মসজিদের মেঝেই সারি সারি লাশ

নিউজিল্যান্ড হামলায় প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা

  যুগান্তর ডেস্ক ১৬ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের দুটি মসজিদে হামলার ভয়াবহতা উঠে এসেছে প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায়। শুক্রবার শহরের ডিনস এভিনিউয়ের আল নুর ও লিনউড মসজিদে কয়েকশ’ মুসল্লি সমবেত হয়েছিলেন জুমার নামাজ আদায়ে। আল নুর ও লিনউড মসজিদের ভেতরে ও বাইরে থাকা প্রত্যক্ষদর্শীরা সেখানকার ভয়াবহ পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়েছেন।

হামলার সময় আল নুর মসজিদ থেকে পালিয়ে আসা এক প্রত্যক্ষদর্শী নুর হামজা কীভাবে জীবন নিয়ে পালিয়ে আসেন নিউজিল্যান্ড হেরাল্ডকে তার বর্ণনা দিয়েছেন। এ সময় তার পোশাকেও রক্তের ছোপ ছোপ দাগ লেগে ছিল। ৫৪ বছর বয়সী হামজা বলেন, গুলি শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আরও অনেক মুসল্লির সঙ্গে মসজিদ থেকে বেরিয়ে আসেন তিনি। তারা সবাই বাইরে পার্ক করা গাড়ির পেছনে লুকিয়ে পড়েন। হামজা বলেন, ‘অন্তত ১৫ মিনিট ধরে চলে গোলাগুলি। গুলি থেমে গেলে মসজিদের জানালা দিয়ে ভেতরে তাকিয়ে দেখি প্রধান দরজা থেকে পুরো মসজিদের মেঝেতে পড়ে আছে লাশ আর লাশ।’ হামজা পড়াশোনার জন্য ১৯৮০’র দশকে মালয়েশিয়া থেকে নিউজিল্যান্ডে আসেন। ১৯৯৮ সাল থেকে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন তিনি। শুক্রবারের গণহত্যার ঘটনায় বাকরুদ্ধ হয়ে গেছেন তিনি। হামজা বলেন, ‘নিউজিল্যান্ডের জন্য এটা আসলেই একটা বিপর্যয়কর ও কালো দিন। আমি কল্পনাও করতে পারছি না এমন ভয়াবহ কিছু ঘটেছে।’

মরার ভান করে লুকিয়ে ছিলাম বেঞ্চের নিচে : হামলাকারীর ব্রাশফায়ারের ভেতর কীভাবে রক্ষা পাওয়ার লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন ফরিদ আহমেদ। তিনি জানান, গুলির হাত থেকে বাঁচতে একটি বেঞ্চের নিচে লুকিয়ে পড়েন তিনি। ফরিদ বলেন, ‘গোলাগুলির মধ্যে একসঙ্গে অনেকেই মসজিদের ভেতর থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করছিলেন। তাদের লক্ষ্য করেও গুলি চালায় হামলাকারী। তখন আমার মনে হল, আমার বাঁচার আর কোনো সুযোগ নেই। হঠাৎ দেখলাম, পাশেই একটা বেঞ্চ রয়েছি। আমি ঠিক ওটার নিচে শুয়ে পড়লাম। কিন্তু আমার পা দুটো বের হয়ে থাকল। আমি মরার ভান করে নিঃশ্বাস বন্ধ করে রেখেছিলাম। এর মধ্যে সে সাতবার ম্যাগাজিন বদলে ফেলেছে। ধাম ধাম গুলির শব্দ। যখনই একটা ম্যাগাজিন শেষ হয়ে যাচ্ছে, তখনই বদলে নিচ্ছে।’

চোখের সামনেই ঢলে পড়ল মানুষগুলো : হামলার পর জীবিত বেরিয়ে আসা মুসল্লি রমজান আলি বলেন, ‘গুলি শুরু হওয়ার আগে আল নুর মসজিদ সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ নীরব ছিল। ইমামের বয়ানের সময় পিনপতন নীরবতা। নামাজ চলাকালে ১টা ৪০ মিনিটে গুলি শুরু হয়।’ তিনি বলেন, সামরিক কায়দার জ্যাকেট ও হেলমেট পরিহিত হামলাকারী বন্দুক নিয়ে হামলা চালায়। তিনি বলেন, হামলাকারীর কাছে বড় একটি বন্দুক ও প্রচুর গুলি ছিল। সে ঢুকে পড়ে আর মসজিদের ভেতরে থাকা প্রত্যেককে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়তে শুরু করে। যেদিকে ইচ্ছা সেদিকেই গুলি ছুড়ছিল সে। আমার চোখের সামনেই অনেককেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে দেখেছি।’

আমি ডেকেই যাচ্ছি কিন্তু কেউ শুনতে পারছে না : ১৪ বছর বয়সী কিশোর ইদরিস খায়েরউদ্দিন নিউজিল্যান্ড হেরাল্ডকে জানায়, গুলি শুরুর সময় সে আল নুর মসজিদের ভেতরেই ছিল। তিনি জানান, প্রথমে তারা ভেবেছিলেন বৈদ্যুতিক শক লেগেছে বা নির্মাণকাজ চলছে। কিন্তু তারপরই মুসল্লিরা দৌড়াতে শুরু করে। হিলমর্টন হাইস্কুলের ছাত্র সে। জানায়, ভেতরে তখনও আমার বন্ধুরা রয়ে গেছে। আমি তাদের ডেকেই যাচ্ছি কিন্তু তারা আমার কথা শুনতে পারছে না। তার চাচা তমিজিসহ তার পরিচিত অন্তত ছয়জনকে গুলি করা হয়েছে।

রাস্তার মাঝে একটি বালিকাকেও মরে পড়ে থাকতে দেখেছি : নিউজিল্যান্ডের ফেডারেশন অব ইসলামিক ফেডারেশনের প্রধান ড. মুস্তফা ফারুক রেডিও নিউজিল্যান্ডকে বলেছেন, আল নুর মসজিদের ভেতরে-বাইরে এ দিন ৩০০ থেকে ৫০০ মুসল্লি ছিলেন। হামলার সময় মসজিদের ভেতরেই ছিলেন মোহন ইবরাহিম। ঘটনার বর্ণনা দিয়ে ইবরাহিম বলেন, ‘হামলাকারীকে দেখতে পাইনি আমি। কারণ অন্য আরেক কক্ষে ছিলাম। হঠাৎই কানে আসল গুলির শব্দ। এরপর জীবন নিয়ে যে যার মতো পালাতে লাগল মুসল্লিরা। আমি এখনও স্তম্ভিত। বহু মুসল্লিকে হত্যা করা হয়েছে। অনেকেই গুরুতর আহত।’ ‘রাস্তার মাঝে একটি বালিকাকেও মরে পড়ে থাকতে দেখেছি,’ বলেন ইবরাহিম।

এমন কিছু ঘটতে পারে ধারণাতেই ছিল না : মসজিদের কাছেই ক্রাইস্টচার্চের বাসিন্দা বেঞ্জামিন জেলি জানান, ২০-৪০টি গুলির আওয়াজ শুনতে পান তিনি। এরপরই গুলি লাগা এক মুসল্লি দৌড়ে কোনো মতে তার বাড়ির দরজায় এসে পৌঁছে। তিনি জানান, ওই মুসল্লির পায়ে ৭ সেমি. গভীরে গুলিবিদ্ধ হয়েছিল। তিনি জানান, ওই মুসল্লির ক্ষত চেপে ধরে সঙ্গে সঙ্গে অ্যাম্বুলেন্স ডাকি ও পুলিশে খবর দিই।’ জেলি বলেন, ‘পুরো ঘটনায় আমি ভয়ে শিহরিত। নিউজিল্যান্ডে এমন কিছু ঘটতে পারে আমার ধারণার বাইরে ছিল।’

শিশুরা খেলছিল, হঠাৎ বৃষ্টির মতো গুলি : প্রত্যেক শুক্রবারের মতো এ দিনও ১১ বছর বয়সী ছেলেকে নিয়ে নামাজ পড়তে যান রাহিমি আহমদ। ছেলেকে বাইরে রেখে ভেতরে যান তিনি। ছেলে বাইরে অন্য শিশুদের সঙ্গে খেলছিল। হঠাৎ বৃষ্টির মতো গুলি। গোলাগুলির মধ্যে এক মুসল্লি শিশুটিকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যান। কিন্তু আহমদের ভাগ্যে কী ঘটেছে তা জানা যায়নি। বলছিলেন আহমদের স্ত্রী আজিলা। আহাজারি করে তিনি বলেন, ‘রাহিমির সঙ্গে মোবাইল ফোন রয়েছে। আমি নিশ্চিত, শিগগিরই আমাকে ফোন করবে। কিন্তু এখনও জানি না তার ভাগ্যে কী ঘটেছে।’

প্রথমেই গুলি করে চেয়ারে বসা বয়স্কদের : দ্বিতীয় গোলাগুলির ঘটনা ঘটে লিনউড মসজিদে। ওই ঘটনা প্রসঙ্গে সায়িদ আহমেদ ক্রাইস্টচার্চ প্রেসকে জানান, ছদ্মবেশ ধারণকারী এক হামলাকারী মোটরসাইকেল হেলমেট পরে মসজিদে ঢুকে হামলা শুরু করে। তিনি হামলাকারীকে চিৎকার করতে শুনেছেন তবে তিনি কী বলেছেন তার অর্থ বুঝতে পারেননি বলে জানান। তিনি জানান প্রথমেই সে চেয়ারে বসে থাকা বয়স্কদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। পরে সবাইকেই লক্ষ্যবস্তু বানায়।

আরও পড়ুন
--
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×