দানবের পরাজয় ও মানবের বিজয়

  ড. এম এ মাননান ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

১৯৬২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর

শুধু ধনিকশ্রেণীর জন্যই উচ্চশিক্ষা নয়, রক্ত দিয়ে আমাদের তরুণরাই তা প্রমাণ করেছে ১৯৬২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর। এ দিনটিতেই সূচনা হয়েছিল বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন নামে সুপরিচিত ছাত্র আন্দোলন। এ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাংলার দামাল তারুণ্য সেদিন রুখে দাঁড়িয়েছিল পাকিস্তানি শাসকদের শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ আর শিক্ষা ক্ষেত্রে সৃষ্ট বৈষম্যের বিরুদ্ধে।

১৯৬২ সালে তৎকালীন সরকারের আমলের প্রথম শিক্ষা কমিশন- শরীফ শিক্ষা কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশিত হওয়ার পরপরই ফুঁসে ওঠে ছাত্রছাত্রীরা। তাদের সঙ্গে যোগ দেন শিক্ষাবিদসহ সংস্কৃতিসেবীরা।

সেকালের বিখ্যাত ঢাকা কলেজ থেকে শুরু হয় আন্দোলন। পরবর্তী সময়ে যুক্ত হয় জগন্নাথ কলেজ, ইডেন কলেজ, কায়েদে আজম কলেজ, তোলারাম কলেজসহ অন্যান্য কলেজের শিক্ষার্থীরা। নেতৃত্বে ছিলেন ইডেন কলেজের ছাত্র সংসদের সহসভাপতি মতিয়া চৌধুরী, ঢাকা কলেজের ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক কাজী ফারুক আহমেদসহ অনেক ছাত্রনেতা, যারা পরবর্তী সময়ে শিক্ষাবিষয়ক আন্দোলনে অনেক অবদান রেখেছেন।

পাকিস্তানের সামরিক স্বৈরাচার আইয়ুব খান ওই আন্দোলনকে দমন-পীড়নের মাধ্যমে স্তব্ধ করতে উদ্যত হয়। চলে পুলিশের গুলি, টিয়ারগ্যাস ও লাঠিচার্জ। রঞ্জিত হয় ঢাকার রাজপথ। শহীদ হন বাবুল, গোলাম মোস্তফা ও ওয়াজিউল্লাহ। ছাত্রসমাজ ১৭ সেপ্টেম্বর তারিখটিকে ‘শিক্ষা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে। আন্দোলনের মুখে শরীফ কমিশন রিপোর্ট আর বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।

বাংলাদেশ ভূখণ্ডে শহীদের রক্তে রঞ্জিত অনেক মাসের মধ্যে এ জন্যই সেপ্টেম্বর মাসটি বিশেষ মর্যাদায় অভিষিক্ত। এ মাসটি সর্বজনীন ও সহজলভ্য শিক্ষা এবং গণমুখী শিক্ষানীতির দাবির আন্দোলনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত হয়ে আছে। এ আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় আসে ’৬৪-এর ছাত্র আন্দোলন, ’৬৬-এর ৬ দফা আন্দোলন, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান ও ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ। আমি শিক্ষা দিবসের শহীদদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রদর্শনসহ তাদের স্বপ্নসাধ বাস্তবায়নের দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করছি।

স্বাধীন স্বদেশে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার লক্ষ শহীদের স্বপ্নসাধ বাস্তবায়নে শিক্ষাকে সহজলভ্য ও সর্বজনীন করার জন্য গণমুখী শিক্ষানীতি প্রণয়ন করেন। ড. কুদরত-ই-খুদা শিক্ষানীতি নামে তা ব্যাপক গণসমর্থন লাভ করে। দ্রুতই শুরু হয় শিক্ষানীতি অনুযায়ী নবজাত বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা সাজিয়ে তোলার কর্মযজ্ঞ। স্বাধীনতার সাড়ে ৫ দশক পর আমরা ’৬২-এর আন্দোলনের স্বাদ পাচ্ছি। কিন্তু এর পেছনের ইতিহাসটা বিভীষিকাময়, নানা চড়াই-উতরাই আর কণ্টকময়।

লৌহমানব হিসেবে কুখ্যাত স্বৈরশাসক আইয়ুব খান, ক্ষমতা দখলের মাত্র ২ মাস পর ১৯৫৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করেন। এ কমিশন ১৯৫৯ সালে আগস্ট মাসের মধ্যে একটি শিক্ষা রিপোর্ট প্রণয়ন করে। ২৭ অধ্যায়ে বিভক্ত এ রিপোর্টে প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চতর স্তর পর্যন্ত সাধারণ, পেশামূলক শিক্ষা, শিক্ষক প্রসঙ্গ, শিক্ষার মাধ্যম, পাঠ্যপুস্তক, হরফ সমস্যা, প্রশাসন, অর্থ বরাদ্দ, শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যবিষয়ক বিস্তারিত সুপারিশ উপস্থাপন করা হয়। এতে আইয়ুব শাহীর ধর্মান্ধ, পুঁজিবাদী, রক্ষণশীল, সাম্রাজ্যবাদী শিক্ষাসংকোচন নীতির পূর্ণ প্রতিফলন ঘটেছিল। আইয়ুব সরকার এ রিপোর্টের সুপারিশ গ্রহণ করে তা ১৯৬২ সাল থেকে বাস্তবায়ন করতে শুরু করে।

শরীফ কমিশনের শিক্ষা সংকোচন নীতি কাঠামোতে শিক্ষাকে তিন স্তরে ভাগ করা হয়- প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চতর। ৫ বছরের প্রাথমিক ও ৩ বছরের উচ্চতর ডিগ্রি কোর্স এবং ২ বছরের স্নাতকোত্তর কোর্সের ব্যবস্থা থাকবে বলে প্রস্তাব করা হয়। উচ্চশিক্ষা ধনিকশ্রেণীর জন্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এ জন্য পাস নম্বর ধরা হয় শতকরা ৫০, দ্বিতীয় বিভাগ শতকরা ৬০ এবং প্রথম বিভাগ শতকরা ৭০ নম্বর।

এ কমিশন বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বায়ত্তশাসনের পরিবর্তে পূর্ণ সরকারি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, বিশ্ববিদ্যালয়-কলেজে রাজনীতি নিষিদ্ধ করা, ছাত্র-শিক্ষকদের কার্যকলাপের ওপর তীক্ষ্ম নজর রাখার প্রস্তাব করে। শিক্ষকদের কঠোর পরিশ্রম করানোর জন্য ১৫ ঘণ্টা কাজের বিধান রাখা হয়েছিল। শিক্ষকরা যাতে ছাত্রদের সঙ্গে স্বদেশ, স্বজাতি নিয়ে আলোচনা ও তর্কের সুযোগ না পায় সে অপচেষ্টা করা হয়েছিল। শুধু ক্লাসের মাঝে এক ধ্যানে মনোনিবিষ্ট রেখে তারা রোবোটিক শিক্ষক-ছাত্র তৈরির চক্রান্ত করেছিল। রিপোর্টের শেষাংশে বর্ণমালা সংস্কার করা এবং বাংলা ও উর্দুর স্থলে রোমান বর্ণমালা প্রয়োগ ও প্রতিষ্ঠার জন্য কমিটি গঠনের প্রস্তাব করে এ কমিশন।

আইয়ুব সরকারের শরীফ কমিশন রিপোর্টে শিক্ষাকে পণ্য হিসেবে বর্ণনা করা হয় : ‘শিক্ষা সম্পর্কে জনসাধারণের চিরাচরিত ধারণা অবশ্যই বদলাইতে হইবে। সস্তায় শিক্ষা লাভ করা যায় বলিয়া তাহাদের যে ভুল ধারণা রহিয়াছে, তাহা শিগগিরই ত্যাগ করিতে হইবে। যেমন দাম তেমন জিনিস, এই অর্থনৈতিক সত্যকে অন্যান্য ব্যাপারে যেমন শিক্ষার ব্যাপারেও তেমনি এড়ানো দুষ্কর।’ পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থরক্ষাই শিক্ষার লক্ষ্য, এ কথা রিপোর্টের এই অংশে স্পষ্ট করে ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল।

ছাত্র ইউনিয়ন আইয়ুবের শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষ্যে ১৯৫৯ সালে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনকে নিয়ে একুশে উদ্যাপনের প্রস্তুতি গ্রহণ করে। ১৯৬০ ও ১৯৬১ সালে এ ধরনের উদ্যোগ অব্যাহত থাকে। ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রনাথের জন্মবার্ষিকী পালন করার মাধ্যমে ছাত্রসমাজ সরকারের সাম্প্রদায়িক ও বাঙালিবিরোধী মনোভাবকে অগ্রাহ্য করে।

১৯৬১ সালে আওয়ামী লীগ, কমিউনিস্ট পার্টির বৈঠকের পর আন্দোলন বিষয়ে ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের মধ্যে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। ৩০ ডিসেম্বর এ বৈঠকে সামরিক শাসনের পরিবর্তে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, বিভিন্ন অধিকার প্রতিষ্ঠা, ‘আইয়ুব শিক্ষানীতি’ বাতিল চায় তারা। রাজবন্দিদের মুক্তি ইত্যাদি বিষয়ে আন্দোলন শুরু করার প্রস্তাব করে, যা ওই মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত আকারে গৃহীত হয়। আরও সিদ্ধান্ত হয়, ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হবে স্বৈরতন্ত্রবিরোধী জঙ্গি আন্দোলন।

১৯৬২ সালের ৩০ জানুয়ারি প্রবীণ নেতারা অন্যায়ভাবে হেনস্তা ও গ্রেফতার হলে ৩১ জানুয়ারি ৪টি ছাত্র সংগঠন মধুর ক্যান্টিনে যৌথভাবে বসে। ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন ছাড়া বাকি দুটি সংগঠন (ন্যাশনাল স্টুডেন্টস ফেডারেশন ও ছাত্রশক্তি) ছিল সরকারের সমর্থক। এদের মূল উদ্দেশ্য ছিল সরকারবিরোধী আন্দোলনকে ভুল পথে পরিচালিত করা। অবশ্য ছাত্রলীগ এ বিষয়ে সতর্ক ছিল।

১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বাত্মক ছাত্র ধর্মঘট পালিত হয়। ২ ফেব্রুয়ারি রাজপথে জঙ্গি মিছিল সামরিক আইন ভঙ্গ করে। ৪-৫ ফেব্রুয়ারি বিক্ষোভ অব্যাহত থাকে। ৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হাজার হাজার ছাত্র প্রতিবাদ সমাবেশে উপস্থিত হয়। ৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়নের সুসজ্জিত একটি মিছিল নাজিমুদ্দিন রোড দিয়ে পুরান ঢাকায় প্রবেশ করে। এ মিছিলকে প্রতিহত করার জন্য সরকার পুলিশের সঙ্গে সেনাবাহিনী নিয়োগ করে এবং কার্জন হলের মোড়ে ফিল্ড কামান বসানো হয়। আন্দোলনকারীরা ওইদিন আইয়ুব খানের ছবি পুড়িয়ে তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করে।

৮ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হওয়ার পর ছাত্ররা হল ত্যাগ করছে না দেখে পুলিশ ও সেনাবাহিনী বিশ্ববিদ্যালয় ঘেরাও করে ছাত্রদের জোর করে বের করে দেয়। প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যে পুলিশ বেষ্টনীর মাঝে আটকা পড়েছিল আন্দোলনের নেতাকর্মীরা। তাদের নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা আগেই জারি হয়েছিল, যা বহুদিন পর্যন্ত বহাল ছিল। এভাবে সারা দেশে আইয়ুববিরোধী, শিক্ষানীতিবিরোধী আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। মার্চে বিশ্ববিদ্যালয় খোলার পর কেন্দ্রীয়ভাবে আন্দোলন চাঙ্গা হতে থাকে। কিন্তু রাজনৈতিক নেতৃত্ব যথাযথ ভূমিকা পালন না করায় কয়েক মাস ছাত্র আন্দোলন কিছুটা মন্থর থাকে।

অবশেষে ১৯৬২ সালের ২৫ জুন দেশের ৯ বিশিষ্ট নাগরিক এক বিবৃতিতে আইয়ুব ঘোষিত শাসনব্যবস্থা প্রত্যাখ্যান করে নতুন শাসনতন্ত্র প্রণয়নের দাবি জানান। নেতারা সারা দেশে জনসভা করেন, ফলে জনমনে কিছুটা আশার সঞ্চার হয়। ’৬২-এর দ্বিতীয়ার্ধে সরকার ঘোষিত শিক্ষানীতির প্রতিবাদে আন্দোলন আবার বেগবান হয়ে ওঠে।

প্রতিক্রিয়াশীল শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে ঢাকা কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল স্কুল, ন্যাশনাল মেডিকেল ইন্সটিটিউটসহ বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্ব স্ব দাবির ভিত্তিতে জুলাই-আগস্ট মাসজুড়ে আন্দোলন চলতে থাকে।

আন্দোলনের দাবিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় হয়েছিল শিক্ষানীতিতে প্রস্তাবিত তিন বছরের ডিগ্রি কোর্স এবং উচ্চ মাধ্যমিক ইংরেজির অতিরিক্ত বোঝা বাতিল করার বিষয়টি। এ দাবির সমর্থনে দেশের অধিকাংশ স্কুল-কলেজের ছাত্ররা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ক্লাস বর্জন করতে থাকে। এসব আন্দোলন কর্মসূচিকে সংগঠিতভাবে রূপ দেয়ার জন্য ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন পাকিস্তান স্টুডেন্ট ফোরাম নামে সাধারণ ছাত্রদের একটি মোর্চা গঠনের মাধ্যমে আইয়ুব শিক্ষানীতি বাতিলের দাবিতে মাসজুড়ে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলার কাজ চালাতে থাকে। শিক্ষা আন্দোলন প্রস্তুতির সময় ছাত্রনেতারা দেশব্যাপী এ কথা বোঝাতে সক্ষম হন যে, শিক্ষার অধিকার ও গণতন্ত্রের আন্দোলন একইসূত্রে গাঁথা।

১৭ সেপ্টেম্বর দেশব্যাপী হরতাল পালিত হয়। ছাত্রদের সঙ্গে সাধারণ মানুষও পিকেটিংয়ে অংশগ্রহণ করে। সকাল ১০টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হাজার হাজার মানুষের সমাবেশে-মিছিল হয়। জগন্নাথ কলেজে গুলি হয়েছে এ গুজব শুনে মিছিল দ্রুত নবাবপুরের দিকে ধাবিত হয়। হাইকোর্টে পুলিশের সঙ্গে সংঘাতে না গিয়ে মিছিল আবদুল গনি রোড ধরে যেতে থাকে।

পুলিশ তখন পেছন থেকে মিছিলে হামলা চালায়। লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস ও গুলি চালায়। পুলিশের সঙ্গে দ্বিতীয় দফা সংঘর্ষ বাধে ঢাকা কোর্টের সামনে। এখানেও পুলিশ ও ইপিআর গুলি চালায়। এতে অনেকে আহত হন, তিনজন শহীদ হন এবং শত শত ছাত্রকে গ্রেফতার করা হয়। বাবুল, গোলাম মোস্তফা ও ওয়াজিউল্লাহ শহীদ হন।

ওইদিন শুধু ঢাকা নয়, সারা দেশে মিছিলের ওপর পুলিশ হামলা চালায়। টঙ্গীতে ছাত্র-শ্রমিক মিছিলে পুলিশ গুলি চালিয়ে হত্যা করে সুন্দর আলী নামের এক শ্রমিককে। শেষ পর্যন্ত বুলেট, বেয়নেট আর রক্তচক্ষু কিছুই স্তব্ধ করতে পারেনি দামাল সন্তানদের দাবিকে।

কিন্তু ইতিহাসের শিক্ষা হচ্ছে, প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি কখনও প্রগতির শক্তিকে পরাজিত করতে পারে না। দানবের পরাজয় ও মানবের বিজয় ইতিহাস নির্ধারিত। ’৬৬-এর ছয় দফা, ’৬৯-এর গণআন্দোলন, এরপর ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ- সব একইসূত্রে গাঁথা। পরবর্তীকালে ১৯৯১-এ গণতন্ত্রের দাবিতে আন্দোলনে এবং এরপর গ্রেনেড, বোমা ও জঙ্গিবিরোধী লড়াইয়ে ’৬২-এর চেতনা উজ্জীবিত করেছে দেশবাসীকে।

১৯৯৬ সালের নির্বাচনের ভেতর দিয়ে জাতির পিতার সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ঘুরে দাঁড়ায় দেশ। রাষ্ট্র ও সমাজ জীবনের সর্বক্ষেত্রের মতো শিক্ষা ক্ষেত্রও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারায় সুসংগঠিত হয়ে উঠতে থাকে। ১৯৭২ সালের ২৬ জুলাই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক গঠিত এবং ড. কুদরত-ই-খুদার সভাপতিত্বে জাতীয় শিক্ষা কমিশনের রিপোর্টের ধারাবাহিকতায় বঙ্গবন্ধুকন্যার নির্দেশনায় ২০১০ সালে প্রণীত হয় গণমুখী শিক্ষানীতি এবং সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় এ নীতি বাস্তবায়নের কাজ।

প্রথমবারের মতো শিক্ষা আইনও আলোর মুখ দেখার পথে। বর্তমানে বিনা মূল্যে শিক্ষার্থীদের বছর শুরুর দিনে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ, যুগোপযোগী ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আলোকে সিলেবাস প্রণয়ন, ছাত্রছাত্রীদের উপবৃত্তি প্রদান, শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট ফান্ড গঠন, শিক্ষা ক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন, কম্পিউটার ল্যাব স্থাপন, ডায়নামিক ওয়েবসাইট প্রতিষ্ঠা, শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতি প্রদান, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, কোচিং বাণিজ্য বন্ধে কঠোরতা, কারিগরি শিক্ষার প্রসার, মাদ্রাসা শিক্ষার আধুনিকায়ন, উচ্চশিক্ষার প্রসার ও গুণগত মান বৃদ্ধি, জেন্ডার সমতা, ইউনেস্কোর সদস্যপদ লাভ, শিক্ষার অবকাঠামোগত উন্নয়ন ইত্যাদি কর্মকাণ্ডের ভেতর দিয়ে প্রণীত শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের কাজ অগ্রসর হচ্ছে। ফলে শিক্ষা ক্ষেত্রে সাফল্যের ধারা হয়েছে অবারিত।

তবে এতে আত্মতুষ্টির অবকাশ নেই। শিক্ষা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গুণগত মান বিচারে এখনও বিশ্বমানে পৌঁছাতে লড়াই করছি আমরা। অন্যদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোকে রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

সম্প্রতি বন্যায় অসংখ্য স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এত প্রতিকূলতার মাঝেও আমরা থেমে নেই। কারণ এ জাতি লড়তে জানে। আর যুদ্ধ করে বিজয় অর্জনের শিক্ষাটা জন্মের পরপরই লাভ করি আমরা। উন্নত এবং মানুষের মতো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার মতো শিক্ষব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম চলছে, চলবে এবং এটি চলমান প্রক্রিয়া। মহান শিক্ষা দিবসের মাস সেপ্টেম্বরে আমাদের শপথ, শহীদদের স্বপ্নসাধ আমরা বৃথা যেতে দেব না।

অধ্যাপক ড. এম এ মাননান : শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট; উপাচার্য, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×