দেয়া হয়েছে। দেশে ৫০-এর উপরে ব্যাংক। ১০ হাজারেরও বেশি শাখা। এর মধ্যে গ্রামাঞ্চলে শাখা বেশি সরকারি ব্যাংকের।

শহরের রাস্তায় রাস্তায় একটি নয়, দুটি নয়, বহু ব্যাংক শাখা বিদ্যমান। গ্রিন ব্যাংকিং হয়েছে, স্কুল ব্যাংকিং হয়েছে। ১০ টাকার হিসাব হয়েছে। আরও কত প্রকল্প রয়েছে ব্যাংকগুলোর! তাদের বিজ্ঞাপন দেখলে প্রাণ ভরে যায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক দাবি করে আসছে, তারা দেশে ‘ব্যাংকিং বিপ্লব’ সাধন করেছে।

সাফল্যের ‘কীর্তিগাথা’ তাদের বার্ষিক প্রতিবেদনগুলোতে। এদিকে চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি অর্থনীতিরও উন্নতি হয়েছে। উন্নতির তথ্য সরকারি প্রকাশনায় হরদম পাওয়া যাচ্ছে। বাজেট বক্তৃতা, অর্থনৈতিক সমীক্ষা, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কার্যাবলি ইত্যাদি প্রকাশনায় অনেক তথ্য পাওয়া যায়।

দেখতে দেখতে দেশে শিক্ষিতের সংখ্যাও বেড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকও দাবি করে, তারা ঘরে ঘরে ব্যাংকের সেবা পৌঁছে দিচ্ছে। আমরা এসব চোখবুজে বিশ্বাস করি। লেখালেখি করি। এখন হয়েছে বিপদ। বিপদ, কারণ সরকারের এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দাবি সত্য হলে তো বিআইবিএমের গবেষণা কর্মটি মিথ্যা হয়ে যায়।

৪৬-৪৭ বছর ধরে ব্যাংকিং করে, প্রতিযোগিতার জন্য বেসরকারি খাতে ব্যাংকের অনুমোদন দিয়ে তাহলে কি এখন ধরে নিতে হবে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মধ্যে মাত্র ৩১ শতাংশ বাংলাদেশির ব্যাংক হিসাব আছে? সরকার দাবি করে, ৩০ শতাংশের ওপর মানুষ মধ্যবিত্তের কাতারে উঠেছে।

এক থেকে দেড় কোটি মানুষ বিদেশে চাকরি করে নিয়মিত ডলার পাঠায়। ৪০ লাখ নারী-পুরুষ পোশাক শিল্পে কর্মরত। ১৫ লাখের মতো শুধু সরকারি চাকরিজীবীই। কোটি কোটি মানুষ বেসরকারি খাতের চাকরিজীবী।

শত শত কোম্পানি আমাদের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত। গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ গেছে। কম্পিউটার শিখছে ছেলেমেয়েরা। এসব তথ্য তো শুধু একটা কথাই বলে- মানুষ ব্যাংকে যায়, ব্যাংকে টাকা রাখে। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পর্কে যে তথ্য বিআইবিএম দিয়েছে তাতে আমাদের অন্তর্চক্ষু খুলে যাওয়া উচিত।

আমার বাসায় ‘ঠিকা’ কাজ করে দু’জন মহিলা। তারা সব মিলিয়ে প্রতিদিন চার বাসায় কাজ করে। মাসে প্রতিজনের রোজগার ৬-৭ হাজার টাকার কম নয়। তাদের স্বামীরাও কাজ করে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তারা রিকশা চালায়। এখানে রোজগার আজকাল বেশ বেশি। জিজ্ঞেস করে জানলাম ব্যাংকের সঙ্গে তাদের কোনো লেনদেন নেই।

ব্যাংকে যাওয়ার কোনো প্রয়োজনও তারা বোধ করে না। দেশে ড্রাইভার শ্রেণীর লোকের সংখ্যা নেহাত কম নয়। তাদেরও বিরাটসংখ্যকের কোনো ব্যাংক হিসাব নেই। দোকানে দোকানে যারা চাকরি করে তাদের সংখ্যা লাখ লাখ।

তারাও ব্যাংকে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা বোধ করে না। যে সিগারেট-পান-বিড়ির দোকান চালায় ব্যাংক শাখার সামনে, তারও কোনো ব্যাংক হিসাব নেই। এসব ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা।

একটি সরকারি ব্যাংকের ম্যানেজারের পদোন্নতির সময় জিজ্ঞেস করা হল, আপনি যে রোডে ব্যাংক শাখা চালান সেই রোডের ক’জন দোকানদারের হিসাব আপনার ব্যাংকে আছে? তিনি এর উত্তর দিতে পারেননি। গ্রামের অবস্থা আরও করুণ।

কিছুদিন আগে এক বন্ধু (বর্তমানে প্রয়াত) ফোন করে আমার সহায়তা চায়। সে একটা অ্যাকাউন্ট খুলতে চায়। দুই দিন ঘুরে ব্যাংক শাখা থেকে ‘অ্যাকাউন্ট ওপেনিং ফরম’ জোগাড় করেছে; কিন্তু তা পূরণ করতে পারছে না। শাখার কোনো কর্মকর্তাও সাহায্য করছে না।

শাখার লোকেরা ব্যস্ত কিছু ব্যবসায়ী অ্যাকাউন্ট এবং স্থানীয় প্রভাবশালীদের অ্যাকাউন্ট সংরক্ষণে। তারা সবার কাছে যায় না। এ ধরনের ‘রিটেইল ব্যাংকিং’ তাদের পোষায় না। এমনও ব্যাংক আছে যেখানে অ্যাকাউন্ট খুলতে গেলে বলতে হয় আমেরিকায় তার কোনো হিসাব আছে কিনা।

এ ধরনের এক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে ব্যাংকগুলো একটা ভয়ভীতির পরিবেশ তৈরি করে রেখেছে। তারা টাকা রাখা, টাকা তোলা, টাকা পাঠানো- এসব কাজকে নানা প্রশ্নের সম্মুখীন করে তুলেছে। অনেকে বিদেশ থেকে ‘ডলার’ পাঠায় ‘বিকাশে’- এ খবর দেখলাম একটি কাগজে।

এ প্রেক্ষাপটে মনেই হয় আমাদের অনেক পরিসংখ্যান অতিরঞ্জিত। ভুল তথ্যে ভরা অনেক খবর। এ অবস্থায় সরকারকে বলব এসব তথ্য ও পরিসংখ্যানের গরমিলগুলো শুধরাতে। শিক্ষিতের হার বাড়বে, মধ্যবিত্তের ব্যাপ্তি হবে, নিুমধ্যবিত্তে দেশ ভরে যাবে, অথচ ব্যাংক হিসাব তারা খুলবে না, এটা মানা যায় না। সরকারের উচিত এসব বিষয় তলিয়ে দেখা।

ড. আর এম দেবনাথ : অর্থনীতি বিশ্লেষক; সাবেক শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter