অবরুদ্ধ কাশ্মীরে জন্ম-মৃত্যুর গল্প
jugantor
অবরুদ্ধ কাশ্মীরে জন্ম-মৃত্যুর গল্প

  যুগান্তর ডেস্ক  

১৮ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

অবরুদ্ধ কাশ্মীরে জন্ম-মৃত্যুর গল্প

মোহাম্মদ সিকান্দার ভাট যখন অবরুদ্ধ শ্রীনগরে নিজের বাড়িতে শুয়ে শেষ নিঃশ্বাস নিলেন, ঠিক তখন শফিক আহমেদ কাশ্মীরের সড়কে নিরাপত্তা চৌকির কড়াকড়ি পার হয়ে অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে ৮৫ কিলোমিটার (৫৩ মাইল) দূরের একটি হাসপাতালে পৌঁছানোর চেষ্টায় উ™£ান্ত ছুটোছুটি করছিলেন।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সংবিধানের ৩৭০ ধারা মুছে দিয়ে জম্মু-কাশ্মীরকে ভাগ করে আলাদা দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল করার সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর থেকেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন কাশ্মীর। ভূস্বর্গখ্যাত এ উপত্যকায় এই কড়াকড়ির মধ্যেই তিন মেয়েকে শেষবারের মতো দেখার ইচ্ছাটি অতৃপ্ত রেখে চিরবিদায় নিতে হয়েছে এক বাবাকে। কঠিন এ জীবনযুদ্ধে টিকে গেছেন অন্যজন।

হয়েছেন ফুটফুটে সন্তানের বাবা; স্ত্রীকেও তিনি বাঁচাতে পেরেছেন। কাশ্মীর নিয়ে সরকারের এ আকস্মিক সিদ্ধান্তের কারণে উপত্যকার ৭০ লাখ মানুষকে কতটা মূল্য দিতে হচ্ছে- তা ওই একটি জন্ম আর একটি মৃত্যুর গল্পেই স্পষ্ট।

রয়টার্স জানায়, দিনটি ছিল ৭ আগস্ট। বেলা ২টা। ৭০ বছর বয়সী ক্যান্সারের রোগী মোহাম্মদ সিকান্দার ভাট তার ছেলেকে ডেকে তিন মেয়েকে নিয়ে আসতে বললেন। অন্য সময় গাড়ি চালিয়ে বোনদের বাসায় পৌঁছাতে ১০ মিনিটও লাগে না। কিন্তু সেদিন লেগেছিল পুরো এক ঘণ্টা।

সিকান্দারের ছেলে বলেন, ‘আমি ফিরে আসার আগেই বাবা মারা গেলেন।’ পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে ডাক্তার ডেকে এনে বাবাকে বাঁচানোর একটা শেষ চেষ্টা করতে পারতেন তিনি। টেলিযোগাযোগ বন্ধ থাকায় ডাক্তার ডাকারও উপায় ছিল না।

রয়টার্সের কাছে নিজের নাম বলতে চাননি বাবাকে হারানো ওই কাশ্মীরি যুবক। তার ভয়, গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলাটা প্রশাসন হয়তো ভালো চোখে দেখবে না। কাশ্মীরের দক্ষিণের শহর কোকেরনাগ। স্ত্রী আর এক মেয়েকে নিয়ে ওই শহরেই থাকেন আহমেদ। নিরাপত্তার কড়াকড়িতে ৭ আগস্ট তারাও কার্যত বন্দি ছিলেন। শীর্ণ গড়নের হাসিখুশি আহমেদ তার সন্তানসম্ভবা স্ত্রীকে নিয়ে গিয়েছিলেন স্থানীয় একটি হাসপাতালে। কিন্তু স্ত্রীর রক্তচাপ মেপে উদ্বেগ প্রকাশ করলেন ডাক্তার। স্ত্রীকে ১৬ মাইল দূরের অনন্তনাগ জেলা হাসপাতালে নিয়ে যেতে বললেন।

ডাক্তারের যুক্তি, সবকিছু বন্ধ থাকায় কর্মীরা হাসপাতালে আসেনি। এর মধ্যে প্রসূতির অবস্থা খারাপের দিকে গেলে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় তার পক্ষে করার কিছু থাকবে না।

উপায় না দেখে আহমেদ, তার স্ত্রী, কন্যা আর শ্যালিকা একটি অ্যাম্বুলেন্সে চড়ে বসেন। অনন্তনাগ হাসপাতালে পৌঁছাতে এমনিতে ৪৫ মিনিটের বেশি লাগার কথা না। সেদিন আটটি তল্লাশি চৌকি পেরিয়ে যেতে দুই ঘণ্টা লেগেছিল। সেখানকার ডাক্তারাও ঝুঁকি নিতে চাইলেন না।

আহমেদকে বলা হল, স্ত্রীকে ৩৭ মাইল দূরে শ্রীনগরের প্রধান মাতৃসদনে নিয়ে যাওয়ার জন্য। শ্রীনগরে যাত্রাপথে আহমেদদের ১০ বার থামানো হয়েছিল। এক ঘণ্টার পথ যেতে লেগেছিল আড়াই ঘণ্টা। এ পুরোটা সময় পরিবারের বাকি সদস্যরা ছিলেন ঘোর অন্ধকারে। যোগাযোগের উপায় না থাকায় তারা জানতেও পারছিলেন না, কোথায় আছেন আহমেদরা- কোকেরনাগ, অনন্তনাগ নাকি অন্য কোথাও।

অবরুদ্ধ কাশ্মীরে জন্ম-মৃত্যুর গল্প

 যুগান্তর ডেস্ক 
১৮ আগস্ট ২০১৯, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
অবরুদ্ধ কাশ্মীরে জন্ম-মৃত্যুর গল্প
ছবি: সংগৃহীত

মোহাম্মদ সিকান্দার ভাট যখন অবরুদ্ধ শ্রীনগরে নিজের বাড়িতে শুয়ে শেষ নিঃশ্বাস নিলেন, ঠিক তখন শফিক আহমেদ কাশ্মীরের সড়কে নিরাপত্তা চৌকির কড়াকড়ি পার হয়ে অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে ৮৫ কিলোমিটার (৫৩ মাইল) দূরের একটি হাসপাতালে পৌঁছানোর চেষ্টায় উ™£ান্ত ছুটোছুটি করছিলেন।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সংবিধানের ৩৭০ ধারা মুছে দিয়ে জম্মু-কাশ্মীরকে ভাগ করে আলাদা দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল করার সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর থেকেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন কাশ্মীর। ভূস্বর্গখ্যাত এ উপত্যকায় এই কড়াকড়ির মধ্যেই তিন মেয়েকে শেষবারের মতো দেখার ইচ্ছাটি অতৃপ্ত রেখে চিরবিদায় নিতে হয়েছে এক বাবাকে। কঠিন এ জীবনযুদ্ধে টিকে গেছেন অন্যজন।

হয়েছেন ফুটফুটে সন্তানের বাবা; স্ত্রীকেও তিনি বাঁচাতে পেরেছেন। কাশ্মীর নিয়ে সরকারের এ আকস্মিক সিদ্ধান্তের কারণে উপত্যকার ৭০ লাখ মানুষকে কতটা মূল্য দিতে হচ্ছে- তা ওই একটি জন্ম আর একটি মৃত্যুর গল্পেই স্পষ্ট।

রয়টার্স জানায়, দিনটি ছিল ৭ আগস্ট। বেলা ২টা। ৭০ বছর বয়সী ক্যান্সারের রোগী মোহাম্মদ সিকান্দার ভাট তার ছেলেকে ডেকে তিন মেয়েকে নিয়ে আসতে বললেন। অন্য সময় গাড়ি চালিয়ে বোনদের বাসায় পৌঁছাতে ১০ মিনিটও লাগে না। কিন্তু সেদিন লেগেছিল পুরো এক ঘণ্টা।

সিকান্দারের ছেলে বলেন, ‘আমি ফিরে আসার আগেই বাবা মারা গেলেন।’ পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে ডাক্তার ডেকে এনে বাবাকে বাঁচানোর একটা শেষ চেষ্টা করতে পারতেন তিনি। টেলিযোগাযোগ বন্ধ থাকায় ডাক্তার ডাকারও উপায় ছিল না।

রয়টার্সের কাছে নিজের নাম বলতে চাননি বাবাকে হারানো ওই কাশ্মীরি যুবক। তার ভয়, গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলাটা প্রশাসন হয়তো ভালো চোখে দেখবে না। কাশ্মীরের দক্ষিণের শহর কোকেরনাগ। স্ত্রী আর এক মেয়েকে নিয়ে ওই শহরেই থাকেন আহমেদ। নিরাপত্তার কড়াকড়িতে ৭ আগস্ট তারাও কার্যত বন্দি ছিলেন। শীর্ণ গড়নের হাসিখুশি আহমেদ তার সন্তানসম্ভবা স্ত্রীকে নিয়ে গিয়েছিলেন স্থানীয় একটি হাসপাতালে। কিন্তু স্ত্রীর রক্তচাপ মেপে উদ্বেগ প্রকাশ করলেন ডাক্তার। স্ত্রীকে ১৬ মাইল দূরের অনন্তনাগ জেলা হাসপাতালে নিয়ে যেতে বললেন।

ডাক্তারের যুক্তি, সবকিছু বন্ধ থাকায় কর্মীরা হাসপাতালে আসেনি। এর মধ্যে প্রসূতির অবস্থা খারাপের দিকে গেলে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় তার পক্ষে করার কিছু থাকবে না।

উপায় না দেখে আহমেদ, তার স্ত্রী, কন্যা আর শ্যালিকা একটি অ্যাম্বুলেন্সে চড়ে বসেন। অনন্তনাগ হাসপাতালে পৌঁছাতে এমনিতে ৪৫ মিনিটের বেশি লাগার কথা না। সেদিন আটটি তল্লাশি চৌকি পেরিয়ে যেতে দুই ঘণ্টা লেগেছিল। সেখানকার ডাক্তারাও ঝুঁকি নিতে চাইলেন না।

আহমেদকে বলা হল, স্ত্রীকে ৩৭ মাইল দূরে শ্রীনগরের প্রধান মাতৃসদনে নিয়ে যাওয়ার জন্য। শ্রীনগরে যাত্রাপথে আহমেদদের ১০ বার থামানো হয়েছিল। এক ঘণ্টার পথ যেতে লেগেছিল আড়াই ঘণ্টা। এ পুরোটা সময় পরিবারের বাকি সদস্যরা ছিলেন ঘোর অন্ধকারে। যোগাযোগের উপায় না থাকায় তারা জানতেও পারছিলেন না, কোথায় আছেন আহমেদরা- কোকেরনাগ, অনন্তনাগ নাকি অন্য কোথাও।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : কাশ্মীর সংকট