ধারদেনা করে চলছেন যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি কর্মচারীরা

দেয়াল বিলের বিকল্প অভিবাসী আটক প্রস্তাব ট্রাম্পের

  যুগান্তর ডেস্ক ২১ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ধারদেনা করে চলছেন যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি কর্মচারীরা

আমেরিকার ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময়ের শাটডাউন চলছে। সরকার যারা চালান, তারাই বন্ধ করে দিয়েছেন দেশের চাকা। সব সম্ভবের দেশ যুক্তরাষ্ট্রে সবই হয়।

কেন্দ্রীয় সরকার বন্ধ হয়ে যায়; রাজ্য সরকার নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণা করে। সরকারি ও বিরোধী দলের দ্বন্দ্বে সাধারণ খেটে খাওয়া জনগণের পেটে ‘লাথি পড়ছে’।

এক মাস ধরে বন্ধ রয়েছে কর্মকর্তাদের বেতন। বাধ্য হয়ে ধারদেনা করেই চলছেন তারা। কেউ কেউ ফুডব্যাংক থেকে খাদ্য নিচ্ছেন। ঘরের দামি দামি জিনিসপত্র বিক্রি করে দিচ্ছেন। অনেকে স্বল্প সুদে ব্যাংক ঋণের দ্বারস্থ হচ্ছেন।

আবার অনেকে খণ্ডকালীন চাকরি করছেন। রাগে-ক্ষোভে রাস্তায় নেমে পড়েছেন সরকারি কর্মকর্তারা। কাজের দাবিতে বিক্ষোভে ফুঁসে উঠেছেন। কারণ কাজে ফিরতে পারলেই জুটবে অর্থ, মিলবে খাবার।

মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল নির্মাণ নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড প্রাম্প ও ডেমোক্র্যাট নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসের দ্বন্দ্বে অচল হয়ে পড়েছে সরকারের চাকা। বেতনহীন রয়েছেন বিভিন্ন বিভাগের ৮ লক্ষাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী। ২২ ডিসেম্বর থেকে চলছে এ অচলাবস্থা। খবর এপি, ওয়াশিংটন পোস্ট ও লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমসের।

* ফুডব্যাংকের সহায়তা

টেনেসি রাজ্যের মিড-সাউথ ফুডব্যাংকের কাছ থেকে খাবার নিচ্ছেন অনেকে। ফুডব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক অ্যান্ড্রিউ বেল বলেন, শুক্রবার আড়াই শতাধিক সরকারি কর্মচারীকে খাবার দেয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, স্থানীয় এফবিআই দফতর থেকেও খাবার সাহায্যের জন্য আমরা ফোন পেয়েছি। মেমফিস বিমানবন্দরের নিরাপত্তাকর্মী মিয়া উইলিয়াম বলেন, ‘টানা এক মাস বেতন ছাড়াই কাজ করছি। আমার খাবার প্রয়োজন। মাসিক ইন্স্যুরেন্স বিল, বন্ধক বিলও পরিশোধ করতে হবে।’ কমিউনিটি গ্রুপ ও ব্যবসায়ী নেতারা সরকারি কর্মচারীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। কলিয়ারভিল শহরের ডোনাট হাট অ্যান্ড বাসকিন রবিনস (বিশ্বের বৃহত্তম আইসক্রিম শপ) বেতনহীন কর্মচারীদের জন্য ফুড ও রেস্টুরেন্ট গিফট কার্ড চালু করেছে। রানওয়ের ৯০১ বার ও গ্রিল ফাস্টফুড শপ তাদের অর্ধেক বেতনে খাবার দিচ্ছে।

স্বল্প সুদে ঋণ দিচ্ছে ব্যাংক

যুক্তরাষ্ট্রের ইউএস ব্যাংক সরকারি কর্মচারীদের জন্য স্বল্পমেয়াদি অল্প সুদে ঋণ সুবিধা চালু করেছে। ১১ জানুয়ারি থেকে এ কার্যক্রম শুরু করেছে ব্যাংকটি। ১০০ ডলার থেকে ৬ হাজার ডলার পর্যন্ত ঋণ দিচ্ছে ইউএস ব্যাংক। ১২ মাসের মধ্যে পরিশোধ শর্তে এ অর্থের সুদ মাত্র দশমিক শূন্য এক শতাংশ। এ সুবিধার আওতায় ওই ব্যাংকের কাস্টমারদের বন্ধক বিল ও কার লোন পরিশোধ করে দেয়া হচ্ছে। এছাড়া জরুরি প্রয়োজনে একই সুদে সর্বোচ্চ ১০ হাজার ডলার দিচ্ছে ব্যাংকটি। ইউএস ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অ্যান্ডি সিসেরি বলেন, কাস্টমারদের অর্থনৈতিক চাপের মুখে তাদের পাশে দাঁড়াতে প্রতিশ্রুতবদ্ধ আমরা।

* খণ্ডকালীন চাকরি

বেতনহীন সরকারি কর্মচারীদের অনেকেই সরকার চালানোর জন্য খণ্ডকালীন চাকরি করছেন। কেউ কেউ উবার, লিফট ও পোস্টমেটের মতো রাইড শেয়ারিং কোম্পানির চালক হিসেবে কাজ করছেন। অনেকে ফুলের দোকান, বেকারি শপ বা ফাস্টফুডের দোকানে কাজ করছেন। অনেকে আবার বাসার বাড়তি কক্ষটি ভাড়া দিয়েছেন। নিজের বাড়ির একটি কক্ষ ভাড়া দিয়েছেন তুকসন কোর্টের অভিবাসন আইনজীবী চেরিল ইনজুনজা ব্লাম। তিনি বলেন, দুই মাস ধরে ফোন বিল বাবদ প্রায় ৫০০ ডলার সরকারের কাছে বকেয়া রয়েছে। বেতন না পেলেও তাকে কাজ চালিয়ে যেতে হবে। কারণ মক্কেলরা আমার দিকেই তাকিয়ে আছে, যাদের অনেকেই আটক বা অনেকের শুনানি চলমান।

* ঘরের পণ্য বেচে চলছে সংসার

নিত্যপ্রয়োজনী পণ্য কিনতে শিশুর ব্যবহৃত জ্যাকেট থেকে শুরু করে দেয়াল ঘড়িটিও বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন অনেক কর্মচারী। আন্দ্রেয়া ক্যাভালারোর স্বামী কোস্টগার্ডে চাকরি করেন। অচলাবস্থার মধ্যেও তাকে কাজে যেতে হচ্ছে। বেতন না পাওয়ায় বড় ছেলের প্রথম জন্মদিনের সময় উপহার দেয়া বোম্বার জ্যাকেটটি ফেসবুকে ৫ ডলারে বিক্রির জন্য পোস্ট দিতে হয়েছে তাকে। এছাড়া দামি খেলনাগুলোও পাঁচ থেকে ১০ ডলারে বিক্রির পোস্ট দিয়েছেন আন্দ্রেয়া। মেয়ের বিয়ের জন্য অনলাইনে কয়েকটি বিয়ের পোশাক কিনে রেখেছিলেন লরা স্লেমনস। তার স্বামী জর্জিয়ার হাউজিং অ্যান্ড আরবান ডেভেলপমেন্ট বিভাগে কর্মরত। এক মাস বেতন না পাওয়ায় সংসার চালাতে বিয়ের প্রতিটি পোশাক ১০০ ডলারে বিক্রির জন্য ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন লরা।

* দুর্যোগ মোকাবেলার অর্থ নেই

যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কাছে এখন প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলারও অর্থ নেই বলে হুশিয়ারি করেছে জাতীয় হ্যারিকেন সেন্টার (এনএইচসি)। আটলান্টিক মহাসাগরের হ্যারিকেন মৌসুম ১ জুন থেকে শুরু হয়। সময় খুব কাছেই। অথচ সরকারের কোনো প্রস্তুতি নেই। ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় গত বছর কয়েকশ’ কোটি ডলার খরচ হয়েছে। এনএইচসির কর্মকর্তা এরিক ব্লেক বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতিহত করতে বহু প্রকল্প দাঁড় করাতে হবে। কিন্তু এখনও কোনো বিলের দেখা মেলেনি।

* রাজ্যে রাজ্যে বিক্ষোভ

অচলাবস্থার শুরু থেকে রাজধানী ওয়াশিংটনসহ রাজ্যে রাজ্যে বিক্ষোভ হয়ে আসছে। শনিবার হোয়াইট হাউসের সামনে, জর্জিয়া রাজ্যের সাভানা-হিলটন হেড বিমানবন্দর, টেনেসি রাজ্যের মেমফিসে, ফিলাডেলফিয়ার জাতীয় পার্কে কয়েকশ কর্মচারী বিক্ষোভ করেন। এ সময় ‘আমরা কাজ চাই’, ‘শাটডাউন বন্ধ করুন’, ‘কর্মচারীদের ওপর যুদ্ধ বন্ধ করুন’ লেখা প্লাকার্ড বহন করেন।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের এক মাসের অচলাবস্থা অবসানের চেষ্টায় নিজের মেক্সিকো দেয়াল প্রকল্পের বিকল্প নতুন পরিকল্পনা উত্থাপন করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শনিবার হোয়াইট হাউস থেকে দেয়া ১৩ মিনিটের ভাষণে নিজের প্রস্তাবগুলোকে ‘সমঝোতা প্রস্তাব’ বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। তার প্রস্তাবিত সমঝোতাগুলোর মধ্যে রয়েছে নতুন অভিবাসীদের অন্তত তিন মাস আটক কেন্দ্রে রাখা। রোববার ওয়াশিংটন পোস্ট জানায়, এ প্রস্তাবটি গ্রহণ করলে দেয়াল নির্মাণের জন্য ট্রাম্পের ৫৭০ কোটি ডলার তহবিল দেয়ার প্রয়োজন নেই। এছাড়া অল্প বয়সে যারা অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছে সেই ড্রিমারদের কাজ করার অনুমতি দেবেন ট্রাম্প। বিনিময়ে তাকে দেয়াল নির্মাণের বরাদ্দ দিতে হবে। ডেমোক্রেটিক দলের শীর্ষ নেতারা তাৎক্ষণিক ট্রাম্পের এসব প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি চলমান অচলাবস্থার কারণে দেশটির আট লাখ ফেডারেল কর্মী বিপাকে পড়েছেন। এই পর্যায়ে এসে ট্রাম্প বলেছেন, ‘অভিবাসীদের স্বাগত জানানোর এক দীর্ঘ ইতিহাস যুক্তরাষ্ট্রের আছে। কিন্তু এই ব্যবস্থাটি অনেক দিন ধরে নাজুকভাবে ভেঙে পড়ছে। জঙ্গিরা সীমান্ত দিয়ে ঢুকে পড়ছে। এমন সন্দেহভাজনদের অন্তত ৩ মাস আটক কেন্দ্রে রাখা উচিত।’

তবে ভাষণে তিনি দেয়াল নির্মাণের পক্ষে তার যুক্তিগুলো তুলে ধরেছেন। দেয়ালটি ধারাবাহিক না হয়ে বেশি স্পর্শকাতর স্থানগুলোতে শুধু একটি স্টিলের পথরোধক থাকবে বলে জানিয়েছেন। কিন্তু দেয়াল নির্মাণের জন্য ৫৭০ কোটি ডলারের দাবিতে অটল থেকেছেন। ট্রাম্পের নতুন ‘সমঝোতার’ প্রস্তাবে রয়েছে ড্রিমার ও টেম্পোরারি প্রটেকশন স্ট্যাটাস (টিপিএস) হোল্ডারদের বিষয়ও। যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৭ লাখ ড্রিমার আছে। তাদের বাবা-মায়েরা যখন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছিলেন তখন তারা অল্প বয়সী ছিলেন। কাজ করতে পারবে কিন্তু নাগরিকত্ব পাবে না, এমন একটি কর্মসূচির আওতায় বর্তমানে ড্রিমাররা বিতাড়িত হওয়া থেকে সুরক্ষা পাচ্ছেন। এই কর্মসূচিটি বাতিল করবেন বলে জানিয়েছেন ট্রাম্প। ভাষণে তিনি বলেছেন, ওয়ার্ক পারমিট পাওয়ার অনুমোদনসহ এই ড্রিমারদের সুরক্ষা আরও তিন বছর পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা হবে। পাশাপাশি টিপিএস ভিসাধারীদের মেয়াদও তিন বছর পর্যন্ত বাড়াবেন। যুদ্ধ ও দুর্যোগকবলিত দেশগুলোর তিন লাখেরও বেশি লোক টিপিএস সুবিধায় যুক্তরাষ্ট্রে আছে। এই কর্মসূচির বিরোধিতা করছেন ট্রাম্প। এর পাশাপাশি আরও কয়েকটি প্রস্তাব দিয়েছেন ট্রাম্প।

এর মধ্যে জরুরি মানবিক ত্রাণ সহায়তায় হিসেবে ৮০ কোটি ডলার বরাদ্দ, আরও দুই হাজার ৭৫০ সীমান্তরক্ষী ও নিরাপত্তা কর্মকর্তা এবং ৭৫ জন নতুন অভিবাসন বিচারকের টিম নিয়োগ দেয়া। প্রস্তাবগুলো নাকচ করে হাউস স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি বলেন, আমেরিকাকে জিম্মি করে রাখা এ অনর্থক শাটডাউন বন্ধ করতে অচিরেই ট্রাম্প বিলে স্বাক্ষর করবেন। সিনেট সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা চাক শুমারও ট্রাম্পের সব প্রস্তাব নাকচ করেছেন। নতুন প্রস্তাবগুলো প্রত্যাখ্যাত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র সরকারের অচলাবস্থার সহসাই ইতি ঘটছে না বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×