ট্রাম্পের বাণিজ্য যুদ্ধের নেপথ্যে কী?

  কেমাল দারভিস ও ক্যারোলাইন কনরয় ১১ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ট্রাম্প

নিজের আগ্রাসী বাণিজ্যনীতির পক্ষে ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুক্তি- এটি চলমান মার্কিন মূলধন ঘাটতি কমাবে এবং হুমকির মুখে থাকা মার্কিন শিল্পকে সুরক্ষা দেবে, যা পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষায় টেকে না। ট্রাম্পের বাণিজ্য যুদ্ধের মূলে রয়েছে সম্ভাব্য বহুপাক্ষিক শৃঙ্খল থেকে আমেরিকার শক্তিকে মুক্ত করার এক প্রেরণা।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি থেকে ৫০ শতাংশ দ্রুতগতিতে বাণিজ্য বেড়েছে। এর পেছনে ব্যাপকভাবে কাজ করেছে সাবেক ‘জেনারেল এগ্রিমেন্ট অন ট্যারিফস অ্যান্ড ট্রেড’ (জিএটিটি) বা বর্তমানের বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিওটিও) আনুকূল্যের আওতায় উদারীকরণের লক্ষ্যে বিভিন্ন পর্যায়ের সফল আলোচনা।

কিন্তু এখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সর্বশেষ আমদানি শুল্কের মাত্রা বিশ্বকে একটি পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্য যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে, যেখানে বাণিজ্যের ওই প্রবৃদ্ধির বেশিরভাগটাই আর হবে না।

মুক্তবাণিজ্যের প্রস্তাবকরা সবসময় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধি উপভোগ করছেন। কারণ সার্বিক দক্ষতা বৃদ্ধির নির্দেশক হিসেবে বিশেষায়িতকরণের মধ্য দিয়ে তুলনামূলক সুবিধা কাজে লাগিয়ে দেশগুলো নিজেদের পুঁজি বাড়াচ্ছে বলে মনে করে তারা।

বিপরীতে, মুক্তবাণিজ্যের সমালোচকরা এই ভেবে উদ্বিগ্ন যে, এটি দরিদ্র দেশগুলোকে এমন পণ্য উৎপাদনে সীমাবদ্ধ করে ফেলতে পারে, উৎপাদন প্রবৃদ্ধিতে যেগুলোর অবদান অনেক কম। তারা আরও যুক্তি দিচ্ছেন, যদিও বিশ্বায়নের কারণে সমবেতভাবে অর্জনের সুযোগ আছে, সেখানে স্পষ্টত হারানোর আশঙ্কাও আছে।

বস্তুত, খুব কম মানুষই এতে দ্বিমত পোষণ করতে পারেন যে, একটি স্থিত তুলনামূলক সুবিধা তত্ত্ব উন্নয়ন নীতির জন্য দুর্বল নির্দেশনা। বাণিজ্য জ্ঞান ও নতুন মার্কেটের শিক্ষাও নিয়ে আসছে কিনা, তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য আরও বেশি প্রাণবন্ত ও গতিময় ফ্রেমওয়ার্ক প্রয়োজন। যদি এমনটি হয় তবে এটি হতে পারে ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক উন্নতির একটি চালিকাশক্তি।

সর্বোপরি, বিশ্বাস জাগানোর মতো প্রমাণ আছে যে, উন্নত দেশগুলোতে যেখানে সহায়তামূলক নীতি কার্যকর আছে, সেখানে অবশ্যই তারা আরও সমৃদ্ধ হয়েছে। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে উন্নত দেশগুলো বুঝতে পেরেছে শিক্ষা ও অবকাঠামো খাতে উচ্চ বিনিয়োগের সঙ্গে সঙ্গে বাণিজ্য নীতিগুলোকেও সম্পূরক করতে হয়।

কিন্তু বর্তমানে যখন বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থা মার্কিন হামলার শিকার, তখন উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, কীভাবে তারা এর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেবে।

নিজের বাড়তি শুল্ক আরোপের যুক্তি হিসেবে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে নিজ দেশের দ্বিপাক্ষিক বা বহুপাক্ষিক বাণিজ্য ঘাটতির বিষয়টি তুলে ধরেছেন।

কিন্তু যেখানে বাড়তি শুল্কারোপ বাণিজ্য প্রবাহের গতি পরিবর্তন করে দিতে পারে, সেখানে জাতীয় সঞ্চয় ও বিনিয়োগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চলতি মূলধনের ভারসাম্যে তা খুব কমই প্রভাব ফেলতে পারে। যদি সঞ্চয়ের কারণে বিনিয়োগ কম হয় (যেমনটি ঘটে যুক্তরাষ্ট্রে), তবে চলতি মূলধনে অবশ্যই ঘাটতি থাকবে।

নিশ্চিতভাবে বলতে গেলে, চলতি মূলধন ভারসাম্যে শুল্ক প্রাসঙ্গিক প্রভাব ফেলতে পারে। যেমন- অভ্যন্তরীণ ভোক্তাদের ওপর করারোপ করা হলে এবং সুনির্দিষ্ট অভ্যন্তরীণ উৎপাদকদের ভুর্তকি দেয়া হলে শুল্ক ভোক্তাদের নিষ্পত্তিযোগ্য (ডিসপোজেবল) আয় কমায় এবং মূলধন আয় বাড়ায়।

বিস্তৃতভাবে বলতে গেলে, শ্রম আয়ের তুলনায় যত বেশি মূলধন আয় বাঁচানো হবে, শুল্ক সার্বিক অর্থনীতির সঞ্চয় হার তত বেশি বাড়াবে। তারপরও সঞ্চয়-বিনিয়োগ ভারসাম্যের ওপর এ প্রভাব হয় একইসঙ্গে দুর্বল ও অপ্রত্যক্ষ।

মাইক্রো লেভেলে ট্রাম্প বিতর্ক করতে পারেন যে, নির্দিষ্ট কিছু খাতকে রক্ষা করার জন্য শুল্কারোপ দরকার। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি করা অনেক পণ্য প্রকৃত অর্থে মধ্যস্বত্বভোগী প্রভাব রাখে, যা কিনা মৌলিকভাবে অভ্যন্তরীণভাবে উৎপাদিত (এমনকি এটি চীন থেকেও বড় ইস্যু)।

সুতরাং, যুক্তরাষ্ট্রের নির্দিষ্ট সেক্টরে শুল্কায়ন প্রকৃতপক্ষে সংযোজিত মূল্য, বেতন ও লাভকে সংরক্ষণ করছে কিনা, তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য যে কাউকে অবশ্যই মার্কিন রফতানির মধ্যে মূল্য সংযোজনকে আমলে নিতে হবে, যা বর্তমানে করারোপের মুখে রয়েছে।

ধারণা করি, ট্রাম্পের উপদেষ্টারা বিষয়গুলো তার কাছে ব্যাখ্যা করলে তার প্রকৃত যুক্তি নিয়ে কেউ কেউ বিস্মিত হতে পারেন।

যেখানে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ শিল্পগুলোকে টেনে তোলা এবং যুক্তরাষ্ট্রের চলতি মূলধন ঘাটতি কমানো ট্রাম্পের আকাঙ্ক্ষা, সেখানে তার বাণিজ্যনীতিতে এগুলো প্রভাব ফেলতে পারে। তারপরও এটি স্পষ্ট যে, তার মূল লক্ষ্য হল বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা এবং বহুপাক্ষিকতা, যার প্রতিনিধিত্ব সংস্থাটি করে থাকে।

মনে হচ্ছে ট্রাম্পের ধারণা, বহুপাক্ষিকতা আমেরিকার প্রভাবকে খাটো করতে পারে এই ভাবনা থেকে যে, দ্বিপাক্ষিক একটি মতানৈক্যে জয়ী হওয়ার জন্য আমেরিকা সবসময় তার অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক কর্তৃত্বকে কাজে লাগাতে পারবে। যেটা তিনি উপলব্ধি করতে পারছে না তা হল, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশটির এখনও নিরপেক্ষ বৈশ্বিক আইন ও পক্ষপাতহীন বহু প্রতিষ্ঠান দরকার তাদের সেবার জন্যই।

ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ গত ৭০ বছর ধরে জিএটিটি থেকে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নিয়মকানুন বহুপাক্ষিক ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে উন্নতি লাভ করেছে, যেখানে সব দেশের জন্য একই ধরনের আইন প্রয়োগ করা হয়।

তাতে বলা হচ্ছে না যে, বড় ও ধনী দেশগুলোর ছোট ও দরিদ্র দেশগুলোর চেয়ে কম সুবিধা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলো জটিল বাণিজ্যিক দরকষাকষিতে আরও বেশি কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞ নিয়োগ করতে পারে তাদের কোম্পানিগুলোর স্বার্থের পক্ষে কথা বলার জন্য।

পাশাপাশি তারা পেছনের দরজা দিয়ে সমান্তরাল কূটনৈতিক পথেও প্রভাবান্বিত করতে পারে। যা হোক, আইনগতভাবে ডব্লিউটিও হচ্ছে একটি সমতার গ্রুপ। ‘সবচেয়ে সুবিধাপ্রাপ্ত দেশের’ সুযোগের অর্থ হল একটি সুবিধা যদি এক দেশের উৎপাদকদের জন্য বিস্তৃত করা হয়, সেটা অন্যদের জন্যও করতে হবে।

সম্ভবত, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল ডব্লিউটিও’র বিরোধ নিষ্পত্তি মেকানিজম (ডিএসএম) রয়েছে, যা সদস্য রাষ্ট্রগুলোর বিরোধ সময়মতো নিষ্পত্তি করতে কাজ করে। যদিও ডব্লিউটিও’র বিচারক প্যানেলে তোলা বেশিরভাগ মামলাতেই যুক্তরাষ্ট্র জিতেছে, তবে কিছু ক্ষেত্রে দেশটিকে হারতেও হয়েছে।

বাঁধাধরা বিচারে রায় দেয়ার সক্ষমতা সত্ত্বেও ডব্লিউটিও পদ্ধতিতে ডিএসএম একটি অসাধারণ বিষয়। অন্য কোনো বহুপাক্ষিক সংস্থারই এমন মেকানিজম নেই।

বহুপাক্ষিক পদ্ধতিতে উন্নতি করতে পারে, অবশ্যই এমন অনেক পথ আছে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা, বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের উচিত বড় প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবেলায় নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবন করা।

এছাড়া একুশ শতাব্দীর প্রতিযোগিতামূলক নীতিও দরকার। গুরুত্বপূর্ণ ভোটের ফরম সংযুক্ত করাও ডব্লিউটিও’র জন্য উপযুক্ত হতে পারে, যেমনটি আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের কার্যতালিকায় ব্যবহৃত হয়।

যেভাবে সমালোচনা করা হয় যে, বিশ্বায়ন বিজয়ী ও পরাজিত উভয়টিই তৈরি করছে, সেভাবে বাণিজ্যের বিরুদ্ধে যুক্তি দেয়া যায় না। এটি হচ্ছে যারা পেছনে পড়ে গেছে তাদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার পক্ষে যুক্তি।

এর ওপর ভিত্তি করে- যারা অতীতে ডব্লিউটিও’র সঠিক সমালোচনা করেছে- তাদের উচিত এর সমর্থক দলে যোগদান করা। বৈশ্বিক শাসনের এ প্রতিষ্ঠানটিকে ট্রাম্পের নীতির বিদেশভীতির একপাক্ষিকতা থেকে রক্ষায় উভয় পক্ষেরই একটি স্বার্থ রয়েছে।

প্রজেক্ট সিন্ডিকেট থেকে ভাষান্তর : সাইফুল ইসলাম

কেমাল দারভিস : তুরস্কের সাবেক অর্থমন্ত্রী ও ইউএনডিপির সাবেক প্রশাসক

ক্যারোলাইন কনরয় : ব্রুকিংস ইন্সটিউিশনের জ্যেষ্ঠ রিচার্স অ্যানালিস্ট

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter